রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

বই নিয়ে আলাপ : আনসারউদ্দিনের গল্প--সমাজ সত্যের কথাকার

-পুরুষোত্তম সিংহ

দেশভাগের পর এপার বাংলার কথাসাহিত্যে মুসলিম জনজীনের কথা বিশেষ ভাবে পিছিয়ে পড়ে। অভিজ্ঞতার অভাব সহ ছিল পাঠকরুচির অভাব। সদ্য একটি দেশের খণ্ডিত অবস্থার জন্য মানুষ সেই সম্প্রদায়কেই দায়ী করে বসল। আর কথাকাররা পাঠক হারানোর ভয়ে সে সমাজের প্রতি নজরই দিলেন না। ফলে নিজস্ব সমাজের কথা নিজের মতো করে বলার দায়িত্ব তুলে নিতে হল সৈয়দ মুস্তফা সিরাজকে। সেই ধারাতেই পরবর্তীকালে এসেছেন আবুল বাশার, সোহারাব হোসেন, আনসারউদ্দিন, নীহারুল ইসলাম সহ একাধিক কথাকার। আনসারউদ্দিনের( ১৯৫৯) বড় হয়ে ওঠা নদিয়া জেলার নাকাশিপাড়ার শালিগ্রামে। পেয়েছেন ‘সোমেনচন্দ্র পুরস্কার’, ‘ইলাচন্দ্র পুরস্কার’ ও সাম্প্রতিক ‘অহনিশ পুরস্কার’ ।

আমসারউদ্দিন গল্প লেখেন বিপন্ন মানুষদের নিয়ে। তিনি উজান স্রোতে হাঁটতে ভালোবাসেন।নিজের ভূগোলে বসে নিজের সমাজের কথা বলেছেন নিজের মতো করে। সেই বিপন্ন সমাজের কথা তিনি কথকতার আঙ্গিকে তুলে ধরেন। দেশজ- লোকজ ঘরনাকে নিয়েই সৃষ্টি ভুবনের পটচিত্র সাজান। আনসারউদ্দিন নিজেও উঠে এসেছেন এক প্রান্তিক অঞ্চল থেকে। স্বাধীনতার পর একটি দেশ সত্তর বছর অতিক্রম করে গেছে। একটি দেশের অথনৈতিক উন্নয়নের জন্য সত্তর বছর কম সময় নয় ! প্রযুক্তি বিজ্ঞানের জগতে মানুষ পাড়ি দিয়েছে মহাকাশে অথচ সেই ভারতবর্ষেই এক শ্রেণির মানুষ আজও অভুক্ত। সেই অভুক্ত শ্রেণি বিভক্ত পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা তুলে আনেন আনসারউদ্দিনের মতো কথাকাররা। আঞ্চলিক রঙে সেই সব মানুষেরা কখনই মিলিয়ে যায় না। নিজস্ব যাপনচিত্রের এক স্বতন্ত্রতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মুসলিম জীবনে ধর্মান্ধতা যেমন আছে তেমনি আছে ধর্মীয় আদর্শের প্রতি বিশ্বাস। এক দ্বন্দ্ব টানা পোড়েনের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলেছে একটি সমাজ। ‘গাজির বিচার’ গল্পে মুসলিম ধর্মান্ধতা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে মুসলিম সমাজের ঐতিহ্যের প্রতি কলম নিয়ে গেছেন। এ গল্পের বিষয় খুব সামান্য-একটি চুরির ঘটনা। এ চুরি করেছে খেদু নামে এক দারিদ্র মুসলিম। লেখক ‘কেন’ এর প্রতি নজর দিয়েছেন। খেদু কেন চুরি করল? দারিদ্রতা , অসহয়তা, বিপন্নতা ও অনাহার আজ খেদুকে এই পথে নিয়ে গেছে। ইদের আগের রাতে চুরি করে খেদু। খেদুকে যখন সবাই প্রহারে উদ্যত তখনই গাজি সাহেব মুসলিম জীবনে ধর্মীয় আদর্শের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। মুসলিম জীবনে এক পবিত্র উৎসব ইদ। এই উৎসবে সকলেরই আনন্দের অধিকার।সেখানে থেকে আজ বঞ্চিত হচ্ছে খেদু। গাজির নির্দেশে মতো সবাই আজ মেনে নেয় খেদুও এই আনন্দ উৎসবে যোগ দিক। কিন্তু খেদু তো অসহায়, খাদ্য টুকুও ঘরে নেই। এই বিপন্নতায় গল্প কথকের বাবা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে-“ বাবা শৈষমেশ দাদুর উদ্দেশ্যে বললে- খেদুর জন্য সবাই করছ যখন তখন ইদের পাব্বণে ওই বান দেওয়া মোরগটা দিয়ে দাও। ওটা জবাই করে বাড়ির গোস রুটি করে খাক।“(‘ গাজির বিচার’,’গণিচাচার খেত-খামার’, প্রথম প্রকাশ ২০১৭, অভিযান , পৃ.২০১)। এ গল্পে লেখক মুসলিম জীবনের গোষ্ঠীচেতনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের উদার সহানুভূতির দিকগুলি তুলে ধরেছেন। ইসলাম পবিত্র ধর্ম, সেখানে দাঙ্গা- বিভেদের স্থান নেই। রয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের মমতা ও সোহাদ্যপূর্ণ উদারতা। গাজি সাহেব সেই মহান বাণীর কথা মনে করিয়ে দিয়ে আজ উদ্ধার করেছে খেদুকে। গাজি সাহেব এই অবক্ষয়িত মূল্যবোধহীন পৃথিবীতে একটি অঞ্চলের সমস্ত মানুষদের নব দর্শনে নিয়ে গিয়েছেন।

## আজ গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব ভোট। প্রতিটি লেখককে নজর দিতে হয় সমাজ বাস্তবতার উপর। তবে নিছক বাস্তবতার বর্ণনাই সাহিত্য নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন – বাস্তবের মাটি থেকেই ঝড় তুলতে হবে হাওয়ার আকাশে। অমর মিত্রের ‘ভোটের আগের রাত্রি’ গল্পে দেখেছিলাম রাজনৈতিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত দলগুলি কিভাবে নিজেদের শক্তি অপব্যয় করে। আনসারউদ্দিন তাঁর ‘ভোট’ গল্পে মুসলিম জীবনের প্রেক্ষাপটে বর্তমান রাজনীতির নক্কারজনক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। সময়ের ব্যবধানে পাল্টে গেছে মূল্যবোধ, আজ সমস্ত বিষয়েই প্রবেশ করেছে রাজনীতি।জন্ম প্রমাণপত্র, রেশন কার্ড, বি. পি.এল এ নাম তোলা থেকে শুরু করে কলেজ ভর্তি, এমনকি কবর স্থানেও চলছে রাজনীতি।যে মুসলিম জীবন ধর্মীয় সত্তায় বিশ্বাসী ছিল তারাও আজ রাজনীতির শক্তি আয়ত্ত্ব করেছে। আর এই রাজনীতির ফলে গ্রাম্য জীবনের কঙ্কালসার রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। আনসারউদ্দিনের গল্পে মাটি মেশানো সোঁদা গন্ধ পাওয়া যায়। তিনি নিজস্ব ভূগোলের মাটি থেকেই চরিত্রগুলিকে তুলে আনেন।চলমান নদীর মতোই আনসারউদ্দিনের চরিত্ররা সহজ-সরল। সাবলীল ভাবেই লেখক তাদেরকে শিল্প সত্তায় উত্তীর্ণ করেন। গ্রাম জীবনে আজ প্রবেশ করেছে জটিল রাজনীতি। দ্বন্দ্ব সংঘটিত হচ্ছে দুই ভাইয়ের। রাজনীতির ক্ষমতাদখল করতে প্রতিবেশী বন্ধুটি আজ দাঁড়িয়েছে গোঁজপ্রার্থী হয়ে। লেখক গ্রাম জীবনে অসহনীয় বিপন্নতার দিকেই নজর দেন। সামান্য কাঁঠালের জন্য সন্তানের হাহাকার ও কৃষিজীবী মানুষের কন্দনের ইতিবৃত্ত তিনি তুলে ধরেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে আজ দ্বন্দ্ব - বৃদ্ধ মাতা কোন পার্টিকে ভোট দেবে। লেখক অত্যন্ত কৌশলে এই কাহিনি পরিবেশন করেছেন। আজ কবরস্থানেও রাজনীতি। রাজনীতির ক্ষমতা পুষ্ট দলে না থাকলে মৃত্যুর পর কবর স্থান হবে না। লেখক সেই দ্বন্দ্ব ক্ষতবিক্ষত চিত্র তুলে ধরেছেন-

“ মা আকাশের দিকে হাত তুলে আল্লার কাছে মৃত্যুর আর্জি জানলেও আমি জানি, আকাশ নয়, মৃত্যুর পর এই মাটিতেই তাঁকে সমাহিত করা হবে। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই মায়ের। বারোয়ারি কবরের জমিন রাজনীতির যাঁতাকলে দু-খণ্ডে ভাগ হয়ে গিয়েছে আজ। আমি ভাবতে পারছি না, সেই কবরের জমিনের কোনদিকে থাকবে মায়ের মাথা, আর কোনদিকে পা।“(‘ভোট’, ঐ, পৃ.১৬৬)

মুসলিম জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আনসারউদ্দিনের ‘স্বপ্ন- দুঃস্বপ্ন’ গল্পটি। কথকতার ঢঙে আনসারউদ্দিন গল্প বলে চলেন। বেশিরভাগ গল্পে তিনিই কথক। এক আপাত মধুর ভঙ্গীতে তিনি গল্পের পরিণতি ঘটান। সহজাত বিষয় ও কাহিনি নিয়েই তিনি গল্পে উপস্থিত হন। কিন্তু গল্প নির্ণয়ে থাকে চমক। এ গল্পে লেখক একটি বালকের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে মুসলিম জীবনের ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার, লোকবিশ্বাস সমস্তই তুলে ধরেছেন।ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে নিম্নবিত্তের মুসলিমদের কিভাবে শোষিত হতে হয় তা লেখক দেখিয়েছেন। আনসারউদ্দিনের বেশিরভাগ গল্পেই সমাজের নিচু তলার মানুষের প্রতি একটা ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। দিদার আলির বাড়িতে রয়েছে জমজমের পানি। জমজমের পানি হল আরব দেশ থেকে আনা পবিত্র জল। এই জল খেলে অনেক ভয় বিপদ নিরাময় হয়। কিন্তু দিদার আলি আজ মৃত। সেই জল আছে দিদার আলির পুত্র সোরাবুদ্দিনের কাছে। কিন্তু এই জল আনতে গেলেই নানা কৈফিয়ৎ দিতে হয়। সেই কৈফিয়ৎকে কেন্দ্র করেই ফজলচাচা ও কথকের পিতাকে কেন্দ্র করে গোটা গল্প বিবর্তিত হয়েছে। আসলে লেখকের লক্ষ্য মুসলিম সমাজের total life ফুটিয়ে তোলা। সেই সমাজ বারবার ফিরে আসে গল্পে।

##সময়ের দর্পণে মানুষের ছবি আঁকা কখনই শিল্প হতে পারে না। সময়কে, মানুষকে শিল্প করে তোলাই কথাকারের কাজ। আর এ কাজ করার জন্য একজন কথাকারকে নিরন্তর জটিলতার মধ্যে দিয়ে আখ্যানকে প্রবাহিত করে নিয়ে যেতে হয়। সময়ের কুচক্রীগ্রাসে মানুষ নিরন্তর পাল্টাচ্ছে।সময়কে যদি আমরা দুটি পর্বে বিভাজন করি- বড় সময়, ছোট সময়। বড় সময় যদি বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন কার্যকলাপ হয় তবে ছোট সময় হল অন্তঃবিশ্বের কার্যকলাপ। সময়ের স্রোতে মূল্যবোধহীন পৃথিবীতে মানুষ ক্রমাগত পাল্টাচ্ছে। সেই বিবর্তিত মূল্যবোধের অবদংশনের ক্ষয়িতমনা সময়কেই কথাকার ধরতে চান। ফলে গল্পের কাহিনি এক হলেও জীবনবোধ, জীবনচেতনা পাল্টে যায়। সেই জীবনচেতনার সন্ধানেই অগ্রসর হন কথাকাররা। শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে আমরা দেখেছিলাম পশুপ্রীতির আশ্চর্য নিদর্শন। তবে সেখানেও প্রতিবাদ ছিল, মুক্তি ছিল। কিন্তু নিম্নবিত্তের যে মুক্তি নেই তা দেখিয়েছেন মনোজ দে নিয়োগী তাঁর ‘আবারও মহেশ’ গল্পে। আমিনারা রেহাই পায় নি শহরে গিয়েও। আমিনাদের মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় সময়ের কুচক্রী গ্রাসে। আনসারউদ্দিনের ‘জম্জমের পানি’ গল্প পশুপ্রীতির আশ্চর্য নিদর্শন ফুটে উঠেছে। ইদ্রিশের এক জোড়া বলদ আছে, তার মধ্যে একটি অসুস্থ। গ্রামীণ মানুষ, কৃষক মানুষ পশুকে সন্তানসম স্নেহে পালন করে। কৃষকের কাছে ফসল উৎপাদনের প্রধান হাতিয়ারই বলদ। নিম্নবিত্তের গ্রামীণ মানুষের কাছে হালের বলদের যে অপরসীম প্রয়োজন তা আনসারউদ্দিন খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। মুসলিম লোকাচার বিশ্বাস জমজমের পানি পান করলে সমস্ত রোগ নিরাময় হয়। প্রিয় বলদের সুস্থতার জন্য ইদ্রিশ জমজমের পানি আনতে গিয়েছিল সিরাজ ফরাজির বাড়ি। কিন্তু সেখান থেকে ব্যর্থ ও অপমানিত হয়ে এসেছে। কিছু দিনের মধ্যেই মারা যায় বলদটি। এই মৃত পশুর জন্য ইদ্রিশের যে হাহাকার সেটিই গল্পের মূল সুর-

“ তা কী করে ? কথা অনুচ্চস্বরে বললে ইদ্রিশের বউ ? তার কথার ধরতাই পেয়ে আবার বললে- বলদ দুটোকে তুমি তো কম ভালোবাসতে না। কতদিন ওদের শাড়ির আঁচলে গা ঝেড়ে দিয়েছে। নাদায় তেষ্টায় পানি ঢেলে দিয়েছে। তখন কি তুমি জানতে ওদের একটাকে আমরা এভাবে হারিয়ে ফেলবে ? সন্তানশোকের চেয়ে এ শোক কম নয় গো-“ (‘জম্জমের পানি’, ঐ, পৃ. ১০৯)

লেখকের ব্যঙ্গ ফুটে উঠেছে মুসলিম ধর্মজীবনের প্রতি। ইদ্রিশকে আজ সামান্য জমজ্মের পানির জন্য অপমানিত হতে হয়েছে। এই জলে রোগ নিরাময় হয় আবার অনেক সময় হয় না। গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস তবুও যদি পান করলে একবার ভালো হয়ে যায়। আরব থেকে আনা জমজমের পানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সিরাজ ফরাজি কল থেকে এক বিন্দু জল ঢেলে দিয়েছিল। সেই জলই সবাই জমজমের পানি বলে কাজ চালাত। আজ সেই কলের গোড়ায় নানা আর্বজনার জল প্রবেশ করেছে। এই দৃশ্য ইদ্রিশ দেখেও নীরব থেকেছে। এই নীরবতার মধ্যে দিয়েই লেখক দুটি প্রশ্ন বড় করে তুলেছেন। একটি হল সিরাজ ফরাজির অবহেলার প্রতি প্রতিবাদ, অন্যটি হল ধর্মজীবনের প্রতি অবিশ্বাস। আনসারউদ্দিন যেমন আস্তিক্যবাদী দর্শনের গল্প লেখেন তেমনি সময়ের স্রোতে সমাজকে ধরতে নৈরাশ্যবাদী নাস্তিক্যদর্শনের দিকেও পা বাড়াতে হয়। আনসারউদ্দিনের গল্পে সে সময় বড় হয়ে ওঠে, যে সময়ে মানুষ সামাজিক নানা ঘাত প্রতিঘাত ও অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সেই ঘাত- প্রতিঘাতের দ্বন্দ্ব মুখর সময়ই আনসারউদ্দিনের গল্পের মূল সুর।

## আনসারউদ্দিনের গল্পে গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতা প্রবল ভাবে ধরা দেয়। তিনি ফেসবুকে নিজের পরিচয় দিয়েছেন –প্রান্তিক চাষি বলে। আবার কখনো নতুন বন্ধুর সান্নিধ্য পেয়ে হাত ধরেই বলেন লাঙল টানা হাত তো তাই শক্ত করে ধরলাম।নিজেকে উদ্বাস্তু লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন না। ফলে ভূমিজ মানুষ তাঁর গল্পে প্রবল ভাবে উঠে আসে। আর সেই ভূমিজ মানুষ হল প্রান্তিক মুসলিম জনজীবনের মানুষ। ‘অঙ্কশাস্ত্র’ গল্পে দরিদ্র মুসলিম ইরফান মাস্টারের করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগেই প্রাইমারি শিক্ষকের স্বচ্ছল অবস্থা ছিল না। তার পূর্ব সময়ের অবস্থা আরো ভয়ঙ্কর ছিল।এজন্যেই প্রবাদ প্রচলিত ছিল- “চাকরি ভাতার যার পোড়াল কপাল তার / চাষা ভাতার যার খাসা কপাল তার”। গল্প কথক কোনদিনই অঙ্কে ভালোছিল না। কিন্তু পিতার ইচ্ছা সন্তান যেন অঙ্কে ভালো হয়। কৃষক মানুষ অঙ্কে ভালো বুঝতে বোঝেন সুদের হার ,কৃষিই ঋণের পরিমাণ। বিদ্যালয়ে ইরফান মাস্টার অঙ্ক পড়ান। সমান্য বেতনে ইরফান মাস্টারের দিন চলে না। সেই ইরফান মাস্টারের কাছেই টিউশুনি পড়তে এসেছে গল্প কথক। পড়ার বদলে জমি চাষ করে , আর মাস্টার পরীক্ষায় বেশি নম্বার দেয়। এভাবেই প্রাথমিক থেকে উচ্চবিদ্যালয়ে গেছে কথক। সে আজ চলেছে মাধ্যমিক দিতে। ইতিমধেই মারা গেছে ইরফান মাস্টার। পিতা বলে পরীক্ষার আগে ইরফান মাস্টারের কবরে প্রণাম করে যেতে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ভবিষ্যতের ভার’ গল্পে আমরা দেখেছিলাম মধ্যবিত্তের আদর্শচ্যুতি কিভাবে ঘটে। এ গল্পের ইরফান মাস্টারের পরিণতি আরো ভয়ঙ্কর। পরীক্ষা দিতে যাবার আগে কথক কবরের সামনে প্রণাম করতে গিয়ে যেন রুক্ষতার মুখোমুখি হয়-

“ নিজের মুখ থেকে উচ্চারিত কথা নিজের কানেই ধ্বনিত হল। আমি আবার অন্ধকার ফাটলের দিকে তাকালাম। আমার কেন না-জানি মনে হল মাস্টারমশাই হাই তুলে তুলে ওই ফাটলের মধ্য দিয়ে তাঁর পেটের খিদেকে উড়িয়ে দিচ্ছেন।“( ‘অঙ্কশাস্ত্র’, ঐ, পৃ.২২৩)

এই অসহনীয় জীবনযন্ত্রণার মর্মান্তিক চিত্রের মধ্যে দিয়েই আনসারউদ্দিন গল্পের পরিণতি ঘটান। লেখক অধিকংশ গল্পের পরিণতিতে বাস্তববাদী। বিপন্ন মানুষের হৃদয় যন্ত্রণার মর্মভাষ্যই তিনি তুলে ধরতে ভালোবাসেন। কেনই বা তুলে ধরবেন না- তাঁর ভূগোলের চারিদিকে বিপন্ন পরিবেশ আজও বর্তমান। প্রান্তিক মুসলিম মানুষেরা আজও শিক্ষার আলোয় আসতে পারে নি। মুসলিম জীবনের অর্থনৈতিক চিত্র আজও ভয়ঙ্কর ভাবে দুর্বল।সেই যন্ত্রণার কথাই তিনি ফুটিয়ে তোলেন। গ্রাম জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে ‘গ্রাম কমিটি’ গল্পে। পঞ্চায়েত রাজ কিভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল গ্রাম্য নেতাদের কৌশলে লেখকের দৃষ্টি সেদিকে। তবে অন্য সব লেখক থেকে আনসারউদ্দিনের স্বতন্ত্রতা সহজেই চোখে পড়ে। অন্যান্য লেখক যেখানে আবেগের উপর নির্ভর করেন সেখানে তিনি নির্মমভাবে সমাজ সত্যের কথাকার। আর এই সমাজ সত্য সম্ভব হয়েছে আনসারউদ্দিন নিজেও কৃষক শ্রেণির প্রতিনিধি বলে। পঞ্চায়েতর বিলি ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গ্রামে যে কমিটি গড়ে উঠেছে সেখানে প্রত্যেকেই দারিদ্র্য। বক্কার, কাদের,অবজাল প্রত্যেকেই নিম্নবিত্ত মানুষ। তাঁর গল্পে শাসক ও শোষিতের সম্পর্ক যেন এক সরলরেখায় মিশে যায়। তাদের একটি পরিচয়ই বড় হয়ে ওঠে তা হল দারিদ্র্যতা। ফলে পঞ্চায়েতের মাল বাটোয়ারা নিয়ে আর্থিক অসংগতি নয় গ্রাম্যজীবনের প্রকৃত ছবি উঠে আসে।

## আনসারউদ্দিন গ্রামীণ জীবনের ভাঙা গড়া ও তার বিবর্তনের ছবি আঁকেন সুন্দর ভাবে। সমাজের ক্ষেত্রে আজ বহমানতাই বড় হয়ে উঠেছে। তিনি সেই বহমান জীবনস্রোতের শিল্পী। জীবনে বেঁচে থাকা ও লড়াই সংগ্রামকে তিনি মিলিয়ে দেন ‘সেলাই’ গল্পে। জীবনে বেঁচে থাকা যেন একধরণের সেলাই, যে যত শক্ত সূতোয় বাঁধতে পারে সে তত সফল হয়। ওসমান দর্জির টেলারিং এর দোকান। সেখানে সে পুরুষ মহিলা সকলেরই পোশাক বানায়। দারিদ্র্যতা থেকে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওসমানের স্ত্রী ছবিরণ। ছবিরণ কুৎসিত হলেও দারিদ্র্যের কারণে ওসমান এতেই মুগ্ধ। সে গাছা বাজারের সেরা দর্জি। তাঁর সাফল্য ছড়িয়েছে চারিদিকে। আপাত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে লেখক এ গল্পে নেমেছেন।একদিন ব্লাউজ কাটতে গিয়ে সে শাড়ির আঁচল কেটে ফেলে। দামী কাপড়ের এই অসহনীয় অবস্থা দেখে মেয়েটি চিৎকার করে ওঠে। বাজারের সবাই ভাবে ওসমান বুঝি ধর্ষণ করেছে। কুৎসা রটে যায় বাজারে। শেষে সমস্ত দোকানদাররা মিটমাট করে। ওসমান জীবনে এই প্রথম ভুল করল। কাপড়ের মূল্য হিসেবে তাঁকে ফেরত দিতে হয় সাত হাজার টাকা। সেই শাড়ির ওসমান সেলাই করে নিজের স্ত্রীর জন্য নিয়ে এসেছে। ওসমান আজ আর প্রকৃত সত্য প্রকাশ করেনি। শুধু বলেছে-

“ কিছু মনে কোরো না। এ নিয়ে দুঃখ কোরো না। মনে জানবা তোমার-আমার সম্পর্কটা তো সেলাইয়ের। নইলে ভেবে দেখো কোথায় তোমার বাবার বাড়ি আকন্দপুর আর আমার বাড়ি কুটির পাড়া। কতদিন ধরে একসঙ্গে আছি বল দিকিন। যত দামিই হোক না কেন শাড়ি একদিন ফেঁসে যায় ছিঁড়েও যায়, কিন্তু সেলাই সহজে ছিঁড়ে যায় না। সেলাই সেলাই-ই থেকে যায়।“ (‘সেলাই’ ঐ, পৃ. ৬৫)

লেখক অদ্ভুত ভাবে মিলিয়ে দেন জীবনের সঙ্গে শিল্পকে। তেমনি লেখক সমাজ চিত্র বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর গল্পের প্রথম দিকে গ্রাম্য জীবনের চাষিবাসী, নিম্নবিত্ত ভূমিজ মানুষের বর্ণনা পেলেও সেই গ্রাম যে ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে, মানুষ যে ক্রমাগত আধুনিকতার দিকে যাত্রা করেছে, গ্রামেও যে এসেছে নগরায়ণের ছাপ তা তুলে ধরলেন এই গল্পে। তিনি শুধু বাস্তবের শিল্পী নন, বাস্তবের ভিতরে বহু বাস্তবের যে স্বর, যাকে কোন কোন সমালোচক বলেছেন ‘অধিবাস্তব’- সেই পথ আবিষ্কারে মত্ত থাকেন। লেখক ওসমান দর্জির নিপীড়নের ছবি আঁকলেও গোপন পাঠে তা যেন অন্য ভাষ্য রচনা করে। এইভাবেও বেঁচে থাকা যায়, নানা লাঞ্ছনার মধ্য দিবে নতুন জীবনস্বপ্নে এগিয়ে যাওয়া যায়- বাঁচার স্বপ্ন এগিয়ে যায়। মনে পড়ে মিশেল ফুকোর কথা –“ The individual is not to be conceived of as a sort of elementary nucleus on which power comes to fasten .... in fact, it is already one of the prime effects of power that certain bodies, certain gestures, certain discourses, certain desires come to be identified and constituted as individuals.” ( তপোধীর ভট্টাচার্য, ছোটগল্পের বিনির্মাণ, অঞ্জলি পাবলিশার্স, প্রথম প্রকাশ ২০০২, পৃ. ১৪৩)

## আনসারউদ্দিনের অধিকংশ গল্পে সে নিজেই কথক। কথকতার ঢঙে গল্প বলতেই তিনি ভালোবাসেন। কোন ভূমিকা নয় তিনি সরাসরি গল্পের অন্দরমহলে প্রবেশ করেন। তিনি একটি সমাজের প্রতিনিধি। সেই সমাজ পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মুসলিম সমাজ। সেই অবহেলিত সমাজের কথা যেন কথনভঙ্গিতেই তিনি জীবন্ত করে তোলেন- তেমনই একটি গল্প হল-‘গানের খোঁজে’। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে পল্লিবাংলা। হুল্লোড় প্রিয় সভ্যতা আজ নিজের অতীত ভুলতে বদ্ধ পরিকর। সেখান থেকে গল্পকার দের আজ গল্প লিখলেই চলে না, নীতিশিক্ষা, সমাজ শিক্ষা দিতে হয়। সমাজ সংশোধন সাহিত্যের কাজ নয় তবুও একালে বসে সে পথ অবলম্বন ছাড়া উপায় নেই। এ গল্পের কথক আজ অগ্রসর হয়েছে বিভিন্ন লোকসংগীতের খোঁজে। যান্ত্রিক সভ্যতার চাপে যেসব লোকসংগীত আজ পল্লিবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কথক সেই অতীত সন্ধানে অগ্রসর হয়েছে-

“ আমার অনেকদিনের শখ নেহাতই গ্রাম বাংলার নিজস্ব কিছু গান সংগ্রহ করার। যে সমস্ত গান গ্রাম বাংলার মানুষ একসময় মাঠে- ঘাটে গাইত। সে সমস্ত গান কারা রচনা করেছে, কারাই বা সুর দিয়েছে অনেক সময় তার হাল-হদিস করা মুশকিল। তবে গানের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে এ গানের রচয়িতা গাঁয়ের অল্পশিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর মানুষেরা। এইসব মানুষের মধ্যে কত যে রসবোধ লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা জানতে পেরে সত্যিই পুলকিত হই।“( ‘গানের খোঁজে’, ঐ, পৃ.১৮৩)

পল্লিবাংলা থেকে ধীরে ধীরে লুপ্তপ্রায় বঁদগান, ধুয়োগান জারিগান সহ বহু গান। সেই গান সন্ধানে গল্প কথক আজ উপস্থিত হয়েছে আমানিপুরে নুরুদ্দির কাছে। নুরদ্দির পিতা বিখ্যাত লোকসংগীত গায়ক ছিল। কিন্তু আজ নুরদ্দিনের পরিবারে অসহনীয় দারিদ্র্য। গল্পকথক নুরদ্দির কাছ থেকে আজ গান সংগ্রহ করে নিতে চান। এই পর্যন্ত গল্পের কাহিনি এক সরল রেখাতেই চলছিল- কিন্তু এখান থেকেই গল্প বাঁক নেয়। নুরদ্দি জানায় সে অসহানীয় দরিদ্র, কন্যা রূপসেনাকে কিছুতেই বিবাহ দিতে পারছে না। সে যদি নিজের পুত্রবধু করে নিয়ে যায় রূপসেনাকে তবে নুরদ্দি খুব খুশি হবে। গল্পকথক গান সংগ্রহে গিয়ে একটি নির্মম ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। আনসারউদ্দিন কোন ঘটনার ব্যাখ্যা বা সমস্যার সমাধান করেন না, কিংবা গল্পকে শিল্পসত্তায় উত্তীর্ণ করেন না। তিনি নির্মম ভাবে সমাজ সত্যের প্রতি নজর দেন। তবে তাঁর সমাজ সত্য ও গল্পের প্লট অন্য গল্পকারদের থেকে পৃথক। আনসারউদ্দিনের স্বতন্ত্র চিহ্নিত গল্প ‘ শিল্পী’। ধর্মীয় ভারতবর্ষ, সাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের বিরুদ্ধে এক ব্যঙ্গের চাপেটাঘাত নিয়ে উপস্থিত হন এ গল্পে। বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে যে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল গল্পটি সেই প্রেক্ষাপটে লেখা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ গল্প পড়ে মনে হয়েছিল-‘ বেশ উচ্চকিত আদর্শমূল্য’। মানবজীবন প্রেমিক এক উদার শিল্পসত্তার পরিচয় পাওয়া যায় এ গল্পে। তিনি মিলনের জয়গাথা গান, ধর্মের ভেকধারীদের প্রতি বঙ্গবাণ বর্ষণ করেন। এ গল্পের বিষয় খুবই সামান্য। কিন্তু বৃহৎ প্রেক্ষাপটে জীবন মৃত্যুর দোলায় তিনি জীবনকে দুলিয়েছেন। গ্রামে এসেছে এক শিল কাটানো মানুষ। তিনি শিলের উপর রাম মন্দির আর বাবরি মসজিদের ছবি আঁকেন। এ জন্য দুই সমাজের মানুষের কাছেই সে প্রবল প্রিয়। তবে এর জন্য যে প্রহার খেতে হয় নি তা নয়। সংখ্যাগুরু গ্রাম ভিন্ন দুই সমাজই প্রহার করেছে তাঁকে-

“ এই দ্যাখেন উপরের পাটিতে কটা দাঁত নেই।হিন্দু- গাঁয়ে গিয়ে এই অবস্থা। ওদের দাবি মজুরি যা খুশি নাও বাবরি মসজিদ আঁকতে পারবে না। আর কান চোয়ালের এই কোপের দাগ দেখেছেন ? ওটা মুসলমান গাঁয়ে। বলেছিল কাফেরদের মন্দির আঁকলে কোরবানি দেব। ভাগ্যির খাতিরে বেঁচে গেছি। আসলে ধর্মটা হল মনের বিশ্বাস। আর মনের মধ্যে মন্দির মসজিদ। যাদের মানুষের উপর বিশ্বাস নেই তাদের আবার ধর্ম করা কেন ?” (বাংলা গল্প সংকলন –চতুর্থ খণ্ড, সম্পাদনা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাহিত্য অকাদেমি, প্রথম প্রকাশ ২০০৬, পৃ. ৪০০)

এই শিল্পীর মধ্য দিয়েই আনসারউদ্দিনের জীবনদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। সেই শিল্পী বলে- ‘জাত নেই বলে দুটোই সমানভাবে পারি’। দরিদ্র মানুষের কোন ধর্ম থাকতে পারে না, ক্ষুধার্ত মানুষের কোন শ্রেণি থাকতে পারে না, বিপন্ন মানুষের শুধু একটাই আর্তনাদ বেঁচে থাকার কৌশল আবিষ্কার। এই শিল্পী হত দরিদ্র। আজ শিল কাটতে এসে ক্লান্ত অবসন্ন মনে বহু শিলের মধ্যে এলোমেলো করে ফেলে শিলগুলি। রামমন্দিরের চিহ্ন আঁকা শিল চলে যায় মুসলিম বধুর কাছে আর বাবরি মসজিদের চিহ্ন শিল চলে যায় হিন্দু পরিবারে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দুই সমাজ প্রহার করতে উদ্যোত হয়। হিন্দু মানুষটির শিলের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পরে শিল্পী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পে মদনের শিল্পসত্তা বড় হয়ে উঠেছিল। এ গল্পের শিল্পী বলে-“ আমাকে মাফ করবেন। মরে গেলেও পারব না। মানুষ হিশাবে আমারও তো একটা ধর্ম আছে। যে মসজিদ নিজ হাতে গড়েছি তাকে কেমন করে ভাঙি। কাতর অনুরোধে লোকটার গলা ভারী হয়ে উঠল।“ ( ঐ, পৃ.৪০৩)। শিল্পসত্তাকে রক্ষা করতে গিয়ে বরণ করে নিতে হয়েছে মৃত্যুকে। দুই ভিন্ন যুগের প্রেক্ষাপটে মানিক ও আনসারউদ্দিন শিল্পীর আত্মমর্যদার পৃথক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে আনসারউদ্দিন গল্পের পরিণতিতে আরো নির্মম। উপমা পেতে হয়েছে ‘বিজপির দালাল’- সময়ের উপর জোড় দেন লেখক। এভাবেই যান্ত্রিক ভারতবর্ষের এক অধঃপতিত রূপ উঠে উঠেছে এ গল্পে।

## অন্যদিকে ‘নেনিনের মা’ গল্পে বর্তমান ভারতের রাজনীতিকে লেখক অদ্ভুত ভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন। সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষক শ্রেণির কথা ভেবেছিল লেলিন। কমরেড জাবের তাই ছেলের নাম রেখেছে নেনিন। স্থানীয় উচ্চারণে লেলিন হয়েছে নেনিন। দারিদ্র্য জাবের আজ মৃত। দলের কথা রাখতে আজ ভোটে দাঁড়িয়েছে জাবেরের স্ত্রী অচেনা। গ্রাম্য রাজনীতির এক সচেতন স্বরূপ লেখক তুলে ধরেছেন এ গল্পে। অচেনা বিধবা নারী, পঞ্চায়েতের নানা ভাতায় তাঁর দিন চলে। সে সদ্য সাক্ষারও হয়েছে। অচেনা ভোটে না দাঁড়াতে চাইলেও দলীয় পরিস্থিতি তাঁকে বাধ্য করেছে। কিন্তু কংগ্রসের কাছে সে এক ভোটে হেরে যায়- গল্পের কাহিনি এটুকুই। কিন্তু লেখক এই কাহিনিকে বিধবা জীবনের আত্মযন্ত্রণার সঙ্গে উঁচু সুরে বেঁধেছেন। মুসলিম সমাজে বিধবা নারী এমনিতেই বেওয়া। তার মধ্যে ভোটে হেরে অচেনার মনে হয়েছে-“ আবার যেন সে নতুন করে বিধবা হল।“ (বাংলা ছোটগল্প – অষ্টম খণ্ড, সম্পাদনা বিজিত ঘোষ, পুনশ্চ,পৃ. ২৩২)। স্বামী জাবের নেই, এই বঞ্চিত বিধবা নারী পরাজিত প্রার্থী কিভাবে বেঁচে থাকবে সে প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। অচেনার আজ বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নেনিনের মা। আসলে সর্বহারারা বোধহয় কোনদিন জয়ী হতে পারে না ! লেখক কোন দর্শন দ্বারা চরিত্রদের কোন সময়ে জিতিয়ে দেন। কিন্তু আনসারউদ্দিন এক্ষেত্রে বাস্তববাদী, নির্মম কথাকার। গ্রামীণ সমাজবাস্তবতাকেই প্রাধান্য দেন। আসলে এই সমাজ বাস্তবতা লেখকের প্রতক্ষ্য বাস্তবতা। তাই তিনি শিল্পের সেই স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে তিনি আপস করেন না।

## আনসরউদ্দিন সহজ সরল ভাবেই গল্পে প্রবেশ করেন। গল্পকে অযথা জটিল করে ফেলেন না। জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখগুলি নিয়েই তাঁর গল্পের ক্যানভাস গড়ে ওঠে। স্থানিক রঙ ও কথ্য ভাষার মিশ্রণে গড়ে ওঠা চরিত্র গুলি যেন জীবনের শাশ্বত সত্যের সন্ধান দেয়। সেখানে তিনি নির্মম, এক জটিল জীবনযন্ত্রণার অভ্রভেদী নির্মাতা।




আলোচক পরিচিতি
পুরুষোত্তম সিংহ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন