রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

পাঠপ্রতিক্রিয়া-- আলবেয়ার কাম্যুর উপন্যাস পতন

“নিজের বিষয়ে সন্দেহের ইতি টানতে গেলে একজনকে নিজের জীবনের উপরেই ইতি টানতে হয়।“ 

আলবেয়ার কামু কে ছিলেন, কোথায় জন্ম, কি লিখেছেন ইত্যাদির জন্য উইকিপেডিয়া আছে। সে নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, পরিসর আর সময়ের অপচয়। কথা হচ্ছে – 'The Fall' বা 'পতন' উপন্যাসকে নিয়ে।

উপন্যাস একটা দীর্ঘ আত্মকথনকে কেন্দ্র করে। শ্রোতা যে কেউ হতে পারেন। আপনি, আমি অথবা বক্তা নিজেও হতে পারে। শ্রোতার একটা শিথিল রূপরেখা টানা আছে, কিন্তু সে আসনে যে কেউ বসতে পারি। বসে থাকার সাহস আর ধৈর্য চাই। একজন মানুষ নিঃসঙ্কোচে নিজের স্বরূপের আত্ম-উন্মোচন ঘটাবে, আপনাকে তার শ্রোতা, সাক্ষী --- দুই-ই হতে হবে। যে মানুষটা নিজেকে খুঁড়ে কথাগুলো বলবে, সে ভয়ানক, কারণ সে আপনার আমার অন্তর্লীনরূপ। অবশেষে শ্রোতা, বক্তা মিশে কালের মিশ্রণযন্ত্রে জেগে উঠছে এক নৈর্ব্যক্তিক সত্তা – মানব-চিত্ত-মন্থনজাত বিষামৃত। 

প্রতিটা প্রতিষ্ঠিত সত্যের ভূমিতে একটা মিথ্যা থাকে। যে মিথ্যাকে আড়াল করে একটা সামাজিক, লোকরক্ষাকারী নীতিমালা থাকে। একটা মধুর আবরণ থাকে। একটা অভ্যাসের জড়ত্ব থাকে। নিজেকে মানানসই, চলনসই করে সামাজিক পদে আত্মপ্রতিষ্ঠ হয়ে ওঠার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। আর এসবের গভীরে প্যাঁচ কাটা কলের মত বিন্দু বিন্দু বিষাদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তেই থাকে, পড়তেই থাকে। তার টপ টপ আওয়াজকে কানে নিতে চাই না, বাইরের কোলাহলে চাপা দিয়ে রাখি, নানা হুল্লোড়ে, ভণ্ডামিতে ঢেকে রাখি, কিন্তু তবু সে টপ টপ আওয়াজ হতেই থাকে হতেই থাকে হতেই থাকে। এক এক সময় রাগে জেদে জোরে কলের মাথা চেপে কিছুক্ষণের জন্য বিষাদধারাপাত ধ্বনি থেকে রেহাই পেয়েছি ভাবি, কিছু একটা ফুর্তিতে গা ভাসিয়ে ভাবি এই তো থেমেছে সে শব্দ, কিন্তু ফুর্তির সে গগনভেদী অহমিকার আস্ফালনের তেজ কমতে শুরু করলেই শুনি ওই... টপ... টপ... বিন্দু বিন্দু বিষাদধারাপাত। 

কামু সেই কলের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। বাথরুমে এমনি উলঙ্গ হতে অসুবিধা হয় না, কিন্তু সেই বাথরুমের দরজায় যদি একটি শরীর প্রমাণ আয়না বসানো থাকে তবে অস্বস্তির সীমা থাকে না। নিজেকে যে উলঙ্গ হিসাবে জানি না তা নয়। মানি না। আর সংসারটা জানায় চলে না, মানায় চলে। এতো শুধু আমি নই, খ্রীষ্টকেও মুখোমুখি হতে হয় দস্তয়েভস্কির কলমের ( ব্রাদার কারামোজভের, গ্রেট ইনকুইজিটর) পর কামু'র কলমের সামনে। খ্রীষ্টান ধর্মকে, মানবধর্মকে, পেশার ধর্মকে, নীতি-মতবাদ-প্রতিবাদজীবীদের মুখোমুখি হতে হয় কামুর কলমের সামনে। কামু কারুর কাছে কৈফিয়েৎ চান না, শুধু তাকান একবার, আর কি অসহ্য নির্মম সকরুণ সে চাহনি। 

মানুষ হিপোক্রেসি ছাড়া 'মানুষ' হতে পারে না। সেই হিপোক্রেসিকে স্বীকার না করে সে সত্যভিমুখীও হতে পারে না। আমার ইসিজি রিপোর্ট যেমন আমার ক্ষণকালের হৃৎযন্ত্রের অবস্থানের সূচক, সব প্রতিষ্ঠিত সত্যই তেমন সত্যের ইসিজি রিপোর্ট। তা সেই মুহূর্তের সত্য, তাকে চিরকালীন সত্য বললেই যেমন মিথ্যাচার হয়ে যায়, এও তেমন। তাই কামু বলেন, সত্য মানুষকে অন্ধ করে। কামু বলেন মানুষের পতন ঘটে প্রভাতে। সত্যিই তো তাই, স্বপ্নের বেদনা তো জাগরণেই। জীবন তো এক আধা জাগা আধা স্বপ্নের স্রোত। সত্য-মিথ্যা-নীতি- মানবিকতা তো কামুর এক সাক্ষাৎকারের ভাষায় ‘মাউথওয়াশ’। 

তবে কি শুধুই নঞর্থক দৃষ্টিভঙ্গী? এই প্রশ্নটাই অনর্থক। কোনো মিথ্যাকে সত্য বলে জানার অভ্যাসে কুড়ুল মারাটা সব সময়েই নঞর্থক হয়েই থাকে। কিন্তু সেই কুয়াশাটা চিরে দিলেই সত্যের আলো এসে পড়ে। প্রশ্নটা হল সেই সত্যকে মানার হিম্মৎ আমার আছে কিনা। আর থাকলেও তা কতদূর, আর কতদিন? 

কামুর এই বইটাকে সার্ত্রে বলেছেন সবচাইতে সুন্দর আর মানুষের সবচাইতে কম কাছে পৌঁছাতে পারা বই। আসলে বইটা আমার মনে হয়েছে সচেতন মস্তিষ্কে বুঝতে চাইলেই বিপদ। কারণ সচেতন মস্তিষ্কে সামাজিক পাহারা। নিজেই নিজের বাধা। যাকে সত্য বলে জানি, কিন্তু স্বীকার করতে ভয়, তার প্রতিবাদটাই সবচাইতে ভয়ংকর। তাকে ঘুম পাড়িয়ে পড়তে হবে। নিজের বাথরুমে নিজের সামনে দাঁড়াতে হবে। কানে ফিসফিস করে কথা বলবে - কামু। পতনটা অবশেষে মুখোশের।

“ওহে যুবতী, আরেকবার জলে ঝাঁপ দাও, যাতে আমি আমাদের দুজনকেই বাঁচাবার দ্বিতীয় সুযোগটা পাই!”


(বাংলায় আমার জানা অনুবাদ দুটো। ১) র‍্যাডিকাল প্রকাশনী। ২) এবং মুশায়েরা। দ্বিতীয়টা সরাসরি ফরাসি থেকে অনুবাদ। মূল্য ৯০/- আর ১৫০/- যথাক্রমে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন