মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

বই পড়া : সেলিম জাহানের ব্যক্তিগত জার্নাল--বেলা-অবেলার কথা

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম 

উপেক্ষিত মানুষও কখনো কখনো নিজের সময়কালের প্রতীক। ভুলে যাওয়া মানুষের সাথে যোগাযোগহীন হয়েও একটি খবরে বিশেষ আপন হয়ে যায় সে। ততোদিনে হয়ত চারটি দশক ফুরিয়ে গিয়েছে জীবনের। হয়ত মানুষটির মৃত্যুর খবরই সরিয়ে দেয় আপন হবার সকল সীমাবদ্ধতা।
লেখকের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সতীর্থ ছিলেন পারুল। মফঃস্বল থেকে আসা এই সহপাঠীর দিকে বিশেষ মনযোগ দেবার মতো কিছু ছিল না লেখকের ছাত্রাবস্থায়। কিন্তু চার দশক পর দূরালাপনীতে আরেক বন্ধুর কাছে সাদাসিধে এক সহাপাঠীর মৃত্যুর খবর শুনেই হঠাৎ করে পারুল নামটা মনে হয়েছিল। নিজের উপেক্ষার স্পষ্টতার দায় অবচেতনে চেপে থাকার অনুভবই কাজ করে থাকবে। সেই পারুল বৈবাহিকসূত্রে আত্মীয়া হলেও আলাপ হয়নি কখনো। মৃত্যুর খবরে যে সে ভীষণ আপন হয়ে উঠলো আর সাদামাটা জীবনেও যে পারুল আসলে বড় যোদ্ধা ছিলেন তা অকপটে স্বীকার করলেন বইয়ের শ্রদ্ধা-তর্পণ অংশের ‘আমার সতীর্থ পারুল’ গল্পে।

মুক্ত গদ্যগুলো ছোট গল্পের মতো, প্রতিটি লেখাতেই আছে একটা মুহূর্তের ঘটনা, সেই সময়ের অভিজ্ঞতাই তিনি গল্প করেছেন পাঠকের সাথে, নিজের সঙ্গেও। বনফুলের গল্পের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ লেখাগুলোতে উঠে এসেছে অকরুণ করুণার অনুভব। এমন একটা গল্প ‘কনে দেখা আলো’। পিতামহীর কাছ থেকে কনে দেখা আলোর যে গল্প লেখক শুনেছিলেন সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে লতুদিকে উপস্থিত করা হয়েছিল পাত্রপক্ষের সামনে। এই লতুদিকে দিয়েই ছোট্ট গল্পটা শেষ। পাগলা গারদে নিয়ে যাওয়া হবে বলে তাকে যেদিন ধরে ধরে ট্যাক্সিতে তোলা হলো, সেদিন ভোরের মোলায়েম আলো এসে পড়েছিল তাঁর মুখে। এক কিশোর সেদিন থেকে ভুলে গেলো পূর্বী নদীর ঢেউয়ে ছড়িয়ে যাওয়া কনে দেখা আলোর সৌন্দর্য আহরণ করতে। এই গদ্যটি পাঠের পর অপরিচিত লতু দি বা নাজমা আপা আমাদের পরিচিত কেউ হয়ে উঠেন।

দীর্ঘদিনের পরিচিত শহর পেছনে ফেলে এলে যে মায়ার জন্ম হয় সেখানে প্রথমেই স্থান পায় তাঁর অবয়ব। প্রিয় পথের ছায়া, মেঘ শিরীষ গাছ, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। অবকাঠামোর সেই স্মৃতি চিহ্নের সাথে থাকে কিছু মানুষের গল্প। আসলে অবকাঠামো, স্থাপনা যাই হোক সেই চেনা মানুষ- অপরিচিত জন, শিক্ষক-সতীর্থরাই শহরটাকে মায়াময় করে রাখে। ‘খুলে যাওয়া ঢাকা’য় সেই অনুভবই আবিষ্কার করেছেন সেলিম জাহান। যে ঢাকায় একদিন তাকে, কবি আবুল হাসানের সামনে বসে ‘ছলিম’ নাম নিয়ে বিরিয়ানি খেতে হয়েছিল। সেই শহরে শরীফ নামে এক ক্যান্টিনের মালিক বিতর্ককে বলতেন 'বিরতক্ক'। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ক্যান্টিনের এই গল্প আমাদের সময় এসে খানিকটা বদলে গিয়েছে। আমরা হয়ত ওই মামা, বা দাদু বলে ডেকেই আনন্দ পেতাম। প্রজন্মের পরিবর্তন ধরা পড়ল নিজের কাছে।

শহীদ মুনীর চৌধুরীর সাথে আমাদের প্রজন্মের সশরীরে দেখা হয়নি। আমরা পেয়েছি কবর, রক্তাক্ত প্রান্তরের মতো তাঁর সৃষ্টিকর্ম আর দেশের জন্য আত্মোত্যাগের স্মৃতি। ১৯৫৯ সালে বরিশাল থেকে এক শিক্ষক পিতা তাঁর শিশু পুত্রকে ঢাকা শহর দেখাতে এনেছিলেন। শিশুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে ( জগন্নাথ হলের আদি ভবনে প্রতিষ্ঠিত ছিল)। সেখানে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি গায়ে দেওয়া এক শিক্ষকের কোলে বসেছিল। মানুষটি বন্ধু পুত্রকে কোলে বসিয়ে পা দোলাতে দোলাতে মন দিয়ে বই পড়ছিলেন। সেই মানুষটি শ্রদ্ধেয় মুনীর চৌধুরী । সেলিম জাহান নিজের সেই শৈশব স্মৃতির বর্ণনায় আমাদের সামনে নিয়ে এলেন ব্যক্তিগত মুনীর চৌধুরীকে। আমার সৌভাগ্য যে একটা সন্ধ্যা সেলিম জাহান স্যারের সামনে বসে শুনেছিলাম, কবি জীবনানন্দ দাশের কথা। সেলিম স্যারের বাবা বরিশাল বি এল কলেজের অধ্যাপক প্রয়াত সিরাজুল হকের সহকর্মী ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। আর কবির নতুন বাড়ি দেখতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ পেয়ে শ্রদ্ধেয় সিরাজুল ইসলাম কবির মুখে শুনেছিলেন কার্তিকের মাঠে সাদা কুয়াশার টানা রেখা জন্মানোর গল্প। সে গল্প আমি স্যারের মুখে শুনেছি ঢাকা শহরের এক বইয়ের দোকানে বসে। আর বিভূতিভূষণ, বিনয় মজুমদার এবং কবি তারাপদ রায় নিয়ে তাঁর পাঠের অলিখিত অভিজ্ঞতা-অনুভূতি শোনার সুযোগ হয়েছে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে স্ট্র্যান্ড বুক হাউজের উল্টো দিকের কফির দোকানে বসে। সে স্মৃতি অন্য সময়ের জন্য রইলো। শুধু এটুকু বলি, মানুষ হিসেবেই সেলিম জাহান বিশেষ শ্রদ্ধার।

সামান্য সময়ের পরিচয়। অল্পই আলাপ তবুও তিনি আমাকে বই পড়ায় ও লেখা অব্যাহত রাখায় যেমন উৎসাহ দিয়েছেন সে মূল্য অপরিমেয়। তবে এমন করেই তো পূর্বসূরিরা আমাদের হাত ধরেন। যেমন কিছুদিনের জন্য হলেও সেলিম জাহানের হাত ধরেছিলেন কবি মোহাম্মদ রফিক।

লেখার সনাতন বৃত্ত থেকে বেরিয়ে কবি মোহাম্মদ রফিক সেলিম জাহানকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন অন্যরকম লেখায়। সে ফল হচ্ছে তখন সংবাদ পত্রিকায় পাক্ষিক কলাম ‘কড়ি-কড়চা’ লেখা। খ্যাত-অখ্যাত কত মানুষের সাথে লেখকের সখ্যতা হয়েছে। কেউ কেউ খুব স্পষ্ট ছাপ রেখেছেন তাঁর জীবনে, কেউ হারিয়ে গিয়েছে। যেমন ‘সেই সব মানুষেরা’ গল্পের আলম মিয়া যাকে তিনি বিমান বন্দরে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বড় কূটনৈতিক বলে। ওমানে প্রবাসী এই শ্রমিকের সাথে লেখকের পরিচয় হয়েছিল আলম মিয়ার আরোহণপত্র পূরণ করে দেওয়ার অনুরোধে।

একাকিত্বের নি:সঙ্গতা কাটিয়ে ওঠা যায়, একলাত্বের শূন্যতা মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়। ‘একা বনাম একলা’ এ দুই শব্দের ভেতর বিস্তর ব্যবধানের কথা তুলে এনেছেন তিনি। 
“ সময় আমাদের অগ্রাধিকার নির্বাচনে ভুল হয়, আমরা জীবিকা আর জীবনকে গুলিয়ে ফেলি, জীবিকাকেই জীবন বলে ভুল করি। ” ‘বেঁচে থাকা’ গদ্যের এই অনুভব নিজেকে পরাজিত না ভাবার এক জীয়ন কাঠি।

এমন ছোট ছোট ৬০টি মুক্ত গদ্যের ভেতর দিয়ে নিজের শৈশব-কৈশোর, তারুণ্য আর বিশ্বের নানা দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প বলেছেন অর্থনীতিতে মানবমুখী প্রান্তিক ভাবনাচিন্তায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলা অধ্যাপক সেলিম জাহান। তবে একটানে পড়ে যাওয়া এ বই নিয়ে একটা মতামত আছে। সুখপাঠ্য লেখনী হলেও প্রতিটি ঘটনা অত্যন্ত দ্রুত শেষ হওয়ায় রেশের সাথে খেদও রইল। এক মলাটে এতগুলো গদ্য সঙ্কলিত করার পক্ষেও আমি নই। সেলিম জাহানের ভাষায় ‘অবয়বপত্র’ থেকে মলাটবদ্ধ। এই অবয়বপত্র শব্দটি বিনাঅনুমতিতেই এখন ব্যবহার করি, আশা করি তিনি তাতে বিরক্ত হননি।

লেখক পরিচিত হলে শুধু আলোচনায় নয়, বই পাঠেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন। আমি কিন্তু বলেছি যা ভালো লাগেনি। এ বই নিয়ে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সনৎকুমার সাহাসহ বেশ কয়েকজন বিশদ আলোচনা করেছেন এরই মধ্যে। আমি শুধু পাঠের অভিজ্ঞতাটুকুই উল্লেখ করলাম আর প্রত্যাশা করছি বেলা-অবেলার কথা'র মতো আরেকটি সুখ পাঠ্য নতুন বইয়ের।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন