রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

কথাশঙ্কর

স্বপন চক্রবর্তী

🍁

হঠাৎ করেই তাপমাত্রা একটু বেড়ে গেলো। হাড় কাঁপানো শীতের কামড় তেমন নেই যেন। যদিও এ অবস্থাটি শীতের আরো তীব্রতা নিয়ে সহসা ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বলক্ষণ মাত্র! দেশে দিনাজপুরে, পঞ্চগড়ে, শ্রীমঙ্গলেও নাকি শীতের প্রকোপ সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে । কি করে যে দরিদ্র জনগোষ্টি বেঁচে আছেন এমন শীতে, ভেবে খুব মন খারাপ হয়।এঁদের জন্যে কিছু করতে পারার সাধ্যহীনতার কষ্ট আরো বেশী যন্ত্রণা দেয়।

এমন কত যন্ত্রণা নিয়েই তো আমাদের দিন কাটে, রাত কাটে। এমন কত সাধ্যহীনতার কামড় অসহনীয় এই শীতের কামড়ের মত আমরা সহ্য করে যাই, সয়ে সয়ে এমন সব ব্যথাই একসময় সহনীয় হয়ে যায়। তখন এই সকল বেদনা আর গায়ে লাগে না। মনেও কি লাগে? হয়ত লাগে, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করে যাবার একটা শক্তি যেন ভেতরে ভেতরে তৈরী হয়ে যায় ! এ কি কোন উচিত অনুভব! সাধ্যহীনতা বা অক্ষমতার কামড়ে এই ঔচিত্যবোধও কি ফিকে হয়ে ওঠে ! হয়ত ওঠে । 

এসবই ভাবতে ভাবতে পার হয়ে যাচ্ছিলাম থ্রকসনেক ব্রিজের উপর দিয়ে লং আইল্যান্ডের দিকে।যাচ্ছি প্রশাসনিক অফিসের নতুন কলিগ স্কট ডিভাইন এর মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে। বরফে এখনও সাদা হয়ে আছে হাইওয়ের পাশের ‘অ্যালি পন্ড’। লং আইল্যান্ডের একটি ক্যাথলিক গীর্জায় এই আয়োজন। আরো অনেকেই যাবে, সকাল সাড়ে এগারোটার আগেই পৌঁছাতে হবে। এই সময়ে রাস্তার ট্রাফিকটা একটু হালকা থাকে, এইটুকুই ভরসা।

সঠিক সময়ের একটু আগেই পৌঁছে গেলাম। কি অপূর্ব একটা গীর্জা, বিশাল এলাকা জুড়ে অপূর্ব নান্দনিকতা ছড়িয়ে সগৌরবে নিজের অস্তিত্ব জানাচ্ছে এই গীর্জা। স্কট নিজে ধর্ম নিয়ে একটা দোটানায় ভুগে সবসময়ে। সুযোগ পেলে সে এই বিষয়ে আমার সাথে তর্ক জুড়তে খুব ভালোবাসে। কিন্তু তার মায়ের শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানটি পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পরিবার। 

গীর্জার পাশের দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে দেখি অনেকেই এসে গেছেন। পারিবারিক সদস্যরা একপাশে ও অন্যান্য অভ্যাগতরা অপরপাশে বসেছেন। আমরা গিয়ে সিটে বসার কয়েকমিনিটের মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হলো। সামনে নিয়ে আসা হলো স্কটের মায়ের কফিন। গীর্জার পুরোহিত বাইবেলের নানা অনুচ্ছেদ পড়ে যাচ্ছেন। আর ফাঁকে ফাঁকে একটি মেয়ে অপূর্ব গলায় গেয়ে যাচ্ছে কিছু পদ । শান্ত, সুন্দর গাম্ভীর্য্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে দিয়ে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের অনুষ্ঠানটি শেষ হলো। শববাহকেরা কফিনটা নিয়ে খুব ধীরে বেরিয়ে গাড়ীতে তুলে নিলেন। পরিবারের লোকজন ও অন্যান্য অভ্যাগতরা একে একে সৌজন্য বিনিময় করছেন, এরপরেই পরিবারের লোকজন কফিন নিয়ে চলে যাবেন সর্বশেষ অনুষ্টান সমাপনের জন্যে সেমিট্রিতে। 

স্কটের সাথে হাত মিলিয়ে সরে গেলাম একপাশে, যাতে অন্যরা সৌজন্য বিনিময় করতে পারেন। এই শোকের সময়ে একটু সাথে থাকতে পারাটাও যে কতখানি সান্ত্বনা দেয়, তা’ স্বজন হারানো মানুষেরা ঠিকই জানে। দেখি অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি, যে শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অপূর্ব গলায় সঙ্গীত পরিবেশন করেছে। মেয়েটির বয়স হয়তো ত্রিশের মধ্যে। জগতের সমস্ত বিষাদ তার মুখে ধরে রেখেছে মেয়েটি।সৌজন্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে জানতে পেলাম ওর নাম আনা, এই গীর্জাতে নানা অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করার চাকরি তার। তাকে বললাম, তোমার এমন সুন্দর কণ্ঠ, তুমি তোমার গানের সিডি বের করেছ তো! 

মুখে একটু কষ্টের হাসি ছড়িয়ে সে বললে, গীর্জাতে গান গেয়ে জীবনপাতই আমার নিয়তি। ওই যে পবিত্র ক্রস হাতে কফিনের গাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে, উনি আমার বাবা, কফিনবহনকারী ওইপাশের দুজন আমার ভাই, আর ঐ যে বয়স্কা মহিলা যিনি অনুষ্টানে নানা কাজে সাহায্য করছেন, অনেকটা আমার মত দেখতে, তিনি আমার পিসী। 

জিজ্ঞেস করলাম, তোমার মা? 

সে বললে, তার মায়ের কাজটিই সে নিয়েছে । মা নেই, চলে গেছেন ক’বছর আগে। কিন্তু এই কাজটি তার ভালো লাগে না, কিন্তু এই বংশানুক্রমিক ব্যবসাটিকে ধরে রাখতে পরিবারকে সে সাহায্য করতে গিয়ে এখন এরই অংশ হয়ে গেছে সে। জিজ্ঞেস করলাম, প্রতিদিন এতো মৃত মানুষের জন্যে টেপ রেকর্ডারের মত গান গেয়ে যেতে তোমার কষ্ট হয় না ?

~ ‘হয় না মানে, আমি তো দিনরাত বিষাদেই ডুবে থাকি। বিষাদের সাথে আমার পরমসখ্যতা। প্রতিদিন নানা মৃতদেহের সাথে সাথে আমার বিষাদ মিশিয়ে আমার জীবনের সব আশা আকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনার ফুলকিগুলোকে চলে যেতে দেই । আমি ক্রমশ: দেয়ালের ওই মূর্তিগুলোর মতো পাথর হতে থাকি!’

এক নি: শ্বাসে কথাগুলো বলে ধন্যবাদ দিয়ে মেয়েটির ভাইয়ের ডাক শুনে সেদিকে ছুটে গেল। ফেরার পথে কানে বাজছে আনার কথাগুলো, এই দেশেও আছে এমন নিয়তির নির্মম শিকার হয়ে বেঁচে থাকা মানুষ! যারা ইচ্ছে করলেই বেরিয়ে পড়তে পারে এই স্বেচ্ছাবন্দীর নিগড় থেকে । কিন্তু কেনো বেরোয় না ! 

এই পাজল্ আমাকে বিব্রত করে রাখল সারাটিপথ। ঘরে ফিরেও কলিগের মা হারানোর বিষাদঘন মুখ ছাড়িয়ে, ওই আনা নামের পাথর হতে থাকা মেয়েটির বিষাদ আমাকে গ্রাস করে রইলো। আমাদের দেশেও ঘরে ঘরে কি এমন প্রতি প্রহরে পাথর হতে থাকা অসংখ্য মেয়ে নেই! আছে বৈকি ।

মানুষের জীবন - সে কি আশ্চর্য্য এক কারাগার! মানুষের কত রকমেরই অক্ষমতা মানুষকে দিনরাত জর্জরিত করে, কতভাবে মানুষ সেই কারাগারে পড়ে থাকে - সেই কারাগারের মাহাত্ম্যকে সুখের সংজ্ঞায় নির্ণায়িত করে, আত্মগর্বে টইটুম্বুর হয়ে থাকে! হায়রে জীবন !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন