মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা স্বকৃত নোমানের সেরা গল্প --------------বগি নম্বর ৮৩০৫-------------

এই গল্পটি লেখার গল্প

‘বগি নম্বর ৮৩০৫’গল্পটি লিখেছি চলতি বছরের সেপ্টম্বরের ২২ তারিখে, ঢাকায় আমার বাসায়। গল্পটি লেখার সময় চাকরির সুবাদে আমি বাংলা একাডেমিতে কাজ করছিলাম এবং পড়াশোনা এবং লেখালেখি করছিলাম আমার বাসাতেই। গল্পটির বীজ পাই সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে, আমি যখন সপরিবারে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সাজেক থেকে ফিরছিলাম।
যাওয়ার সময় প্রথমে ঢাকার কমলাপুর থেকে ট্রেনে করে ফেনী যাই, তারপর বাসে করে খাগড়াছড়ি। কদিন আগে কোরবানির ঈদ গেছে। ট্রেনে প্রচ- ভিড়। ফেনী পৌঁছে ট্রেন থেকে নামার সময় আমার প্যান্টের পকেটে থেকে মোবাইল ফোনটি কেউ নিয়ে গেল। ভারী বিপদে পড়ে গেলাম। মোটামুটি দামী মোবাইল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। পাঁচ মিনিট। তারপর মনে পড়ে গেল গীতার বাণী : ‘...তোমার কী হারিয়েছে, যে তুমি কাঁদছ? তুমি কী নিয়ে এসেছিলে, যা তুমি হারিয়েছ? তুমি কী সৃষ্টি করেছ, যা নষ্ট হয়ে গেছে? তুমি যা নিয়েছ, এখান থেকেই নিয়েছ। যা দিয়েছ এখানেই দিয়েছ। তোমার আজ যা আছে, কাল তা অন্যকারো ছিল, পরশু সেটা অন্যকারো হয়ে যাবে। পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম।’ সঙ্গে সঙ্গে মনটা ভালো হয়ে গেল। মোবাইল চুরি হওয়ার বেদনা মাথা থেকে উড়ে গেল। ভুলে গেলাম মোবাইলের কথা। 

ভ্রমণের দিনগুলোতে আমার হাতে মোবাইল ফোন ছিল না। চার দিন পর ট্রেনে করে ফেনী থেকে ঢাকায় ফিরছি। ট্রেন কুমিল্লা পৌঁছার পর আমার পেশাবের বেগ পেল। গেলাম ট্রেনের বাথরুমে। ট্রেনের বাথরুমের দরজাগুলো লোহার। জানালাটাও খুব ছোট। ভেতর থেকে চিৎকার করলেও বাইরে কম শোনা যায়। দরজাগুলো ভেতর এবং বাহির―দুদিক থেকেই বন্ধ করা যায়। বাথরুমে ঢুকে যথারীতি হুক লাগিয়ে দিলাম। অর্ধেক পেশাব করলাম, ঠিক তখনই মনে হলো, আচ্ছা, এখন যদি বাইরে থেকে কেউ দরজার বাইরের হুকটি লাগিয়ে দেয়, তবে আমার কী উপায় হবে? আমার হাতে তো ফোন নেই। দরজা খুলে দেওয়ার জন্য যে আমার স্ত্রীকে ফোন দেব সেই উপায় নেই। সঙ্গে সঙ্গে, পেশাব শেষ না করেই, দরজার হুক খুলে দিলাম এবং দরজা খোলা রেখেই কাজটা শেষ করলাম। বাথরুম থেকে বের হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। মাথায় খেলে গেল ‘বগি নম্বর ৮৩০৫’গল্পের কথাবস্তু। 

সারাপথ মাথা থেকে আর গল্পটির কথাবস্তু যায় না। ডুবে থাকি একটা ঘোরের মধ্যে। কীভাবে গল্পটা শুরু করব এবং কীভাবে শেষ করব, তাই নিয়ে ভাবতে থাকি। ঢাকায় পৌঁছেও সেই ঘোর আর কাটে না। আঙ্গিক নিয়ে ভাবি, শুরু নিয়ে ভাবি, শেষ নিয়ে ভাবি। ২১ তারিখ বিকেলে মনে পড়ে গেল ফ্রেডরিক নীটশের একটি কথা : ‘বেঁচে থাকা মানে দুর্ভোগ পোহানো। টিকে থাকা মানে ওই দুর্ভোগের কোনো তাৎপর্য বুঝতে পারা।’ আমার মনে হলো, যে গল্পটি লিখতে চাচ্ছি সেটা লেখার প্রয়োজনীয়তাটা আমি জেনে গেছি। এখন শুরু করা যায়। সেদিন রাতেই শুরু করলাম লেখা। 

মধ্যরাতে গল্পের অর্ধেক লিখে থেমে যেতে হলো। রাত তখন প্রায় দেড়টা। মনে হলো, প্রায় একই বিষয়ে তো ‘ছুটির ঘণ্টা’ নামে একটা সিনেমা আছে। আমার গল্পের মূল সুরের খানিকটা তো ‘ছুটির ঘণ্টা’র সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কী করা যায়? ভাবি আর ভাবি। ভাবতে ভাবতেই ঘুমাতে যাই। পরদিন সকালে চলে যাই অফিসে। ভাবনা থেকে বের হতে পারি না। আমি সাধারণত হেঁটে বাসায় ফিরি। সেদিন অফিস থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফেরার পথে যখন নীলক্ষেত মোড় অতিক্রম করলাম, তখন এই জটিল সমস্যার একটা সমাধান পেয়ে গেলাম। আমার গল্পে নিয়ে এলাম ‘ছুটির ঘণ্টা’র প্রসঙ্গ। যেমন, “...তখন সে (আমার গল্পের চরিত্র) কমোডের পাশে অপরিসর জায়গাটুকুতে বসে পড়ল। মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে লাগল। মনে পড়ে গেল ছুটির ঘণ্টা সিনেমার কথা। প্রায় দশ বছর আগে দেখা। ঈদের ছুটি ঘোষণার দিন স্কুলের বাথরুমে সবার অজান্তে তালা বন্ধ হয়ে আটকে পড়ে বারো বছর বয়সী এক ছাত্র। সেই বন্ধ বাথরুমে দীর্ঘ দশদিন অমানবিক কষ্ট সহ্য করার পর নিষ্পাপ শিশুটি ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। তার দশাও কি সেই ছাত্রের মতো হবে?” 

বাসায় এসে লিখতে বসে গেলাম। রাত ন’টা কি দশটার দিকে লেখা শেষ হলো। সম্ভবত সাকুল্যে ৩২ ঘণ্টার মধ্যে গল্পটি রচিত। অর্থাৎ ৩২ ঘণ্টায় একটা কাঠামো দাঁড় করাতে সক্ষম হই। গল্প লেখার সময় আমি প্রথমে কম্পিউটারে লিখি। তারপর প্রিন্ট নিয়ে দুবার, কখনো তিনবারও দেখি। এই গল্পটিও সেভাবেই লেখা। মোট তিনবার সম্পাদনা করি। 

উপন্যাস লেখার সময় আমার মূলভাবনা ঠিক থাকে না। যা লিখব বলে উপন্যাস লেখা শুরু করি, শেষ পর্যন্ত তা আর থাকে না। অন্যদিকে মোড় নেয়। কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে তেমন হয় না। গল্পের পরিসর তো ছোট। তাই লেখা শুরুর আগেই গোটা গল্পটি আমার মাথায় সেট করে নিয়ে তারপর লিখতে বসি। ফলে মূল ভাবনা আর পাল্টায় না। এই গল্পটিরও পাল্টায়নি। 

গল্পটি লেখার পর পড়তে দিই আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার নাজুকে। আমার অধিকাংশ গল্পের প্রথম পাঠক নাজু। প্রতিটি গল্পের সর্বশেষ প্রিন্ট কপিটি আমি পুরনো কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিই। নাজু সেখান থেকে কুড়িয়ে আমাকে জানিয়ে কিংবা না জানিয়ে পড়ে নেয়। এই গল্পটি স্বেচ্ছায় তাকে আমি পড়তে দিই। পড়ে আমাকে বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে এটি তোমার সেরা গল্পগুলোর মধ্যে একটি হবে।’ আমারও তাই মনে হলো। অন্তত এ বছর যে কটি গল্প লিখেছি তার মধ্যেই এটিই সেরা। লেখার পর আমার কাছে মনে হয়েছে আমি যা লিখতে চেয়েছি ঠিক ঠিক তাই লিখে উঠতে সক্ষম হয়েছি। 

গল্প
বগি নম্বর ৮৩০৫ 
স্বকৃত নোমান 


বেঁচে থাকা মানে দুর্ভোগ পোহানো। টিকে থাকা মানে ওই দুর্ভোগের কোনো তাৎপর্য বুঝতে পারা। 

― নিটশে 


ট্রেন এক রহস্যময় বাহন। কত চড়েছে সাজু! তবু এর রহস্যের তল পায় নি। রহস্যময় আসলে ট্রেন নয়। লোহা-লক্করের মধ্যে কী এমন রহস্য? সেই শতাব্দীকাল প্রাচীন ইঞ্জিন কুলোর বলদের মতো বগিগুলোকে টানে, আঠারো শতকের নিগ্রো ক্রীতদাসদের মতো বগির চাকাগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে চলে, চলতে চলতে দেশ-দেশান্তরে ছোটে, এই তো। এর মধ্যে রহস্য কোথায়? রহস্য আসলে মানুষ। ট্রেনে কত কিসিমের মানুষ যে চড়ে! ধনী গরীব ব্যবসায়ী চাকুরে মৌলবি ফেরিওয়ালা কানা খোঁড়া ফকির। বিচিত্র রকমের মানুষ। একটু আগে মুখে সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি আর গায়ে জোব্বাঅলা এক ফকির জানালার পাশে দাঁড়াল। এক টাকা নয়, দুই টাকা নয়, শুরু করল পাঁচ টাকা চেয়ে : দেন বাবা, পাঁচটা টাকা দেন। পাঁচ টাকার অসিলায় কবরে পঞ্চাশ হাজার বছরের আযাব মাফ হবে। জান্নাতে পাবেন পঞ্চাশ হাজার হুর ও গেলমান। দশ টাকা দিলে কবরে এক লক্ষ বছরের আযাব মাফ হবে। জান্নাতে মিলবে এক লক্ষ হুর ও গেলমান। বিশ টাকা দিলে তার ডবল। চল্লিশ টাকা দিলে ডবলের ডবল। 

সাজুর বিরক্তি লাগল। এসব কথা কেতাবের কোথায় লেখা আছে? একেই বলে ধর্মব্যবসা। ধর্মকে পুঁজি করে সুবিধা আদায় তার একেবারেই অপছন্দ। যারা করে, হোক তারা মৌলবি-মাওলানা বা ফকির, তাদেরকে ভণ্ড মনে হয়। ধর্ম তো একটা আধ্যাত্মিক ব্যাপার, এর যাচ্ছেতাই ব্যবহার কেন? তার ভালো লাগে ট্রেনের অন্ধ ভিখেরিদের, যারা দলবেঁধে সুরে সুরে গান গেয়ে ভিক্ষা মাগে : আর আছেননি ডাইনে-বাঁয়ে দিবার মতো ভাই/ আমার আল্লা নবীজির নাম। 

চোখেমুখে বিরক্তি নিয়ে সাজু বলল, মাফ করেন। 

ফকির বলল, আপনি মুসলমান না? 

সাজুর মেজাজটা এবার টং করে উঠল। সে মুসলমান, না হিন্দু, না বৌদ্ধ, না খৃষ্টান, তাতে ফকিরের কী? ফকিরের মতলবটা বুঝতে তার দেরি হলো না। অর্থাৎ তোমাকে এতক্ষণ ধর্মের কথা শোনালাম, তুমি কিনা কোনো গুরুত্বই দিলে না! মেজাজের লাগামটা সে ধরে রাখল। ফকিরের সঙ্গে মেজাজ দেখিয়ে কী লাভ? হাসিমুখে বলল, আমি মানুষ। আপনি? 

বুঝেছি, তুই মুসলমানের পোলা না। তোর ভিক্ষা লাগবে না। 

হাঁটা ধরল ফকির। দীর্ঘ হুইশেল বাজিয়ে ট্রেনও ছেড়ে দিল। সাজুর মেজাজের লাগামটা ফসকে গেল। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, নইলে ফকিরের বেটা ফকিরকে আচ্ছামতো দুটো কথা শুনিয়ে দিত। বেশি বাড়াবাড়ি করলে পাঞ্জাবির কলারটা টেনে দিতেও ছাড়ত না। 

সাজু ফিরছে ফেনী থেকে। মহানগর এক্সপ্রেসে। সঙ্গে স্ত্রী-কন্যা। তাদের সিট পড়েছে ডান দিকে, তার বাঁ দিকে। ফিরছে আসলে সাজেক থেকে। বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে মহানগর প্রভাতীতে ফেনী যায়। রাতটা ছিল শালীর বাসায়। শুক্রবার মহিপাল থেকে প্রথমে খাগড়াছড়ি, তারপর দিঘিনালা। দিঘিনালা থেকে চাঁদের গাড়িতে চড়ে সাজেক। মেঘকাব্য রিসোর্টে ছিল দুই রাত। রোববার রাতে আবার শালীর বাসায়। সোমবার আবার ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা। 

বৃহস্পতিবার দুপুরে ফেনী পৌঁছার পর মেজাজ বিগড়ে দিয়েছিল চোর, আজ ফেনী ছাড়ার সময় বিগড়ে দিল ফকির। বৃহস্পতিবার ট্রেনে খুব ভিড় ছিল। ঈদ গেছে দশ দিন আগে। ভেবেছিল এত ভিড় হবে না, অথচ হলো কিনা অকল্পনীয় ভিড়। নামার সময় প্যান্টের পকেটে ছিল শখের স্যামসং জে সেভেন এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, আর হাতে ছিল ট্রলি ব্যাগ। কোন ফাঁকে মোবাইলটা চুরি হয়ে গেল টের পেল না। পেল নামার পর। ততক্ষণে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। মেজাজ বিগড়ে গেল ভীষণ। বিগড়াবে না? মাত্র ছ মাস আগে ফোনটা কিনেছে। একেবারে নতুন। কোথাও একটা দাগ পর্যন্ত পড়েনি। প্রায় দশ মিনিট পর, প্লাটফরম ছেড়ে যখন রিকশায় উঠল, মনে পড়ে গেল গীতার বাণী : তোমার কী হারিয়েছে যে তুমি কাঁদছ? তুমি কী নিয়ে এসেছিলে যা তুমি হারিয়েছ? সঙ্গে সঙ্গে মেজাজটা হয়ে গেল শীতল। 

শালী বা ভায়রার কাছ থেকে টাকা ধার করে ফেনী শহর থেকে একটা ফোন কিনতে পারত। কেনে নি। কারণ ফোন ছাড়াই ভ্রমণটা শেষ করতে চেয়েছে। ফোন মানেই ডিস্টার্ব। কল আর কল, ফেসবুকে চ্যাট আর চ্যাট। ভাইবার, হোয়াটসআপ তো আছেই। সায়িকার ফোন আছে। শাওমি কোম্পানির দামি এনড্রয়েড। ওটা দিয়ে ছবি তোলার কাজ সেরেছে। ফোন ছাড়া গত কদিন ভালোই ছিল। 

ফকিরের কথায় মেজাজ এতটাই বিগড়ে গেল যে, ভায়রা বা শালার নম্বরে ফোন করার ইচ্ছে হলো। ওই ফকিরের বেটাকে ধরে আচ্ছামতো তারা ঝেড়ে দিক। শালা ভণ্ড কোথাকার! সঙ্গে ফোন থাকলে ঠিকই ফোন দিত। সায়িকার ফোন থেকে দিতে পারে। দিল না। মনকে প্রবোদ দিল, যাক, আদনা ফকিরের ওপর রাগ করে লাভ কী? 

ট্রেন চলছে। ভিড় বেশি নেই আজ। কেউ দাঁড়িয়ে নেই। গোটা বগির দু-একটা সিট ফাঁকাও থাকতে পারে। পনের মিনিটে পৌঁছে গেল গুণবতী স্টেশন। এই স্টেশনে থামার কথা নয়, অথচ থামল। হয়ত লাইন ক্লিয়ার পায় নি। খানিক পর চট্টগ্রামগামী একটা ট্রেন ক্রস করল। আবার চলতে শুরু করল। সাজুর চোখ স্থির হলো বগির শেষমাথায় দরজার উপর, যেখানটায় লেখা ৮৩০৫। যতবারই সে ট্রেনে চড়েছে ততবারই খেয়াল করছে, সব বগির ওই জায়গাটায় একটা নম্বর লেখা থাকে। ওটা কি বগি নম্বর? তার টিকেটে তো লেখা : কোচ নং-গ। তাহলে ওটা কিসের নম্বর? হয়ত স্থায়ী কোচ নম্বর। পৃথিবীতে কত কিছু যে অজানা! জানার আসলে শেষ নেই। জ্ঞান এক মহাসমুদ্র, যার কোনো কিনারা নেই। মোবাইল থাকলে গুগলে সার্চ দিয়ে জেনে নিত। 

ট্রেন কুমিল্লা স্টেশনে পৌঁছল সোয়া পাঁচটায়। ফেনী থেকে পাক্কা সোয়া তিন ঘণ্টা লাগিয়ে দিল। বিস্তর যাত্রী উঠল। দু-একজন বসতে পারলেও বাকিরা দাঁড়িয়ে। আখাউড়া থেকে উঠল দ্বিগুণ। মানুষের পিঠে মানুষ। তিলঠাঁই নেই। সাজুর বিরক্তি লাগে। ট্রেনে আজকাল এত ভিড় হয়! ছ মাস আগে সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে চট্টগ্রাম গিয়েছিল। তখন এত ভিড় দেখে নি। অবশ্য তখন গিয়েছিল এসি কেবিনে। এসি কেবিনে তো নয়ই, এসি বগিতেও অতিরিক্ত কোনো যাত্রী ওঠে না। উঠলেও পুলিশ অন্য বগিতে চালান করে দেয়। সেদিন হয়ত অন্য বগিগুলোতে ভিড় ছিল। তার চোখে পড়েনি। তার ভুলে হয়েছে নন এসি শোভন চেয়ারের টিকেট কেটে। উচিত ছিল কেবিন নেওয়া। টাকা একটু বেশি হলেও নিরুপদ্রব ভ্রমণ। নেয় নি সায়িকার কারণে। কেবিন ভালো লাগে না তার। বাদামঅলা, ঝালমুড়িআলা, শশাঅলা, আমড়াঅলা ওঠে না। ট্রেন ভ্রমণ মানেই এটা-সেটা খাওয়া। না খেলে ভ্রমণ কিসের? তাই তার শোভন চেয়ার পছন্দ। 

সাজুর সিগারেটের তেষ্টা পেয়েছে খুব। তেষ্টা মেটানোর জন্য দরজার সামনে বা বাথরুমে যেতে হবে। যে ভিড়, যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সর্বশেষ ট্রেন কুমিল্লা স্টেশনে ঢোকার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে টেনেছিল একটা। পেশাবের বেগও পেয়েছে খুব। ঝিম মেরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। ভিড় ঠেলে বাথরুমে যাওয়া-আসার চেয়ে ঝিম মেরে বসে থাকাটা কম কষ্টের। 

নরসিংদী স্টেশনে কিছু যাত্রী নামলেও উঠল তার দ্বিগুণ। সাজু জানত এমনটাই ঘটবে। নরসিংদীর মানুষ বাসে কম চড়ে। ঢাকা যাতায়াতে ট্রেনেই তাদের সুবিধা। বিমান বন্দর স্টেশন না পৌঁছা পর্যন্ত এই ভিড় আর কমবে না। ভিড়ের কারণে সায়িকা ও মিশুকে দেখা যাচ্ছে না। কুমিল্লা স্টেশনের পর তাদের আর দেখতে পায় নি। ভাগ্যিস ট্রেন কুমিল্লা স্টেশনে ঢোকার আগে মেয়েটা বাথরুম সেরে এসেছে। নইলে কী বিপত্তিতে যে পড়তে হতো! 

ট্রেন বিমানবন্দর স্টেশনে থামল রাত প্রায় পৌনে ন’টায়। ফাঁকা হয়ে গেল পুরো বগি। খালি হয়ে গেল অনেক সিট। সায়িকা ও মিশুর সঙ্গে কথা বলে বাথরুমে গেল সাজু। পেশাব করে বেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দিল। মাথার ভেতরে ঝিঁঝিঁ করতে লাগল। দীর্ঘক্ষণ পর সিগারেট খেলে মাথায় এমনই করে। 

সিগারেটটা শেষ করে সিটে ফিরে এল। তেজগাঁও স্টেশন পৌঁছতে আর কতক্ষণ লাগবে? সায়িকা জানতে চাইল। বড়জোর পনের মিনিট, বলল সাজু। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সায়িকা। মিশুও। সাজুর পেটটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। আবার বাথরুমে যেতে হবে। চেষ্টা করল ঠেকিয়ে রাখার। কিন্তু পেটের ভেতর যে আন্দোলন, তাতে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে বলে মনে হলো না। তাদের বাসা মোহাম্মদপুরে। নামতে হবে তেজগাঁও স্টেশনে। সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে বাসায় পৌঁছতে আরো অন্তত এক ঘণ্টা। জ্যামে পড়লে তো কথা নেই, দেড় ঘণ্টাও লেগে যেতে পারে। তারচেয়ে বরং ট্রেনেই কাজটা সেরে ফেলা ভালো। 

সায়িকা ও মিশু তখনো বাইরে তাকিয়ে। সাজু উঠল। সে যখন বাথরুমে ঢুকে দরজার লোহার পাতটা ঘুরিয়ে লকটা লাগিয়ে দিল, পেছনের বগি থেকে এক বুড়ো দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বাথরুমটা বগির ডান পাশের দরজা-লাগোয়া। একটা বিড়ি ধরাল বুড়ো। বাথরুমের দরজার বাইরে আরেকটা লক। ভেতরে কেউ আছে কিনা সেকথা না ভেবেই লকের লোহার পাতটা ঘুরিয়ে খাঁজে ঢুকিয়ে দিল বুড়ো। তারপর দরজায় হেলান দিয়ে আয়েশে বিড়ি টানতে লাগল। দু-মিনিটের মধ্যে ঝটফট বিড়িটা শেষ করে গলার কফ-থুতু ফেলে নিজের বগিতে ফিরে গেল। 

ট্রেন তেজগাঁও স্টেশনের কাছাকাছি। বাঁ-দিকে তাকিয়ে স্বামীকে দেখতে পেল না সায়িকা। ভাবল, দরজায় বুঝি সিগারেট খেতে গেছে। সে অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক মিনিট পর তেজগাঁও স্টেশনে ঢুকল ট্রেন। অস্থির হয়ে উঠল সায়িকা। কোথায় গেল সাজু! বগির এ-মাথা ও-মাথায় চক্কর দিল একবার। কোনো সিটে নেই। দুই মাথার চার দরজায় খুঁজল। তাও নেই। কোথায় গেল তবে? পরিচিত কারো দেখা পেয়ে কি অন্য বগিতে গেল? গেলেও এতক্ষণে তো ফিরে আসার কথা। পেছনের বগিতে গিয়ে খুঁজে দেখার কথা ভাবল। কিন্তু ট্রেন ততক্ষণে প্লাটফর্মে থেমে গেছে। কী করে সে? কেঁদে ফেলল বেচারি। মিশু বলল, আম্মু, চলো আমরা নেমে পড়ি। আব্বুর কাছে তো মোবাইল নেই। যেখানেই থাকুক, আব্বু নিশ্চয়ই নেমে পড়বে। আমাদেরকে খুঁজে না পেলে অন্য কারো নম্বর থেকে নিশ্চয়ই তোমার নম্বরে ফোন দেবে। 

ব্যাগ আর মেয়েকে নিয়ে নেমে পড়ল সায়িকা। প্লাটফর্মে তেমন লোকজন নেই। ট্রেন থেকে যারা নেমেছে তারা গন্তব্যে ছুটছে। আছে কয়েকটা কুকুর, কয়েকজন ভবঘুরে আর একজন টিকেট চেকার। এক হাতে মেয়েকে এবং অন্য হাতে ব্যাগটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল সায়িকা। ডানে-বাঁয়ে তাকাতে লাগল। সাজু নিশ্চয়ই নামবে। নেমেই তাদেরকে খুঁজবে। আসুক, আচ্ছামতো একটা বকা না দিয়ে ছাড়বে না। এটা কোন ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা? 

কিন্তু না, সাজু এল না। দীর্ঘ হুইশেল বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। আবারও কেঁদে ফেলল সায়িকা। মিশুও কাঁদতে শুরু করল। ভ্যানেটিব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে হাতে নিল সায়িকা। নিশ্চয়ই সাজু ফোন দেবে। প্রায় পাঁচ মিনিট কেটে গেল, অথচ কোনো ফোন এল না। সায়িকার মাথায় নানা দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। কী হলো সাজুর? সে কি সিগারেট খেতে দরজায় গিয়েছিল? খাওয়ার সময় ট্রেন থেকে পড়ে গেল না তো? কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দিল না তো? নাকি ট্রেনে সিগারেট খাওয়ার অপরাধে পুলিশ গ্রেপ্তার করল? না না, তা হবে কেন? দরজায়, বাথরুমে কত যাত্রীই তো সিগারেট খায়। নাকি কেউ অপহরণ করল? ইদানীং তো অপহরণের ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিনা ওয়ারেন্টে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে, ডিবি পরিচয়ে সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। নাকি কোনো ছিনতাইকারীর কবলে পড়ল? 

কী করে সায়িকা? প্লাটফর্মে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। ঢাকা শহরের প্লাটফর্ম মানে চোর-বাটপার আর ছিনতাইকারীদের আখড়া। এখন নেই, আসতে কতক্ষণ? অগত্যা ট্রলিব্যাগটা টানতে টানতে সে বেরিয়ে গেল। বাইরের রাস্তায় দাঁড়াল। মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল। রাত সোয়া নয়টা। ট্রেন থেকে নেমেছে আধা ঘণ্টা হয়ে গেছে। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবে? মিশু বলল, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে মা? দাঁড়িয়ে থেকে তো লাভ নেই। আমাদেরকে খুঁজে না পেয়ে আব্বু নিশ্চয়ই বাসায় চলে যাবে। 

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সায়িকা। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর একটা সিএনজি অটোরিকশা ঠিক করে বাসার উদ্দেশে রওনা হলো। 

সায়িকা চলে যাক। মিশুও যাক। কারণ তারা এই গল্পের চরিত্র নয়। গল্পের চরিত্র সাজিদ হোসেন সাজু, যে এখন কমলাপুর স্টেশনে থেমে থাকা ৮৩০৫ নম্বর বগির বাথরুমে বন্দি। বের হওয়ার জন্য সারাটা পথ সে বাথরুমের দরজা টানাটানি করেছে, দুহাতে ধাক্কা দিয়েছে, জোরে জোরে শব্দ করেছে, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছে, অথচ কেউ শুনতে পায় নি। ট্রেন তেজগাঁও স্টেশনে থামার পর সে ভেবেছিল কেউ না কেউ তার ডাক শুনতে পাবে, অথচ কেউ শুনতে পায় নি। কী করে পাবে? যাত্রীদের কেউ তো ডানের দরজা দিয়ে নামে নি। প্লাটফর্ম বাঁয়ের দরজায়, ডানের দরজা দিয়ে নামবে কেন? তবু সে আশায় থেকেছে। নিশ্চয়ই কেউ না কেউ প্রাকৃতিক ডাকে বাথরুমে আসবে। কমলাপুর পৌঁছে গেল ট্রেন, অথচ কেউ গেল না। 

কমলাপুর স্টেশনে ট্রেন থামার পর সে আবার চিৎকার শুরু করল, আবার দরজা ধাক্কাতে লাগল, অথচ কেউ শুনতে পেল না। অবশ্য শুনতে পাওয়ার কথাও নয়। বাথরুমটা যেন আস্ত একটা কবর। গোটা বাথরুমে মোটে দুটি ফুটো। একটা উপরে ছোট্ট ভ্যান্টিলেটরের, দ্বিতীয়টা নিচে কমোডের। ভ্যান্টিলেটরের উপর এক টুকরো কাচ। সাধারণত খোলা থাকে, অথচ এখন বন্ধ। বিপদ এলে এভাবেই বুঝি চারদিক থেকে আসে। কাচটা সরিয়ে মাথাটা গলিয়ে চিৎকার করলে কেউ না কেউ শুনতে পেত। কিন্তু কোথাও দাঁড়িয়ে বা কিছু একটা ধরে মাথাটা যে ওই পর্যন্ত নেবে, তার কোনো উপায় নেই। বাথরুমে বেসিনও নেই। থাকলে বেসিনে ভর দিয়ে ওঠা যেত। 

প্রায় আধা ঘণ্টা পর খটখট আওয়াজ শুনতে পেল সাজু। কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে লোহা পেটাচ্ছে। বগি থেকে বগি আলাদা করার সময় যেরকম শব্দ হয় ঠিক সেরকম। সাজু চিৎকার করল, আবার দরজা ধাক্কাধাক্কি করল। দরজাটা এমনই শক্ত, ধাক্কালেও সহজে শব্দ হয় না। জোরসে লাথি মারতে লাগল। না, বাইরে কারো কোনো সাড়াশব্দ পেল না। সে লাথি মারতে থাকে। মারতে মারতে পায়ে ব্যথা ধরে যায়, চিৎকার করতে করতে গলাটা শুকিয়ে যায়। চিৎকার করার মতো, লাথি মারার মতো আর শক্তি পায় না। তখন সে কমোডের পাশে অপরিসর জায়গাটুকুতে বসে পড়ল। মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে লাগল। মনে পড়ে গেল ছুটির ঘণ্টা সিনেমার কথা। প্রায় দশ বছর আগে দেখা। ঈদের ছুটি ঘোষণার দিন স্কুলের বাথরুমে সবার অজান্তে তালা বন্ধ হয়ে আটকে পড়ে বারো বছর বয়সী এক ছাত্র। সেই বন্ধ বাথরুমে দীর্ঘ দশদিন অমানবিক কষ্ট সহ্য করার পর নিষ্পাপ শিশুটি ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। তার দশাও কি সেই ছাত্রের মতো হবে? সাজুর হৃদকম্প দ্বিগুণ বেড়ে গেল। পাল্লা দিয়ে ঝরতে লাগল ঘাম। 

হঠাৎ বগিটা নড়ে উঠল। পেছনের দিকে চলল খানিক। তারপর আবার থামল। সাজু ভাবল, ট্রেন নিশ্চয়ই আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করবে, তাই ইঞ্জিন ঘুরিয়ে বগির সামনে লাগানো হয়েছে। সে স্বস্তি পেল। খানিক পরেই যাত্রীরা উঠতে শুরু করবে। নিশ্চয়ই কেউ না কেউ বাথরুমে আসবে। না এলেও বাথরুমের সামনে তো অন্তত দাঁড়াবে। তখন নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তার ডাক শুনতে পাবে। 

বগিটা এবার সামনের দিকে চলতে শুরু করল। সাজু ভাবল, ট্রেন কি চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে দিল? কিন্তু কই, বাইরে তো যাত্রীদের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না! বগিতে নিশ্চয়ই যাত্রীরা আছে। বাথরুমের দরজার কোথাও কোনো ফাঁক নেই বলে তাদের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না। 

কয়েক মিনিট চলার পর বগিটা আবার থামল। এবার চলতে শুরু করল পেছনের দিকে। এবার ভীত হয়ে পড়ল সাজু। তবে কি ট্রেন চট্টগ্রাম যাচ্ছে না! শরীরে তার কাঁপুনি ধরে গেল। পরক্ষণে মনে হলো, ট্রেন হয়ত প্লাটফর্ম পরিবর্তন করছে। তিন নম্বর থেকে চার নম্বরে যাচ্ছে, কিংবা চার নম্বর থেকে পাঁচ নম্বরে। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয়। ট্রেন তো যে প্লাটফর্মে থামে সেই প্লাটফর্ম থেকেই ছাড়ে। কে জানে, হয়ত কোনো সমস্যা হয়েছে, তাই প্লাটফর্ম পরিবর্তন করতে হচ্ছে। সাজু অপেক্ষা করতে লাগল। তার ভাবনাতেও এল না ৮৩০৫ নম্বর বগিসহ আরো দুটি বগিকে যে প্লাটফর্মের পূর্ব দিকের অব্যবহৃত লাইনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কারণ অতিব্যবহারে বগিগুলো জীর্ণ। মেরামত করাতে হবে। 

ধীরে ধীরে চলতে চলতে বগিটা থামল। অপেক্ষা করতে লাগল সাজু। খানিক পর নিশ্চয়ই যাত্রীরা উঠতে শুরু করবে। বড়জোর এক ঘণ্টার মধ্যে ট্রেন চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করবে। মুক্তির আর বেশি দেরি নেই। সে ঘড়ি দেখল। গাঢ় অন্ধকারে ঘড়ির কাঁটাগুলো জ্বলজ্বল করছে। বড় শখের ঘড়ি। টাইটান কোম্পানির। পাঁচ হাজার টাকায় কিনেছিল দেড় বছর আগে। সময় এখন দশটা বেজে তেত্রিশ মিনিট। 

সাজু অপেক্ষা করতে থাকে। এক ঘণ্টা কেটে গেল, কারো সাড়াশব্দ পেল না। দুই ঘণ্টা কেটে গেল, ট্রেন ছাড়ল না। তিন ঘণ্টা কেটে গেল, তবু ছাড়ল না। সাজু ভাবল, তবে কি এই ট্রেন ভোরে ছাড়বে? ঘড়িতে তখন রাত একটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। ঢাকা থেকে তূর্ণা একপ্রেস তো রাত সাড়ে এগারটায় ছাড়ে। তারপর তার জানামতে রাতে আর চট্টগ্রামগামী কোনো ট্রেন নেই। সকাল পৌনে আটটায় ছাড়ে মহানগর প্রভাতী। সে ভাবল, নিশ্চয়ই এ ট্রেনটাই মহানগর প্রভাতী হয়ে চট্টগ্রাম যাবে। তবে কি ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? চিৎকার করতে করতে, দরজায় ধাক্কা ও লাথি মারতে মারতে এবং খিদায় সে নিদারুণ ক্লান্ত। প্যাকেটে আছে বারোটি সিগারেট। একটা ধরাল। সকালের আগে মুক্তির কোনো আশা নেই। আশায় থেকে জেগে থাকার কোনো মানে নেই। ঘুমিয়ে নেওয়াটাই উত্তম। কমোডের পাশে ছোট্ট জায়গাটা ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে। সেখানে বসে পড়ল সে। হেলান দিল। সিগারেটটা শেষ করে কমোডের ফুটোয় গোড়ালিটা ফেলে দিল। তারপর চোখ বুঝল। 

কিন্তু বাথরুমে কি কেউ ঘুমাতে পারে? তাও ট্রেনের বাথরুমে? ঘুম কি সহজে আসে? না, ঘুম আসে না কিছুতেই। একবার চোখ বন্ধ করে তো আবার খোলে। গভীর অন্ধকারে সে নিজেকেও ঠাওর করতে পারে না। যেন সে একটা কবরে শুয়ে। কবরে কোনো ফুটো থাকে না, এখানে আছে, কবরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না, এখানে নেওয়া যাচ্ছে―পার্থক্য শুধু এটুকু। নানা দুশ্চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। মনের আয়নায় সায়িকার মুখটা ভেসে ওঠে। সায়িকা নিশ্চয়ই কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। এই শহরে তার কোনো নিকটাত্মীয় নেই। সাজুরও নেই। দূরাত্মীয় যারা আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। এই বিপদে সায়িকা কার সাহায্য চাইবে? চাইতে পারে সাজুর বন্ধু-বান্ধবদের, কিংবা অফিসের কলিগদের। যাদের নম্বর সায়িকার মোবাইল সেটে সেভ করা আছে, এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার কোনো বন্ধু হয়ত সায়িকাকে নিয়ে থানায় গিয়ে পুলিশে খবর দিয়েছে। পুলিশ এতক্ষণে হয়ত সাজুকে খুঁজতে শুরু করেছে। কিন্তু মনে হয় না ঘটনাটা পুলিশ আমলে নিয়েছে। পুলিশ কি টাকা ছাড়া নড়ে? নড়ত, সাজু যদি বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি হতো। সে সাধারণ এক ব্যাংক কর্মকর্তা, তার জন্য কি পুলিশ এত রাতে এতটা তৎপর হবে? 

মিশুর কথা মনে করে সাজুর কান্না পেল। মেয়েটাকে সে বড্ড ভালোবাসে। পড়ালেখার জন্য সায়িকা কত বকাবকি করে, কত মারধর করে, সাজু কিচ্ছুটি বলে না। মেয়েকে কখনো রাগ দেখাতে পারে না। কখনো দেখালে মন খারাপ করে যখন কাঁদে, মুখের দিকে তাকিয়ে তখন তার মৃত বাবার কথা মনে পড়ে যায়। কান্নারত মেয়ের মুখে ভেসে ওঠে মৃত বাবার মুখ। বাবার জন্য সাজুর বুকটা তখন হুহু করে ওঠে। তখন তারও কান্না পায়। সাজু ভাবে, এই যে মানবহৃদয়ের গোপন গভীর অনুভূতি, এই অনুভূতির কথা কাউকে বলা যায় না, কাউকে বোঝানো যায় না। 

নানা চিন্তা ও দুশ্চিন্তার স্রোতে ঘুরপাক খেতে খেতে সাজুর চোখে ঘুম নামল। রাত সাড়ে তিনটার দিকে কিসের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। সে চিৎকার করল, বাইরে কেউ আছেন? কারো সাড়া পেল না। সে আবার চোখ বুজল। আবার ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে দেখা দিল মিশু। দেখতে রকেটের মতো একটা বাহনে চড়ে বসেছে মিশু। সঙ্গে সাজুও। একটা টাওয়ার বেয়ে রকেটটা উপরের দিকে উঠতে থাকে। সর্বোচ্চ গতিতে। উঠতে উঠতে দূর আকাশে বিশাল একটা প্লাটফর্মে পৌঁছে। মিশু রকেটটা থামাতে চায়। পারে না। ব্রেক ফেইল করেছে। রকেটটা বিশাল একটা টাওয়ারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে টাওয়ারটা ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে হাওয়ায় মিশে যায়। সাজু দাঁড়িয়ে থাকে প্লাটফর্মে। মিশুর রক্ত-মাংস-অস্থি গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে হাওয়ায় মিশে গেছে। মেয়ের শোকে সে কাঁদতে শুরু করে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। পেছনে দেখতে পায় সায়িকাকে। সায়িকা নির্বাক। শোকে পাথর হয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে সাজুর ঘুম ভেঙে গেল। টের পেল, চোখের জলে ভিজে গেছে তার গাল, গলা আর বুক। সে উঠে দাঁড়াল। ভ্যান্টিলেটরের কাচ ভেদ করে খানিকটা আলো ভেতরে ঢুকেছে। তার মানে ভোর হয়েছে। কান্না থামাতে পারে না সাজু। মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছে করে খুব। কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। জোর করে সাজু কান্না থামাল। চোখ মুছে চিৎকার করল, বাইরে কেউ আছেন? কেউ শুনতে পাচ্ছেন? কেউ কি আছেন? আমি বাথরুমে আটকা পড়েছি। আমাকে উদ্ধার করুন প্লিজ। কেউ আছেন? কেউ কি শুনতে পাচ্ছেন? ও ভাই...! 

না, কারো সাড়াশব্দ পেল না। খিদার জ্বালাটা উসকে উঠল। কলটা ছেড়ে দিয়ে পেট ভরে পানি খেল, চোখেমুখে পানি দিল। জুতো জোড়া খুলে এক পাশে সরিয়ে রাখল। ঘড়ি দেখল। সাতটা বাজে। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিল, আর মাত্র বড়জোর আধা ঘণ্টা। তারপর যাত্রীরা উঠতে শুরু করবে। মুক্তির আর দেরি নেই। 

আটটা বেজে যায়, যাত্রীরা ওঠে না। দশটা বেজে যায়, ট্রেন ছাড়ে না। দুপুর বারোটা বেজে যায়, বগিটা একটুও নড়ে না। তবে কি ট্রেনটা মহানগর গোধূলী হয়ে চট্টগ্রাম যাবে? হতে পারে। পৌনে তিনটায় ঢাকা থেকে যাত্রা করে মহানগর গোধূলী। সাজু অপেক্ষা করতে থাকে। 

আড়াইটা বেজে যায়, কোনো যাত্রী ওঠে না। তিনটা বেজে যায়, ট্রেনটা ছাড়ে না। তবে কি রাত এগারটায় তূর্ণা হয়ে যাবে ট্রেনটা? হতে পারে। সাজু অপেক্ষা করতে থাকে। খিদার কথা ভুলে যায়। এখন আর খিদা নেই। একটা নির্দিষ্ট সময়ে শরীর খাবার চায়। খাবার না পেলে সে বিদ্রোহ করে। ক্লান্ত হয়। তবু খাবার না পেলে সে নিজের শক্তির উপর নির্ভর করে। টিকে থাকে দুদিন, তিন দিন, পাঁচ দিন, এমনকি এক সপ্তাহ। তারপরও খাবার না পেলে সে আত্মা থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে নেয়। 

সাজু ঘড়ি দেখল। রাত আটটা বেজে তেত্রিশ মিনিট। বাইরে কারো গলার আওয়াজ শুনতে পেল। হাঁক দিল, বাইরে কেউ আছেন? হ্যালো ভাই, শুনতে পাচ্ছেন? আমি আটকা পড়েছি। 

না, কারো সাড়া নেই। 

প্রায় দশ মিনিট পর, পনের মিনিটও হতে পারে, স্টেশনের জনৈক যুবতী বেশ্যা, ভদ্রজনেরা যাকে বলে যৌনকর্মী, ডানের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। পেছনে যুবক খদ্দের। যুবতীর নাম হতে পারে জুলেখা, চামেলি, বিথি, নার্গিস, ফুলি, চম্পা, জবা। বেশ্যাদের নাম এমনই হয়ে থাকে। প্রকৃত নাম গোপন করে তারা একটা ছদ্মনাম নেয়। ধরা যাক যুবতীর নাম জবা। আর যুবক খদ্দেরের নাম হতে পারে খায়ের, জাকের, মালেক, দুলাল, ছলিম, কলিম, কামাল, জামাল। ঢাকা শহরে শ্রমজীবীদের নাম এমনই হয়ে থাকে। যুবক নিশ্চয়ই শ্রমজীবী। নইলে লুঙ্গি পরে রাতের বেলায় জবার সঙ্গী হতো না। ধরা যাক যুবকের নাম জামাল। 

দরজার পাশে ছোট্ট জায়গাটুকুতে শুয়ে পড়ল জবা। তার সালোয়ারের ফিতেটি ত্রস্ত হাতে খুলতে শুরু করল জামাল। এক টানে সালোয়ারটা খুলে এক পাশে সরিয়ে রাখল। টেলকম পাউডারের গন্ধ ঝাপটা দিল তার নাকে। জামালের হাত দুটো চলে গেল জবার নরম বুকে। দুহাতে ব্লাউজের হুকগুলো খুলতে শুরু করল। খুলে দুই মাংসপিণ্ডের ফাঁকে মুখটা ডুবিয়ে দিল। 

হঠাৎ কান খাড়া করল জবা। যেন দূরাগত কোনো শব্দ ভেসে আসছে তার কানে। সেদিকে খেয়াল নেই জামালের। তার সর্বাঙ্গে আদিম উল্লাস। জবা বলল, এই ব্যাডা, কিছু শুনতে পাচ্ছিস? জামাল উত্তর দেয় না। জবা আবার বলল, একটু দাঁড়া, আমারে একটু উঠবার দে। জামাল তার কথার পাত্তা দিল না। তার নাঙলটি জবার সুড়ঙ্গে প্রবিষ্ট করার জন্য সে তাড়াহুড়ো করতে থাকে। জবা বাধা দিল, আরে দাঁড়া না ব্যাডা! তার হাত দুটো দুহাতে ঠেঁসে ধরল জামাল। জবা বলল, শুনতে পাচ্ছিস না কিছু? বাথরুমের ভিতরে কে যেন কাঁনতে আছে। শুনতে পাচ্ছিস? জামাল তবু পাত্তা দিল না। কারণ বেশ্যাদের ছলনা তার জানা। নানা অছিলায় ফসকে যেতে চায়। ফিসফিস করে বলল, তোর চাতুরিতে কাজ হইবে না মাগী। চুপ কইরা হুইয়া থাক। জবা চুপ করে থাকে। দুই কান খাড়া করে রাখে। 

জামাল যখন তার নাঙলটি জবার সুড়ঙ্গে প্রবিষ্ট করল, জবা হঠাৎ ‘খাড়াইতে কইছি না খানিকর বেটা’ বলে দুহাতে জোরসে তাকে ধাক্কা মারল। জামাল ছিটকে পড়ল বগির নিচে, শক্ত পাথরের উপর, অথবা ইস্পাতের লাইনের উপর। সে আর্তনাদ করে উঠল। আদিম মানবের মতো উলঙ্গ জবা ত্রস্ত হাতে বাথরুমের দরজার লকটা ঘুরিয়ে দরজায় ঠেলা মারল। দরজাটা খুলে গেল। নরম কিছু একটার সঙ্গে যেন ধাক্কা খেল। ভেতরে কেঁদে উঠল সাজু। বসা থেকে সে দাঁড়াল। তারপর বেরিয়ে এল। ল্যামপোস্টের আলো যুবতীর মুখের উপর। সালোয়ারটা পড়ে আছে একপাশে। দুহাত জোড় করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সাজু। তারপর লুটিয়ে পড়ল জবার পায়ে। কৃতজ্ঞতার দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল পায়ের মেহেদি রাঙানো পাতায়। হা মুখে খোলা বাথরুমটার দিকে তাকিয়ে রইল জবা। আর বাইরে দরজার ডান্ডা ধরে লুটিয়ে পড়া সাজুর দিকে তাকিয়ে রইল জামাল। 


লেখক পরিচিতি
স্বকৃত নোমান
জন্ম : ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর, ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায়। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস। প্রকাশিত উপন্যাস : রাজনটী (ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা), বেগানা (বিদ্যাপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা), হীরকডানা (বিদ্যাপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা), কালকেউটের সুখ (জাগৃতি প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা এবং অভিযান পাবলিশার্স, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা), শেষ জাহাজের আদমেরা (অনিন্দ্য প্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা)। গল্পগ্রন্থ : নিশিরঙ্গিনী (জাগৃতি প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা), বালিহাঁসের ডাক (অনিন্দ্য প্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা), ইবিকাসের বংশধর (পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, ঢাকা)। শিশুতোষ : ছোটদের পূর্ববঙ্গ গীতিকার গল্প (রোদেলা প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা), বাঙালি মনীষীদের ছেলেবেলা (অনিন্দ্য প্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা)। গদ্য : উপন্যাসের পথে (আলোঘর প্রকাশনী, ঢাকা)। 

৪টি মন্তব্য:

  1. অনেকদিন পর একটানা একটা গল্প পড়লাম। বিরতি দিতে পারিনি। এক কথায় অসাধারণ। আপনার আরও লেখা পড়তে চাই।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো লাগলো। ভালো গল্পো। যদিও গল্পের বর্ননায় গল্পকারই সঠিক, তবুও , পাঠক হিসেবে, আমি গল্পের মাঝখানে এসে,কিছু বাক্য ও বর্ননায় 'পরিধি বাড়ানোর' প্রয়াস অনুভব করেছি। মেদযুক্ত লেগেছে।মেদহীন গল্প আমার বেশি ভাল লাগে। শেষটা অসাধারণ হয়েছে। ক্লাইমেক্সে পৌছাতে পেড়েছি। ক্লাইমেক্স জটিলতার অসাধারণ ফিনিশিং পাঠক হিসেবে ভাল করে উপভোগ করেছি।

    উত্তরমুছুন
  3. তারপর কী ঘটল জানতে মন চায়। ফিনিশিংটা আরো একটু হলে ভালো হতো। পাঠকমন আত্মতৃপ্ত হতো। এছাড়া ছোটগল্পই রয়ে গেল—শেষ হয়েও হইল না শেষ।

    উত্তরমুছুন