রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

স্মরণ-- মতি নন্দী : মানুষ তার বাসনার চাপে কতদূর না যেতে পারে

জয় গোস্বামী 

আজ থেকে প্রায় বছর দশেক আগে খড়গপুর বইমেলায় গিয়েছিলাম। মঞ্চ থেকে যখন নামছি, তখন শুনলাম মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে: মতি নন্দী আর নেই। সেই মুহূর্তে বুকের ভিতরটা যেমন ফাঁকা লেগেছিল, আজ প্রায় এক দশক পরেও সেই শূন্যতা থেকে গিয়েছে। মতি নন্দী খুব ‘লোকপ্রিয়’ লেখক ছিলেন না। কিন্তু মতি নন্দীর প্রত্যেকটি ছোটগল্প, প্রত্যেকটি উপন্যাস ছিল তুলনারহিত। মতি নন্দী তাঁর গল্পে এবং উপন্যাসে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের নিয়ে পরীক্ষা করতেন।
গবেষণাগারে বসে একজন বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যকে পরস্পরের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে নজর করতে থাকেন দ্রব্যগুলি কীরকমভাবে একে-অন্যের সঙ্গে বিক্রিয়া করছে এবং সেই বিক্রিয়ার ফলে কী ঘটছে। মতি নন্দী তাঁর লেখার ভিতর চরিত্রদের নিয়ে এসে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতেন। নিখুঁত বাস্তব অথচ খানিকটা অভাবনীয় অবস্থার মধ্যে তাদের নিয়ে গিয়ে ফেলতেন। তারপর লেখক হিসাবে যেন পর্যবেক্ষণ করতেন একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্ক কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। 

সম্পর্ক! এই হল মতি নন্দীর গবেষণাগারের প্রধান উপাদান। মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ জীবনের কোনও একটি পর্যায়ে এসে কীভাবে বাসনার কাছে পরাজিত হয়। অথবা কোন জৈবিক তাগিদ তার মূল্যবোধকে ভেঙে দুমড়ে দেয়, পাশাপাশি কোন আশ্চর্য মূল্যবোধ কোনও প্রায়-দরিদ্র মানুষকে চালিত করে সত্যের দিকে, যেকারণে সে মানুষ তার জীবনের সর্বস্বকেও বাজি রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে-- মানবজীবনের এরকম নানা রূপের বৈচিত্র ও সংঘাত দেখা দেয় মতি নন্দীর লেখার চরিত্রদের ভিতর। অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ’ গল্পটির কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল। 

সংঘাত— এও হল মতি নন্দীর কথাসাহিত্যের একটি বড় উপকরণ। সম্পর্কের মধ্যে অবস্থানকারী চরিত্রদের সংঘাত তো বটেই, চরিত্রটির নিজের সঙ্গে নিজেরই সংঘাত। কোন অবস্থার মধ্যে পড়ে মানুষ কোন কাজ করে ফেলে, এবং তখন সেই অবস্থান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টায় একের পর এক স্বভাববিরোধী কাজের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনে ঘটে যাওয়া ভুলের হাতে নিজেকে সমর্পণ করতে বাধ্য হয়, তারও নিখুঁত নিদর্শন পাওয়া যায় মতি নন্দীর লেখায়। ‘বাওবাব’ উপন্যাসটির কথা এই সূত্রে ভাবা যেতে পারে। 

মতি নন্দী, লেখক হিসাবে, নির্মোহ। এত দূরও বলা যায়, নিষ্ঠুর। মতি নন্দীর একটি উপন্যাসে একটি চরিত্র তার স্ত্রীকে একটা থাপ্পড় মারে। লোকটি ভালবেসে ওই নারীকে তার সঙ্গিনী করেছিল। প্রেমের সূচনা ও অর্ধস্ফুট অবস্থা থেকে দু’জনের একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত পর্বটি উপন্যাসে অব্যর্থ ডিটেলসহ দেখানো হয়েছে। যে তার বউকে থাপ্পড় মারল, সেই চরিত্রটি কেমন? সে নরম মনের মানুষ। সে বই পড়তে ভালবাসে। উঁচু গলায় কথা বলে না। উপন্যাসের আরম্ভে দেখা যায় সেই লোকটি অতি অল্পেই ভালবেসে ফেলে তার সঙ্গিনী মেয়েটাকে। তারপর মতি নন্দী ধাপে ধাপে লোকটিকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে এনে ফেলেন যে, চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গিনীকে একটা থাপ্পড় মেরে বসে। লোকটি বই পড়ছিল। সঙ্গিনী সেই বই তার হাত থেকে একটানে কেড়ে নিয়ে জানলা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয় ক্রুদ্ধ হয়ে। শান্ত, নির্বিরোধী স্বভাবের লোকটির কী প্রতিক্রিয়া হয়? একটি থাপ্পড়। 

তারপর সে ভাবতে বসে এটা সে কী করল! ততক্ষণে তার সঙ্গিনী বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। মতি নন্দী তাহলে এই পর্যন্ত নিয়ে এলেন সহজে প্রেমে পড়ে যাওয়া, বই পড়তে ভালবাসা সবরকমের বিবাদহীন চরিত্রটিকে। 

‘শবাগার’ নামক গল্পে আমরা দেখতে পাই ক্যানসারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছনো মৃত্যুশয্যায় শায়িত নড়াচড়া করতে অসমর্থ পঙ্গু স্বামীর সামনেই দ্বিতীয় একটি পুরুষের দৈহিক চাহিদার কাছে আত্মসমর্পণ করছে স্ত্রী। এই জায়গাটা একটু তুলে দিই— 

মধ্যরাত্রে মুকুন্দ নিচে নেমে এসে শিপ্রার ঘরের দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলে যেতেই সে ঘরে ঢুকে শিপ্রাকে জড়িয়ে ধরল। 

একি, একি। ঘরের মধ্যে নয়। ও রয়েছে যে। 

থাকুকগে। শিপ্রাকে মেঝেতে শোয়াতে শোয়াতে মুকুন্দ বলল, ও তো মরে যাচ্ছেই। তাহলে আবার ভয় কীসের। 

এইটিই গল্পের শেষ লাইন। মানুষ তার বাসনার চাপে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে, এখানে তা পরিস্ফুট হল। 

মতি নন্দীর একটি উপন্যাসের শেষে। একজন আত্মহত্যা করছে। সে যে আত্মহত্যা করছে, সে কথা কোথাও বলা হল না। চরিত্রটি একটা কেরোসিন ভর্তি টিন হাতে নিয়ে ছাদে গেল। পরনের পাঞ্জাবিটা খুলে ফেলল। তারপর দু’হাতে কেরোসিনের টিন তুলে গায়ের গেঞ্জিটা ভেজাল। বুকটা ভেজাল। পিঠের দিকটা ভেজাল। তারপর দেশলাই বাক্স খুলে একটি কাঠি বের করল। উপন্যাস এইখানেই শেষ। মতি নন্দী তার লেখায় কখনও একটিও অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার করতেন না। একলক্ষ্য, নিশ্চিত, অব্যর্থ ও নির্মেদ মতি নন্দীর গদ্য। 

কিশোরদের জন্য মতি নন্দী অবিস্মরণীয় সব লেখা লিখে গিয়েছেন। সেখানে তিনি আর এক মানুষ। এ কথা আজ সকলেরই জানা যে, খেলাকে নিয়ে যে উচ্চাঙ্গের সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় বাংলায় মতি নন্দীই তার প্রথম প্রমাণ। ১৯৭৪ ও ১৯৭৫, পরপর দু’বছরে মতি নন্দী লিখেছিলেন বড়দের জন্য ‘বারান্দা’ আর কিশোরদের জন্য ‘কোনি’। তখন তিনি ৩৯ বছর বয়স থেকে ৪০-এ পৌঁছেছেন। আজকে ভাবলে অবাক লাগে। 

মতি নন্দীর ‘উপন্যাস সমগ্র’ ও ‘গল্পসমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে এখন। তাঁর সারা জীবনের লেখা এখন আমাদের চোখের সামনে। নতুন করে মতি নন্দীকে পড়া শুরু করা দরকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন