রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

স্বপ্নময় চক্রবর্তী’র পাঁটটি অনুগল্প

হরিণ! হরিণ!
--------------
একটা ঘরে দু’জন থাকি
আমরা দু’জন রাগ করে
দরজা দেরাজ জানলা কপাট
সমান নিলাম ভাগ করে
কোন একজন বাইরে গেলে
লাগাই তালা ঠিক করে
একটা কপাট বন্ধ থাকে 
অন্য কপাট ফাঁক করে।
এই আমাদের সম্পর্ক। আমাদের মধ্যে কথা নেই। ব্যথা আছে। ওর খাট আর আমার খাট পাশাপাশি। ও যখন জেগে থাকে, ওর কথা শুনিনা। ও যখন ঘুমোয়, তখন ওর কথা শুনি। বেশি বেশি শুনি। ও ঘুমের মধ্যে কথা বলে। 
আমার সারাদিন পরিশ্রম। বারো-চোদ্দ-ষোল ঘণ্টা। রাত্রে ঘুমোতে চাই। কিন্তু পারিনা। পাশের খাট থেকে মধ্যরাতেও চেঁচায় হরিণ! হরিণ! 
ও চেঁচায়- আহা! তাজমহল!
ও চেঁচায়- দেখো কী সুন্দর ঝর্ণা!
ও চেঁচায়- পেরেছি! পেরেছি!
আমি ওকে অনেক বার বলেছি স্বপ্ন দেখা বন্ধ কর। আমাকে ঘুমোতে দাও।
ও কিছুতেই শোনে না। রোজ রাতে চেঁচায় হরিণ! হরিণ...!
গতকাল মাঝ রাত্রে হরিণ হরিণ শুনে আমি আর নিজেকে সংযত করতে পারলাম না। ওর বুকের উপর বসে গলা টিপে ধরলাম। অনেকক্ষণ। ওর জিভ বেরিয়ে পড়ল, শরীর নেতিয়ে পড়ল। আমি নাকের কাছে হাত রেখে দেখলাম নিঃশ্বাস নেই। তারপর ঘুমোলাম। 
সকালে দাঁত মেজে কাজে বেরুলাম। সারাদিন কাজ। ফেরার সময় মনে হল আমার ঘরে একটা মৃতদেহ আছে। নিশ্চয় পচতে শুরু করেছে। দুর্গন্ধ বেরোবে। এর মধ্যে ঘুমোবো কী করে? তারপর কাল কী হবে? আরও দুর্গন্ধ। পরশু? পাড়ার লোক আসবে, পুলিশ...। মৃতদেহ কোথায় সরাব?
ঘরে ফিরি। একটা কপাট খোলা। ঘরে ঢুকি। দুর্গন্ধ পাচ্ছি না। লোকটা শুয়ে আছে। ঠোঁট নড়ছে। বিড়বিড় করছে-
হরিণ!



মা
---
যুথিকা পেট ভাড়া দিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরল-নৈহাটি। এতদিন কলকাতার বালিগঞ্জে ছিল। আসলে ও ছিল সারোগেট মাদার। বউটা কি একটা গণ্ডগোল ছিল। ছোটচুল ওলা ফর্সা বউ। গরু ছাগলের হলে বলে পাল ছেড়ে দেওয়ার দোষ। বউটা গর্ভ রাখতে পারতোনা। ভদ্রলোকের বীজ, ওর বউয়ের ডিম্বানু মিশিয়ে, হিসেব করে যুথিকার পেটে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। যুথিকা ছিল ও বাড়িতেই। ভালোমন্দ খেয়েছে। ওদের টাকায় দুধ ছানা ডিম। যুথিকা তো জানতো ও খাচ্ছে না, খাচ্ছে পেটেরটা। বাচ্চা হ'ল। খুব ফুটফুটে। তারপরও চারমাস ও বাড়িতে ছিল যুথিকা। বাচ্চাটাকে দুধ খাইয়েছে, বুকের দুধ।

এবার ওরা আমেরিকা চলে গেছে। স্বামী আগেই গিয়েছিল, এবার বউ আর বাচ্চা। যুথিকাকে অনেক টাকা দিয়েছে। শাড়িও।
ওদেশে নাকি পেটভাড়ার খরচ আরও অনেক বেশি। ওখনও যুথিকার বুক টনটন করে। বুকে এখনও দুধ রয়েছে। দুধের জন্য নয়! আরও ভিতরে কিছু আছে, ওখানেই কষ্টটা।
ওই বাচ্চাটার...


দেহদান
---------
আমি পিসিমার বাড়িতে থেকে পড়াশুনো করতাম। পিসিমার বাড়ির একতলায় নতুন ভাড়াটে এল। একজন মহিলা আর্টিস্ট। আমি তখন ক্লাস ইলেভেন।
ভদ্রমহিলা বেশ সুন্দরী। ছোটচুল। হাতকাটা জামা। ছবি আঁকতেন। দেখতে যেতাম। সব ছবির মানে বুঝতাম না। কয়েকটা ছবিতে নগ্নতাও থাকতো। স্ত্রী পুরুষের মিলিত নগ্নতা ছাড়াও নগ্নপুরুষও দেখেছি। ওর কাছে অনেক পুরুষও আসতো। ভিতরে কী হ'ত জানি না। জানলা বন্ধ থাকতো।
আর্টিস্টদের তো মডেল থাকে তাই না? আমাকে মডেল করবে? তারপর....। কত কী ভাবতাম। বিচ্ছিরি ভাবনা। ওই বয়সে কি ভাবনা পোষ মানে?
ওই মহিলা একা থাকতেন। উঁকিঝুঁকি কম করিনি। ওর অন্তর্বাস শুকোতে দেখেছি রোদ্দুরে। কত কী কল্পনা। ওই বয়সে কল্পনার কি লাগাম থাকে?
ওই ভদ্রমহিলা বেশ যুবতী। দারুন শরীর। ওর একটা ছবি দেখলাম, নিজের শরীর। নিজেরই আঁকা। আমার খুব রক্তমাংসের শরীর দেখতে ইচ্ছে করতো, অন্তত কিছুটা।
হায়ার সেকেন্ডারির পর ডাক্তারিতে সুযোগ পেয়ে গেলাম। বাঁকুড়া চলে যেতে হল। যাবার আগে দিদির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। কয়েকটা নিষিদ্ধ ইচ্ছে অপূর্ণই রইল।...না পাওয়াই থাক। হোস্টেলে চলে গেলাম।
ডাক্তারি পড়তে লাগলাম। আর্টিস্ট দিদিমনির কথা মনে পড়তো মাঝে মাঝে। বিশেষত অ্যানটমির ক্লাসে। স্বপ্নও দেখেছি কয়েকবার। কিছুদিন পর পিসিমার বাড়ি গিয়ে জানলাম আর্টিস্ট দিদিমনি বাড়িটা ছেড়ে দিয়েছে।
একদিন ডিসেকশন টেবিলে একটা বডি এল। শুনলাম যার বডি, উনি সেটা দান করেছেন। সুইসাইড করেছিলেন, সুইসাইড নোটে ছিল দেহটা যেন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাজে লাগে।
চাদর ওঠালেই দেখা গেল সেই আর্টিস্ট দিদিমনি।
নিরাবরণ।
চোখ বুঁজি।


শাড়ি
--------
ভোট।
মন্দাকিনী গেছে বাপের বাড়ি।
ওর ভোটটা নষ্ট হবে নাকি?

মন্দাকিনীর বাড়ির কাজের মেয়ে মরণীকে বলা হ‌ল বৌদিমণির ভোটটা দিয়ে আয়।

মরণীকে বৌদিমণির শাড়ি পরানো হল। হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ, ঠোঁটে লিপস্টিক।

ভোট শেষ হলেই মরণী, বৌদিমণির শাড়িটা খুলে দেবে, সেই শাড়ি যাবে লণ্ড্রীতে।


পণ্য
------
আমি একা থাকি। রেঁধে খাই। ছুটির দিনে মাংস করি। দুপুরে রবিবাসরীয় পড়তে পড়তে ঘুমোই। আমার একতলা বাড়ি। খুব মশা। আর হকার। ছুটির দিনে হকার খুব জ্বালাতন করে।

সাড়ে নটায় বেল বাজল। জ্যাম জেলি আচার।
না। ও সব লাগে না। দরজা বন্ধ করলাম।
দশটায় একটি অন্ধ। ধূপকাঠি।
না। ধূপকাঠি লাগে না।
এগারটায় টাই পরা যুবক। এ্যকোয়াগার্ড।
না। আমার দরকার নেই। আমার পেট কাকের মতো। সব হজম হয়।
পেট খারাপ হয় না আমার।

এবার একটি মেয়ে। চুপচাপ দাাাঁকড়িয়ে আছে। কোনো পণ্য বয়ে আনেনি ও।

শুকনো ঠোটেঁর উপর ব্যান্ডেজের মতো লিপস্টিক। চোখের ভিতরে পাখির বাসা।
কিছু বলছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

1 টি মন্তব্য: