মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত'র গল্প : গাছ

তারপরে রাত করে ঝড় উঠল। 

সন্ধে থেকেই মেঘ জমছিল, থমথমে হয়ে ছিল দিশপাশ। একটা গাছের পাতাও নড়ছিল না। কী যেন একটা ঘটবে তারই ভয়ে বোবা অন্ধকার তটস্থ হয়ে আছে। কান্নার সুরে সুরে একটা শেয়াল ডেকে উঠল বুঝি।

ঘরে বারান্দায় লোক বলাবলি করতে লাগল, ও শেয়াল নয়। শেয়াল কখনও একা ডাকে না। ডাকলেও এমনি কঁকানো কান্নার সুরে নয়। 

শেয়াল ছাড়া এ অঞ্চলে অন্য কোন জানোয়ার আছে বলে তো শুনিনি। শেয়াল যদি না হয় তো, এ আরও অলক্ষণ। 

আস্তে-আস্তে বারান্দার লোকজনও ঘরে আসতে লাগল। আগেভাগেই আগলে পড়ল দরজায়। এখানে-ওখানে যে দু-একটা জ্বলছিল টিপ টিপ করে নিবে গেল। যে যার মনে শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। যা হবার তা ঘুমের মধ্যেই হোক। 

তারপরেই তুফান ছুটল।। 

আগুনের গোলা ছুঁড়তে-ছুঁড়তে গোটা কুড়ি এঞ্জিন যেন ছুটেছে মহাশূন্যে। কেউ লাইন রাখেনি, একে অন্যের সঙ্গে কলিশন বাড়িয়েছে। সে কী শব্দ! কী গর্জন! 

কত যে গাছ পড়ছে, চাল উড়ছে ঠিক-ঠিকানা নেই। নদী থেকে নৌকো ধরে এনে গাছের উপর তুলে দিচ্ছে। এবাড়ির সিন্দুক উড়িয়ে নিয়ে ওবাড়ি ঢুকিয়ে দিচ্ছে। পারাপারের খেয়া বন্ধ, তাতে কী, নদীর এ পারের মানুষকে তুলে নিয়ে বসিয়ে দিচ্ছে ওপারে। 

সিন্দুক-ওড়ানো, মানুষ-ওড়ানো ঝড়। 

দিকে দিকে শোনা যাচ্ছে মানুষের চিৎকার। সু 

সুভঙ্গগবালা মনোরথকে খুব জোরে আঁকড়ে ধরেছে; ‘ভীষণ ভয় করছে’। 

‘চোখ বুজে থাকো’। মনোরথ বললে অস্ফুটে। 

‘কী হবে?’ 

‘মরতে হলে একসঙ্গে মরব। কথা বোলো না।’ 

একটু পরেই আবার কথা বললে সুভঙ্গ। বললে, ‘শুনছ?’ 

মুখ যখন খুলেছে তখন শোনাবেই শোনাবে। মনোরথ কান পেতে রইল। 

‘গঙ্গামণির মা কাদছে’— 

টুকরোটাকরা কত কান্না কত ডাকই তো শোনা যাচ্ছে। 

কেন কাঁদছে তাও সুভঙ্গর বলা চাই। ‘ওগো শুনছ, গঙ্গামণিকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঝড়ে কোথাও উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে।’ 

‘নিলে নিয়েছে’। বাঁধন আরও আঁট করল মনোরথ। 

কিন্তু এ কী, গঙ্গামণির মায়ের কান্না যে সুভঙ্গদের ঘরের দরজায়। ‘ওলো সুভঙ্গ, গঙ্গামণি কি তোদের বাড়ি এসেছে? তোর ঘরে আছে?’ 

ঝড়ের তেজ কিছু কমেছে বটে কিন্তু আলো জ্বালাবার সাধ্যি নেই। দরজা একটু ফাঁক করে বললে, ‘না, আমাদের এখানে আসেনি তো’। 

‘আসেনি? ঘরে লোক কে?’ 

‘তোমাদের জামাই’। দরজার ফাঁকটা কমিয়ে আনল সৃভঙ্গ। গলার স্বরও বুঝি নামিয়ে আনল সঙ্গে সঙ্গে : ‘ভাগ্যিস বেলাবেলি চলে এসেছিল। নইলে এ সময় নদীতে থাকলে, রাস্তায় থাকলে কী হত কে জানে।’ 

কিন্তু ঘরেতে থেকেও তো বিপদ কিছু কম নয়। বিছানায় শোয়া শক্তসমর্থ মেয়েটাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে। 

‘উড়িয়ে নিয়ে গেলে পাওয়া যাবে হয়তো’, ঘরের ভিতর থেকে মনোরথ বলে উঠল : ‘হাঁটিয়ে নিয়ে গেলেই বিপদ’। 

‘যা, দরজা বন্ধ করে দে। জামাই ডাকছে--’ গঙ্গামণির মা ফিরে চলল। 

“কিন্তু তুমি কোথায় ওকে খুঁজবে?’ 

“দেখি’-- অদেখা আকাশের দিকে তাকাল গঙ্গামণির মা। 

ঘরে জলের ছাঁট ঢুকছিল। দরজা বন্ধ করে দিল সুভঙ্গ। চলে এল বিছানায়। যে যার নিরাপদ আশ্রয় আঁকড়ে ধরে আছে। কিন্তু গঙ্গামণি কাকে ধরবে? 

ঝড়ের বেগ আরও কমে এল আস্তে-আস্তে। বৃষ্টিও ঝিরঝির হয়ে এল। বিদ্যুৎও আর ছুরির তীক্ষ্ণ ফলা হয়ে নেই, থেকে থেকে আলোর খানিকটা ঝলক দিচ্ছে মাত্র। 

লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখা যাচ্ছে। টেপা বাতি দেখা যাচ্ছে এদিক-ওদিক। শোনা যাচ্ছে ব্যস্ত মানুষের গোলমাল। 

অনেকেই খোঁজ-তালাসে বেরিয়েছে। গরু-বাছুর লোক-জন গাছ-গাছালি। খেতখামারের কী দশা! কত মাঠ তছনছ হল! কত চাল উড়ে গেল! কে জানে কার কী সর্বনাশের চেহারা! নদীর ঘাটের খবর কী! হাট-বাজারের কোন চিহ্ন-টিহ্ন আছে কিনা। 

দেখা গেল, আশে-পাশে একটা গাছও কোথাও দাঁড়িয়ে নেই। সমস্ত ভূমিসাৎ। 

না, একটা মাত্র খাড়া আছে। আর, সেটা কিনা গঙ্গামণিদের বাগানে। যাই গঙ্গামণিকে খুঁজি গে। সুভঙ্গ উঠে পড়ল : “তুমি যাবে?’ 

অনেকেই উঠে পড়েছে, এসেছে বেরিয়ে। সুভঙ্গদের বাড়ির আর সব পুরুষেরাও। কিন্তু মনোরথ গা করল না। বরং আরও ছড়িয়ে শুলো। বললে, ‘আমার কী দায় পড়েছে। তোমার সই, তুমি খোঁজো গে।’ 

দরজায় ছিটকিনি দিয়ে বেরিয়ে গেল সুভঙ্গ। 

মনোরথের মনে হল আবার কতক্ষণ পরেই আরেকটা ঝড় আসবে নিশ্চয়ই। তারই আশায় চোখ বুজে রইল। 

ঠিক এসেছে। একেবারে ঢেউয়ের মতই উছলে পড়েছে গায়ের উপর। “ওগো শুনছ? মনোরথের গায়ে ধাক্কা মারতে লাগল সুভঙ্গ’। 

‘শুনছি।’ আধো ঘুমের মধ্য থেকে মনোরথ বললে, ‘দরজাটা খোলা রেখেছ কেন? বন্ধ করে দাও’। 

সেদিকে তাকালও না সুভঙ্গ। শুনছ, ‘গঙ্গামণিকে পাওয়া গিয়েছে’। 

এ আবার গায়ে ঠেলা মেরে ঘুম ভাঙিয়ে বলবার মত কী কথা! তবে কি, চমকে উঠল মনোরথ, তবে কি গঙ্গামণি বেঁচে নেই? 

‘কোথায় পাওয়া গিয়েছে?’ 

‘ওর ঘরের কাছেই, বাগানে।’ 

‘তবে কি--’ 

‘না, বেঁচে আছে। কথা বলছে। কথা বলছে?’ 

‘হ্যাঁ গো, কথা বলছে’। 

‘কার সঙ্গে কথা বলছে’? 

‘ওর স্বামীর সঙ্গে।’ 

স্বামীর সঙ্গে? বিছানায় উঠে বসল মনোরথ : ‘কী বলছে?” 

‘দুহাত দিয়ে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরেছে আর বলছে, না, না, না—’ 

‘না-না-না কোন কথা নয়, এ একটা শব্দ।’ মনোরথ আবার শোবার উদ্যোগ করতে লাগল। 

‘শুধু না-না-না নয়’, সুভঙ্গ সর্বাঙ্গে আবার ঝিলিক দিল : ‘বলছে স্পষ্ট বলছে, তুমি যেয়ো না, তুমি যেয়ো না।’ 

‘বলছে?” 

‘চল না, নিজের চোখে দেখবে চল।’ সুভঙ্গ এবার হাত ধরে টান মারল : ‘কত লোক জমায়েত হয়েছে। স্বকর্ণে শুনছে। তুমিও শুনবে চল’। 

এমন অঘটন কে না দেখে! কে না শোনে! চল। তক্তপোশ থেকে নেমে পড়ল মনোরথ। 

কিন্তু যাই বল, গঙ্গাটা কেমন বেহায়া। সবার চোখের সামনে যা করছে--’ সুভঙ্গ লজ্জায় মুখ ফেরাল। 

‘কী করছে?’ 

‘স্বামীকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে আছে, আর গায়েতে গাল লাগিয়ে আদর করছে আর বলছে, তুমি যেয়ো না, তুমি যেয়ো না। শত হলেও স্বামী তো বাঁচা। এত লোক দেখছে—’ 

‘দেখছে তো বয়ে গেল।’ বালিশের তলা থেকে ছোট টর্চটা কুড়িয়ে নিল মনোরথ : ‘স্বামী-স্ত্রীতে আছে, লোকে দেখছে কেন?’ 

‘আহা, কথা বলছে যে—’ 

‘তা স্বামী-স্ত্রীর কথা। অন্য লোকের কী! চল—’ এবার মনোরথই ঠেলা দিল সুভঙ্গকে। 

ঝড়ের জের একটা কাতর হাওয়া শুধু বয়ে চলেছে। বৃষ্টিও আর নেই, গাছের ডাল-পাতা থেকেই পড়ছে যা ফোঁটা-ফোঁটা। 

কতটুকুই বা পথ, মনোরথকে নিয়ে সুভঙ্গ এগিয়ে গেল। 

‘ঐ দেখ।’ বললে সুভঙ্গ। 

দূরে-দূরে দাঁড়িয়ে অনেকে দেখছে। মনোরথও দেখল। 

আর সকলের আতঙ্ক কেটে গেলেও গঙ্গামণির বুঝি যায়নি। সে দুই বাহুতে গাছটাকে বুকের মধ্যে সজোরে জাপটে ধরে তার গায়ে গাল লাগিয়ে বলছে কাতরস্বরে; ‘না, না, না, তুমি যেয়ো না, তুমি যেয়ো না।’ 

শুধু কান্নার মতই তো শোনাচ্ছে না, স্পষ্ট কথার মতই শোনাচ্ছে। আশ্চর্য, মুখে কথা ফুটেছে গঙ্গামণির। 

আর সব গাছ পড়েছে, গঙ্গামণির গাছ পড়েনি। সন্দেহ কী, গঙ্গামণির জন্যেই পড়েনি। তার আকুলতা বুঝি ঝড়কেও হার মানিয়েছে। হাত-পা-একটা ডালও ভাঙতে দেয়নি। যেমন-কে-তেমন নিখুঁত দাঁড় করিয়ে রেখেছে। 

কিন্তু এখন আর ভয় কই? ঝড় কই? বৃষ্টিও তো ধরে গেছে কখন। এবার তবে গঙ্গামণি ঘরে যাক। কী রকম ভরপুর ভিজে গিয়েছে! গায়ে একটা জামা পর্যন্ত নেই। তার মুখের কথা তো শুনেইছে সকলে, তবু ভিড় পাতলা হয় না কেন? 

গঙ্গামণির মা কাছাকাছি হয়েও শেষ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারছে না। পারছে না মেয়েকে ছিনিয়ে নিতে। কী করে পারবে? ওটা যে মেয়ের নিজের এলেকা। অতদূর পর্যন্ত যাবার যে কারু এক্তিয়ার নেই। অন্তত এখন তো নেই। 

শম্ভুপদ বললে, ‘এবার মেয়েকে ধরে নিয়ে চল। বিপদ তো কেটে গিয়েছে’। 

তবু শাসনের সুরে কিছু বলতে সাহস হয় না দেবুবালার। মুখে যে কথাটুকু ফুটেছে তা যদি মিলিয়ে যায়! 

গঙ্গামণির যখন ইচ্ছে হবে তখনই ঘরে ফিরবে। 

কিন্তু কী রকম লোক জমছে দেখেছ? 

তা লোকে দেখতে চায় তো দেখুক না, চোখ মেলে দেখুক। দেখুক কেমন একটা মেয়ে তার স্বামীকে ভালবাসতে পারে ! নির্ঘাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে রাখতে পারে বাঁচিয়ে। দেখুক, আরও দেখুক। কী করে, কিসের জোরে কিসের টানে, বোবা মুখেও কথা ফুটতে পারে! 

‘ও মা, এখনও বুকে করে আছিস?’ সুভঙ্গ একেবারে কাছে চলে এল : ‘তোর স্বামী তো বেঁচে আছে, মরে যায়নি। জ্যান্ত স্বামীকে কি কেউ এতক্ষণ জড়িয়ে থাকে?’ 

সুভঙ্গর দেখাদেখি গঙ্গামণিরও চোখ পড়ল মনোরথের উপর। ও লোকটা এখানে কেন? ও কী চায়? গঙ্গামণি গাছের আড়ালে নিচু হয়ে মুখ লুকোল। আমাদের মাঝখানে ও কেন? 

সুভঙ্গ এগিয়ে এল গঙ্গামণিকে মুক্ত করে নিতে। কতক্ষণ আর এমনি ভিজে কাপড়ে বাইরে পড়ে থাকবি? আর তো ভয় নেই, আকাশে তারা উঠে গিয়েছে। এবার ঘরে গিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোগে। 

কথার সঙ্গে-সঙ্গে সুভঙ্গ ইঙ্গিতেও সুস্ফুট হল। 

পাশ থেকে মনোরথ চিপটেন কাটল : ‘বরং ছোট একটা ডাল ভেঙে নিয়ে যাক। | মানুষ তো জুটল না, ঐ ডালটাকেই পাশে নিয়ে শুক’। 

খবরদার! গঙ্গামণি সুভঙ্গের হাত ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমার জিনিসে হাত দিসনে। সরে যা! লজ্জা করে না? স্ত্রীর সামনে তার পুরুষের গায়ে হাত দিস? আর, দূরে দাঁড়িয়ে তোর স্বামী তাই বরদাস্ত করে? 

শুধু ইঙ্গিতেই মুখর হতে পারল। 

তারপর নিজেই গঙ্গামণি শেষবারের মত গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে, তাকে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে বলে, ফিরে চলল নিজের ঘরে। 

ভিড় ভেঙে যেতে লাগল। 

‘বোবা মেয়ে কথা কয়ে ফেলেছে’। 

‘একটা গাছের জন্যে মানুষের এত টান!’ 

‘লোকে আশ্রয়ের জন্যে ঘরে ঢোকে, আর এ মেয়ে আশ্রয়ের জন্যে বাইরে বেরিয়ে এসেছে।’ ‘মরতে হয় দুজনে একসঙ্গে মরবে, তেমনি ভাবে আঁকড়েছে প্রাণপণে।’ 

‘যাই বল, সতীনারীর মত বাঁচিয়ে দিয়েছে স্বামীকে। বিচ্ছেদ ঘটাতে দেয়নি’। 

নানা জনের নানা রকম বলাবলি। 

পরে আবার খোঁজ নিতে হবে। একবার যখন কথা কইল, বরাবরের মতই কইল কি না। 

‘আচ্ছা, মেয়েটার বোবামি যদি সেরে যায়, শম্ভুপদ কি আবার ওর বিয়ে দেবে।’ 

‘কেন দেবে না? বাধাটা কী?’ 

‘ঐ গাছ’। 

‘রাখো! গাছের সঙ্গে মানুষের বিয়ে’। বলাবলি হাসাহাসিতে এসে ঠেকল। 

ছোট বোন গয়ামণির বিয়ে হয় না যদি না গঙ্গামণি পাত্রস্থ হয়! 

কিন্তু বোবা মেয়েকে কে বিয়ে করবে? তার উপরে কিছুটা জড়বুদ্ধি। কানেও শুনতে পায় না। দেখতে অবশ্য ভাল। যেন রজনীগন্ধার ফুটন্ত ডাঁটি। কিন্তু শুধু উপরউপর দেখিয়েই কি মেয়ে পার করা যায়? 

ভাগ্যিস শুনতে পায় না, কত লোক ওকে গঙ্গা না বলে গোঙ্গা বলে ডাকে। 

কিন্তু তাই বলে ও গয়ামণির সুখের কণ্টক হবে? 

কেন হবে? তোমরা ওর একটা ব্যবস্থা করে দাও। কারু সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দাও। মানুষ না জোটে, ছুরি কঁচি শিলনোড়া যা হোক একটা কিছু নিয়ে এস। ছি ছি, ওদের কাউকে গঙ্গামণির পছন্দ নয়। দরজা-জানলা? দূর! ওদের কি প্রাণ আছে? না, পৌরুষ আছে? 

তবে গাছের সঙ্গে বিয়ে দাও। যে সরল সতেজ গাছটা ওর ঘরের কাছ ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে সেই গাছের সঙ্গে। 

গঙ্গামণি মাথা উঁচু করে তাকাল গাছের দিকে। অনেক পাতা, অনেক ছায়া। কিছুটা আবার ফুল। কিছুটা আবার গন্ধ। 

গঙ্গামণি পছন্দ করল। বেশ নির্ভীক, বলবান গাছ। পুরুষ-পুরুষ দেখতে। একেবারে হাতের কাছটিতে। 

পাড়ায় অনেক বিয়ে দেখেছে গঙ্গামণি। জানে বিয়ের দিন কনে কেমন সাজে, গয়না পরে, কেমন রঙচঙে হয়। বেশ, তবে সে-সব আয়োজন কর। 

তাই বলে কি বলছি আলো হবে, না, বাজনা হবে, না, ভোজ হবে? অত-শত আশা করে না গঙ্গামণি। কিন্তু মুখচন্দ্রিকা তো হবে! আর মালাবদল? বা, তা নইলে বিয়ে কী। সপ্তপদীও হবে। পুরোতের সামনে মন্ত্র আউড়ে শম্ভুপদই করে দেবে সম্প্রদান। 

সবই শাস্ত্রমত হল। শুধু মালাবদলের সময় নিজেরই দেওয়া মালাটা নিজেই গলায় তুলে নিল গঙ্গামণি। আর যখন একলা বিছানায় শুতে গেল, খুলে রাখল গাছের দিকের জানলাটা। থেকে-থেকে, ঘুমের মধ্যে থেকে, তাকাতে লাগল বাইরে। যেমন গাছ তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। সে তো তারই মত বোবা। তারই মত অবোধ। সাধ্যও নেই বোঝে কী কাণ্ডটা ঘটে গেল, কত বড় দায়িত্ব টেনে নিল নিজের উপর। 

কিন্তু যাই বল, বিয়ের পর গঙ্গামণি অনেক শান্ত হয়েছে। গম্ভীর হয়েছে। পাগলামি কমে গিয়েছে। সব সময়ে চোখের সামনে ধীর-স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কী করে তুমি চপলতা কর, উচ্ছৃঙ্খল হও! আগে-আগে যে বিকট শব্দ করত তা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পাশের পুরুষটা ভাববে কী! 

ছাই ভাববে! কিছুই ভাবে না। কিছুই করে না। শুধু সম্ভ্রান্ততায় নিশ্চল হয়ে থাকে। 

শুধু মাঝে-মাঝে মাঝরাতে যখন হাওয়া দেয় তখন শত-শত পাতায় বেজে উঠে গঙ্গামণিকে ডাকে : চলে এস। চলে এস। 

গঙ্গামণি এদিক-ওদিক তাকায় ত্রস্ত হয়ে। না, কেউ নেই। মনোরথ আসেনি এ সপ্তাহে। এখন বেশ নিরিবিলি। অন্ধকার। 

কত রাতে উঠে এসেছে গঙ্গামণি। গাছের নিচে বসেছে চুপচাপ। গাছটাকে ছুঁয়েছে, ধরেছে, আদর করেছে। মনে হয়েছে, এইখানেই তার বাসরঘর। এইখানেই আঁচল পেতে ঘুমিয়ে থাকি। কিন্তু কতক্ষণ বসতে না বসতেই মা এসে ধরে নিয়ে গেছে। এখন আর আগের মত মারধর করে না মা। বিয়ের পর মেয়ে সম্ভ্রান্ত হয়েছে। তার উপর তাকে ঘিরে তার পুরুষ দাঁড়িয়ে! সাধ্য কী তার গায়ে কেউ হাত তোলে! 

দিনের বেলা লোকের আনাগোনায় যাওয়া যায় না কাছে। আর সব রাতেই হাওয়ালাগা পাতার শিরশির শোনা যায় নাকি? বৃষ্টি আছে, বাদল আছে, হাড়কাঁপানো শীত আছে, বেরুনো অসম্ভব হয়ে ওঠে। তুমি তার একটা ব্যবস্থা করতে পারো না? যাতে ঘর থেকে না বেরিয়েই, ঘরের মধ্যেই পেতে পারি তোমাকে। 

গাছ তার ব্যবস্থা করল। একটা সরু ডাল পাঠিয়ে দিল গঙ্গামণির দিকে। 

আর একটু। আর একটু। আর একটু বাড়িয়ে দিলেই জানলা থেকে ছুঁতে পারবে গঙ্গামণি। ইচ্ছেমত পারবে আদর করতে। 

আমার আরও নালিশ আছে। তোমাকে ছাড়া আর কাকে বলব? না, হিন্দুস্থানী মেয়েদের বিরুদ্ধে নয়। তারা তো তোমাকে পুজো করে, তোমার গোড়ায় জল ঢালে। তা ঢালুক। তাতে আপত্তি কী! তোমার গায়ে যে সিঁদুর লাগাতে চেয়েছিল, তখন ধমকে দিয়েছি। না, ছোঁয়াছুঁয়ি হতে দেব না। তারা তাই মেনে নিয়েছে। উলটে সিঁদুর আমার মাথায় মাখিয়ে দিয়েছে। কেমন দেখতে হয়েছে বল দেখি? 

নালিশ তবে তোমার কার বিরুদ্ধে? 

ঐ মুখপোড়া মনোরথটার বিরুদ্ধে। পাশের বাড়িতে ঐ যে আমার বন্ধু থাকে, সুভঙ্গ, তার বর। মাঝে-মাঝে আসে, দু-একদিন থেকেও যায়। আর ওদের ঘরের জানলা দিয়ে আমার ঘরটা দেখা যায়, তাই ও ওদের জানলায় দাঁড়িয়ে আমার ঘরের মধ্যে ইশারা পাঠায়। দপ করে রাগ হয়ে যায়, এমন ইশারা। তুমি যদি দেখ! দেখলে তুমি যে ওর কী করবে তার ঠিক নেই। 

কী ইশারা করে ! 

বলে, রাতে ঘরের দরজা যেন খুলে রাখি, ও আসবে। 

ওর বউকে বলে দিতে পারো না? 

আমি কি কথা কইতে পারি যে সব বুঝিয়ে বলব? কী ভাবে বোঝাতে চাইব আর ও কী ভাবে বুঝবে তার ঠিক কী। তা ছাড়া ওকে বলতে যাব কেন? তুমি আমার আপনজন, তোমাকে বলব। তুমি তার প্রতিবিধান করবে। শাস্তি দেবে। 

শাস্তি দেব? আমার কী সাধ্য! 

সাধ্য নেই তো স্বামী হয়েছ কেন? নিজের স্ত্রী থাকতে পরস্ত্রীর দিকে লালসা করবে তুমি স্বামী হয়ে তার শাসন করবে না? চুপ করে সহ্য করে যাবে? তোমার এত শক্তি এত তেজ কোন কাজে লাগবে না? 

দেখি। ভাবি। 

তুমি যদি কিছু না কর তো না করবে, কিন্তু আমার দুঃখের কথা তোমাকে বলে বাখলাম। তুমিও বোবা আমিও বোবা। বোবার অন্তরের দুঃখ আর কে বুঝবে? আমার কথা কইতে না পারার অতলে যে একটা কথা আছে, তার ভাষা একমাত্র তোমারই জানা। 

গাছের তলায় বসে গঙ্গামণি কাঁদতে লাগল। 

তারপর, দিনের পর দিন, কী দেখল? দেখল, গাছ পাঁচিলের উপর দিয়ে আরেকটা ডাল সুভঙ্গেদের বাড়ির দিকে বাড়িয়ে দিল। যে জানলায় মনোরথ এসে দাঁড়ায় ঠিক সেই জানলাটা লক্ষ্য করে। ক্রমে-ক্রমে গুচ্ছ গুচ্ছ পাতা গজিয়ে দিল। 

ঠিক হয়েছে। দুই জানলার মাঝে আড়াল গড়ে উঠেছে। মনোরথ আর স্পষ্টাস্পষ্টি দেখতে পায় না গঙ্গামণিকে। ইশারা করতে পারে না। জানলা খোলা রেখে নিজের ঘরের মধ্যে নড়তে-চড়তে পারে গঙ্গামণি। তার আপন পুরুষের সঙ্গে কথা কইতে পারে, কথা কইতে না পারার সব অপরূপ কথা। 

কে বলে প্রাণ নেই, ইচ্ছে নেই, ভালবাসা নেই? কে বলে প্রতিকার করতে জানে না? গঙ্গামণি সুভঙ্গদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসে। আমাকে আর দেখবে কী? এখন শুধু আমার পুরুষকে দেখ! যে সমস্ত কিছু পূর্ণ করে আচ্ছাদন করে, সেই তো পুরুষ। 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল কী? সেই যে ঝড়ের উত্তেজনা গঙ্গামণির মুখে কথা ফুটেছিল তা স্থায়ী হল কই? 

ঝড় শান্ত হয়ে যেতে গঙ্গামণিও শান্ত হয়ে গেছে। আর ভয় নেই, তাই আর কথাও নেই। যেমন বোবা তেমনি বোবা হয়ে রয়েছে। 

প্রতিবেশীরা বললে, ‘কথা যখন একবার ফুটেছিল তখন নিশ্চয়ই আবার ফুটবে’। 

‘শুধু গাছের উপরে একটা আঘাতের ভয় সৃষ্টি করতে পারলেই ফল হবে হয়তো’। অনেক যুক্তি-তর্ক খাটিয়ে মনোরথই কথাটা দাঁড় করাল। 

কথাটা শম্ভুপদর কাছে খুব অসার মনে হল না। স্বাভাবিক স্ত্রীর মত গঙ্গামণি তার স্বামীকেই মনে-প্রাণে ভালবাসে। আর এইখানে আঘাত পড়লেই তার চরমতম যন্ত্রণা। যন্ত্রণা হলেই আবার কথা বলে ওঠবার সম্ভাবনা। 

একবার শোনবার পর সকলেরই আবার নতুন করে শোনবার লোভ। 

কিন্তু তাই বলে সমূলে সমস্ত গাছটাকে কেটে ফেলবার আয়োজন করতে শম্ভুপদ রাজি নয়। 

‘না, না, সমস্ত গাছটাকে কাটা নয়। তাহলে হয়তো মেয়েটাই মরে যাবে।’ বললে অন্য প্রতিবেশী। 

‘আমি বলি কী, এক-আধটা ডাল আগে কেটে দেখা যাক, কী রকম হয়’। মনোরথ বললে হিতৈষীর ভঙ্গিতে : ‘তারপরে না হয় সমস্তটার কথা ভাবা যাবে।’ 

তাই ভাল। যদি একটা ডাল কাটলে কিছু ফল পাওয়া যায়, তাহলে আরেকটা ডাল। এমনি ক্রমে-ক্রমে। 

একটা ডাল কেটে ফেলতে আর কতক্ষণ! গভীর রাতে সব যখন ঘুমে চুপচাপ, তখন কাটারির দু-ঘায়েই ডালটা কেটে ফেলল মনোরথ। সেই পাঁচিলের উপরকার শত্রু ডালটা। 

সকালে উঠে টের পেল গঙ্গামণি। পুব দিকটা কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। এ কি সেই ডালটা কোথায়? ওপারের জানলায় যে মনোরথ দাঁড়িয়ে। 

কিন্তু আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় গঙ্গামণির মুখে কথা কই? এ যে দেখি শুধু কান্না, শুধু চুল ছেড়া, মেঝে-দেয়ালে রক্তাক্ত কপাল ঠোকা। 

নায় না, খায় না, ঘুমোয় না, গঙ্গামণি একটা কান্নার সমুদ্র। 

তার যত কথা যত নালিশ সব তার পুরুষকেই। সমস্ত উচ্চারণ সেই অতলান্ত স্তব্ধতায়। 

তুমি আমাকে জাগিয়ে দিলে না কেন? দেখতাম কেমন তোমার বাহুতে কোপ মা’রে! তুমি নীরবে সব সহ্য করলে কেন? অত ভালমানুষ হলে কি চলে? তোমাকে মারবে আর তুমি তা ফিরিয়ে দেবে না ? ডালটা কেটে ফেলে আবার কেমন তা দিব্যি নিয়ে গেল। তুমি নিয়ে যেতে দিলে? প্রতিশোধ নিলে না? না, না, তুমি নাও প্রতিশোধ। আমাকে তৃপ্তি দাও। মুখ বুজে সব সহ্য করে যাওয়া কোনও কাজের কথা নয়। তোমার যে প্রাণ আছে টান আছে তা প্রমাণ করো। মনোরথ হাসে। বলে, ‘একটা ডাল কাটলে কিছু হবে না, সম্পূর্ণ গাছটাই শেষ করে দিতে হবে।’ 

কিন্তু তার আগেই আরেকটা ঝড় উঠল। 

মেঘে-বিদ্যুতে ঝড় নয়, এ ঝড় রক্তে আর আগুনে, লুটপাটে, খুনখারাপে। ছুরি-ছোরা বন্দুক-মশাল নিয়ে পঙ্গপালের মত দুর্বৃত্তের দল বেরিয়ে পড়েছে। গাঁ-কে-গাঁ উজাড় করে দিচ্ছে। হাতের কাছে পাচ্ছে আর কাটছে, বাড়ি-ঘরে আগুন লাগাচ্ছে, জরু-জেওর বাগে পেলেই চুরি করে নিচ্ছে। 

সে এক চরম সর্বনাশের প্রহর! 

যে-যে-পথে পার পালাও। একব। একলক্ষ্যে। আর কিছু নয়, শুধু প্রাণটুকু বাঁচানো। কী গেল-থাকল, আর কোন হিসেব নয়, শুধু নিশ্বাসটুকুর হিসেব। 

শম্ভুপদের গ্রামও বেরিয়ে পড়েছে পায়ে হেঁটে। ঘুরপথে। বন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। নদীনালা সাঁতরে। 

আশ্চর্য, সীমান্ত পর্যন্ত তারা পৌঁছল নিরাপদে। 

‘আপনাদের কিছু খোয়া যায়নি?’ সীমান্তের অফিসর জিজ্ঞেস করলে। 

শম্ভুপদ বললে, ‘না।’ 

‘তবে এই দুই মহিলা কঁদছে কেন’? অফিসর সুভঙ্গ আর গঙ্গামণির দিকে ইঙ্গিত করল : ‘কোন অত্যাচার হয়েছে নাকি?’ 

‘না।’ শম্ভুপদ সুভঙ্গকে দেখিয়ে বললে, ‘ওর স্বামী খুন হয়েছে, আর এর স্বামী--’ 

একবার বুঝি অলক্ষ্যে টোক গিলল শম্ভুপদ : ‘এর স্বামী আসতে পারেনি।’ 

আসতে পারেনি? খুন হয়ে যাওয়ার চেয়ে আসতে না পারাটাই যেন বড় খবর। 

অফিসর খাতা-পেন্সিল বাগিয়ে ধরল। ‘ওর স্বামীর নাম কী?’ 

নাম? স্বর্গ-মর্ত খুঁজতে লাগল শম্ভুপদ। 

তারপরে অফিসরকে একপাশে একটু টেনে নিল। বললে, ‘মেয়েটা বোবা। আর যে ওর স্বামী, যার সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছে, সে একটা গাছ’। 

‘গাছ?’ চট করে কণ্ঠস্বরটা শুধরে নিল অফিসর। গঙ্গামণির দিকে এগিয়ে এসে চোখ-মুখ উজ্জ্বল করে বললে, ‘তাহলে আপনি কঁদছেন কেন? আপনার স্বামী তো বেঁচে আছে। আপনার তবে কিসের ভাবনা?’ 

ভাবনা করার কিছু নেই? ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল গঙ্গামণি। 

‘সে যেমন আছে তেমনি থাকবে। তাকে কেউ মারবার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাববে না। সে আপনার জন্যে প্রতীক্ষা করবে। আবার একদিন দেখা হবে আপনাদের।’ 

দেখা হবে? কথা কিছু শুনতে পারে না গঙ্গামণি তবু তার ভাসা-ভাসা চোখ আলোতে-আশায় ভরে উঠল। 

‘আমরা শিগগিরই একদিন দলবল নিয়ে সেখানে যাব।’ বললে অফিসর, ‘আপনি আবার আপনার ঘরবাড়ির দখল পাবেন। ফিরে পাবেন স্বামীকে। দেখবেন সে ঠিক আপনার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ি আগলে।‘ 

দাঁড়িয়ে আছে। সুভঙ্গ কাঁদুক, গঙ্গামণি তার চোখের জল মুছে ফেলল। তার স্বামী মরেনি। সে ঠিক দাঁড়িয়ে আছে। অটল সহিষ্ণু একনিষ্ঠ। 

রচনা (১৩৭১)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন