মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা ইকবাল হাসান এর সেরা গল্প : আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ

আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ--গল্পটি নিয়ে আলাপ

গল্পপাঠ--
গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছিলেন?

ইকবাল হাসান--
নির্দয় শীতকাল। আমি তখন টরন্টো থেকে প্রায় পনেরো শ’ কিলোমিটার দূরে, থান্ডার বে’তে। দু’ বছর আগের কথা। ভারতীয় খাবারের ছোট্ট একটা ব্যবসা ছিলো ওখানে। ওটা নিয়েই পড়েছিলাম।

আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ’ গল্পটি ওখানে বসেই লেখা।

গল্পপাঠ--
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন। এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন? 

ইকবাল হাসান--
কাজের ফাঁকে ঢাকার কাগজ পড়া আমার অভ্যাস, তো হঠাৎ একদিন দেখি, এক এলাকায় সংখ্যালঘুদের বেশ কটি বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। আগে শুনেছি এবং দেখেছি যে, একের পর এক এলাকায় সংখ্যালঘু বিশেষ করে, হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে, দখল করে তাদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে। এমন কি পুলিশ স্বয়ং সাওতাল পল্লিতে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে এমন ছবিও দেখেছি পত্রিকায়। রাজনৈতিক নেতাদের ইঙ্গিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশ্য মদদে এবং প্রশাসনের নির্বিকার আচরনের ফলে আমাদের দেশে সাধানরত এই অমানবিক নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে নির্বাচন পরবর্তী সময়। অই সময়টায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা হয়ে ওঠে সফ্ট টার্গেট।

তো হঠাৎ পত্রিকায় হিন্দুবাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট হবার সচিত্র প্রতিবেদনটি দেখে বড়ো কষ্ট পাই, সহসা মনে হলো প্রাণভয়ে পলায়নরত অই মহিলা যেন আমার মা আর কাপড়ের একটা পোটলা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে নির্বিকার বসে থাকা লোকটি আমার অসহায় বাবা।

তখুনি সিদ্ধান্ত নেই, আমি একটি গল্প লিখবো। এই বিষয়টি নিয়ে এবং আজ রাতেই ।

গল্পপাঠ--
গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন?
ইকবাল হাসান--
রাতেই গল্পটি লিখে ফেলি। 
না, কাটাকুটি তেমন করতে হয়নি। তবে কিছু জায়গা পরে এডিট করে ফেলে দিয়েছি। তিনজন মৃত-মানুষকে বাসÍব ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার চেষ্টা করেছি। যেন কোথাও মূল থিমটা আহত না হয়।

গল্পপাঠ-- 
গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন? 
ইকবাল হাসান--
পরদিন দুপুরের দিকে গল্পটি আমার প্রিয় অনুজবন্ধু, স্থপতি শিখা আহমাদ’কে পড়ে শুনাই। সে রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী, সিরিয়াস পাঠক। সহসা তাকিয়ে দেখি, শিখার চোখে জল, সে কাঁদছে!



ইকবাল হাসান'র গল্প  
আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ

রাস্তা তো নয়, যেন চলন্ত সাপের শরীর; আঁকাবাঁকা হ’য়ে শেষে নদীর সামনে এসে কিছুক্ষন ফনা তুলে থমকে দাঁড়িয়ে, কিংবা বলা যায়, কিছুটাবা বিস্মিত হয়ে অতঃপর ডানদিকে বাক নিয়েছে। বাদুরতলা হাট বলে যে জায়গাটিকে দেখা মাত্র সনাক্ত করা যায় তা আসলে খুব বড়ো কোনও বাজার নয়, গোলপাতা মাথায় নিয়ে মোটে তেরোখানা ঘর দু’পাশে, মাঝখান দিয়ে বিস্মিত হ’তে জানা যে রাস্তাটির কথা বললাম, সেই রাস্তাটি মকবুল কবিরাজের মতো টাল খেয়ে শেষে কিঞ্চিত সরু আকৃতি নিয়ে কাঠের পোলের পায়ের কাছে এসে থেমেছে; যেন এই মঠবাড়ি খালপারে এসে একটু জিরিয়ে নেয়া।
এই খালের কোনও ইতিহাস আমাদের জানা নেই, শাহ্ সুজা নাকি একবার এখান দিয়ে গিয়েছিলেন -- এমন দু’একটি গুজব ছাড়া; তবে আমরা জানি, খালের এপারে বাদুরতলা আর ওপারে মঠবাড়ি, আগে বাঁশের পোল ছিল খালের উপর যা এখন উন্নয়নের ছোঁয়ায় কাঠের হয়েছে বলে বাদুরতলা-মঠবাড়ি, মঠবাড়ি-বাদুরতলা করতে অসুবিধা হয় না মানুষের। আর অত্র এলাকার এমপি সাহেব --যিনি আমাদের বন্ধু শামছুর সম্পর্কে খালু বিধায় আমরাও তাঁকে খালুজান বলে ডাকি, নির্বাচনের সময় ওয়াদা করেছিলেন যে, তাঁকে ভোট দিলে তিনি অচিরেই খালের উপর ব্রিজ আর রাস্তা পাকা করে দেবেন। খালুজান ভুলো মনের মানুষ, তিনি ভুলে গেছেন; এতো কিছু কি মনে রাখা যায়? এলাকায় এখন তাঁকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল, তবে গ্রামের লোকেরা সময়-অসময়ে আমাদের পায়। আমরা ইলেকশনের টাইমে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খালুজানের হ’য়ে পাকা রাস্তা আর ব্রিজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম বলে গ্রামের কেউ কেউ আড়ালে আবডালে এখন আমাদের ‘চুতিয়া কা আওলাদ’ বলে ডাকে, গালিটা হিন্দি ছবির ডায়লগের মতো শোনায় বলে এবং গাওগেরামের মুরুব্বি-সকল যে কোনও গালি দেবার অধিকার রাখেন বলে আমরা মাইন্ড করি না। এক কান দিয়ে শুনি আর এক কান দিয়ে বের করেদি’। কারণ, রাস্তা পাকা না হবার ফলে সামান্য বৃষ্টিতে থকথকে কাঁদায় মানুষের পা আটকে যায়। গালি তখন আর দিতে হয় না, মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, অটোমেটিক। 

তবে মকবুল কবিরাজ, যিনি সর্বদাই ডান দিকে কাৎ হ’য়ে হাটেন, যার কাঁধে তেল-চিটচিটে ঝোলা ব্যাগ থাকে এবং আমরা ধারনা করি, বয়সহেতু বলা তো যায় না কখন কোথায় ইন্নানিল্লাহে হ’য়ে যায়-- অই ঝোলায় ভিতর একখানা কাফনের কাপড় সযতনে মজুদ রাখেন তিনি, ফলে ঝোলাটিকে বাইরে থেকে পাঁচ মাসের প্রেগনেন্ট বলে মনে হয়, কাউকে গালি দেন না তিনি, খালি অভিশাপ দ্যান, আল্লার গজব অইবে, হালার পো হালারা কেউ বাচঁবি না কইলাম-- আর অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে এই অভিশাপ তিনি কাকে দিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর, তা আমাদের দ্বন্ধে ফেলে। আমরা বুঝতে পারি না। তবে কেউ কেউ বলে, মকবুল কবিরাজের মাথায় ছিট আছে, তার ছিঁড়া। সব ছিঁড়া তার জট পাকিয়ে গেছে মাথার ভিতর। প্রতিদিন সন্ধ্যায় লঞ্চঘাট গিয়ে অপেক্ষা করেন তিনি, ছেলে আসবে। কিন্তু ছেলে আর আসে না। স্বাধীনের পর থেকে ছেলের দ্যাখা নাই, বাইশ বছরের তাগড়া জোয়ান ছেলে, যুদ্ধের পর আর ফিরে আসেনি। মকবুল কবিরাজের ধারনা, ছেলে ফিরে আসবে, এবং তিনি নিশ্চিত-- এই যে বরিশাল থেকে ছেড়ে আসা বরগুনাগামী লঞ্চ, এই লঞ্চেই মহিবুল ফিরে আসবে একদিন। 

এসব শুনে হাসেন সুনীল কুমার সূত্রধর। তিনি আমাদের বন্ধু শ্যামলের বাবা এবং বাদুরতলা গ্রামের একমাত্র প্রাইমারী স্কুলের অংক শিক্ষক। নক্ষত্র গণক। মঙ্গল গ্রহ নাকি ৩০০ বছর পরপর পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে। এই তথ্য আগে আমাদের জানা ছিল না। আমরা আরো জানতে পারি যে, এই ক’দিন আগে নাকি সূর্যাস্তের পর 


আকাশের দক্ষিন-পূর্ব প্রান্তে মঙ্গল, শনি ও এন্টারেস নক্ষত্রকে খালি চোখে দেখা গেছে। তাঁর ধারনা, মকবুল কবিরাজ বলে এই গ্রামে কেউ কোনওদিন ছিল না এবং এখনো নেই। কেউ নাকি আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরে উপরুল্লিখিত দৃশ্যচিত্রগুলো ডাকটিকেটের মতো লাগিয়ে দিয়েছে। এমনকি এই ক’দিন আগে আমরা বাদুরতলা হাটে ডান দিকে কাৎ হয়ে কাদার ভিতর আটকে পড়া যে মানুষটিকে দেখেছি সেও নাকি আমাদের চোখের ভ্রম এবং এই ধারনায় তিনি নিশ্চিত যে, আমরা এতোদিন ধরে যা দেখে আসছি তা অবাস্তব ও নিছক কল্পনাপ্রসুত। আমাদের দৃশ্যচিত্রে পুনঃপুনঃ মকবুল কবিরাজের উপস্থিতিতে অতএব যারপরনাই হতাশ হই আমরা। এবং আমাদের কী করনীয় এখন -- এমত ভাবনায় বাস্তব-অবাস্তবের ঘোরের ভিতর ভাসমান তিনটি সোনালী মাছের মতো সাঁতার কাটতে থাকি আমরা এবং একসময় শামছু, শ্যামল ও আমি অস্থির হ’য়ে উঠি। 

২. 

উঠ্কো ঝামেলা একেবারেই পছন্দ করেন না শশধর ভদ্র। সারাক্ষন চোর ছেঁচড়ের সঙ্গে চিৎকার চেচামেচি করতে ভালো লাগে না তাঁর। এই রাজাপুর থানার ওসি হয়ে আসার পর নিদ হারাম হয়ে গেছে চিন্তায় চিন্তায়, জায়গাটা খুব একটা ভালো নয়-- এমন শুনেছেন তিনি; প্রায় পুরো এলাকা নাকি চোর ডাকাতে টইটুম্বুর। এখানে বদলি হ’য়ে আসা মাত্র সেকেন্ড অফিসার হামিদুল তাঁকে আশ্বস্ত করে, স্যার এই এলাকার চোর ডাকাতগুলো অতো খারাপ নয়, এখানে যারা রাজনীতি করেন তাদের চে’ ভালো। ওরা নিজেদের এলাকায় চুরি ডাকাতি করে না। দূরে গিয়ে করে। আপনি আসার আগেই দুর্ধর্ষ দু’টোকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছি আর নতুন দারোগা আসছে শুনে একটা পালিয়ে গেছে ভয়ে। এখন ছিঁচকে চোর ছেঁচড় ছাড়া এলাকায় কেউ নেই তেমন। যা হ্যান্ডেল করা আপনার জন্য ডালভাত। 

হামিদুলকে একটা ধমক দিতে যাবেন শশধর ভদ্র, এমন সময় দেখেন যে একটা লোক, প্রায় উদভ্রান্ত উষ্কখুষ্ক চুল, রক্তজবার মতো লাল টকটকে চোখ, পুরো ফ্যামিলি নিয়ে থানার ভিতর ঢুকে গেছে। আমারে বাঁচান ওসি সাব। এই বাচ্চা দুইডা আর মা-বৌরে লইয়া আমি এহোন যামু কই? 

বলা নেই, কয়া নেই; এ কেমন উটকো ঝামেলা! শশধর ভদ্র হঠাৎ কিছু বুঝে উঠতে না পেরে হামিদুলের দিকে তাকান। 

হামিদুলের অজানা কিছু নেই, এলাকার সব কিছু তার নখোদর্পনে, সে বলে-- স্যার ওর নাম হরিপদ। হরিপদ বালা। মুদী দোকান ছিলো একটা। এখন কিছুই নাই। নিতান্ত গরীব। সামান্য একফালি জমি আছে, চাষবাষ করে খায়। তবে ওর কেস্টা একটু জটিল। আপনাকে হ্যান্ডেল করতে হবে। 

হরিপদ বালার সমস্যা আসলেই একটু জটিল, নতুন দারোগা হিসেবে এসেই এইসব ঝামেলা এখন মাথায় নেয়া যাবে না, শশধর যে সুচিন্তিতভাবে এগুবে তেমন কোনও উপায়ও সে দেখতে পেল না সহসা, সে কিছুটা বা বিভ্রান্ত, এ সময় হামিদুল তাঁকে বাঁচালো যেন। বলল, এখন যাও হরিপদ, স্যারকে একটু ভাবতে দাও, আলাপ আলোচনা করে একটা উপায় নিশ্চয়ই বের করা যাবে। 

এ কথায় হরিপদ যেন আরো কিছুটা উদভ্রান্ত হয়, সে হামিদুলের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়, উস্কখুষ্কু চুল আরো বেশী এলোমেলো করে দ্যায় ফ্যানের বাতাস, এসময় পিছন থেকে এক বৃদ্ধাকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়, 

চোখে মুখে তাঁর গভীর আকূতি, সে হাত জোড় করে বলে, মোগো থাকার অই ছাপরা ঘর আর চাষের জমিটুক ছাড়া আর কিচ্ছু নাই বাবা। মোগো রক্ষা করো । 

আমাদের কী করার আছে, আমাদের হাত পা’ তো বাঁধা; তারপরও দেখি কি করা যায়। 

শশধর ভদ্রর একথায় ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন বৃদ্ধা। 



যখন থানায় ঢুকলাম তখন দিন না রাত, দুপুর না সন্ধ্যা আমরা তা আমলে আনি না। 

শশধর ভদ্র টেবলে মাথা রেখে মৌনব্রত পালনরত কিংবা বলা যায় ঝিমুচ্ছিলেন। হরিপদ বালা ও তাঁর পরিবার তাঁকে যথেষ্ট টেনসনে ফেলে একটু আগে বিদায় হয়েছে। হামিদুলও সামনে নেই। আমরা শান্ত-সুবোধ বালকের মতো তাঁর মৌনতা ভঙ্গের অপেক্ষায় থাকি। 

আমাদের অপেক্ষা যেন শেষ হয় না আর, একসময় ধৈর্যহীন হয়ে পড়ি আমরা। শ্যামল বলে-- শামছু আজ চল, আর একদিন এসে শালার দারোগার সঙ্গে দ্যাখা করা যাবে। 

চোপ্ শালা-- এই বলে পকেট থেকে পিস্তল বের করে টেবলে রাখে শামছু। শশধর ভদ্র সহসা জেগে ওঠেন, চোখ খুলেই তিনি এমত দৃশ্যে বিস্ময়ে হতবাক, ভয়ে কাঁপছেন এবং এখন দু’হাত উপরে তুলবেন, না হামিদুলকে ডাকবেন --ভাবতে না ভাবতেই জানালা দিয়ে দেখেন যে, হারামজাদা হামিদুল তাঁকে এখন আর একটি উটকো ঝামেলার মধ্যে রেখে নির্বিঘ্নে থানার মাঠ পেড়িয়ে চলে যাচ্ছে। ভয়ে-আতংকে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি হামিদুল হামিদুল বলে চিৎকার করতে থাকেন। 

আমরা শুনি, শশধর ভদ্র মিউমিউ করছেন বিড়ালের মতো। 

ওসি সাহেব কি কিছু বলছেন? 

না, না, কিছু না। নিজের সঙ্গে একটু কথা বলছি, এই আর কি! কতোদিন নিজের সঙ্গে কথা বলা হয় না। তা বাবারা আপনাদের পরিচয়? 

আমরা আমাদের পরিচয় পর্বটি বিস্তারিত করলে শশধর ভদ্র এই ভেবে আস্বস্ত হ’ন যে, আমরা ভয়ংকর কেউ না, বলেন-- তা বাবারা হঠাৎ কী মনে করে আমার এখানে? 

আপনি থানায় নতুন এসেছেন, আপনার সঙ্গে দ্যাখা করা কর্তব্যজ্ঞান করলাম। আমি বলি। 

তা ভালো, তা ভালো। এবার বলেন, আপনাদের জন্য কি করতে পারি? 

শোনেন ওসি সাহেব, এই এলাকাটা খাতারনাক। চোর- ছেঁচড়ে টইটুম্বুর। টেবল থেকে পিস্তলটা হাতে তুলে নিয়ে শামছু বলে, এলাকার দু’একজন মোড়ল চোর-ছেঁচড়ের চেয়েও খারাপ। তাদের দিকে চোখ রাখতে হবে। আর একটা কথা, যদি শুনি কাউরে বিনা বিচারে ক্রসে দিছেন তাইলে আপনার খবর আছে। খালুজানরে দিয়া এমন জায়গায় বদলি কইর দেবো যে, বৌ মাইয়্যা পোলার মুখ দ্যাখা তো দূরের কথা, ছয় মাসেও সূর্যের মুখ দেখবেন না। 

একথায় বেকুবের মতো হেসে ফেলেন শশধর ভদ্র। 

বলেন, খেলনা পিস্তল আর খালুজান দিয়া আমারে ভয় দেখাচ্ছেন আপনারা! আমি ভয় পাওয়ার লোক না, আমার নাম শশধর ভদ্র। আমি এই থানার ওসি। 


আসল জিনিষও আছে। সেটা কিন্তু খেলনা নয়। তবে এই এলাকার জন্য ড্যুপ্লিকেটটাই যথেষ্ট। শামছু বলে। 

শোনেন, বিনা বিচারে কাউরে ক্রসে দেইনা আমরা। ভয়ংকর সন্ত্রাসী হলে আলাদা কথা। 

এবার গর্জে ওঠে শামছু। বলে, এই শ্যামল, তুই দাঁড়া। 

শ্যামল উঠে দাঁড়ালে একটানে ওর গায়ের জামাটা ছিড়ে ফেলে শামছু। বলে, দেখেন ওর বুকটা । 

শশধর দেখেন যে, শ্যামলের বুকের বাম পাশে একটা ছিদ্র, ছোট্ট সরু একটি টানেলের মতো এ এফোড় ওফোড়। 

চেয়ারম্যান মোতালেব মন্ডল হামিদুলের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে ওরে ক্রসফায়ারে দিছে। ও কি ভয়ংকর সন্ত্রাসী ? 

আর ভয়ংকর সন্ত্রাসী হলেও তাদের বিচারের জন্য কি কোনও আইন নাই দ্যাশে ? মগের মুল্লুক ? 

শশধর কি উত্তর দেবেন ভেবে পান না, তবে এখানে আসার পর তিনি শুনেছেন যে শ্যামলের বাবা, অংকের শিক্ষক সুনীল কুমার সূত্রধরকে গ্রামছাড়া করার পরিকল্পনার একটা সাজানো নাটক ছিল অই ক্রসফায়ার। আর অই সময় শ্যামলের বাড়িতে অস্ত্র প্রাপ্তির যে খবরটা চাউর করা হয়েছিল তা ছিল মুলত একটি খেলনা পিস্তল। যে পিস্তলটা এখন শামছুর হাতে দেখা যাচ্ছে অনেকটা সেরকম। 

সহসা নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় শশধরের, মনে হয়, তিনি এখন আর থানা অফিসে নেই, এমন কি থানা চত্তরেও না। যেন ধাঁনসিড়ি নদীর গভীর তলদেশে বসে আছেন আর তাঁর সামনে সাতার কাটছে তিনটি সোনালী মাছ। 

এমত দৃশ্যে ভয় পেয়ে তিনি হামিদুল, ও হামিদুল বলে চিৎকার করে ওঠেন। 

তাঁর চিৎকার আমাদের শ্রুতিতে বিড়ালের মিউমিউ হয়ে বাজে এবং এ সময়ে আমরা বরং বিস্মিত হ’য়ে দেখি যে, শ্যামল আমাদের ছেড়ে উধাও হয়েছে। আমরা তখন অসহায়ের মতো এদিক ওদিক তাকাই, তারপর নিঃশব্দে শ্যামলের খোঁজে বের হই। 

বাইরে তখন দিন না রাত, আলো না অন্ধকার আমরা তা ধর্তব্যে আনি না। 



অতঃপর একদিন রাতের দ্বিপ্রহরে পুনরায় আমরা মিলিত হই, বাদুরতলা-মঠবাড়ি সাঁকোর নিচে, আধো আলো আধো অন্ধকারে। আমার বা পাশে শামছু আর ডানপাশে শ্যামল। শামছুর গলা আজ উন্মুক্ত এবং তা বামদিকে কাঁত হ’য়ে আছে। সদ্য জবাই করা খাসির গলার মতো চাপাতির কোপে গভীর ক্ষত জায়গাটায় এখন ঠিকরে পড়ছে দূরের কোনও গ্রহ থেকে ছুটে আসা একটুকরো হিরন্ময় আলো । এবং অপার্থিব আলোতে এই ক্ষত এখন যথেষ্ট লাল ও দগদগে। যেন এইমাত্র খুন হয়েছে শামছু, হিরন্ময় অপার্থিব আলোতে নয় বরং যেন লাল টকটকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে ওর শরীর। এমত ভাবনা আমাদের দিশেহারা করে তোলে। আমরা হতবিহ্বল হয়ে বিষখালির দিকে তাকিয়ে থাকি। 

রাতের শেষ প্রহরে এক সময় শ্যামলই আবিস্কার করে নৌকাটিকে, সে হাক ছাড়ে, নৌকা কোথায় যাচ্ছে ? 

মাঝি ভয়ার্ত স্বরে উত্তর দেয়, কোথাও না হুজুর। 

কোথাও না মানে? আমি চিৎকার করে উঠি, আমাদের সঙ্গে চালাকি হচ্ছে ? 

কইতে মানা আছে হুজুর। 


৫.
অই ব্যাটা মাঝির বাচ্চা মাঝি, নৌকা ভিড়া। নইলে গুলি কইরা দেবো। শামছু মুখ খোলে এতোক্ষনে। 

ভিড়াইতে আছি বাবা, গুলি কইরেন না, নৌকায় বাল-বাচ্চা আছে। 

নৌকাটি কাছে এলে আমরা বিস্মিত হয়ে দেখি, ছইয়ের মধ্যে হাটুর ভিতর মুখ লুকিয়ে আছে পাঁচটি ছায়া, ভয়ে থরথর করে কাঁপছে যেন। 

ছইর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি ছায়া, শরীর মুখ চাদরে ঢাকা, বুকের কাছটা একটু উঁচু। বলে, বাবারা মোরা বড় দুঃখি, মরা মানুষ। মরা মানুষগো জানে মাইরেন না। নৌকায় উইট্টা দেহেন, মোগো লগে কিচ্ছু নাই, সের দুই চাউল, ইক্টু ডাইল আর নুন মরিচ আর লগে কিছু ঘডিবাডি...। 

ঠিক আছে। তোমাদের কেউ মারবে না। শামছু বলে, নাম কি তোমার ? কোথায় যাচ্ছো এতো রাতে? 

বেনাপোলের দিক, হেয়ারপর কইতে পারি না কপালে কি আছে মোগো। 

কি নাম? 

মোর নাম হরিপদ, হরিপদ বালা হুজুর। সাং রাজাপুর। আর থাওন গেল না হুজুর, থাওনের ভিডাডাও দখল অইয়া গেছে। 

হঠাৎ আমার চোখে পড়ে, হরিপদ কাপড়ে মোড়া কিছু একটা বুকের সঙ্গে আকড়ে ধরে আছে। 

বুকের সঙ্গে আকড়ে ধরে আছো ওটা কি হরিপদ ? 

এই প্রশ্নে সহসা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে হরিপদ বালা। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, ভিডার ইট্টু মাটি হুজুর, মোগো চৌদ্দপুরুষের চিহ্ন। মায় কইলো, ভিডার ইট্টু মাডি লগে ল হরি। 


এরপর আমরা হরিপদ বালার পরিবারটিকে বিষখালিতে ভেসে যেতে দেখি।



লেখক পরিচিতি
ইকবাল হাসান,
কবি ও গল্পকার।
জন্ম, ৪ ডিসেম্বর,১৯৫২, বরিশালে, একটি বিদেশি মিশনারি হাসপাতালে।
অর্থনীতিতে স্নাতক।
বসবাস: জার্মানী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবংবর্তমানে কানাডার টরন্টো।
পেশা : দেশে সাংবাদিকতা এবং বিদেশে কখনো ব্যবসা, কখনো স্রেফ শ্রমজীবী।

প্রকাশিত গ্রন্থ : 
অসামান্য ব্যবধান [কবিতা ১৯৮৬, আগামী প্রকাশনী],
মানুষের খাদ্য তালিকায় [কবিতা ১৯৮৬, বইমন্চ],
কপাটবিহীন ঘর [গল্প ১৯৯৪, আগামী ],
জ্যোৎস্নার চিত্রকলা [ কবিতা ১৯৯৭, অনাদি],
দূর কোনো নক্ষত্রের দিকে [কবিতা ২০০০, ব্যতিক্রম],
মৃত ইঁদুরও মানুষের গল্প [গল্প ২০০০, আগামী],
দূরের মানুষ কাছের মানুষ [ব্যক্তিগত নিবন্ধ/এলবাম ২০০০, ব্যতিক্রম],
আশ্চর্যকুহক [উপন্যাস ২০০২, আগামী],
শহীদ কাদরী কবি ও কবিতা[সম্পাদনা ২০০৩, আগামী],
জলরঙে মৃত্যুদৃশ্য [কবিতা ২০০৩, আগামী],
ছায়ামুখ [উপন্যাস ২০০৪, অন্যপ্রকাশ],
কার্তিকের শেষ জ্যোৎস্নায়[গল্প ২০০৪, পারিজাত],
দীর্ঘশ্বাসের পান্ডুলিপি [নিবন্ধ ২০০৪,
পারিজাত], প্রেমের কবিতা [কবিতা ২০০৪, অন্যপ্রকাশ],
ইকবাল হাসানের বারোটি গল্প [গল্প  ২০০৫, অন্যপ্রকাশ],
নির্বাচিত ১০০ কবিতা [কবিতা ২০০৯, অন্যপ্রকাশ],
যুগলবন্দি [কবিতা ও সৈয়দ ইকবালের চিত্রকর্ম ২০১০, রয়েল],
আকাশপরী [কবিতা ২০১০, রয়েল],
চোখ ভেসে যায় জলে [প্রবন্ধ/নিবন্ধ ২০১০,অনন্যা],
সুখলালের স্বপ্ন ও তৃতীয় চরিত্র [গল্প ২০১০, অনন্যা]।
আর্কিটেক্ট [উপন্যাস, রয়েল, ২০১২]
গল্পসমগ্র [গল্প ২০১২, রয়েল], পরী,
হূমায়ূন আহমেদ ও ঝরা পালকের গল্প [মুক্তগদ্য ২০১২, রয়েল],
আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ [সময়, ২০১৬]
একদা চৈত্রের রাতে [রয়েল, ২০১৬],
প্রেম-বিরহের অনুকাব্য [পরিবার, ২০১৬],
নির্বাচিত গল্প [ গল্প, ধ্রুবপদ,২০১৬]
ছায়ামুখ ও আশ্চর্যকুহক [ যুগল উপন্যাস, ২০১৬, অনিন্দ্য ],
কিছু কথা কথার ভেতরে [ পরিবার, ২০১৬],
শহীদ কাদরী স্মারকগ্রন্থ [ সম্পাদনা, বাংলা একাডেমি, ২০১৮] ইত্যাদি।

পুরস্কার : বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার।
শখ: পড়া ও লেখা, আড্ডা, দেশভ্রমণ এবং এসব নিয়ে কোনো রকম বেঁচে থাকা।
প্রিয়স্থান: রাঙামাটি।
--------------------------------------



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন