মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

অমর মিত্রের গল্পঃ মোরেলগঞ্জের পিসেমশাই

( আমার ভয় কী। আমার সঙ্গে আমার বড় পিসেমশাই আছেন। আমাকে কে ঠেকায়….. নইলে ওভাবে থ্রু শান্তিপুর গ্যালোপিং ট্রেন কেউ ঘুরিয়ে দিতে পারেন ? ।। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প--- সে ) 


একা ঘরে ইজি চেয়ারে শুয়ে ভাবছি দুপুর কখন শেষ হবে। টের পেলাম সিঁড়িতে শব্দ হচ্ছে। বাইরে আষাঢ় বয়ে যাচ্ছে। মেঘ আসছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে। রোদ মরে আছে, রোদের ভিতর মেঘের ছায়া পড়ছে, আবার সরে যাচ্ছে, এসব আমি টের পাই ঘরের আলো কমে আসায়, বেড়ে যাওয়ায়।
বৃষ্টি নামবে নামবে করে নামছে না। আজ সকালে সমীর খবরের কাগজ পড়ে শুনিয়েছে, পশ্চিমঘাট পর্বত মালায় আছড়ে পড়ে মহারাষ্ট্রে বৃষ্টি নেমেছে। কেরলে বৃষ্টি নেমেছে। আন্দামানে মেঘ ঢুকেছে। উত্তর বঙ্গে মেঘ ঢুকেছে। ওদিকে বৃষ্টি নামিয়ে এদিকে আসবে। কতদিন বাদে বৃষ্টি আসছে। দেখতে পাচ্ছি আগের বছর না তার আগের বছর, নাকি আরো আগের বছর, চাকবেড়ে, সূর্যপুর, পিয়ালির চর, আট নিরিমিষ জুড়ে কী বৃষ্টি নামল! কুয়াশার মতো সব ছেয়ে গেল। হাজরা, বজরা, ভদ্রেশ্বরের ঠাকুদ্দা, তার ঠাকুদ্দারা ধন রুইছে। ডাক দিচ্ছে, বাঙালবাবু এস। চোখ যেন জুড়িয়ে এল। এবারও সেই মাঠে জল নামবে। বাঙাল সব ফেলে এসেছে। আমি তাকিয়ে আছি ব্যালকনির আধ ভেজান দরজার দিকে। ডেক চেয়ারে আধ শোয়া হয়ে চোখ বুঁজে আছি। সারাদিন শুয়ে বসে কেটে যাচ্ছে। সকালে আজ কিছু বলেছিলাম, খুলনা শহরের কথা। উপন্যাসের পরের অংশটা যা হবে। সমীর টেপ রেকর্ডার বসিয়ে কথাগুলো রেকর্ড করেছে। এই ভাবে কি হয় ? হতে হবেই। ললি বলছে তোমার অসুখ সেরে গেছে বাবা। এখন আস্তে আস্তে আগের মতো হয়ে উঠবে। ইতি আমাদের টালিগঞ্জের বাড়ি থেকে চেলিতে মোড়া নারায়ণ শিলা নিয়ে এসেছে ললির এখানে কাশীপুরে। ওই শিলা আমি গন্ডক নদীর বালুচর থেকে নিয়ে এসেছিলাম। ভালো পেপার ওয়েট হবে। গন্ডকের বালিতে পড়ে থাকে শত শত এমনি কষ্টি পাথর, শত শত ভগবান। পেপার ওয়েটের সার্ভিস দিয়েছিল অনেক দিন। তারপর কবে ইতি নিয়ে গিয়ে লাল চেলিতে মুড়ে লক্ষীর আসনে তাঁর পাশে বসিয়ে দিয়েছিল জানি না। প্রথমবার হাসপাতালে গেলে হয়তো। নারাণ শিলা। যেচে ঘরে এসেছে। প্রত্যেক দিন সকালে সেই শিলা আমার কপালে ছোঁয়ায় যখন, আমি জিজ্ঞেস করি, নারায়ণ কী হবে ? 

নারায়ণ বলে, হবে ? 

হবের কি কোনো মানে আছে ? 

নারায়ণ বলে, হবে। 

তোমাকে আমি গন্ডক নদীর বালি থেকে কুড়িয়ে এনেছি, নারায়ণ কী হবে ? 

নারায়ণ বলে, আনলি কেন ? 

রোদে পুড়তে শীতে কাঁপতে। 

নারায়ণ বলে, জন্ম থেকে তাইই তো হতো, কত বড় ছিলাম। 

নারায়ণ, আমার কী হবে ? 

নারায়ণ বলে, হবে। 

আমি তোমারে বালির ভিতর থেকে তুলে এনেছি। 

আনলি কেন ? 

তুমি যাতে ভালো থাকো। 

নারায়ণ বলে, ভালোই তো ছিলাম। 

ক্ষয়ে ক্ষয়ে ফুরিয়ে যেতে। 

নারায়ণ বলল, যেতে হয়, কত বড় ছিলাম, এখন কতটুকু হয়েছি। 

ইতি বিড়বিড় করে অনেকটা সময় ধরে। কী ঠান্ডা নারায়ণের গা। সব সকালে নারায়ণের সঙ্গে আমার দেখা হয়। ভগবান স্পষ্ট করে কিছু বলে না। কিন্তু একটা কথা বলেছেন, কত বড় ছিলেন। ওই নুড়ি পাথর, শিলা কি পাহাড়ের মতো ছিল? ক্ষয়ে ক্ষয়ে নারায়ণ হয়ে গেছেন। কথাটা আজ উনি বলেছেন। কথার মানে কি ? ছোট হয়ে ভগবান। সারাদিন ভেবেই যাচ্ছি। এখন নিঝুম দুপুর, কাশীপুরের এই রাস্তাঘাট এখন ঘুমোচ্ছে। বাসের শব্দও নেই। দুপুরের দিকটায় সব কমে যায়, বেলা পড়লে সব আবার শুরু হয়ে যায়। গান-বাজনা, খোল-কত্তাল, বাপের নাম, ঠাকুদ্দার নাম। দূরে কোথায় একটা ডাক পাখি ডাকছে। এই ডাকটা আমি চিনি। এই ডাকটা তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমি চোখ বুঁজে ডাক পাখির ডাক শুনলাম। তখন শুনতে পেলাম সিড়িতে ধপ ধপ আওয়াজ। খুব বড় থ্যাবড়া থ্যাবড়া পা, দশ কি বারো নম্বর সাইজ। বাটা কোম্পানিতে অর্ডার দিয়ে বানাতে হতো। কিন্তু দেড়শো বছর আগে তো জুতো পরার চলই ছিল না। মোরেলগঞ্জের চৌকিদার জুতো পরবে কী করে তার সায়েবের সামনে। সায়েব ছাড়া কেউ জুতো পরে না। ওদিকে বামুন বলতে আমার পিসে। খড়ম পায়ে পৈতে জড়িয়ে জপ করতে করতে তো বাঘ আটক করা যায় না। ডাক পাখিটা ডাকছে, মানে খবর দিচ্ছে মোহিনীদাদার বাবা, আমার বড় পিসে এসেছে। বাঘ এলে যেমন ফেউ ডাকে, পিসে এলে ওই পাখি ডাকে, ও মণি, ও মণি। ভগবান সকালে বলেছে, হবে। তার মানে ভালো হবে। বড় পিসে এসেছে যখন আমার এবার ভালো হবে। টাইগারের হাত থেকে আমি বাঁচব। সেই যে টাইগার এজাহার নিল তারপর থেকেই আমার সব গেছে। মাথার ভিতরে যা ঢুকে গেছে, তা আর সাফই হচ্ছে না। আমার বিপদের পর বিপদ। মনে হচ্ছে, আবার থানায় ঢুকিয়ে এজাহার নিতে পারে টাইগার। আসলে কিছুদিন ধরেই খোঁচড় লেগেছিল পিছনে। দমদম রেল লাইনের গ্যালোপিং শান্তিপুর লোকালের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার পর থেকেই খোঁচড় লেগেছিল। কে বাঁচায় বাঙালটাকে ? মেট্রোয় তো বাঁচার কথা ছিল না, কে বাঁচাল লোকটাকে ? সেই বাঙালটাকে। চাকরি খেয়ে, পরের অফিস বন্ধ করে দিয়ে, পি, এফ গ্রাচুইটি মেরে দিয়ে, কত চেষ্টা করা হলো, কে বাঁচায় ? তারপর নিশ্চয় ওরা খোঁজ পেয়েছিল মোহিনীদাদার বাবা, মোরেলগঞ্জের বড় পিসের। টাইগারকে খুঁজে আনল ইউ,পি, বিহার কোনো জায়গা থেকে, কিংবা বীরভূম, পুরুলিয়া থেকে। একেবারে বড় পিসে। বাঘ ধরা বড় পিসে। বড় পিসের যেমন ছিল, মর্তমান কলার সাইজের বুড়ো আঙুল, তার উপরে দশ কেজি সাইজের কাতলা মাছের আঁশের মতো নখ, মানানসই পায়ের পাতা, তেমনি। বড় পিসে কিছু করতে পারল না, আমার যা হবার হলো। মাথার ভিতরে ভীমরুলের চাক ঢুকিয়ে দিয়ে তারা মজা দেখছে। শালা, তোর বড় পিসে এসে বাঁচাক এবার। চাক কতবার ভাঙবি, সাফ করবি, আবার হবে। আবার। 

আমার কিন্তু আবছা ভরসা ছিল। যদি পারে মোরেলগঞ্জের সেই মানুষই পারবে। যদি এবারের মতো রেহাই পাই, বড় পিসেকে ওরা চিনে যাবে, আর আমার ক্ষতি করতে আসবে না। পারবে না। বড় পিসে আগুন দিয়ে মাছি তাড়াবে। আজ তোমার পরীক্ষা বড় পিসে। আমি এখন সেই ঈশ্বরীতলার বাড়ির হুলো বজ্জাতের মতো হয়ে গেছি প্রায়। পাখির ডিম খেতে বজ্জাত হুলোটা গাছে উঠেছিল, চাকে ঘা পড়তেই মৌমাছি ঘিরে ধরল, আমি কিন্তু লড়ে যাচ্ছি। সব বড় পিসে।আসলে তিনিই লড়ছেন। হারতে হারতে টিকে থাকছেন। বড় পিসে তো জানে না, পৃথিবী আর দেড়শো বছর আগের মতো নেই। রাইফেল, বন্দুক, অ্যাটম বোমা সব নিয়ে মানুষ তৈরি আছে, রাগ উঠলেই তাক করবে। না হলে আমি, তোমার ছেলে মোহিনীদাদার মামাতো ভাই, সাতে পাঁচে থাকি না, একটু ভালোবাসা নিয়ে ঘুরি, সঞ্চয় বলতে কানাকড়ি, আমার উপরেই এত রাগ! পুব দিকে জাপান বলে একটা দেশ আছে পিসে, তুমি যখন মোরেলগঞ্জে চৌকিদার, জাপানে তখন সূর্য ওঠে সবার আগে। তারপরে মোরেলগঞ্জে রোদ পড়ে, বরিশাল, পটুয়াখালিতে রোদ পড়ে, ভৈরবে সকাল হয়। তখন আমার বারো পেরিয়েছে, তোমার একশো দুই, আছ কি না আছ খবর পাই না, সেই বছরে ভরা শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে, তিন দিনের মাথায় মাথায় পরপর বোমার ভিতরে কোটি কোটি মৌমাছির চাক নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল দুই শহরে। নামতে নামতে চাক ভেঙে গিয়েছিল। আকাশ থেকে মৌমাছির বৃষ্টি নেমেছিল। কালো বৃষ্টি ! মনে হয় এক জ্যোৎস্নারাতে আমি তা দেখেছিলাম। অবাক হয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলাম। গহীন রাত। কালো বৃষ্টির ফোটায় ভিজে গিয়েছিলাম মনে হয়। মনে হয় সেই শুরু পিসে, আমি এইটুকু জানি, তুমি জান কি না,তা আমি জানি না, মোরেলগঞ্জে খবর যায়নি, কিন্তু আমার মাথার ভিতরেও মৌমাছি ঢুকে গিয়েছিল। মানুষেরই এমন হয়। আমার যা হয়েছে এত বছর ধরে, পি এফ, গ্রাচুইটি লুট, বেতন বন্ধ, সেই সব আবার মানুষই করেছে। তুমি আর কত ঠেকাবে পিসে ? তবে ঠেকিয়েছ তো বটেই। না ঠেকালে জাপানীরা বেঁচে থাকে কী করে ? ভিয়েতনাম বলে একটা দেশ আছে পিসে, তাকে বোমা মেরে মেরে শেষ করে দিয়েও শেষ করতে পারেনি, তুমি ঠেকিয়েছ বড় পিসে। ইরাক বলে আর একটা দেশ আছে বড় পিসে, তাকে শেষ করে দিয়েছে সায়েবরা। যুদ্ধ , বোমা, রাসায়নিক বিষ... মানুষ মরেছে যত বেশি, বেঁচেছে তার চেয়ে বেশি, তুমি ঠেকিয়েছ বড় পিসে। এই যে আমি বললাম, তুমি সব জান না। জান নিশ্চয়। নাহলে মৌমাছির চাক মাথায় নিয়ে যে আমি ঘুরছি, তুমি ছাড়া কে জানত ? সেই আমার দ্বাদশ যখন, তখন থেকে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে, এই বাঙালটাকে শেষ করে দাও, কিন্তু তুমি থাকতে উপায় নেই। 

এখন প্রায়ই তাঁর কথা মনে পড়ে। তিনিই পারেন। ডাক্তার এসেছিল পরশু সন্ধ্যায়, আমি ঘট হয়ে বসে আছি, ডাক্তারকে বললাম, মৌমাছির চাক দেখেছ ব্যানারজিবাবু ? 

কেন দাদা ? 

বলতে পারব না, মাছি ঘিরে ধরেছিল বজ্জাতকে, আমি লিখেছিলাম, যা লিখলাম সত্যি হয়ে গেল। 

ডাক্তার বলল, আপনি তো ভালো হয়ে উঠছেন। 

ডাক্তার, এই বাঙালটার পাশে যদ্দিন তার মোহিনীদাদারর বাবা আছে, পারবে না। 

ডাক্তার জানে না, মোহিনীদাদার বাবা বড় পিসের কথা। তবু কী মনে করে হাসল। হাসির ভিতরে মরা চাঁদের ভাব, শেষ রাতে যখন ডুবে যায়। ডাক্তার যদি জানত সব সাহস পেত। আমাকে স্তোক দিতে এসেছে জানি। কিন্তু আসলটা যে কে, কে রক্ষা করেছিল ভিয়েতনাম, হিরোসিমার মানুষকে, ইহুদিদের, ইরাকের মানুষকে, আচমকা চলন্ত মেট্রোরেলের দরজা খুলে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকা বাঙালকে ভিতরে টেনে এনেছিল কে, কে ভয়ানক বেগে ছুটে আসা গ্যালোপিং শান্তিপুর লোকালের লাইন বদলে দিয়ে বাঙালটাকে রক্ষা করেছিল, তা জানে না ডাক্তার। জানে না বলেই প্রেশার মাপছে, সুগার মাপছে, জিভ দেখছে। বাঙালের জীবন এতে নেই। সেই ১৯৪৫-এর ৬ ও ৯-ই আগস্টের মৌমাছি বৃষ্টি, কোটি কোটি মাছির কটা ঢুকে গিয়ে ঘুমতে লাগল ভিতরে, তারা এতদিনে চাক বেধেছে। মাথার ভিতরে বিজবিজ করে, কিন্তু এসব তো বলা যায় না। ইতি নারায়ণ শিলা কপালে ঠেকালে কিংবা মাদুলি বেঁধে দেওয়ার সময় বলি, তাঁরে ডাকো, যদি ডাকার মতো পারিতাম ডাকিতে, বড় পিসে মাছিগুলোকে তাড়াও। 

দুই 

ক’দিন ধরে তাঁর কথা খুব মনে পড়ছিল। পার্ক নারসিং হোম, ঠাকুরপুকুর হাসপাতাল, পিজি হাসপাতাল হয়ে আবার কাশীপুর। ইদানীং মনে হচ্ছে লোকটা নজর দিয়েছে। মোরেলগঞ্জের পিসে, মোহিনীদাদার বাবাই পারে আমার অসুখ সারিয়ে দিতে। দিচ্ছে। কেউ আসছে। বড় বড় পা। গরিলা নাকি। এই কাশীপুরে গরিলা কোথায় ? মোরেলগঞ্জে বাঘ ছিল, গরিলা পিসেমশাইয়ের পা দেখতে পেয়েছিলাম আমি। দেখে চমকে উঠেছিলাম। তাঁকে দেখা যেত এক বছর ধরে। যখন কেউ থাকত না, পিসেমশাই ঢুকে পড়ত। আজও তাই। ইতি ঘুমোচ্ছে, ললি চেম্বারে গেছে, সমীর ব্যাঙ্কে। মনে হচ্ছিল এবার সেরে গেল। পাখিটা ডাকছে। মণি, ও মণি। পিসেমশাই আসছে। এক দুপুরে এল। মোরেলগঞ্জ থেকে, দেড়শো বছর উজিয়ে এল বড় পিসে, আমার মোহিনীদাদার বাবা। সিঁড়িতে ধপ ধপ। গামা পালোয়ান কিংবা গোবর গুহ হয়ে বড় পিসে আসছে। আমার তো তাঁর মুখের দিকে তাকানোর উপায় নেই। তাকালেই ভ্যানিশ। আগে কয়েকবার হয়েছে এমন। যখন পা থেকে মাথা তুলেছি, কেউ নেই। আমি ঘাড় নিচু করে বসে আছি। সামনে দুটো পা কাদা মাখা। কাদা শুকিয়ে বুটজুতো-মোজা হয়ে গেছে। তাঁতের ধুতি অনেকটা তুলে পরা। গায়ে বুনো গন্ধ। বাঘের গন্ধ যেমন পেয়েছিলাম আলিপুর চিড়িয়াখানায়, তা থেকে আলাদা হয়েও আলাদা না। 

মণি ? বজ্র গম্ভীর গলা। ইতির না ঘুম ভেঙে যায়। 

একটু আস্তে, পিসে । 

মণি অনেক তো হলো। 

তুমি তো আছ পিসে। আমি মাথা নামিয়েই আছি। পায়ের পাতার দিকে চেয়ে আছি। 

আমার সব গোলমাল ঠেকেরে মণি, কতবার ছুটে ছুটে আসব ? 

তুমি না এলে এই মৌমাছি না ভীমরুলের হুল আমাকে সহ্য করতে হবে পিসে, কেটে সাফ করল, আবার হলো, আমার মাথার ভিতর খেয়ে নিচ্ছে পিসেমশাই। খুব আস্তে আস্তে বলছি। ইতির না ঘুম ভেঙে যায়। 

তুই কিছুই ঠিকঠাক করতে পারিসনে, হকের টাকা মেরে দিল কোম্পানি, কাজ চলে গেল, জমি-জমা ফেলে ঈশ্বরীতলা থেকে চলে এলি, তোরে আমি কতদিন চোখে চোখে রাখব মণি ? 

কী করব পিসে, আমার যে কিছুই ঠিকঠাক থাকে না, আমি যে এমনি। 

মোহিনীর বাতাস লেগেছিল তোর গায়ে, সে এল কেন এই দেশে, এসে আবার ফিরতেই বা গেল কেন ? 

আমি বললাম, জজমানিতে পাওয়া গরু নিয়ে মোরেলগঞ্জ যাবে বলে কালীঘাট থেকে রওনা হয়েছিল শুনেছি। 

জলখেতে পুকুরে নেমে গরু মরল, সে-ও, পুকুরে জল ছিল না। 

হ্যাঁ পিসে। 

বোকার হদ্দ, গরুর বদলে টাকা ধরে নিতে পারত, সেই টাকা দিয়ে জমি কিনতে পারত ঈশ্বরীতলায়, ধান ছড়ালেই ধান, ভগবানের মাটি। 

আমি চুপ করে থাকি। চাষাবাদের কথা ভুলিনি এখনো। মাজরা পোকায় খেয়ে নিল সব। ফেলেই এলাম অনেক লোকসান দিয়ে। পিসে বলল, তুই নিজেরটা গুছোতে পারলিনে মণি, জমি বাড়ি সব খোয়ালি, নিজের বলতে কিছুই নেই, আর আমি চৌকিদারি করে দেড়শো বিঘে আবাদ জমি, তোদের তো এমন হবে। 

আঁজ্ঞে। 

মোরেল সায়েব আমারে টাইগার বলে ডাকত, টাইগার ব্রাহ্মিন, টাইগার বামুন, সায়েব ছিল মালিক, কোন পশ্চিম থেকে এসে বনবাদাড় জরিপ করে আবাদ শুরু করল, সায়েব আমারে কী ভালো না বাসত, আর তুই তোর ঈশ্বরীতলা ছেড়ে এলি। 

নেশা কেটে গিয়েছিল, মনে হয়েছিল জীবন তো একটা, আর কিছু করি, আর বলতে পার যা ধরি রাখতে পারি না কিংবা চাই না, আমি মোরেল হতে হতে হতে চাইনি, আমার মাথার ভিতরে মৌমাছি বিজ বিজ করে, তুমি বোঝ পিসে। 

কেন যে ঐ মাছি বৃষ্টির ভিতরে বেরুলি মণি, আমার জন্ম ১৮৪৩, আমার যখন দুবছর, মোরেল সায়েব এল পানগুচি আর বলেশ্বর গাঙের ধারে, কোথা থেকে কোথায় এল, তুইও ঈশ্বরীতলায় গিয়েছিলি মোরেলগঞ্জের সায়েবের মতো, কিন্তু পারলিনে মণি, মোরেল ভাইরা নীলচাষ আরম্ভ করল বন সাফ করে, বাজার বসাল, নারকেল সুপুরির বাগান করল, বরিশাল, খুলনা থেকে লোক এল চাষ করতে, আমারে দিল চৌকিদারি, মণি তোর ভিতরে মোরেল সায়েবের গুণ ছিল, কিন্তু তুই সব ছেড়ে এলি। তোর কুঠিবাড়ি দেখলে আমার চোখে জল আসেরে, পড়ে আছে একা একা, তোর এমন ভাগ্য কেন, চাকরি থেকে বসিয়ে দেয়। 

আমি ভাবছি টাইগার স্যার। টাইগার। তাহলে কি সত্যিই...। সেই টাইগার। অব তেরা কেয়া হোগারে কালিয়া, শোলের ডায়ালগ, হামি পিসেই আছিরে। বুঝতে পারি না। ভয় লাগল। বললাম, বসিয়ে দেয়নি পিসে, কোম্পানি তুলে দিয়ে টাকা পয়সা ভাগ বাটোয়ারা করে নিল শরিকরা। 

তোরে বসায়নি, সত্যি বলছিস ? 

হ্যাঁ পিসে। 

আমি তা’লে ভুল শুনেছি ? 

তার আগের কোম্পানির কথা শুনেছ। আমি কোনো রকমে বললাম। এই টাইগারকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই। কলকাতা শহর পর্যন্ত জানে কী হয়েছিল। 

অথচ মোরেল সায়েব আমারে চোখে হারাত না। পিসে বলল, কাম টাইগার, যাহারা রেভিনু আদায় ডিবে না, উহাদের পাকড়াও করা টোমার কাজ, চোকিদার। 

আমার দুর্ভাগ্য পিসে, আমি কারো চোখের মণি হতে পারিনি 

আমাকে তোর ভার নিয়ে চলতেই হচ্ছে, দেড়শো বছর উজিয়ে ফেরা কি সহজ ? 

আমি কী বলব ? ১৮৪৩ এ পিসের জন্ম। ১৮৪৯ এ মোরেল ফ্যামিলি এসে নোঙর করল সেই আবাদ অঞ্চলে। ১৮৫৭-র সিপাই বিদ্রোহের খবর অত দূর পৌঁছল না। পিসে অতদূর অন্ধকার থেকে এই ২০০১-এর জুনের শেষে আমার মেয়ে জামাইয়ের ফ্ল্যাটে হাজির। আচ্ছা, দেড়শো বছর আগে মানুষের চেহারা ছিল কেমন। মুখখানা কত বড়, চোখ কেমন ? আদিম মানুষ ছিল গরিলার মতো। মোরেলগঞ্জের দেড়শো বছর আগের বড় পিসেমশায় কেমন ছিল? আমি মাথা তুলতেই ভ্যানিশ। বড় পিসে দেখা দেয় না। 

তিন 

আমার তবু চলছিল। পিসে চালিয়ে দিচ্ছিল। কোম্পানি সব মেরে দিয়েছে, তবু আমার চলে যাচ্ছিল। খবরিয়া হয়েছিলাম। গাঁ গঞ্জে গিয়ে হাটবাজারের খবর নিয়ে আসতাম। খবর বেচে দুজনের সংসার চলত। সেই যে থানা থেকে ফিরলাম, তারপর কী হয়েছিল জানি না, দু’মাস বাদে টের পেলাম ঘুম নেই। ঘুম আসে না গো। ঘুম আসে না। অস্থির লাগে। থানায় গিয়েছিলাম বুড়ি রুকসানা বিবির ভুট্টার দাম আনতে। সে ফুটপাথে বসে তোলা উনুনে ভুট্টা পোড়ায় আর বেচে। এক ডজন করে ভুট্টা রোজ নিয়ে যায় থানা, দাম দেয় না। আমি তো জানি, আমার কিছু হবে না। বড় পিসে আছে। রুকসানার পাওনাটা আদায় করে আনি। অভিযোগ করতে গিয়ে মেজবাবুর হাত থেকে টাইগারের হাতে। আছাড়। হাজতে না ঢুকিয়ে বেরিয়ে আসতে দিয়েছিল বটে, কিন্তু সেই লোকটাকে, যার কথা আমি লিখেছিলাম বড় পিসে, তাকে এমন মেরেছিল যে ঘা পড়ে গিয়েছিল ১৯৪৫-এর সেই মৌমাছির চাকে। পুজোর আগে আগে এক দুপুরে ফোন এল জামাইয়ের, কেমন আছেন ? 

এস একবার, মনে হচ্ছে তোমাদের সঙ্গে সব হিশেব এবার চুকিয়ে ফেলতে হবে, আমি আর পারছি না সমীর, বড্ড কামড়, পার তো আমাকে দেখে যাও। 

সমীর শুনতে পেল কি না জানি না, চলে এল বিকেল বিকেল। তারপর ডাক্তার, ওষুধ, টালিগঞ্জ থেকে কাশীপুর আসা, তারপর ঝড় চলছে। আমার দিন শেষ হতে হতে যে হচ্ছে না, তার কারণ সেই লোকটা। আমার কাছে প্রায়ই আসে। দুপুরে। ইতি, সমীর, ললি, কেউ জানতে পারে না। এর ভিতরে নারসিং হোম, হাসপাতাল করতে হয়েছে। আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে খেয়াল করেছি বড় পিসের ছায়া পড়েছে আমার গায়ে। তখন নিশ্চিন্ত হয়েছি। পি জি হাসপাতালেও যখন সবাই আমাকে ফেলে চলে গেল সন্ধে হতে, তখন ভয় করত, বাইরে কত পাখির ডাক, কিন্তু ঘরটা এত চুপচাপ। জঙ্গলে এমন হয়। তখন পিসে এসে দাঁড়ায়, মণি। 

আমি পাশ ফিরে শুয়ে আছি। পিঠে বড় হাতের পাঞ্জা। আমার চোখে জল, পিসে আর ভালো লাগে না। 

আমি দেখতিছি মণি, দেখতিছি কতটা কী করতে পারি, থানায় ঢুকার আগে আমারে ডাকিসনি কেন? 

থানায় ঢুকেছিলাম কি ঢুকিনি সবই এখন ধন্দ লাগে, হয়তো ভেবেছি অমনি, কী যে আমার হয়, এ দানিতে কবিতা বিমল মানসদের কথা খুব মনে পড়ে, তারা কেউ নেই। কতজন নেই! কিন্তু থানায় না ঢুকলে কালো মাছির চাক এল কোথা থেকে ? আমি বললাম, পিসে তুমি আমার সঙ্গে থাক। 

জবাব পাইনি। ঘুম ভাঙতে সকাল। এরপর আবার কাশীপুর। আষাঢ় গিয়ে শ্রাবণ এল। আমার নাকি এতদিন টিকে থাকার কথা না। এই অসুখে অতদিন টেকে না মানুষ। আশ্বিন মাসে রোগ ধরা পড়ল, চৈত্র কি বৈশাখে ফাইনাল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমি টেনে চলেছি। হয় না, এমন হয় না। জ্ঞান-অজ্ঞানে ডাক্তারের কথা শুনেছি আমি হাসপাতালে। সিস্টারকে বলছিল। ললি সমীর তা জানে ? মলি তুষার কিংবা ইতি ? ওরা জানে না, আমি জানি। জানি আমি লড়ে যাচ্ছি। আমি না, আসলে তো বড় পিসেমশায় সেই মোরেলগঞ্জ থেকে কলকাতা এসেই যাচ্ছেন। আমাকে তিনি আটকে দিয়েছেন। ডাক্তারের কথা মিথ্যে প্রমাণ করেই ছাড়বেন। অতবড় মানুষ, অমন পা, অমন উরু, বুঝে নিতে পারি কতখানি পেট, কতখানি চওড়া বুক, কাঁধ। গোয়ালে ঢোকা রয়াল বেঙ্গল টাইগারকে কম্বল চাপা দিয়ে ধরে, মুখে গামছা ঢুকিয়ে দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে যে লোক মোরেল সায়েবের কাছে নিয়ে যায়, হুজুর দেখুন, সেই লোকের কাছে মৌমাছি, ভিম্রুলের চাক তো মিথ্যে। 

আমি জ্ঞান হারাই, কষ্টে বেঁকে যাই, আবার উঠে বসি। আশ্চর্য ব্যাপার, এই লোকের এতদিন থাকার কথা নয়। ধান গেল, জমি গেল, বাঙালের কুঠীবাড়ি গেল, গরু বাছুর, কুকুর, বেড়াল, হাজরা, বজরা সব গেল, চাকরি গেল, গাড়ি গেল, কোম্পানি উঠে গেল, তবু বাঙালকে জব্দ না করতে পেরে শেষে এই। মাথার ভিতরের চাকে ঘা দিয়েছে। চাক নয় যেন তেজস্ক্রিয় ভস্ম, বারুদ। ঠেসে দিয়েছে আঙরা, এবার তুই বোঝ। বড় পিসেমশাই শুধু আমাকে ভালো করে তুলছে, আবার যেই তিনি মোরেলগঞ্জে ফিরে যান, তারা আসে আবার। জাগিয়ে তোলে হুল আর বিষে ভরা মাছিদের। পুজো আবার আসছে। ভাদ্র মাস গেলেই ঢাক বেজে উঠবে। বড় পিসের সেই বলেশ্বর, পানগুচি নদীর চর শাদা হয়ে গেছে কাশের বনে। পিসে এক দুপুরে এসে ঘুরে গেল। ভালো আছিস মণি, এ যাত্রায়ও ওরা হেরে যাবে। যাবেই। সকালে ইতি যখন নারায়ণ শিলা কপালে ঠেকাল, নারায়ণ বলল, আমিও পারতাম না মণি। 

তুমি তো ভগবান হয়ে গেছ, তাও বলছ ? 

মণি, আমার উপর কেউ আছে মনে হচ্ছে, তোর তো এতদিন থাকার কথা না। কী নরম গলা গন্ডক নদীর চরের শিলার। 

বড় পিসেমশায়ের কথা বলব বলব করেও চুপ করে গেলাম। কাউকে বিশ্বাস নেই। আমি বেশ আছি। বন্ধুরা দেখতে আসে, বন্ধুরা ভালোবাসা দিয়ে যায়। বেশ আছি। মাথার ভিতর থেকে সব সাফ করে দিয়ে গেছে মোরেলগঞ্জের মানুষ। তখন সেই ভাদ্রমাসের এক রাত্রে ললি ডাকল সমীরকে, দেখে যাও। গলার আওয়াজে ভয় মিশে রয়েছে। খুব ভয়। 

কী হয়েছে ? 

দেখে যাও কী হয়েছে ? 

আমার মাথার ভিতরে আওয়াজ শুনলাম। গুনগুন, গুনগুন, বিজবিজ বিজবিজ করছে কোটি কোটি মৌমাছি। তারা জন্মাচ্ছে। ক্রমাগত জন্মাচ্ছে। ও ললি, আমার কষ্ট হচ্ছে। আবার। বড় পিসেমশাই, তুমি এস। মোহিনীদাদা খবর দাও তোমার বাবাকে। সন্ত্রাস, সন্ত্রাস, কত মানুষ মরে গেছে গো... পাশের ঘরে সকলে ভয় পেয়েছে, ললি, সমীর, ইতি, ওদের মেয়ে। হায় হায় হায়। আমি পাশ ফিরতে চেয়েও পারি না। বজ্জাতের দশা হয়েছে আমার। ঘিরে ধরেছে মাছির দঙ্গল। তারপর জানি না। শুধু ডাক শুনলাম, মণি। 

এইটা ২০০১ সাল। ভাদ্র মাসের শেষের দিক। মানে ইংরিজি সেপ্টেমবর চলছে। ১১ তারিখের পর থেকে বড় পিসেমশাই হাজির। মোরেলগঞ্জের টাইগার। মণি মণি। 

তুমি হেরে গেলে পিসে, খুলনা যাব ভেবেছিলাম, হলো না। 

মণি আমি চেষ্টা করছি, দেড়শো বছর পিছন থেকে এসে কিছু করা যায় না,আমার সঙ্গে না পেরে এমন কান্ড ঘটিয়ে দিল। 

একেই বলে যুদ্ধ। বড় পিসের সঙ্গে তাদের যারা আমাকে শেষ করে দিতে চায়। একেই বলে যুদ্ধ, হাজার হাজার মাছিতে ছেয়ে যাচ্ছে জগত। চাক থেকে বেরিয়ে পড়েছে তারা। দুটো টাওয়ার ভেঙে পড়ল। তারপর যা হবে জানি, টন টন বোমা নিয়ে আকাশে উড়তে লাগল বোমারু বিমান। মাথার ভিতরে তারা শব্দ করে উড়ে আসছে কান্দাহার কাবুলের পথে। আকাশ থেকে নামছে হিংস্র ভীমরুল, মৌমাছির দল। মোরেলগঞ্জ আর কতদূর ? পিসে গো নিজেকে রক্ষা করতে ফিরে যাও দেড়শো বছর পিছনে, মোরেলগঞ্জের গাঙ পাড়ে। 

ভাদ্র মাস চলে গেছে। আশ্বিনের ৭ দিন হয়েছে। সকাল না রাত্রি জানি না, দুপুর না গোধূলিবেলা জানি না। বড় পিসে ডাকল, মণি। 

পিসে আমার কী হবে ? 

মণি, আমি আর দেড়শো বছর আগু পিছু করতে পারছি না, তুই আমার সঙ্গে চ, কুঠীবাড়িতে থাকবি। 

সেই থ্যাবড়া দশ--বারো নম্বরি পা, মর্তমান কলার সাইজের বুড়ো আঙুল, দশ কেজি কাতলার আঁশের মতো নখ, আমি উঠে বসতে লাগলাম। পিসে হাত ধরছে। আমাকে নিয়ে ভৈরব পেরিয়ে মোরেলগঞ্জে পাকাপাকি ফিরবে বলছে। এই পৃথিবীতে থাকা যায় না। আকাশে বোমারু বিমান। কিন্তু আমার আর ভয় নেই। এবার পিসের মুখ দেখতে মানা নেই। হাত ধরে ফেলেছি। ভ্যানিশ হতে দেব না। ও বড় পিসেমশাই ! এদিকে ফেরো। তাকাতেই দুমড়ে যাওয়া শরীর ঝটকা মেরে উঠল। স্থির হয়ে গেলাম। সামনে আয়না মেলে ধরেছে কে ? এ যে আমি। যেন আয়নায় শ্যামল বাঙালের মুখ দেখছি। আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ও বড় পিসে ? বাঙাল আমাকে ডাকল, আয় মণি, মোরেলগঞ্জে যাই। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন