মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

এমদাদ রহমানের জার্নাল : লন্ডনে, বৃষ্টি ও ওয়ালপেপারের সংলাপ

সুদানি লেখক তায়িব সালেহ'র উপন্যাস ‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’ (Season of Migration to the North) দ্বিতীয়বার পড়ার ফাঁকে, উপন্যাস পাঠের বিষণ্ণতা কাটাতে ঢুঁ মারছিলাম অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের গল্পের ভেতর, কখনও সুনীলের দু-একটি গদ্যে, কখনও বা জয়ের ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছে; বিজনের রক্তমাংসে, কখনও…

সন্দীপনের একটি সাক্ষাৎকারও পড়া হলো আজ, তায়িব সালেহর সাক্ষাৎকার খুঁজতে গিয়ে নেটে পাওয়া গেল। ‘সূর্যমুখী ফুল আর বিকালের আলো’। সন্দীপনের গল্পের নাম। গল্পসূত্রে আলাপের বিস্তার। সুনীলের সঙ্গে পরিচয়পর্বের কথা এল। পড়িনি গল্পটি। মনে হলো। মিত্র ও ঘোষ প্রকাশিত গল্পসমগ্র প্রথম খণ্ড এবং দ্বিতীয় খণ্ড, কোনও দিকেই গল্পটি নেই। কী আশ্চর্য। কোথায় গেল এই গল্প?

উপন্যাসটি পড়তে পড়তেই মনে পড়ছিল ইলিয়াসের রেইনকোট গল্পটির কথা। কারণ ছাড়াই মনে পড়ছিল। কতকিছুই তো অকারণ মনে পড়ে যায় আমাদের। যেমন অকারণেই মৃত্যুর কথা ভাবি। 
ভাবলাম আজকালের মধ্যেই গল্পদু'টি পড়তে হবে। রেইনকোট। উৎসব। তারপর ইলিয়াসের একটা সাদাকালো ছবির দিকে তাকিয়ে থাকব। কিছুক্ষণ। ভায়োলেট এভিনিউয়ের কোনও একটি ঘরে বসে।

কত কাজ জমে আছে। আফ্রিকার কিছু উপন্যাসের সন্ধান পেলাম। হেইনম্যান আফ্রিকান রাইটার্স সিরিজ। একটা উপন্যাসের নাম ‘সুন্দর যে, তার এখনও জন্ম হয়নি’; ঘানার উপন্যাস। ভাবলাম কিনতে হবে। আমাজন জানাল লন্ডনের এই ঠিনাকায় পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে ২ থেকে ৩ মাস! কী বলে! আউট অব প্রিন্ট, নাকি?

একটা বই করার কথা ভাবলাম। থিয়েটারের রীতিনীতি। আর্ট অব থিয়েটার। প্যারিস রিভিউকে দেওয়া বিশ্বখ্যাত সব নাট্যকারদের দীর্ঘ দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থাকবে বইয়ে। প্ল্যান করায় ভালো লাগল। এরকম অদ্ভুত মুহুর্তে সিগারেট ধরাতে হয়। একটু হাসলাম। হাসিটা সরল ছিল।

বাচ্চারা কী সুন্দর ফুটফুটে শব্দে কথা বলতে শিখেছে। পাতা। ফুল। পাখি। চাঁদ মামা। গাড়ি। পোকা…

রোববার পত্রিকার একটি সংখ্যা পাওয়া গেল। নেটে। লিটলম্যাগ সংখ্যা। অমর মিত্রের গদ্য একটা দেখলাম। রুদ্ধশ্বাসে পড়া হলো। তাকে মেসেঞ্জারে পাওয়া গেল। কলকাতার ভোরে। জানালাম। লিঙ্ক দিলাম। লেখাটির স্ক্রিনশট দিলাম। স্নেহ, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা বিনিময় হলো। কলকাতায় ভোর। লন্ডনে গভীর রাত। 
পাতা গাড়ি পোকা ফুল! কী সুন্দর সহজ তাদের উচ্চারণ।

সন্দীপনের গল্পটি কোথায় পাবো? নেটে খুঁজব? কিছুক্ষণ সুবিমল মিশ্রের ‘ঘোড়া নিমগাছের মগডালে দেখন চাচা থাকতেন’ গল্পটি খুঁজলাম। পেলাম না। এই গল্পটি আজ পড়তে চাইছিলাম। 
বছর দশেক আগে, সিলেটের জিন্দাবাজারের প্যারিস ম্যানশনের ফোকাস আইটিতে বসে মিনহাজ ভাই (আহমদ মিনহাজ) এই গল্পটি পড়েছিলেন। সেদিন আমরা বেশক'টি জরুরি সিগারেট খেয়েছিলাম। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য।

সন্দীপনের গল্পটি পড়িনি। পড়লে মনে পড়ত। অন্তত আর কিছু না হোক, মোটাদাগে গল্পটা। 
হ্যাঁ, অন্যান্য লেখাগুলোর মতোই তার সাক্ষাৎকারটি অসাধারণ। স্মৃতিকথা বলছেন। যা আক্রান্ত করে। এক জায়গায় বলছেন, ক্রীতদাস ক্রীতদাসী গল্পটি লিখছেন তিনি, বেশ খানিকটা লিখেছেন, একদিন সুনীল এসে গল্পের কিছুটা পড়ে ফেললেন! তারপর সুনীল চিঠি লিখলেন সমীর রায়চৌধুরীকে :
'সন্দীপন একটা অসাধারণ গল্প লিখছে। শেষ হলে একটা যুগান্তকারী ঘটনা ঘটবে।’

সুনীলরা এসব করতেন। এসব করেছিলেন।

সাক্ষাৎকারে নাম এল, গল্পটির। অশ্বমেধের ঘোড়া। দীপেনের। গল্পটি পড়তে হবে, আবারও। কতকিছুই যে আবার পড়তে হবে। জীবন কি সত্যিই ছোট? মনে হয় না। জীবনকে আমরাই তো ছোট করে ফেলি। 
কবীর সুমনের একটা গান খুঁজে পেয়েছি। ইউটিউবে। আগে শুনিনি। কথাগুলি এমন-

করেছি সন্ধান একা একা কতো
হেরেছি খোঁজে খোঁজে একা অবিরত
ফিরেছি এপাড়ায় ওপাড়ায় ঘুরে
গিয়েছি ঘর ছেড়ে দূরে বহুদূরে

[...]

শুনেছি সাপুড়ের আঁকাবাঁকা বাঁশি
ভেবেছি বাঁশিটাকে ঘরে নিয়ে আসি
ধরেছি সুরটাও অন্য ছিরিছাঁদে
পড়েছি ছ’তারের গিটারের ফাঁদে

পড়েছি আব্বাস উদ্দিনের ফাঁদে

শুনেছি তারই ফাঁকে নীরবতা কাঁদে...

সুমনকে নমস্কার। নির্বাসনে গেলে আর কিছু নয়, আপনার গানগুলি সঙ্গে নিতে চাই।

বাংলাদেশের উপন্যাস কি হাস্যকর হয়ে উঠছে না? কী মনে হয়? নিজেকে প্রশ্ন করলাম। লেখকরা লিখতে পারছেন না মনে হচ্ছে। আমাকে উপন্যাসের খোঁজে থাকতে হচ্ছে। উপন্যাস নিতে হচ্ছে ইরান থেকে। লেবানন থেকে। ভেবে দেখলাম, এখন আমাকে উপন্যাস পড়তে হবে মোজাম্বিকের, কেনিয়ার, নাইজেরিয়ার, সুদানের, ঘানার, মিশরের। বাংলাদেশের উপন্যাস এখন মৃত। লেখকরা উৎসব থেকে ঘুরে আসুন। এ প্রসঙ্গে আমার কী দুঃখ! কী বিপুল বেদনা।

তায়িব সালেহর উপন্যাস ‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’ শেষ করেছি তিন দিনে। উপন্যাসটি আয়তনে ছোট হলেও, মহাপ্রাণ। তিনি লিখতে জানেন। জানেন বলেই তার কথা সারাবিশ্ব জানে। লেখক এমনি হবেন। মৃত উপন্যাস লিখে লাভ নেই। উপন্যাসকে হতে হবে তীব্র।

গত বছর অমর মিত্রের পুনরুত্থান পড়লাম, এ বছর সাদিক হোসেনের মোন্দেলা। 
কী তীব্র লেখা। ভাবা যায় না। সাদিক হোসেনের হাতে নতুন দিনের উপন্যাস লিখিত হবে। এই আশা করছি।

‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’ শেষ হওয়ামাত্র আবার পড়তে শুরু করেছি। পড়তে পড়তে ভেতরে যে তীব্র তৃষ্ণার জন্ম হয়েছিল, এবার দ্বিতীয় পাঠে তা কিছুটা কমবে, আশা করছি। সুদানের নীল নদের জলেভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে লন্ডন আর শমশেরনগরের গন্ধ মিশে যাচ্ছে। কী লেখা!

হাংরি আন্দোলন প্রসঙ্গে সন্দীপন আইডিয়া দিচ্ছেন- সাগরময় ঘোষসহ বেশ কয়েকজনকে মুখোশ পাঠানো হবে। মুখোশে লেখা থাকবে : মুখোশ খুলে ফেলুন। 
তারপর বলছেন, আসলে লেখাটাই হচ্ছে প্রকৃত বিপ্লব। সেটাই করতে হয়।
আবারও সিগারেট ধরাবার ইচ্ছা হলো। আবারও বোকার মতো হেসে উঠলাম।

মা'কে ফোন করা হলো না, আজও। ভিডিও কলে ঝুম্পাবতীর খিলখিল হাসিও দেখা হলো না। দুঃখ!

শীত পড়েছে। এই রাতে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। হাসান আজিজুল হকের আত্মজা ও একটি করবী গাছের কথা মনে পড়ছে। আজ একবার পড়তে হবে, গল্পটা। ঘুমোবার আগে।


[০৩/১২/২০১৮

1 টি মন্তব্য:

  1. আহা! বর্তমান বাংলাদেশে যদি কয়েকজনকে বলতে পারতাম---"মুখোশ খুলে ফেলুন"। লেখাটি এলোমেলো ভাবনার প্রতিফলন হলেও ভাবতে উদ্ধুদ্ধ করবে ও পাঠে আগ্ৰহ জাগাবে।

    উত্তরমুছুন