মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

মোজাফফর হোসেনের গল্প নিয়ে আলোচনা : স্মৃতির দরজা খুলে

সাইফুদ্দিন রাজিব

‘ধরো, এমন কিছু-একটা হতে চাও কিন্তু জানো সেটা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আবার তুমি অন্যকিছু হতে চাও-না...। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে বৃদ্ধ লোকটি আমাকে বলেছিলেন। মৃত্যু মানে আত্মহত্যা।

‘স্মৃতির দরজা খুলে’ গল্পে মোজাফ্‌ফর হোসেন এভাবেই শুরু করেছেন। শুরুতেই এই বাক্যটি একজন পাঠকের মগজকে নাড়িয়ে দিয়ে সক্ষম। তবে সেই পাঠক, যিনি গল্পের গভীরে ঢুকতে পারেন, গল্পকে ধারণ করতে পারেন। গল্পটি মূলত অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত লেখকের ‘খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক’ বইয়ের প্রথম গল্প।

আমি হুট করে গল্পে ঢুকতে পছন্দ করি না, গ্রন্থের ভূমিকা বা প্রাককথনে লেখক নিজের গল্পনির্মাণের পেছনের গল্প বলেছেন। এটুকু পড়লে পাঠক লেখকের বোধকে ধারণ করে গল্পগুলোতে সহজে ঢুকে যেতে পারবেন। এই অংশটি পাঠ না করলে হয়ত আমিও গল্পের ভেতরে ঢুকতে পারতাম না। কারণ, মোজাফ্‌ফর হোসেনের গল্প নির্মাণজগৎ আলাদা, স্বাতন্ত্র্য গদ্যপদ্ধতি। তাঁর লেখায় বাস্তব-অবাস্তব পরাবাস্তবের বৈচিত্র্যের যে পরোক্ষ মিশেল তিনি ঘটান, তা ঈর্ষণীয় নয় তবে অনন্য। যা আপনাকে ভাবাবে, অতঃপর হৃদয়কে নাড়িয়ে দেবে। এই নাড়িয়ে দেবার শক্তিতে একটা বিষয় থাকে, গল্পে স্মৃতি আবিষ্কার একই সাথে সজীবতা। পাঠক যেন বোধ করতে পারেন যে, গল্পটা তাঁরই অথবা খুব পরিচিত, যেন দেখছি অথবা আমার সাথেই এমন কিছু হয়েছে।

ছোটগল্পের শিল্পরূপ না থাকলে গল্প সুস্বাদু হয় না, কারণ পরিসর বিবেচনায় সবকিছু বর্ণনা সম্ভবপর নয়। এই শিল্প নানাভাবে হতে পারে, কারও বাক্য নির্মাণশৈলীতে টানটান উত্তেজনা থাকে, সম্মোহনী ক্ষমতা থাকে। এখানে মোজাফ্‌ফর হোসেন নিজস্ব গদ্যরীতির সাথে তাঁর প্রায় প্রতিটা সৃষ্টিতেই রেখেছেন গল্পের ভেতরে গল্প। সেই গল্পের বর্ণনা পাঠে কখনো স্খলন হতে পারে, কিন্তু উপস্থিত মিথ ওই অণুচ্ছেদ আবার পড়তে বাধ্য করবে।

‘মরে যাওয়ার আগে একটা সিদ্ধান্ত অন্তত আমি নিজে নিতে চাই। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অদৃষ্ট কারও না; একান্ত আমার সিদ্ধান্ত সেটা।’

এটা নিছক গল্প নয়, চরিত্রের বয়নে এই শব্দগুলোর ভেতরে লেখক নির্মাণ করেছেন একটা জীবনপটের আখ্যান। গল্পকার এই চরিত্রের নাম দেননি, চাচা সম্বোধন করেছেন, এ চরিত্র তাঁর কল্পনাসৃষ্ট। তাঁরা প্রতিদিন একসাথে বসে চা খান। তারপরে চলে যান যে যার মত করে। এই যাওয়া আসার মাঝে যোগসূত্র বটগাছ, সেখান থেকেই মোজাফ্‌ফর হোসেন খুলেছেন পরিচিত স্মৃতির দরজা। সেই স্মৃতির ওপাশের যে গল্প, সেখানে তিনিই প্রধান চরিত্র। কথক হিসাবে নিজেকে এনে হয়ত গল্পকে সজীব করেছেন, এই সজীবতার মধ্যে যে শিল্প এটাই লেখকের নিজস্ব সৃষ্টি। একারণেই রেলপাতের মত প্যারালাল গল্পের অন্য অংশের সাথে নিজের গল্পের যোগসূত্র নির্মাণ করেছেন। স্মৃতির গল্পের চরিত্রগুলোর মাঝে নির্মিত হয়েছে এক বায়বীয় সাদৃশ্য। এই সাদৃশ্য বর্ণনায় তাঁর নিজস্বতা, সরলতা, স্পষ্টবাদিতায় মনে হয় গল্পটা খুব আপন।তাঁর সেই গল্প নির্মিতিতে কৃপণতার লেশমাত্র নেই। মোজাফ্‌ফর হোসেন ঢেলে দিয়েছেন সবটুকু।

'কাশিতে ভেসে গেল বাবা, পদ্মায় মা। জীবিত কিংবা মৃত। বিহারের দাঙ্গায় খুব কষ্ট করে মা বেঁচে এসেছিলেন। একাত্তরে আরও এক অন্ধকারে বৃদ্ধ মাকে নির্যাতন করে পাকিস্তানী বর্বর সেনাদল নদীতে ফেলে দিল। মা যদি একবার বলত সে বিহারির স্ত্রী, হয়ত রক্ষা পেত। কিন্তু মা স্পষ্ট বাংলায় বলেছে সে বাঙালি।'

ছোটগল্পের কয়েকটা লাইনও আপনার অন্তরে জাতিসত্তার কাঁপন ধরাতে সক্ষম। চাচা বলে যান তাঁর মায়ের কথা, বাবার কথা নিজের কথা। কথক ফিরে যান নিজের স্মৃতিপটে, সেখানে ভালবাসা আছে। এইতো, সৎ মা যাতে তাঁর চুল ধরে খুব মারতে না পারে তাই বাবা ফজু চাচাকে কৌশলে বলেছিলেন, 'ওর চুলটা কদম ছাট দি দিস তো!' কিন্তু এই বাবার মাঝেও যে আরেকটা বাবা বাস করে। সেই বাবার সাথে মিলির কি যেন একটা সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক জানা হয় না। গল্প যে বটগাছ তলা থেকে স্মৃতির পাতায় চলে গিয়েছিল, ফিরে যায় সেখানে। এমনই কোন বটতলার বেঞ্চির নিচে পাওয়া গিয়েছিল মিলার লাশ।

অপূর্ণতার প্যারালাল গল্পে বৃদ্ধা ফিরে যান নদীর মোহে, অদ্ভুত সম্পর্ক সেই নদীর সাথে। বাবা, দাদি, মা... কেউই বা কোনকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এক জীবনে একটা সিদ্ধান্ত সে নিজে নিতে চায়, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অদৃষ্ট কারও না; একান্ত নিজের।

‘খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক' থেকে একটি গল্পের পর্যালোচনা করার কারণ গ্রন্থটির লেখক মোজাফ্‌ফর হোসেন। সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে যে-কজন লেখকের গল্প পড়েছি তাতে মনে হয়েছে লেখকগণ চেয়েছেন, ধারাবাহিকভাবে কিভাবে নিজের লেখাকে উন্নতি করা যায়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে তিনটে গ্রন্থ আমি রচনা করেছি সেখানেও শুধু চেষ্টা করেছি কিভাবে উন্নতি করা যায়। এখানে মোজাফ্‌ফর হোসেন একটা নিজস্ব ধারা তৈরি করতে চেয়েছেন। নিজের পরিচিত গল্পের ভেতরে ঢুকে নতুন গল্প তৈরি করার প্রয়াস সব লেখকেরই থাকে আমার মনে হয়েছে এই লেখক গল্পকে আপন করতে চেয়েছেন। ডায়ালগ নির্মাণে নিজস্ব রীতি দৃশ্যমান, এই রীতিতে পাঠক হিসাবে আমি কখনো হোঁচট খেয়েছি। হতে পারে পাঠ-কৌশলে আমি গতানুগতিক কিছু ভেবেছি। তবে সেটা কোনভাবে আমাকে গল্প থেকে ছিটকে ফেলেনি। এটা মোজাফ্‌ফর হোসেনের শক্তিশালী দিক বলে মনে হয়েছে। মেদহীন গল্প বর্ণনা করতে গিয়ে কি যেন বাদ থেকে গেল মনে হচ্ছিল। যেন আরও কিছু আছে, বেশ খানিকক্ষণ যেন গল্পের ভেতরেই আঁটকে আছি। তবে ভাল করে বোঝা যায়, এটাই তাঁর নিজস্ব রীতির অংশ। তিনি তাঁর মত লেখেন।

মোজাফ্‌ফর হোসেনের সাথে আমার কথা হয়নি কোনদিন। তবে আন্তর্জালের কল্যাণে, কিছু প্রবন্ধ ও গল্প পড়ে এই লেখক সম্পর্কে যতটুকু ধারণা তৈরি হল যে তিনি পাঠকের কাছে নিজের গল্প নিয়ে যেতে রাজি নন, বরং তিনি চেয়েছেন নিজস্ব একটা ধারা তৈরি করতে যা পাঠককে তাঁর লেখার দিকে টেনে আনবে। এখানে কারও সাথে কারও তুলনা বেমানান, তবে পাঠক হিসাবে মনে হচ্ছে মোজাফ্‌ফর হোসেনকে পড়া উচিত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন