রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

বই নিয়ে আলোচনা : ষোল ঘড়ি কথা : জনপদ জীবনের আখ্যান

-পুরুষোত্তম সিংহ 

যিনি সমস্তই জানেন তিনি লিখবেন প্রবন্ধ আর যিনি জানেন না তিনি লিখবেন উপন্যাস। এই জানাটা যেন পুকুর আর অজানাটা হল সমুদ্র। ঔপন্যাসিক যেন ডিঙি নৌকা নিয়ে সমুদ্রে ভেসে চলেন, তাঁর যাত্রা আছে, সূচনা আছে, লক্ষ্য আছে কিন্তু অভিমুখ নেই। এই যাত্রাপথই হল উপন্যাস। প্রাবন্ধিককে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় থামতে হয়, তিনি তাঁর এই পরিসমাপ্তিটা জানেন, ঔপন্যাসিক পরিসমাপ্তি জেনে কখনই লেখা শুরু করেন না। লিখতে লিখতেই তা হয়ে ওঠে উপন্যাস। প্রাবন্ধিকের পরিত্রাণ আছে কিন্তু ঔপন্যাসিকের পরিত্রাণ নেই, সমাপ্তি বিন্দু থেকেই তিনি পেয়ে যেতে পারেন অন্য রচনার উপাদান। 

সাহিত্যের আঞ্চলিকতা নেই তবে অঞ্চলের সাহিত্য আছে। আর সে আঞ্চলিক জীবনকে সাহিত্যের ক্যানভাসে রূপায়িত করতে পারেন একমাত্র স্বদেশের সন্তানরা, স্বদেশের কথাকাররা। তবে জন্মভূমির প্রতি টান বা মমত্ত্ববোধ ও শিকড়ের প্রতি টান বা অনুসন্ধানী দৃষ্টি না থাকলে তা কখনই সম্ভব নয়। বাংলা সাহিত্যের যে ভিন্ন ভিন্ন ভূগোল, সেই ভিন্ন ভুগোলের কথাকাররা নিজস্ব বোধ, জীবনদৃষ্টি ও অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সাহিত্য রূপ দান করেন। কিন্তু তা কখন যে বৃহত্তর বঙ্গের পাঠকের কাছে সমাদৃত হয় কথাকার নিজেই জানেন না। আসলে পাঠকের অনুসন্ধানী পাঠ খুঁজে নেয় প্রকৃত কথাকারকে। 

দেবেশকান্তি চক্রবর্তীর জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ শহরে।প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সানুচর জলৌকা’ সাতের দশকে প্রকাশিত হয়। ‘নির্বাচিত গল্প’র জন্য পেয়েছেন ‘ত্রিবৃত্ত পুরস্কার’। গল্প লিখেছেন তিনশো’র বেশি। ‘বসনী’ গল্প পশ্চিমবঙ্গের গল্প প্রতিযোগিতায় ১৯৮৯ এ দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিল। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘বুনো হাঁসের ডানা’, ‘নোনা নদীর বাঁকে’, ‘কনিষ্ক’ ও ‘ভাদুসুন্দরী’। টাল- দিয়ারা অঞ্চলের বাদিয়া মুসলিম সমাজের কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘নোনা নদীর বাঁকে’ উপন্যাস। ভঙ্গনশীল সামন্ততন্ত্র ও নব্য সমাজতন্ত্রের আখ্যান নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘বুনো হাঁসের ডানা’ উপন্যাসটি। 

বাংলা উপন্যাসের আবহমান কালের কথাকাররা প্রত্যকেই স্বতন্ত্র ও নতুনত্বের খোঁজে অগ্রসর হয়েছেন। বিষয়ভাবনা, আঙ্গিক জীবনদর্শন ও জীবনবোধের নব চেতনায় প্রত্যকের স্বতন্ত্র চোখে পড়ে। আবার কেউ কেউ নিজস্ব ভুগোলে বসে স্বদেশ, স্বজাতির কথা বলতে চেয়েছেন। অমিয়ভূষণ মজুমদার, সতীনাথ ভাদুরী, ভগীরথ মিশ্র, নলিনী বেরা ও ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়রা কথাভুবন ভরিয়ে তুলেছেন নিজস্ব অঞ্চলের মানুষ ও জীবনচিত্র দ্বারা। তাই বলে এঁরা যে আঞ্চলিক কথাকার তা কিন্তু নয়। ‘শবরচরিত’ যেন অনার্য ভারতবাসীদের দেখার এক জলজ দর্পণ। দেবেশকান্তি চক্রবর্তী উত্তর দিনাজপুর জেলার কথাকার। দীর্ঘদিন ধরে কুম্ভকার সমাজে ঘুরে ঘুরে, ক্ষেত্র সমীক্ষা করে লিখেছেন মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ষোল ঘড়ি কথা’( ২০০৮)। তাই বলে এটি কিন্তু ‘ডকু নভেল’ নয়।দীর্ঘ বারো বছর ধরে তিনি কুম্ভকারের গাওয়াল জীবনযাপনের নির্যাস সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম করে তিল তিল করে নির্মাণ করেছেন। কুম্ভকার জীবনের অলিখিত সামাজিক ইতিহাস রচনা করেছেন। বাংলা উপন্যাসের দেড়শো বছরের ইতিহাসে যা অদ্বিতীয় ও অভিনব। এর পূর্বে কুম্ভকারের গাওয়াল জীবন তাদের রক্ত মাংস ভাষা সহনবাংলা উপন্যাসে বোধহয় উঠে আসেনি – যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। 

নাগর, কুলিক নদীর তীরবর্তী এক প্রান্তিক জনপদ এ উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণ করেছে। এই প্রান্তিক জনপদ যেন কোন শিল্পীর হাতের ছোঁয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। সেই শিল্পী দেবেশকান্তি চক্রবর্তী। যিনি চারটি পর্ব ধরে কুম্ভকার জীবনের এক নবভাষ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি চারটি পর্বে ৮৫ টি পরিচ্ছেদে কুম্ভকার জীবনের তিনপ্রজন্মের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের পাবনা জেলায় ছিল এই কুম্ভকারদের সমাজ। সেখান থেকে ভূমিচ্যুত হয়ে প্রায় আশিঘর কুম্ভকার এসেছে নাগর নদী, কুলিক নদীর ধারে- এঁরাই উপন্যাস পরিচিত সিংহবাহিনীর কুম্ভকার সমাজ নামে। এ উপন্যাস এক জনপদ জীবন যাত্রাপথের উপন্যাস, অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া বিপন্ন কুম্ভকারদের কন্দনধ্বনির উপন্যাস। শ্রীপদ, সুমন্ত, যদুপাল, সদানন্দ আজ গাওয়ালে( মাটির তৈজস ফেরি করা )যাবে মহানন্দা নদীর তীরে। কুম্ভকাররা হাড়ি পাতিলের বিনিময়ে টাকার বদলে ধান নেয়। কেননা ধান নিলে অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশি লাভ হয় কুম্ভকারদের। নদীপথে এই যাত্রাকে কেন্দ্র করে পল্লির জনপদ জীবনের যে চিত্র লেখক অঙ্কন করেছেন তা অসামান্য। স্বামী বিচ্ছেদে প্রতিটি নারীর চোখেই জল কিন্তু স্বামীর প্রতি ভালোবাসা অন্যদিকে সন্তানের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখা এই To be or not to be দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত প্রতিমা। নিম্নবিত্ত বিপন্ন কুম্ভকার সমাজের অন্দর মহলে উঁকি দিয়েছেন লেখক। প্রতিমার এ যে অনাবশ্যক কৃপণতা তা নয় আবার স্বামীর প্রতি যে ভালোবাসা নেই তাও নয় – আসলে নিম্নবিত্তের সংসারে মাহিলাদের যেন কিছুই করার নেই- সবই নিয়তি –আর সে নিয়তির দোলাচলে অস্থির প্রতিমারা। এ বাণিজ্য যাত্রা যেন কুম্ভকার সমাজের অর্থনীতি আভাস। কালিদাসী, প্রতিমারা নৌকার গলুইতে সিঁদুর দিয়ে যেন প্রার্থনা করে। বুকে অবরুদ্ধ বেদনা, মুখে হাসি নিয়ে বিদায় জানাতে হয় এই যাত্রাপথকে- 

“ নৌকা ভাসতে ভাসতে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রতিমার গলায় অনুক্ত কান্না দলা পাকিয়ে উঠেছে। একটু আগে চাল মাপতে মাপতে কৃপণতা করেছিল মনে করে মরমে মরে গেল। এ সময় অবশ্য শ্রীপদ সেই মরমের কথা ধরতে পারল না- ছাওয়াল মেয়াগুলির ভাল মতন দেহিস গেদারে যেন মারিস না। তর জবর মাইয়ের আত। রাইতে একটু হজাক্ থাহিস। এই সতর্কবাণীর সঙ্গে সঙ্গে ঢোক গিলল শ্রীপদ।“( ‘ষোল ঘড়ি কথা’, প্রথম প্রকাশ ২০০৮, অ্যাকাডেমিক এন্টারপ্রাইজ,পৃ. ১১) 

লেখক যেন অজান্তেই জাদুবাস্তবতার আখ্যান লিখে ফেলেন। ‘ষোল ঘড়ি কথা’র অর্থ রাধাকৃষ্ণের বিরহ আখ্যানের ষোলটি পর্ব। এই বিরহ কুম্ভকার সমাজের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে কোথায় যেন মিলিয়ে যায় তা পাঠক অচিরেই টের পান। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ এর সমাপ্তি ঘটেছিল রাধার বিরহের মধ্য দিয়ে। রাধার মনে অনন্ত আশা বাসা বেঁধেছিল কৃষ্ণ আসবে বলে। কিন্তু কৃষ্ণ আসনি। বিপন্ন মানুষের, গাওয়লের জীবনে কোন দিন সুখ আসতে পারে না।প্রতিটি কুম্ভকার ঘরেই যেন হাহাকার, কন্দনের বাঁশি বেজে চলেছে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে লিখেছিলেন-“ ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্রপল্লিতে। এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।“( বেঙ্গল পাবলিশার্স, পঁয়তাল্লিশতম মুদ্রণ, শ্রাবণ ১৪১৯, পৃ. ১৪ ) ঈশ্বরের বক্র দৃষ্টি কুম্ভকার সমাজে পড়ে না। তবে কুম্ভকার জীবনে আশা রয়েছে। সেই আশা থেকেই শত দুঃখের মধ্যেই কালিদাসী গেয়ে চলেন ষোল ঘড়ি কথা। এই ষোল ঘড়ি কথা যেন কুম্ভকার সমাজের নিজস্ব সম্পদ। বিরহের মধ্যেই যেন রয়েছে মিলনের গান। সেই মিলনগীতি, শত দুঃখের মধ্যে একটু আনন্দের ইঙ্গিত যেন খুঁজে নেয় এই পালাগানের মধ্যে। কালিদাসী আজ এই সংগীতের উত্তরাধিকার খুঁজে চলেছে। কালিদাসীর ‘ষোল ঘড়ি কথা’ শেষ হয় না। এ শেষ হতে পারে না। কুম্ভকার জীবনে দুঃখের শেষ নেই। দুঃখের শনি যেন কুম্ভকার সমাজের অস্তিমজ্জা গ্রাস করেছে। সেই ‘অলীক ক্রন্দনধ্বনি’র আখ্যান এ উপন্যাস। 

এশিয়াটিক সোসাইটির বক্তৃতায় যখন কোন মৃৎশিল্পী বলেন ‘ষোল ঘড়ি কথা’ উপন্যাসে আমাদের পিতৃপরিচয় আছে তখন এ উপন্যাসে বাস্তবতাকে স্বীকার করতেই হয়। আর উপন্যাসের বাস্তবতা সম্পর্কে মপসাঁ বলেন –“ The high order of Realists should call themselves illusionists”( গোপিকানাথ রায়চৌধুরী, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : জীবনদৃষ্টি ও শিল্পরীতি, দে’জ, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০৮, পৃ. ২৮ ) দেবেশ বাবু জীবনের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতাকে নির্মাণ করেছেন- সে জীবন কুম্ভকারের গাওয়াল জীবন। এ উপন্যাস একদিনে লেখা সম্ভব নয়। জনপদ জীবনই যেন লেখককে দিয়ে এ উপন্যাস লিখিয়ে নিয়েছে। শ্রীপদ, সুমন্তরা নদীতে বাণিজ্যতরী ভাসিয়েছে। নদীর স্রোতের মতোই কাহিনি এগিয়ে গেছে। পিতার ইচ্ছা ছিল সুমন্ত যেন শিল্পী হয়। কিন্তু ভাসনি পাল ইচ্ছা করেই সুমন্তকে শিল্পী হতে দেয় নি। অঘ্রাণ মাসে কুম্ভকাররা মহানন্দার ঘাটে পৌঁছায়। সেখানে কিছুদিন গাওয়াল করে ফিরে এসে আবার তৈজস তৈরি আবার ভ্রমণ যাত্রা- ঋতুর আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই গাওয়ালের জীবন আবর্তিত হয়। মহানন্দার তীর যেন কুম্ভকারদের নব উপনিবেশ। ব্যক্তি অপেক্ষা সমষ্টির দিকে লক্ষ্য লেখকের। তবে সবাই শ্রেণিচেতনা জাতিসত্তা সম্পর্কে সচেতন। তাই যদুপালের অসুস্থতায় সবাই এগিয়ে এসেছে। এই গাওয়ালেই লেখক একটি প্রজন্মকে শেষ করে দিয়েছেন। সুমন্তর বাবা আগেই মৃত, কৃষ্ণকুমুদ অবসরপ্রাপ্ত,আর আজ চলে গেলেন যদুপাল-একটি প্রজন্মের অবসান হল-“ চোখ বিস্ফরিত করে ঘন অন্ধকারের দিকে চেয়ে সুমন্ত বলল,- এই মদন, আর কান্দিস নারে ভাই। যে বছর আমার বাবা গেল, কি ঝড় ! কি বৃষ্টি ! কাষ্ঠ করার জায়গা আচিল না। চারিদিকে অথাই জল। তর বাবা এই যদু কাহা আমার পিঠে হাত দিয়া কইছিল- কান্দিস নাই সুমন্ত।“( ঐ, পৃ. ৩৬ ) 

লেখক প্রথম থেকেই সমাজবাস্তবতার উপর জোড় দিয়েছেন। এই সমাজ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে মূলত গোষ্ঠীজীবনকে কেন্দ্র করে। শ্রীপদ, সুমন্তরা গোষ্ঠী জীবনের নায়ক হলেও সমাজরেই প্রতিনিধিত্ব করেছে- এ সমাজ বিপন্ন কুম্ভকার সমাজ। তবে শোষণ যে নেই তা নয়, সদানন্দ পালরা যেন হোসেন মিঞার উত্তরাসূরী। যদুপালের জমি বন্দক রয়েছে সদানন্দের কাছে। সদানন্দ আজ অর্থের লোভে মদনদের ঘরছাড়া করতে চাইলেও কন্যা গঙ্গা সে কাজে বাধা দিয়েছে। আসলে লেখক কুম্ভকারদের উদ্বাস্তু করতে চান নি। নিজের স্বভূমিতে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তেমনি সুমন্ত শিল্পীর আত্মমর্যদা, প্রতিষ্ঠা ও সম্মান থেকে ফিরে এসেছে আবার গাওয়াল জীবনে। তেমনি রয়েছে প্রাচীন কৃষ্ণকুমুদ। সে কুম্ভকার সমাজের মাথা, অভিভাবক। সে যেন এ সমাজের এক চলমান দলিল, ইতিহাসের ধারক বাহক। কুম্ভকাররা কোনদিন সুখের মুখ দেখে না। এ যেন বিধাতার এক নিষ্ঠুর অভিশাপ। লোকবিশ্বাস বসুমতীকে দগ্ধ করার অভিশাপই যেন তাদের ধ্বংস করে-“বুঝলা হলদা, খাইতে না পায়া আড়িবেচারা মাটির পোড়া দেয়। মৃত্তিকারে অজন্ম করে। বসুমতীর পাপ নাগে। নিজেরে অপরাধী ভাবতে ভাবতে, আড়িবেচা মানুষটাই আড়ি পাতিলের মত অয়্যা যায়।“( ঐ,পৃ. ৪৫) 

লেখক গ্রামীণ জীবনের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনবোধের সন্ধানে অগ্রসর হয়েছেন। তাই সুমন্ত নিজের জমানো সমস্ত টাকা আজ তুলে দিয়েছে যদুপালের স্ত্রীকে। তেমনি রয়েছে গ্রামীণ জীবনের আলো- অন্ধকারময় সমাজ বিবর্তনের ছবি। যদুপালের সন্তান মদন, ভানুকে নিয়ে যেমন চিন্তিত সুমন্তরা তেমনি রয়েছে দ্বিধাও। এই দ্বিধা হাড়িবেচার জীবনের জীবন সংকট ও অস্তীত্বের লড়াই। সুমন্ত- শ্রীপদরা এইসব পরিস্তিতি এড়াতেও পারে না আবার মনে মনে রাগ দুঃখও হয়। গ্রামীণ জীবনের Total life ই লেখকের লক্ষ্য। তাই গঙ্গা, যমুনা, প্রতিমা ও সাবলিদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের আশ্চর্য প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। গঙ্গার গহনা চুরি হওয়ায় সাবলি আজ মনে খুশি হয়েছে। কাশিদাসী আজ ‘ষোল ঘড়ি কথা’ বধূ প্রতিমার মনে সঞ্চার করে দিয়ে গিয়েছেন। স্বামী বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় যেন ষোল ঘড়ি কথা মনে শক্তি সঞ্চার করে-“ ঘরের মানুষ গাওয়ালে গেলে হাড়িবেচার বউ কোন ভরসার বুকে বল ধরে- মস্ত একটা ভরসা বুঝি ষোল ঘড়ি কথা। রাধার সঙ্গে মিল ! তার ত ভাতের অভাব নাই ? ভাতের অভাব ছাড়াও আরও এক নাই নাই, মনের নাই নাই কারে কয় ? আর কোন দুর্দশায় ত্রিভুবন পাগল হয় !”( ঐ, পৃ. ৬৫) 

দারিদ্র্যতার কারণে নিম্নবিত্ত মানুষের জাতি সত্তার পরিচয় লোপ পায়। প্রচলিত যে প্রবাদ- ‘নদীর ধারে বাস ভাবনা বারো মাস’- গাওয়াল জীবনে ভাবনার শেষ নেই। কুম্ভকাররা যে ভাত খায় তার নাম চৌধানা। বিভিন্ন ধরনের ধান সেখানে মিশে থাকে তাই এমন নামকরণ। পৌষের শেষের দিকেই গাওয়াল জীবন শেষ করে কুম্ভকাররা ঘরে ফেরে। কুম্ভকার জীবনে চৈত্র মাস নিস্ফলা। এ যেন এলিয়টের ভাষায় ‘cruyal month’। তবে চৈত্রকে অতিক্রম করে হাড়িবেচার আবার নতুন জীবন সংগ্রাম শুরু করে। এ যেন কবিগুরুর ভাষায়-“ দিনের শেষে নতুন পালা আবার করেছি শুরু। তোমারি মুখ চেয়ে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে”। কুম্ভকার জীবনে ভালোবাসার সময় নেই- আছে জীবন যুদ্ধের অনন্ত সংগ্রাম। তাই প্রতিমা আজ সন্তানদের গাওয়াল যাবার জন্য প্রস্তুত হতে বলেছে। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে সন্তানদের খাদ্যের ঝগড়া দেখে কুবের উপলব্ধি করেছিল লড়াই সংগ্রামের পৃথিবীতে নিজেদের অধিকার নিজেরাই বুঝে নিতে শিখুক। কুম্ভকার জীবনে দুঃখ ঘোঁচে না, গাওয়ালের সমস্ত টাকা ধার-দেনা শোধ করতেই শেষ। 

একটি সমাজের চিরদিন এক সরলরেখায় চলা সম্ভব নয়।বিবর্তিত মননের মধ্য দিয়েই সেই চলমান সমাজের চিত্র উঠে আসে। নব সূর্যদয় প্রতিদিনই যেন নব সভ্যতার জন্ম দেয়। আর যদি শিল্পীর অন্তদৃষ্টি যুক্ত হয় তবে সে সমাজ কখনই পিছিয়ে থাকতে পারে না। ঔপন্যাসিকের হাতে সৃষ্ট চরিত্ররা যেন খেলার পুতুল। নির্মাণ বিনির্মাণের পরম্পরায় তিনি যেভাবে অঙ্কন করবেন সেভাবেই যেন তারা এগিয়ে যাবে। তেমনি একটি সমাজের দাবি অনুযায়ী, সমাজের ইতিহাস চিত্রনে লেখককে অনেকটাই এগিয়ে ভাবতে হয়। যেমন ভেবেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘পঞ্চপুত্তলী’ উপন্যাসে নিম্নবর্গের মলিন দাস আজ হয়েছে বিরাট মৃৎশিল্পী। লেখক তাঁকে বীরভূমেই আটকে রাখেন নি, পাটনা, দিল্লী, লখনউ ঘুরিয়ে আবার কলকাতায় এসেছেন। সে নারী ভোগী ঠিকই কিন্তু সে শিল্পীর সত্তায় অবতীর্ণ হয়েছে। নারীকে দেখেই সে শিল্প অঙ্কন করেছে। কিন্তু শেষে সে নিজস্ব দর্শনে ফিরেছে। কুম্ভকারের জীবন শুধু গাওয়ালেই শেষ হতে পারে না, তাই দেবেশবাবু শিল্পের দিক হাতছানি দিয়ে সুমন্তদের এগিয়ে নিয়ে যান। উপন্যাসের দুটি পর্বে গাওয়াল জীবন দুটি পর্বে কুম্ভকারের আজ প্রবেশ করেছে শিল্পে। দ্বিধাবিভক্ত শিল্পসত্তার পরিচয় আমরা পাব উপন্যাসের তৃতীয়- চতুর্থ পর্বে। বাস্তবকে দেখেই শিল্পী অঙ্কন করেন। মলিন দাসের হাতিয়ার ছিল নারী সৌন্দর্য। সুমন্তের হাতিয়া রাধাকৃষ্ণের যুগলপট, রাধাকৃষ্ণের আখ্যান। 

[২] 

‘’ মহাসাগরের নামহীন কূলে 
হতাভাগাদের বন্দরটিতে ভাই, 
জগতের যত ভাঙা জাহাজের ভিড়। 
মাল বয়ে বয়ে ঘাল হ’ল যারা 
আর যাহাদের মাস্তুল চৌচির, 
আর যাহাদের পাল পুড়ে গেল 
বুকের আগুনে ভাই 
সব জাহাজের সেই আশ্রয়- নীড়।“ 

( ‘বেনামী বন্দর’, প্রেমেন্দ্র মিত্র ) 

নতুন জীবনের হাতছানি আজ মন্মথ, সুমন্তদের সামনে। কুম্ভকার জীবনে ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে আধুনিকতার আলো। নিজের ঐতিহ্য ভেঙে বেরিয়ে আসতে চলেছে সুমন্তরা।সে গাওয়াল জীবনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দূর করতে টেরাকাটা শিল্প ও মূর্তি তৈরিতে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। তবে সে কিন্তু ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ এই সত্তায় বিশ্বাসী। তাই সে নিজের তৈরি শিল্প বিক্রি করেনি। বিপুল অর্থের লোভ সামলেও নিজেকে ফিরিয়ে এনেছে। বর্তমান সরকার লোকশিল্পের প্রতি নজর দিয়েছে- এবড় আশার কথা। হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে সুমন্তের আজ জয় জয়কার। মার্কসবাদী দর্শন, শ্রেণি সংগ্রাম, অস্তিত্বের জন্য অর্থ সমস্তকে পিছনে ফেলে লেখক বড় করে তোলেন কুম্ভকারের শিল্পসত্তাকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পে দেখেছিলাম চরম অভাবের দিনেও মদন তাঁতি নিজের শিল্পসত্তাকে বজায় রেখেছিল।শিল্পীর কাছে আত্মমর্যদার প্রশ্নই বড়- সেই অশনি সংকেতেই লেখক আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন। ষোল ঘড়ি কথার প্রতিযোগিতা হয় না। কিছু কিছু নিম্নবিত্ত তো চরম অভাবের দিনেও নিজের ব্যক্তি মহিমায় অটল থাকে, সুমন্ত তাদেরই প্রতিনিধি। লেখক মার্কসবাদী দর্শনে প্রভাবিত হয়ে চরিত্রকে একটি নির্দিষ্ট জীবনদর্শনে পৌঁছে দিতে চান নি, তিনি নির্মম বাস্তবতাকেই অঙ্কন করেছেন। একদিকে শিল্পসত্তা, অন্যদিকে বাজারকেন্দ্রিক সভ্যতা- এই দ্বন্দ্ব বড় হয়ে উঠেছে। সুমন্ত উদ্বাস্তু হতে চায় না, নিজের বংশ পরম্পরায় কর্ম জীবনে ফিরে গেছে। সুমন্তের শিল্পের অহংকারকেই লেখক বড় করে তুলেছেন-“ তোমার নক্সা বুঝি বিক্কিরি অয় নাই। তয় মন খারাপ কর ক্যা। তহন তোমারে, অই নকশাডি বিক্কিরি অয়া গেলে আমার বড় মন খারাপ অইতো। অই গুলান আমাগর মতন আড়ি বেচাগর মনের কথা। মনের কথারে হদায় করণ যায়, কও ? সুমন্ত ঠোঁটের কোনে ফিকে হাসি।“( ঐ,পৃ. ৩৩০) 

“ Awareness of the contemporary situation is not quite the same awareness of the present ... By the novelist”s awareness of the contemporary situation, we mean the novelist’s sense of the age in which he lives, his intuitive feeling for the stresses and pressures that it is and distinguishes it from other times, “( অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, ‘কালের প্রতিমা’, দে’জ, পণ্চম সংস্করণ, বৈশাখ ১৪১৭, পৃ. ২৫৮) লেখক যে ভূগোলে থাকেন সে ভূগোল যেন অচিরেই লেখায় উঠে আসে। দেবেশ বাবু কর্মসূত্রে এইসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ছিলেন। ফলে কুম্ভকার সমাজকে হাতের তালুর মতো চেনেন। লেখকের লক্ষ্যই ছিল কুম্ভকারের এই বিপন্ন জীবন, ফলে তিনি গোষ্ঠীজীবনের দিকেই যাত্রা করেছেন। একটি নারী নয়, অনেক গুলি নারী এ উপন্যাসের ঘটনা নিয়ন্ত্রক। প্রতিমা, সাবলি, আশা, গঙ্গা, কালিদাসীরা যেন নদীর স্রোতের মতো কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। গ্রামীণ জীবনে ভাঙা- গড়ার যে যৌথ পরিবার তার কান্ডারী প্রতিমা। পরিবারে অসম্ভব দারিদ্র্য থাকা স্বত্তেও সে হাসিমুখে সব মেনে নিয়েছে। সুমন্ত সাবলির প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসা। তবে ঈর্ষা যে নেই তাও নয়। গাওয়াল জীবন পিছনে ফেলে সুমন্ত যখন শিল্পের গেছে তখন হাড়িবেচার সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছে শ্রীপদের উপর। স্বামীর এই অসহনীয় কষ্ট দেখে প্রতিমা মনে মনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সুমন্তর উপর। সুমন্তের শিল্পসত্তা এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে যে নারীটি সে হল আশা। সুমন্তের প্রতি আশার ভালোবাসা যেমন আছে তেমনি আশার প্রতিও সুমন্তের ভালোবাসা আছে। কিন্তু সুমন্ত জানে উচ্চবিত্ত আশাকে কোনদিন পাওয়া সম্ভব নয়। তেমনি সুমন্তের অসুখে এগিয়ে এসেছে গঙ্গা। সুমন্তের প্রতি ভালোবাসা আশা ও গঙ্গার। অথচ সুমন্ত কারো প্রেমেই ধরা দেয় না, ফলে একে অপরের প্রতি অভিযোগ আনে –“ আশা বলল- গঙ্গা তুমি বড়লোকের আদুরী, অহংকারে বাঁচোনা। একটা লম্পটের পিছে তোমার মাথাব্যথার কারন জানতে পারি ? কি জানি তোমার বাড়ির লোক জন কেমন ! শাসন টাসন করে না, নষ্ট দুষ্ট লোকের কাছে তোমারে একলা ছাড়ে ?”( ঐ, পৃ. ২৮১) 

কত বড় ধ্রুবদর্শী শিল্পী হলে একটি সমাজের প্রায় একশো বছরের ইতিহাস একটানে অঙ্কন করা যায় তা উপন্যাস পাঠে বোঝা যায়। শ্রীপদরা আজ টব নিয়ে বাইরে গিয়ে লোকসান করে এসেছে। বিশ্বয়নের যুগে দরিদ্র মানুষের এই প্রতরণা নিতান্তই সহজ-সরল। যুগসংকট, কুম্ভকারের ঘর- বাইরের দ্বন্দ্ব বড় হয়ে উঠেছে। শ্রীপদরা হাড়িবেচা থেকে শিল্পী হতে পারছে না আবার মন্মথরা বড় শিল্পী হয়ে গেছে। আবার সুমন্তের জীবনে বিরাট প্রাপ্তির হাতছানি থাকলেও সে বিসর্জন দিয়েছে। নাগর, কুলিক নদীর মন্মথ গতির মতই এগিয়ে গেছে কুম্ভকারদের জীবন। আসলে লেখককে নদীর সাথে পাশ্ববর্তী মানুষের চলমানতাকে মিলিয়ে দিতে হয়। তাই অদ্বৈত মল্লবর্মনকে মালো পাড়ার জীবন মন্মর করে তুলতে হয় আবার সমরেশ বসু খরস্রোতা গঙ্গার নদীর মতোই কাহিনি এগিয়ে নিয়ে যান। ভুলে ভরা জীবনই যেন তাদের সঙ্গী- 

“ ষোল ঘড়ির পাঁচালী অনেক ভুল শব্দে ভরা। সঠিক শব্দগুলি কি কালিদাসীও জানে না। ভুল শব্দের জন্য কালিদাসীর মনে কোন প্রশ্ন দেখা দেয় না। সঠিক শব্দ বোধ হয় কর্তামা নিজেও জানতো না। সুমন্তও জানার চেষ্টা করেনি। ভুল শব্দের মচকানো শব্দার্থ শিল্প সৃষ্টির অতি প্রয়োজনীয় ভাব হিসেব গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখন বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হল, ভুল শব্দের পদাবলী এক ভুল নির্মাণ জন্ম দেয়নি তো !” ( ঐ, পৃ. ৩২১) 

সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’ উপন্যাসে তোতলা বিলাস সমুদ্রে তরী ভাসিয়েছিল। এ উপন্যাসের শ্রীপদর সন্তান রূপচাঁদ আজ গাওয়াল যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়েছে –“ আমি আড়ি পাতিল নিয়া গাবালে যামুগা”। আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার ও কুম্ভকার জীবনের যে নিজস্ব উচ্চারণ তা লেখক সচেতন ভাবেই করেছেন। তেমনি ছড়াগুলিতেও লেখক জাদুবাস্তবতার মাধম্যে কুম্ভকার জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। কৃষ্ণ মথুরায় গিয়ে রাধার জন্য কন্দন করেছিল কি না তা আমরা জানি না, কিন্তু লৌকিক এই গানে কালিদাসীরা রাধার হৃদয় যন্ত্রণার পাশে কৃষ্ণের যন্ত্রণাকেও ব্যক্ত করেন। কেননা স্বামী গাওয়ালে গেলে কেবল কুম্ভকার নারীই শুধু কাঁদে না, কোথাও যেন বিরহে কুম্ভকার পুরুষেরও মন আনচান করে ওঠে। কুম্ভকার সমাজের কথাই যেন আড়ালে কালিদাসী বলে ওঠেন- 

“ চতুর্দোলায় বইসো রে ভাই জগমোহন হরি 
পুস্প তুইল্যা সাজাই তোমায় বিনোদ বিহারী 
দেখিয়া কুঞ্জের শোভা যেদিক ফিরে আঁখি 
সুখময় কুঞ্জখানি ভাই অন্ধকার দেখি 
দুই নয়নে বইছে ধারা নইছে রাধার নাম 
এই কুঞ্জে কাইন্দা মইলো নবগুণ শ্যাম ...।“ 

( ঐ, পৃ. ৩১৪) 

লেখক নিজেই বলেছেন “ ষোল ঘড়ি কথা শেষ হয় না”- এ শেষ হওয়া সম্ভব নয়। লেখক নির্মম ভাবেই এ কাহিনির সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। কোনো দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উত্তরণের পথে যাননি – এক্ষেত্রে তিনি অবশ্যক প্রকৃতবাদী। দুঃখ যন্ত্রণায় ভরা কুম্ভকার জীবন যেন ‘ষোল ঘড়ি কথা’র ভুল উচ্চারণের মতই এলোমেলো। 

কুম্ভকার জীবনকে এক মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন লেখক এ উপন্যাস। এ উপন্যাস সময় প্রবাহের উপন্যাস- যে সময় গড়ে উঠেছে কুম্ভকার জীবনকে কেন্দ্র করে। আবেগ সর্বস্বতা নয় লেখক সমাজ বাস্তবতার উপর নজর দিয়েছেন। ‘ষোল ঘড়ি কথা’ আঞ্চলিক, সমাজিক বা নিম্নবর্গের শ্রেণিভুক্ত লেবেলসাটা উপন্যাস নয়। ‘ষোল ঘড়ি কথা’ জাতিসত্তা নির্মাণের ধ্রুপদী উপন্যাস। অধ্যাপকীয় সমালোচনায় সেই ‘আঞ্চলিক’ শিরনামের গোত্র আমি মানতে নরাজ। লেখক তো একটি নির্দষ্ট অঞ্চল, একটি সময় নিয়েই লিখবেন- লেখক নিশ্চয়ই আকাশ নিয়ে লিখবেন না। আসলে লেখার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার জগৎ বড় কথা। দিল্লী প্রবাসী কোন অনভিজ্ঞ সাহিত্যিকের পক্ষে ‘ষোল ঘড়ি কথা’ লেখা সম্ভব নয়। তবে অঞ্চল প্রাধান্য নয় তা শিল্প হয়েছে কি না সেটা বড় প্রশ্ন। প্রতিটি লেখকেরই মূল লক্ষ্য থাকে শিল্পসত্তায় উত্তীর্ণ হওয়া। দেবেশ বাবু এ উপন্যাস শৈল্পিক সত্তায় উত্তীর্ণ হয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দহ নেই। 

আপাত অর্থে সুমন্তকে এ উপন্যাসের নায়ক মনে হলেন জনপদ জীবনই এ উপন্যাসের নায়কত্বের দাবিদার। গোটা কুম্ভকার সমাজের তিন প্রজন্মের সময় রহস্যের বিবাগী সত্তা যেন নায়ক। সুমন্তরা শুধু সেই সময়কেই বহন করে চলেছে। অভাব আছে, দারিদ্র্য আছে, যন্ত্রণা আছে কিন্তু এ সবের উর্ধ্বে আছে প্রেম- ভালোবাসার রোমান্টিক অনুভূতি। দারিদ্র্যের জন্য কোন যন্ত্রণা বা শোকগাথা নয়, দারিদ্র্যতাকে সঙ্গী করেই বাঁচতে চেয়েছে, বেঁচেছে। আর লেখক এঁদের দেখেছেন নির্ভেজাল স্বচ্ছ দৃষ্টিতে। মায়াবী ভাষার রহস্য জাদুতে তিনি প্লট নির্মাণ করেছেন। আর সে নির্মাণের কায়া যে মহৎ হয়ে উঠেছে তা উপন্যাস পাঠেই অনুভব করা যায়।





আলোচক পরিচিতি
পুরুষোত্তম সিংহ
পিএইচডি রিসার্চ স্কলার
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। 

1 টি মন্তব্য: