মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত'র গল্প : আর্টিস্ট

দুপুরবেলা দোতলার বারান্দায় ইজিচেয়ার পেতে শীতের রোদ পোহাচ্ছিলুম, শুনলুম আমার নামে কোত্থেকে এক টেলি এসেছে।

চিঠির মোড়ক না খোলা পর্যন্ত শিহরিত আঙুলের মুখে অর্ধোচ্চারিত প্রত্যাশার ভাষা, টেলির বেলায় সব সময়েই একটা মূঢ়, নিরবয়ব আতঙ্ক।

স্বপ্নেও যা ভাবতে পারিনি। টেলি এসেছে সুদূর লামডিং থেকে। স্বপ্নেও যা ভাবতে পারিনি। চুনী—আমাদের চুনী আসামের জঙ্গলে মাত্র দশ ঘণ্টার ম্যালেরিয়ায় অকস্মাৎ মারা গেছে।

হতবুদ্ধি হয়ে গেলুম। শীতের আকাশে কোথাও যেন আর এক ফোঁটা রোদ নেই। যেন একটা আর্দ্র আহিম অন্ধকার আমার সমস্ত অস্তিত্বকে সহসা পিষে ধরেছে। অলস, ম্রিয়মাণ রোদে গা ভিজিয়ে খানিক আগে মনে-মনে কবিতার উড়ু-উড়ু মৃদু কয়েকটা লাইনে কল্পনার তা দিচ্ছিলুম, তারা স্তব্ধতার শূন্যে গেল হারিয়ে। চুনীর সঙ্গে সঙ্গে আমার একটি কবিতারও অকাল-মৃত্যু ঘটল। 

কী যে করা যায় কিছু ঠিক করতে পারলুম না। চলে গেলুম রমেশের আপিসে। টাইপরাইটারের উপর একসঙ্গে তার দুই হাত চেপে ধরে বললুম,—ভীষণ দুঃসংবাদ।

—কী? রমেশের আঙুলগুলো আমার হাতের মধ্যে ভয়ে কুঁকড়ে এল। পকেট থেকে বের করে দেখালুম টেলি। আমাদের চুনী আর নেই।

—বলিস কী? রমেশ চেয়ারের পিঠে পিঠটা ছেড়ে দিল : আমি বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। এমন দুর্দান্ত ছিল ওর প্রাণশক্তি। হাতের মুঠোটা বাঘের থাবার মত প্রচণ্ড। দুই চোখে ঝড়ের কালো দীপ্তি। গলায় যেন বাজ ডাকছে। তার মৃত্যুটা যেন সূর্যের আকস্মিক নির্বাপণের মতই অসম্ভব।

—বরং আত্মহত্যা করলেও বিশ্বাস করতুম। শেষকালে ম্যালেরিয়ায় মরে যাওয়া? রমেশ ভয়ে হেসে উঠল : কে করেছে টেলি? কে এই অমরেন্দ্র?

—লামডিং-এর কোন বন্ধু বা আত্মীয় হবে হয়ত। যেখানে গিয়ে উঠেছিল। টেলিটা উলটে-পালটে নাড়াচাড়া করতে করতে বললুম : পরে চিঠি আসবে লিখেছে।

—কিন্তু লামডিং ও গেল কবে? এই সেদিন তো ওকে ম্যানাস্‌ক্রিপ্‌ট বগলে করে

কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট ধরে যেতে দেখলুম।

—এই সেদিন, সেদিনও আমার কাছে এসেছিল ওর একটা গল্পের ইংরিজি অনুবাদ করে দিতে পারি কি না। টাকার ভীষণ দরকার, অথচ মাথায় নাকি কিছু নতুন গল্প নেই। অনুবাদটা পেলে বোম্বাই না কোথাকার কী কাগজ থেকে কিছু পেতে পারে সম্প্রতি। অথচ তার আগেই—

রমেশ দুই হাতে তার টাইপ-রাইটারের চাবি টিপটে লাগল। বললে— টাকা, টাকার জন্যে শেষকালটা কেমন মরিয়া হয়ে গেছল। না হয়ে বা উপায় কী! কত বললুম কোথাও একটা অপিসে-টাপিসে ঢুকে পড়—সাহিত্য করে কিছু হবে না। কে শোনে কার কথা! কী গো, কী সতীত্ব, মরবে অথচ ধর্মভ্রষ্ট হবে না। যাক, রমেশ আবার চেয়ারে হেলান দিল : ভাগ্যিস বিয়ে করে রেখে যায় নি।

—কিন্তু সমস্যাটা তাতে বিশেষ প্রাঞ্জল হয়েছে বলে মনে হয় না। বললুম, বিধবা মা, তিনটি ছোট বোন, বড়টির প্রায় বিয়ের বয়েস, এক দাদা আছেন—ট্রাম-অ্যাক্‌সিডেন্টে আজ বছর দুই ধরে প্যারালিটিক, বিছানায় শোয়া—তারও আছে ক'টি ছেলে-পুলে, সমস্ত সংসার ছিল চুনীর মাথার উপর। সমস্ত সংসারে শুধু ওই ছিল রোজগেরে—লিখে-টিখে যা পেত এদিক-ওদিক। এখন কী যে উপায় হবে কিছু ভেবে পাচ্ছি না। 

রমেশ বললে,—বাড়িতে জানে?

—কী করে জানবে? বোধহয় নয়। বোধহয় আমাকেই গিয়ে বলতে হবে। আপাদমস্তক শিউরে উঠলুম : তুইও আমার সঙ্গে যাবি, রমেশ। চল, ওঠ।

—কিন্তু আগে খোঁজ নেয়া দবকার। অমরেন্দ্র না কার আগে সবিস্তারে চিঠি আসুক। কোন শত্রুর কারসাজি নয়তো? রমেশ চেয়ার থেকে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল : আমি যে কিছুতেই মেনে নিতে পাচ্ছি না, চুনী আর নেই—আমাদের সেই চুনী।

বিশ্বাস করা এমনিই শক্ত। টেলির আঁকাবাঁকা নীলচে ক'টি অক্ষর ছাড়া আর কোথাও এব বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই। স্পষ্ট দিবালোকে পৃথিবী তার অভ্যস্ত প্রাত্যহিকতায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

বললুম,—মানুষের মৃত্যুটা সবসময়েই ভীষণ সত্যবাদী। তার আকস্মিকতাতেই সে বেশি স্পষ্ট, বেশি বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু এখন কী করা যায়? ওর মার কাছে গিয়ে কী করে এই খবর দেব? 

—দাঁড়া, ভেবে দেখি। আমিও তোর সঙ্গে যাব। রমেশ আমার হাত ধরল : চল টিফিন রুমে। দু কাপ আগে চা খেয়ে নিই। গলাটা শুকিয়ে আসছে।

রমেশকে নিয়ে সন্ধ্যাসন্ধিতে চুনীদের বাড়ি গেলুম। নোংরা, অন্ধ একটা গলির শেষ-প্রান্তে, তা-ও ভিতরের দিকে, দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছোট, নিচু একটা গর্ত। শীতের সন্ধ্যায়। স্যাঁতস্যাঁত ধরছে। এ-বাড়ির বাতাস কোনদিন যেন রোদের মুখ দেখে নি। অন্ধকারটা যেন কালো মস্ত একটা মরা পাখির মত তার ভারী পাখায় ঘর জুড়ে পড়ে আছে। 

খানিকক্ষণ দাঁড়াতেই চোখ একটু সজুত হয়ে এল। 

ঘরের ভিতর থেকে আওয়াজ এল : কে? 

—আমি, আমি প্রসাদ। আর সঙ্গে এই আমার একটি বন্ধু। 

কাঁথার তলা থেকে চুনীর মা উঠে এলেন। বয়েসে যতু নয়, দারিদ্রে গেছেন জীর্ণ হয়ে। বললেন—এসো, এসো, তোমাদের কাছেই খবর পাঠাবো ভাবছিলুম। চুনী কোথায়।

গেছে বলতে পারো? 

শুকনো একটা ঢোক গিলে বললুম—কেন, চুনী বাড়ি নেই?

—কলকাতায়ই নেই। তিন দিন হল, গেল-বেস্পতিবার সন্ধেবেলা আমার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে সেই যে বেরিয়ে গেল ঝড়ের মত, আর তার কোন পাত্তাই নেই। তোমাদের সঙ্গে ওর দেখা হয় নি? 

—না তো। অনেক দিন দেখা নেই বলে আমরাই বরং ওর খোঁজ নিতে এসেছিলুম। কোথায় গেছে কিছুই বলে যায় নি?

—সে ছেলে আবার বলবে! মা অবহনীয় দুর্বলতায় মেঝের উপর বসে পড়লেন : যা মুখে এল তাই না আমাকে বলে পাগলটার মত বেরিয়ে গেল। তারপর একটিবারের জন্যেও এ-মুখো হবার নাম নেই। সামান্য একটা চিঠি পর্যন্তও নয়। মা হঠাৎ কান্নার। অসহায়তায় ফুঁপিয়ে উঠলেন : আমি তো তোমাদের দেখে ভাবছিলুম তোমরা আমার চুনীর কিছু খবর নিয়ে এসেছ।

গলাকে যথাসম্ভব তরল রাখবার চেষ্টা করলুম। বললুম—আমার সঙ্গে কম-সে-কম প্রায় দুই হপ্তা দেখা নেই। নতুন এক কাগজ বেরুচ্ছে তাই ওর একটা লেখা চাইতে এসেছিলুম। তা—ও হঠাৎ আপনার সঙ্গে ঝগড়া করতে গেল কেন?

—আর বোললা না। মার কান্না এবার শব্দে প্রতিহত হতে লাগল : বাড়িওলা সেদিন বাড়ি এসে আমাকে যাচ্ছেতাই অপমান করে গেল, ওকে বলেছিলাম তার একটা প্রতিবিধান করতে। ও ক্ষেপে উঠে বললে, বাড়িওলাকে ও এখুনি গিয়ে খুন করে আসবে। আমি টিটকিরি করে বলেছিলুম, ওর ন্যায্য টাকা দিতে পারিস না, আবার মুখ করিস কার ওপর? করবেই তো তাকে অপমান। যে ঠাট করে মাসের পর মাস পরের বাড়িতে থাকবে অথচ ভাড়ার টাকা গুনতে পারবে না, তার আবার কিসের মা, কিসেব কী? এই না বলা, আর ছেলের সমস্ত রক্ত গেল মাথায় উঠে। দু'হাতে জিনিস-পত্র ভেঙে চুরে ছত্রখান করে দিয়ে যা মুখে এল তাই বলতে-বলতে ছুটে বেরিয়ে গেল। 

গলায় হাসির আমেজ এনে বললুম,—কী বললে? 

—সে মুখে বলতে পারব না। মুখে ওর কোনদিন কিছু বাধে নাকি?

—না, বলুন, আমাদের বলতে কী বাধা? 

মা দুই হাঁটুতে মুখ ঢাকলেন : বললে, পারব না, পারব না আমি এই গুষ্টি গেলাতে। আমি কে, আমার কী, আমি কেন তোমাদের সবাইকে খাওয়াতে যাব? আমি একা, আমাকে সবাই মিলে তোমরা বাঁচতে না দাও, আমার মরণ তোমরা কী করে বন্ধ করতে পারবে? আমি মরব, মা কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগলেন : যা মুখে এল তাই বলতে বলতে ঝড়ের মত বেরিয়ে গেল। ভাতের থালাটা পর্যন্ত ছুঁলো না।

ঘরের মৃত, ঠাণ্ডা অন্ধকার মুখের উপর প্রেতায়িত নিশ্বাস ফেললে। অন্ধকারে যেন অস্তিত্বের কোন সীমা খুঁজে পেলুম না। 

পিছন থেকে রমেশ বলে উঠল : একেবারে ছেলেমানুষ।

—এমনি ছেলেমানুষি আরও কতবার করেছে, রাগারাগি করে কতদিন গেছে ঘর থেকে বেরিয়ে, আবার একটি দিন পুরো যেতে-না-যেতেই কোথেকে নিয়ে এসেছে টাকা যোগাড় করে—এমন করে একসঙ্গে এতদিন আমাদের ফেলে রাখে নি। কী যে মুশকিলে পড়েছি, প্রসাদ, কী বলব? হাঁড়িতে একটা কুটো পর্যন্ত নেই—ছেলেপুলেগুলো কাল থেকে ঠায় উপোস করে আছে। তোমরা একটু খোঁজ করে রাগ ভাঙিয়ে ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারো? ও নিজেই বা এতদিন কী করে থাকতে পারছে চুপ করে? ও জানে আমাদের অবস্থা? ও জানে না ও ছাড়া আমাদের কী গতি হবে? 

রমেশ জিজ্ঞেস করলে : লামডিং-এ অমরেন্দ্র বলে আপনাদের কেউ আছে জানেন?

—অমরেন্দ্র? মা চমকে উঠলেন : কেন; অমরেন্দ্র তো আমার দূর সম্পর্কের বোনপো হয়। লামডিং-এ তার মস্ত কাঠের কারবার। কেন, তার কী হল?

—না, কিছু হয়নি। একটা উড়ো খবর শুনেছিলুম চুনী নাকি লামডিং-এ গেছে সেই অমরেন্দ্রর কাছে।

—পাগল! তার হবে আবার সেই সুমতি! অমরেন্দ্র তার কারবারে ওকে নেবার জন্যে কত ঝোলাঝুলি, পেরেছে ওকে বাগ মানাতে? ব্যবসা বা চাকরি ওর দু-চক্ষের বিষ। ওর তপস্যা হচ্ছে সাহিত্য, খেতে না পাক, গুষ্টিসুদ্ধু মরুক সবাই মিলে, তবু ও ছাড়বে না ওর নেশা। ওটা ওর কাছে ঠিক ধর্মের মতো। বলে, যার যা কাজ মা, যার যা ব্রত। বলে, তুমি বলতে পারো আগুনকে তুমি পোড়াতে পারবে না, দিতে পারবে না আলো, হতে পারবে না লাল? তেমনি মা আমি। আমার যা করবার তাই আমি করব, তাই আমি করব আমার সমস্ত প্রাণ দিয়ে। ও যাবে লামডিং, অমরেন্দ্রের কারবারে! উদ্বেগে অস্থির হয়ে মা আবার উঠে দাঁড়ালেন : তা হলে তো অমরেন্দ্রই আমাকে আহ্লাদে একেবারে টেলি করে খবর দিত। লামডিং-এ যাবে বলে তোমাদের কাছে ও কিছু বলেছিল নাকি?

—না, বলে নি ঠিক, তবে হ্যাঁ, শুনেছিলুম যেন কোথায়, এখন ঠিক মনে করতে পারছি না। রমেশ হাঁপিয়ে উঠল। 

মা আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন : যে করে পারো ওর একটা খবর এনে দাও আমাকে। আমি এমনি করে যে আর পাচ্ছি না। এতদিন ধরে রাগ করে থাকার ছেলে তো ও নয়। ও যে মার দুঃখ ভীষণ বুঝতে, সবায়ের দুঃখ। 

বললুম,—না, নিশ্চিন্ত থাকুন, খবর এনে দেব ঠিক। কোথায় আবার যাবে?

রমেশ তার মানিব্যাগ থেকে দু'খানা দশ টাকার নোট বার করল। আমি তো অবাক। রমেশ বললে—সামান্য কটা টাকা, আমি আপনাকে দিয়ে যাচ্ছি। কটা দিন চালান যতদিন না চুনীর খবর পাওয়া যায়। 

মা অত্যন্ত কুণ্ঠিত হয়ে গেলেন : না, না, তা কি হয়? চুনী জানলে মনে করবে কী? আবার ক্ষেপে যাবে, আবার যাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে। ওকে তোমরা চেনো না।

—না, এটা ওকে ওর গল্পের জন্যে অগ্রিম দিয়ে যাচ্ছি মাত্র, ওর গল্প আমরা চাই-ই। রমেশ নোট দুটো কোনরকমে মার হাতে গুঁজে দিল। 

খবরটা কিছুতেই ভাঙতে পারলুম না। দু'দিন ধরে সমস্ত পরিবার ঠায় উপোস করে আছে। 

কিন্তু রমেশের ব্যবহার সব চেয়ে বেশি আশ্চর্য করেছে। বরং কঞ্জুস বলেই তার একটু অখ্যাতি ছিল, বন্ধুবান্ধবের উদ্দেশে আঙুলের ফাঁকে একটি পয়সাও তার গলতো না। সে কিনা অনায়াসে কুড়ি-কুড়িটে টাকা বার করে দিলে। চুনীর ভাগ্য বলতে হবে। কিন্তু হায়, বন্ধুর এই মহানুভবতা দেখবার জন্যে আজ সে বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে বা বেঁচে থাকতে অবিশ্যি তার উপর আমরা এমন মুক্তহস্ত হতে পারতুম না।

অমরেন্দ্রর চিঠির জন্য অপেক্ষা করছিলুম। বন্ধুদের মধ্যে একবার ঠিক হয়েছিল লামডিং-এ কাউকে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু সেই দিনই দুপুরে অমরেন্দ্রর চিঠি এসে হাজির। সমস্ত ঘটনাটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছে।

রাত্রে খেয়ে-দেয়ে শুতে যাবার আগে প্রায় সাড়ে ন'টার সময় তার জ্বর আসে—দেখতে দেখতে একশো পাঁচ, ছয়, সাত—উঠে এল মাথায়। যাকে বলে ম্যালিগ্‌ন্যান্ট্‌ ম্যালেরিয়া। চেষ্টার কোন ত্রুটি হয়নি। ডাক্তার, ইনজেক্‌শান, আইস্‌ব্যাগ—স্টেশন থেকে দু মণ বরফ পর্যন্ত আনানো হয়েছিল। লোকজন সেবা-শুশ্রুষা—যতদূর হতে পারে। তবু কিছুতেই কিছু হল না। জ্বর নেমে গেল প্রায় চারটের কাছাকাছি, সঙ্গে সঙ্গে সব গেল নিবে, জল হয়ে। দশ ঘন্টার মধ্যে সব শেষ।

তারপর চিঠিতে খবরের কাগজের ভাষায় অমরেন্দ্র দীর্ঘ এক বিলাপ জুড়ে দিয়েছে। তার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে এই, বাঙলা দেশের আকাশ থেকে একটি উদীয়মান, উজ্জ্বলন্ত নক্ষত্র হঠাৎ খসে পড়ল। তার উপযুক্ত স্মৃতিরক্ষার জন্যে তার সাহিত্যিক বন্ধু-বান্ধবদের অবহিত হওয়া উচিত। বাঙলা-সাহিত্যের যা ক্ষতি হল—সে আরেক শোকাবহ, দীর্ঘ বক্তৃতা। অমরেন্দ্রর কারবার এখন ভারি মন্দা, চারদিক দেখতে-শুনতে হচ্ছে, তাই এই দুঃসময়ে মাসিমার সঙ্গে এসে সে দেখা করতে পারছে না। তবে চুনীর জন্যে কোন মেমোরিয়্যাল ফান্ড তৈরি হলে সে একুনে একশো টাকা দিতে রাজি আছে।

মনে-মনে হাসলুম। চুনী আজ নেহাত মরে গেছে বলেই, তোমার ব্যবসার মন্দায়মান অবস্থা সত্ত্বেও, তুমি এক কথায় একশো টাকা দিতে রাজি হয়ে গেলে। কিন্তু যতদিন ও বেঁচে ছিল, ততদিন ভুলেও হয়ত একখানা পোস্টকার্ড খরচ করে ওর খবর নাওনি। বাঙলা-দেশের আকাশ থেকে একটা তারা-ই খসেছে বটে। সে খবরটাই শুধু পেলে, কিন্তু কখন সেটা উঠেছিল বলতে পারো?

চুনীলালের জীবনের সমস্ত ছবিটি আমার মনে পড়ল। সে সেই জাতের সাহিত্যিক ছিল না যারা পয়সার জন্যে জনসাধারণের মুখ চেয়ে সাহিত্যকে জার্নালিজমের পর্যায়ে নিয়ে আসে। তাতে তার নিজের তৃপ্তি কী হত ছাই কে জানে, পয়সা হত না। এ-পর্যন্ত কেঁদে-ককিয়ে বই লিখেছে সে মোটে পাঁচখানা—তাও প্রকাশকের ফরমায়েসে নয়, নিজের তাগিদে, বই ছাপাতে তার তাই বেগ পেতে হত ভীষণ, জনসাধারণের কথা না বলে সে নিজের কথা বলবে—এই আস্পর্ধার জন্যে তাকে দাম বলে যা নিতে হত সেটাতে তার কাগজ ও কালির দাম উঠে আসত কিনা সন্দেহ। অথচ সে আমার মত শীতের রোদে ইজিচেয়ারে আধখানা শুয়ে কবিতায় গলে যেতে বসেনি, নেমে এসেছিল সে গদ্যের রূঢ় বন্ধুরতায়। তবু কেন যে সে বেশি লিখছে না, লেখাটাকে বুদ্ধিমানের মত অর্থোপার্জনের বিদ্যা করে তুলছে না, সেটা আমাদের বুদ্ধির অগম্য ছিল। জিজ্ঞেস করলে বলত : কী লিখব, কাদের জন্যে লিখব? মুর্খ পাবলিকের বুদ্ধির সমতলতায় সে নেমে আসতে পারে নি, তাই তার উপর ভাড়াটে ছুটো সমালোচকরা প্রসন্ন ছিল না। আর চুনীলাল লিখেই খালাস, একবার চেয়েও দেখত না বইয়ের সম্পর্কে আর তার কোন কর্তব্য থাকতে পারে কিনা। বইয়ের কাটতির জন্যে বিজ্ঞাপন লেখার কসরৎও যে সাহিত্যেরই একটা অঙ্গ, সে বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল অভ্রভেদী। ঘরে-বাইরে এখানে-ওখানে নিজের বইয়ের ঢাক পেটাবার সূক্ষ্ম কৌশলটা এতদিনেও সে আয়ত্ত করতে পারেনি। বন্ধুবান্ধব ধরে কী করে সভা-সমিতি ডাকানো যায়, কী করে আদায় করা যায় প্রোফেসরদের সার্টিফিকেট, কারু কোন অসংলগ্ন মৌখিকউক্তিকে কেমন ছলনা করে ছাপার অক্ষরে টেনে আনা যায়—সাহিত্য ব্যবসায়ের এ সব প্রাথমিক আবালবৃদ্ধজ্ঞেয় নীতি সম্বন্ধে সে ছিল একেবারে নিশ্চিদ্র। তবুও তাকে কিনা আসতে হয়েছিল এই সাহিত্যে—এই সাহিত্যিক উপজীবিকায়। নিয়তির সামনে তার পুরুষকার টিকতে পারল না।

চুনীর মৃত্যুর খবরটা পরদিন দৈনিক কাগজে সমারোহে ছাপা হয়ে গেল। আজ আর কেউ চুনীকে প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত নয়—একজন তরুণ বাঙালি সাহিত্যিক অকালে তিরোধান করল খবরের কাগজের দপ্তরে সেটা একটা মস্ত খবর। তার দাম আছে। তার জীবনের না থাক, মৃত্যুর তো বটেই। কোন-কোন কাগজ তার উপরে প্যারাগ্রাফ পর্যন্ত লিখেছে। বাঙলা-ভাষার ক্ষতি কষতে গিয়ে শোকের উৎসাহে বাংলা ভাষাকে আর তারা কেউ আস্ত রাখে নি।

দৈনিক কাগজ নিবে গিয়ে ক্রমে মাসিক-কাগজের দিন এল। নানা জায়গা থেকে আমার কাছে চিঠি আসতে লাগল চুনীলালের কোন অপ্রকাশিত লেখা বা ফটো এনে দিতে পারি কি না। ওদের বাড়ির সেই অন্ধকার গর্ত হাতড়াতে-হাতড়াতে কয়েকটা লেখা বার হল : খুচরো তিনটে গল্প, আর ছেড়া-খোঁড়া একটা নাটিকা। মা বাক্স থেকে তার কিশোরবয়সের সুকুমার একখানি ছবি খুলে দিলেন। চুনীলালের শেষ সম্পত্তিগুলি নিয়ে সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম।

সম্পাদক দামিনীভূষণ চুনীর জীবদ্দশায় তার উপর প্রায় খড়গহস্ত ছিলেন। কিন্তু আজ মৃত্যু তার স্মৃতির উপর অপরিম্লান একটি মহিমা এনে দিয়েছে। মৃত্যুর অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে দেখাচ্ছে তাকে আজ যথার্থ অনুপাতে। আজ তাকে মূল্য দিতে কারু কোন লোকসান নেই, কেননা সে মূল্য সে আর নিজ হাতে নিতে আসছে না। তাকে প্রশংসা করতে আজ আর কিসের লজ্জা, কিসের ভয়, যখন সে নিঃশেষে মরে গেলে। মৃত্যুর মত নিশ্চিন্ত আর আছে কি!

পৃষ্ঠায় যে-গল্পটি সব চেয়ে বড় দামিনীভূষণ সেটি গ্রহণ করলেন। একবার পড়ে পর্যন্ত দেখলেন না। তার দরকার ছিল না। চুনীলালের লেখাটা তার কাগজে আজ একটা মস্ত বিজ্ঞাপন—সেটা তিনি ব্যবসার চোখে সহজেই ধরতে পেরেছেন। আজ তার লেখা ছাপায় চুনীলালের দরকার নেই—দরকার দামিনীভূষণের। বলা বাহুল্য, প্রায় অর্থনৈতিক নিয়মেই দামটা একটু বেশি চাইলুম। দামিনীভূষণ এক কথাতেই রাজি, আমার মতের জন্যে অপেক্ষা না করে সটান একটা পঞ্চাশ টাকার চেক কেটে দিলেন। বললেন : ওঁর বিপন্ন, দরিদ্র পরিবারের কথা ভেবেই সংখ্যাটা একটু ভদ্র করলুম। 

দামিনীভূষণের সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশের কৃপাজীবীর দলও মমতায় দ্রবীভূত হয়ে। গেল। একজন গদগদ হয়ে বললে—কিন্তু এ-টাকায় বড়জোর একমাস চলতে পারে। তারপর? দামিনীবাবুর মত স্বজনবৎসল লোক তো আর বেশি নেই বাংলা-দেশে। 

বললুম—না, আমরা একটা চুনীলাল-মেমোরিয়াল ফান্ড খুলব ভাবছি।

—খুলুন, দামিনীভূষণ সহসা সামনের টেবিলের উপর একটা ঘুষি মারলেন : একশো বার খোলা উচিত। এই নিন, আমিই দিচ্ছি প্রথম চাঁদা। বলে বুকপকেট থেকে মনিব্যাগ খুলে আমার দিকে দশটাকার একটা নোট বাড়িয়ে ধরলেন।

কৃপাজীবীদের কেউ-কেউ করুণ, মৃত্যুম্লান চোখে দামিনীভূষণের দিকে চেয়ে রইল। কেউ-কেউ উল্লাসে ঢলে পড়ে বলল : কী উদার, কী মহান।

চুনীলালের মৃত্যুতে দামিনীভূষণ উদারতার চমৎকার একটা সুযোগ পেয়েছেন বটে।

ভাগ্যিস সে মরেছিল, নইলে তাকে এমন মহৎ বলে হয়ত আমরা দেখতে পেতুম না। 

দামিনীভূষণ আর্দ্রগলায় বললেন, —আমি শেষ পর্যন্ত বিচার করে দেখলুম, চুনীবাবুর লেখা এমন কিছু নিন্দনীয় ছিল না। শুধু কাগজের পলিসির জন্যেই তাকে রাইট-অ্যান্ড-লেফট গাল দিতে হয়েছে। মানুষ না মরলে তাকে আমরা বুঝতে শিখি না কখনও। কী বলল হে রাজেন?

—আমিও তোমাকে এতদিনে এই কথাই বলব বলব করছিলুম। বাবরি চুলে উদাস একটি ছোকরা গুনগুনিয়ে বলে উঠল। 

চুনী নিতান্ত আর বেঁচে নেই বলেই আজ তার এত সৌভাগ্য।

বাকি লেখা দুটোও উঁচু দামে অতি সহজেই বেচে এলুম। এই মহড়ায় থিয়েটার খুব ভাল জমবে মনে করে তার সেই নাটিকাটিও পেশাদার এক থিয়েটার-পার্টি কিনে নিল।

আশ্চর্য, স্বপ্নেও কেউ যা ভাবতে পারিনি। আজ আর তার সমালোচনার কথা উঠতেও পারে না, বেরুতে লাগল কেবল উচ্ছ্বসিত, উলঙ্গ প্রশংসা। দামিনীভূষণের রাজেন সংস্কৃতবহুল গম্ভীর বাংলায় ''সাহিত্যে চুনীলালের বিদ্রোহ'' সম্বন্ধে জাঁকালো, প্রকাণ্ড এক প্রবন্ধ বার করলে। (পৃষ্ঠা গুনে সে দাম পাবে অবিশ্যি) তার দেখাদেখি, এটাই নতুনতম ফ্যাশান ভেবে, আর-আর কাগজও সুর মেলাল। চুনীর বইগুলি কাটতে লাগল প্রায় হু-হু শব্দে, ছ'মাসে বইটার প্রায় এডিশন হয়! যে বইটার সে কপিরাইট বেচে দিয়েছিল, তার বিক্রয়াধিক্য দেখে প্রকাশক আপনা থেকেই দয়াপরবশ হয়ে কিছু মোটা টাকা চুনীর মায়ের নামে ধরে দিলেন। নাটিকাটাও সেই সঙ্গে জমজমাট হয়ে উঠল।

আজ চুনীলাল নেই। কিন্তু তার বাড়ির অবস্থা এ ক'মাসে বেশ শ্রীমন্ত হয়ে উঠেছে। বেঁচে থাকলে শত চেষ্টা, শত সংগ্রাম করেও এ-বাড়ির একখানা ইট সে খসাতে পারত না। কিন্তু তার তিরোধানের কল্যাণে সবাই উঠে এসেছে এখন ভালো পাড়ায়, ফাঁকা, রোদালো বাড়িতে। চুনীলালের মৃত্যু সমস্ত পরিবারের পক্ষে প্রসন্ন একটি আশীর্বাদ।

আমি তার টাকা-পয়সার তদারক করছি—মেমোরিয়াল ফান্ডটাও আমারই হাতে। বর্ষার নদীব মত ক্রমশ তা কেবল ফেঁপেই চলেছে—প্রতি সপ্তাহে খবরের কাগজে জমার তালিকাটা দেশের সামনে পেশ করছি। আজ চুনীলালের অনুরাগী ভক্তের আর লেখাজোখা নেই, দূর মফস্বল থেকে অপরিচিততম পাঠক পর্যন্ত তার সাধ্যাতীত দিচ্ছে পাঠিয়ে। যতদিন চুনীলাল বেঁচে ছিল কেউ তাকে চিনত না, আজ তার মৃত্যু সমস্ত দেশের কাছে একটা অনপচেয় ঐশ্বর্য। জীবনে সে ছিল নির্বাক, নির্বাপিত, কিন্তু মৃত্যুতে সে আজ মুখর, অন্ধকারে সে আজ দীপ্যমান। মৃত্যুই আজ তার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপন, শ্রেষ্ঠ রচনা।

তাঁর জন্যে আর আমরা কেউ শোক করছি না।

ফান্ডের টাকাটা দিয়ে চুনীলালের নামে একটা লাইব্রেরি স্থাপনার জল্পনা চলছিল। এই বিষয় নিয়ে খবরের কাগজে দেশবাসীর একটা মত আহ্বান করছিলুম, সবাই প্রায় রাজি দেখা গেল। কেউ-কেউ শুধু বললে,—সঙ্গে চুনীলালের একটি প্রস্তরমূর্তিও স্থাপিত করা হোক।

কমিটি থেকে তাই পাশ করিয়ে নিয়ে নিচে একা ঘরে হিসেবের খসড়ার উপর অন্যমনস্কের মত চোখ বোলাচ্ছিলুম, হঠাৎ দরজার কড়াটা যেন হাওয়ায় নড়ে উঠল।

রাত তখন এগারোটার কাছাকাছি। পাড়াটা নিঝুম। আলো নিবিয়ে এবার শুতে যাব, দরজার উপর আবার কার ভারী হাতের শব্দ হল।

বললুম—খোলা আছে। ধাক্কা দিন। 

দরজাটা সজোরে দু ফাঁক হয়ে খুলে গেল।

চমকে আর্তকণ্ঠে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলুম। মুহূর্তে সমস্ত শরীর শুকিয়ে এল। চারদিক থেকে দেয়ালগুলি যেন হেঁটে হেঁটে সরে এসে আমাকে চেপে ধরেছে। পায়ের নিচে মেঝেটা আর খুঁজে পাচ্ছি না। 

লোকটা শব্দ করে চেয়ার টেনে আমার মুখখামুখি বসল। হাসিমুখে, পরিচিত স্বাভাবিকতায় বললে,—ভয় পাচ্ছিস কেন? চিনতে পাচ্ছিস না আমাকে?

চাপা গলায় আবার একটা চিৎকার করতে যাচ্ছিলুম, চুনীলাল তেমনি তার প্রবল উচ্ছ্বসিত পৌরুষে অজস্র হেসে উঠল। বললুম : তুই—তুই কোত্থেকে?

—স্বর্গ থেকে বললে বিশেষ নিশ্চিন্ত হবি না নিশ্চয়ই। চুনীলাল কোটের বোতামগুলি খুলতে-খুলতে বললে, আপাতত লামডিং থেকেই আসছি। কত পেলি? জমল কত আমার ফান্ডে? 

তার মুখের উপর রুখে উঠলুম : লামডিং থেকে আসছিস মানে?

—হ্যা, ফান্ডের টাকাটা নিয়ে যেতে এসেছি। বেশ একটা ডিসেন্ট সংখ্যা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বলে চুনীলাল আবার শূন্যতা কাপিয়ে হেসে উঠল : বেশ পাবলিসিটি করেছিস, প্রসাদ। আমিও তাই আশা করছিলুম। ব্যবসায় বেশ মাথা খুলেছে দেখছি।

চেয়ারের পিঠে ভেঙে পড়ে আবার তার সেই পরিতৃপ্ত আলস্য।

তার হাতটা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরলুম। হাড়ময় নীরক্ত হাত নয়, দস্তুরমত মাংসল, সুস্থ, নধর। বললুম : এ কী ভীষণ কথা? তুই না মরে গেছিস?

—মরেই গেছি তো নিঃশেষে মরে গেছি। চুনীলাল পরিষ্কার, প্রখর দাঁতে আবার হেসে উঠল : আমি তো আর সাহিত্যিক নই, আমি এখন অমরেন্দ্রর কাঠের কারবারে।

1 টি মন্তব্য: