রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

প্রবন্ধ : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র ইংরেজি উপন্যাস

মোস্তাক আহমাদ দীন 

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র ইংরেজি ভাষায় লিখিত দুটি উপন্যাস দি আগলি এশিয়ান ও হাউ ডাজ ওয়ান কুক বিন্‌স প্রকাশিত হওয়ার পরে তাঁর উপন্যাসচিন্তা ও উপন্যাসের প্রবণতা বিষয়ে কথা বলা কিছুটা সহজ হয়েছে। দুটি বইয়েরই অনুবাদক শিবব্রত বর্মন।১ বইয়ে অনুবাদবিষয়ে অনুবাদকের দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যক্ষ উল্লেখ না থাকলেও বোঝা যায় ঔপন্যাসিকের মনের অভিব্যক্তি বিবেচনায় রেখে এতে চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাস দুটির ভাষাভঙ্গি গৃহীত।
ইংরেজি উপন্যাস দুটির রচনাকাল নির্ণয় নিয়ে এখনও মতভিন্নতা থাকলেও ভাষা ও বিষয় উভয় ক্ষেত্রে এদের ঘনিষ্ঠতা চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদোর সঙ্গেই, লালসালুর সঙ্গে নয়; তাই বলা যায়, অনুবাদকের এই সিদ্ধান্ত যথার্থ। এই লেখার কিছু মন্তব্য এ-কথার পক্ষেই যাবে, এছাড়াও এখানে আলোচিত হবে ইংরেজিতে উপন্যাস লেখার কারণ এবং বিশেষভাবে আলোচিত হবে তখন পর্যন্ত কোনো বাঙালি ঔপন্যাসিক-কর্তৃক গৃহীত এর নতুন বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে। 

এই সময়ে এসে, ওয়ালীউল্লাহ্‌র এ-পর্যন্ত প্রাপ্ত ও প্রকাশিত পাঁচটি উপন্যাসের দিকে নজর দিলে লালসালুর ধীরে ধীরে গড়ে-ওঠা সার্বিক সাফল্য ও এখনকার জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও আজ একথা স্পষ্টভাবেই বলা যায় যে, চেতনাগত দিক দিয়ে অন্য চারটি উপন্যাস থেকে লালসালু ভিন্নচেতনার একটি উপন্যাস। এতে লালসালুর মহত্ত্ব কিছুতেই ক্ষুণ্ণ হয় না, ক্ষুণ্ণ হয় না এর স্রষ্টার মর্যাদাও, বরং মজিদ পিরের বাস্তব ভিত্তি বা উপন্যাসের অন্তর্কাঠামো যাই হোক, সে যে মোটের ওপর ভণ্ড পিরের প্রতীকে পরিণত হতে পেরেছে, তাতে সমাজের উপকারই হয়েছে। তবু একথা মনে রাখা জরুরি, ১৯৪৮ সালে লালসালু প্রকাশের পর বাংলা ভাষায় লিখিত তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাসটির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ষোল বছর। তার কারণ যে-ভাষা ও বিষয়বস্তু অবলম্বন করে উপন্যাস লিখবেন, ধারণা করি তা মনে দানা বাঁধতে সময় লেগেছে। আর এ-কথাও ঠিক যে, পূর্বে-দেখা সামান্য অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে, বলা উচিত জীবন্ত করে, বিশেষ দায়বোধ থেকে তিনি লালসালু লিখেছেন, দ্বিতীয়বার সেরকম বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লেখা ছিল অসম্ভব, কেননা গ্রামীণ জীবনব্যবস্থার সঙ্গে ততটা ঘনিষ্ঠ হওয়ার মতো সুযোগ তাঁর জীবনে আসেনি। যদিও এই সময়ের মধ্যে, ১৯৫৪ সালের ১৫ অক্টোবরে লিখিত চিঠিতে একটি ইংরেজি উপন্যাস রচনাবিষয়ে ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর স্ত্রী আন মারিকে জানিয়েছিলেন : 'এটি আসলে এখানকার গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে লেখা উপন্যাস, তবে এর পরতে পরতে আছে আমার ব্যক্তিগত ভাবনাচিন্তা'২--ধারণা করি, সেই উপন্যাসটি, শেষপর্যন্ত গ্রামজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার অভাবে সমাপ্ত করে যেতে পারেননি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌; অথবা হতে পারে সেই উপন্যাসটি পরে বিষয় ও রূপ পাল্টে অন্য উপন্যাসে অন্তরিত হয়ে গেছে। তবে এই সময়ের মধ্যেই তিনি সাময়িকপত্রে কিছু গল্প লিখেছেন, গল্প লিখেছিলেন লালসালু প্রকাশের আগেও, গল্পবই নয়নচারাও বেরিয়েছিল ১৯৪৪ সালে--নানাসময়ে লেখা এই সকল গল্পে গ্রামজীবনের অভিজ্ঞতা আছে, তবে পরবর্তী সময়ে তিনি যে-ভাবে, যে-আঙ্গিকে বাংলা ও ইংরেজি উপন্যাস লিখবেন তার কিছু মুদ্রাচিহ্ন তাতে দেখা গিয়েছিল, যা এড়িয়ে যায়নি সেই সময়কার আলোচকদের চোখেও। নয়নচারা প্রকাশের দু-বছর পরে পরিচয় পত্রিকায় সুশীল জানা লিখেছিলেন : 

ওয়ালীউল্লাহ্ সাহেবের ঝোঁক মনঃসমীক্ষণের দিকেই বেশি। এতে বিপদ আছে, বিশেষ করে যে শ্রেণীর মর্মকথা তিনি লিখেছেন সে ক্ষেত্রে। মধ্যবিত্তিক ভাবপ্রবণতা আবেগের ঝোঁকে ঘাড়ে চেপে বসে গিয়ে নিপীড়িত শ্রেণী-জীবনের ওপরে। জীবন আড়াল হয়ে যায়। যা বর্তমান সাহিত্যে খুবই সুলভ। এতে রচনা জীবন-ধর্মী না হয়ে, হয়ে পড়ে ভাবধর্মী।৩ 

তুলনায় লালসালুতে এই ঝোঁক কম এবং তিনি একজন চিত্র-আলোচক ছিলেন বলে অন্য চারটি উপন্যাসের থেকে তাঁর এই পৃথকস্বভাব বইটি সম্পর্কে একথা বলা যায় যে, এখানে মজিদের মূর্তিকে দাঁড় করিয়ে তাকে কেন্দ্র করে যথাসম্ভব নিষ্ঠার সঙ্গে একটি সম্প্রসারিত অথচ আপাতনিস্তরঙ্গ স্থিরচিত্র তৈরি করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। তবু এই বই প্রকাশের একবছর পরে চতুরঙ্গ পত্রিকায় আহসান হাবীব লেখেন : 

নায়ক মজিদ স্পষ্ট সন্দেহ নেই। কিন্তু তার মানসিক দ্বন্দ্বের বর্ণনায় মাঝে মাঝে লেখকের নিজের তীক্ষ্ণ মননশীল মনটি প্রধান হয়ে উঠতে চেয়েছে। সৌভাগ্যের কথা সে বিভ্রান্তির পরিসর খুব অল্প।৪ 

লালসালু ও সেই ধরনের জীবনবাস্তবতাধর্মী গল্পের জন্য মনঃসমীক্ষণের প্রতি ঝোঁক বা সেখানে 'তীক্ষ্ণ মননশীল মন'-এর 'প্রধান'-হয়ে-ওঠার ব্যাপারটি দোষের হলেও প্রাসঙ্গিক স্থানে তাই হয়ে ওঠে গুণের--ওয়ালীউল্লাহ্‌র অনেক গল্প আর বাকি চারটি উপন্যাস তারই মুদ্রিত নজির। আসলে শুরুর দিকে তাঁর লেখার প্রতি পাঠকসমাজের আশানুরূপ আগ্রহের অভাব এবং এইসব মূল্যায়নই তাঁকে ইংরেজি উপন্যাস এবং চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাস রচনার দিকে ঠেলে দেয়। সৈয়দ আবুল মকসুদকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর ভাই সৈয়দ নসরুল্লাহ্‌ও মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, পূর্ববাংলার সেই সময়কার লেখকেরা লালসালুর মধ্যে কোনো ধরনের বিশেষত্বই খুঁজে পেলেন না, তবে নসরুল্লাহ লালসালুর অনাদরের প্রসঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে এও বলেছিলেন যে, গোড়া থেকেই ইংরেজিতে লেখার প্রতি ঝোঁক ছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র।৫ এ-বিষয়ে ওয়ালীউল্লাহ্‌র সঙ্গে কাজী আফসার উদ্দিনের আলাপটি উদ্ধৃত করলে লেখকের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে : 

লালসালু যথেষ্ট বিক্রি না হওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছিলেন। আমাকে বলেন, ইংরেজিতে উপন্যাস লিখব। বললাম, ইংরেজিতে কেন? বললেন, বাংলার পাঠক কোথায়? পাঠক যা পড়তে চায়, আমি তা লিখতে পারব না।৬ 

এর পরে, ১৯৫৪ সালে, তিনি একটি ইংরেজি উপন্যাসে হাত দিয়েছিলেন, আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্‌র অনুমান সেই উপন্যাসটি দি আগলি এশিয়ান, কিন্তু সাজ্জাদ শরিফ যুক্তি উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন, সেটি দি আগলি এশিয়ান নয়, অন্য কোনো উপন্যাস। উপন্যাস যেটিই হোক, আর তা যে-সময়েই লেখা হোক না কেন, কিন্তু এ-কথা ঠিক যে, তিনি ইংরেজিতে উপন্যাস লিখেছিলেন, এবং এটাও ঠিক যে, তিনি শুধু লালসালুর প্রতি অনাদরের প্রতিক্রিয়া থেকেই তা লেখেননি, এর পেছনে তাঁর সংবেদনশীল, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আন্তজার্তিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত প্রধান ভূমিকা রেখেছে। আন মারি যে লিখেছেন, গ্রিক সফোক্লিসই হোন বা ফরাসি ভলতেয়ারই হোন কিংবা বাঙালি রবীন্দ্রনাথই হোন, তাদের সবার চিন্তা ও রীতি আত্মস্থ করে তিনি নিজের সংস্কৃতি, মানুষ তথা পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমান কৃষকদের উপর প্রয়োগ করতেন, তা এমনিতে নয়; তার কাছে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সাহিত্যের কোনো ভেদ নেই, তিনি বলতেন, 'আমি একজন মুক্ত মানুষ। জগৎ আমাকে গ্রহণ করুক আর নাই করুক, পুরো জগৎটিই আমার।'৭ এরকম একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখক কোন ভাষায়--বাংলায় না ইংরেজিতে না ফরাসিতে--সাহিত্য রচনা করবেন সে-আলোচনা সবসময় প্রাসঙ্গিক থাকে না। তবে তিনি দি আগলি এশিয়ান ও হাউ ডাজ ওয়ান কুক বিন্‌স কেন ইংরেজিতে লিখেছেন এবং কেন তা জরুরি ছিল, তা বই দুটির বিষয়বস্তুর মধ্যেই নিবিড়ভাবে নিহিত। 


২ 

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র দি আগলি এশিয়ান ঠিক কোন সময়ে লিখিত, তার দিনতারিখ নির্ণয়ে এখনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌছতে না পারলেও একথা বলা যায় যে, এটি একসময়ের জনপ্রিয় উপন্যাস জে. লেডারার ও ইউজিন বারডিক রচিত দি আগলি আমেরিকান [১৯৫৯] প্রকাশের পরেই রচিত। কেননা ওয়ালীউল্লাহ্‌র উপন্যাসে ওই বই পাঠের ইঙ্গিত ও প্রতিক্রিয়া আছে এবং সেটি লিখিতও হয়েছে একই আঙ্গিকে। তবে সেই সঙ্গে একথাও স্বীকার করতে হবে যে, ইঙ্গিত, প্রতিক্রিয়া ও আঙ্গিক যাই থাক, দি আগলি এশিয়ান রচিত হয়েছে দি আগলি আমেরিকান থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমেরিকাবাসী দুই লেখক জে. লেডারার ও ইউজিন বারডিক যৌথভাবে যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাদের উপন্যাসটি লিখেছেন, অল্পকথায় একটি লেখায় তার উল্লেখ করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : 

দি আগলি আমেরিকান-এর লেখকদ্বয়ের আক্ষেপ এখানে যে, এতসব করেও আমেরিকানরা এশীয়দের মন পায় না। মন দখলের যুদ্ধে তারা পরাভূত। এর কারণ তারা অনুসন্ধান করেছেন এবং উপন্যাসের শেষে উত্তরভাষণ হিসেবে একটি প্রবন্ধে এশিয়াবাসীর মন জয়ের জন্য কী কী করণীয় তাও বলে দিয়েছেন। আমেরিকানদের প্রথম কাজ হবে স্থানীয় মানুষকে জানা এবং সেই উদ্দেশ্যে অবিলম্বে স্থানীয় ভাষা রপ্ত করে ফেলা।৮ 

কিন্তু তাদের এই পরামর্শ কাজে লাগবে কি না, তার জবাব আছে দি আগলি এশিয়ান-এর শেষে, 'একজন এশীয়র সংলাপ'-এ, যেখানে লেখক বলতে চেয়েছেন, এশীয়দের মন পেতে গেলে ভাষা রপ্ত করে তাদের সঙ্গে সংলাপ করলেই হবে না, কেননা এখানে যে যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা, তা ভাষার নয়, প্রতিবন্ধকতা হলো 'বক্তব্য'-এর, আরও স্পষ্ট করে বলতে চাইলে বলতে হয় : বাধা হলো দৃষ্টিভঙ্গির, অভিজ্ঞতার এবং চাহিদার। একথা বলবার জন্য, অর্থাৎ ভাষা রপ্ত করার পরও তাদের উদ্দেশ্য যে ব্যর্থ হবে, তা বোঝানোর জন্য তিনি কল্পনায় নিখুঁতভাবে একজন মার্কিনি ও একজন এশীয় কৃষকের সংলাপ তৈরি করে তাদের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতার দূরত্ব দেখিয়েছেন : 


কৃষক : আমাদের গ্রামে আপনি কী চান? 

মার্কিনি : আমি ধানের ফলন বাড়াতে তোমাদের সাহায্য করতে এসেছি। কৃষক : আপনার কী দয়া! কিন্তু আমাদের জন্য এসব করে আপনার লাভ? মার্কিনি ইতস্তত করে, কারণ এখন পর্যন্ত কেউ তাকে এ প্রশ্ন করেনি। এ দেশের দরিদ্র লোকজনের প্রতি আন্তরিক টানের কারণে কি সে কাজ করছে? সে জানে না। সে কি সামান্য মিথ্যাচার করবে? না, লোকটিকে সে সহজ-সরল সত্যটি জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। 

মার্কিনি : আমি চাই তোমরা ভালো থাকো, কারণ আমি চাই না কমিউনিস্টরা তোমাদের নাগাল পাক। 

কৃষক : কমিউনিস্ট আবার কারা? 

মার্কিনি : ওরা খারাপ লোক। মানুষের জমি কেড়ে নেয়। 

কৃষক : আমার কাছ থেকে তো কাড়তে পারবে না। আমার জমি নেই। 

মার্কিনি : কোনোদিন জমি হলে তখন কেড়ে নেবে। একদিন তো তোমার জমি হবেই। 

কৃষক : ওরা কি আমাদের জোতদারের চেয়েও খারাপ? 

মার্কিনি : (চারপাশে তাকিয়ে) তার চেয়েও জঘন্য। ওরা মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাও কেড়ে নেয়। ওরা মানুষকে দাস বানায়। 

কৃষক : আমার ছেলে-মেয়েগুলিকে ওরা খেতেটেতে দেবে না? 

মার্কিনি : (বিরক্ত ভঙ্গিতে) খাওয়া-দাওয়াই সবকিছুই নয়। মানুষের আরো চাহিদা আছে, তাই না? 

কৃষক ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মার্কিন ভদ্রলোক কৃষকের নিজের ভাষায় কথা বলে, কিন্তু তার কথার অর্থ সে বুঝতে পারে না।৯ 


এই সংলাপটি কল্পিত বটে, কিন্তু এটাই তো বাস্তব এবং সত্য, আর সেকারণেই সংলাপটি--দু-জনের বক্তব্যের দূরত্বের কারণে--হাস্যকর। আমেরিকানদের তা বোঝার কথা নয়, সেজন্যই আমেরিকানদের কাছে এমন এশীয়দের নির্বোধ মনে হবেই! এই সবকিছু উপন্যাসের সারকথা বটে, কিন্তু এ হলো উপন্যাসের শেষের বক্তব্য, আর বইয়ের শুরু থেকে পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা ব্যাপী রয়ে গেছে আরও নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনা, রয়েছে সুবোধ এশীয়দের তৎপরতা আর সুশীল গণতান্ত্রিক মার্কিনিদের আধিপত্য বিস্তারের কাহিনি! এখানে, এইসবের পুনরুল্লেখ না করেও, সারকথা সেরেই, দি আগলি এশিয়ান-এর আলোচনাটি শেষ করা যেত, কিন্তু আসলে উপন্যাসটি শুরু থেকে সারকথায় পৌঁছার আগপর্যন্ত ঘটনাগুলি মার্কিন আধিপত্যের একটি প্রতীকী দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। আজ, ২০১৯ সালে পৌঁছনোর পর, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের, বিশেষত ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দিকে খেয়াল করলে মনে হয়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরো সময়-অভিজ্ঞতা যাপন করে অল্পদিন আগেই যেন এই উপন্যাসটি লিখেছেন। 


৩ 

ইউরোপ ভূত দেখছে--কমিউনিজমের ভূত। এ ভূত ঝেড়ে ফেলার জন্য এক পবিত্র জোটের মধ্যে এসে ঢুকেছে সাবেকী ইউরোপের সকল শক্তি পোপ এবং জার, মেত্তেরনিখ ও গিজো, ফরাসি র‍্যাডিকেলেরা আর জার্মান পুলিশগোয়েন্দারা।১০ 

দি আগলি এশিয়ান উপন্যাসটি পড়তে শুরু করলে আস্তে আস্তে এর (কল্পিত] দেশে কয়েকজন আমেরিকানের উপস্থিতি ও তৎপরতা লক্ষ করা যায় : কেউ সাংবাদিক, কেউ রাষ্ট্রদূত, কেউ প্রকৌশলী, কেউ গোয়েন্দা, কেউ আবার স্বেচ্ছাসেবীও। সকলের ক্ষেত্রই আলাদা, নানা মতলবে তাদের বিচরণ, কিন্তু একটি ব্যাপারে সকলেই একমত যে, এখানে যাদের উপরে কমিউনিজমের ভূতের আছর পড়েছে, বা যাদের উপরে আছর পড়ার সম্ভাবনা, তা যেন কোনোভাবেই না পড়ে সেই চেষ্টা করা। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের পটপরিপ্রেক্ষিতরূপে উল্লিখিত এই উদ্ধৃতিতে 'ইউরোপ'-এর জায়গায় 'আমেরিকা' আর অন্য অন্য জায়গায় এই আমেরিকানদের বসিয়ে নিলে পুরো কাহিনিটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এখানে আমেরিকানরা ভূত দেখছে একথা ঠিক, আবার তাদের ঐকমত্য এটাও প্রমাণ করে যে তারা নিজেরাও কম ভূতগ্রস্ত নয়, এবং ভূতগ্রস্ত বলেই তাদের আচরণ স্থানে স্থানে হাস্যকর। 

আমেরিকার এক রাজনৈতিক পত্রিকা সাপ্তাহিক অপিনিয়ন-এর সাংবাদিক জনসনের আগমনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু, সে এসেছে এদেশের চলমান অবস্থা সরাসরি জানবার জন্য, আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় পত্রিকার স্বার্থেই তার আসা, তার পর্যবেক্ষণে একপ্রকার নিরপেক্ষতা ও আত্মসমালোচনাও রয়েছে, এবং বোঝা যায় লেখক তার মাধ্যমে আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গিও অনেকটা খোলাসা করতে চেয়েছেন। অপিনিয়ন-এর সম্পাদক এশিয়া ও আফ্রিকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিরীক্ষণ করেন, তিনি জানেন এবং মানেন এই সকল স্থানে পুরাতন পরাশক্তিগুলো তাদের অবস্থান হারাবার পর আমেরিকাই এখন পৃথিবীর 'একমাত্র পরাশক্তি', তাই এখানকার অসহায় মানুষকে সমাজতন্ত্রের ভূতের আছর থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমেরিকার ওপর আপনাআপনি এসে বর্তেছে; তবে তিনি এও স্বীকার করেন যে, এ-জাতীয় নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পূর্ব-ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা নেই, অঢেল ইস্পাত ও মোটরগাড়ি তৈরি করা বা গম ফলানো আর নেতৃত্ব দেওয়া এককথা নয়। তিনি জানেন, শত্রু মোকাবেলা করার শৌর্য তাদের আছে, অস্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীকে নিশ্চিহ্ন করে সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের আছে, তবু এ নিয়ে আশ্বস্ত হওয়া ঠিক নয়, কেননা শত্রু নানা ভাবে এগোতে পারে, তাই আমেরিকাকে সতর্কতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। জনসনের মাধ্যমে এই কথাগুলো এই জন্য উঠে আসছে যে, এখানে যে-দেশটি আমেরিকার সঙ্গে সবধরনের মৈত্রী স্থাপন করেছিল, আমেরিকার অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অর্থ ছিল যার প্রধান সহায়, নানাভির নেতৃত্বাধীন সেই সরকারি দলটি নিঃসংকটে একদশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও বিরোধী মোর্চার কাছে হেরে যায়। কেন হেরে যায়, এই ভাবনায় উত্তেজিত অপিনিয়ন-এর সম্পাদক, সে প্রথমে ভাবে, এই পরাজয়ের পেছনে রহস্যময় কিছু একটা আছে, কারণ পররাষ্ট্র দপ্তরও এ-ব্যাপারে আগাম কোনো সতর্কবার্তা পায়নি; পরে, জনসনের উদ্দেশ্যে সে এই মর্মে নির্দেশ ছুঁড়ে দেয় যে, 'এখানে আমাদের লোকজন তালগোল পাকিয়ে বসে আছে কি না গিয়ে খোঁজখবর নাও। যদি তা-ই হয়, কসম কেটে বলছি, এবার আমি হৈচৈ বাঁধিয়ে দেব।'১১ বোঝা যায় আমেরিকার সরকারপক্ষের ক্ষমতাশালী এই সম্পাদকের নির্দেশে রহস্য মোচনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে এখানে এসেছে জনসন, এখানে রাষ্ট্রদূতসহ নানা ক্ষেত্রে আরও যে-সকল আমেরিকান আছে তারা সকলেই এ-বিষয়ে যার যার জায়গা থেকে তৎপর অর্থাৎ কমিউনিজমভূতের আছর-তাড়ানো আর বিশেষ বশীকরণের ক্ষেত্রে সকলের চিন্তায় একধরনের ঐক্য রয়েছে। 

কিন্ত ঘোরতর রহস্য মোচনের আগেই একসময় মার্কিন দূতাবাসের পদস্থ কর্মকর্তার কাছে আরেক রহস্যময় সংবাদ শোনে জনসন, নির্বাচনে-জয়ী ইউনাইটেড ফ্রন্টের নেতা আবদুল কাদের নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য নানাভির দলের যে-অল্প ক-জন জয়ী হয়েছেন তারা এবং আরও একটি ছোটো দলের সঙ্গে মিলে জোট বাঁধছেন, 'তারপর তিনি সোজা তার পূর্বসূরির জুতাটি পরবেন।' কিন্তু এবিষয়ে তার বিস্ময় কাটে না, সে বুঝতে পারে না নিরপেক্ষতাবাদের সমর্থনে যারা এদেরকে ভোট দিল এরা এখন কী করবে, তাই সে প্রশ্ন করে : 'আর যারা এই মাথামুণ্ডু স্লোগানের পেছনে ভোট দিল, তাদের কী হবে? তাদেরকে তো নিরপেক্ষতাবাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তাই না?' এর উত্তর দেয় কনডন এবং বুঝিয়ে দিতে চায় যে, এখানে প্রার্থীরা যা ইচ্ছা প্রতিশ্রুতি দেয়, এবং তাকে এই কথাও বলে যে : 

আপনাকে আগে এ দেশটার চালচিত্রটা বুঝতে হবে, মি. জনসন। এখানে আশি ভাগ লোকের বসবাস গ্রামে। তারা লেখাপড়া জানে না। পাশের গ্রামে কী হচ্ছে তারই খবর রাখে না। যে কেউ তাদের কাছে গিয়ে তাদের সমর্থন আদায় করতে পারে।১২ 

কিন্তু এ কোন দেশের কথা বলছেন কনডন? একজন আলোচক অবশ্য স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন 'চারপর্বে বিন্যস্ত উপন্যাসটির কাহিনিকাঠামো, পটভূমি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান',১৩ তা হতে পারে, আবার সমগ্র উপন্যাসের খণ্ড খণ্ড ঘটনার দিকে নজর দিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান, ভারত বা এশিয়ার অন্যান্য দেশের নামও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। এ-প্রসঙ্গে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৫০ সালে আমেরিকা ও কানাডা সফরকালে ক্যামব্রিজের ম্যাসাচুসেট টেকনলজিক্যাল ইনস্টিটিউটে প্রদত্ত পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বক্তৃতার কথা, যেখানে তিনি প্রথমে বিশ্ববাসীর জন্য অবদান রাখার জন্য আমেরিকান জাতির কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন যে, তাদের অভিজ্ঞতা ও শিল্পজ্ঞান নিয়ে গণতান্ত্রিক মতবাদকে বলিষ্ঠভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সময় কি এখনো তাদের আসেনি? বলেছিলেন, বর্তমান জগতে গঠনমূলক কার্যক্ষেত্রে এগিয়ে গিয়ে চিরস্থায়ী বিশ্বশান্তির ভিত্তি আপনারাই কি স্থাপন করবেন না? এরপর নিজ দেশের জন্য তাদের সহায়তা চেয়ে বলেছিলেন : 

কেউ হয়ত ভাববেন, আমি দয়ার ভিখারী, আমি আপনাদের দানশীলতাই কামনা করছি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। আমাদের জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে পুরোপুরি কাজে লাগাবার জন্যে আমরা শুধু অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ দেশসমূহের সহায়তা কামনা করছি। দেশের ও রাষ্ট্রের স্বার্থের খাতিরেই শুধু এই সহায়তা চাই না; এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে আমেরিকার ও সারাবিশ্বের স্বার্থ । সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ ও সমৃদ্ধি বর্তমান জগতে সম্ভবপর নয়।১৪ 

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান সফরে গিয়ে আমেরিকার প্রতি এই আহ্বান জানিয়েছিলেন বটে, কিন্তু মনে রাখতে হবে সেই সফরের দাওয়াত এসেছিল আমেরিকার কাছ থেকেই। ১৯৫০ সালের এই সফরের পরে ১৯৫১ ও ১৯৫২ সালে পাকিস্তান বর্ধিত হারে সাহায্য লাভ করে ঠিকই, তবে এই সাহায্য ছিল সশর্ত : মার্কিন সরকারের অনুমোদনের মাধ্যমে এ-সাহায্য কাজে লাগানো হত এবং অন্য দেশ থেকেও কোনো প্রকার কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া যেত না। এই সবকিছু তদারকির জন্য আসে বিশেষজ্ঞ ও উপদেষ্টারা, এবং এইভাবে '১৯৫৩ সালের মধ্যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং তখন থেকেই পাকিস্তান সরকারের নীতিমালা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়;১৫ এরপরে, ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে পাকিস্তান সরকার একটি পুতুল-সরকারে পরিণত হয়। এই সকল ঘটনার দিকে নজর দিলে দি আগলি এশিয়ান-এর পটভূমিবিষয়ে ধারণা পাওয়া যায় আর ওয়ালীউল্লাহ্‌ও এই সময়েই নয়া দিল্লি ও সিডনিতে পাকিস্তান দূতাবাসের প্রেস এটাচি হিসাবে দায়িত্ব পালন করায়, ধারণা করি, এই সব বিষয়ে তিনি ছিলেন পুরোটাই অবহিত। 

বাস্তবে ঘটে-যাওয়া এই সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত ঘটনাবলির মাধ্যমে পাকিস্তানে আমেরিকার হস্তক্ষেপের যে-চিত্র দেখি, তা তো কোনো দেশের গণতন্ত্রের জন্যই কাম্য নয়; কিন্তু এ-ক্ষেত্রে, তাদের ভাষ্য মতে, তারা যা করছে তা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারই জন্য এবং তারাও চায় সরকার যেন এমন পন্থা অবলম্বন করে যে, জনগণ যেন বুঝতে পারে আমেরিকা তাদের বন্ধু, এবং তারা যেন তাদের বন্ধুর শত্রুকে--কমিউনিস্টদেরকে--তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, এই অবস্থায় আমেরিকানরা কেন এশীয়দের বন্ধু হতে পারে না তার সমালোচনা আছে দি আগলি আমেরিকান-এ, এ-প্রসঙ্গ আলোচিত হয় দি আগলি এশিয়ান উপন্যাসেও, কিন্তু এ-ক্ষেত্রে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল? 

এই প্রশ্নে 'একজন এশীয়র আলাপ'-এর উপর ভিত্তি করে ওয়ালীউল্লাহ্‌ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, তিনি লিখেছেন : 'কিছুটা শিশুসুলভ সরলতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু সদুপদেশ দিয়ে বিভিন্ন দেশে মার্কিন অবস্থান ও হস্তক্ষেপের ভূমিকাটিকে মোটামুটি পাকাপোক্ত করারই ব্যবস্থা করেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্।'(১৬) ভারত-ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের বেদনা মর্মে লালনকারী ওয়ালীউল্লাহ্‌র জীবনবাস্তবতা-বিষয়ে কোনো কৌতূহল না দেখিয়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোটাকে নির্মম সিদ্ধান্তের উদাহরণই বলতে হবে। অথচ এই বই পড়েই, 'রূপান্তরশীল মন'-এর কথা বিবেচনায় এনে, সাজ্জাদ শরিফ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন : 

এ উপন্যাসে তাঁর রাজনৈতিক সত্তা যেন এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে উদ্‌গীরিত হয়েছে। তিনি এতে প্রবলভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, বিভিন্ন গরিব দেশের জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ের অকুণ্ঠ সমর্থক, এমনকি সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর পক্ষপাতও মোটেই প্রচ্ছন্ন নয়। মনে রাখতে হবে পাকিস্তান তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক লেজুড় রাষ্ট্রবিশেষ। এটি আর যা-ই হোক, ওয়ালীউল্লাহ্‌র স্বপ্নের রাষ্ট্র নয়, এ রাষ্ট্রে তার মন পড়ে থাকার নয়।১৭ 

তিনি 'প্রবলভাবে' সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কিনা জানি না, তবে অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী; তিনি সক্রিয় কমিউনিস্ট ছিলেন না ঠিক, তবে অবশ্যই কমিউনিস্ট-মনোভাবী। আন মারিকে অনেকেই জিজ্ঞেস করতেন ওয়ালীউল্লাহ্ মার্কস্‌বাদী কি না, সেই সূত্র ধরেই তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন : 

আমাকে জিজ্ঞেস করা করা হয়, ওর বন্ধুবান্ধবদের মতো ও মার্ক্সবাদী কি না। হ্যাঁ ও মার্ক্সবাদী ছিল। সেটা বুঝতে গেলে আপনাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলোয় পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে নিজেদের বাসাতে হবে। সময়টা অধিকাংশ লেখক ও শিল্পীর কাছে ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি আর এর ফলে দারিদ্র্যের কবল থেকে নিষ্কৃতি লাভের প্রত্যাশা থেকে প্রতিভাত হয়েছিল।১৮ 

ওয়ালীউল্লাহ্‌কে যেভাবেই চিহ্নিত করা হোক না কেন, তাঁর লেখা পড়লে বোঝা যায় আসলে তিনি কোনো তত্ত্বের অনুগত ছিলেন না, তবে গুণগ্রাহী ছিলেন। বেগম আকতার কামাল উপন্যাসের তথ্য ও তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করে ওয়ালীউল্লাহ্‌র মধ্যে যে 'দ্বৈততা' খুঁজে পেয়েছেন এবং তাকে উদারমানবিকতাবাদী বলেছেন, তাও গ্রহণযোগ্য। নানা জাতি ও নানা শ্রেণির আকাক্ষা ও সংকটে মর্মপীড়িত এই মহৎ ব্যক্তিত্বের বিচার করতে গেলে যে-কোনো আলোচককেই সতর্ক ও সচেতন না হয়ে উপায় নেই। তিনি তাঁর উপন্যাসে, 'একজন এশীয়র আলাপ'-এ, আমেরিকানদের যা বলেছেন তাকে 'সদুপদেশ' বলে ব্যঙ্গ করা ঠিক নয়, তা 'পরামর্শ' বলাও ঠিক নয়, তিনি আসলে তাঁর কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে--উপায়ান্তর না দেখে--আপাতস্বার্থে কিছু কথা মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, উপন্যাসের শেষের দিকে জনসনের সঙ্গে আলাপে আহসানের বক্তব্যে তো তারই ইঙ্গিত : 

...'আপনার তত্ত্বের পক্ষে আপনি কী যুক্তি দেখান, বুঝতে পারছি না। 

'যুক্তি দেখাতে পারি না তো', আহসান বলেন, একথা স্বীকার করতে তাকে মোটেও বিব্রত দেখায় না। 'তার মানে এই নয় যে, কথাটি অসত্য। আমি মানুষের হৃদয়ের কথা বলছি। নানারকম লোকদেখানো ভঙ্গির প্রকাশ সিদ্ধান্ত, অটল বিশ্বাসের অন্তরালে হয়তো কোথাও সত্যিকার মানবহৃদয় একটি আছে। সেই হৃদয় অন্যের দুঃখদুর্দশা বুঝতে পারে।... 

'আপনি বলতে চান কমিউনিস্টদের জন্য গোপনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হৃদয়ে এ রক্তক্ষরণ হচ্ছে? 

'না, আপনারা কমিউনিস্টদের ঘৃণা করেন। আমার বক্তব্য সেটি নয়, আমি বলতে চাই : আমাদের ক্ষুধার্ত মানুষজনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কিন্তু তারা একথা স্বীকার করতে পারছে না।'... 

জনসন উত্তর দেবে না সাব্যস্ত করে। আর তার বলার কী আছে? সে বরং বৃষ্টির অস্পষ্ট শব্দ শোনে। ঘরের ভেতর শত-সহস্র মশার পাখার শব্দ অদৃশ্য গুঞ্জন তোলে। 

'একদিন একথা আপনি স্বীকার করবেন, কিছুক্ষণ বিরতির পর প্রায় অশ্রোতব্য কণ্ঠে আহসান বলে।১৯ 

আহসানের এ উক্তিকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো মুশকিল, এ হলো মর্মপীড়িত মানুষের অভিব্যক্তি, যাতে মিশে আছে এক স্বপ্ন-দেখা মানুষের যন্ত্রণা। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ের আলোকে আহসানকে স্বপ্ন-দেখা মানুষ বলছি বটে, কিন্তু 'একজন এশীয়র আলাপ'-এ লেখক নিজেই মনে করছেন, এই স্বপ্ন হয়ত 'অলীক কল্পনা' নয়, তার আশাও হয়ত বাতুলতা নয়, ক্ষুধাকে জয় করার জন্য আকুল একটি দেশ যদি মার্কিনিদের কাঙ্ক্ষিত পথ গ্রহণ না করে, তবু তারা জবরদস্তি থেকে বিরত থাকবে। এ-সূত্রে তিনি কিউবার প্রসঙ্গ তুলছেন এবং ধারণা করছেন, তারা যে কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মারাত্মক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না, তার কারণ, তাদের আত্মদম্ভী, স্বেচ্ছাচারী আচরণ, আর এছাড়া অস্ত্রভাণ্ডার টিকিয়ে-রাখার বাসনার আড়ালেও নিশ্চয়ই দুর্দশার ভেতর জীবনযাপনকারী পিছিয়ে-পড়া মানুষের প্রতি সহমর্মিতা রয়েছে। আহসানের উক্তি আর এই বক্তব্য তো একই, এ হলো একজন ব্যথিত মানুষের ভাবনা। এই আহসান যে ঔপন্যাসিক ওয়ালীউল্লাহ্‌রই প্রতিনিধি। তিনি এখানে একটি বাস্তব অবস্থার উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন বটে, কিন্তু উপরের সংলাপে পাঠকের মনে পড়ে যেতে পারে চাঁদের অমাবস্যা উপন্যাসের আরেফ ও কাদেরের সংলাপের কথা। মৃত্যু বিষয়ে কাদেরের উক্তি শুনে আরেফ তাকে বলেছিল, আপনি শুধু দুর্ঘটনার কথাই বলছেন, কিন্তু তাকে যে 'মায়া-মহব্বত' করতেন তা তো বলেননি--এতে বিস্মিত হয়েছিল কাদের, তার কণ্ঠে ছিল ঘৃণা ও বিস্ময়। যেভাবে আহসানের কথায় বিস্মিত হয়ে জনসন ভেবেছিল, সে এমন জগতে হাজির হচ্ছে, যে জগৎ অবাস্তব, এ জগৎকে সে চেনে না বলেই এর রঙ, আকার ও মাত্রা নিয়ে সে প্রশ্ন করতে পারে না। অবশ্য শেষপর্যন্ত 'মায়া-মহব্বত'হীন শূন্য হৃদয়ের অধিকারী কাদেরের কারণে আরেফের যে-মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হয়েছিল, এখানে জনসনের কারণে তেমন অভিজ্ঞতা হয়নি আহসানের। আহসান জানত জনসনের সাঙ্গপাঙ্গরা তাকে যে-কোনো সময় মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু রাজনীতির মানুষ হয়েও, হয়ত ওয়ালীউল্লাহ্‌র প্রতিনিধি বলে, মৃত্যু তার কাছে বড়ো কোনো ঘটনা নয়, বড়ো হলো হৃদয়, মমতা, ঘৃণা, এবং অবশ্যই মানুষের সদাশয়তা। তাই জনসনকে সে প্রশ্ন করেছিল, আপনি কি আমাকে ঘৃণা করেন? এর জবাব জনসন দুই বার দিয়েছিল : প্রথমবার শুধুই 'না', পরে, 'না, আমি আপনাকে ঘৃণা করি না।২২ এটি, আহসানের জন্য, ওয়ালীউল্লাহ্‌র জন্যও বড়ো স্বস্তিকর একটি উক্তি, আর একারণেই, রাজনৈতিক বয়ান সত্ত্বেও এই উপন্যাসটিকে চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদোর ঘনিষ্ঠ বলছি, ফলে ইংরেজি উপন্যাস দুটি পাওয়ার পর ওয়ালীউল্লাহ্‌র মূল্যায়ন সহজ হয়েছে বটে, সেই সঙ্গে তাকে কিছুটা ভুলভাবে বোঝার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। কথাটা এজন্যই বলছি, এই দুটি উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ্ যেভাবে নানা চরিত্রকে সূক্ষ্ম দার্শনিক জায়গা থেকে সহৃদয় দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছেন তাতে চরিত্রগুলোকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, এ-উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে কদর্য এশীয়র বিষয়টি, এখানে 'কদর্য' কে? সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, আমেরিকানরা চাইলে আহসানকে 'কদর্য' বিবেচনা করতে পারে,২৩ কিন্তু আমরা উপন্যাসে মার্কিনিদের প্রতিনিধি জনসনকে দেখি আহসানকে সে 'ঘৃণা' করে না, বরং আহসানকে তার স্বপ্ন ও কল্পনার কারণে 'অদ্ভুত' ভাবতে পারে জনসন, বা যে-কোনো আমেরিকান। অন্য একজন আলোচক লিখেছেন, যে-এশীয়রা আমেরিকানদের সহযোগী, তারাই 'কদর্য', চিহ্নায়নটি আপাতসংগত বলেই মনে হয়, কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে তো 'কদর্য' বলার অধিকারটা আমেরিকানদের উপর না পড়ে খোদ লেখকের উপরই বর্তায়--কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ্‌র উপন্যাসগত অভিব্যক্তি তো সেরকম নয়। 

তাহলে এই উপন্যাসে 'কদর্য' কে? এখানকার দরিদ্র জনগণই আসলে আমেরিকানদের চোখে 'কদর্য', এ-প্রসঙ্গে কৃষক ও মার্কিনির মধ্যকার সংলাপটির কথা মনে করা যেতে পারে, এই মতের বাইরে কারও যদি আরও যুক্তিসংগত মত থাকে তাহলে আমরা সেটিও মেনে নিতে বাধ্য, কেননা ওয়ালীউল্লাহ্‌র উপন্যাসগুলো তার অন্তরঙ্গ অভিব্যক্তির কারণে সেরকম ভিন্নমতের সম্ভাবনাই জারি রাখে। তবে এই মতের পক্ষে আরেকটি কথা বলবার আছে যে : কৃষক-মার্কিনি সংলাপে গম্ভীর ওয়ালীউল্লাহ্‌ মার্কিনিদেরকে কিছুটা হলেও হাস্যকর করে তুলেছেন এবং আমরা আবারও স্মরণ করতে পারি মার্কিনির ধানের ফলন বাড়ানোর জন্য গ্রামে আসার কথা শুনে কৃষকের সেই স-প্রশ্ন/বিস্ময় উক্তি : 'আপনার কী দয়া! কিন্তু আমাদের জন্য এসব করে আপনার লাভ?', এই উক্তিতে কি বিদ্রুপের কোনো আভাস নেই? এই সূত্রে মনে করা যেতে পারে উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ের কথাও, যেখানে মেয়েটি জনসনকে প্রশ্ন করেছিল, 'কেমন লাগছে এ দেশ?' তার জবাব না দিয়ে তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিল জনসন, নিচে পড়ে দেখা যেতে পারে তাদের সংলাপটি : 

'তোমার দেশকে তুমি নিজে কীভাবে দেখো, বলো তো।' 

'আমাদের জন্মই তো এখানে। 

'সেটাই তো সব নয়। এখানে জন্মে তুমি কি সন্তুষ্ট? 

খানিক বিরতির পর মেয়েটি জবাব দেয় 'হ্যা সন্তুষ্ট।' 

'ফালতু' তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে ছেলেটি বলে ওঠে। 

মেয়েটি চকিতে তার দিকে ফেরে। 'ফালতু মানে কী, চুপ করো।' আবার মার্কিন ভদ্রলোকটির দিকে ফিরে মিনতির ভঙ্গিতে সে বলে, 'ওর কথায় কান দেবেন না। ও মানসিক পীড়ায় ভুগছে। হ্যাঁ আমরা আমাদের দেশকে অবশ্যই ভালোবাসি। এত গরিব আর নিঃসহায় দেশ। এজন্যই আমরা একে ভালোবাসি। জানেন তো, অসুস্থ সন্তানই মায়ের সবচেয়ে বেশি স্নেহ পায়। হয়তো নিজ দেশ থেকে বহু কিছু পান বলে আপনি আপনার দেশকে ভালোবাসেন। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি এ দেশ আমাদের কিছু দিতে পারে না বলে।২৪ 

জনসনের কাছে মেয়েটির মন্তব্য অযৌক্তিক মনে হয়েছিল, কারণ এর উত্তরে জনসন কিছু না বললেও পরে নিজের-দেশ-সম্পর্কে অন্যমানুষের ধারণা-বিষয়ে মেয়েটির আরেকটি মন্তব্য শুনে জনসন বলেছিল 'এই তো যুক্তিবাদী কথা।' আসলে জনসন ভাববে কী, কথা বলার পর মেয়েটি নিজেই ভাবে, অন্যের কাছে এ ভালোবাসা 'হাস্যকর' মনে হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি হাস্যকর? নিজের দেশকে এরকম ভালোবাসতে-পারার ক্ষমতাকে--দৃষ্টিভঙ্গিকে--হাস্যকর-মনে-করাটাই কি হাস্যকর নয়? আমেরিকান ও এশিয়ানদের সম্পর্কে, এই স্পর্শকাতর বিষয়ে, স্থিরনিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেবে কে? ঔপন্যাসিক-অভিব্যক্তিও তো স্থিরমতের পক্ষে নয়। একজন আলোচক ওয়ালীউল্লাহ্‌র এই উপন্যাসকে 'থিসিস নভেল' হিসেবে চিহ্নিত করে এতে থিসিসের 'যুক্তি-বিশ্লেষণ ব্যবহার করে একটি চিন্তা বা ধারণা'২৫ তুলে ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু আসলে এখানে যুক্তি-বিশ্লেষণ-চিন্তা-ধারণা আর স্বপ্ন-আবেগ- ভালোবাসা প্রভৃতি তাদের নিজ নিজ অভিব্যক্তি নিয়ে মুখোমুখি ঠাণ্ডা লড়াইয়ে লিপ্ত; মনে হয় না, এই অনিশ্চিত পরিণতিতে লেখকের কোনো আপত্তি ছিল। তার বড়ো প্রমাণ শিম কীভাবে রান্না করতে হয় উপন্যাসটি, যার উপশিরোনাম 'এক এশীয়র ফ্রান্স-অভিযান'। উপন্যাসে সন্দর্ভসুলভ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলে কি আবারও সেই 'এশীয়'-প্রসঙ্গ আসে? 


৪ 

এশীয়-প্রসঙ্গ আবার এজন্যই যে, ধারণা করি, এই উপন্যাসটি তিনি কদর্য এশীয় লেখার পরেই লিখেছেন, বা হতে পারে আগেই লিখেছেন, তা যে-সময়েই লিখুন, এটি আসলে একই ভাবনার ভিন্নরকম প্রকাশ : একটিতে আমেরিকা আর অন্যটিতে ইউরোপ। পশ্চিমারা যুক্তিশীল, উন্নত, শ্রেষ্ঠ আর প্রাচ্য চিন্তনবৈকল্যতাড়িত, অনুন্নত ও নিকৃষ্ট--এরকম একটা ধারণা যে প্রচারিত হয়েছে, অরিয়েন্টালিজম-এর সূত্রে এখন তা সবারই জানা। অরিয়েন্টালিজম-এর প্রকাশকাল গত শতকের ১৯৭৮, প্রচারিত হয়েছে আরও পরে, কিন্তু তারও আগে লিখিত দি আগলি এশিয়ান-এ আমেরিকানদের চোখে যে-এশীয়দের দেখি, তা তো প্রচারিত প্রাচ্যতত্ত্ব-এর উদাহরণ ও সমালোচনা। শিম কীভাবে রান্না করতে হয় বইয়ে রয়েছে এ-বিষয়ের অন্যরকম বয়ান, একজন এশীয় ফ্রান্সে গিয়ে কীরকম অবস্থায় পড়ে তারই বিবরণ। 

কিন্তু কথা হলো এই এশীয় কেন ফ্রান্সে যায়? 

বইয়ের শুরুর বর্ণনা থেকে বোঝা যায় মানুষ নানা কারণে--একশ একটি কারণে--ফ্রান্সে যায়, এক অদৃশ্য দানা বা স্বপ্নের তাড়নায় তাকে যেতেই হয়, যাওয়ার কোনো যুক্তি না থাকলে, যুক্তি তৈরি করে হলেও যায়, যেতেই হয়, না গিয়ে উপায় নেই, এজন্যই কথক যাত্রার আরেকটি যুক্তি/কারণ খুঁজে পায় : 'যৌক্তিকতা পাওয়ার জন্য (যুক্তি ছাড়া কেউ তো আর ফ্রান্স ভ্রমণ করতে পারে না) আরেকটি দানার সঙ্গে একীভূত হলো। আকারে অনেক বড় ও দৃশ্যমান এক দানা : শিম।'(২৬) এখানে যুক্তির কথা বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু আসলেই কি তা কোনো যুক্তি? অভিযাত্রী বলছে, ফ্রান্সের সভ্যতা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, ঝরনা, প্রাগৈতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ, ইতিহাস তাকে কৌতূহলী করলেও ফ্রান্স-অভিযানে উৎসাহিত করেনি, এই বিস্ময়কর দেশে তার আগমনের কারণ মূলত একটাই, সেই তাড়নার নাম : শিম। অভিযাত্রীর ভাষায় : 

আরো নির্ভুলভাবে বললে, রান্না হয়ে থালায় পরিবেশনের দশায় উপনীত শিম। অন্য কথায়, কীভাবে শিম রান্না করা হয়, সেটা দেখতেই আমি এসেছি। মনে রাখবেন, ফেজিওলিজ গোত্রের সব শিম কিন্তু না : ঘোড়া শিম না, উইন্ডসর শিম না, লিমা শিম না, কিডনি শিম না, এবং অতি অবশ্যই সয়া শিমও না। বরং বাটার শিম, ফরাসিরা ছাড়া, আর সবাই যেটাকে বলে--ঠিকই বলে--ফ্রেঞ্চ শিম।২৭ 

শিম বিষয়ে যত গুরুতর তথ্যই এখানে উল্লেখ করা হোক না কেন, শিম যে এখানে কোনো অপরিহার্য বিষয়ই না, অথবা বিষয় যদি হয়ও তবু তা যে হাস্যসৃষ্টির উপলক্ষ্য মাত্র, সেটা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই স্পষ্ট। আন্দাজ করি, ওয়ালীউল্লাহ্ চাকরি সূত্রে বসবাসকালে ইউরোপের সভ্যতা-সংস্কৃতির গুণগ্রাহী হওয়া সত্ত্বেও এদের অন্তঃসারশূন্যতা, এশীয়দের প্রতি এদের আধিপত্যবাদী মনোভাব তাঁকে তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে থাকবে, যার পরিণতি এই উপন্যাস দুটি, বিশেষত শিম কীভাবে রান্না করতে হয়। তারপরও এই বিষয়টি গ্রহণ করার পেছনে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন তাঁর স্ত্রী আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্। ম্যানিলার একটি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলেন তারা, সেখানে এক ফরাসিকে শিম পরিবেশন করা হলে সে তীব্রভাবে অভিযোগ করে বলেছিল যে এগুলো রান্না করার পদ্ধতি নাকি ঠিক হয়নি, তা থেকেই এই উপন্যাসের--আন মারির ভাষায় 'প্রহসন'-এর--আইডিয়া। আমরা এটাকে আইডিয়া না বলে উপলক্ষ্যই বলব, যার উপরে ভর করে আইডিয়ার বিস্তার, এখানে যা শিম না হয়েও যে-কোনো কিছুই হতে পারত, কেননা ওয়ালীউল্লাহ্‌র কাছে উপলক্ষ্যের বিষয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চরিত্রের প্রবণতা বিশ্লেষণ ও তাঁর দর্শন-অনুসন্ধান। চাঁদের অমাবস্যা বিষয়ে তাঁর ইংরেজি ভাষার প্রকাশককে লিখিত চিঠির কিছু অংশ পড়লে এ-কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে : 

উপন্যাসটির মূল বিষয় একটি অপরাধের একটি অশুভ কর্মের জ্ঞান। যুবক শিক্ষক হয়ে দাঁড়ায় এ জ্ঞানের ধারক। এ জ্ঞানের সঙ্গে যে দায়িত্ববোধ যুক্ত, সেটি তাকে সন্ত্রস্ত করে তোলে। এ অশুভ কর্মটি শিক্ষকের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। আমি যেটা বলতে চাই, তা হলো, সেই অশুভ কর্মটি বা সেই অপকর্মের হোতা কেউই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, সবচেয়ে জরুরি হলো এরকম একটি অপকর্মের বাইরের মানুষের আচরণ।২৮ 

বলা নিষ্প্রয়োজন, এখানে অপরাধটি 'মৃত্যু'কেন্দ্রী বলে তার ব্যাপ্তি ও গভীরতা বেড়েছে, সংকটও তীব্র হয়েছে, কিন্তু এখানে মৃত্যু ও অপরাধ উপলক্ষ্য মাত্র, বিষয় নয়; আইডিয়াও নয়। এখানে শিমও যে-কোনো শিম নয়--ফ্রেঞ্চ শিম, এই বলে শিমকে নয় ফ্রান্সকে বিশেষায়িত করা হচ্ছে, আর শিম, প্রকৃত অর্থে একটি সাধারণ খাদ্য বলে, তার জন্য এশীয়র এই অনিবার যাত্রাকে কিছুটা হাসির বিষয় করে তোলা হয়েছে। একজন এশীয়র এই অভিযানকে ঔপনিবেশিক দাসত্ব বা হীনম্মন্যতাজাত অভিযানরূপে উপস্থাপন করা ঔপন্যাসিকের গৌণ লক্ষ্য হলে হতে পারে, তবে মুখ্য লক্ষ্য ছিল ফরাসিদের কর্মকাণ্ড এবং তাদের মনোভাবকে হাস্যকর করে তোলা। এই অর্থে আন মারি যে এই বইকে উপন্যাস না বলে 'প্রহসন' বলেছেন তা যথার্থ, তবে তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় এটিকে যে কম গুরুত্ব দিলেন, তার কারণ হতে পারে এই বইয়ের মর্মে রয়েছে ফরাসিদের--তার নিজ দেশের-- সমালোচনা। স্বীকার করি, এই মন্তব্যে ছিদ্রান্বেষণের পরিচয় রয়েছে, তবু নির্দ্বিধায় বলব ঠিক এই কারণেই এই উপন্যাসটি ওয়ালীউল্লাহ্‌র জন্য ছিল দায়িত্বশীল, আর আমাদের অর্থাৎ উপনিবেশিত এশীয়দের জন্য, খুব দরকারি একটি রচনা। 

বইটি শেষ করে উঠে পাঠকের কাছে এই ভ্রমণগল্পের বহু জায়গায় যুক্তি-শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বোঝা যায় এই সবই ইচ্ছাকৃত। ঘটনাক্রমের কারণে যে এরকম হয়েছে তা না, মনে হয় একজন হতবিহ্বল মানুষ তার জীবনে ঘটে-যাওয়া কোনো গল্প মনে করার চেষ্টা করছে--কিছু মনে করতে পারছে, কিছু পারছে না, এর সঙ্গে সূত্রহীন অনেক কিছুই তার মনে এসে যাচ্ছে। 

উড়োজাহাজে চড়ার পর অভিযাত্রী বাইরে তাকিয়ে আরও তিনটি উড়োজাহাজ দেখে, এর মধ্যে দুটি রাগে গজরাতে গজরাতে অন্যদিকে চলে গেল; তৃতীয়টিকে একগুয়ের মতো তাদের পিছু নেওয়ার পর সে স্পষ্ট দেখে তার চোখ দিয়ে মুক্তার মতো দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এরপর বিমানবালার সঙ্গে আরও যে বাক্যালাপ হয়, বোঝা যায় এ একধরনের যেন মনালাপই, কিন্তু বালা ঠিকই তার জবাব দেয়। 

এরপর, দর্শনীয় স্থান দেখায় তার অনাগ্রহ লক্ষ করে স্বেচ্ছানিয়োজিত গাইড যখন বিরক্ত হয়ে তাকে বলেছিল, তা হলে আপনি এখানে এসেছেন কেন? তখন সে এমনি-এমনি একটি 'ব্যালকনি' দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে।(৩০) অন্যত্র, গাইডের চাপে একটি উঁচু টাওয়ার থেকে নিচে তাকিয়ে সে অদ্রে পেরর‍্যাঁর চেহারা দেখে,(৩১) এতে ক্ষুব্দ ও বিরক্ত হয় গাইড। কিন্ত এর মানে কী? 

বইয়ে এই সকল আচরণের কোনো মানে পাওয়া না গেলেও, সে যে একজন এশীয়, তা বারবারই মনে পড়ে : 

১. 

আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটছে, সেই ফরাসি লোকটার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নিজের মধ্যে আমি এরকমই একটা পরিবর্তনের আভাস পেতে শুরু করেছি। পরিবর্তিত হয়ে আমি যা হয়ে উঠছি, তা হয়ে ওঠাই অবশ্যম্ভাবী--আমি একজন এশীয় হয়ে উঠছি।৩২ 

২. 

আমি ফিসফিস করে তাকে ধন্যবাদ দিলাম। তারপর সন্তর্পণে হেঁটে ঢুকে পড়লাম আমার কাছে প্রতিভাত প্রাচ্যের রহস্যময় অন্ধকারের ভেতর। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, সুবিশাল ফাঁকা লবির শক্ত মর্মর মেঝেতেও আমার জুতা কোনো আওয়াজ তুলছে না। এশীয়রা এভাবেই হাঁটে।৩৩ 

৩. 

প্রত্যেক এশীয়র গভীরে নাটুকেপনার একটা সূক্ষ্ম বোধ থাকে, সামান্য উৎসাহেই সেটি ঠেলে বেরিয়ে আসে।৩৪ 

৪. 

এশিয়ার সব লোকই সাবধানী, এমনকি সর্বগ্রাসী বাসনার আগুনে পোড়ার সময়ও তারা সাবধানী। সাবধানী হওয়াই তাদের পক্ষে স্বাভাবিক, নতুবা বিদেশীদের শত শত বছরের লুটপাট আর হামলা, প্রকৃতির খামখেয়ালিমার্কা নিষ্ঠুরতার পরও কি তাদের পক্ষে এভাবে টিকে থাকা সম্ভব হত?৩৫ 

৫. 

আমরা এশীয়রা বিলক্ষণ জানি, ব্যতিক্রমেই জীবনের প্রাণ। এমনকি ঈশ্বরও ব্যতিক্রমের ফায়দা নেন।৩৬ 

৬. 

কেউ তাকে স্টুপিড বলবে, এশীয়রা ব্যাপারটা মোটেই হজম করে না।৩৭ 

৭. 

এশীয়রা আর যে একটা জিনিস হজম করতে পারে না, সেটা হলো কাপুরুষ উপাধি।৩৮ 

৮. 

ডাক্তার যতবারই আমার দেহের উপর হাত রেখেছেন, আমি একটা ছোট পশুর মতো যন্ত্রণায় মোচড়ামুচড়ি করে উঠেছি। সেটা করেছি ডাক্তারকে হতাশ করতে চাইনি বলে। প্রত্যেক এশীয়ই অপরের জন্য এই দায়িত্বটি বোধ না করে পারে না।৩৯ 

এশীয়রা কি আসলেই এই রকম? আচরণের এই সকল বৈশিষ্ট্য কোথা-থেকে পাওয়া, তা বোঝা যায় না; মনে হয় ফরাসিদের বৈশিষ্ট্য থেকে এশীয়দের বৈশিষ্ট্যগুলো যে আলাদা, তা বোঝানোর জন্যই এর উল্লেখ। এমন-আচরণের-অধিকারী এশীয়ই কিন্তু ফ্রান্সে যাচ্ছে এবং সে যে ফ্রান্সে যাচ্ছে সেটাও বারবার মনে করিয়ে দিয়ে ফ্রান্সকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছে। এখানে মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্য যদিও ভিন্ন, কিন্তু বাস্তবেও যে সেই ধারণা প্রচলিত ছিল সেকথা তো আরও আগেই লিখেছেন সতীনাথ ভাদুড়ী তার একটি সত্যি ভ্রমণকাহিনী বইয়ে। তিনি জানিয়েছেন ফরাসিদের, বিশেষত প্যারিসের সম্মোহনী শক্তির কথা; তাঁর মতে প্রাণ-বাঁচানোর চাহিদার পরও মানুষের 'স্থূল উপভোগ' ও সূক্ষ্ম অনুভূতির 'উপকরণ'-এর কেন্দ্র হলো প্যারিস; বিদেশীদের কল্পনাকে পুঁজি করে তাদেরকে আকর্ষণ করবার জন্য 'চুম্বক' তৈরি করাই তাদের পেশা। ফরাসিদের ট্যুরিস্টভোলানো প্রবণতা বিষয়ে তাঁর নিম্নোক্ত মন্তব্যগুলো বিবেচনা করলে আমাদের এশীয় অভিযাত্রীর দুর্ভোগ বিষয়ে একটি স্পষ্ট ধারণায় পৌঁছতে পারব : 

প্যারিসের কুৎসিত রূপটা এরা দেখায় না। ...এখানকার পালা-পার্বণগুলোকে বারোমাস বিদেশীদের সম্মুখে তুলে ধরবার জন্য একটা বড় সমিতি আছে। Jules Romains-এর মত বড় সাহিত্যিক তার সভাপতি। যতই অব্যবসায়ী আর আপন-ভোলা হ'ক না-কেন এই ফরাসি জাতটা, টুরিস্ট আমদানির ব্যবসা তারা বোঝে ভাল। যেখানে টুরিস্ট নিয়ে কারবার সেই সব দপ্তরেই কাজ দেওয়া হয়, অকেজো সুন্দরীদের। এদের একমাত্র কাজ দাঁতের মাজনের বিজ্ঞাপনের সাদা হাসিটি মুখে ফুটিয়ে অফিসে বসে থাকা।৪০ 

এই ফ্রান্সের কথাই মনে করিয়ে দেয় ফরাসি--এক সবিশেষ ফ্রান্স--সে-স্থান ভ্রমণ করতে গেলে নাকি অভ্যস্তও হতে হয় অভিযাত্রীকে। এখানে ফ্রান্সকে মহিমান্বিত করার দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের উদ্দেশ্য এই মনোভাবের প্রকাশ ঘটানো যে : তোমাদের এতকিছু, এতসব থাকা সত্ত্বেও, তা দেখার জন্য আমি আসিনি, আমার আসার কারণ ভিন্ন, তোমরা কীভাবে শিম রান্না করো তা দেখা। কিন্তু এই সবে আগ্রহী না হওয়ার কারণেই চলে জবরদস্তি--দেখা যায় বিরক্তি ও ক্ষোভ, আর ফরাসির এই আচরণই তাকে হাস্যকর করে তোলে। একজন উপনিবেশিত এশীয় হিসেবে এই বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন ছিলেন লেখক, না হলে অদ্রে পেরর‍্যাঁরকে দেখে অভিযাত্রীর এমনটি মনে হত না যে, ফরাসিরা ছাড়া ব্রিটিশ বা অন্য কেউ যে-দেশ শাসন করে সর্বত্র তাদের পদচিহ্ন রেখে যায় সে-দেশে খুব কম ফরাসিই 'সুখ' বোধ করে। এই চেতনার পরিচয় রয়েছে উপন্যাসের অন্যান্য স্থানেও। আমরা দেখি এশীয়দের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে আত্মম্ভরী ফরাসি-প্রতিনিধি অদ্রে পেরর‍্যাঁর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নির্লজ্জের মতো সৈকতে দৌড়ায়, পেছনে তোয়ালে হাতে নিয়ে দৌড়ায় এশীয় ও একটি কুকুর, কিন্তু এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই তার। এই নগ্ন হয়ে দৌড়ানোটাই তার উদ্ভটত্ব, এই ভাবে লেখক 'প্রাচ্যবাসীর দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমের একটি দেশকে হাজির করেছেন উদ্ভট চেহারায়, তার বাইরের ভব্যতার চামড়াটি খসিয়ে দিয়ে।'৪২ অন্য আলোচক লিখেছেন, 'ফ্রান্সে এক এশীয় আগন্তুকের বিচিত্র/বিড়ম্বনা এই উপাখ্যানের উপজীব্য,৪৩ উপন্যাসে এই এশীয় বিড়ম্বিত বটে, সেই সঙ্গে সে আত্মচেতনও, এই জায়গায় কদর্য এশীয়র চরিত্রগুলো থেকে এই এশীয় অভিযাত্রীর চারিত্রিক অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট, এতে ঔপনিবেশিকদের চেহারাও বিলকুল পরিষ্কার। তাই যারা তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের চরিত্রসৃষ্টির দক্ষতা এবং এ-অঞ্চলের রাজনৈতিক তৎপরতাকে ভিত্তি করে লিখিত ইংরেজি-ভাষায়-লেখা অন্যান্য ঔপন্যাসিকের উপন্যাসের কথা মাথায় রেখে এই উপন্যাস দুটিকে পূর্ণাঙ্গ-চরিত্রহীন ও অসফল শিল্পপ্রয়াস বলে মূল্যায়ন করেন, তাদের এ-কথা মনে রাখা জরুরি যে, বিশ্বসাহিত্যের নিবিড় ও সতর্ক পাঠক ওয়ালীউল্লাহ্ আখ্যান ও চরিত্রের বয়ান ও বয়নবিষয়ে প্রাচীন প্রথাগত রীতি সজ্ঞান বর্জন করেছিলেন। 

উপন্যাস দুটি পড়া শেষ করে তার এই রাজনৈতিক বিষয়বস্তু ও তৎকালিক পাক-মার্কিন সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় আনলে ওয়ালীউল্লাহ্‌র 'আবু শারিয়া' ছদ্মনাম গ্রহণের কারণটিও আর অস্পষ্ট থাকে না। এই কারণে কট্টরপন্থী কেউ যদি কখনো গোপনীয়তার প্রসঙ্গ তুলে অভিযোগ করেন, তাহলে তার জবাবে একথা নির্দ্বিধায়ই বলা যাবে যে, কট্টরপন্থাও যেখানে প্রায়শই লক্ষ্যচ্যুত হয়, সেখানে ওয়ালীউল্লাহ্‌র দুটি উপন্যাসই হয়েছে একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ও লক্ষ্যভেদী। 




তথ্যনির্দেশ ও টীকা


১. এই অনুবাদের সম্পাদনাকাজে যুক্ত ছিলেন শহীদুল জহির ও সাজ্জাদ শরিফ; 

২. আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্, আমার স্বামী ওয়ালী [Wali, My Husband, as I saw him], শিবব্রত বর্মন অনূদিত, প্রথমা, ঢাকা, ২০১২ পৃ. ৫০; 

৩. সৈয়দ আকরম হোসেন-কর্তৃক উদ্ধৃত, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-রচনাবলী ২, সৈয়দ আকরম হোসেন সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ৫৬১; 

৪. আহসান হাবীব, 'লাল সালু', চতুরঙ্গ থেকে দ্বিতীয় খণ্ড, অশোক মিত্র সম্পাদিত, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃ. ১০৭; 

৫. সৈয়দ আবুল মকসুদ, স্মৃতিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, প্রথমা, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ২১-২২ [সেই সময়কার পূর্ববাংলার লেখকদের সম্পর্কে সৈয়দ নসরুল্লাহ লিখেছেন : 'তখন যাঁরা গল্প-উপন্যাস লিখতেন, তারা রোমান্সের উপরেই জোর দিতেন। তরুণ-তরুণীদের জন্য লাভস্টোরি ধরনের লেখা। কেউ কেউ Downtroden people-দের দুঃখ-দুর্দশার কথা তাদের গল্পে বলতেন। সেই অবস্থায় লালসালু ছিল ব্যতিক্রম। লাভস্টোরিও না, সরাসরি গরিব-দুঃখীর কথাও না। ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা।' কাহিনিটি তখনকার পাঠককে আকৃষ্ট করতে পারেননি।']; 

৬. পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৮; 

৭. আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত পৃ. ৪৩; 

৮. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র আরেক পূর্ববঙ্গ, প্রথম আলো [২৩ জুন], মতিউর রহমান সম্পাদিত, ঢাকা, ২০০৬, পৃ. ২৩; 

৯. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, কদর্য এশীয় [The Ugly Asian), শিবব্রত বর্মন অনূদিত, ২০০৬, ঢাকা, পৃ. ১৭১; 

১০.মার্কস এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, নির্বাচিত রচনাবলী প্রথম খণ্ড, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা, ১৯৯৭, পৃ. ২৫; 

১১. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫; 

১২. পূর্বোক্ত, ২৩; 

১৩. বেগম আকতার কামাল, 'সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র কদর্য এশীয় : ক্ষুধা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ', নান্দীপাঠ ৬, সাজ্জাদ আরেফিন সম্পাদিত, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ২৪৬; 

১৪. লিয়াকত আলী খান, পাকিস্তান এশিয়ার প্রাণকেন্দ্র, [Pakistan : The Heart of Asia], আবদুর রহীম অনূদিত [১৯৫০ সালের মে ও জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফররত পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খান ও বেগম লিয়াকত আলী খান কর্তৃক প্রদত্ত বক্তৃতাবলী], নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা, ১৯৬৯, পৃ. ১২২; 

১৫. তারিক আলী, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ জান্তা না জনতা [Pakistan : Military Rule or people's Power] মাহফুজ উল্লাহ অনূদিত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ. ৬১; 

১৬. খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র ইংরেজি লেখা, পূর্বোক্ত, নান্দীপাঠ, পৃ. ২৪১-২৪২; 

১৭. সাজ্জাদ শরিফ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ : প্রচ্ছদের অন্তরালে', সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-সংখ্যাহীন ভূমিকা; 

১৮. আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৭; [এ-বইয়ের ভূমিকায় আনিসুজ্জামান লিখেছেন : 'আন মারি তাঁকে মার্কসবাদী বলেছেন; মার্কস্‌বাদী না হলেও তিনি ছিলেন অনেকটা বামঘেঁষা। বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন তাঁর কাম্য ছিল।' পৃ. ১০]; 

১৯. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৯; 

২০. নান্দীপাঠ ৬, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫২ [বেগম আকতার কামাল লিখেছেন : 'খুব আশ্চর্যভাবে মার্কিনিদের হৃদয়ের এই রক্তক্ষরণকে ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর জন্যে, আহসান যেন অনুভব করে। এই অনুভব ওয়ালীউল্লাহ্‌রও। দরিদ্রের ক্ষুধা নিয়ে তাঁর এই উপলব্ধি/বিশ্বাস গভীরতাস্পর্শী সহৃদয়বাদের স্বয়ংপ্রকাশ, তাঁর শৈল্পিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পুনরাবৃত্ত এবং শ্রেণিসত্তাবিত্তিক উদারনৈতিক মতবাদের ফলশ্রুতি']; ['কদর্য এশীয় : ঠাণ্ডাযুদ্ধের তপ্ত বয়ান' প্রবন্ধে মাসুদুজ্জামান লিখেছেন : 'সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের অংশ হিসেবে জনসন বা মার্কিনিরা যে তত্ত্ব হাজির করেছিলেন, প্রফেসর আহসান তার বিপরীত বয়ান নির্মাণ করেছেন। একথাও অনুমান করা সম্ভব যে, এ ছিল আসলে ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌রও রাজনৈতিক ভাবনা।' পৃ. ২৬৪]; 

২১. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৯; 

২২. পূর্বোক্ত, ১৬৯; 

২৩. প্রথম আলো, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৩ [সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন : 'আহসানকে কদর্য এশীয় হিসেবেই তারা দেখবে, যদি দেখতে চায়।' ...'আমেরিকানদের পক্ষে এমনটা না করে উপায়ও নেই, কেননা তাদের নিজেদের চোখে রয়েছে আমেরিকার স্বার্থের ঠুলি; সেটা দিয়ে দেখলে দেশপ্রেমিক আহসানদের কুৎসিত ভিন্ন অন্য কিছু মনে হওয়ার উপায় নেই।']; 

২৪. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৯; 

২৫. কাজী মোস্তাইন বিল্লাহ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র উপন্যাস : কদর্য এশীয়, থিসিস উপন্যাস?', পূর্বোক্ত, সাজ্জাদ আরেফিন, পৃ. ২৩৬; 

২৬. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, শিম কীভাবে রান্না করতে হয় [How Does One Cook Bean's], শিবব্রত বর্মন অনূদিত, প্রথমা, ঢাকা, ২০১২, পৃ. ১২; 

২৭. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩; 

২৮. আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত, পৃ. ৬৫-৬৬; 

২৯. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৬; 

৩০. পূর্বোক্ত, পৃ. ৩১; 

৩১. পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৪; 

৩২. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭-১৮; 

৩৩.পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯; 

৩৪. পূর্বোক্ত, পৃ. ২৪; 

৩৫.পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬; 

৩৬.পূর্বোক্ত, পৃ. ২৯; 

৩৭. পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৩; 

৩৮. পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৪; 

৩৯. পূর্বোক্ত, পৃ. ৪১-৪২; 

৪০. সতীনাথ ভাদুড়ী, সত্যি ভ্রমণ কাহিনী, সতীনাথ ভাদুড়ীর নির্বাচিত রচনা দ্বিতীয় খণ্ড, বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৮৬, পৃ. ১৬; 

৪১. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, পূর্বোক্ত, পৃ. ২০; 

৪২. পূর্বোক্ত, পৃ. ৬২ ['পরিশিষ্ট অংশে পুনর্মুদ্রিত সাজ্জাদ শরিফ লিখিত 'ভূমিকা', এটি ২০০৪ সালে প্রথম আলো ঈদ সংখ্যায় শিম কীভাবে রান্না করতে হয় বইটির প্রথম প্রকাশকালে লিখিত]; 

৪৩. পূর্বোক্ত, সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখিত ভূমিকা, পৃ. ১০।



লেখক পরিচিতি
মোস্তাক আহমাদ দীন
জন্ম ১৯৭৪ সালের ১১ ডিসেম্বর, সুনামগঞ্জ জেলার ইসহাকপুর গ্রামে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন। পিএইচডি করেছেন ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, অধ্যাপক তপধীর ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে। নব্বই দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি। ২০০১ সালে বের হয়েছে প্রথম কাব্য 'কথা ও হাড়ের বেদনা'। ২০০৫-এ কাব্য- 'জল ও ত্রিকালদর্শী', ২০০৯-এ 'জল ও শ্রীমতি', ২০১২-এ 'ভিখিরিও রাজস্থানে যায়'। এই কাব্যের জন্যে পেয়েছেন ২০১২ সালের 'এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার'। 'কবিতাযাপন' নামে তাঁর একটি বিশিষ্ট গদ্যের বইও প্রকাশিত হয়েছে, ২০১১-য়। লোকজীবন ও লোকসাহিত্যের প্রতি তাঁর টান বিশিষ্ট মাত্রা পেয়েছে। তাঁর সম্পাদনায় বেশ কয়েকজন লোক-কবির পাণ্ডুলিপি বই হয়ে বেরিয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মকদ্দস আলম উদাসী'র 'পরার জমিন', 'আবদুল গফ্‌ফার দত্তচৌধুরী : তাঁর স্মৃতি তাঁর গান, ১৯৯৯। পেশায় শিক্ষক। সিলেট কমার্স কলেজের উপধ্যক্ষ। এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার পেয়েছেন ২০১২ সালে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন