মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

শামীম আজাদের গল্প: বাংলা প্রজেক্ট

বাংলায় রাত ন’টা থেকে অন্তত তিনটা চারটা পর্যন্ত রাতই।কিন্তু ইংলিশ ভাবনায় রাত বারোটার পর থেকেই সকাল।সবই আর্লি মর্নিং। শুভ মোবাইলে সময় দেখেই ফেইসবুকেরপাতাটা স্পর্শ দিয়ে মুক্ত করে দেখে তার কাঙ্খিত সবুজফুট্‌কিটি উঠেছে কিনা।
গোলাকার বৃত্তে সে মুখচ্ছবি জেগেগেছে কি না। তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই তার মিউট মোবাইলপ্রেম কাতর পোকার মত কাঁপতে থাকে।।তির তির মিরমির…পিন্‌ পিন্‌ পিন্‌।

আছে আছে! সজাগ আছে। অথবা সজাগ হয়েছে। হয়বাথ্রুম যেতে নয় জল খেতে না হয় আসলেই মোবাইলেরম্যাসেজ চেক করতে। ফোনটা কানে লাগাতেই ঘুম জড়ানোঘুমতি নদী থেকে জল এসে শুভর কান ভিজিয়ে দিয়ে যায়।

গুড মর্নিং। 

সে মুখে কোন উত্তর করে না। কিন্তু মনে মনে করে হাজার বার আর আই ফোনটি আঠার মত কানে লাগিয়ে রাখে।ফোন তপ্ত করে ডাহুক ডেকেই যেতে লাগলো আর আব্ছা্রগলার স্বর আব্‌ছা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো। এবারবাংলায়।

সুভ সকাল সুন্দর শুভ। যেনো ম্যানহাটনের পূর্বী নদীর পাড় থেকে, ডকল্যান্ড থেকে ডাহুক ডেকে উঠেছে। তার দাদাবাড়িসিলেটের শ্রীরাই নগরের ডাহুকের মত শুভর পুরো মনেরগ্রাম বাংলায় ভিজিয়ে দিল ঐ বাংলা। আ...। মেয়েটি এমন করে বললে ছেলেটির কি যে করে সে আর তার ঈশ্বর জানেন। ওর কণ্ঠস্বর এখন অনেক তাজা লাগছে! চন্‌মনে।

নিশ্চয়ই।সুভ স কাল আব্‌ছা। বাহ্‌। এবার মনে হচ্ছে দূরের ঐ করাইল বস্তির উপরের ঐঘোর অন্ধকার কম্বল ঠেলেআলো এসে গেছে।আর সত্যি সকাল হয়েছে। 

কি বল এসব, একটু বুঝাওতো। 

তোমার বাংলা শুভেচ্ছায় পাকা চেরীর মত করে আমার ভোর ফুটে উঠলো। মনে হচ্ছে লাল চেরীর ছোট্ট সবুজ শলাকা মত ডাটাটি ধরে আলতো করে ঘষে দিই তোমার ঐপিচ্ছিল ও গোলাপী কুয়াশার মত গালে। তোমাকেও সুপ্রভাত সুন্দরী ।

এটাতো আরো হার্ড করে ফেল্লি। তবে জিস্ট বুঝেছি। ওকে, দ্যান লেট মি সে শুভ বিকাল এ্যাজ ওয়েল।! 

মানে কি ! এই ভোরে?

আমি কথা বললেই যদি এমন সব এ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যায় দেখতে চাই শুভ বিকাল বললে তুই বলিস কিনা আমিবিউটিফুল বিকাল এনে দিলাম।হা হা হা। এত হাসতে থাকে আব্‌ছা যে শুভর চিন্তা হয় ওর বাড়ির লোকজন নিয়ে। কি বলবে এ্যাই শুভ, বাপ্‌ শোন্‌। ইট রিয়েলি ইজ ভেরী চিজী। 

কি?কি জিজ্ঞেস করলেও আব্‌ছা এই কি’র উত্তরে কি বলতে পারে তার একটা ধারনা তার হয়েছে গত তিন মাসে। এবং তাই হল।

এই যে ; আমি এই করলাম বল্লে তোর ঐ হয়ে যায়। আমি সেই বললে তোর এ্যানাদার থিং হয়ে যায় এগুলা … । আই হেইট দিস কাইন্ড অব পুতু পুতু প্রেম। শুভ এসব উত্তর জানতো তবু দমে যায়। দাড়ির ফুস্কুরিতে চুল্কায়। নির্ঘাত মশার কামড় থেকে এটা হয়েছে। কিন্তু তক্ষুনি শুনতে পায় মোবাইল ছাড়িয়ে মেয়েটির হাসির শব্দ আসছে। সে আস্বস্ত হয় আসলে মেয়েটির এসব কথা ভালই লেগেছে। না হলে হাসছে কেন।

না আব্‌ছা আমি কিছুতেই বিউটিফুল বিকাল বলতাম না।বরং বিকেল এলে সকালের এই মিষ্টি মেয়েটার সঙ্গেকথোপোকথনের কথা ভাবতাম। কিন্তু ঐ যে কিছু বাজেবাজে শব্দ বল্লে তাতেইতো দিলে সব নষ্ট করে। বলে ছেলেটিএকটু দম নেয়। ভেবে নেয় যা বলবে বলে ভাবছে তা বললেফলাফল কি হবে। তারপর বেশ সময় নিয়ে না হেসে বলে,দুঃখিত বাজে শব্দ না ভুল বলেছি। যা বলতে চাই তাহ’ল,দুটো সুন্দর ভাষাকে ওভাবে একত্রে গুলিয়ে বললে কোনটাই আর সুন্দর থাকে না। তাদের চরিত্র খন্ডিত হয়ে যায়। আর আমি কেন এমন করে কথা বলি কেনো?আমি না প্রেমে পড়েছি! আমিতো আমার জানা শোনা পড়া সব মিষ্টি কথাই এখন বলবো! সেটাই স্বাভাবিক না?

এখন যে কথাটা শুভ বলতে পারেনি তাই এবার মনে মনে বলতে থাকলো,’ ওহে আব্‌ছা নামের রহস্যময়ী বালিকা তুমি যখন বাংলায় শুভ সকাল বললে মনে হল তোমার অপরূপ ঠোঁট জোড়ার খয়েরী রেখা দেখলাম। তোমার ওই শুভ্রগজদন্তের ঝিলিকে মিসেল্টোর মনি দেখে ফেললাম। আর সেই কর্ণওয়ালের ক্যাম্পিং এর সময়ের ক্রিসমাস এর কথা মনে পড়ে গেল। শুনবে তার গল্প?
এ্যাগেইন? এসব সুগার কোটেড ডায়লগ নে ফেরত নে। না হলে সিওর তোর প্রেম টিকবে না। আর সুইট হার্ট বল্‌না এতআর্লি মর্নিং এ তুই জেগে কেনরে? এবার শুভ হাসে।আসলেআমি সন্ধ্যা ন’টা থেকে একটানা ঘুমিয়ে উঠেছি এই এখন।

এবার তার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে চা খাবে আব্‌ছা? আমিদু’কাপ বানাচ্ছি। ক’চামুচ চিনি? কারণ শুভর এখন আব্‌ছার সঙ্গে খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এসব না বলেছেলেটি মশারি একদিক তুলে মোবাইল হাতে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে কিচেন স্পেস এর দিকে এগিয়ে যায়। হাল্‌কা ফিরোজা চেক চেক শর্টস আর ভি নেক্‌ড সাদা সূতী টি শার্ট পরা। টি শার্টের হাতাটা তার জিম করা বাহুতে সেঁটে আছে। সেদিন চা’ওয়ালায় কথা বলতে বলতে এদিকেই তাকাচ্ছিল আব্‌ছা। 

জল ভরে কেটলির সুইচ টিপে দিতেই কেটলির ভেতরে একটা হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল। বনানীর ছোট্ট এই এক বেড্রুম ফার্নিশ্‌ড ফ্ল্যাটে তার সঙ্গেতো আর কেউ নেই। তাই যে কোন রকম শব্দ তার তৈরি করতে বেশ লাগে। এমনকি মশা মারার ব্যাট দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে ব্যাটের বিদ্যূতে মশা মরার শব্দও। শুনেছে ঢাকার নগরপাল আনিসুল হক মারা যাবার পর নাকি এই এ্যতো মশা। শুভ এই মশা মারাটা একটা প্রজেক্ট হিসেবেই গন্য করে। দৌড়ে দৌরে মশার সঙ্গে যেন সে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করে। এসময় সে বিটোভেন বা ভিভ্যালদি ছাড়ে। আর লড়াইএ মশক কূল হারিয়ে তাদের ফিন্‌ফিনে মৃতদেহগুলোর গুনন শেষে সে সংবাদ এ মেয়েটিকে দিলে সে বলে ইউ আর এ্যামেজিং শুভ। মেয়েটিযখন হাসে তখন নিজেকে বাইবেলের বীর মনে হয়।

চা নিয়ে এক্টু গলা খাকারির মত একটা শব্দ করে শুভহাতের মোবাইল সেট টার দিকে তাকায়। একটা বৃত্তের মধ্যেআব্‌ছার অবয়ব। ওর কথার সঙ্গে সঙ্গে ফুটকির মত নড়েনড়ে উঠছে।

এত যে আকর্ষণ বোধ করে এই মেয়েটার প্রতি তা সে বলতেই পারবে না! যেন মেয়েটির মাথা মুখ চোখ ললাটচিবুকের নিচে টানের চুম্বক। যেনো মেয়েটি ঘোলা মনু নদেরজল-বিদ্যূত ঘূর্ণ্ন। যেনো লবন দিয়ে আমলোকি খাবার পরমুখের মিষ্টি জল্কুন্ডল। আর এটা প্রথম দেখাতেই হয়েছে।

সেদিন বিয়ের দাওয়াতে তার হাঁসফাঁস লাগতেই আলোকমালায় মোড়া উৎসব মঞ্চ ছ্রেড়ে একটু বেরিয়ে এসেছিলশুভ। সুইমিং পুলের পাশের ছিল কয়েকটি মেয়ে। সবারমধ্যেই আব্‌ছাকে দেখার পরই বনি এ্যাম’র গানের ‘শিলুক্‌স লাইক সুগার ইন দ্যা প্লাম’ মনে হয়েছে। কি ঘনসোজা রাজশাহী সিল্ক চুল। গায়ের রঙ ঘন শাঁওতাল। আরনাকে নথ্‌।

তারপর নিজেই আলাপ করে নিয়েছে। এসব কাজে কারো জন্য বসে থাকতে হয় না। সেদিনের সেই প্রথম আলাপেরকথা মনে হলেই কি যেন হয় তার, যেন জ্বর এসে যায়।দাঁড়ির বাঁদিকের ফুশ্‌কুরির চুলকানো থেমে যায়। টিশার্টেরঘারের কাছে লেবলের খচখচানো থেমে যায়। খালি ওরমুখায়বয়বের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা হয়। ঘরের হাল্কা আলোয় মোবাইলে মেয়েটির মিষ্টি মোরব্বা কচকচে মুখটারসঙ্গে বাংলায় লেখা আছে ওর নাম। আব্‌ছা। অবাক লাগেএত কি করে মানুষের প্রকৃতি ও নামের মিল হতে পারে।মেয়েটি কেমন অস্পষ্ট, কেমন যেন সুদূরের, একটাপ্রহেলিকা, একটা অদ্ভূত যৌনতা যেন তার দেহ চুইয়ে পড়ে।এছাড়া সারাক্ষণই আব্‌ছা তাকে নানান চ্যালেঞ্জের মধ্যে,উত্তেজনার মধ্যে রাখে। বার বার নিজেকে প্রমান করতেওতার মন্দ লাগে না। সে ঝরে যেতে চায়না। মনে মনে সেজানে আব্‌ছাও তাই চায়। কিন্তু এই যে কি সব ভাষা বলেমেয়েটি যে রাগ ধরে যায়। তাই মনে মনে বলে আমার এপ্রেম না টিকলে টিকবেনা এই তুই তোকারীর জন্য । তারপরমনে পড়ে যায় এটাইতো তার নতুন প্রজেক্ট।

বিয়েতে দেখার পর তাদের প্রায়ই ফোনে কথা হত। হয়। এইআজকের মতই। একদিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল,শোনো আব্‌ছা সেই বাংলা বইটার কথা আবারো বলি,আফসোস তুমি পড়লেনা। কত সুবিধা তোমাদের,বাংলাদেশে থাকো, এখানে বইমেলা হয় বাংলা বই পাও।

আই নো তুমি বিদেশে কষ্ট করে বাংলা শিখেছো। কিন্তুতুমিওতো পাও, অনলাইনে পাও না? 

পাই। যাহা চাই তাহা পাই না। 

প্লিজ রিমাইন্ড করনা কি যেন টাইটেল ঐ বইটার? যেইটা তুমি আমাকে বরো করতে দিয়েছো।

বিমল করের বালিকা বধূ। উপন্যাস।

জটিল! বেসম্ভব একটা নভেল! লিসেন শুভ, পড়েছি মানেআই ট্রাইড। এ্যন্ড আই ক্রাইড।

পড়েছো? কেঁদেছ বাহ্‌। জানো ওটা পড়েই না আমার বিয়েরইচ্ছে হল। এর আগে বিয়ে নিয়ে ভাবতামই না। আর একটাবাংলাদেশের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করার ইচ্ছাজাগল।

শুভ তাকে এ বই পড়া শুরুর গল্পটাও বলেছে।এইতো বছরখানেক আগে নিউহ্যাম লাইব্রেরীতে বিবিসি করছিলোওয়ার্ল্ড ল্যাংগুয়েজ ডে। সেখানে কবি শামীম আজাদেরপরিচালনায় বিজয়ফুল পরে বাংলাদেশের কবিতা পড়ছিলোকিছু ব্রিটিশ বাংলাদেশী কবি। সেখানেই অনেক দিন পর দেখা হয়ে গেছিল তার মার্লব্যারী স্কুলের জিসিএসসি’র সেইসময়ের টিচারের সঙ্গে। কত দিন পর! তাকে দেখে অবাকহয়ে গেছিলেন তিনি। শুভ, তুমি এখনো দেখছিবাংলাদেশের, বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহী। বাহ্‌। খুব খুশিহলাম।

বিলেতের এ্যাকিউএ্যা’র বাংলা কারিকুলাম অনেকটা ফ্রেঞ্চবা স্পানিশ বা জর্মনের মতই।ঐ পরীক্ষা পাশ পর্যন্তই। এরপর শুধু প্যারিসে বেড়াতে গিয়ে দরকারমত ফরাসী ভাষারচেষ্টা করা। কিন্তু আরো যে ফ্রেঞ্চ সিনেমা দেখা বা বইপড়া তাকেউ করেনা। শামীম আজাদ, এই ডলি ইসলাম এরা তারমা’র বন্ধু ছিলেন। মিস তার হাতের মুজতবা আলীরগুরুদেব ও শান্তি নিকেতনের দিকে তাকান।

আরে তুমি দেখছি এখনো বাংলা বই বরো কর। খুশিহলাম। তোমাকে নিয়ে আমি অনেক গল্প করি। আচ্ছাতোমার বাবাকি রিটায়ার করেছেন? মা? সে সব গল্প করতেকরতেই শুভ দেখেছিল। ডলি ইসলাম তেমনি মধুর করেহাসেন, শাড়ি পরেন, কপালে টিপ। তার কাছ থেকেই সেদিনআবার কিছু বইর নাম সে নিয়েছিলো।

তখন মাত্র একমাস আগে তার পোস্টিং হয়েছে সে ক্যানারিওয়ার্ফ এইচএসবিসি ব্যাংকে। মা মারা গেছেন। বাবা রিটায়ার করে বাংলাদেশে গ্রামের বাড়ি শ্রীরাই নগর চলে গেছেন। একটা ভাই কিংবা বোন নেই যে তার কাছে যায়।সারাদিন পৃথিবীর অত্যাশ্চর্য সব ঘটনা, ব্রেক্সিটের পর দেশের পরিস্থিতি এসব নিয়ে থাকলেও বাংলা বইর জগতেঢুকে পড়তো সন্ধ্যায়, ব্রেকে, ট্রেন জার্নিতে।বিমল করের বালিকা বধূ পড়ে ছেলেটি সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে শুরু করে।উপন্যাসের শেষের দিকে পরিণত যুগলের অসহায় শেষঅবস্থায় তার মন ভারি হয়ে যায়। তখন তার মনটা গল্পেরবুড়োবুড়ির জন্য এমন খারাপ হয়ে যেত যে এমনকি ব্রেকেঅফিস থেকে বেরিয়ে মিউজিয়ামের ব্রীজের কাছে বই হাতে বসে থাকতো। হাতের না খোলাই থেকে যেতো এ্যাভাকাডোস্যান্ডুইচ। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো নানান ভিনজাতি যুগলের আসা যাওয়া। জলেরদিকে তাকিয়ে বাংলাদেশেরঅতল খুঁজতো। জলের পারদ ফেটে উঠে আসতো ডকল্যান্ডডাহুকের ডাক।

বালিকা বধূর গল্পটা এমন যে অনেক কান্না লাগে তাই না?

না…! প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল আব্‌ছা। আমি কান্নাকরেছি বিকজ এত হার্ড বাংলা পড়া… আমি আম্মাকেরিকোয়েস্ট করেছিলাম হেল্প করতে। শুভ, ফানি থিং হলআম্মা দেখি পড়ে আর হাসে। আবার ইট্টু পড়ে আবার ইট্টুহাসে। কয়েক পেজ পড়ে জিজ্ঞেস করে কে আমাকে এটাপড়তে দিয়েছে? আমি বললাম, একটা স্টুপিড ইডিয়টলন্ডনে ছিল এখন ঢাকায় সে। তখন মুখে একটামিস্‌টেরিয়াস হাসি নিয়ে উঠে চলে গেল। আমি বললাম, হোয়াট আম্মা! হোয়াট?

তো খালা কি বললেন?

বললেন এবার নাকি আমি মানুষ হবো। আমি আম্মারকথাতো আন্ডারস্ট্যান্ড করলামই না আর বুঝলাম না কিএত ফানি আছে বইটায়! আচ্ছা ঐটা ঐ বইটা কেন পড়তেদিলি?

প্লিজ ‘তুই’ না।

আমার সব ফ্রেন্ডরা তাদের বয়ফ্রেন্ডদের তুই করে বলে। আরআর তোর মত ফাজিলকে ‘তুই’ বলবোনাতো কি বল্বো। তুইতুই তুই … আমার কিউট সুন্দর ফাজিল ফইটক্যা তুই!

আব্‌ছার কথায় এত হাসি এসেছিল শুভর যে কি বলব! ওরমনে হয়েছিল- আজব! বাংলাদেশে, নাকি শুধু ঢাকারমেয়েরাই এমন হয়ে গেছে। নাকি সে ই বেশি প্রাচীন? 

সেদিন বনানীতে চা’ওয়ালাতে গিয়েছিল। শুভ আইস্ক্রিমনিয়েছে আর আব্‌ছা নিয়েছে কি একটা বাবল গ্যাম ড্রিংক।এমন কোন পানীয় সে লন্ডন, স্কটল্যান্ড এমনকি কাজেরজন্য যখন নিউ ইয়র্ক গেছে তখনো খায়নি। বাংলাদেশে কিনা পাওয়া যায়! এখানে এসে তার নিজেকে বেশ গ্রাম্য গ্রাম্যমনে হয়। ঠিক ডার্লিংটন থেকে লন্ডনে এসে ও যখন স্কুলেভর্তি হয়েছিল অনেকটা তার মত।

ছোট্ট একটি গোলাপী আধা-চামুচে সাদা আইস্ক্রিম গলাতেগলাতে বলেছিলো, দেখো এ যেন চালের দুধ। যেনো খইদিইয়ে তৈরি।খই খেয়েছো নিশ্চয়ই।

কোথায় পাওয়া যায়?

মানে! সে তো যে কোন বাজারে গুলশান, তিনশ ফিট বাস্বপ্নতেওতো পাবার কথা। আমি খেয়েছি আমাদের গ্রামে একচাচা এনে দিয়েছিলেন। বিলেতে নিয়ে আসবার জন্য।আচ্ছা খই রঙা হাঁস দেখেছো? যারা কাহিনীর দেশে থাকে।যাদের গায়ে পরণ কথার গন্ধ লেগে থাকে।

আব্‌ছা টেবিল থেকে টিস্যূ পেপার নিয়ে শুভর গোঁফেরকোনা থেকে ক্রিম মুছে দিয়ে তাকে একটু থামাতে চায়। এইবিদেশী ছেলেটি এত বেশি বাঙালি কেন! পেইন ইন দ্যা… উফ্‌। না হলে ওকে যে কি ভাল লাগে। শুভর সবই ভালোলাগে। ড্রেস সেন্স, আফটার শেইভের স্মেল, জুতার কালারও স্টাইল। আর কি পরিষ্কার করে হাতের নখ কাটা। সে নাকিকোন পার্লারেও না নিজেই এমন পরিষ্কার করে কাটে। দেশে এরকম পরিষ্কার ছেলে এত্ত কম। কী পিওর এই বিলাতি বাচ্চাটা! শুভ থামে না।

চলনা সোনার গাঁয়ে তোমার দাদার বাড়ী যাই। ইন্টারনেটে দেখেছি সেখানে জয়নুল গ্যালারিও আছে । 

নো নো নোনো! বলে নাকের নথ্‌টা দোলাতে থাকে। আরকি যে মিষ্টি লাগে তাকে ঐ নথে। অনেক ট্রাফিক জ্যামভাই। আর গাড়ির থেকে বেরুলেই যা গরম। একদম হালুয়াটাইট হয়ে যাবে। তাই আমি যাইনা।স্টিল তোমার জন্য না হয় একদিন যাবো। আর জয়নুল কে? এ্যান্ড প্লিজ ট্রান্সলেটপরণকথা ইন্টু বাংলা। মানে কি?

তোমার ও লেভেলে জীবনানন্দ ছিলো না? কথা বলতে বলতে ওরা চাওয়ালা থেকে বেরিয়ে বাইরে পা বাড়িয়ে ছিল।ওর হাঁটতে ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু সম্ভব না। সামনে ফুটপাতে কতকি। পনীর ওয়ালা, রিক্সা ভ্যান ভরা বেগুন আলু, বাঁদরনাচ, ডাস্টার বিক্রেতা। 

আব্‌ছা পরেছিল নরম সবুজ একটা সালোয়ারের সঙ্গে গাঢ় সবুজ কামিজ। ওর মুখটা যেন পদ্মের মত। আবার তার সেই প্রথম দেখার কথা মনে হয়। এটা বার বার মনে হয়। আর ওরা গল্প করে। মন্টি খালার সঙ্গে বেইলী রোড অফিসার্স ক্লাবে একটা বিয়েতে গেছিল- খালা আসলে দেশে আসার পর তাকে মেয়ে দেখাতে নিয়ে গেছিলেন। শুভর চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল। সব মেয়েকেই মনে হচ্ছিল বলিউডের। মেকাপে সবার চেহারাই এক হয়ে আছে। নকল আই ল্যাশ, জামায় জমকালো জরোয়ার কাজ। বউটাকে মনে হয়নি বাংলাদেশের বউ। আর বিয়েটাকে মনে হচ্ছিল বোম্বের কোন ফিল্ম প্রিমিয়ার। বরকে দেখে সে হাসি চাপ্‌তে পারেনি। মন্টিখালা রেগে বলছিলেন, চুপ্‌ কর শুভ। ছেলেটি ভেবেছিল কি করে সে চুপ করে! বরের শুধু নাগরা ও পাগরী না কোমরের পাশে একটা তলয়ার ও ঝুলছে! পাগল নাকি? আব্‌ছার নাকে ছিল জলবিন্দুর মত একটা নথ্‌। সালোয়ার কামিজে দেখলেও শুভর খুব ইচ্ছে হতে লাগলো শাড়িতে দেখতে। মেয়েটি আসলে বয়সের চেয়ে কম গভীর। তবে সরল। তালে আছে কবে তার মেনিকিওর কবে পার্টি কবে লাবীবের ম্যাড শেফের খাওয়া।

না স্কুলের বাঙলা কারিকুলম ইউনিভার্সিটির জন্য না ইয়োর হাইনেস। তাই জীবনান্ড ডাশ আমরা পরি না। আমাদের আর সব সাব্জেক্টই এ্যামেরিকান । স্যরি তোমাদের ব্রিটিশ না। লিসেন, আমি এখানে নেমে যাচ্ছি। গাড়ি তোকে নামিয়ে আমার কাছে আসবে। শোন, কিউটি পাঈ আমি- এ্যাম লাইক ইয়োর বেস্ট ফ্রেন্ড নাউ- কিন্তু আমি মোর দ্যানফ্রেন্ড হতে চাই। কিন্তু তুই খালি লেসন দিস। ভাল্লাগে না। বাই। আমার রেডিও শো’টা শোন। এই কার রেডিওতেই পারবি। রহমত আপনি দিয়েন। শেষ কথাটি গাড়ির ড্রাইভারকে বলা। 

ওকে নামিয়ে গাড়ি চল্লে শুভ মনে মনে বলে যার সঙ্গে পেমেনিমগ্ন থাকতে চাই তাকে তুই করে বলতেই পারবো না। শুধু এই তুমি শোনার জন্য ক্যারোলাইন এ্যাডামস্‌ এর বইর শিরোনামের সেই সাত সাগর তেরো নদী উড়ে এসেবাংলাদেশে কাজ নিয়েছি। থাকছি। মুগ্ধ হচ্ছি। মশার জন্য দিন রাত অডোমস ক্রিম মেখে থাকছি। আর দেখছি কত অসুবিধার মাঝেও কি সাঙ্ঘাতিক এগিয়েছে এ দেশ। কি মিষ্টি এর ভাষা। ভাগ্যিস মা তাকে বাংলাটা বাড়িতে পড়িয়ে যাচ্ছিল কমিউনিটি স্কুলে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত। আর বাবা–মা বাসায় এক অক্ষর ও ইংরাজি বলতে দেয়নি। 

গাড়িতে তখনো মেয়েটির সুবাস। কি মাখে মেয়েটা একটু মসলা মার্কা গন্ধ। যেন বনাজী। রহমত বলে, রাস্তায় জ্যাম স্যার। আপনার সেই গানটা ছাড়ুম? আমি আপনার জন্য কিন্‌সি।

হ। বলেই শুভ হাসে। গাড়িতে গান বাজে আব্দুল করিম।

কোন মেস্তরী নাও বানাইল 

কেবা দেখা যায়

ঝিলমিল ঝিলমিল করেরে

ময়ূর পক্ষী নায়...

সে যে এসব বাংলা গান জানে তা ভেবেই ড্রাইভার অবাক। শুভ তাকে বলে আরে রহমত ভাই বিলাতে বৈশাখী মেলায়তো এগুলাই শুনি।তেমন গান আ্পনার আপুও শোনেনা। আমরা বিলাতীরা হয় ইংলিশ শুনি না হইলে কালা মিয়া, আশিক, রাধা রমণ এইসব। 

গাড়ি বনানীর রাস্তায় পড়ে। মনেহয় যেন গাছে গাছে ইংলিশ ক্লাশের সাইনবোর্ড ফুটে আছে। সেদিন দেখেছে ধানমন্ডির গাছে এবং দেয়ালেও। হয় কাজী অফিস নয় ইংরাজী শিক্ষা, শেখানো বা স্কুলের। আশ্চর্য বাংলা শেখানোর কোথাও নেই।

ভেবে অবাক হয়। বাংলাদেশের মানুষ কি কষ্ট করে, কত ব্যয় করেই না চাকুরী বা বিদেশে যাবার জন্য ইংরাজী শেখে। আবার অনেক কষ্টে মাস্টার রেখে বা মসজিদে ইমামের কাছে বেতের বাড়ি খেয়ে বেহেস্তে যাবার জন্য শেখে আরবী। দুটোই বিদেশী ভাষা। একটা বাস্তবে উন্নতির জন্য আরেকটা উন্নত মানের স্বর্গে যাবার জন্য। কি কষ্ট কি কষ্ট। আর যে ভাষা মায়ের ভাষা বলে অনায়াসেই ব্যয় ছাড়া পেয়ে যায় তার দাম নেই! শূন্য। বরং চল্‌ছে তার বিকৃতি।

চা নিয়ে এক্টু গলা খাঁকারির মত একটা শব্দ করে শুভহাতের মোবাইল সেট টার দিকে তাকায়। একটা বৃত্তের মধ্যেআব্‌ছার অবয়ব। ওর কথার সঙ্গে সঙ্গে ফুট্‌কির মত নড়েনড়ে উঠছে।

হাত থেকে মির্জাপুর চা’র সুগন্ধ আসে। মোবাইলের অপর প্রান্তে তার প্রিয়া।

আব্‌ছা, ভাবছি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শকের চাকুরীটা ছেড়ে দিয়ে একটা শুদ্ধ করে বাংলা বলা’র স্কুল দেবো। এটাই আমার হবে নতুন প্রজেক্ট।

কি!!!!

মোবাইল কাঁপতে থাকে তির তির তির তির।।

-------------------
লেখক পরিচিতি
শামীম আজাদ
কবি। গল্পকার। অনুবাদক। সাংবাদিক।
লন্ডনে থাকেন। 





1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ শামীম! অনেকদিন বেঁচে থাক বন্ধু রে আনন্দ বিলিয়ে যা আমাদের জন্যে।

    উত্তরমুছুন