শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

অমর মিত্র'এর গল্প : বিভূতিবাবুর দেশ

এই গল্প কেন লেখা। 

[গল্পটি আমি লিখেছিলামন ২০১১-র জুলাই মাস নাগাদ। আমি সেই সময় বিভূতিবাবুর কয়েকটি উপন্যাস পরপর পড়ি। ইছামতী, দৃষ্টিপ্রদীপ, আদর্শ হিন্দু হােটেল, আরণ্যক। তা ব্যতীত বিভূতিবাবুর গল্প। বিভূতিবাবুকে আমি ঘুরে ঘুরে পড়ি। পড়তে ভালাে লাগে। তিনি আবিষ্ট করেন। আরণ্যক পড়তে পড়তে দেখতে পাই, লেখক বা গল্পকথক যিনি এই উপন্যাসের তাঁরও আক্ষেপ আছে ওই দিগন্তে বিস্তারিত অরণ্যভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কারণে।
গরিব মানুষ আসে কিছু জমির আশায়, চাষবাস করে খাবে, আর বড়াে মহাজন বিঘার পর বিঘা জমি নিয়ে জমিদারি ফাঁদে। বনভূমি নষ্ট হতে থাকে। আদিবাসী রাজা দোবরু পান্না তার অলীক রাজত্বের বনভূমিকে নিয়ে বাঁচেন। একদিন সমস্ত পাহাড় জঙ্গল ছিল তাদের, এখন নেই। আলাে বাতাস অরণ্য পাহাড় সব কেড়ে নিয়েছে এই সভ্যতা আর উন্নয়ন। জাতি সংঘের কাছে আমেরিকার আদিম জনজাতির দলপতির পাঠানাে দাবি পত্রের কথা স্মরণ করুন। 

বিভূতিবাবুর আরণ্যক উপন্যাসে আদিবাসী রাজা, রাজকন্যা ভানুমতী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি নতুন করে আরণ্যক পড়ে বিচলিত হই অন্য কথা ভেবে। আজ সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে আদিবাসী অন্ত্যজ মানুষ রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহভাজন হয়ে উঠেছে। আর আদিবাসী অন্ত্যজ মানুষের যে অধিকার এতদিন কাড়ত স্থানীয় মহাজন, জমিদার, সামন্তপ্রভু, তা কাড়তে এসেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলি। তার দোসর হয়েছে রাষ্ট্র আর গ্রামের ফড়ে মহাজন যারা থাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে। ওড়িশা থেকে ছত্তিশগড়, আর আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, লালগড় সর্বত্র। ওড়িশায় তাে উন্নয়নের জাঁতাকলে পড়ে আদিবাসী অন্ত্যজ মানুষ নিঃশব্দে তার সমস্ত অধিকার হারাচ্ছে। ছত্তিশগড়েও তাই। ছত্তিশগড়ে ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটছে। সােনি সােরি নামের আদিবাসী কন্যাটি যেভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তা সভ্য দেশে হতে পারে না। ওড়িশায় যে পাহাড়গুলি লিজ নিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি মৃত্তিকাগর্ভ থেকে খনিজ উত্তোলনের জন্য, সেই পাহাড়গুলি আদিবাসীদের কাছে দেবতাস্বরূপ। রাষ্ট্র সব তুলে দিচ্ছে বহুজাতিকের হাতে। অধিগ্রহণ করে। ভূমি অধিগ্রহণ আমার ৪টি উপন্যাসে নানাভাবে আছে। নানা ঘটনার কথা শুনে নিজেকে এক অক্ষম মানুষ মনে হয়। আরণ্যক পড়তে পড়তে মনে হয় এই আদিবাসী মানুষজন, নিরীহ আদিবাসী মেয়েরা যারা জেলখানায় আছে এই আমাদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওড়িশা, ছত্তিশগড়ে, সারা দেশে তারা তাে রাজকন্যা ভানুমতীর উত্তরসূরি। ভানুমতীর মেয়ে, নাতনি। আদিবাসী রাজা দোবরু পান্নার বংশধর। তাদের পবিত্র সেই ধনঝরি পাহাড়ই তাে লিজে নিয়ে ভাঙতে শুরু করেছে মহাজন আর বহুজাতিক কোম্পানি। আরণ্যক পড়লে আমাদের দেশের বনভূমিকে চেনা যায়। চেনা যায় গ্রামসমাজকে। রাসবিহারী সিং মহাজনকে। নন্দলাল ওঝাকে। আমাদের সেই সামন্ততান্ত্রিক সমাজ আছে পুরােপুরি। তা বহন করেন আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকরা। চোখ রাঙিয়ে আর জেলখানায় শারীরিক অত্যাচার করে তারা হাড় হিম করা আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিতে থাকেন মানুষের ভিতর। তারপর লােভের হাত বাড়ান বনভূমি, পাহাড প্রকৃতির উপর। এরা যেন আরণ্যক উপন্যাসের রাসবিহারী সিং-এর বংশধর সবাই। মানুষ দেশ পরিচালকদের ভালোবাসা পায় না কেন, রাষ্ট্রের ভালােবাসা? নানা ভাবনা গল্পটির জন্ম দিয়েছে। বিভূতিবাবু যেভাবে দরিদ্র আর অন্ত্যজ মানুষের কথা বলেছেন আরণ্যক উপন্যাসে তা আমাদের সাহিত্যে বিরল। এই লেখা সেই বিরল প্রকৃতির লেখকের প্রতি আমার প্রণাম। ] 


ফুলকিয়া বইহার, নাঢ়া বইহার, সরস্বতী কুণ্ডের মাটি সােনা। ভূতত্ত্ববিদরা ওই মাটির নীচে পেয়েছেন কপার, ম্যাঙ্গানিজ, লৌহ আকরিক, আরও কত ধাতুর সন্ধান। এক এক জায়গায় এক একরকম। মৃত্তিকার গর্ভ উন্মােচন করতে এসে যাচ্ছে কর্পোরেট সংস্থা। কেন যে এতদিন অবহেলায় পড়ে আছে এই মাটি। এতকাল গাঁয়ের কামার লােহা নিষ্কাশন করে ছুরি কাচি দা কুড়ােল বানাত, এখন তার সন্ধান পেয়ে গেছে ভিনদেশি কারিগর আর কোম্পানি। 

রাজকন্যা ভানুমতীর নাতনি এই ভানুমতীরও বয়স হয়ে এল। সেই কবে তার মায়ের ঠাকুদ্দা, বন পাহাড়ের রাজা দোবরু পান্না দেহ রেখেছেন, মাঠে গােরু চরাতে চরাতে পড়ে গিয়ে বুড়াে রাজা মরে গেলেন, তখন থেকে এই রাজবংশের মন্দ দিন এল, মন্দ দিনই চলছে। এই ভানুমতির মা রূপমতী বলত, দিদিমা ভানুমতীই নিজের নামে তার নাম রেখেছিল, তাকে দেখতেও হয়েছে তার দিদিমা ভানুমতীর মতাে। তার স্বভাবও নাকি সেইরকম। রূপমতীর মা রাজা দোবরু পান্নার নাতনি ভানুমতীর ছিল মায়ায় ভরা মন, প্রজার জন্য তার মন কাঁদত, অথচ তাদের তখন প্রজা ছিলই না। নাঢ়া বইহার, ফুলকিয়া বইহারে সব জমি কলকাতার খেলাত ঘােষবাবুদের হাতে চলে গিয়েছিল। যত বনপাহাড় সব তাদের ছিল এককালে, তখন কিছুই ছিল না, তবু রাজা দোবরু পান্না, রাজকন্যা ভানুমতীর ছিল প্রজাদের উপর মায়া। দিদিমা ভানুমতী তাকে গল্প। বলত, এই বনপাহাড়ের সবটাই ছিল তাদের অধিকারে। তাদের বংশ সূর্যবংশ, এই বন পাহাড়, সারা পৃথিবীই তাদের রাজ্য ছিল। রাজা দোবরু পান্না তার যৌবনকালে ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়েছিল, কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়ে তাদের রাজ্যের সীমা ছােটো হয়ে আসতে লাগল। 

কী আশ্চর্য, বনপাহাড় আমাদের ছিল! 

হা, বুড়ি রূপমতী বলে, আমাদের ছিল। 

ছিল তাে থাকল না কেন? 

রাজকন্যা ভানুমতীর মেয়ে রূপমতী বলল, জানিনে মা, তবে আমাদেরই ছিল সব। 

কী করে জানলে? 

আমরা ছাড়া বনে আর কারা থাকবে বল, বনে ছিলাম তাই আমরা বুনাে, এখন বন চলে যাচ্ছে, আমরা বুনাে, জংলিরা রয়ে গেছি। 

দুপুর গড়িয়ে এল। মা রূপমতী আর মেয়ে ভানুমতী তাদের কুটিরের সামনে বসে। এ বছর বর্ষা হয়েছিল ভালাে। এই পাহাড়তলীর জমিতে রােয়া হয়ে যাওয়ার পর তাদের মা মেয়েকে তুলল পুলিশ। লবসা বুড়াে হল ভানুমতীর বাবা। বুড়াে ত বটে, কিন্তু সেই বয়স নয় রূপমতীর স্বামীর। না খেয়ে পুলিশের মার খেয়ে অকালে বুড়াে হয়ে গেছে। কিন্তু সেই লােক জেলে, তার অবর্তমানে তার বউ মেয়ে ষড়যন্ত্রী। মা মেয়ে দুজনে জেল খেটে ফিরেছে সবে। ভানুমতীর স্বামী লবসাকে এখনো ছাড়েনি । তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযােগ বানিয়েছে পুলিশ। লবসা সােরেন এককালে মস্ত মানুষ ছিল। ছফুটের উপর মাথায়, তেমনি ছিল তার স্বাস্থ্য, টানা ঘাসজমির মতাে মস্ত বুক, চওড়া কবজি, সে যখন হাঁটত মেদিনী কাঁপত বুঝি, পাহাড় টলত। সেই লবসার প্রেতকে জেলে ঢুকিয়ে রেখেছে পুলিশ। লবসার নামে পাঁচটা খুনের মামলা সাজিয়ে দেশদ্রোহী তকমা দিয়েছে, তাকে এমনভাবে বেঁধেছে যে একটায় জামিন হলে আর একটায় ধরে, আদালত চত্বর পার হলেই পুলিশ ধরে ভ্যানে তুলে চালান করে দেয় সদরে, আবার মামলা ওঠে, জামিন হয় আবার হয় না, হলে নতুন কেস দিয়ে তা তুলে নেয়, এইরকম চলছে। এইরকম করতে করতে লবসাকে আর ভিটের মুখ দেখতে দেবে না। জেলখানায় ওর কিছু একটা হয়ে যাবে। এইরকম কি হয়নি? বুড়াে লগন মুন্ডা তাে মরার তিনদিন আগে ছাড়া পেল, জেলখানা থেকে হাসপাতাল, হাসপাতালে মরল। তার বডি গাঁয়ে আনতেই দিল না। ছেলেকে দিয়ে সদরের শ্মশানে দাহ করল। ছেলে যত বলে, ধনঝরি পাহাড়ের উপর তাদের পূর্বপুরুষ সকলের সমাধি, তাদের তিন পুরুষ আগের শেষ রাজা দোবরু পান্নার সমাধিও সেখানে, তার বাবাকে ওখানেই শােয়াবে, পুলিশ না করল। চোখ রাঙাল, ওসব নিয়ে যদি আর কোনাে কথা বলে জগরু তবে তাকেও ঢুকিয়ে দেবে জেলখানায়। জগরু কেন জেলখানায় ঢােকেনি সেইটাই আশ্চর্যের। জগরু নামটিও রাজা দোবরু পান্নার নাতি জগরু পান্নার নামে। ধনঝরি পাহাড়ের কোলে, এই বনপাহাড়ের কোলের মানুষ এখনও রাজা দোবরু পান্নার কথা ভােলেনি। কত বছর কেটে গেছে তারপর, তারা সন্ধের সময় এখনও সেই রাজার কথা বলে। এই রূপমতীর মা রাজকন্যা ভানুমতী সেই যে বলত একটা লােকের কথা, কাছারির মাথা, ঘােষবাবুদের জমিদারির ম্যানেজার, এই ফুলকিয়া বইহার, নাঢ়া বইহার জঙ্গলের পত্তনিদার মানুষটার কথা, সত্তর আশি বছর বাদে এরাও জানে। সে এসেছিল কলকাতা থেকে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বনভূমিতে বসত করিয়ে দুঃখ নিয়ে ফিরে গিয়েছিল নিজের দেশে। বনকে নষ্ট করলাম, হে মহামান্য রাজা দোবরু পান্না; লােকটা এসে রাজাকে সেলাম জানিয়েছিল, রাজার জন্য ভেট এনেছিল তাও মনে পড়ে। 

রূপমতী বলল, কতবার বলব, লােকটা এসেছিল দুবার নয় তিনবার, শেষবার এল রাজা দোবরু পান্না মরে গেলে, ভানুমতীর মা তাকে নিয়ে গেল ধনঝরি পাহাড়ের উপর, তার সমাধির উপর শিউলি ফুল ছড়িয়ে দিল মানুষটা, চলে গেল পরদিন, বলল, চিরকালের মতাে যাচ্ছে, মা ভানুমতী বলতে বলতে চোখ মুছত। 

ভানুমতী বলল, মনে হয় মা আমিই তাকে রাজার সমাধিতে নিয়ে গিছিলাম। 

রূপমতী বলল, মা ভানুমতীর বয়স তখন বছর পনেরাে কি চোদ্দো, তারপর কত বছর কেটে গেল, বুড়ি হয়ে গেল মা ভানুমতী, মরার আগে অবধি ভাবত সেই খেলাত ঘোষবাবুদের কাছারির ম্যানেজার মানুষটি ফিরবে। তার জন্যই বুড়ি মরছিল না। কত লােক মরে গেল, বুড়ি বেঁচে থেকেই যায়। শেষে কিনা পাঁচজনের একটা দল এল। তাদের ভিতরে বুঝি অবিকল সেই মানুষ। কী করে হয়? রাজকন্যা ভানুমতী বুড়ি হয়ে গল, আর সে বুড়াে হল না! তারা এসেছিল নাঢ়া বইহার আর ফুলকিয়া বইহার দেখতে। ও এক আশ্চর্য কথা শুনাতে, রাজা দোব্রু পান্নার রাজ্য তারই তো ফিরে পাওয়ার কথা। কী অদ্ভুত লেগেছিল শুনে! তা হয় নাকি? যে বনপাহাড় চলে গেছে, আর কি ফেরে? তারা অনেক আশ্চর্য কথা বলল, গুনতে ভালো, কিন্তু তা কখনও হতে পারে না। তাহলে তাে রাজা দোবরু পান্নাকে বেঁচে উঠতে হয়। সেই শেষ রাজা যুদ্ধ করেছিল ইংরেজের বিরুদ্ধে। 

তারা বিচিত্র সব কথা বলেছিল, তাই হবে, রাজা দোবরু পান্নাকেই বেঁচে উঠতে হবে, তার সমাধি থেকেই তিনি যুদ্ধযাত্রা করবেন। সেই রাতে বুড়ি ভানুমতী যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা তার মেয়ে রূপমতীকে বলেছিল পরদিন সকালবেলায়। স্বপ্নটা কী, না রাজা দোবরু পান্না আর সেই এস্টেট ম্যানেজার কথা বলছে সরস্বতী কুণ্ডের ধারে বসে। আর রাজকন্যা ভানুমতী মালা গাঁথছে শিউলি ফুলের। সেই সরস্বতী কুণ্ড আর লবটুলিয়ার বন যা রেখে গিয়েছিল লােকটা, তা ফরেস্টার আর ঠিকেদার শেষ করে দিয়েছে। যুগলপ্রসাদের বসানাে সেইসব গাছ কেটে কেটে চালান করে দিয়েছে শহরে। ফুলের বন শেষ করে দিয়েছে। সেই জায়গাটা বন্দোবস্ত না দিয়ে অনেক বছর পর্যন্ত ভালাে ছিল, কুণ্ডের জল শুকিয়েছে বহুদিন। 

কতদিন আগের কথা এসব। তখন রূপমতির বয়স চোদ্দো, সেই তার মায়ের বয়স, যে বয়সে মা কেঁদেছিল কলকাতার সেই মানুষটির জন্য। মানুষটির চোখ দেখে রাজকন্যা ভানুমতীর বুঝতে কোনাে অসুবিধেই হয়নি, তাকে ভালােবাসা যায়। ভালােবেসেই ফেলল রাজকন্যা। মানুষটি ধনঝরি পাহাড় থেকে নামতে নামতে ভানুমতিকে বলেছিল, ইচ্ছে হয় এই ধনঝরি পাহাড়ের কোলে ঘর বেঁধে থেকে যাই আর সন্ধেয় দাওয়ায় বসে তােমার বকম বকম শুনি ভানুমতী, তুমি যা জানাে তা কেউ জানে না কোথাও। 

মা মেয়ের কথার ভিতরে উঠোনে এসে দাঁড়ায় একটি লােক। কে? রূপমতী উঠোনে এল দাওয়া থেকে। আসলে উঠোন আর দাওয়া একই সমতলে। দাওয়ার চাল ঝুঁকে পড়েছে এত যে লম্বা লােকটির মুখ দাওয়ায় বসে দেখা যাচ্ছিল না। দেখল ধনেশ সিং। তারা এতই মগ্ন ছিল যে ধনেশ সিং রাজপুত যে ঢুকছে তাদের ভিটেয় তা টেরও পায়নি। হ্যাঁ, বুকবুক শব্দ একটা শােনা যাচ্ছিল বটে, তা অনেক দূরে। উঠোনের বাইরে মােটর সাইকেল রেখে হেঁটে এসেছে রাজপুত। আগে হাতি আর ঘােড়া ছিল বাহন, এখন মােটর সাইকেল। ধনেশ সিং রাজপুতকে দেখে কুঁকড়ে গেল রূপমতী, কথা বলতে সাহস হয় না তার, কে জানে কী মনে করে এসেছে লােকটা, ভয় হয়। 

ধনেশ সিং রাজপুতের কোমরে যে যন্ত্রটি ঝুলছে তা চেনে রূপমতী । রাজপুত বলল এ জায়গা সাফ করে দিয়েছি, টহলদার বাহিনী ঘুরছে, সব পালিয়েছে। 

রূপমতী কথা বলে না। ধনেশ সিং বলল, তােরা ছাড়া পেলি আমার জন্য। 

রূপমতী ঘাড় কাত করে, মনে মনে বলে, তুমি রাসবিহারী সিং রাজপুতের নাতি, তােমার সব অভিসন্ধি আমি জানি। রাসবিহারী সিং-এর সব কথা রূপমতীকে তার মা ভানুমতী বলে গেছে। মা ভানুমতী আর কুন্তা বুড়ি ধনঝরি পাহাড়ের উপর বসে দূরে মহালিখারূপ পাহাড়শ্রেণির দিকে তাকিয়ে ভয়ানক রাসবিহারী সিং রাজপুতের কথা বলত। কুন্তাকে সে কতবার টেনেছে। ভয় দেখিয়েছে তার বাচ্চাগুলােকে আছড়ে মারবে যদি কুন্তা তার কথা না শােনে। শেষে পালিয়েই গেল সে। তারপর সেই মানুষটা জমি বন্দোবস্ত করে দিয়ে গেল তাে কুন্তা বাঁচল। সেই রাসবিহারীর নাতি দাঁড়িয়ে। 

ধনেশ সিং বলল, লবসাকেও ছাড়িয়ে আনব, কিন্তু আমার একটা কথা শুনতে হবে। 

রূপমতীর মেয়ে ভানুমতী দাওয়া থেকে কুটিরের ভিতরের অন্ধকারে গিয়ে ঢুকেছে। মা তাকে বলেই দিয়েছে, ধনেশ সিং বা তার সাগরেদরা ঘুরঘুর করে শুধু তার জন্য। সুযােগ পেলেই টেনে নিয়ে যাবে। শুধু সে রাজা দোবরু পান্নার নাতনির নাতনি, রাজার ছায়া নিয়ে আছে, তাই ছাড় দেয়, না হলে গরিব আদিবাসী আর গঙ্গোতা মেয়ে কি ছাড় পায়? বনের ভিতরে আগে টানত, এখন ফুর্তির বাংলােয় নিয়ে গিয়ে তোলে। বাড়িতে কাজে ঢুকিয়ে দিনের পর দিন তাকে নিয়ে শুয়ে, আঁচড়ে কামড়ে শেষ করে দেয়। ধনেশ সিং-এর বাড়ির মেয়েরা জানে এইটিই পুরুষের দস্তুর। তাদের কাজ ছেলে বিয়ােনাে আর গয়না গড়া। কন্যা-সন্তান যদি হয়, তার মায়ের বড়াে বিড়ম্বনা। এসব জানে ভানুমতীর মা রূপমতী কেন ভানুমতীও। ভানুমতী অন্ধকারে বসে ধনেশ সিং এর কথা শুনছে। ধনেশ সিং বলল, লবসা আর আসবে না গাঁয়ে, তােরা উঠে যাবি এখেন থেকে, বুজলি ? 

রূপমতী বলল, এ তাে আমাদের ভিটে, উঠে যাব কোথায়? 

মিছি নদী পার হয়ে সিংপুরা হাটের দিকে যাবি, বােমাইবুরুতে কাজ শুরু হয়ে গেছে, এবার এদিকে, অনেক হয়েছে, গাঁ শ্মশান করে দিয়েছি, তােরা এবার যা। 

ভানুমতীর বাপ ফিরুক। 

ও তাে এখেনে ফিরতে পারবে না, ওর জন্য সব কাজ আটকে গেল। 

রূপমতী বলল, ওর বাপ না ফিরলে তাে কিছু বলা যাবে না। 

তােরা এ জা’গা না ছাড়লে ভানুর বাপ ছাড়া পাবে না। 

তা কেন হবে? 

ওইটাই হবে, ওইরকমই হবে। 

না, ভানুর বাবা ফিরুক, না হলে আমরা হারিয়ে যাব। 

হারাবি কেন, আমি তােদের জন্য সিংপুরায় ঘর ঠিক করে রেখেছি, তােরা যা, গেলে জামিন পাবে লবসা। 

কী খাব? 

খাটবি আর খাবি, ওদিকে কাজ আছে, বােমাইবুরু খাদানে যাবি, আমি বলে দেব। 

এ তাে তুমি আগেও বলেছ সিং-এর নাতি, আমরা রাজা দোবরু পান্নার দেশ ছেড়ে যাব না, এ আমাদের জায়গা। 

কী বললি? 

শুনলে তাে, সিং তােমার ঠাকুদ্দা রাসবিহারী সিং কত দাপট দেখাত, কিন্তু রাজার কাছে এসে মাথা নামাত, তুমি তাই করবে তাে। 

হাসল ধনেশ সিং, বলল ঠাকুদ্দা আর আমি এক হলাম, শুন, এ বস্তিতে কেউ নেই, তা দেখছিস, সব পালিয়েছে টহলদার বাহিনীর ঠেঙা খেয়ে, তােরা যে ফিরবি তা আমি ভাবিনি, জামিনটা হুট করে হয়ে গেল, আমরা চাই না কারাের জামিন হােক, লেকিন হয়ে যাচ্ছে। 

রূপমতী চুপ করে থাকে। দূরে মহালিখারূপ পাহাড়ের দিকে সূর্য ঢলে গেছে। কী রকম ছায়া ছায়া ভাব সবদিকে। সে জিজ্ঞেস করল, কোনাে লােক নেই? 

নেই, পরশু থেকে সব ঝােপড়ি ভেঙে দেওয়া হবে। 

পুলিশের ভয়ে বনে চলে গেছে? 

না, একেবারে গেছে, বনে চিরুনি তল্লাসি চলছে, বলা আছে বনে থাকলেই গুলি। 

তারপর? রূপমতীর ভিতরে কেমন একটা জেদ জেগে উঠছে, সে রাজা দোবরু পান্নার নাতনি, রাজকন্যা ভানুমতীর মেয়ে। এই বন পাহাড় সব তাদের ছিল। এই বন পাহাড়, সরস্বতী কুণ্ড, ফুলকিয়া বইহার, নাঢ়া বইহার, লবটুলিয়া, মিছি নদী, ধনঝরি গাঁও, পাহাড়, সব তাদের। রাজা দোবরু পান্না বলত, সব চলে গেছে, সব আবার ফিরে আসবে। কী করে আসবে? টাঁড়বারাে সব ফেরত দেবে? টাঁড়বারাে তাে মহিষের দেবতা। এখন মহিষের পরিবর্তে মানুষকে রক্ষা করেন, কেন না বুনাে মহিষ আর নেই। তাদের মেরে চামড়া আর শিং পাচার করে দিয়েছে রাসবিহারী সিং-এর নাতি। ধনেশ সিং বলল, মেরে বনের ভিতরেই পুঁতে দেওয়া হচ্ছে, অর্ডার সেই রকম আছে, কাল সিংপুরা যেয়াে মেয়েকে নিয়ে, আমি থাকব, এসব পরশু থেকে ভাঙা হবে। 

রূপমতী বুঝল এ কথা ফাঁকা আওয়াজ নয়। তাদের যেতে হবে। না গেলে কী হবে? ধনেশ সিং রাসবিহারী সিং-এর চেয়ে শয়তান বেশি। বলছে, মাটির তল থেকে কপার, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, সব ধাতু উঠবে, পাহাড় ভেঙে স্টোন-চিপ যাবে শহরে, সব পাহাড় তার লিজের।। 

কী বললে ? 

ধনেশ সিং মাটিতে লাথি মেরে বলল, সব পাহাড় আমার, বিলিতি কোম্পানি বরাত দিয়েছে ভেঙে ফেলতে।। 

পাহাড় তুমার ? 

হাঁ, তাের মেয়ে নিয়ে কাল ভাের ভাের বেরিয়ে পড়বি, গায়ে কেউ নেই, যে থাকবে তাকে মেরে গ্রাম সাফ করার অর্ডার আছে বাহিনীর উপর।। 

রূপমতী বলল, তুমি যাও সিং বাবু। 

তােরাও যাবি, চাস তাে এখনই তােদের নিয়ে যেতে লােক পাঠাই, এখানে থাকা চলবে না। 

চুপ করে থাকে রূপমতী। ধনেশ সিং একটু দম নিয়ে বলল, পরশু থেকে ডিনামাইট চার্জ করা হবে ধনঝরি পাহাড়ে, তখন এখেনে থাকতে পারবি না।। 

রূপমতী বলল, টাড়বারাে দেখবে, রাজা দোবরু পান্না দেখবে, শুনেছি রাজা বড় গুণীন ছিল, কতদিন আমি দেখেছি রাজা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে হাতে করে চাঁদ নামিয়ে দিন মিছি নদীর দিকে, ধনঝরি থেকে রাজা মহিষের পিঠে চেপে নেমে আসবে, পাহাড় ভাঙতে পারবে না। 

আধবুড়ি রূপমতীর এই কথার পিছু পিছু অপরাহ্নর ছায়া ঘন হয়। গা সিরসির করে ওঠে ধনেশ সিং-এর। এইসব আদিবাসী মেয়েমানুষকে বিশ্বাস নেই। তুকতাক করে দিলে? রূপমতী বলছে, তার ঠাকুরদা রাসবিহারী সিং যতই শয়তান হােক রাজা দোবরু পান্নার সামনে কোনােদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াত না, তুমি তাে সেই শয়তানের নাতি। | 

‘শয়তানের নাতি’ এই ভূষণে ভূষিত হয়েও ধনেশ সিং রাগে না, বরং তার বুক দশ হাত হয়ে ওঠে। যাদের চোখ রাঙিয়ে সর্বস্বান্ত করতে পেরেছে তার ঠাকুদ্দা, তারাই বলে, শয়তান। তাও আড়ালে। ঠাকুদ্দা ছিল বলেই ধনেশ সিং এত বড় হতে পেরেছে। ওই ধনঝরি থেকে মহালিখারূপ পর্যন্ত যত ছােটো বড়াে পাহাড় সব সে ফাটাবে। ভেঙে শেষ করবে। সে আর দাঁড়ায় না, যদি সত্যিই চাঁদ নামাতে নামাতে নেমে আসে রাজা দোবরু পান্না, তখন কী হবে? সে পিছু হটে। উঠন থেকে বেরিয়ে তার মােটর সাইকেলে গিয়ে ওঠে। সে বেরিয়ে যেতেই ভানুমতী কুটির থেকে বেরিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। কী হবে মা? 

মােটর সাইকেলে ফিরতে ফিরতে ধনেশ সিং-এর সাহস ফিরতে লাগল। সে চলে গেল টহলদারি বাহিনীর ক্যাম্পে, ভিনরাজ্যের কম্যান্ডারকে ধরে বলল, এ কেয়া হুয়া নাথজি, বলছ গ্রাম ফাঁকা করে দিয়েছ, কই তা, দুটো মেয়েছেলে আবার গিয়ে বসেছে তাদের। ঝােপড়িতে, পাহাড়গােড়ায়, আজই সাফ না করলে কাল আরও এসে যাবে, যত মারা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি বেঁচে, ভরতি হয়ে যাবে, কত টাকা অলরেডি ইনভেস্ট হয়ে গেছে জানাে, কর্পোরেট তাে এরপর কুইট করবে, কতদিন অপেক্ষা করবে তারা? 

ভােরের ভিতর সাফ করে দিচ্ছি সব। কম্যান্ডার ডাক দিল, বুধিয়া, অ্যাই বুধিয়া, শুয়ার কি বাচ্চে। 

বডি যেন না পড়ে থাকে, পুতে দিয়ে আসবে ধাতুরিয়া, কুন্তা, মঞ্চিদের মতাে, আগে যেমন হয়েছে। ধনেশ সিং বলল। 

ও কে সিংজি। 

মারার আগে মেয়েছেলেদুটোকে বুঝিয়ে দিয়ে এসাে টাড়বারাে, দোবরু পান্না কেউ কিছু নয়, কবরে ঘুমােচ্ছে, এমন বুঝিয়ে দেবে যেন মরার পরও মনে থাকে ওদের, গুড নাইট। 

এ কাহিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাস থেকে পাওয়া বা না পাওয়া। এই যে সেই পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত নাঢ়া বইহার, ফুলকিয়া বইহার, লবটুলিয়া, সরস্বতী কুণ্ড সব সাফ হতে হতে অনেক বছর বাদে হয় তাে ধুলাে। ধাতু নিষ্কাশনের সময় ধনঝরির পাহাড়তলী থেকে নাঢ়া বইহার, ফুলকিয়া বইহারের মাটির তলা থেকে শুধু বেরিয়ে আসতে থাকে ক্যালশিয়াম কার্বনেট। সার্ভে রিপাের্ট, সয়েল টেস্ট—সব জলে গেল। কর্পোরেটের কোনাে হিসেবই মিলল না। কোথায় কপার, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, ইউরেনিয়াম ! বেরিয়ে আসতে থাকে শুধু ক্যালশিয়াম পতিত হওয়া, চুন হয়ে যাওয়া প্রাণীর হাড়গুঁড়াে। বােন ডাস্ট। শুধু তাে মানুষ নয়, যুগলপ্রসাদ, রাজু পাড়ে, মটুকনাথ পণ্ডিত, ধাতুরিয়া, কুন্তা, মঞ্চিরা নয়, ওই বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমির যত প্রাণী, কীটপতঙ্গ, পাখ-পাখালি সব নিধন করে ধনেশ সিং আর টহলদার বাহিনী মাটির তলায় চালান করে দিয়েছিল। শবদেহ মাটির তলায় গিয়ে ঢেকে দিয়েছে যত আকরিক। চুনা পাথর ব্যতীত আর কিছু নেই টের পেয়ে ধনেশ সিং ক্ষিপ্ত হয়ে ছােটাছুটি করতে থাকে। কে তাকে খবর দিয়েছিল, এর পিছনে আছে একটা মানুষ, তিনিও ষাট বছর আগে মারা গেছেন, তাঁর হাড়ও ক্যালশিয়াম কার্বনেট হয়ে উঠে এসেছে যত আকরিকের পরিবর্তে। আর এও শােনা যায় জ্যোৎস্না রাতে তিনি একা একা পার হয়ে যান তৃণহীন বৃক্ষলতাশূন্য বনপাহাড়। শূন্য মাটি ভিজে যায় তার চোখের জলে।। 


২টি মন্তব্য: