রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

সেই সন্ধেটি

সেলিম জাহান 

জানি, আজ বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা - তাপমাত্রা পাগলা হিমাঙ্কের ১৫ ঘর নীচে। দমকা বাতাসের সে কি হু হু করা শব্দ - মাঝে মাঝে আছড়ে পড়ছে জানালার শার্সিতে। ঝোড়ো আবহাওয়ায় আকাশটা কালো। ম্যানহ্যাটেনের আকাশ রেখার বিশাল উঁচু হর্ম্যরাজি কালো দৈত্যের মতো দু’হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোন এক চিমনী থেকে সাদা ধুঁয়ো ছড়িয়ে পড়ছে স্লেটের মতো ধূসর আকাশে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি গুটিসুটি মেরে কালো বেড়ালের মতো সন্ধ্যা নেমে আসছে।

দিনের এ সময়টায় সবর্দা আমার মন খারাপ করে। কি এক বিষন্নতা ছুঁয়ে যায় আমাকে - সেই যখন খুব ছোট ছিলাম তখন থেকেই। যে কোন সময়ে - শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, বসন্ত; পৃথিবীর যে কোন জায়গায় - মস্কো, ঢাকা, বরিশাল, প্যারিস, মন্ট্রিয়াল, নিউইয়র্কে। নিজে একা থাকলে কিংবা শত লোকের মাঝে। কোন ব্যাখ্যা নেই তার - তবু এ সময়ে দু’একদিন কোন কোন সন্ধ্যের স্মৃতি মনে পড়ে যায়।

পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকের কথা। বাবা তখন ব্রজমোহন কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসের অভীক্ষক। অভীক্ষকের ছড়ানো বিরাট বাড়ীর বাসিন্দা তখন আমরা। আমার মা’ শক্ত টাইফয়েডে পড়লেন। প্রথম তিন-চারমাস ধরাই যাচ্ছিল না, তাঁর অসুখটা কি। জ্বর আসে যায় অনেকটা ঐ বানরের তৈলাক্ত বাঁশের ওঠা-নামার মতো। আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন সারাদিন। দেখি বাবা তাঁর মাথায় জল ঢালছেন। 

আমার বয়স সাতের মতো, আমার বোনের চার। রেনুর মা মাসিমা আমাদের দু’জনকে স্নান করান, খাওয়ান, শোয়ান। তাঁর মেয়ে রেনু’দিও মা’কে সাহায্য করেন। ছাত্রাবাসের কর্মচারী মান্নান ভাই বাইরের কাজ সারেন। আমি আর স্কুলে যাই না। মা’র কাছাকাছি ঘুর ঘুর করি।

একদিন শেষ বিকেলের দিকে মা’র পাশে বসে আছি। মা’র শিয়রের লম্বা মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত জানালা। দেখি বাইরেরে সিমেন্টের উঠোনে মরা রোদ এসে পড়েছে। একটু দূরের জলপাই গাছের তেল তেল পাতাদের চক চকে আভা ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিক। একটু দূরের কাঁঠাল গাছটায় একটা শালিক চুপচাপ বসে আমারই দিকে তার টানা চোখ মেলে ধরেছে। দেখি চারদিকে সন্ধ্যার ছায়া নামছে। বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। 

হঠাৎ শুনি মা আমার নাম ধরে ডাকছেন। আমি আস্তে আস্তে তাঁর শিয়রে গিয়ে দাঁড়াই। দুর্বল হাতে আমার হাত ধরেন তিনি - টের পাই তাঁর হাতের উত্তপ্ততা। টেনে বসান আমাকে তিনি তাঁর পাশে। তাকাই তাঁর দিকে। দু’চোখ বোঁজা তার - রোগাক্রান্ত পান্ডুর মুখ। খুব ধীরলয়ে নি:শ্বাস নিচ্ছেন তিনি। একসময়ে চোখ খোলেন তিনি। জলধারা নেমেছে তার চোখে। তাঁর হাত আমার গালে রাখেন, তারপর ভাঙ্গা গলায় বলেন, ‘আমি বোধহয় আর বাঁচবো না’। 

আমি ফুঁপিয়ে উঠি। শক্ত করে তাঁর হাত ধরি। কেঁপে কেঁপে উঠি বলা চলে। ততক্ষনে মা হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে, সাত বছরের একটি শিশুকে হয়তো মৃত্যুর কথাটা বলা ঠিক হয় নি। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেন। ম্লান হাসেন, গাল টিপে দেন আমার, তারপর আশ্বস্ত করেন আমাকে, ‘কিচ্ছু হবে না। যাও, খেলতে যাও’। আমি আস্তে আস্তে উঠি, জামার আস্তিনের উল্টোপিঠে চোখ মুছি, তারপর দরজা পেরোই। পেছনে তাকিয়ে দেখি, ক্লান্তহয়ে তিনি আবার চোখ বুঁজেছেন।
আমি পায়ে পায়ে বাইরে আসি। ততক্ষনে সন্ধ্যা নেমেছে আর একটু গাঢ় হয়ে। সিমেন্টের উঠোনে এসে দাঁড়াই। জলপাই গাছে আঁধার ঝুলে ঝুলে আছে। কঁঠাল গাছে যে সব পাখীদের রাত্রিবাসের কথা, তারা হুটোপুটি ঝগড়া-ঝাঁটিতে ব্যস্ত। মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক সবুজ টিয়ে টিঁ টিঁ করে উড়ে গেল। আমি যেন শুনতে পেলাম - ‘বাঁচবো না, বাঁচবো না।’ ঘরেরে দুকে তাকিয়ে দেখি, রেনুর মা মাসিমা হাতে একটি হারিকেন নিয়ে চলেছেন মায়ের ঘরে আলো দিতে।

ষাট বছরের ওপরে হয়ে গেল। মা সে যাত্রায় সুস্হও হয়ে উঠেছিলেন প্রায় এক বছরকাল রোগভোগের পরে। আমিও ভুলে গিয়েছি তাঁর অসুখের কথা। জীবন তারপর চলেছে তার নিজস্ব গতিতে। কিন্তু ঐ সন্ধ্যেটা কেমন করে বোধহয় আমার শিশুমনের কোথাও লুকিয়ে আছে। তাই কোন কোন সন্ধ্যেয়, বাইরের দিকে তাকিয়ে আমি বিষন্ন হয়ে পড়ি। এই আজ যেমন হলো। মানুষের মন, কে বুঝতে পারে? নিজেই কি পারি? আপনাকে জানা, সে কখনো ফুরোয় না।


-------
ছবি: অভীক্ষকের বাসস্হানের একাংশ ২০০৯এ। কাঁঠাল গাছটি আমার ছোট বেলার সখা।অভীক্ষকের বাসস্হান আর কলেজের মূল ভবনের মাঝখানের পুকুর।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন