সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

পুরুষোত্তম সিংহের আলোচনাঃ অমাবস্যার গান : অন্ধকারের আলো

বিংশ শতকের প্রারম্ভলগ্ন থেকেই বাংলা উপন্যাসের পরিধি প্রসারিত হতে থাকল। উনিশ শতকের জটিলতা, ধর্মীয় দ্বন্দ্ব ও সমাজ ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে ঔপন্যাসিকরা বিস্তৃর্ণ পরিসরে আখ্যানের ব্যাপ্তি ঘটালেন। চল্লিশ পঞ্চাশের দশকে এসে উপন্যাসের জীর্ণতা অতিক্রম করে আজ উপন্যাস নির্দিষ্ট ফর্মকে ভেঙে নিজেই ফর্ম খুঁজে নিয়েছে।
আজ আর উপন্যাস বলতে নির্দিষ্ট কোন বাধাধারা ফর্ম নেই। জটিল জীবনের বহুবিধ গলিপথের মতো উপন্যাসেও বহুস্বরিক ভাষা নিয়ে আজ উপস্থিত হয়েছে।

Deconstructionবা বিনির্মাণের মাধ্যমে অতীতকে উপন্যাসে উপস্থিত হতে আমরা দেখেছি। ইংরেজিতে এর নানা পরিভাষা রয়েছে – Remaking, Rereading, Demantling প্রভৃতি। ব্যক্তিগত অনুভূতিতে ’Rereading’ শব্দটি আমার বড় প্রিয়। এই ‘পুনর্পাঠ’ উপন্যাসে নানা ভাবে এসেছি। ইতিহাস, সাহিত্য, রূপকথা, লোককথা আজ নবনির্মাণে উপস্থিত হয়েছে। লেখকের ব্যক্তি মনন, উপলব্ধিজাত সত্য ও দর্শন এই পুনর্নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। এই Deconstruction সম্পর্কে দেরিদা লিখেছেন –“ they undertake the deconstruction of metaphysics by showing how a philosophical position is subverted or undone, exposed as a construct, by the workings of the discourse that affirms it.” ( ‘পাশ্চাত্য সাহুত্যতত্ত্ব ও সাহিত্যভাবনা’, নবেন্দু সেন, রত্নাবলী, পৃ.৪৭১) বনফুল ‘পাঠকের মৃত্যু’ গল্পে লিখেছিলেন- যে গল্প যৌবনে রেল স্টেশনের প্রখর রোদে বসেও পড়েছেন, সে গল্প আজ ড্রয়িং রুমে বসেও পড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় কথাসাহিত্যের মানুষ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন প্রক্রিয়া ও ব্যক্তিগত পাঠে ছিল ভারতচন্দ্রের পাঠ। সেই ভারতচন্দ্রকে নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘অমাবস্যার গান’ উপন্যাসটি। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় সমকাল প্রকাশনী থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে। মধ্যযুগের শেষকবি ভারতচন্দ্রের ব্যক্তিগত ও সাহিত্যজীবন নিয়ে এ উপন্যাসের ক্যানভাস গড়ে উঠেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ভারতচন্দ্রের প্রসঙ্গ এসেছে বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ উপন্যাসে।

​​​ব্যক্তির জীবন চরিত নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বহু উপন্যাস লেখা হয়েছে।যথা- রামকিংকর বেইজের জীবন নিয়ে লেখা সমরেশ বসুর ‘ দেখি নাই ফিরে’, লালন ফকিরকে নিয়ে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’, শিশির ভাদুরীর জীবন নিয়ে লেখা ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’, রবীন্দ্রনাথ ও রানু মুখার্জিকে কেন্দ্র করে লেখা ‘ রানু ও ভানু’, চৈতন্যদেবের জীবন নিয়ে লেখা শৈবাল মিত্রের ‘গোরা’। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের জীবন নিয়ে লিখেছেন ধনঞ্জয় ঘোষাল ও সেলিনা হোসেন।জীবনানন্দের জীবন নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন সুরঞ্জন প্রামাণিক, দেবব্রত বিশ্বাসের জীবন নিয়ে লিখেছেন বাসব দাশগুপ্ত, ব্যাসের জীবন নিয়ে লিখেছেন শাহজাদ ফিরদউস এবং নজরুলের জীবন নিয়ে বিনোদ ঘোষাল লিখেছেন ‘ কে বাজায় বাঁশি’ উপন্যাস। মধ্যযুগের কাহিনির পুনর্নির্মাণ আমরা দেখেছি অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘চাঁদবেনে’, সেলিনা হোসেনের ‘নীল ময়ূরীর যৌবন’, ‘চাঁদবেনে’, রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘ধনপতির সিংহল যাত্র’, অমর মিত্রের ‘মৈমনশাহী উপাখ্যান’ উপন্যাসে। এইসব ঔপন্যাসিকরা কাহিনিকে সামনে রেখে নিজস্ব রীতিতেই উপন্যাস গড়ে তুলেছেন। অমিয়ভূষণ মজুমদার ‘চাঁদবেনে’ উপন্যাস শুরুই করেন একটি দর্শন দিয়ে- উপন্যাসের নায়ক মধু আবার জন্ম নিতে চেয়েছে। মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্রের মৃত্যুতেই একটি যুগের অবসান ঘটেছে। শুরু হয়েছে নতুন একটি যুগের। এজন্যেই ভারতচন্দ্র যুগসন্ধির কবি, অবক্ষয়ের কবি। সেই সময়পর্ব, সেই ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখতে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন ‘অমবস্যার গান’ উপন্যাস।

​ভারতচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-“ রাজসভাকবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গলগান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা তেমনি তাহার কারুকার্য।“( ‘কবিসঙ্গীত’, ‘লোকসাহিত্য’) আবার ‘পঞ্চভূত’ গ্রন্থের ‘নরনারী’ প্রবন্ধে লিখলেন-“ বিদ্যাসুন্দরের মধ্যে সজীব মূর্তি যদি কাহারও থাকে তবে সে কেবল বিদ্যার ও মালিনীর। সুন্দর চরিত্রে পদার্থের লেশমাত্র নাই”। অন্যদিকে প্রমথ চৌধুরী ব্যক্ত করেছেন –“Bharatchandra, as a supreme literary craftsman, will ever remain a master to us witers of the bengali language.”( প্রবন্ধ সংগ্রহ, বিশ্বভারতী, পৃ. ২১৬)। এমনকি প্রবোধচন্দ্র সেনের মনে হয়েছিল- রবীন্দ্রনাথের পূর্বে একজন বড় ছন্দবিদ ভারতচন্দ্র। কাব্যক্ষেত্রে যিনি ‘রাজকণ্ঠের মণিমালা’ ফুটিয়েছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর ছিল অসহনীয় দারিদ্র্য। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সচেতন ভাবেই ভারতচন্দ্রকে সামনে রেখেই উপন্যাস নির্মাণ করেছেন। উপন্যাসে প্রবেশের আগে আমরা ভারতচন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করব তবে উপন্যাসের রস আস্বাদনে সহায়ক হবে।

​​​​​​অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন- “ ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনী অতি বিচিত্র ও চিত্তাকর্ষী – আধুনিক কালের গল্প উপন্যাসেও তাহা স্বচ্ছন্দে স্থান পাইতে পারে।“ ( ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’, তৃতীয় খণ্ড : দ্বিতীয় পর্ব, মর্ডাণ, পুনর্মুদ্রণ- ২০১১-১২, পৃ. ১২৬) অষ্টদশ শতকের সূচনায় সমাজ- ইতিহাসে ছিল এক অস্থির পরিস্তিতি। বর্গি হাঙ্গামায় সমাজ জীবন ক্ষত- বিক্ষত। এক দোদুল্যমান অবস্থায় ভারতচন্দ্র ১৭১২ খ্রিস্টাব্দের হুগলি জেলার পেঁড়ো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে জন্মসাল নিয়ে বিভেদ আছে। ঈশ্বরগুপ্ত যেহেতু পদাতিক গবেষক হয়ে এ তথ্য দিয়েছেন তাই প্রমাণ্য বলে এটিই বিবেচিত বোধহয়। পিতা নরেন্দ্রনারায়ণ রায়। রাষ্ট্রিক বিপর্যয়ে পিতা সর্বস্ব হারা হলে ভারতচন্দ্র বাল্যকালেই মাতুলালয় যাত্রা করেন ও সংস্কৃত ভাষা ব্যকরণে শিক্ষা লাভ করেন। ইতিমধ্যে বিবাহও করেন, স্ত্রী রাধা। পরিবারের অনুমতি ছাড়া বিবাহ ও অর্থকারী পারস্য ভাষা আয়ত্ত্বের বদলে অনর্থকারী সংস্কৃত ভাষার শিক্ষালাভ- এই গঞ্জনায় দেশত্যাগ করেন। ইতিমধ্যেই দেবানন্দপুরের রামচন্দ্র মুন্সীর আশ্রয়ে ফরাসী ভাষা আয়ত্ত্ব করেন। ফরাসী ভাষা আয়ত্ত্ব করে গৃহে প্রত্যাবর্তণ করলে পরিবারের নির্দেশে যাত্রা করেন বর্ধমান রাজসভায়। কিন্তু পিতা খাজনা না দিলে বর্ধমান রাজা কর্তক কারাগারে নিক্ষেপ ও পলায়ণ করে কবি মারঠা সুবেদার শিবভট্টের সাহায্যে পুরী যাত্রা করেন। সেখানে গিয়ে বৈষ্ণবীয় বেশ ধারন করে ‘মুনি গোঁসাই’ নামে পরিচিত হন। বহু বৈষ্ণব সহ পুরী থেকে যখন বৃন্দাবনে ফিরছেন সেই প্রেক্ষাপট থেকেই শুরু হয়েছে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অমাবস্যার গান’ উপন্যাসের।

​[২]

উপন্যাসটি ১১টি পরিচ্ছেদে সমাপ্ত। ‘মিত্র ও ঘোষ’ থেকে প্রকাশিত ‘নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচনাবলী’র দ্বাদশ খণ্ডের ভূমিকায় অরিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ও সবিতেন্দ্রনাথ রায় লিখেছেন- “ অন্ধকার যুগ বলেই সম্ভবত গ্রন্থের নামকরণ অমাবস্যার গান।“ এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক বিপর্যয়ের এক প্রান্তিককাল হলেও অন্ধকারকে অতিক্রম করে ঔপন্যাসিক আলোর সন্ধান করেছেন। এই রাষ্ট্রিক বিপর্যয়ের মধ্যেই লেখা হয়েছিল ‘রাজকণ্ঠের মণিমালা’। মধ্যযুগের যে দৈবীবাতাবরণ তা থৈকে এই প্রথম নতুনসুর ধ্বনিত হল, মানুষের কথা ধ্বনিত হল। ভারতচন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবনে দৈন্য ও ক্ষত-বিক্ষত রণক্লান্ত অবস্থা ছিল বলেই তিনি সহজেই দৈব অপেক্ষা মানুষের কথা বলতে পেরেছিলেন। কাব্যে শিবের শরীরে যে ধূলা ছুড়ে ফেলা – যার মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিল আধুনিকতার, এই যে অবিশ্বাস তা ভারতচন্দ্র পেয়েছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে চরম অর্থনৈতিক সংকটের ফলেই। ‘অন্নদামঙ্গল’ রচিত হলেও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় তখন চরমঅবক্ষয় বিরাজ করেছে। ঔপন্যাসিক সেদিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন-“ ব্রাহ্মণ, জমিদার সমাজপতি যেদিকে চলে – সমাজের গতিও সেই দিকে। ঘরে ঘরে, পাপ ঢুকেছে, আখড়ায় আখড়ায় ব্যভিচার, তন্ত্রের নামে পঞ্চ ‘ম’-কারের লৌকিক উপাসনা। চারিদিকে অন্ধকার। যেমন রাজসভা, তেমনি রাজকবি। আলোহীন ভবিষ্যৎহীন এই অমাবস্যার ভেতরে অমাবস্যার গান।“(নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড, মিত্র ও ঘোষ, প্রথম প্রকাশ-১৩৯৫, পৃ. ৬১)। সেই তিমির নাশ করেই সুখ স্বচ্ছন্দের আভাস পেয়েছিলেন ভারতচন্দ্র। ব্যক্তিগত জীবন ও বাংলাকাব্যের পঙ্কিলতা অতিক্রম করে আধুমিকতা আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ যেন জীবনানন্দের ভাষায়-

“ মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।
তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ’য়ে
আমরা কি তিমিরবিলাসী ?
আমরা তো তিমিরবিনাশী
হ’তে চাই।
আমরা তো তিমিরবিনাশী।“

​​​​​( সাতটি তারার তিমির )

ঐতিহাসিক উপন্যাস সে যুগের tone and tamper বজায় থাকে। এ উপন্যাসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক ইতিহাসের এক বৃহত্তর জটিল প্রেক্ষাপট অবর্তিত হয়েছে একটি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। ভারতচন্দ্রই এ উপন্যাসের নায়ক। ভারতচন্দ্রকে সামনে রেখে ঔপন্যাসিক অষ্টদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের এক অবরুদ্ধ কণ্ঠস্বর চিত্রিত করেছেন। উপন্যাসের শুরু হয়েছে একটি যাত্রাপথের বর্ণনা দিয়ে। এই যাত্রাপথ যেন – পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থী, আমরা চলতি পথের সঙ্গী । এই যাত্রাপথ ভারতচন্দ্রের বিড়ম্বিত ভাগ্যচক্রের বিবর্তনের পথ। বৈষ্ণব ভারতচন্দ্র তীর্থ থেকে তীর্থে ঘুরে বেড়ান। সংসারত্যাগী ভারতচন্দ্রের নাম কৃষ্ণপ্রেম। বৈষ্ণবীয় গীত রচনায় তাঁর দক্ষতা ইতিমধ্যেই রঘুনাথের কাছে প্রমাণিত। সংসারের মায়ামমতা সমস্তই তিনি ত্যাগ করেছেন। ভুলেছেন স্ত্রী লীলাবতির কথা। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই রঘুনাথ ভারতচন্দ্রকে ফিরিয়েছেন সৌদামিনীর গৃহে। সৌদামিনী ভারতচন্দ্রের স্ত্রী লীলাবতির দূর সম্পর্কের বোন। বাউণ্ডুলে ভারতচন্দ্র এবার বাঁধা পড়লেন সংসারের জালে।

ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের দক্ষতা অনন্ত। ভারতচন্দ্রকে সামনে রেখেই তিনি ইতিহাসের পদধ্বনি শুনিয়েছেন। ইতিহাসকে বিকৃতি করে তিনি উপন্যাস ফাঁদেন নি। যদিও সাহিত্যের ধর্ম তা নয়। ইতিহাসের সত্যকে তিনি উপন্যাসের সত্যে মিলিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রিক বিপর্যয়ের কাহিনিকে তিনি সুললিত গদ্যে পরিবেশন করেছেন। ব্যক্তি ভারতচন্দ্রের ভবঘুরে জীবনের ইতিবৃত্তে রয়েছে অর্থনৈতিক সংকতের চিত্র ও ভাগ্য বিড়ম্বিত মর্মগাথা। বর্ধমান রাজদরবার থেকে পলায়ণ, বর্গী হাঙ্গামা ও পারিবারিক লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে বৃন্দাবনে যাত্রা করলেও সংসারের প্রতি তাঁর যে মন ছিল না তা কিন্তু নয়। নিয়তি পরিহাসেই আজ সে বৈরাগ্য হয়েছে। ভারতচন্দ্র সংসারি জীবনচিত্রের অন্তরমনন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সৌদামিনী। অন্তর রহস্যের বিগলিত অবরুদ্ধ অভিলাস ফুটে উঠেছিল মুখে। তাই সৌদামিনী বলে-

“ ভাবনার তো কিছু নেই ভাই। সত্যিই যদি তুমি সন্নিসী হয়ে যেতে, আমরা কেউ তোমায় পেছু ডাকতুম না। কিন্তু তুমি তো সাধু হওনি –রাগে দুঃখে বাউণ্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ। শুধু নিজের জীবনটাই নষ্ট করছ তাই নয়- লীলার যে এতগুলো বছর কিভাবে কাটছে, সে ও তুমি বুঝতে পারছ না। কাল লীলা আসুক, একবার ভালো করে চেয়ে দেখো তার মুখের দিকে, তারপর তোমার ধর্ম যা বলে তাই কোরো।“( ঐ, পৃ. ১৫)

ভারতচন্দ্র মত্ত চৈতন্যতত্ত্বে। চৈতন্যদেব নিজে সন্ন্যাস নিলেও ভক্তদের সন্ন্যাস নেবার পরামর্শ দেন নি। ভারতচন্দ্র আজ চৈতন্যতত্ত্ব, বৈষ্ণবতত্ত্ব, বৈষ্ণবীয় রসভাসে মশগুল হয়ে জীবন কাটাছেন। সংসারের প্রতি যে গোপন অভিপ্রায় ছিল না তা নয়। তবে বৈষ্ণবীয় লোকাচারকেই তিনি প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে। সৌদামিনীর ভৎসনা আজ তাঁকে গৃহমুখী করেছে। গৃহবিমুখ যে ভারতচন্দ্রকে জোড় করে গৃহবন্দি করা হয়েছিল আজ দর্জা উন্মুক্ত থাকলেও বাইরের নির্মল প্রকৃতি আজ আর আকর্ষণ করেনি। সে অভিলাস গোপন করেন নি সৌদামিনীর কাছে-“ মিথ্যেই ভেক বয়ে বেড়াচ্ছিলুম, পাপের বোঝা বাড়ছিল। তোমরা তা থেকে আমায় মুক্তি দিলে।“( ঐ,পৃ.১৭) যে কবি প্রতিভা চাপা পড়েছিল তা আবার প্রকাশ পেল। ‘সত্যপীরের পাঁচালী’ শুনে সবাইকবির গুনগানে মুগ্ধ হল।

​​​​রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ক্রমাগত মঙ্গলকাব্যের পুনরাবৃত্তি ঘটলে পনেরো আনা মানুষ সাহিত্য পড়া ছেড়ে দিত। দীর্ঘ পাঁচশো বছর ধরে মঙ্গলকাব্যের পুনরাবৃত্তি ঘটায় যুগরুচি ও সাহিত্য রুচিতেই ঘুণ ধরেছিল। তাই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে পরামর্শ দিয়েছিল ‘নতুন মঙ্গল’ রচনার। তবে কৃষ্ণচন্দ্রের মনে সন্দেহ ছিল নতুন মঙ্গলের নামে বোধহয় আবার চণ্ডীমঙ্গলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ভারতচন্দ্র প্রথম আশ্রয় পান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর রাজসভায়। ইন্দ্রনারায়ণ রাজা হলেও ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁকে অপংক্তেয় করেছে। বিদ্যাধরী নামে এক পতিতা নারীকে স্থান দেওয়ায় ইন্দ্রনারায়ণের এই পদঙ্খলন। তবে ইন্দ্রনারায়ণ সমাজ শাসনকে পাত্তা না দিয়েই স্থান দিয়েছেন বিদ্যাধরীকে। ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের নগেন্দ্রনাথ বলেছিল যে গ্রামে আমিই রাজা, সেখানে আবার সমাজ কি ! ইন্দ্রনারায়ণও তেমনই। যেখানে দারিদ্র্যই সর্বস্ব গ্রাস করেছে সেখানে আবার কৌলিন্য কি ! ভারতচন্দ্রেও জাতি রূপান্তর ঘটে গেছে, সে গ্রহণ করেছে চন্দ্রাবতীর খাদ্য। আসলে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সমাজিক ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছেন, যা শুরু হয়েছে এই জাতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছে বিজন ভট্টাচার্যের ‘গোত্রান্তর’ নাটকের হরেন মাস্টারের কথা। যিনি চরম অভাবের দিনে কন্যাকে নিম্নবিত্ত পাত্রের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেননা যুগের ক্ষেত্রে গোত্রান্তর সত্য। ভারতচন্দ্রের এই গোত্রান্তর ঘটেছে অভাবের জন্যই। কখনও সংশয়ীচিত্তে উথ্থাপন করেছেন-

ক/ “ কবিত্ব আছে বলে সেই অপরাধে আমায় কি না খেয়ে মরতে হবে চৌধুরী মশাই”( ঐ, পৃ. ২৭)

খ/ “ কী হবে কবিত্ব দিয়ে ? আজকাল আর কবিকে কেউ চায় না ; লোকের জন্য বাইজী আছে, খেউড় গান আছে ।“( ঐ,পৃ. ৩৩)

মধ্যযুগের বেশিরভাগ কবির কোন স্বতন্ত্রতা ছিল না। একই প্লটকে সামনে রেখে তারা কাব্য ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছেন। সেই প্লটবা আখ্যানেই কিঞ্চিৎ অভিনবত্ব এনেছেন তবে পুরোপুরি স্বতন্ত্র ধারার প্রবর্তন ছিল না। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে আরাকান রাজসভার কবিরা। তবে তা বাংলা থেকে বহুদূরে। ভারতচন্দ্র জানতেন কবিদের এই দৈন্যতার কথা। প্রতিভা থাকলেও ছিল যুগরুচির অভাব। তাই মুকুন্দরাম নিজের প্রতিভাকে ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য রচনায় নিমগ্ন করেন। আসলে দৈবী ভাবনার পরিমণ্ডলে দেবতা অপেক্ষা মানুষের কথা ঘোষণা খুব বেশি সহজ ছিল না। তাই নতুন কাব্যের ক্ষেত্রে ভারতচন্দ্রের মনেও সংশয়- “ লিখতে পারি আমি ? কিন্তু সে কবিতা কেউ পড়বে না।“( ঐ, পৃ.৩৭ ) কেননা মধ্যযুগীয় বাতাবরণে মানুষকে দেবতার পায়ে বলি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারতচন্দ্রের ব্যক্তিগত দৈনত্যা থেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন –“ নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায় ?” এই অবিশ্বাস তাঁর মনে সঞ্চিত হয়েছিল সামাজিক লাঞ্ছনা থেকেই। কখনও মনে হয়েছে-“ আমাদের দেশে মানুষের প্রেমের কথা নিয়ে লেখার নিয়ম নেই। সব কিছু লিখতে হয় দেবতাকে নিয়ে।“ ( ঐ, পৃ. ৩৮)

​​​​ইন্দ্রনারায়ণের সভায় এসেছেন নবদ্বীপের অধিপতি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়।ভারতচন্দ্রের স্বরচিত কবিতা শুনে কৃষ্ণচন্দ্র মুগ্ধ হয়ে নিজের রাজসভায় কবিকে নিয়ে গিয়েছেন। রাজ্যের ভৌগোলিক সীমা যেমন উঠে এসেছে তেমনি এসেছে রাষ্ট্রিয় ষড়যন্ত্র। কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় ভারতচন্দ্রকে প্রথমেই অপদস্ত হতে হয়েছে গোপালের কাছে। মধ্যযুগের কাব্যরচিত হত রাজ নির্দেশে। রাজার ইচ্ছা পূরণে কবিকে বলি দিতে হত তাঁর প্রতিভা। ভারতচন্দ্র এতদিন নিজস্ব খেয়ালেই কাব্য রচনা করেছেন। সেখানে কোন বাধ্য বাধকতা ছিল না। এবার এল রাজ নির্দেশ। প্রতিভাকে বলি দিতে হবে রাজার পায়ে। আষাঢ়ের মেঘ ঘনিয়ে এল কবির চোখে মুখে। ব্যক্তিজীবনের ক্রোধ কাব্যে প্রকাশ পেল শ্লেষ রূপে। রচিত হল রাজ নির্দেশে ‘অন্নদামঙ্গল’।

রাজসভাতেও কম অপমান লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় নি। পদে পদে শুনতে হয়েছে গোপাল ভাঁড়ের ব্যঙ্গ। বর্গী হাঙ্গামায় সমাজ জীবন বিপর্যস্ত। সেখান থেকে তিনি লিখলেন মানুষের কাব্য। তবে সহায় ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। এবার নবদ্বীপ ছেড়ে কৃষ্ণনগরে নিজের আসন পত্তন করলেন রাজা। সেখানে ভারতচন্দ্র কবি হিসেবে আসন পেলেও সভাকবি বাণেশ্বর। মাঝে মাঝে অপমান সহ্য করতে হচ্ছে, ‘চাটুবৃত্তি’ হিসেবে উপমা জুটেছে। কিন্তু ভারতচন্দ্র অন্তরমননে ছিলেন স্বাধীনচেতা। সেই সব ব্যঙ্গগুলি কাব্যে শ্লেষ আকারে ধরা দিয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের ক্লিষ্টতায় কখনো আত্মগ্লানিতে ভুগেছেন –

“ মনে মনে অনুতপ্ত বোধ করলেন ভারতচন্দ্র। নীলাচল ছেড়ে চলে না এলেই ভালো করতেন। তা হলে এই বাংলাদেশকে দেখতে হতো না, এই বাঙালীকেও না। সেই কতকাল আগে যখন দেশ ছেড়েছিলাম, তখনো দেশে দেখেছিলেন হাঙ্গামা, দেখেছিলেন আকাল, দেখেছিলেন এক সের মিঠাইয়ের দাম এক কাহন, আধ পণে আধ সের চিনি কিনতে হয়, কাপড় অগ্নিমূল্য, চারদিকে হাহারব।“ ( ঐ, পৃ. ৬৫)

বর্গী হাঙ্গামার যে অত্যাচার সেখানে তিনি মুক্তির গান শুনিয়েছেন।মুকুন্দরামের মতো ভারতচন্দ্রেরও ব্যক্তিগত জীবনে দৈন্যতা ছিল। কিন্তু রাজা সেই পুনরাবৃত্তির কাহিনি শুনতে চাইলেন না। কেননা সে রাজসভায় বাণেশ্বর, গোপাল ভাঁড় রয়েছে সেখানে ব্যঙ্গ যে অনিবার্য তা তিনি জানতেন। কৃষ্ণনগরের লোক আরো বেশি রসিক, একটু প্রঞ্জল রচনাই তাদের বেশি প্রিয়। রাজ আদেশ শিরোধার্য করে লিখলেন নতুন মঙ্গল –“ না, চণ্ডীমঙ্গল নয়। রঘুনন্দন মিত্তিরের কাছারীবাড়ি মনে পড়ে গেল। ক্ষুধিত তৃষ্ণার্ত একদল মানুষ, একটুখানি জল খেতে চাইলে রাজার পেয়াদা তাদের লাথি মারে। দেবী কি কেবল রাজারাজড়ারই দেবতা, গরিবের কেউ নন ? নামটা কেটে দিলেন, তারপর লিখলেন,’অন্নদামঙ্গল”। ( ঐ, পৃ. ৬৮)

অস্থিরমত্ত ভারতচন্দ্রের কেটে যাচ্ছে বিনিদ্র রজনী। কাব্যে নতুনত্বে তিনি কি আনবেন ! ভাষার ক্ষেত্রে নতুনত্ব ছিলই কিন্তু বিষয়বস্তু ? দারিদ্র্যের কথা রাজার ভালো লাগে না, ধনপতি- কালকেতুর গল্পও পছন্দ নয় অন্যদিকে তখন চারিদিকে শুধু আকাল। ভারতচন্দ্র আবার ব্যভিচার, পরকীয়া সাধনা ও খেউড় গানের উচ্ছ্বঙ্খলতা লিখতে নরাজ। বৈষ্ণব কবিরা বাস্তবের কোন নায়িকা দেখেই যেমন রাধার বিরহ চিত্তের অবস্থা অঙ্কন করেছিল বলে রবীন্দ্রনাথ যেমন জানিয়েছেন তেমনি বিদ্যাধরীকে সামনে রেখে ভারতচন্দ্র অঙ্কন করলেন সমাজ জীবনের ক্ষত-বিক্ষত অবস্থা। সে কাব্যপাঠে চন্দ্রাবলীর মনে হল-“ থামব কি কর্তা ? এ যে একেবারে আমাদের গাঁয়ের ত্রিলোচন চাটুজ্জের বিয়ের ছবিটা এঁকে দিয়েছেন। আমি সে বিয়েতে বরের সঙ্গেই গিয়েছিলুম। সত্তর বছরের বুড়ো, বিয়ে করতে গেছে কুলীনের ঘরের দশ বছরের মেয়েকে। বুড়োর মাথা থরথর করে কাঁপে, শরীর যেন অষ্টাবক্র মুনি।“( ঐ, পৃ. ৭৭)

ইতিমধ্যেই রাজসভায় কাব্যপাঠ হল। বাণেশ্বর মুগ্ধ হলেও রাজার মনে বিরুদ্ধ চিত্ততা। কাব্যে আদিরস কোথায় ? রাজার নির্দেশে রচিত কাব্যে যে রাজাকে মুগ্ধ করতে হবে সে কথা ভারতচন্দ্রের মতো ছিল না। আসলে তিনি ছিলেন শিল্পীর ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আদিরস ছাড়া রাজার কাছে কাব্যের গুণ গ্রাহ্য হয় না। এই যুগরুচিতে আহত হন ভারত। রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে চান –“চলে যাবেন এখান থেকে ? কোনো শান্ত পাড়াগাঁয়ের ছায়ায় গিয়ে খুলবেন টোলচতুষ্পাঠী ? কিন্তু আজকাল কেউ আর সংস্কৃত পড়ে না, এখন কালিদাস- মাঘ- ভবভূতি- ভারবিতে লোকের অনুরাগ নেই। যাজন- যজন করবেন ? তাতে আপত্তি নেই। ব্রাহ্মণ সন্তানের ওতে লজ্জা পাওয়ার কথা নয়।“( ঐ, পৃ. ৮২) মনে পড়ে যাচ্ছে প্রমথ চৌধুরীর কথা-“ অহং ও আত্মা যে এক বস্তু নয়, সে কথা কি এ দেশে বুঝিয়ে বলা দরকার ? ভারতচন্দ্র ছোটো হোন বড়ো হোন- জাতকবি, সুতরাং তাঁর অহংএর পরিচয় তাঁর কাব্যে নেই।“ ( ঐ, পৃ. ২১৫ )

কাব্য মানে নীতির কথা নয়, কাব্য মানে রসের চাকচিক্য নয়। ভারতচন্দ্রের মননে দেখা দিয়েছে দোলাচিত্ততা। রাজা নির্দেশ দিয়েছেন ‘বিদ্যাসুন্দর’ রচনার। আদিরসের আমদানি করে যুগরুচিকে মুগ্ধ করতে। যিনি লিখতে চেয়েছিলেন দেবী অন্নদার কথা তাঁকে আজ লিখতে হবে গণিকাবৃত্তির কথা। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় কবির এই মনস্তাত্ত্বিক রক্তক্ষরণ অদ্ভুত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। দারিদ্র্যতা থেকে রক্ষা করেছিল এই রাজা। একদিকে রাজনির্দেশ অন্যদিকে শিল্পসত্তা কোন পথে যাবেন কবি- অন্তরগহনের এই মনচাঞ্চল্য লেখক দেখিয়েছেন। কিন্তু নিজের দারিদ্র্যের কাছে কবিত্বের মূল্য কতখানি ? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পের মদন তাঁতি বা আনসারউদ্দিনের ‘শিল্পী’ গল্পের শিল্পী নিজের শিল্পসত্তা বজায় রাখতে পেরেছিল কিন্তু মধ্যযুগীয় বাতাবরণে যেখানে রাজাই শেষ কথা সেখানে কবির ব্যক্তিস্বতন্ত্রতার কোন মূল্য ছিল না। নিজের সমস্ত সত্তা বিসর্জন দিয়ে ভারতচন্দ্র লিখলেন ‘বিদ্যাসুন্দর’।

রাজকবির বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে কবি কাব্যে নিয়ে এলেন আদিরস। কালিদাস যেমন কাব্যে নিজের সমস্ত সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে আদিরসের ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন তেমনি ভারতচন্দ্রও সেই প্রবাহে কাব্যকলাকে নিয়ে গেলেন। To be or not to be এর দ্বন্দ্বে ভারতচন্দ্র যখন ক্ষত বিক্ষত তখন চন্দ্রাবলী বলেন-“ তুমি লেখো ঠাকুর, আদিরসের আশ্রয় করে নরলীলার কথাই শোনাও। বাইরে থাকুক বিলাস, ভেতরে থাকুক বৈরাগ্য। তোমার সাধনায় ফাঁকি ঘটবে না।“( ঐ, পৃ. ৮৭ ) মনে রাধাগোবিন্দ ও বাইরে লোকলীলাকে সামনে রেখে গড়ে তুললেন বিদ্যা সুন্দরের প্রণয় চিত্র।রাধাকৃষ্ণের রসতত্ত্ব হারিয়ে গিয়েলৌকিক প্রেমমহিমা জনগণকে মুগ্ধ করল। জনগণে মজে রইল আদিরসে। কিন্তু ভারতচন্দ্রের এই মনন বুঝেছিলেন প্রমথ চৌধুরী-“ভারতচন্দ্রের সাহিত্যের প্রধান রস কিন্তু আদিরস নয়, হাস্যরস। এ রস মধুর রস নয়, কারণ এ রসের জন্মস্থান হৃদয় নয়, মস্তিস্ক, জীবন নয়, মন। (প্রবন্ধ সংগ্রহ, বিশ্বভারতী, পৃ. ২১৯) রাজা মুগ্ধ হয়ে কবিকে উপহার দিলেন মুলাযোড় গ্রাম-“ অপূর্ব- অদ্ভুত ! কৌতুকে, রসিকতায়, কবিত্বে কামশাস্ত্রকে মহাকাব্য করে তুলেছ তুমি। বিহলন, অমরু, রাজশেখর- সবাই ম্লান হয়ে গেছে তোমার কাছে। আজ আমি তোমার উপাধি দিচ্ছি ‘রায়গুণাকর”।( ঐ, পৃ. ৮৮)

পলাশীর প্রান্তরে রণক্লান্ত অবস্থা। শওকৎ জঙ্গকে সমর্থন করায় সিরাজদৌল্লা বন্দি করেছে জগৎ শেঠকে। সিরাজের দৃষ্টি জগৎ শেঠের বিধবা কন্যার প্রতি। ইতিহাসে থাকে রাজা রাজাদের কৃতিত্ত্বের কাহিনি। লম্পট সিরাজের ভণ্ডামীর বিবরণ রয়েছে মুর্শিদাবাদের স্থানীয় ইতিহাসে।লেখক সিরাজের সেই লম্পট্যকেই তুলে ধরেছেন। জগৎ শৈঠ কন্যাকে রক্ষা করতে বিধবা বিবাহের প্রচলন করতে চেয়েছেন। ভারতচন্দ্র ভেবেছিলেন সমাজের এই ক্ষত- বিক্ষত অবস্থা চিত্রিত করবেন, লিখবেন মানুষের কথা। কিন্তু সমস্ত অতিক্রম করে তাঁকে হতে হল রাজার দাস। কবি ভারতচন্দ্রের এ যেন এক বড় ট্র্যাজেডি-“ কেউ ওর আসল অর্থ বুঝবে না, কেউ বুঝবে না আমার যন্ত্রণা, শুধু তারিয়ে তারিয়ে পড়বে ওর রসিকতা, মজে থাকবে ওর ভোগবিলাসে, বলবে- সাবাস কবি, সাবাস কবিত্ব ! লীলা, কিসের বিনিময়ে আমার এই যশ, এই সৌভাগ্য, এই অর্থ ? আমি কি দিতে চেয়েছিলুম, আর কী দিলুম ?” ( ঐ, পৃ. ৯২)

​​​অষ্টদশ শতাব্দী এক অবক্ষয়ের যুগ। রাষ্ট্রিক বিপর্যয় ও সাহিত্যে পদস্খলনের যুগ। অন্ধকারে তমসাচ্ছন্ন সমাজ যখন ডুবে গিয়েছিল তখন কবি আলোর সন্ধান করেছেন। ব্যক্তি ভারতচন্দ্রকে সামনে রেখে কবি অষ্টদশ শতাব্দীর এক বিশেষ সময়পর্বক চিহ্নিত করেছেন। দেখিয়েছেন শিল্পীর পদস্খলন, আত্মরুচিতে নিমগ্ন থাকা মানুষের ব্যক্তি ট্র্যাজেডি। আসলে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নিজে শিক্ষক, শিল্পী ও ঔপন্যাসিকের জন্য উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন আরেকজন শিল্পীর আত্মবেদনা। একজন শিল্পী চিত্রিত করেছেন আরেকজন শিল্পীর আত্মবিপর্যয়ের কাহিনি। অতিশয্যা বা রোমান্স নয় মূল কাহিনিকে সামনে রেখে তিনি যেন একটি নতুন ভারতচন্দ্রের জীবনী লিখেছেন। সাহিত্যের ভারতচন্দ্রকে উপন্যাসের ভারতচন্দ্র হিসেবে নির্মাণ করেছেন। সৃষ্টিশিল পুনর্নির্মাণ বলতে যে বোঝায় তার সার্থক দৃষ্টান্ত এ উপন্যাস।


​​​

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন