মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

পাঠপ্রতিক্রিয়া-- ‘ভালোবাসাকেই ভালোবাসা দিয়ে যাব’ : জয়ন্ত দে’র গল্প

পুরুষোত্তম সিংহ 

‘পেন্ডুলাম’ গল্পের গল্পকারে সঙ্গে পাঠক অবশ্যই পরিচিত। বলার আর অপেক্ষা রাখে না গল্পকারের নাম জয়ন্ত দে।তাঁকে মেধাবী লেখক বলতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এ কোন প্রচার নয়, ‘ভালোবাসার গল্প’ সংকলনের সামান্য ভূমিকা পড়েই বোঝা যায়। ‘ভালোবাসা’ শব্দটিকে তিনি বহুস্বরে নিয়ে গিয়েছেন। ’৫০ টি গল্প’ সংকলনের উৎসর্গ পত্রে পার্থ বন্দ্যোপাধায়কে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন-“ যার কাছে সহজ হওয়ার পাঠ নিয়েছি’- হ্যাঁ তিনি সহজ-সরল ভাবেই বলেন। কিন্তু সেই সহজ-সরলতার মধ্যেই তিনি স্বপ্নের রঙ মিশিয়ে দেন। পাঠক পড়ে চমকে ওঠেন- এমন তো ভাবিনি। আসলে জীবনবোধের বিস্তারই লেখককে এই পর্যায়ে নিয়ে যায়। তিনি জীবনের নানা গলিপথ আবিষ্কারে মত্ত।তাই এ সংকলনের ভূমিকায় বলেন- 

“ তোমাকেই ভালোবাসি। পদ্যে তুমি, গদ্যেও, বিষয় ও বিন্যাসেও। ছাপা আর ফেরত আসা গল্পে তুমি। তোমাকেই ভালোবাসি। মুদ্রা ও মুদ্রাদোষে তুমি। স্বপ্ন ও স্বপ্নদোষে। হস্তরেখা ও হস্তমৈথুনে। গলিপথ ও হাইওয়ে। আমার বন্ধু ও শত্রু তুমি, জন্মদিনের কেক ও বাউন্স করা চেক।মদের ঠেক ও আমার ধরা ভেক,তুমি। আমার প্রতিটি খুনের মধ্যে ও খুন হয়ে যাওয়ার ভেতর। তোমাকেই ভালোবাসি। হে জীবন, হে নৈঃশব্দ,হে সাদা পাতা, হে বিপন্ন অক্ষর। এই কটা পঃক্তি যদি ‘ভালোবাসার গল্প’ এর ভূমিকা হয়, তাহলে সেটা তুমি।“ 

অমর মিত্রের ‘ এই চরাচর এই চালচিত্র’ গল্পে আমরা দেখেছিলাম একটি গ্রাম্য মেয়ের নানা নামের জন্য সে সরকারি টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। গ্রামীণ মানুষের সহজ সরলতা অনুসারে ভূতির নানা নাম বিভিন্ন জায়গায়। ভোটার কার্ডে এক নাম তো রেশন কার্ডে এক নাম। জয়ন্ত দে’র ‘প্রেমপত্র’ গল্পে দেখা যায় গ্রাম্য সুন্দরী ব্রাহ্মণ কন্যার নাম ‘বুঁচি’। প্রথাগত ধারণা অনুসারে সবাই অনুমান করে নেয় এ মেয়ের রূপ কুৎসিত। ফলে বিবাহ বানচাল হয়ে যায়। জয়ন্ত দে গল্পের কাঠামোকে সাজাতে জাতিভেদের( ব্রাহ্মণ- পাল ) দ্বন্দ্ব নিয়ে আসেন। ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিবাহ করা অসম্ভব পাল কিরণবালার পক্ষে। কিন্তু এ সংকলনের নাম যে ‘ভালোবাসার গল্প’। প্রথম গল্পেই তিনি জাত-পাত ভেদাভেদের উর্ধ্বে মানবপ্রেমের শাশ্বত সত্যে উপনীত হন। প্রকাশ পেয়ে যায় বুঁচির প্রকৃত সৌন্দর্য ও আসল নাম সরস্বতী। গল্প কথকের বাবা যিনি বুঁচিকে হারিয়ে দিতে উদ্যোত হয়েছিলেন তিনিই আবার জিতিয়ে দেবার কৌশল আবিষ্কার করেছেন। মনে পড়ে যায় বঙ্কিমের সেই কথা –“ রূপ রূপবানে নাই রূপ দর্শকের মনে।“ সে দর্শকই আজ জিতিয়ে দিয়েছে সরস্বতীকে। ‘এই চরাচর এই চালচিত্র’ গল্পে ভূতিকে উদ্ধার করতে সাহেব লিখে দিয়েছিলেন-‘ডটার অব সাহেব মণ্ডল’। কথকের বাবা কিরণবালাকে দিয়েই আবার প্রেমপত্র লেখায়। জাত- পাতের উর্ধ্বে প্রেমের জয় আমরা ময়মনসিংহ গীতিকাতেই পেয়েছিলাম। আলাওলের নায়িকা ঘোষণাই করেছিল-‘প্রেম বিনে ভাব নাহি ভাব বিনে রস’ –হৃদয়ে যে প্রেমের প্রস্ফুটিত কুঁড়ি আঁকা- একে অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই। প্রথম গল্পেই লেখক জীর্ণতার প্রাচীর ভেঙে অবক্ষয়ের পৃথিবীতে মানবপ্রেমের কথা নিয়ে আসেন। 

## ভারতবর্ষের মত উপমহাদেশে বিচিত্র জাতি, বিচিত্র সংস্কৃতি। বৈষ্ণব কবিরা প্রেমকে পাঁচভাগে ভাগ করেছিলেন।মোহিতলাল, বুদ্ধদেব বসু ও ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর লেখকরা প্রেমের ক্ষেত্রে যৌনতার দাবি মেনে নিলেন। আধুনিক জটিল বিশ্বে মানুষ শুধু এই পাঁচ প্রকার প্রেমেই বন্দি নেই।নানা অবস্থায়, প্রেক্ষাপটে,ক্ষণিক সাক্ষাতে মানুষ বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছে। বনফুলের ‘ডানা’ উপন্যাসের ভাস্কর বসুও স্বীকার করেছিলেন দেহের ক্ষুধা মেটাতে যেখানে –সেখানে যৌন মিলন ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে যেন গণ্ডিবদ্ধ ভাবে বেঁধে রাখা হয়। নারীর একাধিক প্রেম সমাজের চোখে যেন অবৈধ।জয়ন্ত দে ‘দেহনদী’ গল্পে নারীপ্রেমের স্বাধীনতা দেখিয়েছেন। ফ্রয়েডীয় দর্শনে যেমন গিয়েছেন তেমনি নিম্নবিত্তের জীবনধর্মকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। বৃন্দাবনীর কন্যা মধুমতী বা মধুবণী। এ কন্যা রাধামাধব, শ্যামল ঘোষাল ও গোকর্ণ রাই এর মধ্যে কার তা বৃন্দাবনী নিজেও জানে না। বৃন্দাবনীর এই জীবনের জন্য দারিদ্র্যতাই দায়ী। তবে কন্যার প্রতি রয়েছে অগাধ ভালোবাসা। কন্যা মধুবণীও আজ যৌবনে, সেও নানা পুরুষ সঙ্গ করতে চায়। কিন্তু বৃন্দাবনীর সতর্ক ঘোষণা –“বৃন্দাবনী নিজেকে ছিঃ ছিঃ করে। ছিঃ ছিঃ করে আর বলে, ও নেপালি, ও শ্যামলবাবু ওই মেয়ে আমার মতো হোক। বদমাইশ হোক, মধুমক্ষী হোক।” কোন সময় মাতাই কন্যার প্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু আজ মন চাইলেও দেহ আর সাড়া দেয় না।জগদীশ গুপ্তের ‘আদি কথার একটি’গল্পে মাতার প্রতি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও জয়ন্ত দে পক্ষ- বিপক্ষে না গিয়ে ফ্রয়েডীয় মনোবৃত্তির দ্বারা প্রকৃত সত্যে উপনীত হয়েছেন। আর সে সত্য মিলে যায় রাধামাধবের গানের সঙ্গে।লেখক সচেতন ভাবেই এ সংকলনের জন্য গল্পগুলি লিখেছেন বা বেঁছে নিয়েছেন। বাখতিন কথিত যে বহুস্বর তা যেন এ গল্পে শোনা যায়। এক প্রেম বা ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে তিন পুরুষের ত্রিবিধ দৃষ্টিভঙ্গি পাঠক মনে সঞ্চার করে দেন। 

## ‘ কবি জটিলেশ্বর ও একটি নুনের পুতুল’ একটি অসাধারণ গল্প।জীবনের বহুকৌনিক বিস্তারে লেখক পৌঁছেছেন। গল্প সংকলনের ভূমিকায় লেখক ভালোবাসার যে বৈচিত্র্যালয়ের খোঁজে অগ্রসর হয়েছিলেন তা বিভিন্ন গল্পে বিভিন্ন অঙ্গিকে ধরা দিয়েছে। ভালোবাসর সতকাহনের বৃত্ত পরিপূর্ণ করতে বহু অচেনা-অজানা পথে যেতে হয়। এ গল্পের মূল বিষয় একজন প্রিয় কবির প্রতি পাঠকের ভালোবাসা। নগর কলকাতা থেকে বহু দূরে যাঁরা থাকেন তাঁরাই জানেন প্রিয় কবি লেখকে স্বচক্ষে দেখার কী ঐকান্তিক টান, নিবিড় ভালোবাসা। তেমনই একটি মেয়ে বাড়ির পাশে দেখেছে প্রিয় কবি জটিলেশ্বরকে। কবির মনে হয়েছে অনির্দিষ্ট স্থানে মূত্র ত্যাগের জন্য ভৎসনা করবেন- তখনই চমক এসেছে সে কবির এক ভক্ত পাঠিকা। 

## শাক্ত পদাবলিতে মাতা মেনকার বাৎসল্য প্রীতির কথা আমরা সবাই জানি। নবমী নিশীকে অপরাধী করে মাতা মেনকা ঘোষণা করেছিল- ‘ওগো নবমী নিশী না হইয়ো গো অবসান’। জয়ন্ত দে ‘নবমী নিশীথে’ গল্পে গ্রাহস্থ্য জীবনের এক অপূর্ব চিত্র অঙ্কন করেন। দাম্পত্য জীবনের স্নেহমাখা চিত্র যেন এক সরলরেখায় উপস্থিত হয়। অসুস্থ মীরার মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার আজ নবম দিন। এর মধ্যেই ঘটে গেছে সংসারে শ্রীহীনতা।নারীকে ভিত্তি করেই হয় নীড়,আর সে নারী পলাতক হলে নীড় হয়ে ওঠে ‘নষ্টনীড়’।শমিত ও মীরার পরস্পরের প্রতি ভালোবাস আছে কিন্তু নারীর মনে সদা ভয়। এই বুঝি সংসার ভেঙে যাবে, স্বামী আবার বিবাহ করবে। নারী হওয়া বা জননী হওয়া নারীর কর্তব্যের মধ্যে পরে কিন্তু তাঁতে ভালোবাস না থাকলে সংসার টেকে না। সেই ভালোবাসারই গল্প ‘নবমী নিশীথে’। 

## ভালোবাসর এক আশ্চর্য জীবনবোধের গল্প ‘আট ঘন্টার প্রেম’। অনবদ্য মায়াময় গদ্যে বিপরীত বিশেষণে লেখক গল্পরস পরিবেশন করেছেন। ‘বুঝি বা বাল্যপ্রণয়ে অভিসম্পাত আছে’ বা ব্যর্থ প্রণয়ে দেবদাসরা হারিবে যায় তবে কিছু মানুষ তো বেঁচে থাকতে আবার ভালোবাস নামক সৌন্দর্যবৃক্ষকেই বেঁছে নেয়। এ গল্পে একে অপরকে বিবাহ করেনি অথচ বেঁচেছে, বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে, ভালোবাসার স্রোতে ভেসে গেছে। কর্মজীবনের ক্লান্তি কাটতে মানুষ যেন এভাবেই পারস্পরিক অবলম্বন খুঁজে নেয়। গদ্যের নিদর্শন পাঠক নিজেই দেখুন- 

“আমি ভাজা ভালোবাসি। ও বয়েল। 

আমি খরুচে। ও গুছানো। 

আমি পাহাড়। ও গোয়া,পুরী নিদেনপক্ষে দিঘা। 

ওর ক্লস্ট্রোফোরিয়া, আমার ভার্টিগো 

আমার সন্তান হলে ছেলে। শচীন বানাব। ওর আর পাঁচটা মেয়ের মতো ছেলে নয়। ওর মেয়ে। খুবসে সাজবে। 

আমরা পরস্পরকে বিয়ে করিনি। করবও না কখনও। আমার বিয়ে হলে অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে হবে। আমার ফর্সা, সুন্দরী,ঘরোয়া, গৃহকর্মনিপুণা পাত্রী চাই। ওর সুপ্রতিষ্ঠিত, ভালো চাকরি,এন আর আই পাত্র হলে ভালো” 

## “পাঠক ! আপনার ভাল না লাগলেও আমার সাধ্যের শুধু এই “- লেখকের বড় সম্পদ পাঠক। একটি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেলেই তা আর লেখকের থাকে না ,তা হয়ে যায় পাঠকের। লেখক-পাঠকের সম্পর্ক নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘একটি অদ্ভুত প্রেমের গল্প’। আজকের সাহিত্য পরিমণ্ডলে যেমন নানা লেখক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে তেমনি নানা পঠকগোষ্ঠীও আছে। কিছু পাঠক নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট লেখকের লেখা পড়েন। গল্প কথকের সঙ্গে প্রণয় ছিল রিনির। তবে বিবাহ হয় নি, গল্প কথক বিবাহ করেছে মৃণালিনীকে। তবে রিনি ছিল কথকের ভক্ত পাঠিকা, আর মৃণালিনী স্বামীর একটি লেখাও পড়েন নি। কথক মৃণালিনীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সে উত্তর দেয়- “ ময়রা কি তার নিজের দোকানের মিষ্টি খায় ?” মৃণালিনীর প্রতি গল্পকথকের ভালোবাসা যে নেই তা নয় তবে আরো গভীর ভালোবাস পূর্বপ্রেমিক রিনির প্রতি। কেননা রিনি তাঁর ভক্ত পাঠিকা। লেখকসত্তা ও পাঠকসত্তার কোলাজে একাকার হয়ে যায় এ গল্প। 

## রবীন্দ্রনাথের ‘মাল্যদান’ গল্পে যতীন ও কুড়ানির মালা দেওয়ার প্রসঙ্গ পাঠকের অবশ্যই মনে আছে। জয়ন্ত দে’র ‘বাসরঘর’ গল্পে রিনিকে শেষ পর্যন্ত সিঁদুর দেওয়া হয় নি মিহিনের। যুগের ক্ষেত্রে গোত্রান্তর যেমন সত্য তেমনি মধ্যবিত্তের গোত্রান্তর আমরা দেখেছিলাম বিজন ভট্টাচ্চার্যের হরেন মাস্টার চরিত্রে। নারির আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে কানাই আজ সিঁদুর দিয়েছে রিনিকে। বাঙালি নারীর চিরন্তন সৌন্দর্য শাখা সিঁদুরে। কুড়ানির যেমন অন্তিম আকাঙ্ক্ষা সামান্য মালা তেমনি অসুস্থ রিনিরও আকাঙ্ক্ষা ছিল সামান্য সিঁদুর।নারীর এই আকাঙ্ক্ষার কথা উপলব্ধি করেছিল মিহিনের মা। যৌবনকালে মিহিন ও কানাই দুজনেই রিনিকে ভালোবাসতো। কিন্তু মিহিন জয়ী হয়েছে ভালোবাসায়। রিনি আজ মরণাপন্ন, শহরে থাকা উচ্চশিক্ষিত মিহিন আজ বিবাহ করতে অনিচ্ছুক। ‘নারী হৃদয় কে বুঝিবে ‘-শহুরে শিক্ষিত পোষ্টমাস্টার যেমন বোঝেনি তেমনি বোঝেনি মিহিনও। গ্রাম্য যুবক কানাই আজ জয়ী হয়েছে। গ্রামের মেয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গ্রামেরই অর্ধশিক্ষিত কানাই এগিয়ে এসেছে- সেখানে পিছিয়ে গেছে মিহিন। মিহিনরা যেন শহুরে শিক্ষিত হয়ে শিকড় ভুলতে চেয়েছে, নিজের আত্মমর্যদা বাঁচাতে চেয়েছে। জয়ন্ত দে’র বড় গুণ অসাধারণ গদ্যভাষা ও বক্তব্য পরিবেশেন ভঙ্গি। অনাবশ্যক কথা নয় নিটোল গঠনে তিনি গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যান। মূল্যবোধ, বাঙালিয়ানা ও নারী মনস্তত্ত্ব যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। গল্পকে কখনও কেন্দ্রাভূমুখী করে যেমন রাখেন তেমনি কখনও একক পরিসর থেকে বহু স্বরে নিয়ে যান। জীবন যন্ত্রণা, নাগরিক ক্লেদ যেমন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তেমনি গ্রাম্য সমাজ মনস্কতা ও গোষ্ঠীবদ্ধ মননেরও নিবিড় পরিচয় দেন। 

##মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে কুসুম পরিত্যাগ করেছিল শশীকে। শশী যখন ডাক দিয়েছিল তখন কুসুম আর সাড়া দেয় নি। ‘শরীর শরীর তোমার মন নাই কুসুম’- যৌনতাকে অস্বীকার করে জীবনের দাবি কোনদিন সম্পূর্ণ হতে পারে না। প্রেমের ক্ষেত্রে কামের প্রসঙ্গ বারবার স্বীকার করে নিয়েছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী। জয়ন্ত দে’র ‘সিটবেল্ট’ গল্পে যৌন জীবনে ব্যর্থ হবে ভালোবাসহীন সংসার কাটাতে চায় নি মধুরা। সংসার পরিত্যাগ করে চলছে পিত্রালয়ে। এ গল্প এক যাত্রাপথের গল্প। শ্বশুরবাড়ি থেকে মধুরা’র পিত্রালয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে গোবর্ধনের সঙ্গে গপ্পের গপ্প। সেই গল্পে উঠে আসে মধুরার ভালোলাগা- মন্দলাগা,জীবনের দাবি ও জীবনযন্ত্রণা। মধুরার জীবনযন্ত্রণা কেই লেখক ধরতে চেয়েছেন এ গল্পে, সেই সঙ্গে আধুনিক নারীচেতনাবাদেরও যেন আভাস ফুটে উঠেছে। 

##জীবনে নানাভাবে বাঁচার ও জীবনের পর্বে পর্বে ভালোবাসার নানা কৌশল লেখক আবিষ্কার করেন। “ রূপ রূপবানে নাই রূপ দর্শকের মনে”- সেই রূপের খোঁজেই মানুষ অগ্রসর হয় কৈশোর থেকে যৌবনে, যৌবন থেকে বার্ধক্যে। জীবনের নানা দাবি নিয়ে মানুষ কখনও পালিয়ে বাঁচে কখনও বা অভিনয় করে বাঁচে সেই ঘাত প্রতিঘাতের গল্প হল ‘এক ফোঁটা সুখ’। নিখিল ধরিত্রীরা নান কৌশলে বাঁচতে চেয়েছে। নিখিলের পূর্ব জীবন সম্পর্কে জানা গেলেও ধরিত্রী’র পূর্ব জীবন সম্পর্কে লেখক কোন আভাস দেন নি। সে জীবন বোধহয় অবশ্যই ছিল ! সমস্ত অতীতকে অতিক্রম করে শুধুমাত্র বর্তমানকে ভালোবেসে বেঁচে থাকার যে আকাঙ্ক্ষা তা ফুটে উঠেছে এ গল্পে। আবার সমাজবাস্তবতার উপর জোড় দেন ‘মেয়েটা’ গল্পে।এ পৃথিবীতে নারীকে বেঁচে থাকতে প্রতি পদক্ষেপে লড়াই করতে হয়। তমালি-মালবিকার লড়াই ভিন্ন জগতের। মালবিকা ধর্ষিতা হয়েও বেঁচেছে, তমালিকে বাঁচতে হবে ধর্ষকের স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু মালবিকার আজ ভয় বাচ্চা মেয়েটা কিভাবে বড় হয়ে উঠবে- “আমার ওই মেয়েটার জন্যে বড় কষ্ট হচ্ছে- আমি উঠে দাঁড়াতে পেরেছি, মেয়েটা কি পারবে ?” লেখক কোনো স্টেটমেন্ট দেন না নির্ভেজাল ভাবে গল্প বলে যান। এক সরলরেখাতেই তিনি জীবনের ধ্রুব সত্যের আভাস দিয়ে যান। এক সরলরেখাতেই তা যেন শেষ সত্যে উপনীত হয়। ‘হাইওয়ে’ গল্পে সাংসারিক পরিমণ্ডলে থেকেও নতুন জীবনে যেতে চেয়েছে প্রিয়ঙ্কা। ‘সিটবেল্ট’ গল্পের মধুরা সাংসারিক পরিমণ্ডল থেকে বিদায় নিয়ে নতুন জীবনের সন্ধান করতে চেয়েছিল আর প্রিয়াঙ্কা সংসারে থেকেও শেষপর্যন্ত বলরামের ভালোবাসর কাছে পরাজিত হয়েছে। অবিনের প্রতি মধুরার কোনো ভালোবাস না থাকলেও অনির্বাণের প্রতি ভালোবাসা আছে প্রিয়াঙ্কার। আসলে লেখক এই জগৎ রহস্যের ভালোবাসার নানা অখণ্ড দ্বীপ আবিষ্কার করতে চান।মধুরা, প্রিয়ঙ্কা, ধরিত্রী ও রিনিয়া নানাভাবে বাঁচতে চেয়েছে, ভালোবাসার নানা পথ বেঁছে নিয়েছে। কেউ কারো প্রতি দোষারপ নয় বরং অবলম্বন হিসেবে অন্যকে খুঁজে নিয়েছে। আসলে প্রত্যেকেই বাঁচতে চেয়েছে, বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে- জীবনবোধের সীমায় উত্তীর্ণ হয়েছে। 

## বাখতিন কথিত ‘বহুস্বর’ বিভিন্ন আঙ্গিকে ও পরিসরে ফুটে ওঠে এ গল্প সংকলনে ‘ভালোবাস’ শব্দবন্ধন ও অর্থবন্ধনের মধ্য দিয়ে। ‘নতুন বউ’ গল্পে কারো ঘুমের প্রতি ভালোবাসা তো কারো অর্থ বাঁচানোর প্রতি ভালোবাসা। আবার ‘হুলিয়া’ গল্পে মাতা প্রেমহীন পুরুষের সন্তান জন্ম দিতে চান নি। সে জন্য কোনো অনুশোচনা বা অন্তঃদ্বন্দ্ব নেই। তেমনি নতুন বউ কোনো প্রতিবাদ করে নি।আবার ‘প্রসন্নের প্রসন্নতা’ গল্পে পালিয়ে যাওবা স্ত্রীর প্রতিও অগাধ ভালোবাসা রয়েছে প্রসন্নের। শ্বশুরবাড়ির সবাই যখন প্রসন্নের প্রতি বিরূপ ধারণা সঞ্চার করেছে, তখনই সে সমস্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছে। আজ প্রথাবদ্ধ সংস্কার ভেঙে দেওয়াটাই হল গল্পের চমক।প্রসন্ন এখনও চিন্তামগ্ন পালানো স্ত্রীকে নিয়ে,তার রক্ষণ নিয়ে। কেননা তাঁর হৃদয়ে রাক্ষসী ভালোবাস যে আজও বিরজমান- 

“এবার প্রসন্ন মুখ ফেরায়। চৈত্রের দাবদাহের পর কালবৈশাখী এসে চারিদিকে ভাঙচুর করে, ভিজে চুপচুপে গাছপালা চুঁয়ে জল পড়ে,প্রসন্ন সেই ঝড়ে ভাঙা গাছের মতো লাগে।তবু প্রসম্নর মনে হয়, আসন্ন তুমুল ঝড়জলের আগে সে মেঠো ইঁদুরের মতো জীবনযুদ্ধের কিছু রসদ গোপনে সংগ্রহ করে রাখল। এটা তার জন্যে নয়, এটা তার অবাধ্য, অবুঝ,বিপন্ন ভালোবাসার জন্যে !” 

‘বৃষোৎসর্গ’ গল্প পড়তে গিয়ে প্রথমে শরৎচন্দ্রর ‘মহেশ’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সৈনিক’বা নলিনী বেরার ‘হাতিডহর’ গল্পের কথা মনে উঁকি দিলেও জয়ন্ত দে অন্য পথে গিয়েছেন। সংকলনের নাম ‘ভালোবাসর গল্প’ বলেই কি গল্পের পরিণতি এমন মনে সন্দেহ জাগে ? তিনি পশুর জৈবিক প্রবৃত্তির কথা তুলে ধরেছেন।সমগ্র গল্প সংকলনের মধ্যে এটিই হালকা চালে লেখা বলে মনে হয় ! তবে গ্রাম্য জীবনের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা অত্যন্ত বাস্তব।আসলে সময় ও পরিসর যত পাল্টে যাচ্ছে গল্পের বিষয়বস্তুও তত ব্যাপ্তি পেতে চলেছে। উত্তর আধুনিক প্রজন্মের গল্প ‘স্পর্শ’। যৌনজীবনে ব্যর্থ মহুয়া অবলম্বন হিসেবে পেতে চেয়েছিল বাবলুকে।তবে জয়ন্ত দে তো নিছক কাহিনিকার নন। বড় কথাকার কখনই কাহিনি বলেন না। তিনি সদা- সর্বদা পাঠককে গোলোক ধাঁধায় ফেলে দেন। মহুয়া- বাবুলকে কেন্দ্র করে পাঠক যখন মনে মনে একটা কাহিনিবলয় তৈরি করে বসে তখনই তিনি চমকে দেন। বাবলু যেমন নিজস্ব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা আছে তেমনি মহুয়াও অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণু। তীর্ব ক্ষুধা নিয়েও বাবলুর বাড়িয়ে দেওয়া হাত সে প্রত্যাখ্যান করে। 

## এ সংকলনের প্রতিটি গল্পই বিষয় বৈচিত্র্যে স্বতন্ত্র। কোনো সস্তা চমক বা অতিকথন নয় তিনি দৃঢ় পদক্ষেপেই গল্পের শেষে উপনীত হন। সময়ের চিত্র আঁকতে গিয়ে কখনও বা পাঠকের বিবেকবোধকেও নাড়া দিয়ে যান। সকাল থেকে সন্ধ্যা, জীবনপ্রভাত থেকে জীবনসন্ধ্যার প্রতি পদক্ষেপই ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ যেন এক পা’ও অগ্রসর হতে পারে না। তাই লেখক বলেন –“ ইঁদুরের গর্তে ফেলা আমার দুধে দাঁত থেকে আমার দামাল রাতের চিহ্ন, প্রেম- অপ্রেম, পরকীয় আর বাসি রজনীগন্ধা নিয়ে সাজানো আমার ‘ভালোবাসার গল্প’। পড়লে আমি খুশি। না –পড়লেও প্রিয় পাঠক আপনাকে আমি ভালোবাসি।“ 

ভালোবাসার গল্প। জয়ন্ত দে। প্রথম প্রকাশ,২০১৮। সোপান। মূল্য- ২৫০ টাকা।

২টি মন্তব্য: