মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

স্মৃতি ভদ্র'র গল্প : পরি ও একজন মালতি দি'

নারিকেল গাছের চিরল পাতায় দ্বাদশীর চাঁদ দোল খেতেই একটা শীতল বাতাস বয়ে গেলো। শীর্ণ নবগঙ্গায় এক অদ্ভুত ঢেউ উঠলো। বাতাসে কামিনী ফুলের সৌরভ। ঘুমিয়ে পড়া শহর আজ একটু বেশিই শুনশান। হঠাৎ কোথাও তানপুরার সুর বেজে উঠলো। আকাশের একটি দিকভ্রান্ত তারা ওপাশে ছুটে যেতেই সারা আকাশ আলো করে নেমে এল একটি পরি। শ্বেত চন্দনের মতো তার কোমল পা মাটিতে পড়তেই সেখানে কতগুলো কাঁঠাল চাঁপা ঝরে পড়লো। পরীটার পাখা থেকে সোনার মতো আলো মমিন সাহেবের চোখ ধাঁধিয়ে দিলো। বাতাসে তখন চন্দনের সুবাস। বাতাসে আলতো পা ফেলে পরিটা এগিয়ে গেলো নবগঙ্গার দিকে। নবগঙ্গায় ঢেউ বাড়ছে। নদীর জলে পা দেবার আগে পরিটা একবার ফিরে চাইলো মমিন সাহাবের দিকে। পরির ডানায় সোনার আলো। ছু্ঁয়ে দিল মমিন সাহেবকে।

মোহগ্রস্থের মতো সে ছুটে গেল পরিটার দিকে। জলের বুকে নুপুরের ঝংকার তুলে পরিটা তখন মধ্য নদীতে। মমিন সাহেব তখনো উদভ্রান্তের মতো দিক কাল ভুলে ছুটছে পরির পিছনে। নদীর কিনারে এসে ঝপ করে জলে পড়তেই ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গেলো মমিন সাহেব। কোথা থেকে একটা ঘূর্ণি এসে তলিয়ে দিল তাকে। জলের নীচে বাতাসের অভাবে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে ভেসে উঠতে। বুকভরে বাতাস নিতে। 

গোঁ গোঁ আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো কল্পনার। পাশে ঘেমে নেয়ে ওঠা স্বামীর ছটফটানি দেখে একটা জোড়ে ঠেলা দিয়ে ঘুম ভাঙাতে চেষ্টা করলো। 

' কি হয়েছে?' 

উত্তরে কিছু না বলে সদ্য ঘুমভাঙা ষাটোর্ধ মমিন সাহেব নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে। বড় বড় শ্বাস টানেন। বুকের ভিতর সত্যিই বাতাসের অভাব হয়েছিল তার। নিজেকে খুব ক্লান্ত লাগে। 

' প্রায় রাতেই এমনভাবে গোঙাতে থাকো। কি হয়? শ্বাস নিতে কষ্ট হয়?" 

চোখে একটা নিরুত্তর চাহনী নিয়ে মমিন সাহেব তাকায় মধ্য চল্লিশের কল্পনার দিকে। জানালা দিয়ে আসা রাস্তাবাতির হালকা আলোতেও কল্পনার মুখটা পরিষ্কার দেখতে পেলো মমিন সাহেব। খুব উদ্বেগ সেখানে। 

' ঠান্ডা লেগেছে। বুকে কফ। ঘুমের মধ্যে তাই নিঃশ্বাসে কমবেশী হয়। তেমন কিছু না।" কথা শেষে খুসখুস করে একটু কেশে নেয় মমিন সাহেব। 
বাড়ির সামনের দিকে দেবদারুর ডালে, নারিকেল গাছের মাথায় অন্ধকার তখনো ঘাঁপটি মেরে আছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মমিন সাহেব সেই অন্ধকারের দিকে চোখ পেতে দেন। আলোর খোঁজ করেন। সোনার রঙের আলো। পরির ডানার আলো। অন্ধকার সরিয়ে দেওয়া আলো। 

আলো এলো, দিনের আলো। মমিন সাহেবের মনে বিরক্তি। দিনের আলোতে পরি আসে না। 

পরি সবার কাছে আসে না। ছোটবেলা তার মায়ের কাছে পরী আসতো। মায়ের গায়ের রঙ ছিল দুধ সাদা। কোমর ছাপানো চুল আর ঈষৎ বাদামী রঙের চোখে যৌবনে মাকে ইরানী মেয়েদের মতো লাগতো। অসম্ভব সুন্দরী ছিলেন বলেই হয়ত মায়ের কাছে পরি আসতো। যখন পরী আসতো তখন মাকে তার ঘরে দরজা বন্ধ করে রাখা হতো । কেউ সেখানে যেত না। খুব চুপচাপ হয়ে যেতেন মা। কাউকে চিনতে পারতেন না। মায়ের শরীর দিয়ে তখন কামিনী ফুলের ঘ্রাণ বের হতো। একদিন মমিন সাহেব চুপিচুপি মায়ের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে সেই ঘ্রাণ পেয়েছিলেন। 

মমিন সাহেবের পুরানো বাড়িতে কামিনী ফুলের এক বিশাল ঝাড় ছিল। মমিন সাহেবের এই তেতালা বাড়ির চেহারা আগের বসতবাড়ির মতো নয়। সে সময় তা ছিল একান্নবর্তী। বাবা-চাচাদের নিয়ে ২৩ জনের এক বিশাল পরিবার। তার মা ছিলেন এ বাড়ির তিন নম্বর বউ। মমিন সাহেবের বড় আব্বা মানে বাবার সবচেয়ে বড় ভাই ছিলেন খুব পরহেজগার মানুষ। মেহেদি লাগানো লাল দাড়ি আর জোব্বায় তার চেহারায় একটা আলাদা নূর ছিল। উনি নিজে পছন্দ করে এ বাড়ির সবচেয়ে আলাভোলা ভাইয়ের বউ করে আনে মমিন সাহেবের সুন্দরী মাকে। বছর এগারোর মা তখনো প্রায় শিশু। তবে আর পাঁচটা মেয়ের মতো তার পুতুল খেলার শখ ছিল না। তার শখ ছিল গাছ লাগানো। গাছের সাথে ছিল তার অদ্ভুত সখ্যতা। গাছের সাথে বিড়বিড়িয়ে চলতো তার গল্প। তিনি গাছের কাছে গেলেই কেবল কলি ফুল হয়ে উঠতো। বা তার হাতের পানি পেলেই গাছ ফলবন্তী হতো। গাছের সাথে সখ্যতা বাড়াতেই একদিন ভোরে মা একটি কামিনী ফুলের গাছ পুঁতে দেয় বড় আব্বার ঘরের কোণায়। পুব দিকের জানালার ধারে। 

তখনো এ গ্রামে কোনো বাড়িতে কামিনী গাছের দেখা যেত না। 

সেদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই মা ওযু করতে পুকুরপাড় গিয়েছিলেন। অন্ধকার তখনো আড়ম্বর করেই দিনকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলো। পুকুরের একপাশে শিরিষগাছের নীচে কতগুলো গন্ধরাজের ঝাড় ছিল। সেই ঝাড়ের ভিতর কতগুলো জোনাক পোকা আলোর মহড়ায় ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ করেই একটি জোনাক পোকা পরি হয়ে উঠলো। বাতাসের বুকে আলতো পা ফেলে মায়ের পাশে এসে দাঁড়ালো পরি। মা ভয় পাননি। পরির বুক থেকে আসা অজানা ফুলের ঘ্রাণে আকুল হয়েছিলেন শুধু। পরির ডানা থেকে ঝুরঝুর করে কতগুলো সাদা ফুল ঝরে পড়েছিল। মাতাল করা সুবাসে মা আকুল হয়ে এই ফুলের গাছ চায় পরির কাছে। পরি ডানা থেকে এক টুকরো আলো নিয়ে মায়ের হাতে দেয়। সেই আলো হয়ে ওঠে কামিনী গাছ। সেই গাছের সাথেই এই বাড়িতে বেড়ে ওঠে মা। বড় আব্বার ঘরের পুবদিকের জানালায় এরপর কখনও আঁধার আসেনি। পরির কাছ থেকে পাওয়া আলোয় মা ঝলমল করে কামিনী ফুলের সুবাস গায়ে মাখতো সেখানে। আর বড় আব্বা সে আলোর নূর সুরমা করে চোখে মাখতো। 

মমিন সাহেবের এখন অবসরজীবন। মনের সাথে শরীরও এখন অবসরে যেতে চায়। কাশি আর হাঁপানির টানে নিজের উপর বীতশ্রদ্ধ তিনি। পাঁজর ব্যাথা করা কাশি যখন তার শ্বাস প্রঃশ্বাসে আগল দেয় তখন ঘোলাটে চোখ দুটো কোঠর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। নিজের রুগ্নতায় ঘৃণা আসে তার খুব। নিঃসন্তান হবার কারণে বছর পনেরোর ছোট কল্পনার মধ্যে কিন্তু কোন রুগ্নতা নেই। নেই ক্লান্তি। এখনো যখন বিকেলবেলা জবাকুসুম তেলে পাট করে চুল বেঁধে ইস্ত্রি করা মাড় দেওয়া শাড়ি পড়ে এক কাপ চা নিয়ে মমিন সাহেবের কাছে এসে দাঁড়ায় তখন শরীর আর মনে যে বিদ্যুৎ খেলে যায় তা সামাল দেওয়া বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে মমিন সাহেবের পক্ষে। 

' সারা বিকেল এই বারান্দায় বসে কি করো? একটু কোথাও বেরোলেও তো পারো। কি ভাবো এখানে বসে?' 

কল্পনার হাত থেকে চা নিয়ে আবার চুপচাপ সামনের দেবদারু গাছের দিকে মুখ ফিরিয়ে আনেন মমিন সাহেব। কল্পনা জানে না মমিন সাহেব পরির অপেক্ষায় বসে থাকেন এখানে। একটু পরেই থকথকে অন্ধকার জমবে গাছগুলোর মাথায়। আকাশে একটা দু'টো তারা ফুটে উঠবে। আর তখনি আলোর ঘাগরা পড়ে পরী নেমে আসবে। 

' তুমি খুব চুপচাপ হয়ে গেছো। বেশ কিছুদিন আমার সাথে সেভাবে কথাও বলো না। শরীর কী খুব খারাপ?' 

শরীরের কথা মনে করিয়ে দিতেই পাঁজর ভাঙা কাশিটা জাগান দেয়। কাশতে গিয়ে চা ছলকে পড়ে। কল্পনা কাপটা হাত থেকে নিয়ে নেয়। কাশতে কাশতে পাঁজরে আবার বাতাসের টান পড়ে। বিরক্ত হয় মমিন সাহেব। ইশারায় ইনহেলার চায়। 

' তুমি ঘরে গিয়ে বসো' 

প্রবল বিরক্তিতে মাথা ঝাঁকায় মমিন সাহেব। কল্পনা ইনহেলার আনতে ভিতরে যায়। বুকটা চেপে ধরে মমিন সাহেব হাঁপাতে থাকেন। 

দিনের আলো দপ করে নিভে যায়। দেবদারু গাছের মাথায় একটা তারা ফুটে ওঠে। তিরতির করে বাতাস বয়ে যায়। একটা হীরামন পাখি উড়ে এসে বসে মমিন সাহেবের বারান্দার রেলিঙে। চন্দনের সুবাস চারপাশে। আকাশে এখন অসংখ্য তারা। নারিকেল গাছের পাতায় শুধু গুমোট অন্ধকার জমাট বাঁধা। একটা তারা ঝরে পড়লো সেই অন্ধকার পাতায়। সোনার আলোয় ভরে গেল জায়গাটা। বাতাসে কাঁঠাল চাঁপা ফুলের সুবাস। নুপুরের ঝমঝম শব্দে এগিয়ে এলো পরি। হীরামন পাখির পাশে বসলো। মমিন সাহেবের সব রুগ্নতা হারিয়ে গেল। বুকের পাজরে বাতাসের হুটোপুটি। কাঠাল চাঁপার সুবাসে আকুল মমিন সাহেব আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল পরীর দিকে। 

' হাঁপানির টান কমে গেলো ?' 

ইনহেলার বাড়িয়ে দেয় কল্পনা। কল্পনার চারপাশে গাঢ় অন্ধকার। অন্ধকার মমিন সাহেবকে ঘিরেও। নিরুত্তর চাহনির সাথে কিছুটা বিরক্তি মেশানো মমিন সাহেবের। 

এখন ইনহেলারের দরকার নেই মমিন সাহেবের। এই অন্ধকারও ভাল লাগছে না তার। 

বড় আব্বাও অন্ধকার পছন্দ করতেন না। তাই সন্ধ্যা নামতেই সারা বাড়ি আলো দিয়ে ভরে দিতে হতো মাকে। তেলের কুঁপির আলোয় মাকে তখন একটা পরি মনে হতো মমিন সাহেবের। মাকে যেভাবে মনে পড়ে সেভাবে বাবাকে মনে পড়ে না মমিন সাহেবের। বছরের অধিকাংশ সময় বাবা বাড়িতেই থাকতো না। বিভিন্ন দরগাহ বা মাজারে পড়ে থাকতো। বাকি যে সময়টুকু বাড়ি থাকতো তাকে সেভাবে থাকা বলা চলে না। বাড়ির পাশের বটগাছের তলায় অধিকাংশ সময় বসে কি যেন ভাবতেন বাবা। কারোও সাথেই সেভাবে কথা বলতেন না। সংসারে থেকেও বড় বিবাগী ছিলেন মানুষটি। মায়ের সাথে বাবার কোন লম্বা কথোপকথনের দৃশ্য মনে আসে না মমিন সাহেবের। দু'জনেই অদ্ভুত রকমের নির্লিপ্ত ছিল। শুধু প্রতিবার মাজার থেকে আনা দু'টো করে তাবিজ মা আর মমিন সাহেবের বাহুতে যত্ন করে বেঁধে দিতেন বাবা। সে সময় মা পলকহীনভাবে বাবাকে দেখতেন। কোন শয়তানের যেন নজর না পড়ে এজন্য দোয়া পড়ে যখন মা আর ছেলের মাথায় ফুঁ দিয়ে দিতেন বাবা তখন মায়ের চোখে অজানা কারণে পানি দেখা যেত। 

বাবা বলতেন কথা। প্রাণ খুলে বলতেন। আর তা শুধুমাত্র দু'বাড়ি পরের মালতি দি'র বাবা যতীন কাকার সাথে। ছেলেবেলার বন্ধু ছিলেন তারা। যতীন কাকা বাবার হাত দিয়ে সব দরগাহ্তে মানত পাঠাতেন। আর বাবা বাড়িতে এলে নারিকেলের সন্দেশ নিয়ে বটতলায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই সন্দেশের লোভে মমিন সাহেবও যতীন কাকার বাড়ি যেত ঘনঘন। মালতি দি' উঠোনে আলো ছড়িয়ে কাঁসার বাটিতে মুড়ি, নারিকেলের সন্দেশ আর বাতাসা নিয়ে বসতো। মমিন সাহেবকে দেখলেই সে বাটি লুকিয়ে ফেলত মালতি দি'। সুযোগ পেলেই চিল হয়ে ছোঁ মেরে সন্দেশ নিয়ে পালিয়ে যাবেন মমিন সাহেব, সেই ভয়ে। তবে একসময় সে সন্দেশের লোভ হারিয়ে গেলো মমিন সাহেবের। সেখানে জেগে উঠলো আরেক লোভ। মালতি দি'কে দেখার লোভ। চন্দনের মতো শুধু গায়ের রঙই ছিল না মালতি দি'র, তার সুবাসও ছিল চন্দনের মতো। কাঁঠাল চাঁপা গাছের নীচে বসে একমনে কাপড়ে ফুল তুলতো মালতি দি'। তখন বাতাসে চন্দনের সুবাস ছড়িয়ে পড়তো। দু'বাড়ি দূর হতেও সে সুবাসে আকুল হতেন মমিন সাহেব। কোনো পরবে মালতি দি'র আলতা মাখা লাল পায়ে নূপুর যখন ঝমঝম করে উঠতো তখন সেই নূপুর ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিতে ইচ্ছে হতো মমিন সাহেবের। 

' কি হয়েছে তোমার, বলো আমাকে। কাল রাতে গোঙাতে গোঙাতে কিছু বলছিলে।' 

সচকিত মমিন সাহেব নির্লিপ্ততার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। 

' কি বলেছিলাম?' 

কল্পনার মৃদু্ আওয়াজে বলে, 

'পরি' 

মমিন সাহেবের মাথা ঝুকে পড়ে। কোন উত্তর নেই তার। 

' স্বপ্নে পরি আসে?' 

' শুধু স্বপ্নে না, সবসময় আসে।' নির্লীপ্ত মমিন সাহেব বলেন। 

' তোমার মনের ভুল। এ যুগে এসব কেউ বিশ্বাস করে?' 

' কাউকে বিশ্বাস করতে হবে না। পরি আমার কাছে আসে, আলো ছড়ায়। আমার সব রোগশোক পালিয়ে যায়।' 

মানুষটার কি হলো ভাবতে বসে কল্পনা। সারাদিন অসুস্থ শরীরে ঘরে বসে বসে কি লোকটার মাথায় সমস্যা হলো? 

কল্পনাকে আরোও চিন্তায় ফেলে দিয়ে মমিন সাহেব বলে ওঠেন, 

' পরি নয়, মালতি পরি! পরিরা দেখতে মালতি দি'র মতো হয়।' 

' কোন মালতি দি'? পাগলী মালতি?' 

নিরুত্তর একটি চাহনি দিয়ে কথোপকথনে বিরাম চিহ্ন আঁকেন মমিন সাহেব। 

সে বছর দেশে খুব খাবারের অভাব। বড় দুর্যোগের পর সব দেশেই এমন হয়। তবুও যতটুকু সম্ভব ঘটা করেই মমিন সাহেবের বিয়ের আয়োজন করেন প্রায় ফুরিয়ে আসা বড় আব্বা। তখন বড় আব্বাই মা আর মমিন সাহেবের একমাত্র অভিভাবক। বাবা ততদিনে হারিয়ে গেছেন। এক বড় দুর্যোগে বাবা হারিয়ে গেছেন। দেশে বড় পরিবর্তন হয়ে গেছে। সব স্কুলে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' গাওয়া বন্ধ গেছে। তার বদলে ' আমার সোনার বাংলা' গাওয়া হয় সবুজ-লাল পতাকা উড়িয়ে। 

স্কুলের এসেম্বলিতে সুর মিলিয়ে এই গান গাইতে দেখেই এক ছাত্রীকে ভাল লেগে যায় স্কুলে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক মমিন সাহেবের। দশম শ্রেণীর সেই ছাত্রীকে খুব তাড়াতাড়িই বড় আব্বা মমিন সাহেবের বউ করে নিয়ে আসেন এই বাড়িতে। পোলাও, রেজালার দাওয়াত ছিল সেদিন গ্রামের প্রায় সকলের। বটতলায় ছেঁড়া কাপড়ে মানুষের এঁটো বাসনে খাবার খুঁজতে থাকা মালতি দি'কে সেদিনই শেষ দেখেছিলেন মমিন সাহেব। 

মানুষটার সত্যিই মাথার সমস্যা হয়েছে। পরি দেখতে পাগলীর মতো কিভাবে হয়? মমিন সাহেবকে একমনে কিছু ভাবতে দেখে চুপ করে থাকতে চায় কল্পনা। কিন্তু মনের মধ্যে খুব উশখুশ করতে থাকে তার। 

' মালতি দি' একদম পরির মতো দেখতে ছিল। তুমি সে সময় দেখনি মালতিদি কে।' ভাবনা থেকে ফিরে বলেন মমিন সাহেব। 

' থাক, ওসব পাগল নিয়ে ভেবে তোমার শরীর খারাপ করার দরকার নেই।' কল্পনার কথায় প্রবল চিন্তার রেশ। 

শরীরের রুগ্নতায় এখন বিরক্তি অনেক কম হয় মমিন সাহেবের। পরি এসে তার সব মলিনতা সারিয়ে দিয়েছে। শরীরের এই দুর্যোগের সাথে দেশের দুর্যোগের এক অদ্ভুত মিল আছে। সেই দুর্যোগের বছরেই মমিন সাহেবের প্রথম হাঁপানির টান ওঠে। 

মালতি দি' সেদিন খুব ভয়ে ছিল। আর ভয়ে ছিল যতীন কাকা। গ্রামের পর গ্রাম যুবতী মেয়েদের নিয়ে ভয়ে ছিল। একদিন সন্ধ্যার পর যতীন কাকা মালতি দি'কে নিয়ে মমিন সাহেবের বাড়িতে আসেন। 

' মমিন বাপ, আমার মেয়েটাকে কয়দিনের জন্য আশ্রয় দাও। আশেপাশের সব গ্রামের মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। তোমাদের বাড়ির মেয়েদের দিকে হাত বাড়াতে পারবে না, আমি জানি।' 

যে চন্দনের সুবাসের জন্য দু'বাড়ি দূর থেকে মমিন সাহেব আকুল থাকতো তা নিজের বাড়ি পেয়ে কিভাবে প্রত্যাখান করেন মমিন সাহেব। বাড়িময় তখন চন্দনের সুবাস। থরথর মালতি দি' উৎকন্ঠায় সারাদিন ঘরে সিঁধিয়ে থাকতো। কারণে অকারণে সে ঘরে মমিন সাহেবের যাতায়াত বেড়ে গিয়েছিলো। একদিন সে সুবাসেই প্রথম টের পান মমিন সাহেব তার নিঃশ্বাসে টান পড়ছে। বুকের ভিতর বাতাসের অভাব বোধ হয় তার। চন্দনের সুবাস ফেলে তিনি বুক ধরে হাঁপাতে থাকেন। চন্দনের সুবাস লুকিয়ে রাখা দায়। একদিন সন্ধ্যায় খাকি পোশাকের কয়েকজন একটি জিপে করে সেই সুবাস নজরানা হিসেবে নিয়ে গেল মমিন সাহেবের কাছ থেকে। সেদিন রাতেই যতীন কাকার বাড়ি লুট হলো আর দু'দিন পর নবগঙ্গায় ভেসে উঠলেন যতীন কাকা। 

কল্পনা ঘরের আলো নিভিয়ে বেশ আগেই অন্য ঘরে চলে গেছে। তন্দ্রাচ্ছন্ন মমিন সাহেবের ঘর আজ ভরে গেল চন্দনের সুবাসে। পুবদিকের জানালা দিয়ে একটা তারা আকাশ থেকে খসে মমিন সাহেবের বিছানায় পড়লো। বিছানা ভরে গেল কাঁঠাল চাঁপা ফুলে। মালতি দি'র মতো দেখতে পরিটা আজ মমিন সাহেবের খুব কাছে, একদম মুখোমুখি। পরির ডানা থেকে আজ সোনার রঙের আলোর সাথে এক অদ্ভুত উত্তাপ বেরিয়ে আসছে। আপ্লুত মমিন সাহেব হাত বাড়িয়ে ধরতে যায় পরিকে। ডানার উত্তাপ লাগে মমিন সাহেবের চোখমুখে। সে আঁচে বিশ্রী সেই কাশিটা জাগান দিল তার। কাশির দমকে কিছু আঠালো কফ আর লালা গড়িয়ে পড়লো মমিন সাহেবের ঠোঁট বেয়ে। তার বুকের ভিতরে আজ বাতাসের বদলে তাপ প্রবেশ করতে লাগলো। সবকিছু পুড়িয়ে দিতে লাগলো মমিন সাহেবের। কষ্টে চিৎকার করতে চাইলেন তিনি। পারলেন না। সেই বিছানা, সেই ঘর ছেড়ে পালাতে চাইলেন তিনি। পরি থেকে দূরে চলে চাইলেন তিনি। পারলেন না। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন মেঝেতে। 

' কি হয়েছে, এমন করছো কেন? এখানে এলে কিভাবে?' 

হাঁপাতে থাকা কফে, লালায় মাখামাখি মমিন সাহেবকে মেঝে থেকে টেনে তোলে কল্পনা। 

' পরি...পরি' হাঁপানির টান বেড়েছে খুব মমিন সাহেবের। 

' পরি নেই, কিচ্ছু নেই। সব তোমার মনের ভুল।' 

মমিন সাহেবকে ভেজা তোয়ালায় মুছিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দেয় কল্পনা। কাঁধ ঝুকিয়ে হাঁপাতে থাকা মমিন সাহেবকে দেখতে এখন অবিকল তার বড় আব্বার মতো লাগছে! 

মাটিতে লুটিয়ে পড়া বিছানার চাদর ঠিক করতে যায় কল্পনা। 

এলোমেলো চাদর তুলে ঝারা দেয় সে। দুইটি কাঁঠাল চাঁপা ফুল গড়িয়ে পড়ে। কপাল কু্ঁচকে যায় কল্পনার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন