মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

অনামিকা'স জার্নাল-চাই ল্যাটে: ম্যাডোনা মার্জার-সুন্দরী, ভুবনগ্রাম ও আরশি গ্রাম


অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় 

বছর শেষ। রাত জেগে ছাত্রদের খাতাপত্র দেখবার মাস। শীতশীতুরে সকালে এক গামলা কফি নিয়ে খাতা দেখতে বসেছি। বাইরে বারো ডিগ্রী। মানে মাইনাস। বরফ পড়া শুরু হয়েছে। এই বরফ ঠেঙ্গিয়ে মিটিঙে যেতে কার আর ভাল্লাগে। কেঁচে গেলে ভালো হয় ভেবে মেইল-বক্স সামনে খুলে রেখে এক কাপ গরম কফিতে মুখ দিয়েছি। লিভিং রুমের জানলা দিয়ে দেখি ম্যাডোনা পা টিপে টিপে যাচ্ছে আমাদের গেস্ট-পার্কিং এর  দিকে। 

বোঝো, এই বরফে আবার বাইরে বেরিয়েছে। এই এখুনি সামান্থা চিল্লামিল্লি করবে। তার ওপর তার আছে ইয়ে, মানে ওই জাপটে ধরে গল্প করার অভ্যেস।

ব্যাক-ইয়ার্ডের দরজায় দেখা হলেই দেড়-হাজার অভিযোগ শোনাবে। এই ম্যাডোনা পরশুদিন কি করলো; গেস্টদের কফির সামনে পা তুলে অটোম্যানে বসে পড়েছিল; এইসব। 

হয়েছে কি, ম্যাডোনা হোল এক ধুরন্ধরী বেড়াল। সে দেখতে যেমন সুন্দরী, তেমন তার দাপট। সে তার লেজ দেখলেই মালুম হবে। প্রায় এক ফুট কুঁকড়ে থাকা চমরী গাইয়ের মত ঝাঁটালো পশম লেজ। আর তাকে নিয়েই যত গোলমাল। সামান্থার বর মার্ক প্রায়ই ট্যুরে যায়, আর এই বেয়াদপ, অবাধ্য বেড়ালকে নিয়ে প্রায়ই নতুন নতুন দুর্ভোগ পোয়াতে হয় তাকে। এই তো সেদিন হাডসনদের উঁচু ম্যাপল গাছে চড়ে বসেছিল। পেডারসন'দের ছোটো ছেলে দেখে খবর দেয়। সে এও বলে যায়-- তার মা অনেক বলা সত্ত্বেও নাকি নামেনি ম্যাডোনা। আমার ছেলেও একদিন রাতে ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে সামান্থার সাথে বেরিয়ে খুঁজে এনে দিয়েছিল এই সোহাগিনিকে। এসব অভিযোগ শুনে খুবই মন-মরম খারাপ হয়ে যায় সামান্থার। তার ওপর পাড়ায় নাম খারাপ হয়ে যাচ্ছে, এই ভেবে সে খুব বিমর্ষ হয়েই থাকে। আর আমায় দেখতে পেলেই সেই সব দুঃখের কাহিনী শোনায়। আমি ভ্যাবলা মুখে শুনি আর ভাবি - আহারে বেচারি সামান্থা। এরচে' দু'চার খানা মানুষ ছানাপোনা থাকলে শান্তিতে থাকত বেচারি। 

এমনিতে কিন্তু গোড়াতে এমন বেয়াদপ সে অবশ্য ছিলনা। মাত্র ৫ সপ্তা বয়েসে এসেছিল। তাকে আনার দিন সামান্থা আমায় নিয়ে গিয়েছিলো। তার জন্যে ফ্লোর কুশান, কম্বল, বিছানা সব কিনলুম পেট সাপ্লাই এর দোকান ঘুরে ঘুরে । বাড়ি এসেই সেই বিছানায় ম্যাডোনা এক জব্বর ঘুম দিল। উঠে তার নানারূপ প্ররর, গ্ররর সুরেলা ডাকে আমি আর সামান্থা ভরপুর আহ্লাদিত। যাক পাতি পাঁচটা বেড়ালের মত শুধু মিউ মিউ করেনা তবে। মার্ক তখন ছিলনা। এদিকে মার্ক আসার পরদিন থেকেই নাকি তার মেজাজ যায় বিগড়ে। আদুরে ডাক-ফাক দূর থাক, সে তখন বাড়ি ছেড়ে নানা ফিচলেমি করে ঘুরে বেড়ায়। এদিকে রাস্তায় বেড়াল ছেড়ে দেওয়া আইনত অন্যায়। কিছুদিনের মধ্যেই সে একটি জ্বালাতনি জিলিপি হয়ে ওঠে। খাবারের ব্রান্ড পাল্টালে গুমোর দেখায়। পাশের বাড়ির কুকুর কে জানলার ভেতর থেকে মুখ খিঁচোয়। পাখী থেকে মানুষ কাউকেই তার মনে ধরেনা । হাজার আদর করলেও সামান্থা ছাড়া আর কারুর প্রতি ভব্যতা দেখায়না। আর সর্বশেষ, সামান্থার ডায়াবেটিক মাকে হাতে-পায়ে আঁচড়ে দেওয়া। সারা হাত-পা ঘা নিয়ে এখন ডাক্তারের কাছে ছুটছেন তিনি। আর লিটার মানে হাগু-মুতু নিয়ে নিয়ে তো... যাকগে, যাকগে । মার্ক দেখে শুনে বল্ল- একে যদি আমরা ট্রেন না করতে পারি, তবে ইশকুলে ভরতি করে দাও। 

শেষ অব্ধি তাকে, টিফিন বাক্স, চামচ, তোয়ালে, খাতা ব্যাগে গুছিয়ে 'কিটি অবিডিয়েন্স' ইশকুলে ভরতি করে দিয়ে এলো একদিন সামান্থা। সকাল দশটা থেকে চারটে। গত দশ বছরে এরকম অনেক ইশকুল খুলেছে, বেড়াল ও কুকুরদের জন্যে বিশেষ করে। এই সব ইশকুলের সুবিধে হোল, অন্য বাড়ির বেড়ালরাও আসে, ফলে সোশ্যাল স্কিল অনেক ভালো হয়। সামান্থা একদিন গ্যারাজ পরিষ্কার করতে এসে আমায় বল্ল-- 'ইশকুলে বলেছে ম্যাডোনা'র আইকিউ খুব কম। ভাবো একবার-- আমরা তো ভাবতুম অহংকারী আর বদ স্বভাবের। আহা, বেচারি মনে হয় বুঝতেই পারেনা কি বলছি। বুদ্ধিটাই তো কম। তিনটে পরীক্ষাতেই নাকি ফেল করেছে, আরেকটায় টায়ে-টূয়ে পাশ। ক্লাশেও মন দিয়ে শেখেনা না নাকি সে। শুধু ল্যাজ তুলে ঘুমোয়।' চোখে জল নিয়ে বলে সামান্থা। 

কয়েকদিন গেছে। সামান্থা কদিন বাড়ি নেই। তাই আর খবর নেওয়া হয়নি। 

শীত তো এসেই গেলো। এখনই । সামনের হপ্তায় বরফ পড়বে, মঙ্গলবার। প্যাটিও তে চেয়ার-টেবিল সব ঢাকা দিয়ে রাখছি সময় পেলেই। কিছু কাঠ আর স্টারটার-লগ কিনে আনতে হবে, ফাইয়ার-প্লেসের। 

এইসব ভেবে দোকান যাবো যাবো করছি। দেখি উল্টোদিকের অ্যান্ডারসন-বাড়ির বব, কাঁপা কাঁপা হাতে বাগানে কাঠ চেরাই করতে এসেছে। সব্বোনাশ। বব তো ভালো চোখেই দেখেনা। চুরাশী বছরের বৃদ্ধ। একা একা পুরো বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। একদিন কি দুদিন বাজার যায়, আস্তে আস্তে গাড়ি চালু করে। 

এদেশে এসে বয়স্ক মানুষ দেখলেই আগে হামলে পড়ে উপকার করতে যেতুম। দেশে বয়স্ক মানুষদের আমরা যেমন করি। পরে ঠেকে শিখেছি, ওরম গা-জোয়ারি উপকার তাদের না-পসন্দ একদম । মুখে ভদ্রতা করলেও, জোর দিয়ে বলে দেবেন-' আই ক্যান। থ্যাংকস দো'। তা মাঝে মাঝে এতোই শীতল প্রত্যাখ্যান যে, হাত নিশপিশ করলে সাহায্য করার জো তেমন থাকেনা। 

যাবো কি যাবনা, ভাবছি। যদিও ববের সাথে আমার খুব ভাব, আমার ছেলেও গিয়ে গল্প করে। এই তো সেদিন ববকে বল্লাম--' শোন তোমার চেয়ে বেশী বয়সী ঠাকুরদা আছেন আমার। চুরানব্বই। রোজ হাঁটতে যান। দোকানে গিয়ে দাড়ি কেটে আসেন। দিদিমা আছেন, সাতাশি। তিনি গত মাসে হিমালয়-গঙ্গোত্রী হেঁটে উঠেছেন। এমন বয়েসে এতো কিছু বুড়ো হওনি তুমি। মন খারাপ করবে না'। 

ভাবতে ভাবতে কোটটা গলিয়ে চলেই এসেছি ববের বাড়ি। ফেন্সের বাইরে থেকে বললুম-- ' বব, দরকার আছে খুলে দেবে ?'

বব স্নিগ্ধ হাসি হেসে এসে বল্ল ঃ তোমার সব ভালো তো, ছেলে ঠিক আছে ? 

--হ্যাঁ সে তো আছে, কিন্তু তুমি কাঠ কাটছ কেন ? আগে তো কখনো কাটনি। 

--চেলসি ক্রিসমাসে কাঠ জ্বালাত। পুরো শীতকালটাই। কত দিন ফাইয়ার-প্লেসে আগুণ দেওয়া হয়নি। 

অন্যবার কেউ না কেউ আসে, এবার তো আর কেউ আসছেনা। তাই ভাবলাম, আমিই করে রাখি। বরফ পড়লে জ্বালানো যাবে। দোকানে যাইনি, লোকাল একজন ট্রাকে করে রেখে গেছে। তাই এতো বড় বড়। চেরাই লাগবে। 

বব বলে চলে-- 'চেলসি থাকলে বাড়িতে আলো জ্বলত। বরফ ঢাকা ইয়ার্ডে টুনি দেওয়া বল্গা হরিণ লাগাত।' 

চেলসি ববের স্ত্রী। মারা গেছেন বছর পাঁচেক হোল। একমাত্র ছেলে বস্টনে থাকে। পাঁচ বছরে দুবার দেখা করতে এসেছে। তার মধ্যে গতবার ক্রিস্টমাসে । এবার সে আসবেনা, ইতালিতে চুটি কাটাবে। তার বছর দশের নাতির জন্যে উপহার কিনে কিনে রেখেছিল বব। তারা আসতে পারবেনা বলায় বেচারা বেশ মুষড়ে পড়েছে। 

আমি এক মিনিট ভেবে বলি, 

--আমি আসলে এবার অনেক কাঠ আনব ভাবছিলাম, স্টারটার এর আগুনে ভালো আঁচ হয়না। আর রোদ থাকতে একটু সিজনডও করে নেওয়া যাবে। তোমার কাঠ গুলোয় একটু কাটা প্রাকটিস করতে পারি ?

বব হেসে বল্ল-- ইউ অলওয়েজ ফাইন্ড আ ওয়ে। দেখো আমার খুব বেশী লাগবেনা। অল্প একটু কাটো, আর নিজের সময় নষ্ট করে এসব করোনা, বুঝলে। 

বব'কে তো বলে দিয়েছি। এদিকে আতুপুতু দেশের নষ্ট অভ্যাসে বড় হওয়া আমি কুড়ুল তো কোন আল্লা, মা'য়ের কালে বঁটিও কোনদিন চালাই নি। যা বুঝছি, ফুল জটায়ু কেস। তো, কুড়ুল নিয়ে বাগানে গেলাম। ক'টা কোপ মেরে দেখি। দুটো কোপ মারতেই মালুম পেলুম। উলটোদিকের বাড়ির জন তো বেশ ভুরু তুলে দেখে গেলো আমায়।

ববের জন্যে মনটা খুব খারাপ। 

হঠাত মনে পড়ল 'মেক অ্যা উইশ' দের কথা। এরা বড়দিনে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের শপিং ও বাড়ি সাজাতে সাহায্য করছেন ,বিনে পয়সায়। আমি যে দুটো অরগানাইজেশনের বোর্ডে তাদেরও একবার বলে দেখতে হবে। 

কয়েকটা ফোনেই কাজ হয়ে গেলো। অরগানাইজেশনের বাকী মেম্বাররাই জোগাড় করে দিল মারিয়াকে। মেক্সিকান মেয়ে। বর্ডার পেরিয়ে এসেছিল। যেমন খুব স্বাভাবিক। বাড়িতে গিয়ে ক্লিনিং করে, কখনো রান্নাও করে দরকারে। নিউ মেক্সিকো থেক থেকে সবে এসেছে। কাজ চাই ওর। দু ঘণ্টার জন্যে ৭০ ডলার। 

কিন্তু বব সিভিল-ওয়র দেখা মানুষ। গরীব, অ-শাদা মানুষদের দিয়ে কাজ করাতে তার বাধে। নীতিবাগীশ এই গোঁয়ার বৃদ্ধটিকে বোঝানোও তেমন তুড়ি মারা কম্ম নয় মোটেও। তাই অনেকসময় প্রতিবেশীরাও নানা অছিলায় এড়িয়ে চলেন। 


******* 

এর পর একমাস কেটে গেছে। 

সেই মেক্সিকান মেয়েটি, মারিয়ার সাথে দারুণ ভাব হয়েছে বব'এর। 

পর্চের জানলার খড়খড়ি দিয়ে দেখি, কাঁপাকাঁপা হাতে কফি এনে দিচ্ছে বব, মেয়েটিকে। আর মেয়েটি লজ্জায় 'না-না' করছে। মেক্সিকানরা অনেকটাই আমাদের মত । পারলে একেবারে হেঁসেলে ঢুকে গল্প করে, আবার কেউ কিছু খাওয়াতে চাইলে , লজ্জায় 'না না' করবে। মানে আমাদের ভারতীয়দের সেই লিস্টি বেরোবে এক এক করে। একঃ আরে না না । দুইঃ কি যে বলেন, তিনঃ আমার বাড়িতে আসবেন কিন্তু একদিন, খাওয়াব। যেন পালটা না খাওয়ানোর কথা তক্ষুনি না বল্লে চির-ঋণী হয়ে যেতে হবে। 

আমেরিকানরা এসবের ধার ধারেনা। তাদের কিছু খাওয়াতে চাইলে তুরন্ত বলে উঠবে ঃ ও দ্যাটস গ্রেট। বড়জোর খাওয়ার পর বলবে-- থ্যাক্সস ফর দ্য ফুড। 

সেসব কত ঠেকে যে শেখা। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমার কমিটি চেয়ার / অ্যাডভাইসার একদিন আমাকে ও আমার দুই স্প্যানিশ বন্ধুনী ( তাদেররও কমিটি চেয়ার তিনি ) কে বল্লেনঃ চলো কালকের মিটিঙটা রেস্টুরেন্টে করি, লেটস হ্যাভ আ পার্টি। প্রফেসর পার্টি দেবেন। হেবি ব্যাপার ভেবে সকালের সিরিয়ালটাও খেলুম না। একটা আণ্ডা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে গিয়েছি, নামজাদা রেস্তরাঁয়। যেহেতু আমি তখন ছাত্র, স্কলারশিপের পয়সায় চলে বলে এমনিতে এইসব রেস্তোরাঁয় বড় একটা ঢুকিনা। আমার আমেরিকান ছাত্র বন্ধুরাও তাই। বড়জোর স্টারবাক্সে কফি খাই সবাই মিলে। তো, তারপর চোখ ফুটল। যেমন সবারই ফোটে। দেশ থেকে সদ্য এলে । বিল তো ইয়ে নিজের নিজের, আর টিপ্‌টাও ভাগাভাগি করতে হোল। ভাগ্যিস ডেবিট কার্ডটা নিয়ে এসেছিলাম। আমার বাড়ির থেকে পায়ে হাঁটা বলে, হেঁটেই এসেছি। তখনও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইনি। গাড়িতো নেইই। হেঁটে কোট-গ্লাভস সামলে যেতে হবে, তাই একবার ভেবেছিলুম, যে পার্সটা নেব কিনা। 

আবার এই অধ্যাপকই যত্ন করে কত কি বানিয়ে খাইয়েছেন। বাড়ীতে ডেকে। ডিপার্টমেন্টে প্রায়ই কুকি বানিয়ে এনে আমায় খুঁজতেন। এইরকম আর কি। এতসব গল্প যে বলছি, তা জাজমেন্টাল হওয়ার জন্যে নয়।। আমার ছাত্ররা আড়ালে আমায় বলেঃ আমি নাকি দেখলেই বলব-- 'জাজমেন্টাল হোয়োনা। আর ছেলে তো সামনেই বলে। কিছু একটা বলেই বলে -- জাজমেন্টাল হচ্ছিনা কিন্তু মা। মানে খুবই অ্যালার্মিং আর কি। 

তা জাজমেন্টাল হতে হয় বইকি, যতই ছাত্রদের বলি। 

লন্ডনেও একই জিনিশ হতে চলেছিল, তবে তখন তো আমি শিখে গেছি। ব্রিটিশরা আবার এক পা এগিয়ে বলেনঃ লেট'স হ্যাভ আ ডাচ্‌ ডিনার। মানে তোমায় ডিনারে নিয়ে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু একটি পয়সাও দেবনা। আমারটা আমি, তোমারটা তুমি। সে'তো বাপু সব জাতেরই একই ধাঁচা। তবে ডাচ'দের নামে বেমক্কা বদনাম কেনরে ভায়া ? শাদাদের মধ্যেও কিরকম রেসিজম ভাবুন একবার। সব জাতকে ছেড়ে দিয়ে ডাচ শালাদের ধর টাইপের কেস আর কি। দারুণ কমপ্লিকেটেড ক্যাচালের জিনিশ এসব। এদিকে আমার যা স্বভাব। দেশ ছাড়ে, স্বভাব কি আর যায়। বলেছে আমার মত টেটিয়া কে, আমিও টেটিয়াপনা করে নেকুপুশু সুর লাগিয়ে বললুমঃ 'না না, ব্রিটিশ ডিনারে যাবো।' আড্রিয়ান আড়চোখে আমায় দেখে। ব্রিটিশরা অবিশ্যি এতো ভদ্র যে মুখ লাল হয়ে যাবে কিন্তু চট করে মুখের ওপর কাঁচা কিছু বলবেনা। আমার মনে পড়ে গেলো -- জাজমেন্টাল হচ্ছিনাতো ! পরে অবিশ্যি অ্যাড্রিয়ানের সাথে খুব ভাব হয়ে যায়। এখনও আছে। 


***** 


পরের সপ্তায় বড়দিন। 'মেক আ উইশ' এর লোকেরা এসে এর মধ্যেই দুদিন শপিং করিয়ে এনেছে ববকে। নিজের নাতি, ভাইপোর পরিবার তো বটেই , মারিয়ার জন্যে ও তার ফ্যামিলির জন্যেও নানা উপহার কিনে গাছের তলায় মুড়ে মুড়ে রেখেছে। পাড়ার দু বাড়ি থেকে এর মধ্যেই তার কাছে নানান কুকি ও ফুড বাস্কেট এসছে। তাদের ক্রিসমাসে নেমন্তন্ন করেছে আর আমাদেরও নেমন্তন্ন।

ক্রিসমাসের দিন নানান রঙের কাগজ কেটে ববের বাড়ি সাজানো হোল। আমরাই সাজালুম সেসব। সন্ধ্যেবেলায়, সে বাড়িতে নানান আলো জ্বলল। ফাইয়ারপ্লেসে আগুন। টেবিলে ঠুং ঠাং করে কাঁচের আর কাটা চামচের আওয়াজ উঠল। বব গরম সোয়েটার-কোট পরে আমাদের সাথে এগ-নগ খেতে বসল। মার্ক-সামান্থাও একবার ঘুরে গেলো। আর সঙ্গে ম্যাডোনা। তার সাথে ববের খুব ভাব এখন। ববের বাড়ি মাঝে মাঝেই পড়ে থাকে। বব আপন মনে তার সাথে বকবক করে। ববের হাত থেকে কিছু পড়ে গেলে সে মুখে করে কুড়িয়ে এনে দেয়। 

মারিয়া একদিন আমার কাছে গ্লু চাইতে এল । বব খুব ভালো মানুষ, বলে সে, ববকে দেখে মারিয়ার বাবার কথা মনে পড়ে যায়। 

--তোমার দেশের বাড়ি কোথায় মারিয়া ? বলি আমি। 

দু'চোখ দুরবীন হয়ে ওঠে তার। 

পাঁচ বছর আগে জীবন ঝুঁকি নিয়ে বর্ডার পেরিয়ে মেক্সিকো'র সান ইগ্নাচিও'র কাছের এক ছোট্ট গ্রাম থেকে এদেশে এসেছিলো। পথে পাচারকারীদের তাড়া খেয়ে ওর প্রেমিক আর ছোটো ভাই মারা গেলো চোখের সামনে। সে আর তার দিদি-জামাইবাবু পালিয়ে আসতে পেরেছিল। গত বছর তাদের পুলিশ ধরে ফেলে আর মেক্সিকো ফেরত পাঠিয়ে দেয়। দুটি বাচ্চা হয়েছিল তাদের । ছেলে দুটি ফসটার কেয়ারে আছে। বাবা-মাকে দেখেনি দু'বছর হোল। মারিয়া কাজ করে তাদের নতুন জামা পাঠাবে ক্রিসমাসে। 

তার নিউইয়র্কের নতুন প্রেমিক বলেছে লিগাল ডকুমেন্ট করে দেবে। আর লুকিয়ে অন্যের বাড়ি কাজ করতে হবেনা তখন, বলে মারিয়া। তবে ববের কাছে সে আসবে। নাগরিক হয়ে গেলেও। যতদিন বব বাঁচে।

মারিয়া আমায় বলে-- তোমার দেশের জন্যে মন খারাপ হয়না ? এই যে একা একা ছেলে মানুষ কর ? কোন আত্মীয় স্বজন নেই, ভয় পাওনা একা বিদেশে ? 

আমি ওকে দূর থেকে চলে যেতে দেখে বলে উঠি-- নারীর কোন দেশ নেই মারিয়া । এই যে তুমি এদেশে থাকার অনুমতি খুঁজছ, এদেশের অনেকটাই একদিন তোমাদের দেশের ছিল। আর এদেশের মেয়েদের, আমেরিকান মেয়েদের ভোট দেওয়ার ক্ষমতা ছিলনা একশ বছর আগেও, তারাও তো নিজেদের দেশে পরবাসীই ছিলেন । তেমনই নেটিভ ইন্ডিয়ানরাও। তুমি আকাশ থেকে কাঁটাতার দেখেছ মারিয়া ? 

আপন মনে বলে যাই আমি-- 

আমাদের কারুরই কোন দেশ নাহি মিত্রো। আলেপ্পো থেকে বার্লিন পর্যন্ত। 

দেশ বা দেশের স্মৃতি লইয়া কি করিতে হয়। প্রবাসের বা বিদেশের স্মৃতি লইয়াই বা কি করিতে হয় ?

প্রশ্নগুলো যখন সহজ না, তার উত্তরভি সহজ না আছে। অতএব চলুন আলুভাজা খাই সব্বাই। এদেশে মেড ইন চায়না, দেশে মেক ইন ইন্ডিয়া, মাদার'স কিচেন। আলু কিনতে তো নোট লাগবে। প্লাস্টিকে হবেনা। বাজারে আলুচাষি'দের হাতে পেটিএম এসেছে তো এবার। পঞ্চাশ দিন তো মেরে এনেছেন। আরও কটা দিন গেলেই,আলুচাষি, বিরাম মুদী, শালওয়ালা, কাজের মাসী, লালগোলা, বনগাঁ সবাই পেটিএম হয়ে যাচ্ছেন। ভারতবর্ষ আরতো দূরে থাকবেনা মিত্রো। ঘরের পাশে ঝকঝকে 'আরশি -গ্রাম' হইয়া যাইবে। 


ডিসেম্বর, ২০১৬ 






২টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মুড়িভাজা খাইতেছি এমন ঝরঝরে লেখার সহিত। নারীর কোনো দেশ নাইক্যা নারী। কেবল, শিশিরে শিশিরে চরণ চিহ্ন রেখায়িত হয়ে তা মুছে যাওয়া ছাড়া।

      মুছুন