শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

নওয়াজেশ আহমেদ'এর বই নিয়ে আলোচনা : আহত কোকিলের প্রস্থান

পাঠ ও পাঠ প্রতিকৃতি
মোস্তাক আহমাদ দীন 


বইয়ের ওপর অধিকাংশ লেখকেরই সার্বভৌম প্রভাব থাকে না, আহত কোকিল-এর লেখক নওয়াজেশ আহমদের তা ছিল। প্রচ্ছদ-পরিকল্পনা, প্রচ্ছদের ছবি, পুস্তানিতে মুদ্রিত আকাশের পাখি-ওড়া দৃশ্য, লেখা শুরুর আগের ছবি ও তার চিত্ররূপময় বর্ণনা, সবমিলিয়ে যথার্থ সমঞ্জস। বইয়ের লেখার বাইরের যে-আয়োজন, হালের এক উদ্ধত প্রকাশনী যাকে বলে নির্মাণ, প্রকাশক যার নির্মাতা, এতে নানা বাড়াবাড়ির ফলে কখনো কখনো সৃষ্টি আর নির্মাণের মধ্যে তৈরি হয় অলঙ্ঘ্য দূরত্ব, তখন বিষয়ও হয়ে ওঠে সঞ্চরণহীন।
এই বইয়ের লেখক নওয়াজেশ আহমদ যদি কেবলই একজন কৃষিবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা হতেন, তাহলে কী হতো জানি না, কিন্তু তিনি এর বাইরে একজন সার্থক আলোকচিত্রশিল্পী বলেই বইয়ের লক্ষ্য ও বিষয় আমাদেরকে একই সঙ্গে মুগ্ধ ও তাড়িত করছে। শেষ প্রচ্ছদে ইটের দেওয়ালে আধেক মিলিয়ে-যাওয়া এক মানবশিশুর ভাঙাচোরা মুখের উপরে লেখা এ-কথাগুলো পড়ে কে না ব্যথিত হবেন : 

'মানব-অস্তিত্ব প্রকৃতির সম্প্রসারণ মাত্র, প্রকৃতিকে জয় করবার চেষ্টা অর্থ নিজেরই পরাজয় ডেকে আনা। উন্নত বিশ্বের মানুষ অনেক মূল্যের বিনিময়ে আজ জানছে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য গড়ে তোলার মধ্যেই বিজ্ঞান ও উন্নয়নের সার্থকতা। কিন্তু আমরা কিছুই জানিনি, কিছুই শিখিনি। ব্যাপক অজ্ঞতা ও সর্বগ্রাসী অভাব আরেকভাবে বিনাশ ঘটাচ্ছে আমাদের পরিবেশের। এই বিনষ্টির স্বরূপ ও শঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে বর্তমান গ্রন্থে।' 

এ-কারণে বইয়ের নামের নিচে ছোটো করে লেখা রয়েছে আরেকটি উপশিরোনাম : 'রুগ্‌ণ পরিবেশের আখ্যান'। 'নান্দনিক নিসর্গ' আর 'ত্রস্ত নিসর্গ' শিরোনামের দু'টি ভাগে যে-পনেরোটি লেখা রয়েছে, তাতে প্রবেশের আগে আগে পড়ে নেওয়ার জন্য রয়েছে একটি 'গৌরচন্দ্রিকা'ও; বলার অপেক্ষা রাখে না লেখক বলতে চাইবেন, এতে রূপসী বাংলার কথা শুধু থাকবে না, থাকবে ত্রস্ত-বিধ্বস্ত নীলিমার কথাও; শত জলঝর্নার ধ্বনি শুধু নয়, থাকবে রাশি রাশি দুঃখের খনির কথাও। 

জীবনানন্দ যে অনেকটাই দখল করে ছিলেন নওয়াজেশ আহমদকে, লেখা পড়তে শুরু করলেই তা বোঝা যায়। প্রথম ভাগ 'নান্দনিক নিসর্গ'-এর শুরু হয়েছে দুই পৃষ্ঠাব্যাপী একটি গাছের ডালের অপূর্ব আলোকচিত্র ছেপে, যেখানে একটি পাখি বসা; পরের পৃষ্ঠায় শিশিরভেজা, বলা উচিত শিশিরফোঁটা, কয়েকটি পাতার দৃশ্য, এবং প্রথম লেখাটির শিরোনামও 'শিশিরের শব্দের মতন'। লেখক জানাচ্ছেন, 'শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা আসে' পঙ্‌ক্তিটি তিনি বহুবার পড়েছেন কিন্তু 'চোখ দিয়ে, ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব এই প্রথম'। দু-বছর ধরে 'গৌতম' নামে একটি আলোকচিত্র আলেখ্য তৈরির কাজে দেশ-বিদেশের বহু জায়গায় যাচ্ছেন এই দরদি শিল্পী, কর্ণফুলীতীরের বেতাগী গ্রামে সেই লক্ষ্য নিয়েই যাওয়া, কিন্তু লক্ষ্য সেখানে আর মুখ্য থাকে না, ঘুরতে ঘুরতে পুকুরের খইরঙা হাঁস, ছোটো-বড়ো ঢেউয়ের খেলা, চুড়ির শব্দ আর চাল-ধুতে-আসা এক তরুণীকে ঘাটে আসতে দেখে তাঁর মনে পড়ে যায় রূপসী বাংলার সেই অক্ষয় পঙ্‌ক্তিগুলো : 

'পৃথিবীর কোনো পথে; নরম ধানের গন্ধ--কল্‌মীর ঘ্রাণ, 
হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা সরপুঁটিদের 
মৃদু ঘ্রাণ, কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত--শীত হাতখান' 

তবে মজার কথা এই যে, যে-ভিক্ষু তাঁকে 'কঠিন চীবর দান' অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তার নামও জীবনানন্দ! এই জীবনানন্দের আহ্বানে এসে ওই জীবনানন্দের কবিতাজগতে ফিরে-যাওয়ার ব্যাপারটিকে হিসেবি লোকের কাছে মনে হতে পারে কাকতাল এবং অদরকারি; আর তথ্য হিসেবে দরকারি মনে হতে পারে এই যে, এই জীবনানন্দ বেতাগীর তৃণাঙ্কুর বিহারকে কেন্দ্র করে পলাশ সুপুরি আর নারকেল গাছের ছায়ায় অনাথ শিশুদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি পাঠশালা, শ্রমণ আর গ্রামবাসীদের সহায়তায় গড়ে তুলেছেন কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্রও, যেখানে শুরু হয়েছে সেলাই, টাইপিং ও কাঠের কাজ; আশপাশের গ্রামে মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় পরিকল্পনা চলছে একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠারও। 

এই ভাগের আরেকটি দরকারি রচনার শিরোনাম 'নাম তার ক্যামেলিয়া', যেখানে রয়েছে চা আবিষ্কারের কাহিনি, চা-গাছের সঙ্গে মানুষের প্রথম পরিচয়ের কথা, চা-এর নানা গুণের বর্ণনা এবং আছে উনিশশ চব্বিশ সালে শান্তিনিকতনে রবীন্দ্রনাথ-উদ্বোধিত 'সুশিমো চা-চক্র'-এর তথ্যও। এই বর্ণনা পাঠককে মনে করিয়ে দিতে পারে কাকুজো ওকাকুরার 'বুক অফ টি' বইয়ের কথা, যেটি শুরুই হয়েছে এই ভাবে যে : 'চায়ের শুরু চিকিৎসায়, পৌঁছেছে সে পানীয়ে। অষ্টম শতকের চিনদেশে তার প্রথম পদার্পণ কাব্যের আঙিনায়, মৃদু আমোদের আঙ্গিক হিসেবে। পঞ্চদশ শতকের জাপান তাকে গরীয়ান করেছিল সৌন্দর্যদর্শনের এক ধর্ম বানিয়ে; নাম দিয়েছিল চা-চর্যা।' 

তবে এই সব তথ্যসংবলিত লেখাগুলোর চাইতে আমাদেরকে বেশি আকৃষ্ট করছে আপাত-অদরকারি রচনাগুলোই। 'মুক্ত ডানা' লেখাটি থাইল্যান্ড ভ্রমণকে ভিত্তি করে লিখিত, সেখানেও তো দরকারি কাজেই গিয়েছিলেন কৃষিবিজ্ঞানী নওয়াজেশ আহমদ, কিন্তু তিনি আমাদের এখানে শোনাচ্ছেন ঘুঘুদম্পতির নীড় বাঁধা, ছানা-জন্ম, ঝড়ের কবলে পড়ে যাওয়া এবং শেষমেশ ঝরে-পড়া থেকে উড়তে শেখার গল্প, যে-গল্পে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন পাখিপ্রেমী খোদ নওয়াজেশ আর থাই মেয়ে নারীরাত। 

দু'পর্বে লিখিত এরকম আরেকটি লেখার শিরোনাম 'টোনাটুনির কেচ্ছা'; প্রথম পর্বে রয়েছে ঘরের জানালার পাশে টোনাটুনির নীড় বাঁধার বর্ণনা, ছানা জন্ম দানের পর তাকে বাঁচানোর নানারকম চেষ্টা ও কসরত, এরপর নীড় ছেড়ে উড়ে যাওয়ার কেচ্ছা। দ্বিতীয় পর্ব লেখার সময় লেখকের মনে হচ্ছে যেহেতু টোনাটুনিরা ক্রমশ নিসর্গ-পরিবেশ থেকে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, সেহেতু তাদের কথা আর বলে কী লাভ? তবু লেখাটি শেষ হয়েছে আমেরিকার আলাবামা অঞ্চলের এক গৃহবধূর এই হাহাকারময় চিঠি উদ্ধৃত করে : 

'আমাদের ছোট্ট শহর বহুরকম পাখির কলগুঞ্জনে মুখর হয়ে থাকতো অর্ধ শতাব্দী ধরে। গত জুলাই মাসেও আমরা বলাবলি করেছি এবার বসন্তে পাখির আনাগোনা অনেক বেশি। তারপর একদিন কীটনাটক ওষুধ স্প্রে করা হলো। দেখতে দেখতে অনেক পাখি মরে গেল। আগস্টের মাঝামাঝি সব পাখি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। একটা পাখির গানও আর শোনা যায় না। চারদিকে কি রকম ভয়ানক নীরব বিষণ্ণতা। আমাদের এই সুন্দর প্রাণবন্ত পরিবেশকে বিধ্বস্ত করার কি অধিকার মানুষের আছে?' 


২ 

বইয়ের দ্বিতীয় ভাগের শুরুতে রয়েছে দুই পৃষ্ঠাজুড়ে প্রলয়-বিধ্বস্ত নিসর্গের ছবি, বাঁপাশে-দাঁড়ানো এক ভীত-সন্ত্রস্ত উদোম বালক; পরের পৃষ্ঠায় মনে হচ্ছে তড়িৎ-স্পৃষ্ট কোনো গাছের ডালপালা, যার নিচে লেখা : 'নান্দনিক নিসর্গও আতঙ্কিত হতে পারে। প্রস্তর যুগেও এর নিদর্শন মেলে'। 

এরপরেই শুরু হয়েছে প্রথম লেখাটি, শিরোনাম 'বৃক্ষরোদন', এতে রয়েছে গাছের সঙ্গে যে তাঁর আশৈশব সম্পর্ক তার বিবরণ, আমেরিকার উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা-বিষয়ক ক্লাসের বর্ণনা যেখানে জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখ করে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লিডারবার্গ বলেছিলেন, বাঙালি বিজ্ঞানীরা নাকি একটু 'মিস্টিক' হন। 

লিডারবার্গের কথার কোনো প্রতিবাদ করেননি তাঁর ক্লাসের বাঙালি ছাত্র নওয়াজেশ আহমদ। গাছের বোধশক্তি আছে--জগদীশ বসুর এই মতটি থিওরি দ্বারা প্রমাণিত না হওয়ায় আর সুচ প্রবিষ্ট হলে গাছে কেন কাঁপুনি আসত তারও ব্যাখ্য ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে যাওয়ার কারণেই হয়ত নিশ্চুপ থেকে গেছেন নওয়াজেশ। তবে পরের পৃষ্ঠায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই আরেক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ড. বরলাগের 'ফসল-শঙ্কর' বিষয়ক সেমিনার-বক্তৃতার উল্লেখ করেন নওয়াজেশ যেখানে ওই বিজ্ঞানী বলছেন : 'গাছ কথা বলে ফিসফিস করে। তা বুঝতে হলে তার খুব কাছে যেতে হবে।' এরও কোনো প্রতিবাদ করেননি নওয়াজেশ। 

প্রতিবাদ করবেন কী, এই 'মিস্টিক' বিজ্ঞানীর কথা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন চা-বাগানে কাজ করার সময় : 'কয়েকটি চা গাছ আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল, বন্ধুই বলা চলে। দূর থেকে শুধু একটু পাতার নিশানা দেখেই বলতে পারতাম ওরা কোন মায়ের সন্তান'। এরপর তিনি যখন একদিন চা-বিজ্ঞানী থেকে চা বোর্ডের সেক্রেটারি হয়ে ইট-সুরকি-জনারণ্যের ঢাকায় চলে গেলেন তখনো ফাইলের ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পেতেন 'সবুজের ঝিকিমিকি', মনে পড়ত জীবনানন্দের কবিতার পর কবিতা। এই লেখাটি শেষ হচ্ছে মর্মস্পর্শী বর্ণনায়। মা মারা যাওয়ার পর গোরস্তানে তাঁকে কবর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে পুকুরপাড়ে শৈশবের প্রিয় হিজলতলায় গিয়ে দেখলেন, এ তার পল্লবে পল্লবে ছাওয়া সেই হিজল গাছ নয়, প্রায় সব ডালপালাই কুড়ালের হিংস্র আঘাতে ছিন্নভিন্ন, তাঁর কথায় : 'কাছে যেতেই গাছটা একটা আর্ত চিৎকার করে উঠলো। যে আর্তনাদ ছড়িয়ে গেল বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে।' 

বইয়ের নামরচনা 'আহত কোকিল' রয়েছে এই ভাগেই, এর শুরুতে প্রথম বন্ধনীর ভেতরে দুটি অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছেন কোনো এক 'বেতছড়ি' গ্রামের কথা, যে-গ্রামটি নাকি এখন বাংলাদেশের মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাহলে কি 'বেতছড়ি' কোনো প্রতীকী গ্রাম? আর বেতছড়ি থেকে চলে-যাওয়া আহত কোকিলেরা? যা-ই হোক, লেখক বলছেন, এই গ্রামের উপাখ্যানটি এ-জন্যই বলা হচ্ছে, যাতে আর কোথাও এমন কাহিনির পুনরাবৃত্তি না হয়। 

এক বসন্তে বন পলাশের গ্রাম বেতছড়িতে গিয়েছিলেন লেখক, যেখানে প্রকৃতি যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিল : পুবদিকে 'কচি ধানের হরিদ্রাভ ক্ষেতখামার', দক্ষিণে 'হাঁসলির মতো মায়াবী নদী বাঁশখালী', উত্তরে 'শ্যামলিমায় মণ্ডিত টিলা পাহাড়, সবকিছু নিমগ্ন হয়ে আছে পলাশ-শিমুলের রক্তিম বন্যায় আর পাখির কলকাকলিতে'। এখানে মানুষের সকল কিছু হাসি-কান্না-জন্ম-মৃত্যু 'প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম', এতে রয়েছে 'বিশ্বশক্তির আনন্দক্রিয়া'। এই পরিবেশেই কোকিলের সুমিষ্ট সুর শুনে মণ্ডলবাড়ির কালো মেয়েটি হারমোনিয়াম টেনে সুর ভাঁজে আর সেও হতে চায় পাখির মতো 'সুকণ্ঠী'। 

পরে এক বসন্ত মাঝে রেখে আবার সেখানে গিয়ে নির্বাক হয়ে যান নওয়াজেশ আহমদ, দেখেন সবুজ ধানক্ষেত কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ধানি জমিতে ইট-তৈরির কারখানা বসেছে, বিরাট চিমনি থেকে পাক খেয়ে উদ্গীরিত হচ্ছে ধোঁয়া। একসময় পথে দেখা হলো মণ্ডলবাড়ির সেই মেয়েটির সঙ্গেই, যে এখন গা চুলকাচ্ছে, দেহ আরও ক্ষীণ, সে বলছে : 'কোকিলেরা সব কোথায় গেল, আমিও বোধহয় আর কোনদিন গান গাইতে পারবো না'... 'আমার গলাও দিন দিন বসে যাচ্ছে' ইত্যাদি। 

আহত কোকিল বইয়ে এরকমই গল্পের মতো করে লিখেছেন আরও কয়েকটি রচনা : 'নিহত কপোত', 'ত্রস্ত নিসর্গ', 'ত্রস্ত কর্ণফুলী', 'শুধু একগুচ্ছ রজনীগন্ধা নয়', 'বিধ্বস্ত ক্রন্দসী' এবং 'পুষ্কর-বিতংস'। একটি লেখার শুরুতে নওয়াজেশ লিখেছেন 'আমি কাব্য জগতের লোক'; কথাটি না বললেও চলত, রচনার বর্ণনায় তাঁর কবিত্ব স্পষ্ট, বইয়ের পাতায় পাতায় সশরীর জীবনানন্দ আর মর্মে মর্মে রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ কেউই তো শুধু সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য কবিতা লেখেননি, লেখেননি এই লেখকও। তাই তো বইয়ের 'ত্রস্ত নিসর্গ' রচনায় পড়ি অজপাড়াগাঁয়-আসা শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্যামাঙ্গী অধ্যাপিকাকে দেখে তাঁর মুগ্ধ হওয়ার কথা, কিন্তু বোঝা যায় লেখায় তার প্রসঙ্গ সেই মুগ্ধতা প্রকাশ করবার জন্য নয়, পিতৃভূমিকে নির্মল 'আরোগ্য নিকেতন' মনে করে ক্যান্সার-আক্রান্ত যে-অধ্যাপিকা গ্রামে এসেছিল, এখানে তার উল্লেখ নওয়াজেশ আহমদকে-লিখিত এই মর্মান্তিক চিঠি উপস্থাপনের জন্য : 'আজ সকালে দেখলাম নির্মল পানা পুকুরের পুঁটি মাছের ভেতরও ভয়ঙ্কর কারসেনাজেনিক পদার্থের কর্মকাণ্ড--সারা গায়ে ক্ষত ক্যান্সার কোষ। তাই পালিয়ে গেলাম।' 

এইভাবে নিসর্গে নানারকমের ক্যান্সার যাতে আর না ছড়ায়, পরিবেশ যা হওয়ার হয়েছে আর যাতে রুগ্‌ণ না হয় সে-বিষয়ে নানা মন্তব্য ও ব্যথিত অভিব্যক্তি রয়েছে বইয়ের লেখাগুলোয়। আহত কোকিল বইটি ঢাকার জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী থেকে বের হয়েছিল উনিশশ নব্বই সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, প্রথম প্রকাশের পর প্রায় তিন দশক পার হতে চলল, কিন্তু বইটি আমাদের অপরিসীম ক্ষুধা ও ভোগপ্রবৃত্তির তাড়নায় এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন