মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা কুলদা রায়ের সেরা গল্প : দি র‍্যালে সাইকেল


গল্পটি নিয়ে আলাপ--

গল্পপাঠ
গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছেন।

কুলদা রায় 
এই গল্পটি ২০১৮ সালের মে মাসের দিকে লেখা শেষ করেছি। লিখেছি অনেকদিন ধরেই। প্রায় বছর খানের ধরে। নিউ ইয়র্কে আমাদের বাড়িতে, সাবওয়েতে, আমার কর্মস্থলে লাঞ্চব্রেকের সময়ে। এমনকি কানাডাতেও কয়েকটি প্যারা লিখেছি মনে পড়ছে।
গল্পপাঠ
গল্পটি লেখার সময়ে কি কাজ করছিলেন, কি পড়াশুনা করছিলেন বা কি লিখছিলেন। 

কুলদা রায়
গত দুবছর ধরে নানা ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে দিন কাটছে। নিজেদের ঘরদোরে মিস্ত্রিগিরি করা, বাড়ির পেছনে ক্ষেতখামার করা, ছোটো মেয়ের বহুদূরে পড়তে চলে যাওয়া, চাকরিবাকরি, বাজারঘাট, রান্নাবান্না, আর কিছু নতুন গান শোনা, সিনেমা দেখা আর বইপড়ার মধ্যে দিয়ে চলতে হয়েছে। আর ছিল আমার নিজস্ব কিছু অলসতা। এর মধ্যে পুরনো হোমলেসদের ছেড়ে চলে আসি টেম্পোরারি হোমলেসদের কাছে। সেখান থেকে আবার বুড়োবুড়িদের কাছে। তাদের সঙ্গে আমার দিনগুলো চমৎকার কাটছে। তাদের জন্য হারসি কিসি নিয়ে যেতে হয়। আর তারাও আমাকে আপেল, কমলা, অথবা পিয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে, ও ছেলে তুমি নাকি মদ খাও না!

তাদের মধ্যে কেউ মারা যায়। আমার টেবিলে ফুলের গুচ্ছ রেখে যায়। আর অপেক্ষা করে নতুন আরেকটি মৃত্যুর। এর মধ্যে দিয়েই আমি মার্কেজ পড়ি, বেন ওকরিকে পড়ি। হারুকি মুরাকামি, টমাস মান আর ইতালো কালভিনোকে পড়ি। পড়ি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে, অমর মিত্রকে, পড়ি হামিরুদ্দিন মিদ্যাকে। পড়ি দুশো বছর আগেকার সংবাদপত্র। আর লিখি নতুন কিছু গল্পের টুকিটাকি। সময় হলেই সেগুলো লিখে ফেলব। 
গল্পপাঠ
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন?

কুলদা রায়
আমাদের বাড়িতে একটি পুরনো সাইকেল ছিল সিঁড়ির নিচে জানালা ঘেষে। গত জন্মের সাইকেল যেন। এই সাইকেলটি এভাবেই পড়ে ছিল। কাউকে চালাতে দেখিনি। ধীরে ধীরে জং ধরে গেছে। হয়ে পড়ছিল একটা যন্ত্র কংকাল। সাইকেলটার কাছে গেলেই বুড়ি সরলাদিদি হা হা হা করে ছুটে আসতেন। 
সেবার ১৯৭৭ সালের ৩ এপ্রিল দুপুর ৩.০৫ টায় টর্নেডোতে আমাদের শহরটা মফস্বল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। বাড়ির টিউবওয়েলটা মাটি থেকে উড়ে গেল-- হাওয়ার তোড়ে একটা নারিকেল গাছে স্প্রিংএর মতো পেঁচিয়ে গেছে। । বেশ কিছু গাছ উপড়ে পড়েছে। গোড়ায় বড়ো বড়ো গর্ত হয়েছে। এই সাইকেলটা আমার স্মৃতির মধ্যে জেগে আছে। 

আমার বন্ধু সিজারদের নানাজান বর্ধমান থেকে দেশভাগের সময়ে চলে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন কলেজ শিক্ষক। আর ছিল বাড়ির কাছেই লাল রঙের একটা ডাকঘর। 
যখন একা থাকি এই দূর দেশে তখন এইসব স্মৃতি মনে আসে। সেগুলি থেকেই গল্পের বীজ পেয়েছি। 

গল্পপাঠ
এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন?

কুলদা রায়
দেবেশ রায়ের বরিশালের যোগেন মণ্ডল উপন্যাসটি পড়ে দেখি রায়বাবু যোগেন মণ্ডলকে নমোশুদ্রদের অতি বীর হিসেবে রূপায়িত করেছেন। আমি নমোশুদ্রদের একজন হিসেবে দেখেছি, দেশে নানা সময়ে যখন সাম্প্রদায়িক শক্তি হামলে পড়ে সংখ্যালঘুদের উপর তখন আমার বাপ ঠাকুরদারা যোগেন মণ্ডলকে শাপশাপান্ত করে। তারা বলে, এই লোকটি ব্যক্তিগতভাবে মন্ত্রীত্ব পাওয়ার লোভে মুসলিম লীগের সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন। পাকিস্তান নামক একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলেন। বলেছিলেন মুসলিম লীগ তাদের নিরাপত্তা দেবে। নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার দেবে। সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটি যখন জন্মের পরপরই সংখ্যালঘুদের দেশ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করল দাঙ্গাফ্যাসাদ ঘটিয়ে, ঠিক তখনই যোগেন মণ্ডল নিজের প্রাণ বাঁচাতে দেশত্যাগ করে পালালেন নমোশুদ্রদের বাঘের মুখে ফেলে রেখে--েকটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে দেশহীন করে গেলেন। কলে পড়া ইঁদুরের মতো কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থা রইল না। সে অর্থে যোগেন মণ্ডল নমোশুদ্রদের কাছে নায়ক নয়--ভীলেন। দেবেশ রায় এই সত্যটি লেখেননি। 

এই হাহাকার শুনতে শুনতে আমাদের বাল্যকাল কেটেছে। কৈশোর কেটেছে। এইসব ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই গল্পটি লিখেছি। 

গল্পপাঠ
গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন? 

কুলদা রায়
গল্পটি এক বছর ধরে লিখেছি। আমি সময়ের অভাবে একটানা লিখতে পারিনা। তাই অনেক সময় ধরে গল্পটির পুরো স্ক্রিপ্ট আগে লিখে রাখি। পরে সেটা অনুসরণ করে ভাষা দেই। প্রাণ দেই। সে অর্থে এক প্যারা দু প্যারা যা-ই লিখি না কেনো পরে তার আর কাটাকুটির দরকার হয় না খুব বেশি। শুধু ঘষামাজা করি। গল্পের ভাস্কর্যটি পূর্ণ করে তুলি। যতক্ষণ না তৃপ্ত হই, ততক্ষণ আমি এই কাজ করে যাই। 


গল্পপাঠ
লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে? 

কুলদা রায়
গল্পটি লেখার সময়ে মূল ভাবনাটি খুব বেশি পালটে যায় না। কারণ গল্পটি আদি মধ্য ও অন্ত তো লেখার আগে জানিই। কখন কোন সিকোয়েন্সটি আসবে সেটাও ঠিক করে রাখি লেখার আগে। এমন কি চরিত্রগুলোও স্ক্রিপ্টে থাকে। 
গল্পপাঠ
গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন? 

কুলদা রায়
এই গল্পটি লেখার আগে কয়েকজনকে শুনিয়েছি। লেখার পরে ফেলে ফেলেছি অনেকদিন। বহুবার নিজে নিজে পড়েছি। তারপর গল্পপাঠের কয়েকজনকে পড়তে দিয়েছি। 

গল্পপাঠ
লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা কি লিখতে পেরেছেন?

কুলদা রায়
ক্ষমতা আমাদের স্মৃতিগুলোকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। এই বিস্মৃতির অন্ধপ্রকোষ্ঠ থেকে স্মৃতিগুলোকে ফিরিয়ে আনার কাজটিই আমি গল্পের মধ্যে করি। সে অর্থে আমি যা লিখতে চেয়েছিলাম তা লিখেছি বলেই মনে হয়। 


কুলদা রায়ের গল্প :
দি র‍্যালে সাইকেল

দিনটা ছিল ১৯৭৭ সালের ৩ এপ্রিল। দুপুর তিনটা পাঁচে আকাশটা একটু রাঙা হলো। ঝুপঝুপ করে তিন পশলা বৃষ্টি হল। আর ঝরে পড়ল সাদা সদা শীল। বাড়ির ছেলেমেয়েরা নেমে গেল উঠোনে। মজা করে শীল কুড়োতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শীলের আকার বাড়তে বাড়তে আধ পোয়াটাক হলো। গাছের পাতা ছিড়ে ঝরে পড়তে লাগল। দেখে বাড়ির সরলাবালা চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ওরে তোরা ঘরে ওঠ। ঘরে ওঠ।

ঘরে ওঠার আগেই সরলাবালার কানের লতি ছিড়ে গেল। কপালও কাটে গেল। 

তবে এর মধ্যেই শীল পড়া থেমে গেছে। নইলে বড়ো বিপদ হতে পারত। 

তবে বড়ো বিপদটা এর তিন মিনিটের মধ্যেই এলো। এলো প্রবল ঝড়। মুহূর্তের মধ্যে সারা বাড়ির ঘরগুলো একাত ওকাত হয়ে পড়ে গেল। কোনো কোনো চালের টিনগুলো কাগজের মতো উড়তে লাগল। ঝড়টা হয়েছিল মাত্র তিন মিনিট। এর মিধ্যেই সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। শুধু পুরনো বিল্ডিংটা অক্ষত আছে। 

বাড়ির পেছনে লিকলিকে নারিকেল গাছটির গোড়া উপড়ে ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানে একটি গর্ত হয়েছে। সেটা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। সবাই ঘরদোর ঠিক করতে ব্যস্ত। 

এর মধ্যে নীলু টিপিটিপি পায়ে সেই গর্তের কাছে এসে দাঁড়াল। সে ক্লাশ এইটে পড়ে। তার স্কুল বন্ধ। তার মনে হলো সে যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে। তারও কিছু কাজ করা দরকার। গর্তটা ভরাটের কাজটি সে করবে। 

তার আগে গর্তটা ভালো করে দেখে নেবে বলে ভেতরে নামল। সে জায়গাটি ঠিক মাটির মতো নরম নয়। কৌতুহল ভরে মাটি সরাতেই একটি বস্তা বেরিয়ে এলো। তবে বস্তাটি চটের নয়। শক্ত ক্যানভাসের। 

এখানে গাছের গোড়ায় বস্তা থাকার কথা নয়। এর মধ্যে কোনো ঝামেলা থাকতে পারে। সে কারণে গর্ত থেকে ঝটপট উঠে পড়ল। তার দয়াল কাকা কলেজে পড়ে। তাকে ডেকে নিয়ে এলো। কাকা সব দেখে শুনে বলল, বোমা টোমা থাকতে পারে। 

তবে কাকাই আবার চিন্তা করে বল, যতদূর জানা যায়, এ এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা এখানে ঘটেনি। 

--তাইলে? 

-- সোনা দানাও থাকতে পারে। 

--যক্ষের ধন? 

--হতে পারে। 

নীলু সন্দেহ কিরে বলল, তা কী করে। যক্ষের ধন হলে আমাদের দেখে সরে পড়ত। সে তো জ্যান্ত। 

দয়াল বাতিকগ্রস্থ নয়। যথেষ্ট যুক্তিবাদী। বলল, ডাকাতরা এখানে টাকা পয়সা পুতে রাখতে পারে। 

এটা আশার কথা। কিন্তু এ বাড়ির লোকজন অতি সজ্জন। তাদের কোনো দুর্নাম নেই। আর কোনোকালে ডাকাত পড়েনি। এ এ বস্তা সত্যি সত্যি টাকার বস্তা হয়ে থাকলে সেটা এ বংশের কেউ পুতে রেখেছেন। কোনো কারণে বাইরে রাখতে সাহস পায়নি। ফলে টাকার বস্তাটি খুলতে যাবে, তার আগে বস্তাটির গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারল, তার মধ্যে হাড়গোড় ধরনের কিছু জিনিস রয়েছে। দয়াল চেঁচিয়ে বলে উঠল, ওরে খুলিস নে। মনে হয়ে বস্তার মধ্যে কঙ্কাল আছে। কাউকে মেরে মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছে। 

এ অঞ্চলে জাপানি সৈন্যরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আসেনি। নিকট অতীতে এ পাড়ায় কেউ খুন হয়েছে এমন তথ্য নেই। এ বাড়ির লোকজন এতো সজ্জন যে তাদের নামে ডাকাতি বা রাহাজানির অথবা স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বলে কোনো অভিযোগ তোলার কোনো কারণ নেই। 

এইসব গবেষণায় নিশ্চিত হয়ে নীলু আর দয়াল দুজনে মিলে বস্তাটি খুলে ফেলল। তার মধ্য থেকে হাড়গোড় বের হলো বটে-- তবে কোনো মানুষের নয়। এমন কি কোনো জন্তুরও নয়। হাড়গোড়গুলো কোনো যন্ত্রের-- লোহা লক্কড়ের। তার মধ্যে দুটো চাকা। একটি হ্যান্ডেল। সিট। পেছনে ক্যারিয়ার। চেন খুলে গেছে। তবে এই সব বহু পুরনো বলে জং ধরেছে। আর সব ভাঙ্গা চোরা। 

দয়াল বলল, যাহ বাবা, খাটুনিটাই বৃথা গেল। 

নীলু দয়ালের মতো হতাশ নয়। সে বাঁশের চটা তার গুনা দিয়ে বেঁধে সত্যি সত্যি একটি সাইকেল খাড়া করে ফেলল। তবে সেটা চলে না। চালানো সম্ভবও নয়। এর মধ্যে একটা জিনিস পাওয়া গেল না-- সেটা হলো সাইকেলের বেল। বেলটি থাকলে নিখুঁত হতো। অতি হাস্যকর দেখতে লাগে এই সাইকেলটি। তাকে ঠিক সাইকেল মনে হয় না। সাইকেলের কঙ্কাল। দেখতে অসুন্দর। 

বাড়ির লোকজন বলে ফেলল, এ আপদটাকে রাখিসনে। দূরে ফেলে দে। 

কিন্তু নীলু ফেলতে রাজী নয়। তার একটা সাইকেলের সখ। 

সাইকেলটি রাখা হলো সিঁড়িঘরের আড়ালে। সেখানে প্রতিদিনই নীলু সাইকেলটির যত্ন নেয়। ঘষামাজা করে। চাকু দিয়ে জং ছাড়ায়। দেখে তার মা বিনোদিনী হাসে। বলে, পাগল ছেলে। 

হাসি লুকিয়ে বলে, আরেকটু বড় হলেই নীলুকে একটি সাইকেল কিনে দিতে বলবে। 


২. 
বিনোদিনীর যখন বিয়ে হয় তখন তার বয়স মাত্র চৌদ্দ। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। তার জন্য মণ্ডল বাড়ির ধলু মণ্ডল সম্বন্ধ আনলেন। ছেলের বাড়ি শহরে। লেখাপড়া টেন পাশ। বাড়ির একমাত্র ছেলে। জায়গা জমি আছে। কাজকর্ম করার দরকার নেই। তবে একটা ব্যবসা আছে। আর-- 

বিনোদিনীর বাবা কেশব বনিক শুধালেন, আর? 

ধলু মণ্ডল বলল, ছেলে সাইকেল চালাতে জানে। 

শুনে কেশব বনিকের ভয় হলো। তিনি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন, তাইলে কি ছেলেকে সাইকেল দিতে হবে? 

ধলু মণ্ডল হাসলেন। তখনই কিছু বললেন না। 

কেশব বনিকের মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার। দিয়ে থুয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা তার নয়। তার আরো কয়েকটা মেয়ে আছে। সাইকেল কিনে মেয়ের বিয়ে দিতে তিনি রাজী নন। 

ধলু মণ্ডল বললেন, একটু ধার দেনা করে সাইকেল কিনেই ফেলেন। একটা মাত্র সাইকেল। আর তো কিছু নয়। 

কেশব বনিকের মেয়ে ভারি সুন্দর। কেউ যদি বিনা পণে তার মেয়েকে আদর কিরে নিতে চায় তবে তার আপত্তি নেই। তাছাড়া তার মেয়ের বয়স আহামরি তেমন কিছু নয়। এর মধ্যে অন্য সম্বন্ধ আসবে। চিন্তা নেই। 

কিন্তু চিন্তা আছে ধলু মণ্ডলের। তিনি এ সম্মন্ধ ছাড়তে নারাজ। 

গ্রামের দুএকজন ধলু মণ্ডলের সঙ্গে একমত হলো। এ গ্রামের কারো আত্মীয় সম্বন্ধ শহরে নেই। এ প্রস্তাব তাদের গ্রামের জন্য সম্মানজনক। গাঁয়ে গ্রামে চিনপরিচয় দেওয়া যায়। শহরে নানা বিপদে আপদে তাদের শরণ নেওয়া যায়। সাইকেল কেনার জন্য টাকা পয়সা যা লাগে তারা-- গ্রামের লোকজন নিজেরাই ধারকর্য করে দেবেন। 

কেশব বনিক এ কথাতেও হা করলেন না। 

এবারে ধলু মণ্ডল বললেন, ছেলে সাইকেল চালাতে জানে বটে কিন্তু সে সাইকেল চালাক তা তার বাবার ইচ্ছে নয়। শুধু মেয়ে ফর্শা হলেই হলো। সঙ্গে লম্বা চুল। আঁখি দুটো টানা টানা। আর নম্রভদ্র। তাছাড়া ছেলের বাড়িতে একটা সাইকেল আছে। 

এরপরে আর কোনো কথা নেই। এখানেই বিনোদিনীর বিয়ে হলো। তার মনে আলাদা একটা সুখ ছিল-- তার স্বামী সাইকেল চালাতে জানে। এ গ্রামে কেউ জানে না। তাদের কোনো আত্মীয় স্বজনও কেউ চালাতে পারে বলে শোনা যায় না। 

বিয়ের পরে তার একটা বাসনা জেগেছিল। সেটা হলো, বিয়ের পরে প্রথম বাপের বাড়িতে জোড়ে আসার কালে তার তরুণ স্বামী তাকে সাইকেলে চড়িয়ে তাদের গ্রাম নারিকেল বাড়িতে আসুক। সাইকেলের বেল শুনে গ্রামের বউ ঝিরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসুক। বলুক, সুন্দর। 

কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে এসে বিনোদিনী তার স্বামীকে সাইকেল চালাতে দেখতে পেল না। প্রথম দুদিন মনে করেছিল বিয়ের ঝামেলাতে চালাচ্ছে না। একটু অবসর পেলেই চালাবে। তৃতীয় চতুর্থ দিনেও তাকে চালাতে দেখা গেল না। এমনকি এ বাড়ির চৌহদ্দিতে কোনো সাইকেলও তার চোখে পড়ল না। একবার ভেবেছিল কাউকে জিজ্ঞেস করবে। নতুন বউ হিসেবে লজ্জায় সেটা করতে পারল না। 

পঞ্চম দিবসে কিছু আত্মীস্বজনকে নেমতন্ন করা হয়েছিল। এই উপলক্ষ্যে তার গোলাঘরে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল। সেখানে একটি সাইকেল দেখতে পেল। এই সাইকেলটিই দেখার অপেক্ষায় ছিল বিনোদিনী। তার মন ভরে গেল। এবারে নিশ্চিত হলো নেমতন্নের ঝামেলা কেটে গেলেই তার স্বামী নিশ্চয়ই সাইকেলটি চালাবে। 

দেখতে দেখতে দশদিন পরে বাপের বাড়ি ফেরার দিন ঘনিয়ে এলো। গোলা ঘরেই পড়ে রইল সাইকেলটি। সেটা কেউ ছুঁয়েও দেখেনি। তার ননদিনী এসে জানালো তার জন্য কেরায়া নৌকা ঠিক হয়েছে। কিন্তু বিনোদিনীর মন খুঁত খুঁত করতে লাগল। সেটা বুঝতে পেরে তার ননদিনী জিজ্ঞেস করল, কী হইছে বউদি? 

বিনোদিনীর লাজলজ্জার মাথা খেয়ে জানালো সে নৌকায় যেতে চায় না। যেতে চায় সাইকেলে চড়ে। 

শুনে ননিদিনী হেসে ফেলল। বলল, দাদার নিজের সাইকেল নেই। পাড়ার অনন্ত মোহরীর ছেলে বিনোদের সাইকেল মাঝে মধ্যে চালাত। তারা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে আর চালায়নি। সাইকেল কিনতে পারলে তোমাকে চড়াবে। 

অবাক হয়ে বিনোদিনী জিজ্ঞেস করল, গোলাঘরের সাইকেলটি তাইলে কার? 

--কাড়ারগাতির খবিরুদ্দিন মুন্সির। তবে-- 

-- তবে? 

--তবে সাইকেলটি ঠিক খবিরুদ্দিন মুন্সিরও নয়। আসল মালিক তার দাদাজান আয়েনুদ্দিন মুন্সির। 

আয়েনুদ্দিন মুন্সির বাড়ি বর্ধমান। তিনি স্থানীয় কলেজের তরুণ শিক্ষক। বাড়ি থেকে একটু হেঁটে কলেজে যান। তার শ্বশুর সাহেবের ইচ্ছে হলো মজামাইকে একটি সাইকেল কিনে দেবেন। আয়েনুদ্দিন মুন্সির সঙ্গে তার স্ত্রীও কোলকাতায় গেলেন। তার বাসনা হলো নতুন সাইকেলে স্ত্রীকে বসিয়ে নিয়ে আসবেন। আরো ইচ্ছে হলো তখন তার স্ত্রী মুখের বসনটি খুলে রাখুক। অড্রে হেপবার্নের মতো চুল খোলা রাখুক। হাওয়ায় উড়ে এসে রেশমের মতো চুল তার মুখে এসে লাগুক। 

সব কিছু ঠিকঠাক মতো হচ্ছিল। কিন্তু কোলকাতা তখন গরম। মুসলিম লীগ ১৬ তারিখ বাংলা ভাগ করার দাবিতে ডাইরেক্ট এ্যাকশনের ডাক দিয়েছে। ফলে যেদিন কোলকাতা পৌঁছুলেন সেদিনই তারা বড় বাজার থেকে একটা নতুন সাইকেল কিনলেন। তখন স্টার সিনেমা হলে প্রমথেশ বড়ুয়ার জবাব সিনেমার শেষ রজনী। তারা দুজনে মিলে সিনেমা দেখলেন। 

কাননবালার গাওয়া তুফান মেল গানটি শুনে বিবি মুগ্ধ। তিনি সিনেমা দেখতে দেখতেই গানটি গলায় তুলে নিলেন। আরো কদিন বেড়ানোর ইচ্ছে থাকা সত্বেও কোলকাতার উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে কোলকাতায় থাকার সাহস হলো না। ঠিক হলো পরদিন শুক্রবার ভোরবেলা বর্ধমানের উদ্দেশ্যে রওনা করবেন। 

কিন্তু খালাজান নতুন জামাইকে এভাবে সহসা বিদায় করতে চান না। তিনি পরদিন মুরগি মুসাল্লাম রাঁধতে বসলেন। যেতে যদি হয়ই তবে খেয়ে দেয়ে তারা বাদ জুম্মা যাবে। খেতে খেতে দুপুর পড়ে এলো। পাড়া মহল্লার লোকজন সব ডাইরেক্ট এ্যাকশনের সমাবেশ স্থলের দিকে চলে গেছে। এই ফাঁকে আয়েনুদ্দিন বিবিকে সাইকেলে বসিয়ে নিয়ে ট্রেন ধরতে রওনা হলেন। 

আয়েনুদ্দিন মুন্সির এই ঘটনা নিয়ে একটি বিষাদাত্মক কাহিনী কাব্য রচনা করেছিলেন এ এলাকার ভোজেরগাতি গ্রামের রইসুল কবিয়াল। এখনো সেই গান প্রচলিত আছে। বিনোদিনীও সেই গানটি শুনেছেন-- 

হাওয়ায় উড়িল বিবি ওড়ে তার কেশ। 
তাহাতে মিয়ার মনে লাগে অতি বেশ।। 
পথঘাট শুনশান কেহ কোথা নাই। 
‘তুফান মেলের গান’ বিবি গাহে তাই।। 
এইরূপে মিয়াবিবি চলিতে লাগিল। 
সুখের দিবস মনে রচিতে লাগিল।। 
সহসা আসিল কারা আল্লাতাল্লার নামে। 
জয়কালী বোলে কারা অকুস্থলে থামে।। 
কোথা যাবে কী করিবে বুঝিতে না পায়। 
মিয়াবিবি ধরিয়া দোহে করে হায় হায়।।
যখন চেতন ফেরে দেখে মিয়া ভাই। 
সাইকেল পড়িয়া আছে বিবি সেথা নাই।। 

খোলাচুলের লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো বউটিকে দেখে মুসলমানরা মনে করেছিল মেয়েটি হিন্দু। আর সেই ডামাডোলের মধ্যে বিবির কী হলো, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে কি, অপহরণ করা হয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি। ভাগ্যক্রমে আয়েনুদ্দিন মুন্সি বেচে গেলেন। তার মুখে দাড়ি দেখে অপহরণকারীরা মনে করেছিল তিনি মুসলমান। হিন্দু এলাকায় গেলেই তিনি মারা পড়বেন। ফলে তার স্ত্রীকে অপহরণকারী মুসলমানরা তাকে সাইকেলসহ নিরাপদ এলাকায় পৌঁছে দিয়েছিল। সেদিনের কোলকাতার সংবাদপত্রে আয়েনুদ্দিন মুন্সি আর তার বিবির খবরটি প্রকাশিত হয়নি। তখন দি স্টেটস ম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল -- 

The statesman 
Monday, August 19, 1946 
Calcutta death roll now 20000. Orgy of rioting and looting continues.August 18-- communal rioting with an orgy of murder, arson, looting and destruction continued in Calcutta for three day today. 

কোলকাতার বাতাস তখন লাশের শহর। শকুনের ঝাঁক নেমে এসেছে। 

আয়েনুদ্দিন মুন্সি এরপর আর বর্ধমান থাকলেন না। সব ছেড়ে ছুড়ে পূর্ব বঙ্গে চলে এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন সেই ঝকঝকে সাইকেলটি। 

আয়েনুদ্দিন মুন্সি এলেন বটে। কিন্তু তিনি আর স্বাভাবিক ছিলেন না। লোকজনকে এড়িয়ে চলতেন। একা একা ঘুরে বেড়াতেন আচ্ছন্নের মতো। এমন কি তিনি মসজিদেও যেতেন না। এ রকমই একটা দিন তিনি বিধুবাবুর কাছে এলেন। বিশটি টাকা নিয়ে সাইকেলটি তার জিম্মায় রেখে গেলেন। বললেন, পরে নেবেন। এরপরে আর আয়েনুদ্দিন মুন্সিকে এই এলাকায় দেখা যায়নি। 

সাইকেলটি বিধুবাবু খুব যত্নের সঙ্গেই বাড়িতে রেখেছিলেন। কাউকে ধরতে পর্যন্ত দেননি। তিনি মনে করতেন, নিশ্চয়ই কোনো একিদিন আয়েনুদ্দিন মুন্সি আসবেন। সাইকেলটি নিয়ে যাবেন। 

বিয়ের নবম দিবসে এই বাড়ির উঠোনে খবিরুদ্দিন মুন্সি এলেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন আয়েনুদ্দিন মুন্সির চিঠি। তিনি লিখেছেন-- 


প্রিয় বিধুবাবু 
পত্রবাহক আমার ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীমান খবিরুদ্দিন মুন্সি। তাহার নিকট সাইকেলটি প্রদান করিবেন। প্রদানকালে জিম্মা অর্থ কুড়ি টাকা বুঝিয়া লইয়া কৃতজ্ঞ করিবেন। আমার ইন্তেকালের পরে উহা আমার কবরস্থানের নিকট স্থাপন করিবে। 

ইতি ভবদীয় 

আয়েনুদ্দিন মুন্সি। 

বিধুবাবু শুধালেন, আপনার চাচাজি এখন কোথায়? 

খবিরুদ্দিন মুন্সি মাথা নেড়ে বল লেন, জানি না। দুদিন আগে এই চিঠি এসেছে। দশ বছর আগেকার তারিখ লেখা। চাচাজি জীবিত আছেন কি মারা গেছেন সেটা বলা যাচ্ছে না। তবে আমার নিজেরও বয়েস হয়েছে। কবে কখন মরে যাই। মনে হলো, যাই সাইকেলটি নিয়ে আসি। চাচাজি ফিরলে তার নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা হবে। 

সাইকেলটি নিয়ে যাওয়ায় গোলাঘরটি ফাঁকা হয়ে গেল। বিনোদিনী একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বিনোদিনীকে তার বিধুবাবু কী বুঝে বললেন, দু:খ কোরো না মা জননী। দিনকাল ভালো হলেই আমার ছেলে সাইকেল কিনে নেবে। তখন চড়তে পারবে। 

ফলে গর্ত থেকে যে সাইকেলের কঙ্কাল পাওয়া গেছে তা আয়েনুদ্দিন মুন্সির নয়। তবে কার সাইকেল এটা নিয়ে নীলুর চিন্তা নেই। সে ধুয়ে মুছে সাইকেলটিকে পারলে জ্যান্ত করে ফেলে। চাকা ঘোরানোর চেষ্টা করে। তার এই চেষ্টা তদ্বির দেখে বিনোদিনীর খুব মায়া হলো। ছেলেকে ডেকে বলল, চিন্তা করিস না নীলু। শীত গেলে তোকে একটা সাইকেল কিনে দিতে তোর বাবাকে বলব। 

শুনে নীলু খুশি। হয়তো এ শীতে নয়। হয়তো তার পরের শীতে বাবা কিনে দেবে। পরের শীতে না পারলে তারও পরের শীতে কেনা হবে। তার বাবা কিনে না দিতে পারলে বড় হলে সে নিজেই কিনে নেবে। কোনো সমস্যা নেই। কেনার চিন্তাটাই বড় কথা। ততোদিনে এই বাড়িতে এটা থাক। 


৩. 
শহরের প্রবীণ সাংবাদিক মোজাম্মেল হক মুন্না একজন কবি ও গল্পকার। প্রবন্ধও লেখেন। তবে মফস্বলে থাকেন বলে তার এই কবি খ্যাতিটা ঠিক ততোটা পাননি। 

তার দুটো বই বেরিয়েছে। একটি কবিতার বই-- ভোরের প্রদীপ। মোট ৬১ টি কবিতা আছে। বইটি প্রকাশ করেছেন নিজের টাকায়। আরেকটি নাটকের বই-- হৃদয়ে দিও না ব্যথা। আর দুটি কাব্যগ্রন্থ তার প্রস্তুত আছে। একটি উপন্যাস আদর্শ প্রেসে ছাপা হয়ে আছে দু বছর ধরে পড়ে আছে। টাকার অভাবে তার বাইন্ডিং হয়নি। প্রেসের মালিক বলে দিয়েছেন, ফেলো কড়ি, মাখো তেল। 

মোজাম্মেল মুন্না নতুন একটি উপন্যাস লিখবেন। কিন্তু প্রকাশ করার মতো টাকা জোগাড় হবে না ভেবে তিনি অর্ধেক লিখে ফেলে রেখেছেন। 

স্থানীয় কলেজের বাংলার অধ্যাপক বলেছেন, তার (মো হ মুন্না) লেখার মধ্যে যতোটা সাহিত্য গুণ আছে তার চেয়ে অনেক বেশি সংবাদ সুলভ গুণ আছে। ফলে তিনি সংবাদপত্রে কাজ করলেই ভালো করবেন। তখন থেকেই তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের স্থানীয় বার্তা পরিবেশক হিসেবে কাজ করছেন। তবে তার প্রতি ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট নয়। তারা বলেন, মুন্নার সংবাদগুলো যতটা না সংবাদ তার চেয়ে অনেক বেশি সাহিত্যসুলভ। পাখি ডাকা, ফুল ফোটা, চাঁদ ওঠা টাইপ। সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। তথ্য হালকা হয়ে যায়। ফলে তারা নতুন একজন স্থানীয় বার্তা পরিবেশক নিয়োগ করতে চান। 

তবে তারা আরেকটা সুযোগ দিতে চান। যদি সত্যিকারের একটি অনুসন্ধানমুলক আকর্ষণীয় সংবাদ পাঠাতে পারেন তবে তাকে রাখা হবে। 

সময় মাত্র এক মাস। এটা নিয়ে তিনি বেশ ঝামেলায় আছেন। 

সময়টা বিশেষ ভালো নয়। আমন ধান উঠে গেছে। লোকজনের অবস্থা ভালো। অভাব বিশেষ নেই। শীত কাটি কাটি করছে। নতুন কোনো বিশেষ ঘটনা নেই যা লিখে কর্তৃপক্ষের টার্গেট পূর্ণ করা যায়। এজন্য মুন্নার মন খারাপ। 

এই রকম সময়েই শহরে সরকারি উদ্যোগে কৃষি শিল্প স্বাস্থ্য সংস্কৃতি মেলা বসেছে স্থানীয় স্টেডিয়াম মাঠে। মেলা সাত দিন ব্যাপী হলেও মুন্না প্রথম তিনদিন যেতে আগ্রহ বোধ করলেন না। চতুর্থ দিনে মেলায় গেলেন ছোট ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে। তার পুতুল নাচ দেখার শখ। 

মেলায় বড় বড় লাউ কুমড়ো উঠেছে। ট্রাক্টর রাখা হয়েছে। ম্যালেরিয়া কিভাবে দমন করতে হয় সে ব্যাপারে ছবি টানানো হয়েছে। দেশি গরুর পাশে একটি জার্সি গরু নিরবে ঘাস খাচ্ছে। এর মধ্যে নতুনত্ব নেই। 

তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে যাবেন ঠিক তখনই দেখতে পেলেন স্থানীয় স্কুলের স্টলের একপাশে একজন বালক বসে আছে। তাকে ঘিরে ছোটোখাটো একটি ভিড়। কাছে গিয়ে দেখলেন ভিড়ের লোকজন বালকটিরই সহপাঠী হবে। তারা নানা কায়দায় হাসি ঠাট্টা করছে। লক্ষ্য বালকটি নয়। লক্ষ্য একটি অদ্ভুত সাইকেল। 

তাকে দেখে সবাই থেমে গেল। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে সাইকেলটি দেখতে দেখতে বালকটিকে শুধালেন, এই সাইকেলটির বিশেষত্ব কী বাবা? 

বালকটি বলার আগেই তার সহপাঠিদের কে একজন বলে উঠল, সাইকেলটি অতি হাবা। 

বালকটি এবার মরমে মরে গেল। কিছু বলার ইচ্ছে থাকলেও সেটা দমে গেল। বদলে তার চোখে জল এসে পড়ে পড়ে অবস্থা। 

সাংবাদিক মোজাম্মেল হক মুন্নার মনে হলো বালকটির ক্লেশ একটু লঘু করা দরকার। এই হেতু খুব গুরুত্ব দিয়ে সাইকেলটিকে দেখতে লাগলেন। একটু হাত বুলিয়েও দিলেন। ঠিক তখনই নজরে পড়ল, সাইকেলটির রডে খুব অস্পষ্ট করে কিছু লেখা আছে। সহজে বোঝা যায় না। 

তিনি বালকটিকে জিজ্ঞেস করলেন এই সাইকেলটি কোথায় পাইছো বাবা? 

বালকটি এই প্রশ্নের উত্তর সহসা দিল না। একটু চুপ করে থাকল। এর উত্তর দিতে তার ইচ্ছে নেই। তবে তার সহপাঠিদের একজন উত্তর দিল, এই হাবা সাইকেলটা মাটির নিচে পাইছে। 

শুনে মুন্না বালকটির দিকে তাকিয়ে আস্তে করে শুধালেন, সত্যি? 

মাথা নাড়ল সে। মুখে কিছু বলল না। কিন্তু সহপাঠি বন্ধুটি বলল, ঝড়ের দিন মাটি ঠেইল্যা উইঠ্যা আইছে সাইকেল। 

তারপর একটু কৌতুক করে শোনালো-- 

মাটির নিচ থেকে কেউ পায় সোনার মাইট। 
আর আমাগো নীলু পাইছে সাইকেলের গাইট। 
এই সাইকেল চইড়া সে চান্দে যাইট। 

ছেলেপেলেরা যতই কৌতুক পাক না কেন, মোজাম্মেল হক মুন্না এর মধ্যে কিছু রহস্য পেলো। তিনি একটা রিপোর্ট লিখলেন— 


মৃত্তিকা হইতে অত্যাশ্চার্য দ্বিচক্রযানের উত্থান 
৫ জানুয়ারি, রোববার ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ। 

অত্র জেলাস্থ খাটরার স্থানীয় একটি বসতবাটির মৃত্তিকা গর্ভস্থ হইতে একটি দ্বিচক্রযান উত্থিত হইয়াছে। দ্বিচক্রযানটির সর্বদেহে জবরজং লাগানো রহিয়াছে। তাহা নিজ হইতে দাঁড়াইবার উপযুক্ত নহে বলিয়া স্থানীয় হাই স্কুলের একটি প্রতিভাবান বিদ্যার্থী বংশশলাকা দিয়া উহার কাঠামো প্রদান করিয়াছে। উহার চক্র রহিয়াছে। কিন্তু তাহা বর্তনক্ষম নহে। কেহ কেহ মনে করিতেছেন উহা পৃথিবীর প্রাচীনতম দ্বিচক্রযান। কেহ কেহ মনে করিতেছেন উহা এ জগতের নির্মিত বাহন নহে-- উহা দূর কোনো গ্রহান্তর হইতে পতিত হইয়াছে। 

তবে বালকটির যেভাবে যন্ত্রাংশসমূহকে বংশশলাকা যোগে দ্বচক্রযানটির প্রকৃত কাঠামো প্রদান করিতে সক্ষম হইয়াছে তাহাতে উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে পারিলে দেশ আগামীতে একজন দক্ষ প্রকৌশলী পাইবে বলিয়া অভিজ্ঞ মহলের অভিমত। 

জেলাস্থ কৃষি শিল্প বানিজ্য মেলায় উক্ত দ্বিচক্রযানটি প্রদর্শিত হইয়াছে। তাহা দেখিয়া পক্ষীকুজনসমৃদ্ধ এলাকার জনমনে ব্যাপক কৌতুক সৃষ্টি করিয়াছে। 

রিপোর্টটি পড়ে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মফস্বল বিভাগের সম্পাদক উচ্চস্বরে হাসলেন। ডেকে ডেকে তার সহকর্মীদের পড়ে শোনালেন। তারপর মোজাম্মেল হক মুন্নাকে ফোন করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী লিখেছেন? 

বেশ হাসি হাসি গলায় মুন্না উত্তর দিলেন, কেনো স্যার সংবাদ প্রতিবেদন। বেশ আকর্ষণীয় এবং অনুসন্ধানমূলক। 

শুনে সম্পাদক বেশ গম্ভীর গলায় বললেন, পুরোটাই গাজাখুরি গল্প। এর মধ্যে মধ্যে অনুসন্ধানটা আসে কী করে! 

এবারে ভেঙে পড়লেন মুন্না। তিনি বললেন, স্যার, এটা গাজাখুরি নয়। এর মধ্যে বস্তু আছে। 

মফস্বল সম্পাদক সাহেব আর কথা বলবেন না। তার সময় নষ্ট হচ্ছে। ফোন রেখে দেওয়ার সময় শুধু বললেন, আপনি আমাদের পুরনো মানুষ। আপনাকে আমরা বরখাস্ত করতে চাই না। আপনি নিজেই রেজিগনেশন করেন। আমাদের আর চলছে না। 

কিছুক্ষণ থম ধরে রইলেন মুন্না। তার লেখা রিপোর্টটি তিনি আবার পড়লেন। পড়ে তার অস্বাভাবিক মনে হয়নি। মনে হয়েছে এর মধ্যে গভীর তথ্য আছে যা মফস্বল সম্পাদক ধরতে পারেননি। সেটা ধরতে পারলে এ যাবত কালের মধ্যে প্রকাশিত খবরের মধ্যে এটাই শ্রেষ্ঠ বস্তুনিষ্ঠ আর অনুসন্ধানী খবর হবে তাতে কোনো ভুল নেই। হয়তো মুন্না নিজেও তার পুরোটা আবিষ্কার করতে পারেননি। 

পরদিন নীলুদের বাড়িতে গেলেন মুন্না। সাইকেলটিকে আবার গভীর করে পর্যবেক্ষণ করলেন। রডের উপর আরো কিছু শব্দ গুপ্ত আছে বলে তার মনে হলো। তিনি ঘষে ঘষে শব্দগুলো বের করলেন। লেখার উপরে হাত বুলিয়ে শব্দগুলো উদ্ধার করলেন। লেখা আছে-- 


POSTAL SERVICE OF INDIA, 946. 


বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলেন নীলুদের বাড়ির অতীতে কেউ চাকরি করেনি। এখনো করে না। এই তথ্য থেকে তিনি নিশ্চিত হলেন সাইকেলটি এ বাড়ির কারো নয়। তাহলে কিভাবে এই সাইকেলটি এ বাড়িতে এলো? 

মুন্না ভেবেছিলেন এটা দিয়েই রিপোর্ট শেষ করবেন। তবে মনে হলো তার আরেকটু অনুসন্ধান করা দরকার। 

স্থানীয় পোস্ট অফিসে গেলেন। পোস্ট মাস্টার সাহেব বেশ করিতকর্মা লোক। মোজাম্মেল হক মুন্নার ব্যাপারে তার বেশ জানা আছে। তিনি তাকে বেশি পাত্তা দিলেন না। চা নাস্তা খাইয়ে বিদায় করে দিলেন। বললেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে বৃটিশ আমলের নথিপত্র তাদের কাছে নেই। বৃটিশরা সেগুলো নিয়ে গেছে। তা ছাড়া-- 

--তাছাড়া এই এলাকাটি বিল অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় সেকালে সাইকেল চালানোর মতো রাস্তাঘাট ছিল না। এজন্য ডাক বিভাগের কারো সাইকেল থাকার কথা নয়। 

এরপর আর কথা নেই। 

মুন্না রিপোর্টটি আবার নতুন করে লিখলেন। 

হেডলাইন দিলেন-- 


বৃটিশ আমলের দ্বিচক্রচান উদ্ধার 
৫ জানুয়ারি, রোববার ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ। 

অত্র জেলাস্থ খাটরার স্থানীয় একটি বসতবাটির মৃত্তিকা গর্ভস্থ হইতে একটি দ্বিচক্রযান উত্থিত হইয়াছে। উহার গায়ে পোস্টাল সার্ভিস অফ ইন্ডিয়া লেখা রহিয়াছে। সঙ্গে ৯৪৬। এই সংখ্যাটিও রহস্য জনক। এই সংখ্যাটি ৭৮৬ হইলে আল্লাহ মহান বোঝাইতো। কিন্তু হিন্দু প্রধান ইন্ডিয়াতে আল্লাহু হু আকবর লেখা থাকিবার কথা নহে। এমন কি বৃটিশ ইন্ডিয়াতেও সংখ্যাটি এভাবে প্রকাশ্যে ব্যবহার করিবার প্রচলন ছিল না। 

দ্বিচক্রযানটির সর্বদেহে জবরজং লাগানো রহিয়াছে। তাহা নিজ হইতে দাঁড়াইবার উপযুক্ত নহে বলিয়া স্থানীয় হাই স্কুলের একটি প্রতিভাবান বিদ্যার্থী বংশশলাকা দিয়া উহার কাঠামো প্রদান করিয়াছে। উহার চক্র রহিয়াছে। কিন্তু তাহা বর্তনক্ষম নহে। কেহ কেহ মনে করিতেছেন উহা পৃথিবীর প্রাচীনতম দ্বিচক্রযান। রেড ইন্ডিয়ানদেরও হইতে পারে বলিয়া কাহারো কাহারো অনুমান। ৯৪৬ হয়তো রেড ইন্ডিয়ানদের কোনো আধি দৈবিক চিহ্ন হইতে পারে। অথবা ৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ বা খ্রিস্টপূর্ব ৯৪৬ সালের উল্লেখ বিবেচনা করা যাইতে পারে। যদি এটা নির্মাণকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলে উহা হইবে একটি ঐতিহাসিক ভ্রান্তি। কারণ উক্তকালে দ্বিচক্রযান নির্মাণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। 

জেলাস্থ কৃষি শিল্প বানিজ্য মেলায় উক্ত দ্বিচক্রযানটি প্রদর্শিত হইয়াছে। তাহা দেখিয়া পক্ষীকুজনসমৃদ্ধ এলাকার জনমনে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করিয়াছে। 

এইটুকু লিখে তার মনে হলো লেখাটি পাঠানোর আগে আরেকটু গবেষণা করা দরকার। স্থানীয় করোনেশন লাইব্রেরীতে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা খুলে বাইসাইকেল ভুক্তি পড়ে দেখলেন। সেখানে লেখা রয়েছে-- 

১৮১৭ সালে জার্মানীতে প্রথম দু চাকা বিশিষ্ট দ্বিচক্রযান আবিষ্কারের খবর পাওয়া যায়। এর পরের বছরে নির্মাণ করা ফ্রান্সে। ১৮৩৯ সালে আধুনিক দ্বিচক্রযান নির্মাণ করেন স্কটল্যান্ডের কির্ক পাট্রিক ম্যাকমিলান নামে এক ব্যক্তি। তবে সে সাইকেলে প্যাডেল যুক্ত ছিল না। ১৮৬৩ সালে প্যারিসে প্রথম প্যাডেলযুক্ত দ্বিচক্রযান নির্মাণ করা হয়। একে অভিহিত করা হয় সেফটি বাইসাইকেল নামে। 

বৃটিশ আমলে প্রথম দ্বিচক্রযান দেখা গেছে ১৮৯০ সালে। কোনো এক বৃটিশ সাহেব এনেছিল। 

তবে ১৯০৫ সালে দ্বিচক্রযান আমদানী করা শুরু হয়। ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় পাঁচজন পাঁচটি দ্বিচক্রযান আমদানী করেন। এদের একজন পাদ্রি। দুজন মিলিটারি অফিসার। আর দুজন ব্যবসায়ী। গভর্নের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সড়কে দিনে মাত্র ১ ঘণ্টা চালানোর সুযোগ পেয়েছিল তারা। দূর দূরান্তের লোকজন এই দ্বিচক্রযানটি দেখতে আসত। এই উপলক্ষে ঐ এলাকায় দীর্ঘদিন ব্যাপী মেলা বসেছিল। কিন্তু বৃটিশ বাংলায় কবে কখন এই যানটি এসেছিল সে ধরনের কোনো তথ্য নেই। থাকলে মুন্নার রিপোর্টি আরো জোরালো হতো। যদি কখনো পাওয়া তবে তা যুক্ত করে দেবেন। 

মফস্বল সম্পাদক রিপোর্টটি পড়ে গলাটি কঠিন করে বললেন, মুন্না সাহেব আপনি দেখছি বাইসাইকেল নিয়ে স্কুলের গরুর রচনা লিখছেন। এটা দিয়ে আমরা কী করব? 

একটু কাচুমাচু করে তিনি উত্তর করলেন, আমি তো এটা করতে অনেক অনুসন্ধান করেছি। 

এবারে হাসলেন সম্পাদক। বললেন, সেটা তো দেখতে পাচ্ছি। আপনি অনেক খেটেছেন। আমাদের দরকার জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। 

--এটার মধ্যে সেটা নাই? 

--নেই সেটা বলব না। আছে। তবে সেটাকে আপনি হাইলাইট করতে পারেননি। 

--কোনটা স্যার? 

ঠাণ্ডা গলায় মফস্বল সম্পাদিলক উত্তর দিলেন-- পোস্টাল সার্ভিস অফ ইন্ডিয়া। 

এবারে একটু জানে পানি পেলেন মুন্না। বললেন সেটা আমি লিখেছি। 

-- সেটা দেখেই তো আমি বলছি। প্রশ্ন হলো পোস্টাল সার্ভিস অফ ইন্ডিয়া ছিল ১৯৪৭ এর আগে। এরপরে পোস্টাল সার্ভিস অফ পাকিস্তান হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। যে বাইকেলটি পাওয়া গেছে তা বৃটিশ আমলের। খেয়াল করে দেখুন, লেখা আছে-- POSTAL SERVICE OF INDIA, 946. এই 946 সংখ্যার আগে একটা 1 লাগিয়ে দেখুন। কী হয়? ১৯৪৬। অর্থাৎ এটা ১৯৪৬ সালের সাইকেল। কোনো সুরা বা রেড ইন্ডিয়ানদের ব্যাপার নয়। 

মোজাম্মেল হক মুন্না মাথা নাড়লেন। কী সহজ করে সংখ্যার রহস্য মিটিয়ে দিলেন মফস্বল সম্পাদক। বেচারার এলেম আছে। 

মফস্বল সম্পাদক ততক্ষণে বলে চলেছেন, বৃটিশ আমলের ডাক বিভাগের বাইসাইকেল মাটির নিচে গেল কী করে? এই দেশে মাটির নিচে যাওয়ার মতো ভূমিকম্প তো কোনোদিন ঘটেনি। অথবা নিজে নিজে ঢুকে পড়েনি। 

শুনে তাজ্জব হলে গেলেন মুন্না। এই প্রশ্নটি তার মাথায় আসেনি। শুধালেন, তাইলে কী করি? 

-- আপনি কি গর্তটি দেখেছিলেন? 

-- না। 

-- গর্তে পাওয়া গেল। কিন্তু গর্তটি আপনি দেখলেন না। তাইলে কী অনুসন্ধান করলেন? 

মুন্না শুনে চুপ করে রইলেন। লজ্জিত হয়ে উত্তর দিলেন, ভুল হয়ে গেছে। 

-- গর্তের মধ্যে সাইকেলটি কিভাবে ছিল সেটাও তো জানা দরকার ছিল। 

আর কোনো কথা নেই। মোজাম্মেল হক মুন্না পরদিন নীলুদের বাড়ি গেলেন। গর্তটি দেখতে চাইলেন। বছর খানেক আগের কথা। গর্তটি সেই সময়ই ভরাট করে ফেলা হয়েছিল। তবে নীলু তাকে তাদের গোয়াল ঘরে নিয়ে গেল। গরুর খৈল রাখার জন্য একটি বস্তা ব্যবহার করা হয়। বস্তাটি দেখিয়ে বলল, এই বস্তার মধ্যে সাইকেলটিকে ভাঙ্গাচোরা অবস্থায় পেয়েছিলাম। 

বস্তাটি ভালো করে খেয়াল করলেন। খুব টেকসই বস্তা। মাটির নিচে থাকার পড়েও সেটা নষ্ট হয়নি। ওয়াটার প্রুফ। জল দিয়ে বস্তাটি ধুলেন। দেখতে পেলেন বস্তাটির গায়ে লেখা আছে দি পোস্টাল সার্ভিস অফ ইন্ডিয়া। একজন ডাকহরকরা কাঁধে বস্তা আর হাতে লম্বা লাঠি ছুটে চলছে এই ধরনের একটি ছবিও আঁকা আছে। এটা ডাকহরকর ব্যাগ। এই ব্যাগে চিঠি ভরে নিয়ে যায়। 

দেখে মোজাম্মেল হক মুন্না নীলুকে জিজ্ঞেস করলেন, এই ব্যাগের মধ্যে কোনো কাগজপত্র বা চিঠিপত্র ছিল? 

--না। মাথা নাড়ল নীলু। 

তবে এদিন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা গেল। সেটা হলো, সাইকেল গায়ে খুব অস্পষ্টভাবে লেখা আছে র‍্যালে। 

এরপর আর কোনো তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তিনি তার রিপোর্টে উল্লেখ করলেন, দ্বিচক্রযানটি ডাক ব্যাগের মধ্যে পাওয়া যায়। ডাক ব্যাগটি কোনো ডাকহরকার ব্যবহার করিতেন। তাহার নাম পাওয়া যায় না। 


৪. 

রিপোর্টটি পাঠানোর আগে তার মনে হলো আরেকটু খোঁজ খবর নেওয়া যেতে পারে। এবার শহরের সবচেয়ে প্রবীণ লোকের কাছে কথা বলবেন। এ শহরে সবচেয়ে প্রবীণ লোক আড়পাড়ার লালমিয়া। তিনি খুব প্রতাপশালী ছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনের হাত ধরে মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। পরে মিলিটারি শাসক আইয়ুব খাঁর সঙ্গে ছিলেন। একাত্তরে আরেক জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গও ছাড়তে পারেননি। এখন বেশ বুড়ো হয়েছেন। স্থানীয় পাথুরে কালীবাড়ির সামনে লোলিত কবিরাজের দোকানে বসে থাকেন। আর পান খান। 

এই লালমিয়াই বললেন, তিনি এ শহরের সবচেয়ে প্রবীণ নন। সবচেয়ে প্রবীণ হলেন অমৃতলাল রবিদাস। 

এইনামে এ শহরে কেউ নেই। ফলে মোজাম্মেল হক মুন্না জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কে? 

লালমিয়া পানের পিক ফেলে হাসলেন। বললেন, তাকে তুমিও চেনো সাংবাদিক। তবে তাকে অমৃতলাল রবিদাস দাস নামে চেনো না। তাকে অমৃত মুচি নামে। 

বেচারা এক সময় চৌরঙ্গীতে জুতা সেলাই করত। তার মতো কতে জুতা পালিশও কেউ করতে পারত না। এখানে যেবার হ্যামিলটন সাহেব এসেছিলেন তখন অমৃত মুচিই তার জুতো পালিশ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। হ্যামিলটন সাহেব জুতো পরবেন কি, জুতার গায়ে তার চেহারা দেখেই মজে গেলেন। বললেন, ওহে অমৃট, টোমাকে স্যার উপাঢি ডিটে বড় লাটের কাছে পট্র লিখিবো। 

সেই অমৃত মুচির সন্ধান পাওয়া গেল। বেচারা এখন চৌরঙ্গীতে বসে না। সেখানে বসে তার ছেলে বাগান মুচি। বাগানেরও চুল দাড়ি পেকে গেছে। বলল, বাবা তো বাড়িতেও থাকে না। বলে দম বন্ধ হয়ে আসে। ঠিক কোথায় থাকে জানা যায় না। পাঁচুড়িয়ার বটতলায় মাঝে মাঝে বসে। আমার কাছ থেকে নিয়ে পুরনো জুতা সেলাই করে। 

সেদিন মোজাম্মেল হক মুন্নার কপাল ভালো। বটতলার পাশে বৈরাগীর খালে ঝুঁকে বসেছিল অমৃত মুচি। খুব জীর্ণ শরীর। মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে। এমনভাবে জলের দিকে ঝুঁকে বসে আছে যে একটু হলেও খালে পড়ে যেতে পারে। পড়লে আর উঠতে পারবে না। শরীরে সে রকম জোর তার নেই। 

মোজাম্মেল হক মুন্নাকে দেখে অমৃত মুচি এক গাল হেসে বললেন, বাবা হে, আমি পড়বো না। চিন্তা কইরো না। জলে ঝুঁকে দেখতেছি বয়স কতো হইছে। 

শুনে মুন্না তাকে শুধালো, আপনার বয়স কত হইছে? 

-- সেইটা তো আমারও প্রশ্ন। তবে, যেবার মেদিনীপুরের ক্ষুদিরামকে ফাঁসিতে লটকানো হয় সেবার আমি মুঙ্গের থেকে এই এলাকায় এসে পড়ি। তখন আমার যুবক বয়স। এলাকার কেউ জুতা পরে না। শুধু রেভারেন্ড মথুরানাথ বসু মশাই পরেন। আর পরেন ওয়ালকট সাহেব। মথুরানাথ বাবুই ভরসা দিয়ে বলেছিলেন, চিন্তা করিস না অমৃত, একদিন এই এলাকায় জুতা ছাড়া লোক পাবি না। 

মুন্না হিসেব করে দেখেন, সেটা ১৯০৮ সাল। এপ্রিল মাসে ক্ষুদিরাম সাহেবদের গায়ে বোমা ফেলল। এক মাসের মধ্যে বিচার শেষ হলো। 

অমৃত মুচি বলেন, বুঝলেন কিনা, ছেলেটা হাসি হাসি করে ফাঁসিতে চড়ে বসল। সারা দেশ কেঁদে মরে, কিন্তু তার চোখে জল নাই। 

বলে খুন খুন গলায় গানও ধরলেন, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। 

গান শুনে মনে হলো এককালে গলায় সুর ছিল। জলের উপর দিয়ে যেন অমৃত মুচি সব দেখতে পাচ্ছেন। দেখে দেখে বলছেন-- এরপরের বছরই এই টাউনে নদী দেষ্টে গোলপাতার ঘরে সুরেশ সেন বাবু এসডিও হলেন। তার পূবে লম্বা গোলপাতার ঘরে কোর্ট বসল। আরেকদিকে সাবরেজিস্ট্রি অফিস। কোর্টে উকিল নাই। সব মহুরী বাবুরা মামলা লড়ে। আর ঘোড়ায় চড়ে বেনেডিক্ট সাহেব বিচার করেন। বেনেডিক্ট সাহেব এইখানে আসার আগে বায়না ধরেছিলেন তার জুতা পালিশ করার মতো উপযুক্ত মুচি পেলেই এই টাউনে আসবেন। এই কথা শুনে মথুর বাবুই আমাকে নিয়ে এলেন। 

তখন তো এলাকায় নৌকা ছাড়া গতি নাই। চলার মতো রাস্তাঘাট সেভাবে নাই। পালকি চলে। ঘোড়ায় চড়ে দুএকজন। 

এই পর্যন্ত শুনে মুন্না অমৃত মুচিকে জিজ্ঞেস করে বসল, সাইকেল ছিল না? 

-- সাইকেল! হা হা করে হাসলেন। মাটির রাস্তা। সাইকেল তো তখনো খোদ কোলকাতায় দুএকটা আসতে করছে। সেটা দেখতে আবার লোকে দলে দলে আসতে লেগেছে। আর এইখানে পাড়াগাঁড়ে সাইকেল আসে কোত্থেকে! 

বলে আবার জলের দিকে তাকালেন অমৃত মুচি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, দেশে মানুষের অভাব। এর মধ্যে সতীশবাবুর দোতলা বিল্ডিং উঠে পড়েছে। তার ছোট ভাই বিধুবাবু তখন কোলকাতা থেকে চলে এসেছেন। খোল করতাল বাজিয়ে গান করছেন, ভয় কি মরনে, রাখিবে সন্তানে। তার ইচ্ছা একটা সাইকেল কেনার। কিন্তু কেনার টাকা নাই। সংসারের সব খরচ সব চালান তার মেজোদাদা সতীশচন্দ্র। তিনি সাইকেল কিনে দিতে চান না। তার এই ছোট ভাইটির কোনো দায় দায়িত্ব নেই। কোথায় থাকে কী করে তার ঠিক নেই। বাবুদের সঙ্গে বৃটিশ খেদাও করে বেড়ায়। 

এইটুকু বলে একটু দম নেন অমৃত মুচি। এক আজলা জল তুলে চোখে মুখে দেন। তারপর গামছা দিয়ে মোছেন। এই ফাঁকে মুন্না তাকে প্রশ্ন করেন, সেইটা কোন সালের ঘটনা? 

--সেটা তো ঠিক করে মনে নেই। বয়েস হইছে। তবে একটা গান মনে আছে। বলে গুণ গুণ করে গাইলেন-- 

সা রে গা মা পাদানি। 
বোম ফেলেছে জাপানি।। 
বোমের মধ্যে কেউটা সাপ 
বৃটিশ বলে বাপরে বাপ। 

এইটুকু বলে অমৃত মুচি বললেন এইবার হিসাব করে নেন এইটা কোন সাল। 

মুন্নার হিসাব কষতে দেরি হলো না। সেটা ১৯৪৫ সাল। হাতি বাগানে বোমা পড়েছে। লোকজন কোলকাতা ছেড়ে গ্রামে পালাচ্ছে। এর চেয়েও বড়ো বোমা পড়েছে জাপানে। হিটলার আত্মহত্যা করেছে। যুদ্ধ থেমে গেছে। তখনো অভাব কাটতে শুরুর লক্ষ্মণ জেগেছে। 

শুনে হে হে হে করে হাসলেন অমৃত। বললেন, এইবার বুঝছেন। সেইকালে বিজয় সাহা কোলকাতায় ফ্যামিলি পাঠায় দিছেন। কন্টাকটর খাটরার সতীশ রায় বিজয় সাহার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দোতলা বাড়ি গড়ছেন। আর রানী ভিক্টোরিয়া খবর দিছেন, আর দেরী করা যাবে না। বাংলায় নির্বাচন হবে। সবাই গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করছে। জিন্না সাব দাবী তুলছেন, মুসলমানে লাইগা আলাদা দেশ চাই। হিন্দু গো লগে আর না। 

মুশকিল হলো সতীশ রায়দের। তারা নমোশুদ্র। বাড়িতে কালিপুজা হয়। বরিশালের যোগেন মণ্ডল তখন বঙ্গীয় আইনসভার মেম্বর। মুসলিম লীগের সঙ্গে খুব খায়খাতির। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, নমোশুদ্ররা যতোটা না হিন্দু তার চেয়ে অনেক বেশি মুসলমানদের সঙ্গে ঘনিষ্ট। ফলে যে ব্রাহ্মণ কায়স্তরা নমোশুদ্রদের ঘৃণা করে তাদের দল কংগ্রেসের সঙ্গে তারা যেতে পারে না। মুসলিম লীগ যোগেন মণ্ডলকে মন্ত্রী বানিয়েছে। ছয় চল্লিশ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়েছে। যোগেন মণ্ডলও মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গড়তে চায়। 

কিন্তু ওড়াকান্দীর পিয়ার ঠাকুর যোগেন মণ্ডলের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না। তিনি নমোশুদ্রদের গুরু গুরুচান্দ ঠাকুরের ছেলে। বিলেত থেকে পাশ করা ব্যারিস্টার। তার ব্যাপারই আলাদা। তিনি বললেন, মুসলিম লীগকে বিশ্বাস করা যায় না। উর্দুভাষী ধনী মুসলমানরা মুসলিম লীগের নেতা। তারা যে দেশ গড়তে চায় সেখানে মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো জাতি সম্প্রদায়ের বাস করার সুযোগ নেই। মুসলিম লীগের চেয়ে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ভালো। তারা চাষা হিন্দু চাষা মুসলমানদেরকে এক নজরে দেখে। কিন্তু কৃষকপ্রজা পার্টির হাল খারাপ। সেজন্য মুসলিম লীগের চেয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে থাকাটাই নমোশুদ্রদের জন্য লাভজনক। 

মোজাম্মেল হক মুন্না এই ইতিহাস শুনতে আসেননি। তিনি এসেছেন সাইকেলের তল্লাশে। তার মনে হলো অমৃত মুচি সাইকেলের কথা ভুলে গেছেন। বললেন, সাইকেলের কথা কন। সময় কম। 

অমৃত মুচি একটু হাসলেন। বললেন, ধৈর্য রাখো বাবাজী। যোগেন মন্ডল, পিয়ার ঠাকুরের সঙ্গে সাইকেলের ব্যাপার আছে। 

তিনি একটু স্থির হয়ে আবার বলতে শুরু করলেন। পিয়ার ঠাকুরের কথায় যোগেন মণ্ডল ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি জানেন, কংগ্রেসের সঙ্গে গেলে তার মন্ত্রী হওয়াটা কঠিন। আবার নমোশুদ্ররা তার পেছন থেকে সরে গেলে মুসলিম লীগও তাকে পাত্তা দেবে না। তার মন্ত্রী থাকার খায়েস শেষ। যে কোনোভাবেই হোক না কেনো মতুয়াদের সমর্থন তার চাই। সেজন্য তিনি মতুয়াদের তীর্থ ক্ষেত্রে ওড়াকান্দীর কাছে গোপালগঞ্জে বঙ্গীয় সিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের কনভেনশন ডাকলেন। প্রচার করলেন অল ইন্ডিয়া সিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের সভাপতি বাবাসাহেব ড: আম্বেদ কর এই সভা উদ্বোধন করবেন। যোগেন মণ্ডল তার অনুসারী। 

সেটা ছিল ১৯৪৬ সালের চৈত্র মাস। বারুণীর দিন কনভেনশন। মতুয়ারা লাল নিশান হাতে ছুটছে ওড়াকান্দির দিকে। এখানে কয়েক লাখ নমোশুদ্র আসে। এরাই যোগেন মণ্ডলের টার্গেট। 

কনভেনশন উপলক্ষে ছোট্ট শহরটি সরগরম হয়ে উঠেছে। অবিভক্ত বাংলা থেকে সিডিউল কাস্টের প্রতিনিধিরা আসতে শুরু করেছেন। মধুমতী নদীর পাড়ে প্যান্ডেল করা হয়েছে। সিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের সভাপতি বাবাসাহেব ড: আম্বেদ কর কোলকাতা থেকে স্টিমারে করে আসবেন খুলনা হয়ে। তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে খাটরার সতীশ রায়ের বাড়িতে। সতীশ রায় পাট চাষ করে স্বচ্ছল হয়েছেন। তারপর এ শহরে যখন ইটের রাস্তা হলো আর নদীর পাড়ে হলো কোর্ট বিল্ডিং -- তখন এক ইংরেজ সাহেবের বদান্যতায় সে কাজের কন্টাক্টরি করে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। নমোশুদ্রদের মধ্যে তিনিই প্রথম গড়েছেন ইটের দোতলা বাড়ি। তিনি এখন বাবু। তার ইচ্ছে আছে, বঙ্গীয় আইন সভায় এমএলএ পদে নির্বাচন করবেন। তার বাড়িতে অবস্থানকালে তিনি আম্বেদ করের কাছে ইচ্ছেটা নিবেদন করবেন। এই কারণে সতীশ রায় কনভেনশন সফল করতে বিস্তর খরচপাতি করছেন। 

যোগেন মণ্ডল আগেই এসে পড়েছেন। ৩১ জন সিডিউল কাস্ট এমপি আসবেন। পিয়ার ঠাকুর কলকাতা থেকে এসে নৌকাযোগে ওড়াকান্দির গদিঘরে অবস্থান নিয়েছেন। গোপালগঞ্জে আসার ব্যাপারে তার কোনও নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না। তাকে ছাড়া এই কনভেনশন সফল হবে না। মতুয়ারা যোগেন মণ্ডলের বিপক্ষে চলে যাবে। 

মতুয়াদের ছাড়া পূর্ববঙ্গের সিডিউল কাস্ট ফেডারেশন দূর্বল। মুসলিম লীগের সঙ্গে নির্বাচনী আঁতাত গড়ার প্রশ্নে পিয়ার ঠাকুরের ভিন্ন অবস্থান থাকলেও যোগেন মণ্ডল মনে করছেন, তিনি বক্তৃতা দিয়ে মতুয়া নমোশুদ্রদের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হবেন। সবাই জানে, বক্তা হিসেবে যোগেন মণ্ডলের তুলনা নেই। তা ছাড়া আম্বেদ করের উপস্থিতিও কাজে লাগবে। 

কনভেনশনের আগের রাতের মধ্যে যোগেন মণ্ডল খবর পেলেন, ৩১ জন নমোশুদ্র এমএলের মধ্যে ২৮ জনই অনুপস্থিত থাকছেন। কোলকাতা থেকে আম্বেদকর ফিরে গেছেন। মতুয়ারা এসব রাজনীতি বোঝে না। তারা পিয়ার ঠাকুরের দিকে চেয়ে আছে। তারা জানে, কংগ্রেসের বাবুরা তাদেরকে পাথুরে কালিবাড়িতে ঢুকতে দেয় না। আর মিয়া চৌধুরীরাও তাদেরকে চাপে রাখে। বলে, হ্যাগো ছাইড়া আমাগো লগে আইসা পড়ো। তোমাগো আমরা মাথায় কইরা রাখব। আমাগো জাত বেজাত নাই। 

কনভেনশনে সিডিউল কাস্টের বঙ্গীয় আইন পরিষদের৩১ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৩ জন যোগ দিতে এসেছেন। । বাকিরা মুসলিম লীগের সঙ্গে ঐক্য গড়তে রাজী নন। ফলে সিডিউল কাস্ট আন্দোলনে বিভাজন ঠেকানো যাবে না। এই বুঝেই যোগেন মণ্ডলের গুরু আম্বেদ কর এলেন না। 

যোগেন মণ্ডল একটু দিশাহারা হয়ে গেছেন। এখন পিয়ার ঠাকুরই ভরসা। তিনি না এলে এই কনভেনশনই ফেল করবে। তাকে দিয়েই সভাপতিত্ব করাতে হবে। তাকে যে কোনোভাবেই হোক রাজী করিয়ে নমোশুদ্রদের মধ্যে ঐক্যটা রক্ষা করতে হবে। 

গভীর রাতে মুসলিম লীগের লাল মিয়া সতীশ রায়ের দরোজায় ধাক্কা দিলেন। বললেন, কনভেনশন কি হইতেছে বাবু? 

সতীশ বাবু ভ্রু কুচকে শুধালেন, কেন হবে না। সব তো রেডি। সকাল সকালই শুরু হবে। 

লাল মিয়া বললেন, আপনেগো আম্বেদ কর সাব কই? 

-- তিনি আসতেছেন। ভোর রাতে স্টিমারে নামবেন। 

-- না। তিনি আসবেন না। লাল মিয়া জানালেন, কোলকাতা থেকে শামসুদ্দিন খাঁ সাবে খবর দিছেন, ২৮ জন এমপি আসবে না শুনে আম্বেদ করকোলকাতা স্টিমার ঘাটা থেকে কোলকাতায় ফেরত গেছেন। 

-- সে কি? 

-- কথা সত্যি। আর-- 

-- আর? 

-- ওড়াকান্দীর পিয়ার ঠাকুরও আসবেন না। 

সতীশ বাবু প্রমাদ গুণলেন। তার মনে হলো, যোগেন মণ্ডলকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। লাল মিয়া তাকে থামালেন। বললেন, বেচারারে ঘুমাইতে দ্যান। পিয়ার ঠাকুরকে আনতে লোক পাঠান। তিনি আসলেই হবে। আসতে হবে অতি প্রত্যুষে। 

এই মধ্যে রাতে কাকে পাঠাবেন ওড়াকান্দী। আর যার তার সঙ্গে পিয়ার ঠাকুর নাও আসতে পারেন। তিনি নিজে যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এভাবে সব রেখে চলে গেলে যোগেন মণ্ডল ভরসা করতে পারবেন না। আর কিছু ভাবতে পারছেন না সতীশবাবু। 

লাল মিয়াই নিদান দিলেন, আমার মাইজা দুলা ভাইয়ের জন্য একখান সাইকেল কিনছি। আপনের ছোটো ভাই বিধু বাবুরে সেই সাইকেল দিয়া পাঠায় দেন। তিনি গান বাজনা করেন। কোলকাতায় যাতায়াত আছে। পিয়ার ঠাকুর তার কথা ফেলতে পারবেন না। 

বিধু বাবুর যেতে আপত্তি নেই। তবে একটা ইচ্ছে করেছেন। সেটা হলো, সাইকেলটা নিয়ে যাবেন বটে। কিন্তু সাইকেলটা তাকে কিনে দিতে হবে। এ এলাকায় নমোশুদ্রদের মধ্যে কারো সাইকেল নেই। কেউ চালাতেও জানে না। বিধুবাবু কোলকাতায় থেকে শিখেছেন। সতীশবাবুর না করার সুযোগ নেই। তিনি কিনে দেওয়ার শর্তেই রাজি হলেন। 

সেদিন বেলা বাড়তে থাকে। লোকজন সম্মেলনস্থল জয় ডংকা বাজিয়ে আসতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি বাড়িতে ঘ্যাট -খিচুড়ি রান্নাবান্না চলছে। নদীর পাড়ে চড়ক ঘুল্লি চলছে। তার কাছে কোটালিপাড়ার হারাধন ম্যাজিসিয়ান ছোট একটি ছেলেকে নিয়ে চাকু ছোড়ার খেলা দেখাচ্ছে। গৌরনদীর লক্ষ্মণ দাস হাতি নিয়ে এসেছেন। তিনি দেখাবেন হাতির খেলা দেখাবেন। লাল মিয়ার নেতৃত্বে মুসলিম লীগের নেতা কর্মীগণ লাল ফেট্টি বেঁধে ভলান্টিয়ারি করছে। শহরের কায়স্ত ব্রাহ্মণরা বেশ কৌতুহল ভরে উঁকি ঝুঁকি মারছে। এর মধ্যে ঋষি, জেলে, তাঁতি, যুগি, ডোম, মুচি সম্প্রদায়ের লোকজন বেশ সেজে গুজে এসেছে। তারা ঘুরে ঘুরে ঢোল বাজিয়ে গান গাইছে, ডিগার ডিগার ঢিক চালিয়ে/ চা রা রা ঢিক চালিয়ে…; 

বেলা বাড়ছে, কিন্তু কনভেনশন শুরু করা যাচ্ছে না। যোগেন মণ্ডলের অনুগতরা মাঠ দখল করে আছে। দূরে মতুয়ারা দোলখোলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পিয়ার ঠাকুর না এলে তারা কনভেনশনে যাবে না। তাদেরকে মাঠে হাজির করানো গেলেও যোগেন মণ্ডল খুব কায়দা করে কথাবার্তা শুরু করতে পারবেন। তার বাগ্মীতার প্রশংসা আছে। একবার বলার সুযোগ পেলে শ্রোতাদের মন্ত্র মুগ্ধ করে ছাড়েন। তারপর যা বলবেন তাই তারা শুনবে। 

তিনি সবাইকে হাত জোড় করে দোল খোলা থেকে মাঠে যেতে অনুরোধ করছেন। তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। সতীশ রায় বাবু জনে জনে জানাচ্ছেন, ওড়াকান্দী ঠাকুর বাড়ি থেকে পিয়ার ঠাকুর রওনা হয়েছেন। তার আসতে দেরি নেই। মুসলিম লীগের লাল মিয়াও চোঙ্গা ফুঁকিয়ে বলছেন, পিয়ার ঠাকুর না এলেও কনভেনশন হবে। না হলে এলাকার মান থাকবে না। মান রক্ষার জন্য যা করার তারা তাই করতে পিছপা হবে না। 

এতে মতুয়ারা আরো ক্ষেপে গেছে। তারা বলছে, দুপুর নাগাদ তারা দেখবে। এর মধ্যে পিয়ার ঠাকুর না এলে তারা যেভাবে হোক চলে যাবে। 

দুপুর হলেও পিয়ার ঠাকুরের দেখা নেই। বিধু বাবুর সাইকেলের বেল বাজানোরও কোনো আওয়াজ পাওয়া গেল না। মতুয়াদের কেউ কেউ শহর ছেড়ে চলে গেল। আর কেউ কেউ নদীর পার হয়ে অন্য পাড়ে অবস্থান নিল। 

পরিস্থিতি খারাপ দেখে তখন লাল মিয়া যোগেন মণ্ডল বাবুকে ধরলেন, মতুয়াদের দরকার নেই। আপনি কনভেনশন শুরু করেন। 

কিন্তু শুরু করলেই করা যায় না। সভাপতি ছাড়া কনভেনশন করা যায় না। এখন কে সভাপতি হবেন, সেটা নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। পিয়ার ঠাকুরের স্থানে যাকে তাকে সভাপতি করা যায় না। যতীন বাকচির ইচ্ছে আছে টেম্পোরারি সভাপতি হওয়ার। তিনি জমির দালালি করে কিছু টাকা কড়ির মালিক হয়েছেন। বেদগাঁর হারাধন মাঝি গয়না নৌকায় রাখি মালের কারবার শুরু করেছেন। আগে নিলখ্যার খালে খেয়া পারাপার করত। তার পক্ষে কয়েকজন লেঠেল দাঁড়িয়ে গেল। তাদের দাবী যতীন বাকচির চেয়ে হারাধন মাঝির জোর বেশি। মানিকহারের সুরেন মল্লিক যোগেন মণ্ডলকে খুঁজে বের করে বলছেন, পিয়ার ঠাকুরের জায়গায় তাকে সভাপতি না করলে লাশ ফেলে দেবো। তার বংশের লোকজন বরিশালে ডাকাতি করতে যায় শ্রাবণ মাসে। কনভেনশন এলাকায় এই নিয়ে বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যে কোনো সময় কাইজা শুরু হয়ে যেতে পারে। 

এই ফাঁকে অমৃত মুচিকে খুঁজে বের করলেন শহরের কংগ্রেস নেতা বিজয় সাহা। অমৃত মুচির বয়স হয়েছে। হরিজনদের মধ্যে তাকে সবাই মান্য করে। বুদ্ধিসুদ্ধিও আছে। কথা গুছিয়ে বলতে পারে। তার মন খারাপ। মুচিদের গৌরব আম্বেদ কর আসবেন। তিনি এলেন না। তিনি এলে বড় মুখ করে কনভেনশনে অংশ নিতে পারত। কনভেনশন মাঠে মারা যেতে বসেছে। বিজয় সাহা তাকে বললেন, অমৃত, তুমিই এখন এই কনভেনশনকে রক্ষা করতে পারো। 

-- কী করে? অবাক হয়ে শুধালো অমৃত মুচি। 

-- খুব সোজা। হাসলেন বিজয় সাহা। বললেন, তুমি সভাপতি হতে চাও। 

-- তা কী করে সম্ভব বাবু। আমি জাতে মুচি। সবাই আমাকে দিয়ে জুতা সেলাই করে বটে, কিন্তু কেউ তো পোছে না। 

-- নমোশুদ্ররা তোমাদের পুছবে। নইলে তোমরা এদের সঙ্গে সিডিয়্যুল কাস্ট আন্দোলন করছ কেন? 

বিজয় বাবুর কথায় যুক্তি আছে। অমৃত মুচি কনভেনশনের মাঠে ছুটে গেল। সতীশ রায়কে গিয়ে ধরল। বলল, বাবু আপনেরা যখন সভাপতি ঠিক পারতিছেন না, তখন আমারে করেন। 

শুনে সতীশ রায় অবাক হলেন। অবাক হয়ে বললেন, কী কইলে? 

-- পিয়ার ঠাকুর আসার আগ পর্যন্ত আমারে দিয়ে সভাপতির কাজ চালান। 

সতীশ বাবুর মুখে বাক্য নেই। কে একজন পাশ থেকে হো হো করে হেসে উঠল। খুব জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলল, মুচির পোলায় আবার সভাপতি হতে চাইছে! তারপর খুব কষে একটা গালি দিয়ে বলল, তোমারে সভাপতি বানালে কি জাত থাকবে আমাদের!! 

শুনে অমৃত মুচি সতীশ বাবুকে বললেন, আপনি কী কন? 

তিনি কিছু বলবেন না। তিনি ওড়াকান্দীর রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলেন। বললেন, বিধু পিয়ার ঠাকুরকে নিয়া আসছে। তিনিই সভাপতি। 

এই টুকু শুনে মোজাম্মেল হক মুন্না অমৃত মুচিকে জিজ্ঞেস করলেন, পিয়ার ঠাকুরকে নিয়ে বিধু রায় এলেন? 

--এলেন। বলে কিছুক্ষণ চুপ করে গেল অমৃত মুচি। তার হাত কাঁপছে। হাঁটুর পরে হাতটি চেপে ধরে কাঁপা থামাতে চেষ্টা করল। 

-- এলেন? 

-- হ্যাঁ এলেন। সন্ধ্যা পার হয়ে এলেন। ওড়াকান্দীর দিক থেকে নয়। এলেন দক্ষিণ থেকে বাগেরহাটের লাইন ধরে। সাইকেলের ঠুন ঠুন শব্দ শোনা গেল। বাঁশ বাগানের আড়াল থেকে ঝক ঝক করে সাইকেলের সামনের চাকা দেখা গেল। বিধু বাবু প্যাডেল করছেন। আর রডে বসে আছে-- 

--কে?--পিয়ার ঠাকুর? 

-- না। একটি মেয়ে। ডুরে শাড়ি পরা। মাথার আঁচল সরে গেছে। নাকের নোলক জ্যোৎস্নায় ঝিকমিকিয়ে উঠেছে। 

জানা গেল, বিধু বাবু ওড়াকান্দী না গিয়ে চিতলমারি চলে গিয়েছিলেন। গেল বছর কৃষ্ণযাত্রা গাইতে গিয়ে এই মেয়েদের বাড়িতে উঠেছিলেন। আজ সাইকেল পেয়ে তাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। পাটগাতি কালিমন্দিরে মন্ত্র পড়ে বিয়ে করেছেন। 

মোজাম্মেল হক মুন্না জিজ্ঞেস করলেন কনভেনশনের কী হলো? 

-- কে জানে কি হলো! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অমৃত মুচি। সতীশ বাবু রেগে মেগে তার ছোটো ভাই বিধুবাবুকে শহর ছাড়া করলেন। বৌটিকে রেখে দিলেন। হুমকি দিলেন, বিধু এ মুখো হলে তাকে খুন করে ফেলবেন। আর সাইকেলটিকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলে দিলেন। 

এটুকু শুনে মোজাম্মেল হক মুন্না বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। মনে হলো মাটির নিচ থেকে খুঁজে পাওয়া সাইকেলটির হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। শুধালেন, সাইকেলটির নাম কি? 

--ফোনিক্স। 

মনে হলো মুন্না ভুল শুনেছেন। মনে হলো ফোনিক্স নয়-- অমৃত মুচি সাইকেলটির নাম র‍্যালেই বলেছে। র‍্যালে বললে তার অনুসন্ধান কাজটি সফলভাবে শেষ হয়ে যাবে। রিপোর্টটি লিখে ঢাকার লঞ্চে উঠে পড়বেন। হাটখোলার ইত্তেফাক অফিসে গিয়ে নিজের হাতে মফস্বল সম্পাদকের হাতে রিপোর্টটি দেবেন। এটা পড়ে আর আপত্তি করতে পারবেন না তিনি। তার চাকরির ঝামেলা মিটে যাবে। মুন্না গভীর উত্তেজনায় অমৃত মুচির মুখের কাছে কানটি নিয়ে শুধালেন, সাইকেলটির নাম কি? র‍্যালে না?--র‍্যালে? 

অমৃত মুচি নিরাসক্ত গলায় স্পষ্ট গলায় বলল, র‍্যালে না। ফোনিক্স। 

আর কিছু বলবেন না অমৃত মুচি। তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘরের দিকে যেতে লাগলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, এর চেয়ে বেশি জানতে চাইলে লাল মিয়ার কাছে যান। 


৫.

লাল মিয়ার এখন বয়স হয়েছে। মুখভর্তি দাড়ি। সাদা। সারাদিন পান চিবান। আর পথচলতি লোক দেখেন। স্থানীয় পাথুরে কালিবাড়ির সামনে রতন বদ্যির কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে বসে থাকেন। তার জন্য একটি ইজি চেয়ার কিনে রাখা হয়েছে। এখানেই তার দিন কাটে। এখানেই মধ্যাহ্ন ভোজ-- এখানেই দিবানিদ্রা। রাতে শ্রীদাম বদ্যি তাকে বাসায় পৌঁছে দেন। তার স্ত্রী ষোলটি সন্তানের জননী। নাতি পুতিদের নাতি পুতি হয়েছে। এখনো গিন্নিবান্নি করেন। তার একটি গর্ব আছে। সেটা হলো, সামর্থ্য থাকলেও তার স্বামী আর তিনটি বিবাহ করেননি। কোনো মহিলাঘটিত দূর্নাম তার নেই। লড়কে লেঙে পাকিস্তানের জন্য পাল্লা দিয়ে বাবুদের সামনে দাঁপিয়ে বেড়াতেন। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খাঁ তাকে বেসিক ডেমোক্রেসিক আওতায় এমএলএ করেছিলেন। প্রতিমন্ত্রী করবেন বলেছিলেন। তার আগেই দশ বছর শাসন করে আয়ূব খাঁ জনরোষে পড়ে গেলেন। একাত্তরে পাকবাহিনীর সেনাপতি ইয়াহিয়া খাঁও তাকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বানিয়েছিলেন। 

মোজাম্মেল হক মুন্নাকে তিনি বিলক্ষ্মণ চেনেন। তাকে হতে দেখেছেন। তার দাদাজান লাল মিয়ার রইস আদমি ছিলেন। তারও দাদাজানের সঙ্গে হা ডু ডু খেলছেন। মুন্না তার পায়ের কাছে একটি টুলে বসলেন। কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে থাকলেন লালমিয়া। বললেন, ঘটনাটা তো এই কালের নয়রে বাপজান। সেকালে হক সাবের কৃষক প্রজা পার্টির বেইল নাই। জিন্না সাবে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান আওয়াজ দিয়েছেন। নেহেরু সাবে তখনো ইন্ডিয়া ভাগের রাজি হন নাই। রেডক্লিফ সাবে আসেন নাই। 

পোস্টাল সার্ভিস অফ ইন্ডিয়ার ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল আইজি হ্যামিল্টল সাহেব এই এলাকায় সফরে এলেন। তখন বিদায় বেলা। বৃটিশরা পাত্তাড়ি গোটাতে শুরু করেছে। হ্যামিলটন সাহেবে এই বিল এলাকায় আগে কখনো আসেননি। তিনি এই মফস্বল শহরের লাল ইটের ডাক বাড়িটি দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে চান না। তার ইচ্ছে অজ পাড়াগাঁয়ের ডাক কার্যক্রমও সরেজমিনে দেখবেন। 

সেদিন বেশ বৃষ্টিবাদল নেমেছে ভোর থেকে। লোকজন বাইরে বের হবে কম। আয়েস করে ঘুমাবে। হ্যামিলটন ডাকবাংলো থেকে রওনা হলেন এর মধ্যে রেইনকোট পরে। যাবেন উলপুরের দিকে। কিছুদূর তিনি ঘোড়ায় চেপে গেলেন। কিছু দূর হেঁটে। আড়পাড়া এসে দেখতে পেলেন, খালপাড়ের রাস্তা ভেঙ্গে গেছে। সেখান দিয়ে তীব্র স্রোত বইছে। পার হওয়ার মতো নৌকা নেই। এর মধ্যে পার হওয়া বিপজ্জনক। এইপথে রানার ডাক নিয়ে সদরে আসবে। তিনি এখানে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন। ভোর ছটার মধ্যে উলপুরের রানার ব্যাগ নিয়ে আসার কথা। সরকারি ডাক নিয়ে হেলা করা যাবে না। তিনি ঘড়ি ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু রানারের দেখা পাওয়া গেল না। ঘণ্টা দুএক অপেক্ষা করার পরে তিনি মন খারাপ করে পোস্ট অফিসে ফিরে এলেন। দেখলেন, অফিস খোলা হয়েছে। বাইরে পোস্ট মাস্টার তার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাকে খুব হতাশ স্বরে বললেন, তোমাদের স্বাধীনতা দিলেও কোনো উন্নতি হইবে না বাবু! 

পোস্ট মাস্টার ধীরেন্দ্রনাথ মৈত্র অবাক হয়ে শুধালেন, কেনো স্যার? 

হ্যামিলটন সাহেব বাইরে ভেজা পথের দিকে তাকিয়ে বললেন, বৃষ্টি দেখে তোমাদের উলপুরের রানার বাহির হয় নাই। সে বাড়িতে নিশ্চয়ই নাসিকা গর্জন করিয়া ঘুমাইতেছে? ড্যাম অলস। 

ধীরেন্দ্রনাথ মৈত্র এবার হাসলেন। কিছু না বলে রতন রতন বলে হাক ছাড়লেন। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন দশাসই জোয়ান লোক এসে সাহেবকে লম্বা সেলাম ঠুকে বলল, জ্বী হুজুর! 

মৈত্র পরিচয় করিয়ে দিলেন, এই যে রতন, উলপুরের রানার। ভাঙন পার হতে না পেরে মানিকহার গ্রাম দিয়ে ঘুরে এসেছে। সেজন্য ঘণ্টা চারেক বেশি হেঁটেছে জলকাদার মধ্যে দিয়ে। 

হ্যামিলটন সাহেব খুব খুশি হলেন। বললেন, গুড। গুড। 

তিনি উলপুরের রানার রতনকে নিজ হাতে একটি প্রশংসাপত্র লিখে দিলেন। তাকে সদরের পোস্ট অফিসে রানার থেকে প্রমোশন দিয়ে পোস্টম্যান করার আদেশ করলেন। আর কথা দিলেন, কোলকাতায় ফিরে তার জন্য একটি বিশেষ উপহার পাঠাবেন। উপহারটি হলো-- একটি বাই সাইকেল। ব্রিটেনের র‍্যালে কোম্পানীর র‍্যালে সাইকেল। খোদাই করে লেখা-- পোস্টাল সার্ভিস অফ ইন্ডিয়া। 

এইটুকু শুনে মোজাম্মেল হক মুন্না উৎফুল্ল হয়ে বললেন, এই সেই র‍্যালে সাইকেল! 

লাল মিয়া একটু স্বরে বললেন, হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। 

--এরকম কেনো বলছেন? 

--শোনো বাবা। লাল মিয়া বললেন, রতন রায়বাড়ির লোক না। তার সাইকেল রায়বাড়ির মাটির নিচে যাবে ক্যান? 

এই প্রশ্নে মোজাম্মেল হক মুন্না হা হয়ে গেলেন। প্রশ্নটিতে যুক্তি আছে। এর উত্তর সহসা তার মাথায় আসছে না। 

লাল মিয়ার তখন কথায় পেয়েছে। তিনি চোখ বুঁজে বলতে লাগলেন-- 

সাইকেলটি পেয়ে রতন খুব খুশি। এলাকায় তার বেশ নাম হয়েছে। সে চালাতে জানে না। জানার চেষ্টাও করে না। ছোটো মফস্বল শহরে চালানোর দরকারও হয় না। তবে তার মা পই পই করে বলে দিয়েছেন, রত্তন রে, তুই পিওন মানুষ। আর যাই করিস-- সাইকেল চড়িস না। এলাকার বাবু আর মিয়া সাবরা গোস্বা করতে পারে। সাইকেল চড়ার মতো এলেম তাগোই আছে--আমাগো নাই। রতন মার কথা অমান্য করে না। 

সাইকেলটি ঠেলে ঠেলে রতন বাড়ি বাড়ি যায়। বাড়ির সামনে গিয়ে বেল বাজায়। বাড়ির লোকজন ক্রিং ক্রিং শব্দ শুনে বাইরে আসে। চিঠি নেয়। 

সে সময় রায়বাড়ির সতীশ রায়ের ছোটো ভাই বিধুবাবু মেজো দাদার হুমকিতে এলাকায় আসতে পারে না। তার সদ্য বিয়ে করা বউ এ বাড়িতে স্বামী বিহনে খুব মনোকষ্টে আছে। বেচারি গুমরে গুমরে কাঁদে। মেজো বউ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে, কান্না করিস না ছোটো। মেজোবাবুর রাগ বেশিদিন থাকবে না। রাগ কমলেই নিজে তাল্লাশ করে তোর স্বামীকে নিয়ে আসবে। 

কিন্তু রাগ কমার কোনো লক্ষ্মণ নেই। এমন কি বিধুবাবুর কোনো চিঠিপত্রও আসে না। আগে বাড়ির কাজের লোক ডাক পিওনের কাছ থেকে চিঠিপত্র নিত। কিন্তু বিধুবাবুকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরে মেজোবাবু নিজেই চিঠিপত্র নেন। ফলে বিধুবাবুর চিঠি এলো কিনা তাও নতুন বউয়ের জানার কোনো সুযোগ নেই। 

নতুন বউয়ের ধারণা বিধুবাবু চিঠি না লিখে থাকতেই পারে না। বিয়ের আগে তার কাছ থেকে প্রায়ই চিঠি লিখতেন সুন্দর হস্তাক্ষরে। চুনখোলার পোস্টম্যান সে চিঠি তার হাতে গোপনে দিতে যেত। বিধুবাবুই এরকম ব্যবস্থা করেছিলেন। 

এ বাড়িতে কারো সঙ্গে নতুন বউয়ের খুব বেশি কথা হয় না। কথা হয় মেজো বউ লীলাবতীর দিদি সরলাবালার সঙ্গে। সরলাবালা বাল্যবিধবা হয়ে এ বাড়িতে আছে। তার বোনের হয়ে সবকিছু দেখাশুনা করে। বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে সর্বত্র তার সহজ গমণাগমণ আছে। ছোটো বউ তাকেই ধরল। এই মন মরা মেয়েটির জন্য সরলাবালার এক ধরনের দু:খবোধও আছে। তাকে একটু শান্তি দেওয়ার জন্য একদিন পোস্টম্যানের সাইকেলের বেলের শব্দ শুনে সরলাবালা বাইরে এলো। তাকে ফাঁকে জিজ্ঞেস করল, স্বর্ণময়ীর নামে কোনো চিঠি আসে কিনা। 

রতন পোস্টম্যান জবাব দিল, প্রায়ই চিঠি আসে। সে চিঠি তার হাত থেকে মেজোবাবু নিজে গ্রহণ করেন। সরলাবালা তাকে অনুরোধ করল, এরপর চিঠি যেন মেজোবাবুর বদলে গোপনে তার হাতে দেয়। দুপুরের পরে সে অপেক্ষা করবে। বাড়ির সামনে নয়, বেল বাজাতে হবে একটু অদূরে বাঁশঝাড়ের কাছে। তাহলেই সে বাড়ির সীমানায় এসে নতুন বউয়ের চিঠি নেবে। 

এ সময় সরলাবালার মুখ থেকে মুখের ঘোমটা একটু সরে গিয়েছিল। সেখানে ঝকঝকে রোদ পড়ে লাবণ্য ঝরেছিল। রতন সেদিকে এক পলক তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ। সে গোপনেই তার হাতে দিয়ে যাবে। কোনো ভুল হবে না। 

এরপর থেকে বিধুবাবুর চিঠি আসতে লাগল নিয়মিত। আর ছোটো বউ স্বর্ণময়ীর চিঠিও যেতে লাগল। আগের চেয়ে তার মন প্রফুল্ল হয়েছে। 

প্রায় প্রতিদিনই দুপুর হেলে গেলে বাঁশঝাড়ের কাছে সাইকেলের বেল বাজতে শোনা যায়। আর দেখা যায় সরলাবালা গুটিশুটি পায়ে সীমানায় এসে দাঁড়ায়। রতন পোস্টম্যান বিধুবাবুর লেখা ছোটো বউয়ের জন্য চিঠি নিয়ে আসে। নয় বিধুবাবুকে লেখা ছোটো বউয়ের চিঠি নিয়ে যায়। 

তবে এই ব্যাপারটি গোপন থাকেনি। কে বা কারা সতীশবাবুর কানে তোলে-- এ বাড়ির ছোটো বউটিকে রতন পোস্টম্যান গোপনে চিঠি দেয়। তাদের মধ্যে একটি গুপ্ত প্রণয় ঘটাটা অস্বাভাবিক নয়। 

সতীশবাবু প্রমাদ গোণেন। কথাটি ব্যাপকভাবে চাউর হওয়ার আগেই তিনি পোস্ট অফিসের বড় কর্তাদের বলে রতন পোস্টম্যানের আর্জেন্ট বদলীর আদেশ করান। আদেশপত্রে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থল বরিশালের গৌরনদীতে যোগদান করতে হবে। নাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই পত্র অফিসে আসামাত্রই পোস্ট মাস্টার রতনকে স্ট্যান্ড রিলিজ অর্ডার ধরিয়ে দেন। 

সেদিন সন্ধ্যারাত্রে রায়বাড়ির কাছে খুব মৃদুভাবে সাইকেলের বেল বেজে ওঠে। এই বেলের আওয়াজ আর কেউ টের না পেলেও বাল্যবিধবা সরলাবালা টের পেল। টিপি টিপি পায়ে বাড়ির সীমানায় অন্ধকারের মধ্যে এসে দাঁড়াল। তার কাছে রতন পোস্টম্যান দ্রুত এগিয়ে এসে বললে, আমি এই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তুমি আমার সঙ্গে চলো। 

সরলাবালা একটু অবাক হয়ে শুধালো, কেনো আপনার সঙ্গে যাব? 

রতন একটু এগিয়ে এসে তার হাত ধরে বলল, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। 

শুনে সরলাবালার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল। আঁচল দিয়ে মুখ আড়াল করে বেশ কিছু সময় নিচু হয়ে রইল। মুখে কোনো কথা নেই। 

রতন তার হাত দুটি ধরে মিনতি করে বলল, আর দেরী করা যায় না। কেউ দেখে ফেলার আগেই সাইকেলে করে তোমাকে এই রাতের মধ্যেই গৌরনদীতে নিয়ে যাব। 

সরলবালা তার হাত দুটি ছাড়িয়ে নিল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানাল, না। তার সঙ্গে যেতে পারে না দুটি কারণে। প্রথমত, সে এভাবে গৃহত্যাগ করলে তার বোনের নিন্দা হবে। দ্বিতীয়ত সে একজন মুসলমানের সঙ্গে যেতে পারে না। 

শুনে হতবাক হয়ে গেল রতন পোস্টম্যান। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সাইকেলটা নিয়ে ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগল। কিছু দূর এগিয়ে গেলে তাকে পেছন থেকে সরলাবালা ডেকে ফেরালো। আবার আশান্বিত হয়ে রতন তাকে বলল, যাবে? 

-- না। সরলাবালা এক ধরনের শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল। 

-- তাইলে, এলে কেনো? 

-- যাওয়ার আগে তোমার সাইকেলের বেলটি আমাকে দিয়ে যাও। 

বিনাবাক্যে রতন পোস্টম্যান বেলটি খুলে সরলাবালার হাতে দিল। তারপর ধীরে ধীরে বাঁশঝাড়ের আড়ালে চলে গেল একা একা। সঙ্গে গেল বেলবিহীন সাইকেলটি। 

এটকু শুনে মোজাম্মেল হক মুন্না উদ্বিঘ্ন হয়ে বলল, তাহলে তো সাইকেলটি গৌরনদীতে চলে গেল, তাই না? 

-- যেতে পারে। আবার নাও যেতে পারে। খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন লালমিয়া। 

আর কোনো কথা বলবেন না লালমিয়া। তার এখন ঘুম পাচ্ছে। তিনি পানের পিক ফেলে সহসা ঘুমিয়ে পড়লেন। 

মোজাম্মেল হক মুন্নাকে অধীর আগ্রহে লাল মিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের শ্রীদাম বদ্যি বলল, উনি আজ আর বলতে পারবেন না। 

-- তাইলে কাল আসব? 

-- এসে লাভ নেই। আজ যা বলেছেন, তা কাল মনে রাখতে পারবেন না। নতুন কোনো গল্প বানিয়ে বলবেন। বিশ্বাস করা আর না করা সমান কথা। 

তীরে এসে তরী ডোবার অবস্থা। মোজাম্মেল হক মুন্নার মনে হলো, এত দূর এসে হাল ছাড়াটা ঠিক হবে না। আরো কিছু অনুসন্ধান করা যেতে পারে। পরদিন তিনি গৌরনদীতে রওনা করলেন। সেখানে পোস্টম্যান রতন আর তার সাইকেলের সন্ধান পাওয়া যাবে। 

গৌরনদীতেও কোনো কাগজপত্র পাওয়া গেল না। তবে ওখানকার পোস্ট মাস্টার পরামর্শ দিলেন, বরিশাল চলে যান। ওদের পোস্টাল মহাফেজখানায় তত্ত্ব তাল্লাশ করা গেলে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। বরিশাল অফিসের মহাফেজ খানার দ্বায়িত্বে যিনি আছেন তিনি তার মামা লাগে। তিনি অতিশয় ভদ্রলোক। 

তার সুবাদে বরিশালের পোস্টাল মহাফেজখানায় গোপালগঞ্জ পোস্ট অফিসের রতন মোল্লাকে জরুরি ভিত্তিতে গৌরনদীতে বদলীর চিঠি পাওয়া গেল। চিঠিতে যে তারিখ রয়েছে, তার ঠিক সাত দিন পরে গোপালগঞ্জ পোস্ট অফিস থেকে রতন মোল্লার রিলিজ অর্ডারও পাওয়া গেল। সেখানে গোপালগঞ্জ পোস্ট অফিস থেকে অবমুক্তকৃত রতন মোল্লাকে অনতিবিলম্বে গৌরনদী পোস্ট অফিসে যোগদানের নির্দেশ লেখা রয়েছে। 

কিন্তু এরপরে দেখা যাচ্ছে, রতন মোল্লা গৌরনদীতে যোগদান করেনি। তার সন্ধান চেয়ে গৌরনদীর পোস্ট মাস্টার চিঠি লিখেছেন গোপালগঞ্জের পোস্ট মাস্টারকে। 

গোপালগঞ্জের পোস্ট মাস্টার জানাচ্ছেন, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর ১৩ তারিখ অপরাহ্নে রতন মোল্লাকে রিলিজ দেওয়ার পরে তার বিষয়ে তাদের আর কোনো কিছু জানা নেই। রিলিজ অর্ডারে রতন মোল্লা নাম সহি করেছে এরকম তথ্যও জানানো হয়েছে অন্য আরেকটি চিঠিতে। 

এপ্রিল মাসে বরিশাল পোস্ট অফিস থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটি তিন মাস ব্যাপী তদন্ত করে। রিপোর্টে বলা হয়েছ, রতন মোল্লা গোপালগঞ্জ থেকে রিলিজ অর্ডার নিয়ে গৌরনদীর উদ্দেশ্যে রওনা করে ১৩ ডিসেম্বর অপরাহ্ন। কিন্তু এরপর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। সে কোথায় গিয়েছে বা যেতে পারে অথবা তার পরিণতি কী ঘটেছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু জানা যায় না। এমন কি তার সাইকেলটিরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পুলিশও তদন্ত করেছে। তারাও কিছু পায়নি। তবে কয়েকটি আশঙ্কার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। 

১. রতন মোল্লা দেশত্যাগ করে থাকতে পারে। 
২. ঘাঘর নদীতে রাত্রে দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারে। 
৩. ডাকাতের শিকার হতে পারে। 
৪. ভুতে নিয়ে যেতে পারে। 
৫. বিনা কারণে হঠাৎ বদলীর আদেশে ক্ষুব্দ হয়ে বা ব্যক্তিগত কোনো গভীর দু:খে আত্মঘাতি হতে পারে। 
৬. কে বা কারো আক্রোশের শিকার হয়ে খুন হতে পারে। 

এ সন্দেহগুলোকে উদ্দেশ্য করে আরো তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্য দেশ ভাগ হয়ে যায়। ইংরেজরা চলে যায়। হিন্দু অফিসারদের অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গে বদলি নিয়ে দেশত্যাগ করে। তাদের স্থলে মুসলমান অফিসাররা অন্যান্য বিভাগের মতো ডাকবিভাগেরও দ্বায়িত্ব গ্রহণ করে। তারা ছিলেন অনভিজ্ঞ। ফলে অফিসকে গোছগাছ করার কাছে দীর্ঘমেয়াদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বৃটিশ আমলের কোনো এক পোস্টম্যানের বিষয়ে মাথাঘামানোর সময় নেই। 

রতন মোল্লা বা পোস্টাল সার্ভিস অফ ইন্ডিয়া, ৯৪৬ লেলহা ফি র‍্যালে সাইকেল রহস্যের এখানেই ইতি। 

মোজাম্মেল হক মুন্না আর ইত্তেফাকে কাজ করেননি। হয়তো তাকে ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ চাকরি নট করে দিয়েছেন। অথবা চাকরি নট করার আগেই মুন্না নিজেই মান বাঁচানোর স্বার্থে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন কবিতা লেখায় মনোযোগ দিয়েছেন। 

তবে এর ঠিক দুবছরের মাথায় রায় বাড়িতে একজন বৃদ্ধা মারা গেলেন। তার ছেলেমেয়ে ছিল না। বাল্যবিধবা হিসেবে এবাড়িতে আশ্রিত ছিলেন। মৃত্যুকালে অনুরোধ করে গেছেন, তার সঙ্গে যেন তার পোটলাটিকেও দাহ করা হয়। পোটলাটি ছিল ছোটো। কিন্তু আমৃত্যু সেটাকে কাছ ছাড়া করেননি। 

পোটলাট ছোটো হলেও তার মধ্যে গোল একটা ধাতব কিছু আছে মনে হল। সেখানে সোনাদানা টাকাপয়সা থাকতে পারে ভেবে খোলা হলো। এ ধরনের মূল্যবান কিছুই পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল-- পুরনো ত্যানানেকড়ার মধ্যে পেঁচানো একটি পুরনো সাইকেলের বেল। তার গায়ে লেখা-- রতন। 

বুড়ির সঙ্গে বেলটিকে দাহ করা হয়েছিল। মোজাম্মেল হক মুন্না এ তথ্যটি জানে না।



লেখক পরিচিতি
কুলদা রায়
জন্ম গোপালগঞ্জ। 
১৯৬৫ সাল। 
--------------------------------
কৃষিবিষয়ে স্নাতকোত্তর।
গল্পকার। প্রবন্ধকার। ব্লগার।
--------------------------------

প্রকাশিত বই--
বৃষ্টিচিহ্নিত জল--গল্পের বই। 
প্রকাশক--সোপান প্রকাশনী, ২০৬ বিধান সরনী, কোলকাতা ৭০০০০৬। ফোন--(০৩৩)২২৫৭-৩৭৩৮, ৯৪৩৩৩৪৬১৬,
বাংলাদেশে--নালন্দা প্রকাশনী, ৩৮/৪ বাংলাবাজার (মান্নান মার্কেট), ঢাকা, ফোন--০২-৯৫৯০৬১৭।
--------------------------------------------------------------------------------------------
কাঠপাতার ঘর-- ব্যক্তিগত রূপকথা
প্রকাশক--গুরুচণ্ডালী, ৯/২ বলরাম বোস ঘাট রোড, কোলকাতা ২৫। guruchandali@gmail.com 
--------------------------------------------------------------------------------------------
রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি ও অন্যান্য বিতর্ক
গবেষণা
প্রকাশক--বিপিএল
বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর পাবলিশিং হাউস, ১৭ মহাখালি, ঢকা১২১২, ফোন-+৮৮ ০২ ৮৮১৭১৩১
-------------------------------------------------------------------------------------------
রবীন্দ্রবিতর্ক : বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশক--বিপিএল, ঢাকা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন