শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

এমদাদ রহমানের লেখা : লেখক, পাঠক, পাঠকৃতি, মুখ, মুখোশ ইত্যাদি

পাঠ ও পাঠকৃতি
অ ।। পাঠক

মারিও ভারগাস য়োসা'র নোবেল বক্তৃতার নাম ছিল 'লেখালেখি ও সাহিত্যপাঠের পক্ষে কয়েকটি কথা'; আজ আমাদের এই গদ্যটির শুরুতেই আমরা য়োসা'র সেই অসামান্য বক্তৃতাটির শুরুর দিকের কয়েকটি কথা (এডিথ গ্রসম্যানের ইংরেজি অনুবাদ থেকে) পড়ে নেব :


বলিভিয়া'র শহর কোচাবাম্বায় দে লা স্যাল একাডেমি'র ব্রাদার জাস্তিনিয়ানো'র শ্রেণিকক্ষে, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই আমি পড়তে শিখেছিলাম। এই ব্যাপারটিই আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান। এভাবে পাঠের জগতে একে একে সত্তর বছরের বেশি সময় কাটিয়ে দেবার পর আমার এখনও মনে পড়ে বইয়ে লেখা শব্দগুলিকে ছবিতে রূপান্তরের সেই অদ্ভুত জাদুবিদ্যা নিজের জীবনটিকে ঠিক কতোটা পূর্ণ করে তুলেছিল, কাল ও স্থানের দেওয়ালগুলি ভেঙে গিয়েছিল ধীরে ধীরে, পথ দেখিয়ে দিয়েছিল ক্যাপ্টেন নিমো'র সঙ্গে সমুদ্রের অতল জলরাশির বিশ হাজার লিগ তলে অভিযাত্রায় চলে যেতে, আরামিস, অ্যাথোস, পার্থোসের লড়াই দ্য'আরতাঁনা'র সঙ্গে, রিশেলিও'র গূঢ় অভিপ্রায়ের দিনগুলিতে রাণি'র সহায়তা, প্যারিসের ভূগর্ভস্থ নর্দমায় নেমে গিয়ে জ্যঁ ভালজাঁয় রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া, তারপর ম্যারিউসের অচেতন শরীরটাকে পিঠে করে বয়ে নিয়ে যেতাম বহুদূর।

বইপড়া ব্যাপারটি এমন- এই পড়া স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দেয়, বাস্তব হয়ে যায় স্বপ্ন; পাঠের জাদুস্পর্শে একদিন যে এক ছোট্ট বালক ছিল, তার সামনে জীবন ও স্বপ্নের ঘোর দিয়ে তৈরি সাহিত্যের বিপুলা পৃথিবী তার দরোজা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। মায়ের মুখ থেকে একদিন এই কথাটি শুনতে পেলাম- আমি প্রথম যা লিখতে শুরু করেছিলাম তা ছিল আমার পঠিত গল্পগুলির এক সম্প্রসারণ, কারণ গল্পগুলি যে জায়গাটিতে গিয়ে পৌঁছাত, শেষ হত, সেই শেষটা আমাকে বিষণ্ণ করে ফেলত, আমি তাই গল্পের সমাপ্তিটিকে নিজের মত করে বদলে নিতাম। সম্ভবত ব্যাপারটি ঠিক মত বুঝতে না পেরেই আমি সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছি, আর এখনও বয়সের ভারে ভারাক্তান্ত হয়েও যে-গল্পগুলি আমার ছোটবেলার বিষণ্ণতা ও আনন্দের উৎস ছিল তাদেরকেই নিজের মত করে লিখে গেছি।

আজ যদি আমার মা এখানে থাকতেন, আমাদো নেরভো আর নেরুদা'র কবিতা যখন পড়তেন, আমার মায়ের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ত; আমার পিতামহ- পেদ্র, যার নাকটি ছিল বিশাল, সঙ্গে একটি দীপ্তি বিচ্ছুরিত করা টেকো মাথা- আমার লেখাকে তিনি উদযাপন করতেন; আর একজনের কথা বিশেষভাবে বলব, তিনি আমার লুসো কাকা। এই লুসো কাকাই আমাকে শরীর ও আত্মা নিয়ে লেখায় ডুবে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটিকে আরও বেশি করে উসকে দিতেন যদিও সেই সময়ে লেখালেখি করা নিজেকে উজাড় করার নামান্তর ছিল, সেটা জেনেও। জীবনভর আমি আমার পাশে এরকম মানুষকেই পেয়েছি, যারা এভাবেই আমাকে ভালবেসেছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন, আর যখনই আমি নানামাত্রিক সংশয়ে ভুগেছি তখনই তাদের বিশ্বাসে আর ভরসায় আমি আস্থা রাখতে পেরেছি।'

পাঠক, আপনি কি কোনও সংযোগ অনুভব করতে পারছেন এই মহৎ লাতিন লেখকের সঙ্গে? উত্তর হ্যাঁ ধরে নিয়ে চলুন, দ্বিতীয় পর্বে যাই!


'জীবন গিয়েছে চলে...', মৃত্যুই অমোঘ নিয়তি তবে! 'কুড়ি কুড়ি বছরের পার...', তবে কি আমাদের ভেতর অন্তর্গত মৃত্যু-স্পর্শ-কাতরতা বাজছে শঙ্খের মত?
জানি না। এত জিজ্ঞাসা আমাদের- এই জীবনের কাছে! সে তবু নিশ্চুপ। বোবা। এই যে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে... এই যে শমশেরনগর স্টেশনে এসে থেমেছে কুশিয়ারা এক্সপ্রেস ট্রেন আর এই যে শনিবার শেষরাতে, দিনরাত্রির সঙ্গমে জেগে থাকছে প্যারিস, এই যে আমাদের মনে পড়েছে খোঁপার ফুল বিষয়ক প্রবন্ধগুলোর কথা... যেন হাত বাড়ালেই ধরে ফেলা যাবে এমন নিঃস্পৃহ ভঙ্গি ডানায় এনে জানালার পাশেই বসে পড়েছে নগরের ক্লান্ত চিল। আমি কী করি এখন? মাঝে মাঝে তাদের পালক খসে পড়ে, দু-একটা। দূরে বহুদূরে খালি গলায় কেউ গাইতে থাকে--অমল ধবল পালে... কুশিয়ারা এক্সপ্রেস কি ভানুগাছ ছেড়ে শ্রীমঙ্গলের পথ ধরেছে? কে দেবে এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর? উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমি মেঘ দেখতে দেখতে স্টেশন থেকে স্টেশন (পড়ুন 'ইস্টিশন') পার হয়ে চলেছি- পল এলুয়ার, লুই আঁরাগ, ভলতেয়ার...যেন মেঘ নয়, একটি মাত্র কবিতার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন, ছিলাম অনন্তকাল, কিংবা মাত্র দু'টি লাইন। মাত্র দু'টি!

As silent as a mirror is believed

Realities plunge in silence by...

কুশিয়ারা এক্সপ্রেস শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে গেছে? বৃষ্টিতে পড়ছে শমশেরনগরে? জেগে থাকছে বুলেভার ম্যাক্সিম গোর্কি...কী মানে দাঁড়াচ্ছে তাহলে এই জীবনের? সাইলেন্ট। মিরর। রিয়েলিটি। সাইলেন্স... সাইলেন্স...

কোনও কোনও রাত হয় প্রত্যাখ্যানের। সেসব রাতে বুকের ভেতর থেকে সাইলেন্স সাইলেন্স বলে চিৎকার করে ওঠেন কবি হার্ট ক্রেন--

Then, drop by caustic drop, a perfect cry...

আরও একজন- মাহমুদ দারবিশ! তার লেখার সঙ্গে থাকতে থাকতে কেটে গেল কত কত দিন। অনবরত কথোপকথন আমাদের। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে তার দু'টি বই কাছে আছে-'In the presence of absence' এবং 'Journal of an ordinary grif'; নিজের সঙ্গে সংলাপ, শব্দে-কথায়-নৈঃশব্দ্যে। হ্যাঁ, এ ছাড়া আমাদের আর কোথায় বেঁচে থাকা! ইমাজিনেশন। ম্যাজিক মাউন্টেন। শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা। পথে পথে ছড়িয়ে পড়া তাজা স্ট্রবেরির ঘ্রাণ। জিপসি মেলকিয়াদেস। মার্কেসের উপন্যাসের সেই অদ্ভুত লোকটা। আমরা পারি। সৃষ্টিতে। মাধবী ও ওয়ালপেপারের যেখানে সংলাপ। 'বিজনের রক্তমাংস'। 'কথা ও হাড়ের বেদনা'। 'অন্ধপৃথিবীর জানালাগুলি'। এইসব পাঠকৃতি, আমাদের মুখে মুখে। অসীম রায়ের ডায়েরি। দেবেশ রায়ের গল্প। ইলিয়াসের পা। রবীন্দ্রনাথ । বুদ্ধদেব বসু। 'সাতটি তারা তিমির'। এই সমস্ত কিছু নিয়েই তো। সুন্দরে। পুনর্পাঠে। আমরা থাকি। আগুনপাখি। হিটলারের মাথায় নাৎসী হেলমেট।

জয় গোস্বামীর 'রানাঘাট লোকাল' ধারাবাহিক লেখার একটি পর্বের নাম ছিল 'নৈঃশব্দ্যের সংলাপ'। মনে হলো, আসল কথাটি তো এই। মহাদেশের কথাকাররা শব্দে কথায় সংলাপে নীরবতাই তো ভাঙতে চাইছেন। গভীর এক নৈঃশব্দ্য চেতনার ভেতর দিয়েই তো আমাদের মর্ম ব্যথায় তাদের ভাবনাগুলোকে পৌঁছে দিতে চাইছেন।

'কেন পড়েন?'-এই প্রশ্নে কোনও অদলবদল ঘটে কি, মনে-মননে-বোধে? অন্তর্গত রক্তে খেলা করে কিছু? কেন পাঠক বার বার বইয়ের কাছে ফিরে যায়? তার কোন অসুখের উপশম হয় বই পড়ে? বিস্মৃতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য? সাহিত্য কি তাঁর স্মৃতির ভার বহন করে চলে? আজ যদি সাহিত্য বলে আর কিছুই না থাকে তখন কি মানুষ স্মৃতিহীন হয়ে পড়বে!?

সাহিত্যকে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে কোনও একটি বইকে লেখকরা 'স্মৃতি' হিসেবে বর্ণনা করেন; এই স্মৃতি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়; সাহিত্যের একটি সুতো বুনে চলে আত্মস্মৃতির জামা। তাহলে এই প্রশ্নটিও চলে আসে- সাহিত্যে মানুষ কি তাঁর 'আত্ম'কেই খুঁজে? নিজেকেই পড়ে? পড়তে পড়তে নিজেকে ভেঙে আবার গড়েও নেয়? যে-মানুষ দিনে দিনে নিঃসঙ্গ থেকে আরও গভীরতর নিঃসঙ্গতায় ডুবে যাচ্ছে, চরম একাকীত্বে জীবন ভরে যাচ্ছে তাঁর, সাহিত্য কি তাঁর কাছে নির্জনতার কোনও চিকিৎসা পদ্ধতি? কিংবা যখন পেরুর নোবেলজয়ী লেখক মারিও বার্গাস ইয়োসা 'আপনি কেন লিখেন?' এই প্রশ্নের উত্তরে 'প্যারিস রিভিউ'-কে বলেন- I write because I'm unhappy. I write because it's a way of fighting unhappiness, তখন কি কোনও বেদনাবোধে আক্রান্ত হই আমরা? আত্মপ্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকবার কথা ভাবি?

হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড' কিংবা 'শতবছরের নিঃসঙ্গতা' উপন্যাসটির নাম শুনলেই মনে হয় -এই 'নিঃসঙ্গতা' শব্দটির মধ্যেই পৃথিবীর সমস্ত মানুষ যেন দাঁড়িয়ে আছি; আর, এই একটি শব্দই যেন সম্পর্ক তৈরি করে দেয় মার্কেজের সঙ্গে আমাদের অর্থাৎ লেখকের সঙ্গে পাঠকের; তৈরি হয় নতুন নতুন পাঠকৃতি। সাহিত্য এমনই, সে 'ইভান ইলিচের মৃত্যু'ই হোক কিংবা মেটামরফসিসের 'গ্রেগর সামসা' হোক, নতুন পাঠকৃতির জন্ম হবেই, নিরন্তর পঠনপাঠনের ভেতর দিয়ে; লেখকে-পাঠকে সম্পর্কের সূত্রও তৈরি হবে।

বোর্হেসের সেই গল্পটিও আমাদের জীবনে অমোঘ হয়ে ওঠে, ব্যাবিলনিয়ার বন্দি সম্রাটকে কোনও এক আরব্য সম্রাট এক অন্তহীন গোলকধাঁধায় মুক্ত করে দেন- দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমির মাঝখানে, যার কোনও দিকচিহ্ন নেই; উত্তর-দক্ষিণ ধারণারও বাইরে। চিরন্তন এক গোলকধাঁধায় পাঠকরা চিরদিনের জন্য পতিত হতে হয়। যে-গোলকধাঁধা সাম্রাজ্যের স্থপতিগণ তৈরি করেছিলেন যেখানে আরব্য সম্রাট পথ হারিয়েছিলেন, মরুভূমির গোলকধাঁধার কাছে মানুষের তৈরি গোলকধাঁধা কিছুই নয়।

লেখকরা নতুন অনুভূতি-অনুভব ও বাস্তবতার আবিষ্কারক, এই যেমন 'চাঁদের অমাবশ্যা'। 'লালসালু' কিংবা 'একটি তুলসি গাছের কাহিনি'র বাস্তবতাকে অতিক্রম করে পাঠক যখন আরও দূরগামী হতে চায়, লেখকের আরও বিশিষ্ট রচনা পড়তে আগ্রহী হয় আর নিজের অজান্তেই একদিন 'চাঁদের অমাবস্যা'র পাঠে ঢুকে পড়ে তখন সে একই সঙ্গে যেন জটিল মনস্তাত্ত্বিক ঘোরলাগা জগতেও ঢুকে পড়ে। চরিত্রের টানাপড়েন কিংবা আন্তরজাগতিক জটিলতার ঘোরে পাঠকও যেন এক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে যান। পাঠকমাত্রই জানেন- কীভাবে একটি হত্যাকাণ্ডের অনুষঙ্গে লেখক বলে ফেলেন জীবনের পক্ষে অমোঘ কিছু কথা। উপন্যাসটি ওয়ালীউল্লাহ্‌ লেখেন ফ্রান্সের আল্পস পর্বত অঞ্চলের পাইন আর দেবদারু গাছ পরিবেষ্টিত ইউরিয়াজ নামক এক ক্ষুদ্র গ্রামে বসে। আর পাঠক, বাংলাদেশের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসটি পড়ছে হয়ত ইংল্যান্ডের কোনও গ্রামে চেরি, নাশপাতি, গোলাপ আর আঙুরলতার ছায়ায় বসে, তাঁর পাঠ-অভিজ্ঞতায় ঢুকে পড়ছে যথার্থ এক উপলব্ধি- 'সত্যই সত্যকে আকর্ষণ করে'। সাহিত্যে দেশকালের সীমানা এভাবে ভেঙে পড়ে। তখন সাহিত্য এক মিথ, এক আশ্রয়, অন্তর্জগতের সঙ্গীত। আমরা হয়ত একজন মানুষকে দেখছি- যে পড়ছে। পাঠক। কিন্তু সে মানুষ তো গড়ে ওঠা, অর্থাৎ নির্মিত। তাঁর ভেতরে বহু মানুষের বাস। বহুল স্বরের এক দেবতা সে। সেই দেবতায় আমাদের শ্রদ্ধা।
অথবা সেই পাঠকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক কীরূপ হয়, যে-পাঠকের ভিতরে লেখক হওয়ার একটি বীজ লুকিয়ে থাকে!

লেখালেখিও শিল্পকর্ম, এক শিল্পমাধ্যম, যা মানুষকে অর্থাৎ তাঁর পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে। পাঠক তাঁর নিজের ভিতরে সেই শিল্পকর্মের রস টেনে নেয় মহাবৃক্ষের মত, তাতে জীবনের অর্থের কাছে মানুষ পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়।

কিংবা- সে পাঠক যখন পুরদস্তুর এক লেখক, তখন? মার্কেজ যখন হেমিংওয়েকে পড়ছেন কিংবা বোর্হেস পড়ছেন জয়েসকে, তখন? লেখক যখন পাঠক, তিনি তখন শুধু যে আনন্দের জন্য সাহিত্য পড়বেন তা তো নয়, তিনি একাধারে একজন বোদ্ধা বিশ্লেষক এবং কঠোর সমালোচকও, সেই সঙ্গে তিনি খুঁজে নিচ্ছেন নিজের পথটিও। পাঠ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি নিজেকেও চিনতে পারছেন। এভাবে সাহিত্য এগিয়ে চলে। লেখক নিজের পথ স্পষ্ট করে দেখতে পান। যেখানে, সব কথা বলা হয়ে গেছে, সেখানে- তিনি কীভাবে নতুন ভঙ্গিতে বলবেন, এবার? মানুষ এভাবেই সাহিত্যে তাঁর নিজস্ব স্মৃতিকোষ নির্মাণ করে নেয়। নিজেকে সে ভবিষ্যতের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে! সাহিত্য তখন বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই। লেখা তাহলে কী? কেন এই লেখার এত বিশাল আয়োজন!

এজন্যই লেখককে যে-প্রশ্নটি যুগের পর যুগ ধরে করা হচ্ছে, আগামীতেও যতদিন লেখালেখি হবে, লেখাপত্র টিকে থাকবে, ততদিনে এই জিজ্ঞাসাটি আরও ধ্রুপদী হবে-

কেন লেখেন?

আর, পাঠকের জন্য- কেন পড়েন?

এইসব প্রশ্নের আশ্চর্য সব উত্তর পড়তে গিয়ে আমাদের একদিন মনে হয়েছিল একটা আর্কাইভ করে ফেলা যাক। 'দ্য প্যারিস রিভিউ'য়ের ইন্টার্ভিউ আর্কাইভের মতো। যেখানে রক্ষিত থাকবে আপনার আমার শুনতে চাওয়া কিছু কথা, মহাদেশের কথকরা যা বলে গেছেন। আমরা চেয়েছিলাম--এইসব থাকুক, একটি বইয়ে, পাঠক আশ্রয় খুঁজে পাক প্রতিটি প্রশ্নে, প্রতিটি উত্তরে।

জীবনকে আমরা ভালবেসেছিলাম, জেনেছিলাম তার রঙটি সবুজ; ভেবেছিলাম জীবন এক ফুল...সে ফুলের পাশে কিছু শামুক, তার সঙ্গে পাতা, গন্ধ, ঘ্রাণ আর স্মৃতি; বৃদ্ধা ইভলিন আর তার কুকুর,-- প্যারিস, গন্ধ আর ঘ্রাণ, স্মৃতি আর জীবনের, যে জীবন শরণার্থীর, উন্মুল সব মানুষের।

এই ছিল কয়েকঘণ্টা আগের খুব চেনা, আটপৌরে এক জীবন, ঠিক যেন স্টিল লাইফ। এর মাঝে হাতে এসেছে 'জার্মান ডায়রি'জ ১৯৩৬-১৯৩৭'; ধূসর মলাটের ওপর সবুজরঙে লেখকের নামটি লেখা- স্যামুয়েল বেকেট!

জীবনের তখন কী হয়? দেখো জীবন, কতকিছু শিখিয়েছ তুমি...কত কত আশ্চর্য অনুভূতি! মনে হয় কী যেন... কোথায়, কোন দেশে এই এখন, হত্যাকাণ্ড ঘটছে! তারপর, মনে হয়, পিটার্সবার্গের কনসার্টে গান গাইছে 'পোয়েটিক জাস্টিস', কবি জয় হার্জো স্যাক্সোফোন বাজাতে বাজাতে গাইতে শুরু করেছেন 'দ্য বার্ডস...' এখনই জেগে উঠবে সমস্ত মানুষ! একটা বই হাতে নিলে কতকিছু হয়। কত ভাঙচুর। এই যে একটি ভয়ানক অভিনয় দৃশ্য-

শুয়োরের বাচ্চারা, সাবধান হবি, সা আ আ আ আ ব ধা আ আ আ আ আ ন...

ধুপধাপ আওয়াজ হয়। বাতাসে গোঙানি। চাপা। গন্ধ আসে। গন্ধ যায়। ভেঙে যাওয়া থেঁতলে যাওয়া এক কণ্ঠস্বর :

হরিদাস, হরিদাস... সাবধান হবি...
রাজা সাবধান করে দিয়েছেন। কেউ কারো মুখের দিকে তাকাবি না।

কেউ কারো মুখের ভাষা পড়বি না।

ঘেউ ঘেউ। দূরে। থেমে থেমে। ঘেউ ঘেউ।

বাতিগুলো নিভে যায়। আসলে, নিভে যেতে চায়...ঘুমন্ত মানুষের জেগে উঠবার সময় হয়ে যাচ্ছে!
পাশের জানালা দিয়ে প্যারিসের রাতের আকাশ দেখি। মেঘ করেছে। রাস্তায় যুবক-যুবতীরা, চুম্বনরত। সেপ্টেম্বরে, হঠাৎ ঠাণ্ডা নেমেছে। হাসান আজিজুল হককে মনে পড়ে, তাঁর গল্পকে : এখন নির্দয় শীতকাল। ঠাণ্ডা নামছে হিম... এইসব। খোলা জানালার কারণে 'ঠাণ্ডা নামছে হিম' ভয়ানকরকম টের পাওয়া গেল। মনে হচ্ছে গান গাইছে পৃথিবীর সমস্ত স্ট্রিটলাইট- ওলমৌস্ট হ্যাভেন... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া...

বুকটা হু হু করে উঠে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া! 'ঠাণ্ডা নামছে হিম' আর 'ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া' আমাদের কোথায় নিয়ে যায়? ছোট বোনটির কাছে? মায়ের কাছে? শমসেরনগরে? জানালা খোলাই থাকে। কোরাস ঢুকে পড়ে বুলেভার ম্যাক্সিম গোর্কির এক কুঠরিতে।

আত্মজা ও একটি করবী গাছের 'ঠাণ্ডা নামছে হিম' এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে আর খোলা জানালায় আকাশ! মনের ভিতর কোরাস- কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া; যেন শমসেরনগর থেকে হেঁটে হেঁটে চলে গেছি কোনও এক অচেনা ইস্টিশনে! কেবল, ছাদের ওপর বসে থাকবে একজন- ফিডলার। রাতের ক্রমশ শেষ হওয়া দেখে দেখে ভায়োলিন বাজাবে সে। ছাদের ওপর ফিডলার। নিঃসঙ্গতা! আহা, নিঃসঙ্গতা! গন্ধ ও ঘ্রাণ; স্মৃতি ও জীবন! বাবার খুব প্রিয় ছিল সূর্যমুখী ফুল। তার মৃত্যুর পর, ফুলগুলি কোথায় ফোটে? ভোরে, মা যখন বাবার কবরের দিকে তাকান, আমার স্থির বিশ্বাস সূর্যমুখী ফুলগুলি তখন তার বুকের ভিতর ফুটতে থাকে।

ওলমৌস্ট হ্যাভেন... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া...

শুয়োরের বাচ্চারা, সাবধান হবি, সা আ আ আ আ ব ধা আ আ আ আ আ ন... নতুন দিনের খবরের কাগজের শিরোনাম-- স্টপ দিজ ম্যাডনেস! ... আর, শিশুদের লাশ। বাবার সূর্যমুখী ফুল মায়ের বুকে ফুটছে! ভোর হচ্ছে প্যারিসে, রোমে, হ্যাম্পশায়ারে, শমসেরনগরে, ভেনিসে, লন্ডনে। ছাদের ওপর ফিডলার। ভায়োলিন বাজাচ্ছে। তখন, আলবেয়ার কামু তাঁর নোটবুকে লিখছেন- 'আমি অস্তিত্বের অভিঘাতের দিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করি না, কিন্তু আমি এমন কোনও যাত্রাপথও আকাঙ্ক্ষা করি না, যা মানুষ থেকে দূরে সরে গেছে। আমরা কি আমাদের তীব্রতম অনুভূতিগুলোর শেষে ঈশ্বরকে খুঁজে পাব?'

আজ শরীর কাঁপছে স্মৃতি ও কথার অভিঘাতে। কিছু কথা এখনি পড়তে হবে। দ্রুত খুঁজে বের করলাম ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাস। পড়তে লাগলাম শেষপৃষ্ঠার কিছু কথা, আজকের এই অস্থির সময়ে-

Quickly, as if she were recalled by something over there, she turned to her canvas. There it was -- her picture. Yes, with all its green and blues, its lines running up and across, its attempt at something. it would be hung in the attics, she though; it would be destroyed. But what did that matter? she asked herself, taking up her brush again. She looked at the steps; they were empty; she looked at her canvas; it was blurred. With a sudden intensity, as if she saw it clear for a second, she drew a line there, in the centre. It was done; it was finished. Yes, she thought, laying down her brush in extreme fatigue...


রাত শেষ হচ্ছে। বুলেভার ম্যাক্সিম গোর্কির রাত! এখনই, ঘুমিয়ে পড়বার আগে, আমাদের আরও কিছু অমৃতকথা পড়ে ফেলতে হবে। হে সময়। হে অধিরাজ। হে বাতিঘর। সময়ের যে তীব্র স্রোত বয়ে যাচ্ছে আমাদের ওপর দিয়ে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'দিবারাত্রির কাব্য' উপন্যাসের এই কথাটির মুখোমুখি হলে আমরাও যেন বহু কিছু আবিষ্কার করি- 'জীবনের রহস্যময় গলিঘুপচি'। আমরাই যেন এক একটি উপন্যাস। আমরাই কথা বলছি পরস্পরের সঙ্গে। বড় লেখকরা বড় অনুভবের দিকে আমাদের নিয়ে চলেন। আমরা তো সারথি।


কী হয় পাঠে? হয়তো, কথায় কথায়, শব্দে-বাক্যে-গন্ধে পাঠকের সঙ্গে লেখকের এক সংযোগও তৈরি হয়, ব্যক্তিজীবন আর অভিজ্ঞতা আর প্রজ্ঞাই তো প্রকাশ পায় কথা রূপে। এই যে নতুন এক সংযোগ, আমরা তো এভাবেও, ভাষার সীমান্ত পেরিয়ে লেখকের কাছে পৌঁছই, এ এক আশ্রয় আমাদের- পাঠকের, লেখকের; আর এভাবেই হয়তো পৌঁছেও যাওয়া যায় এক সমগ্রতার কাছে, যেখানে শতবছরের নিঃসঙ্গতা কেটে যায় আত্মার চিৎকারে।

আ ।। পাঠকৃতি
শিল্পীর জীবনতৃষ্ণা
জীবন পিয়াসা (Lust for Life) মূল : আরভিং স্টোন, ভাষান্তর : নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, প্রকাশক : সুবর্ণ রেখা, কলকাতা

কোনও কোনও পাঠে আমাদের আটপৌরে জীবন বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, মামুলি বিষণ্ণতা নয় সে, এ এমন বিষণ্ণতা আমাদের যা তাড়িত করে! মহাজীবনের পাঠ বড় সংক্রামক; গভীর, বিস্তৃত বিপুলা এ মানব জীবন চিরবিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয় মহাজীবন পাঠে! আমরা তখন ভাবি, জীবন কি সার্থক হলো? শিল্প হয়ে উঠল? না কি আগাগোড়া ব্যর্থ হল? না কি সব কিছু, সমস্ত আয়োজন ব্যর্থ হলো মৃত্যুতে! মৃত্যু নাকি আত্মহত্যা? এভাবে শুরু হয় ক্ষয়, এভাবেই ক্ষয়ের পথ ধরে আসে ধ্বংস, আত্মধ্বংস! এই এক মহালীলা, জীবনের অমোঘ নিয়ম। কারিগরের কুশলতা। নির্মাণ। যে-উপন্যাসে দেখি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা—পল সেজান, গগা, লোত্রেক, সিউরাত, ভ্যান গগ—কপর্দকহীন, তৃষ্ণাকাতর, পঙ্গু, হতদরিদ্র, পাগলাগারদে মরছে, বেছে নিয়েছে সন্নাসীর জীবন, খর রৌদ্রের উত্তাপে পুড়ছে তাদের ক্যানভাস— সে-উপন্যাস আমাদের দিনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে; আর অংশ যে হয়ে ওঠবে তাই তো স্বাভাবিক। এমনকি এই একটি উপন্যসের কথা আমরা হয়ত কোনও দিনও ভুলতে পারব না।

একদিন অন্ধকারে হাঁটছিল সে—ভ্যান গগ, শিল্পী—আশ্রয়ের মতো অন্ধকারে! আরও আগে, লন্ডনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল সে—শিল্পীর জীবন শিল্প হয়ে উঠবে কি না, আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে কি না! হাঁটতে হাঁটতে জেসাসের বাণি মনে পড়ে যায় তার—ভয় কি আমার? আমি তো একলা নই। ঈশ্বর আছেন আমার সঙ্গে। তখন এক অপার্থিব আনন্দ আর শান্তি যেন পৃথিবীর বুকের ভিতরের রসটাকে ক্যানভাসে টেনে আনবার দুর্নিবার প্রেরণা হয়ে ওঠে।

য়্যুরোপের কয়লাখনির শ্রমিকদের আঁকে ভ্যান গগ; তাদের মুখগুলো কখনওই স্বাভাবিক মানুষের মুখের মতো ক্যানভাসে উঠে আসে না, তখন আরেক শিল্পী বলেন— চিত্রে একটা ব্যাপার থাকে—মুখ। শিল্পী কখনও মুখটাকে এমন মায়ায় বিকৃত কিংবা কিম্ভূত করে আঁকেন, মনে হয় চোখের সামনের ক্যানভাসে মুখ নেই, সব মূর্তি। সে মূর্তিতে একসঙ্গে অনেক মুখ।
উপন্যাসটিই এমন, একবার পড়তে শুরু করলে পিপাসা না মেটা পর্যন্ত পড়তে হয়, ঠিক যেন তৃষ্ণার্তের জলপান। কেন? কেন এই অমোঘ টান? উপন্যাসের নায়ক ভিনসেন্ট ভ্যান গগ বলে? যে-শিল্পী আত্মহত্যা করেন, সে-শিল্পী কেন এমন তীব্র রঙের ছবিগুলো আঁকেন?
সাড়ে ৫শ পৃষ্ঠার বিপুল এই উপন্যাস সত্যিই তীব্র। মাঝে মাঝে অসহ্য মনে হয়। অসহ্যতায় ভিতরে ভিতরে মথিত হতে হয়। বারবার ভ্যান গগের মতোই মনে প্রশ্ন জাগে—সত্যকে কি সহজে পাওয়া যায়? তাই কি যা কিছু কুৎসিত তাকে সৃষ্টি করাই হয়ে ওঠে আধুনিক শিল্প? জীবনের মধুরতম সৌন্দর্য তখন আর শিল্পীর চোখে পড়ে না! আর জীবনের বিপুল স্রোত থেকে পালিয়ে আদিবাসী জীবনে পৌঁছে কোনও কোনও শিল্পী দেখতে পায় অনন্তের অলৌকিক ঈশারা, অবিরত!

রঙের সঙ্গে পরচিয় ঘটে আমাদের। সেই সঙ্গে শিল্পীর মনের। একজন মাস্টার পেইন্টার কীভাবে তার শিল্পের কিংবা মনের ভাবনা প্রকাশের পথে হাঁটেন, ঔপন্যাসিক আর্ভিং স্টোন আমাদের সেই কথা বলেন। আমরা জেনে যাই, শিল্পী আসলে ছবি আঁকেন না, একটি দৃশ্যকে চোখে দেখার পেছনে মনের যে অনুভূতি তাকেই শিল্পী ধরতে চান রঙে আর রেখায়।

নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় নির্মোহ কিন্তু দীপ্তিমান শব্দে বাক্যে বাঙলাকরণ করেছেন দীর্ঘ উপন্যাসটির, কোথাও ছন্দপতন নেই; পাঠকের জন্য এ আয়োজন এক অমূল্য সংযোজন, বাঙলা ভাষায়। এমন অনুবাদ আমরা বারবার পাই না।

এই মুহূর্তে মনে পড়ছে উপন্যাস-বর্ণিত শিল্পী ভ্যান গগের প্যারিস ছাড়ার মুহূর্তটিকে, একই সঙ্গে মনে পড়ছে তার দুনিয়াখ্যাত ‘পটেটো ইটারস’ চিত্রকর্মটির সৃষ্টিমহূর্তের কথাও; প্যারিস ছাড়বার আগে ভ্যান গগ ভাবছে—কোথায় যাব? কোথায় গেলে আবার ফিরে পাব আমাকে! শিল্পলক্ষ্মী কেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে দূরে সরে যায় অধরা মায়াবিনীর মতো? কবে সে ধরা পড়বে আমার রেখার বন্ধনে, রঙের ইন্দ্রজালে? ভ্যান গগ ভাইকে সব বলে, যে ভাইটি, থিও, সারা জীবন আগলে রেখেছে তাকে, মায়ের মমতার চেয়েও যে মায়া প্রগাঢ়! এই থিওর জন্য পুরো উপন্যাসে আমরা শিল্পের প্রতি আরও বেশি উন্মুখ হই, যে-মানুষটি শিল্পীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে আজীবন, নিজেকে সেও ধ্বংস করে; ছবি আঁকে না সে কিন্তু পাশে থাকে, বন্ধুর চেয়েও বেশি আদরে লালন করতে চায় শিল্পী আর সৃষ্টিকে। একদিন মহামরণ শিল্পিকে কেড়ে নেয়, বেঁচে থাকার ক্লেদ আর ক্লান্তি থেকে মুক্তি দেয় তাকে, পেছনে পড়ে থাকে চিত্রকলার সরঞ্জাম—রঙ, প্যালেট, ক্যানভাস, ইজেল, স্টুডিয়ো আর কিছু কীর্তি। মানুষ যে কীর্তিকে বুকে বুকে বয়ে চলে পৃথিবীর শেষ অবধি!

লেখকের দেশ দেখা
চালচিত্রের খুঁটিনাটি, হাসান আজিজুল হক, পরিমার্জিত দে'জ সংস্করণ, জানুয়ারি ২০০৯, কলকাতা

'চালচিত্রের খুঁটিনাটি' বইটি এমন--পড়তেই হয়, না পড়লে বহুকিছুই ঠিক মতো দেখা যায় না, সে দেশ হোক কিংবা কাল; ভালো করে কিছুই দেখা যায় না। সাহিত্যে তো খণ্ডিত আর মৃত এক জীবন পাই আমরা, দেশের মানুষ তাতে যথার্থ ভিড়টি তৈরি করতে পারে না। কিন্তু কিছু কিছু এমন লেখাও থাকে, যে লেখায় লেখক আমাদেরকে প্রকৃত মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। লেখকের আত্মজীবনের অংশ বলেই হয়ত সেইসব লেখায় মানুষ দেখার জন্য আমাদেরকে দূরবীনের ভেতর দিয়ে তাকাতে হয় না, সরাসরিই তাদেরকে দেখা হয়ে যায়; পৃষ্ঠাজুড়ে কালো সার সার শব্দে অজস্র মানুষের মুখই শুধু, এই মুখগুলোই লেখকের গল্পে উপন্যাসে নাট্যে বারবার ফিরে আসে।
জীবনে হয়ত খুব বেশি পড়ার দরকার হয় না কিংবা একই বই পুনর্পাঠেরও দরকার পড়ে না, কিন্তু হাসান আজিজুল হকের এই বইটি, যারা তার পাঠক এবং সেইসব পাঠক যারা প্রবীণ এই লেখককে কিছুটা গভীরে নেমেই পড়তে চান, বইটি তাদের জন্য এক নতুন জগৎ নির্মাণ করবে, তাতে সন্দেহ নেই। একজন লেখক তার দেশকে দেখতে বের হয়েছেন। চাক্ষুষ করছেন অন্তর্ভেদী চোখে। এই দেখার সঙ্গে আমরাও শামিল হই, দেশকাল দেখতে গিয়ে আমরা পাঠকরাও দেখে ফেলি একদম কঙ্কালসুদ্ধ একটি দেশ। আমরা ধরেই নিই যে কেবল আমাদের দেখাবেন বলেই লেখাগুলি লিখতে বসেছেন তিনি। দেখানোই তো লেখকের কাজ।

বইয়ের একটি লেখার সঙ্গে আরও আগেই আমার পরিচয় হয়েছিল। সেই যে-বছর তার 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ' গল্পটি প্রথম পড়েছিলাম, তারপর যে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তার লেখাপত্রের প্রতি, যে-ঘোর জন্মেছিল তাকে সমগ্রভাবে পড়বার, সেই ঘোর কিংবা টানে সিলেটের উত্তর জিন্দাবাজারের 'বইপত্র' থেকে একের পর বইগুলি কিনে পড়তে শুরু করেছিলাম। তখন আমার দেখা স্বপ্নগুলোও আর সাধারণ ছিল না, স্বপ্নরা দারুণ হিংস্র হয়ে উঠছিল।

ইউপিএল থেকে বের হওয়া 'রাঢ়বঙ্গের গল্প' বইটিতে, ভূমিকা হিসেবে একটি গদ্য ছিল- 'গল্পের জায়গা জমি মানুষ' নামে, সেই লেখাটি প্রথম পাঠের পর, আরও বার'কয়েক পড়েছি; লেখাটির কিছু কিছু কথা তো মনে গেঁথে গেছে, পাকাপাকিভাবেই। অন্তত এই কথাটি বলতে পারি জোর দিয়েই। 'চালচিত্রের খুঁটিনাটি'তেও সেই গদ্যটি আমরা পাই। সেই সঙ্গে পাই আরও কিছু এমনধারা গদ্য, মেজাজের দিক থেকে গল্পের জায়গা জমি মানুষের সঙ্গে যাদের অন্তর্গত মিল রয়েছে।

এই বইয়ের যে সংস্করণটি আমাদের কাছে আছে, তার পেছনের প্রচ্ছদে কিছু কথা আছে, যা বইটির মেজাজ বুঝতে আমাদেরকে সাহায্য করে। 'গল্প নয়, প্রবন্ধ নয়, ভ্রমণকাহিনীও নয়, অন্যরকম এক প্রেক্ষণে দেশ, মাটি আর মাটি-লাগা মানুষকে দেখার অন্তর্ভেদী ও প্রচণ্ড কলমের হলকর্ষণ থেকে জাত এই লেখাগুলি।' সে আমরা পড়তে পড়তেই বুঝতে পারি যে এই বই হচ্ছে লেখকের 'লেখার মাটি, লেখার মানুষ' দেখবার এক নিরন্তর ভ্রমণ। বইয়ের শুরুতে, 'চালচিত্রের খুঁটিনাটি' লেখাটিতে তিনি আমাদের জানাচ্ছেন- 'চরিত্রের সন্ধানে নয়, কাহিনির খোঁজেও নয়, খুব কাছ থেকে নজর করে মানুষ, তার জীবিকা আর যে জগতে সে আষ্টেপৃষ্টে আটকে আছে তা দেখার জন্য উত্তরাঞ্চলের একটি এলাকায় গিয়েছিলাম।' পরের লেখাটিতে (শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে) বলছেন- 'বাংলাদেশের জনপদের যে ছবি আছে মনের মধ্যে তাকে খুঁজে বেড়াই। বরেন্দ্রভূমির গ্রামে গ্রামে ঘুরি। আত্রাই নদীর কূলে কূলে, পদ্মার চরে, মহানন্দার ওপারে দিকহীন সমতলভূমিতে।' এই কথাটুকু বলেই তিনি একটি সত্য কথা বলেন- 'কোথাও তার খোঁজ মেলে না।'

বরেন্দ্রভূমি! এ যেন ভিন্ন দেশ। ভিন্ন মাটি। ভিন্ন মানুষ। সব যেন আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরের। বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী ও বগুড়া জেলা জুড়ে বরেন্দ্রভূমি, যেখানে গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম, শীতকালে অত্যধিক ঠাণ্ডা। এখানে গ্রীষ্মে রাজশাহী অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রিতে উঠে যায়, নাটোরের কোথাও কোথাও এই মাত্রাও ছাড়িয়ে যেতে পারে; আবার শীতে, রংপুর, দিনাজপুরে তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে।

লেখক আমাদের জানাচ্ছেন- 'আমাদের দেশ ছিল রুখো কর্কশ। গাছপালা প্রায় নেই। খুব বড়ো বড়ো মাঠ। তেপান্তর যাকে বলে। গরমের দিনে ঘাস জ্বলে যায়। মাটির রং হয় পোড়া তামাটে। শরতে সেই মাটিকেই দেখি হাড়ের মতো শাদা। তবে বর্ষায় কুচকুচে কালো রং-এর মাটিও দেখেছি। তিন মাইল চার মাইল লম্বা মাঠ ন্যাড়া। মহীরুহ। তাদের প্রায় সবাই শতাব্দী পেরিয়েছে। এদেরও অবশ্যি নতুন প্রজন্ম আছে। কচি বট অশ্বত্থ। কেউ তাদের গায়ে হাত না দিলে অবহেলায় শত বছর পরমায়ু পাবে। এই রকম বিরল কিছু বড়ো গাছ বাদ দিলে খোলা মাঠে বনফুল। শেয়াকুল, ভয়ানক রাগী জাতের ফণীমনসা কিছু কিছু দেখা যায়, তাদের গায়ে তামাটে ধুলোর পুরু আস্তর, বোশেখ জষ্টির রোদে ওৎ পাতা ভালুকের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। ...এই হলো রাঢ়। কি নির্দয় শুকনো কঠিন রাঢ়। আমাদের দেশ মধ্যরাঢ়। পশ্চিমে মঙ্গলকোট। গায়ে আগাগোড়া পুরনোর ছাপ। মজা দিঘি, পোকায় খাওয়া দাঁতের মতো ক্ষয় পাওয়া বটগাছ, পাতলা পাটালির মতো ইটে গাঁথা বাড়িঘর; দালান-কোঠা মাটির তলায় সেঁধিয়েছে।...রাঢ়ের কথা মনে পড়লেই গরমকালের কথা আগে মনে পড়ে। মরুভূমির মতো। তীব্র শাদা কটকটে রোদে সব জ্বলে যায়। ধুলো ওড়ে। গাছপালা ঝোপঝাড় ধুলোয় ঢেকে যায়। জমিতে এই বড়ো বড়ো ফাটল দেখা দেয়। এইসব ফাটলে চোখ দিয়ে উবু হয়ে কতো দিন অন্ধকার পাতালরাজ্য দেখতে চেয়েছি।'

এই পাতালরাজ্যেই হাসান আজিজুল হক আজীবন থাকবেন, লিখবেন; এখানেই রচিত হবে তার অসামান্য বইগুলো- আত্মজা ও একটি করবী গাছ, সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য, আমরা অপেক্ষা করছি, জীবন ঘষে আগুন, নামহীন গোত্রহীন, পাতালে হাসপাতালে, মা মেয়ের সংসার, বিধবাদের কথা, রাঢ়বঙ্গের গল্প, অতলের আধি, একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা, বৃত্তায়ন, আগুনপাখি, শামুক। বইগুলোয় থাকবে- তৃষ্ণা, আত্মজা ও একটি করবী গাছ, ঘর গেরস্থি, সরল হিংসা, পাতালে হাসপাতালে, শকুন, গুনিন, পরবাসী, শোণিত সেতু, আমৃত্যু আজীবন, খাঁচা, নামহীন গোত্রহীন, অচিন পাখি, সাক্ষাৎকার নামের মাইলস্টোন গল্পগুলি।

কবির জীবন
লোরকা'র নির্বাচিত চিঠি (Selected Letters, Federico Garcia Lorca, Edited and translated by David Gershator, First published in Great Britain in 1984 by Marion Boyars Ltd, London.)

রবীন্দ্রনাথের পাঠক কি শুধুই তার কবিতা, গল্প আর উপন্যাসেই আটকে থাকেন? কবিতার বাইরে পাঠক কেন তার একান্ত ব্যক্তিজীবনের দিকে ফিরে তাকাতে চান? রাশিয়ার চিঠি, জাভাযাত্রীর পত্র কিংবা জীবনস্মৃতি তারা পড়েন না? কিংবা আলবের কামু'র উপন্যাস পাঠকের ভেতরে কি তাঁর নোটবুকগুলি পড়বার প্রবল আগ্রহ দেখা দেয় না? রুশদি'র উপন্যাস পড়ার পর তাঁর নিকারাগুয়া ভ্রমণ কেউ পড়তে চান না? হ্যাঁ, এমন অসংখ্য পাঠকও আছেন। প্রচল পাঠের বাইরে গিয়েও তারা তাদের পাঠতৃষ্ণা মিটিয়ে নেন; এ হচ্ছে তাদের ভিন্নপাঠ; এই ভিন্নপাঠে আরাধ্য কবি কিংবা লেখকের জীবনও পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা'র চিঠিগুলিও তেমনই এক সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতায় ভরিয়ে দেয় আমাদেরকে। বলা যায়, এভাবেও পাঠ সম্পূর্ণ হয়, হয়ত বহু কৌতূহলও মিটিয়ে নিতে পারি আমরা, তার চিঠির অন্তরঙ্গ পাঠে। Selected Letters, Federico Garcia Lorca, Edited and translated by David Gershator, First published in Great Britain in 1984 by Marion Boyars Ltd, London-কবির মূল্যবান কিছু চিঠির সংগ্রহ। বইটি আমাদের আশ্চর্য করে। লোরকার ২০ বছর বয়স থেকে শুরু করে ১৯৩৬-এ ফ্রাংকো'র বাহিনীর হাতে মারা যাওয়ার এক মাস আগ পর্যন্ত লিখিত অজস্র চিঠি থেকে বেছে নিয়ে গড়ে উঠেছে নির্বাচিত চিঠি'র এই বইটি।
'হ্যাঁ, তুমি এভাবেই লড়াই করতে শিখেছ। এই পন্থাতেই তুমি শিখে যাবে কীভাবে জীবনে প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজের ওপর কর্তৃত্ব তৈরি করবার ভয়ানক শিক্ষানবিশি। তোমার বই 'নীরবতা দিয়ে ঘেরা' পৃথিবীর সমস্ত প্রথম বইয়ের মত, আমার প্রথম বইটিরও মত। আর এই নীরবতারও আছে বিপুল যাদু আর শক্তি। নিজের আনন্দে, লেখ। পড়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ কর। যুদ্ধ কর। নিজের কাজ নিয়ে নিজে কখনও অহংকার কর না। তোমার বইয়ের ভিতর অনেক শক্তি আছে, আছে অনেক অনেক আশ্চর্য হওয়ার মত প্রসঙ্গ, এবং অত্যন্ত চমৎকারভাবে ঘৃণা আর ক্রোধের এক মনুষ্যচিত উন্মোচনের উৎকৃষ্ট চোখ, কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ সাহসী নয়। যে-সাহসের কথা তুমি বলে থাক, যা প্রায় সকল কবির ভিতরেই আবশ্যকীয়রূপেই বিদ্যমান থাকে।

নিজেকে প্রশান্ত কর। আজকের স্পেনে ইউরোপের সবচেয়ে সৌন্দর্যময় কবিতা লেখা হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে, মানুষের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না তোমার 'পেরিতো এন লুনাস' (আয়নার কুশলতা) কখনই নির্বোধ নীরবতা প্রত্যাশা করেনি। না। এই বই প্রত্যাশা করে তীব্র ধ্যান, মনোযোগ, উৎসাহ আর সকলের ভালবাসা। যা তোমার অধিগত এবং সামনের দিনগুলোয় যা তুমি হয়ে উঠবে, কারণ তোমার ভিতর আছে কবির রক্ত। এমনকি তুমি যখন অক্ষরগুলো দিয়ে কিছুর প্রতিবাদ লিখছ, তোমার আলোকোজ্জ্বল আর যন্ত্রণাদগ্ধ হৃদয়ের কোমলতা দিয়ে, তুমি তখনও নিষ্ঠুর বর্বরোচিত ব্যাপারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পার (যা আমার খুব পছন্দের)। আমি অবশ্যই তোমার এইসব বিষয়কে পছন্দ করব, যদি তুমি এই ঘোর থেকে বের হয়ে আসতে পার। এই ঘোর হল কবিকে বুঝতে-না-পারার ঘোর। অন্যভাবে বলতে গেলে, এই ঘোর হল অধিকতর উদার রাজনৈতিক এবং কাব্যিকতায় আচ্ছন্ন অবস্থা। আমাকে লিখ। আমি আমার কিছু বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি যাতে করে তাদের ভিতর 'আয়নার কুশলতা' নিয়ে কোনওরকমের আগ্রহ তৈরি হয় কিনা, এটা দেখতে।

কবিতার বই, প্রিয় মিগুয়েল, খুবই মন্থর গতিতে এগিয়ে চলে। ধীরে। খুব ধীরে।' ১৯৩৩ সালে বন্ধু মিগুয়েল হারনেন্দেজকে চিঠিতে এই কথাগুলো লিখছেন লোরকা। চিঠির কথাগুলি আমাদের কাছে ব্যঞ্জনাময়, এবং বহুমূল্য। কারণ, বিদগ্ধ আত্মার কবির এইসব চিঠিই তো তার স্মৃতিকথা। এছাড়া তাকে আর কোথাও এত নিজের করে পাওয়া যায় না।

১৯২০-এর আগস্টে বন্ধু আন্তনিয় গেলিগো বুরিনকে তিনি লিখছেন-
'আমার এই গ্রামটা কী চমৎকার--কেন তুমি কিছুদিনের জন্য এখানে চলে আসছ না? আমি পুরো গ্রামটাকে আমার আত্মার ভেতরে গভীরভাবে আশ্রয় দিয়েছি। তুমি যদি দেখতে পেতে সেইসব ভুতুড়ে শিশিরবিন্দুভর্তি সূর্যাস্তগুলো, সেই অপরাহ্ণের শিশিরবিন্দু, দেখলে মনে করবে যেন মৃতদের জন্য ঝরছে, যেন তারা সেইসব বিপথগামী প্রেমিকদের জন্য নেমে আসছে, যাদের পরিণতি সেই একই! তুমি যদি দেখতে পেতে এই বিষণ্ণ খালগুলোর বিষাদ আর সেই সেচযন্ত্রগুলোর চাকার জপমালার মত ধীর আবর্তন! আমি প্রত্যাশা করছি এই দেশ, এই গ্রাম আমার গীতিকার শাখাগুলোকে, অপরাহ্ণের লাল ছুরি দিয়ে এই পবিত্র বছরে পরিমার্জিত করে দিবে।'
১৯২১-এর জুলাইয়ে মালশোর হেরনান্দেথকে লিখছেন-

'আসলে, নিজেকে আমি নতুন করে গড়ছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছি এই জন্য যে, দিনের পর দিন ধরে আমি আমার আকাঙ্ক্ষা আর বিভ্রমগুলোর সমন্বয় করতে পেরেছি!

আমি কিছু অদ্ভুত সংলাপ লিখে ফেলেছি, সংলাপগুলো এতই গভীরতাহীন যে তারা অগভীর বলেই গভীর, প্রগাঢ়। প্রতিটি সংলাপ শেষ হচ্ছে একটি গানের সঙ্গে। ইতোমধ্যেই আমি শেষ করে ফেলেছি 'কুমারি', 'নাবিক আর ছাত্র', 'পাগল আর পাগলী', 'সিভিল গার্ডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল' আর 'ফিলাদেলফিয়া বাইসাইকেল'-এর সংলাপ, এবং নাচের সংলাপ। নাচের সংলাপ নিয়েই এখন কাজ করছি।

প্রকৃত কবিতা- নগ্ন। আমি বিশ্বাস করি যে তারা ধারণ করে গভীর আগ্রহ আর আসক্তি। তারা আমার অন্যসব কাজ থেকে অনেক বেশি বৈশ্বিক (যেগুলোকে, আলাদা আলাদাভাবে, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার মত কিছু পাইনি)।'

১৯২৬-এ বন্ধু আনা মারিয়া দালিকে লিখছেন-

'মারিয়া, গ্রানাদায় আমি ক্লান্ত, বিরক্ত। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাইছি, মাঝেমাঝেই, এবং খুব সম্ভবত কিছুদিনের ভেতর।'

১৯৩১-এ গ্রানাদা থেকে রেজিনো দে লা মাহাকে লিখছেন-

'হ্যাঁ, আমি কাজ করছি। এইতো শেষ করে ফেললাম 'পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে' নাটকটি। ভালয় ভালয় নাটকের কাজটা শেষ করতে পারায় বেশ তৃপ্তি পাচ্ছি, আর হ্যাঁ, 'ইয়েরমা' নাটকটি জিরগু'র মঞ্চে অভিনয়ের জন্য প্রায় আধাআধি পর্যন্ত শেষ করে এনেছি। এটা একটা দারুণ প্রচেষ্টা, রেজিনো। পাশাপাশি একটি কবিতাবইয়ের কাজও গুছিয়ে ফেলেছি, 'মৃত্যুর জন্য কবিতা'। কবিতাগুলো খুব তীব্র, প্রগাঢ়। এখনও, মৃত্যু নিয়েই আমার বলবার মত কিছু কথা রয়ে গেছে! আমি, প্রকৃত অর্থেই, এক প্রস্রবণের আদিমুখ। দিনরাত লিখছি। লিখছিই। এই সময় আমি যেন এক প্রাচীন রোম্যান্টিক, কিন্তু এই অলীক কল্পনাবিলাসটুকুকে মর্ম থেকে না তাড়িয়ে এক বিপুল, খুব সচেতন এক সৃষ্টির দিকেই আমার যাত্রা।'

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা'র লেখালেখি শুরু হয়েছিল 'ছায়ারেখা এবং ভূ-দৃশ্যাবলী' বই দিয়ে; বইটিকে বলা হয় স্পেনের চিত্রকলা, ভূ-দৃশ্যাবলী এবং ইতিহাস নিয়ে এক তরুণ কবির গভীর ধ্যান। গ্রানাদা'র সূর্যাস্ত, ক্যাথিড্রালগুলির গথিক স্থাপত্যরীতি, পর্বতমালার সৌন্দর্য থেকে তিনি যেন স্পেনের অন্তর্নিহিত চেতনার রূপটিকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। লুই বুনুয়েল, সালভাদর দালি, নেরুদা, রাফায়েল আলবেরতি, হুয়ান রামোন হিমেনেথ--এইসব দুনিয়াখ্যাত লেখক ছিলেন তার বন্ধু। তার সবচেয়ে বড় কাজ হিশেবে বিবেচিত জিপসি-গীতিকা বের হয় ১৯২৮ সালে। ১৯ আগস্ট ১৯৩৬-এ স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়, ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো'র ফ্যাসিবাদী প্যারামিলিশিয়া ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্যরা তাকে হত্যা করে। তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি।
বন্ধুদের কাছে লেখা লোরকা'র চিঠিগুলিই তার স্মৃতিকথা, তার আত্মজীবনী।

কথা ও গদ্যের স্পর্শশক্তি
অন্ধের স্পর্শের মতো, শঙ্খ ঘোষ, বেতার-সাংবাদিক প্রয়াত প্রণবেশ সেন স্মরণে বক্তৃতা, গাঙচিল, কলকাতা, ২০০৮

এমনও কিছু বই থাকে, পড়ে কখনও শেষ করা যায় না; পাঠের এক অমোঘ টানে বার বার সে বইয়ের কাছে ফিরতে হয়!

এমন বহু বইয়ের কাছেই তো আমরা বারবার ফিরেছি। বিজনের রক্তমাংস। সময় বড় বলবান। ধূসর পাণ্ডুলিপি। ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ। অক্ষয় মালবেরি। চালচিত্রের খুঁটিনাটি। থিংস ফল অ্যাপার্ট, আগন্তুক, বিচার, জিপসি ব্যালাড, দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন, আরণ্যক, রক্তকরবী, হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ...এভাবে বলতে চাইলে নামের তালিকাও দীর্ঘ হবে, দীর্ঘ তালিকার শেষে দিনে দিনে যোগ দেবে নতুন নতুন বই, সেখানে হয়ত এখন সুদানের প্রখ্যাত লেখক তায়িব সালেহ'র উপন্যাস 'উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম' স্থান করে নিয়েছে।
শঙ্খ ঘোষের 'অন্ধের স্পর্শের মতো' বইটিও তেমন। এক বৈঠকে যে বইয়ের পাঠ শেষ হয় না। পাঠ ফুরোয় না কিছুতেই। আরও নতুন আগ্রহের জন্ম হয়, আরও বিপন্ন বিস্ময় অপেক্ষা করে।
বারো, তেরো বছর আগে প্রথম পড়ি এই বইটি। কিন্তু পড়া আর শেষ হয় না আমার, বিভূতিভূষণের ভণ্ডুল মামার সেই বাড়িটির মতো, সেই ২০০৭ থেকে ২০১৮'র শেষ এখন, এই এতদিনেও, পড়াটা সবসময়ই যেন অসম্পূর্ণ থাকে, ভণ্ডুল মামার বাড়ির কাজও শেষ হয় না! কখনও আধা পৃষ্ঠা কখনওবা এক পাতা; মাঝখানে কয়দিন ভুলে যাওয়া, অন্য পাঠে মগ্নতা।

যা কিছু পড়ি না কেন, তৃষ্ণার জল চাইতে ছেলেবেলায় মায়ের কাছে সেই ছুটে যাওয়ার মতো ফিরে আসতে হয় ছোট্ট এই বইটির কাছে। আরও মনে হয়, এই জীবনে আরও বহুবার ফিরে পড়তে হবে এই লেখা। বইটি মূলত একটি বক্তৃতা। প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা; বইটি প্রকাশ করেছে কলকাতার গাঙচিল, ২০০৭-এ। কী কথা ছিল বইটিতে? এভাবে না বলে, যদি বলি- কী এমন মন্ত্রকথা বলেছিলেন বর্ষীয়ান কবি সেদিনের বক্তৃতায়?

হ্যাঁ, সংযোগের ভাষা নিয়ে কথা বলছিলেন শঙ্খ ঘোষ- 'আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়ে। পারি না হয়তো, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।' এই কথাগুলি বলবার আগে, একটি বিশেষ ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি-

'মাসদেড়েক আগে, বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের প্রযোজনায়, একটি অভিনয় চলছিল কার্জন পার্কে। পড়তি বিকেলে, খোলা জায়গায়, ছোটো একটি বৃত্ত তৈরি করে নিয়ে সেখানে রক্তকরবীর অভিনয় করছিলেন কয়েকজন মানুষ, কেউ যাঁরা চোখে দেখতে পান না। দর্শক ছিলেন অল্প কয়েকজন। পূর্ণ অন্ধদের সেই সুঠাম অভিনয়শেষে দর্শকেরা যখন উচ্ছ্বাস জানাচ্ছেন, আশ্চর্য একটি দৃশ্যের জন্ম হলো তখন। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে কুশীলবেরা সবাই তাদের খোলা দু'হাত বাড়িয়ে রেখেছেন প্রার্থীর মতো। কী চান তারা? কিছু কি চান? তাঁদের মধ্যে একজন বললেন : আপনারা সবাই এসেছেন, কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা যদি আমাদের সকলের হাতের ওপর একটু হাত ছুঁয়ে যান, আপনাদের ভালো-লাগাটা আমাদের মধ্যে পৌঁছবে, আমাদের ভালো লাগবে। দর্শকেরা একে একে সকলের হাতে হাত রাখলেন, কারো কারো চোখে এল জল।'

এই হলো ভাষা। এই হলো কথা। সংযোগের অভিপ্রায়। সেখানে এসে মিশে যায় নীরবতার ভাষা। এভাবেই পরস্পরের সঙ্গে আমাদের একটি সংযোগ তৈরি হয়। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। এছাড়া আর যা বাকি থাকে তা হলো বিচ্ছিন্নতা। একা হয়ে যাওয়া। 'আমি' থেকে 'আমরা' হয়ে যাওয়ার ভেতরে সংযোগের যে ব্যাকুলতা, পুরো বক্তৃতাজুড়ে এই প্রবীণ কবি আমাদের বলে গেলেন।

'জীবনের শেষ কয়েকটা বছর চোখে দেখতে পেতেন না আমার বাবা। বই পড়তে ভালোবাসতেন, কিন্তু পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ভালোবাসতেন কথা বলতে। কিন্তু কথাও কিছুটা থমকে গেল। অভ্যাগতেরা কেউ দরজায় এসে দাঁড়ালে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করতেন: 'কে?' নাম শুনে 'কই, হাতটা দেখি' বলে বাড়িয়ে দিতেন হাত। তারপর সেই অভ্যাগতের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন চুপ করে। কথা কখনো হতো, কখনো হতো না। কিন্তু হাতের ওই জড়িয়ে-থাকাটুকু ছিলই।'

এই অংশটুকু পড়লেই বক্তার অভিপ্রায় বোঝা যায়। এই তো কথা বলবার মূল বিষয় 'সংযোগের ভাষা'।

ঠিক করে রেখেছি যে কোনও একদিন, সকাল থেকে সন্ধ্যা, আবারও এক প্রগাঢ় পাঠ নেব বইটির। আত্মস্থ করে নেব কবির আকুতিটুকু।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন