মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

অমর মিত্রের জার্নাল : তরুণ লেখকরা কী করতে পারেন ও দুই তরুণের লেখা

অনেকে বই পাঠান আমার কাছে। প্রতিদিনই একটি দুটি বই আসে। সব বই পড়ার সময় হয় না। কিছু বই পড়ি। ভালো লাগলে বলি। ভালো না লাগলে বলব কি না ভাবি। আমার কাছে গল্পও আসে মেল কিংবা ইনবক্সে। পড়ার চেষ্টা করি, সব হয় না। হয়ে ওঠে না। আবার হয় হয়তো বহুদিন বাদে, আচমকা এক দুপুরে। পড়তে চাই। এইতো পড়ে আছে ডোরিস লেসিঙের বই, ইশিগুরুর আর একটি উপন্যাস, কবে পড়া হবে জানি না।
হবে আচমকা একদিন। ইন্টারনেট ম্যাগাজিন আছে অনেক, সেখানেও গল্প থাকে, কবিতা কিংবা লেখকের নিজস্ব বোধের কথা। সব পড়া হয় না, কেন না নিজের জন্য অন্তত পাঁচ ঘন্টা দিতে হয়। বিশেষত যখন উপন্যাস রচনায় থাকি দীর্ঘদিন ধরে। এখন যে বড় লেখাটি লিখছি তার জন্য ব্যয় হয়েছে তিন বছর, হয়তো আরো যাবে। পূর্ববঙ্গ গীতিকা এখন আমার সঙ্গে আছে সব সময়। 

তরুণ লেখকরা বন্ধুদের নিয়ে গল্প পাঠের ব্যবস্থা করতে পারেন। আমরা কম বয়সে তাই-ই করেছিলাম। গল্প লিখে পড়ে শোনাতাম আড্ডায়। ১৯৭৪ সালে মেলার দিকে ঘর গল্প লিখে এনেছি মেদিনীপুর থেকে। পাড়ায় রেস্তরাঁয় চা নিয়ে বসে, সেই গল্প পড়ে শুনিয়েছিলাম অগ্রজ নকুল মৈত্র, ভরত সিংহ এবং কৃষ্ণ মন্ডলকে। তাঁরা গল্প লিখতেন। একাল পত্রিকা বের করতেন। এখনো সেই ইচ্ছে যায়নি। কিন্তু হয় না। আমাদের লেখা কিন্তু অগ্রজরা ছাপা হলে পড়তেন কিংবা পড়তেন না। ভালো লাগলে বলতেন, না হলে তিরস্কার করতেন। শ্যামলদার কাছে তিরস্কৃত হয়েছি আবার কুবেরের বিষয় আশয় উপহার পেয়েছি। তাই বলে কি সব লেখা পড়ার সময় হতো তাঁর কিংবা সিরাজদা, দেবেশদা বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ? কোনো কোনো লেখা পড়েছেন। তাঁদেরও সময় কমে গিয়েছিল। 

আমরা অনেকে উপন্যাস লেখার নির্দিষ্ট জায়গা পেয়েছি পঞ্চাশের অনেক পরে। প্রায় ষাটে পৌঁছে। নিজের বড় বড় লেখাগুলি কোথাও ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়নি। ( ব্যতিক্রম আগুনের গাড়ি, সাপ্তাহিক বর্তমা্‌ পাহাড়ের মতো মানুষ, অমৃত ), ধ্রুবপুত্র, অশ্বচরিত ঘরে বসে লিখেছি। এক লক্ষ, দেড় লক্ষ শব্দ, বই হয়েছে সরাসরি। অমুক পত্রিকায় লিখিনি বলে অনেকে চেনেননি। বিশেষত বাংলাদেশে। সে ছিল কঠিন সময়। সত্যযুগ, বারোমাস পত্রিকায়ও উপন্যাস লিখেছি। হ্যাঁ, প্রতিক্ষণে আশ্রয় পেয়েছিলাম আমরা। লিখতে হয় জেদে। 

অগ্রজরা সব সময় পড়ে বলতে পারবেন তা না হতে পারে। এক অগ্রজ লেখক তো বিনা কারণেই আমাদের নিন্দা করেন। সংবাদপত্রে অনাবশ্যক টেনে এনে আমার কুৎসা করেছেন। কেন যে করেন তা জানি না। কিন্তু তাতে হয়েছে কী ? জেদই লিখিয়ে নেয় শত অপমানে। 

তরুণ লেখকরা অভিমানী না হয়ে নিজেদের বন্ধুদের ভিতর লেখা আদান প্রদান করুন। এক সঙ্গে বসুন। লেখা দীর্ঘ দিনের পথ। চড়াই উৎরাই পার হতে হয় অনেক। প্রত্যাখ্যান কম আসে না। সব অগ্রাহ্য করতে হয়। জেদই আপনাকে লেখাবে। কোনো এক তরুণের অভিমানী লেখা পড়ে এই লেখা লিখলাম। সকলের সময় হয় না, তার মানে তাঁরা যে পড়েন না তা না হতেও পারে। আপনি সেই লেখা লিখুন যা আমাকে পড়তে বাধ্য করবে। গোপনে পড়ব আমি। গোপনে পড়বেন তিনি।

দুই তরুণের কথা 
দুই তরুণ সম্বিৎ ও অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, তাঁদের গল্পের বই আমি এবং আমরা এবং মশাট ইস্টিশনের মারটিন রেল’। তাঁরা একই সময়ের ভিন্ন মেরুর দুই লেখক। তাঁরা একই মঞ্চে পুরস্কৃত হয়েছেন, নমিতা চট্টোপাধ্যায় পুরস্কারের বড় ঘটনা এই। সাহিত্য কোন রকমে হবে, কী লেখা হবে, কেমন ভাবে লেখা হবে, তা নিয়ে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম কানুন নেই। বরং নেই বলেই শিল্পী-লেখকরা তা খুঁজে বের করেন নিজের জীবন চর্চা থেকে। আপনার মতো আমি লিখব না, আমার মতো আপনি লিখবেন না, তাইই হবে সাহিত্যের পথ। সাহিত্যের আন্দোলন থেকে যে লেখক নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, তিনিও তাঁর সহযাত্রীদের থেকে আলাদা হয়ে যান। হাংরি জেনারেশন এবং তাঁদের সাহিত্য আন্দোলনের বাসুদেব দাশগুপ্ত, অবনী ধর কিংবা শাস্ত্র বিরোধী আন্দোলনের রমানাথ রায়ের কথা বলা যায় এই প্রসঙ্গে। যাই হোক এই দুই লেখক একই সময়ে লিখছেন, কিন্তু তাঁদের দেখার চোখ আলাদা যে, তা এই দুই লেখককে পাঠ করতে করতে ধরতে পারি। আর এই থেকেই তাঁদের মৌলিকতাও স্বীকার করে নিতে হয়। সম্বিতের লেখায় আছে গোপন পরিহাস, বিদ্রুপ,প্রতিষ্ঠান সমাজ রাষ্ট্রের অন্দরে প্রবেশ করার বিরল ক্ষমতা। অনিরুদ্ধর লেখায় আছে বহমান এই জীবন, বেঁচে থাকা, স্মৃতি বিস্মৃতির বোধ। অনিরুদ্ধ একটু ট্রাডিশনাল, কিন্তু স্বতন্ত্র। সম্বিৎ ভাঙতে চেয়েছেন ট্রাডিশনাল গল্প বলার ভঙ্গি, নিজেকে আলাদা করে নিয়েছেন অনেকের থেকে। সম্বিতের ম্যাকমোহন লাইন, আমি এবং আমরা বা নেগেটিভ দুই গল্পের যে ধরণ তা মশাট ইস্টিশনের মারটিন রেল, নিরুদ্দিষ্ট শকুন ও একটি ভাগাড়ের জন্ম, কিংবা ধুলোপথের রামকথা একেবারেই বিপরীত। অনিরুদ্ধ গ্রাম, তাঁর হাওড়া-হুগলি জেলা চেনেন। সেখানকার মানুষ ও মাটির গন্ধ তাঁর লেখায়। গঞ্জের মানুষ, তাদের জীবন প্রবাহ, বেঁচে থাকা, মরে যাওয়া, গঞ্জের বদল এবং স্থবিরতা অনিরুদ্ধের গল্পের বিষয়। নাম গল্পটির কথা ধরি। সেখানে একটি মানুষ মহীতোষ, যে সমস্ত জীবন অনেক পরিশ্রম করে দাঁড়িয়েছে, ন্যায় করেছে অন্যায় করেছে, জীবনে সফল হয়েছে এবং সেই সফলতার ভিতরে একটি ব্যর্থতা রয়েছে একটি মেয়ের বিয়ে দিতে পারেনি। জীবনে এই অপূর্ণতা আছে। সেই মহীতোষ আচমকা স্নায়ু বিপর্যয়ে শয্যাশায়ী, ক্রমশ মৃত্যুর দিকে পা বাড়াচ্ছে। জীবন-মৃত্যু, সফলতা ব্যর্থতা, শৈশব, মৃত অগ্রজ, বাবা, মা----সব তার কাছে ফিরে আসতে থাকে। তার কন্যাটি অনূড়া। সে-ই তার সেবা শুশ্রুষা করে, মহীতোষ তার জন্যই কষ্ট পান। তার কাছে তার মৃত অগ্রজ যার প্রতি সে অন্যায় করেছিল, আসে। জীবন ও মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণ নিয়েই গল্প। শেষ অবধি অধুনা লুপ্ত মারটিন কোম্পানির রেল গাড়ি আসে। তাতেই চেপে বসে মহীতোষ, সঙ্গে মৃত পূর্বজরা। গল্পটি গভীরতায় নিমজ্জিত করে। পাঠক বিষাদাক্রান্ত হন। অনিরুদ্ধর গল্পে নানা কিংবদন্তী, পুরাণ, আসে। তা তিনি ব্যবহার করেন সাহসের সঙ্গে। বিবরণকে গল্পে পরিণত করতে পারেন চমৎকার। দুই নদী এক নদী গল্পটি চার পাতার। রূপসা নামের একটি মেয়ের কথা আছে। আছে গিয়া নামের একটি অখ্যাত নদীর কথা, আর কটি বালক যারা গিয়া নদীর নাম রূপসা দিতে চায় না। গিয়ার কাছে গিয়ে গল্প কথক যুবক নদীকে নারী হয়ে উঠতে বলে। গল্পটি ক্ষুদ্র, সুন্দর। অনিরুদ্ধর গল্পে এই সময়, রাজনীতির নীতিহীনতা, সমাজ ইত্যাদি এসেছে সহজ গল্পে। চে-র স্বপ্নের পঞ্চায়েত, নিরুদ্দিষ্ট শকুন ও একটি ভাগাড়ের জন্ম সেই গল্প। আবার গল্পের ভিতরে পুরাণ, গল্পের ভিতরে পরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে একজন সচেতন মানুষের কথা আছে। গৃহহীন উচ্ছিন্ন জীবনের গল্প “ চড়ুই”। গল্পের বাস্তবতায় হিম হয়ে আসা এই সময়, পেশাচ্যুত মানুষ। গল্পকে তিনি সরল বাস্তবতা থেকে পরাবাস্তবে নিয়ে যেতে পারেন। চাঁদ বণিকের রূপকথা, এক লোকায়ত মানুষের আশ্চর্য ভ্রমণ সেই গল্প। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে ধুলো পথের রাম কথা, সেই বিধবা বড় পিসির প্রতীক্ষার গল্পটি। যে মেয়েটি সারাজীবন কষ্ট করে গেল, টিউশনি করে পড়ল, বিয়ের পর বিধবা হলো, রামায়ণের শবরীর প্রতীক্ষা পিসির, ভগবান তাঁর ঘরে আসবেন। তার জন্য পিসি রাস্তা ঝাঁট দেয় সবদিন। এই গল্পটি যিনি লিখতে পারেন, তিনি লিখবেন। মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করবেন। বিন্দুতে সিন্ধু দেখবেন। আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করবেন। একজন লেখককে হয়ে উঠতে অনেক শ্রম আর সময় দিতে হয়। গ্রাম গঞ্জের মানুষের ছোট ছোট আশা আকাঙ্ক্ষ্যা অনিরুদ্ধর গল্পে। আমরা তাঁর গল্পের দিকে চেয়ে থাকব। 
সম্বিৎ চক্রবর্তীর গল্প আলাদা যে তা আরম্ভে বলেছি। ম্যাকমোহন লাইন গল্পটির কথা বলি। পড়ে চমকে উঠতে হয়। ম্যাকমোহন লাইন, সেই সীমান্ত রেখা যা নিয়ে যুদ্ধ, সেই সীমান্ত রেখা পেরুলে আপনি অনিরাপদ। পাড়ায় পাড়ায় ম্যাকমেহন লাইন। গল্প আরম্ভ হয় ছোট ছোট বাক্যে। হঠাৎ খেয়াল হলো সীমানা পেরিয়ে এসেছি। সীমানা বলতে সঙ্কীর্ণ একটি খাল, কাল্ভারট, উত্তর দক্ষিণের ভাগ যেখানে। কী আশ্চর্য তাঁর লিখন ভঙ্গিমা, এলাকার দখলদারি, মাস্তানি থেকে গল্প চলে যায় যেন দেশে দেশে সীমান্ত বিরোধের রূপকে। লোকটি ভুল করে উত্তর থেকে দক্ষিণে। ভ্রমণ। তারপর তার ভিতরে উদ্বেগ, দক্ষিণের প্রমাণ করার চেষ্টা, দক্ষিণের লোকের সঙ্গে ভাব জমানোর প্রয়াস, দক্ষিণের লোকের কথায় সন্দেহের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া। আবার উত্তরে ফিরে এলে সেই লোক হয়ে ওঠে শক্তিশালী। ভুল করে উত্তরে ঢুকে পড়া লোককে জেরা করে। সীমান্তে এসে দুজন দুজনকে গা-ধাক্কা দেয়। ছিটকে যায় যে যার এলাকায়। সীমান্তে দাঁড়ালে দুজনের আত্মবিশ্বাস সমান। তাই দুজন দুজনকে ধাক্কা মারতে পারে। সম্বিৎ অতি আধুনিক ভাষায় গল্পের অ্যালিগরি নির্মাণ করেন। অনায়াস বিচরণ দেখলে অবাক হতে হয়। ম্যাকমোহন লাইন যেন সীমান্তরেখার বিপক্ষে লেখকের নিজস্ব কথা। সম্বিতের নাম গল্পটি , ‘আমি ও আমরা’ গল্পটি অনেকটা আত্মপরিচয়হীনতা ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার এক ব্যর্থ প্রয়াসের বিচিত্র গল্প। তিনি গল্পকে নির্মাণ করেন যে কৌশলে তাই তাঁকে ব্যতিক্রমী লেখক হিশেবে চিহ্নিত করে। এই ব্যতিক্রম বাংলা ছোটগল্পে স্বাগত। ফ্রম চর্চা এবং গল্প থেকে কাহিনি লুপ্ত হয়ে যাওয়ায় বিশ্বাস করেন না সম্বিৎ। তাঁর গল্পের কাহিনি আপনাকে ক্রমাগত এক জটিলতায় প্রবেশ করাবে, বিবরে নিয়ে যাবে, তারপর তা থেকে নিয়ে আসবে সদর, মফস্বলে, গঞ্জের যে মাটিতে তা আবার আঞ্চলিকতা মুক্ত হয়ে বড় পরিসরে যুক্ত হয়ে যায়, যেমন গেছে ম্যাকমোহন লাইন। ‘আমি ও আমরা’ গল্পটিতে বসন্ত যাকে মনে করে দেবদাস দত্ত, সে বলে তার নাম অনিমেষ হালদার, অথচ বসন্ত জানে সে দেবদাস। আবার এক গানের অনুষ্ঠানে তাকেই সে আবিস্কার করে শংকরদা বলে। কেউ সেই দেবদাস বা অনিমেষকে শংকরদা বলে ডাক দেয়। সম্বিৎ যেন তাঁর কুশলী কলমে খেলা করতে শুরু করেন মানুষের আত্মপরিচয় নিয়ে। এই লোক, দেবদাস কিংবা অনিমেষ, শংকর ব্যাঙ্কে গিয়ে হয়ে যায় বসন্ত। বসন্তই তা আবিস্কার করে, লোকটি তার নামেই ব্যাঙ্কের কাজ করে বেরিয়ে গেল। বসন্ত বাগচী। প্রথম পর্ব শেষ হয় এখানে। এরপর দ্বিতীয় পর্বে, এল, ডি ক্লার্ক বসন্ত বাগচি নিজের কথা বলে। চেখবের সেই কেরানিই অন্য ভাবে প্রবেশ করেছে যেন এই শহরে। সে চিন্তিত, তার নামে একটা লোক কেন ঘুরছে এই শহরে। সে তার সঙ্গেই যেন লড়াইয়ে নেমে পড়েছে। নিজের সঙ্গে। হ্যাঁ, এই গল্প যে পরিণতিতে যায় তা আমাকে হতবাক করেছে। আমি গল্পটি আর বলছি না, পাঠক পড়ে নেবেন। পড়ার পর অনুমান করতে থাকবেন আরো। সম্বিৎের লেখার ভিতরে যে গোপন পরিহাস থাকে, তা এই গল্পে আছে, আরো আছে চেখবীয় লুকোন বেদনা, নিঃসহায়তা। নেগেটিভ গল্পের সুমনের গণনার অভ্যাস। কিশোরবেলায় সে বৃষ্টির দিনে রাস্তায় কোনো এক আশ্রয়ের নিচে দাঁড়িয়ে সামনের বাড়ির ছাদে ফিরে আসা এবং খোপে ঢুকতে থাকা পায়রা গুণত। মিনিটে ক’ফোটা জল পড়ত শেডের গা দিয়ে তা গুণত। হিসেব করা তার মজ্জাগত। আলাভোলা ছেলে। রেজাল্ট খারাপ। কিছুই করতে পারেনি কিন্তু হিশেব করা ছাড়েনি। এইটি সে পারে। বইয়ের পাতায় হাত রেখে যদি তাকে জিজ্ঞেস করা যায় কত পাতা, সে ঠিক আন্দাজ করে বলে দেবে। ১৫৭ হয়েছে ১৫৫। এই যে ক্ষমতা তার, তা হিশেব করতে করতে হয়েছে, এবং সব দিক দিয়ে ব্যর্থ এই মানুষ যে কত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, গল্পটি সেই দিকে যায়। এই সমাজ, এই জীবন, মানুষের লোভ, নিষ্ঠুরতা সম্বিৎ যে ভঙ্গীতে লেখেন তা অনন্য। আমি মুগ্ধ, সুমন যা দ্যাখে তার ভিতরে গণনা বা সংখ্যার কী ভূমিকা থাকতে পারে, সেইটিই খুঁজে বের করে। তার একটা খবরের কাগজ, বুক স্টল ছিল, পুরসভা তা ভেঙে দিয়েছে, সেখানে বড় মল হলো। সুমন মলে জায়গা পায়নি, কিন্তু পুরসভা একটা কাজ দিয়েছে তাকে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ময়লা সংগ্রহ করা আর ফেলে দেওয়া। সুমন সেই কাজ নিয়েছে কিন্তু গণনা ছাড়েনি। এক জটিল হিশেবে মত্ত হয়েছে। বাড়ির হিশেব। যেমন একশো সাতাশটি ফ্ল্যাটের হিশেব করার সঙ্গে হিশেব করে কটা পুকুর বোঁজান হয়েছে। মাইনাস আর প্লাস। সাতচল্লিশটি বাড়ি উঠল আর উনিশটি গাছ পড়ল...। এই গল্পের সুমন ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে থাকে, নারসিং হোমে কত রোগী ঢুকল, তার ভিতরে কতজন মাইনাস হয়েছে সরকারী হাসপাতাল থেকে। ঘটি মাইনাস, বাটি মাইনাস, ভিটে মাইনাস……...পড়তে পড়তে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে। মহৎ গল্প লিখেছেন সম্বিৎ চক্রবর্তী। প্রতি গল্পই এমন বিচিত্র ভাবে শুরু হয়ে আরো বিচিত্র জায়গায় পৌঁছে আমাদের এই সমাজ পৃথিবীকে একবার দেখিয়ে দেবেন সম্বিৎ। তাঁর লেখার ভিতরে এক জাদু আছে। তা গল্পের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে। 
দুটি বই পড়লাম সম্প্রতি। তাই দুই লেখককে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। একজন চলমান জীবনকে নিয়ে আসেন গল্পে নিপুণতার সঙ্গে, তিনি অনিরুদ্ধ, আর অন্যজন যে বাস্তবতা সৃষ্টি করেন তাঁর গল্পে, তা হতে পারে, না হতেও পারে, কিন্তু হয়েই ওঠে ম্যাকমোহন লাইনের এপার ওপারের মানুষের বাস্তবতা। আর গল্প যে শেষ পর্যন্ত নির্মাণের তা বুঝিয়ে দেন সম্বিৎ। দুজনেই বুঝিয়ে দেন গল্প চারপাশের সেই সব মানুষের যারা ধুলোবালির মতো প্রায়, কীট-পতঙ্গের জীবন যাপন করেন। ভিটে উচ্ছিন্ন চড়ুই কিংবা গাণনিক সুমন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন