শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

স্বকৃত নোমানের গল্প: চরজনম

চরজনম দ্বীপটা ছিল ঠিক এইখানে, এখন যেখানে চর জাগছে। বিশাল বালুচর। জোয়ারের সময় তলিয়ে যায়, ভাটার সময় জেগে ওঠে। উত্তরে মেঘনা ও বুড়া গৌরাঙ্গ নদীর মোহনা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। দ্বীপটা কবে জেগেছিল কে জানে।
হয়ত পর্তুগীজদের আমলে, কিংবা ওলান্দাজ, ফরাসি বা বৃটিশদের আমলে। প্রায় আড়াই শ পরিবারের বসতি ছিল। জনসংখ্যা ছিল প্রায় বারো শ। বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে। সঠিক হিসাব ছিল না। কীভাবে থাকবে? কখনো তো আদমশুমারি হয়নি। সরকারি কোনো দলিল-দস্তাবেজে এখানকার জনসংখ্যার কথা উল্লেখ নেই। ধরা যাক মোট জনসংখ্যা ছিল বারো শ। হিন্দু ছিল তিন শ, বাকিরা মুসলমান। তারা কোথা থেকে এসেছিল কে জানে। হয়ত চট্টগ্রাম থেকে, কিংবা নোয়াখালী, পটুয়াখালী বা বরিশাল থেকে। তাদের ভাষায় ছিল এই চার জেলার আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ। বেশিরভাগই পেশায় ছিল জেলে-মালো, বাকিরা চাষাভূষা। রোজ সকালে মহাজনের একটা ট্রলার ভিড়ত পশ্চিমের ঘাটে। জেলেরা ধরা মাছগুলো পাইকারি দামে তুলে দিত সেই ট্রলারে। রোজ একবার করে কচ্ছপিয়া ঘাটে যাতায়াত করত একটি ট্রলার। সেই ট্রলারে আসতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

দ্বীপের মাঝখানে ছিল দশ-বারোটি দোকানের ছোট্ট একটি হাট। চরজনম হাট। হাটের পুবে ছিল তেইশ হাত লম্বা ও ষোল হাত চওড়া একটা ঢিবি। লোকে বলত চাকমা রাজার ঢিবি। পর্তুগীজদের আমলে সেই রাজা নাকি এখানে নির্মাণ করেছিল হাওয়াখানা। শোনা কথা। সত্যি-মিথ্যা কেউ জানত না। কেউ কোনোদিন খুঁড়ে দেখেনি। আর হাটের পশ্চিমে ছিল জামে মসজিদ। টিনের চৌচালা ও কাঠের বেড়ার। শ্রীশ্রী সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরটি ছিল হাট থেকে মাইলখানেক পুবে, যেখান থেকে হেঁটে সমুদ্রতীরে যেতে লাগত পাঁচ মিনিট। হাটের দক্ষিণে ছিল মাইক্রো ক্রেডিটের এনজিও বিএসটিএম-এর একটি ব্রাঞ্চ, যেখান থেকে চড়া সুদে জেলেরা সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ নিতো। দুই কামরার একটা দোচালা টিনের ঘর। কেন্দ্র ব্যবস্থাপক ছিল একজন, বাকি দুজন মাঠকর্মী। তিনজনই বহিরাগত। ডব্লিউএচপি নামের অন্য এক এনজিও হাটের উত্তরে বড় দিঘিটার পাড়ে একটি স্কুল দিয়েছিল। ভালোই চলছিল। মৌলবি হামিদউল্লাহ যখন মসজিদের পাশে এবতেদায়ি মাদ্রাসা চালু করল, ধীরে ধীরে কমতে লাগল স্কুলের ছাত্রসংখ্যা। ছেলেপিলেরা মাদ্রাসায়ও কি পড়ত? কোনোরকম কোরান শরীফটা পড়তে পারলেই ক্ষ্যান্ত দিয়ে পেটের ধান্দায় নেমে পড়ত।

মৌলবি হামিদউল্লাহ এসেছিল নোয়াখালী থেকে, ঊনিশ বছর বয়সে। কোরানে হাফেজ। তার এক নিঃশ^াসে সুরা ফাতেহার সুরেলা পাঠ শুনে মানুষ এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল, তাকে আর যেতে দেয়নি। সেও অবশ্য যাওয়ার জন্য আসেনি। সে শুনেছিল চরজনম জামে মসজিদের ইমাম কয়েক বছর হলো এন্তেকাল করেছে। মসজিদটা ইমামশূন্য। শূন্যস্থান পূরণ করতেই এসেছিল সে। বিয়েশাদি করে চিরতরে থেকে গেল। জীবনে আর জন্মভূমিতে যায়নি। চল্লিশ বছর দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে মসজিদের মুসল্লি জুটিয়েছিল বারোজন। মানুষজন মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য দান-খয়রাত করত, ইমামকে দাওয়াত করে খাওয়াত, ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসায়ও পাঠাত, কিন্তু এবাদত-বন্দেগিতে তাদের মন ছিল না। সারক্ষণ পেটের ধান্দায় থাকলে কী করে থাকবে? এ নিয়ে মৌলবি হামিদউল্লাহর খেদের সীমা ছিল না। প্রতি শুক্রবার খুতবার আগে মিম্বারে বসে সে খেদ ঝাড়ত। কেউ আমলে নিত না তার খেদ। এক ছেলেকেও হাফেজ বানিয়েছিল। ভোলার কোনো এক হেফজখানায় মোদাররেসি করত। খুব একটা আসত না বাড়িতে।

এই দ্বীপে যে একটা প্রাইমারি স্কুল আর একটা সাইক্লোন শেল্টারের প্রয়োজন ছিল, একথা হয়ত সরকারের মাথায় কোনোদিন আসেনি। কীভাবে আসবে? সরকারের কত কাজ, দেশের কত বড় বড় ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে সরকারকে ব্যস্ত থাকতে হয়, কোথায় বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে চরজনম নামের ছোট্ট একটা দ্বীপের কথা কি আর খেয়ালে থাকে? সরকারের মাথায় দিলে স্কুল ও সাইক্লোন শেল্টারের ব্যবস্থা হয়ত হয়ে যেত। কিন্তু মাথায় দেবেটা কে? দেওয়ার মতো লোক তো কেউ ছিল না। গোটা চরে শিক্ষিত লোক বলতে ছিল শুধু একজন, মুসা মেম্বার। ক্লাস ফাইভ পাস। ভাগ্যিস, জন্মেছিল নানাবাড়ি ভোলায়। নইলে ফাইভ পাস কপালে জুটত না। কিন্তু সে ছিল মুখচোরা টাইপের মানুষ, সহজে পেট থেকে কথা বের করতে পারত না। আর ছিল কুঁড়ের হদ্দ। চরজনম থেকে রোজ একবার যে ট্রলারটি কচ্ছপিয়ায় যাতায়াত করত, সে ছিল সেই ট্রলারের মালিক। চাইলে রোজই ইউপি অফিসে যেতে পারত। কুঁড়েমির কারণে যেত না। বাইশ বছরের মেম্বারি জীবনে মোটে গিয়েছে তিরিশ বার। সারা জীবনে উপজেলা সদরে গিয়েছে চারবার। জেলাশহর কী জিনিস জীবনে কোনোদিন চোখে দেখেনি। সাহস করে একদিন চেয়ারম্যানকে স্কুল ও সাইক্লোন শেল্টারের কথা বলেছিল। চেয়ারম্যান বলেছিল কথাটা সে এমপিকে জানাবে। জানিয়েছিল কিনা কে জানে। না জানানোর সম্ভাবনাই বেশি। সে সামান্য ইউপি চেয়ারম্যান, এমপির দেখা সে পাবে কোথায়? পেলেও সহজে কি সব কথা বলা যায়?

মেম্বার যদি তুফান আলী হতো, তবে সরকারের কাছ থেকে ঠিকই স্কুল আর সাইক্লোন শেল্টার আদায় করে ছাড়ত। সে ছিল কথার ওস্তাদ। কথা বলা শুরু করলে থামার কথা খেয়াল থাকত না। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা কথা বললেও ক্লান্তি আসত না। তার পেটটা ছিল কথার গোলা। আসল নাম তরফান আলী। চরের একমাত্র রেডিওটির মালিক ছিল সে। সারাক্ষণ কাঁধে ঝুলিয়ে রাখত তিন ব্যাটারির সেই রেডিও। দেশ-দুনিয়ার খবরাখবর তার কাছ থেকেই জানত সবাই। একটা টিন পিটিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝড়-তুফানের খবর পৌঁছে দিত বলে তার নাম ফেটে গিয়েছিল তুফান আলী। বুঝ হওয়ার পর কোনোদিন এক অক্ত নামাজ পড়েনি, কখনো মসজিদে যায়নি। মৌলবি হামিদউল্লাহ তাকে নামাজ-কলমার কথা বললে সে বলত, নিজের চরকায় তেল মারেন মৌলবিসাব। হাশরের মাঠে আমার হিসাব আমি দিমু, সুপারিশের জন্য আপনারে ডাকুম না।

গোণার মতো আরেকজন লোক ছিল সুরজিৎ চক্রবর্তী। গোটা চরজনমের একমাত্র ঠাকুর। দুর্গা মন্দিরের সেবাইত। বাড়িটা ছিল মন্দিরের কাছেই। বয়স ছিল প্রায় আশি, অথচ দেখলে মনে হতো ষাট-পঁয়ষট্টি। আদিবাড়ি ঝালকাঠি। যৌবনে জাহাজে খালাসির চাকরি করত। একবার জাহাজ আটকা পড়েছিল মোহনার কাছে একটা ডুবোচরে। তিন দিন অপেক্ষায় থাকার পর একটা নৌকায় চড়ে সে চলে আসে চরজনম। আর যায়নি। গোঁড়া বামুন। ঝালকাঠির এক শূদ্রের মেয়েকে বিয়ে করেছিল বলে মেঝ ছেলেকে ত্যাজ্য করেছিল। জীবনে আর বাড়িমুখো হয়নি ছেলে।

চরজনমে ভাঙন শুরু হয়েছিল দ্বীপটা বিলীন হওয়ার বছর সাত আগে। প্রথমে ভাঙতে শুরু করে দ্বীপের পূর্ব অংশ মালোপাড়া। ওদিকটায় ছিল হিন্দুদের বসতি। দু-বছরের মধ্যে ছাব্বিশটি বাড়ি বিলীন। মৌলবি হামিদউল্লাহ বলে বেড়াতে লাগল, আল্লার গজব নেমেছে। মালুরা রাতদিন হরে কৃষ্ণ হরে রাম জপলে গজব নামবে না? আর সুরজিৎ ঠাকুর বলে, মা গঙ্গা ক্ষেপেছে। তার পূজা দিতে হবে। এবারের দুর্গাপূজাটাও দিতে হবে জাঁক করে। নইলে এই সর্বনাশা ভাঙন কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না।

বর্ষা গেল, শরৎ এল। শুরু হলো শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন। দশ হাজার টাকা খরচ করে মা দুর্গার প্রতিমা আনা হলো শহর থেকে। এত বড়, এত সুন্দর প্রতিমা এর আগে চরজনমের হিন্দুরা দেখেনি। পূজাআর্চা হলো। দশমীর দিন চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলো সাগরে। মাঘ মাসে মহা ধুমধামে দেওয়া হলো গঙ্গাপূজা। সুরজিৎ ঠাকুর সবাইকে আশ^স্ত করল, দুই দেবী তুষ্ট হয়েছে। আশীর্বাদের হাত রেখেছে সন্তানদের ওপর। দেবী গঙ্গা এই দ্বীপের আর কোনো ক্ষতি করবে না। আর ভাঙবে না দ্বীপ।

ওদিকে আর ভাঙল না বটে। তৃতীয় বছর ভাঙতে শুরু করে উত্তর অংশ। ওদিকটায় ছিল শ^াসমূলীয় জঙ্গল। মাত্র চার মাসে সাবাড় করে দিল গোটা জঙ্গল। যে ক’টি হরিণ আর বানর ছিল, ঢুকে পড়ল লোকালয়ে। হরিণগুলো মানুষ জবাই করে খেল, বানরগুলো রেখে দিল পোষ মানিয়ে।

পরের বছর ভাঙন ধরে পশ্চিম অংশে। সতেরটা বাড়ি চলে যায় জলগর্ভে। মৌলবি হামিদউল্লাহ এবার মুখে খিল দেয়। পূর্ব অংশের ভাঙনের জন্য যে হিন্দুদের হরে কৃষ্ণ হরে রাম জপকে দায়ী করেছিল, সেকথা চেপে যায়। যেন এমন কথা জীবনে কখনো বলেনি। কেউ অবশ্য সেকথা মনেও রাখেনি। হামিদউল্লাহ মসজিদের ইমাম, ইমামদের কত কথা বলতে হয়, সব কথা কি সবার মনে থাকে?

পঞ্চম বছর ভাঙতে শুরু করল একইসঙ্গে তিন দিক। পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর। মাত্র আট দিনের তুমুল ভাঙনে কমে গেল দ্বীপের প্রায় দুই মাইল আয়তন। মানুষের মনে হানা দিল ভয়। এভাবে ভাঙতে থাকলে আগামী দু-বছরে তো দ্বীপের অস্তিত্বই থাকবে না! কী করা যায়? অনেকে পাততাড়ি গুটাল। তিরিশটি পরিবার চলে গেল চরবাশার, ঢালচর ও সোনার চরে। পরের বছর গেল আরো কুড়ি পরিবার।

সপ্তম বছর ভাঙন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে মানুষ চোখে আর পথ দেখে না। কোথায় গিয়ে ঠাঁই নেবে ভেবে পায় না। যাওয়ার মতো জায়গা কই? আশপাশের সব চরে তো গিজগিজ করছে মানুষ। জায়গাজমি নিয়ে হানাহানি মামলা-মোকদ্দমা লেগেই আছে। তা ছাড়া নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন জীবন শুরু করা কি সহজ কথা! তুবে চলে গেল পনের পরিবার। বাকিরা আল্লাহ-ভগবানের উপর ভরসা করে থেকে গেল।

তখন মধ্য শ্রাবণ। ঘোর বর্ষা। বৃষ্টি থামার নাম নেই। দ্বীপের তিন দিক ভাঙছে তো ভাঙছেই। তুফান আলীর রেডিওতে খবর বাজছে, বন্যায় ডুবে আছে দেশের এক তৃতীয়াংশ। দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। নদনদীর পানি বইছে বিপদসীমার উপর দিয়ে। মারা গেছে বহু মানুষ, ভেসে গেছে বিস্তর ঘরবাড়ি আর গবাদি পশু।

অমাবস্যা ছিল সে-রাতে। সমুদ্রে ছিল মরাকাটালের জোয়ার, আকাশে ছিল বৃষ্টি, মানুষের চোখে ছিল গভীর ঘুম। ভোরে সবাই জেগে দেখল দ্বীপের পূর্ব ও পশ্চিমের ঘাটে নোঙর করে রাখা নৌকা আর ট্রলারগুলোর একটিও নেই। সব কটি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে উত্তাল ¯্রােত। রাতের অন্ধকারে কেউ যেন শত্রুতা করে নোঙরগুলো তুলে নৌযানগুলো ভাসিয়ে দিয়েছে গভীর সমুদ্রের দিকে। আর তিন দিকের বিস্তর ভূমি চলে গেছে জলগর্ভে। ভেসে গেছে একুশটি ঘর। ভেসে গেছে সেসব ঘরে ঘুমের ঘোরে থাকা মানুষেরাও।

কী করে মানুষজন? একটা নৌকাও নেই যে পাতালের দিকে হাঁটতে থাকা এই দ্বীপ ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নেবে। যমের হাতছানি দেখতে পায় তারা। মৌলবি হামিদউল্লাহ সবাইকে আশ^স্ত করে, চিন্তার কিছু নাই। আল্লাহ এতটা বেরহম নন যে এতগুলো মানুষকে ডুবিয়ে মারবেন। নিশ্চয়ই একটা কিছু ব্যবস্থা হবে। সুরজিৎ ঠাকুর বলে, এসো, সবাই মিলে কৃষ্ণনাম রামনাম জপো। ভগবান নিশ্চয়ই সদয় হবেন। আর মুসা মেম্বার বলে, সকাল আটটায় তো মহাজনের ট্রলার আসবে। মাঝিরা ফিরে গিয়ে আমাদের এই বিপদের কথা সরকারি লোকদের জানালে তারা নিশ্চয়ই আমাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করবে।

মানুষ কিছুটা আশ^স্ত হলো। দশটা বেজে গেল, অথচ মহাজনের ট্রলার এলো না। মানুষজন অধীর অপেক্ষায় থাকে। অপেক্ষা তো সহজে ফুরায় না। না ফুরানোটা অপেক্ষার ধর্ম। দুপুর বারোটা বেজে যায়, তবু ট্রলার আসে না। বিকেলে তুফান আলী বলে, ট্রলার আগামী সাত দিন আসবে কিনা সন্দেহ। সমুদ্র উত্তাল। দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গোপসাগর থেকে এগিয়ে আসছে একটা ভয়াল ঘুর্ণিঝড়। সমুদ্রে জারি হয়েছে চার নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত। নৌ চলাচল বন্ধ।

ঘরে ঘরে ওঠে কান্নার রোল। ঝড়-তুফান ভয় করে না চরজনমের মানুষ। যত বড় গর্কিই হোক, বাড়িঘরে কখনো জল-পানি উঠবে না। কখনো ওঠেনি। এবারও উঠবে না নিশ্চিত। তাদের ভয় ভাঙনে। দ্বীপটা যেভাবে ভাঙছে, সাত দিন কি টিকে থাকবে? মনে হয় না। এ কেমন ভাঙন! এমন ভাঙন কেউ কোনোদিন দেখেনি, কেউ কোনোদিন শোনেনি। নোনাজল নয়, যেন হাজার হাজার জলদৈত্য দ্বীপটাকে ঠেলছে। ঠেলতে ঠেলতে পাতালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

পরদিন মধ্যরাতে উঠল তুফান। বিস্তর ঘর উড়ে গেল, গাছগাছালি উপড়ে গেল। মারা পড়ল তিন শিশু আর পাঁচ নারী। তুফান থামল ভোরে, কিন্তু থামল না ভাঙন। পুবের সমুদ্র চলে এসেছে মন্দিরের কাছে। মাত্র আট-দশ হাত বাকি। এটুকু ভাঙলে দেবী গঙ্গা ভাসিয়ে নেবে দেবী দুর্গাকে। পশ্চিমের সমুদ্র ঠেকেছে মসজিদের কুড়ি-পঁচিশ দশ হাত দূরে। উত্তরে দিঘিটা চলে গেছে সমুদ্রের পেটে। বিকেল নাগাদ হয়ত হাট-মন্দির-মসজিদ-বাড়িঘর কিছুই থাকবে না।

মৌলবি হামিদউল্লাহ বলল, অসম্ভব। আল্লাহর ঘর কখনো ধ্বংস হতে পারে না। গোটা দ্বীপ তলিয়ে গেলেও এই মসজিদ দাঁড়িয়ে থাকবে আহদানিয়াতের সাক্ষী হয়ে। সব মুসলমানকে সে মসজিদে ঠাঁই নেওয়ার পরামর্শ দিল।

ওদিকে সুরজিৎ ঠাকুরও বলল প্রায় একই কথা। দেবী গঙ্গা যতই রুষ্ট হোক না কেন, দেবী দুর্গার মন্দির কখনো ধ্বংস করবে না। এই মন্দির অক্ষত থাকবে। মন্দিরে আশ্রয় নেওয়ার জন্য সে হিন্দুদের আহ্বান জানাল।

সাধারণ মানুষ তো বিশ^াসপ্রবণ। তারা বিশ^াস করে স্বস্তি পায়, তৃপ্ত হয়। সংকটে আরো তীব্র হয়ে ওঠে তাদের বিশ^াস। মুসলমানরা বিশ^াস করল মৌলবির কথা আর হিন্দুরা ঠাকুরের। মুসলমানরা আশ্রয় নিল মসজিদে আর হিন্দুরা মন্দিরে। যা কিছু ঘটুক, কেউ আশ্রয়স্থল থেকে এক তিলও নড়বে না। আশ্রয় নিল না কেবল তুফান আলী। রেডিওটা কাঁধে নিয়ে সে ঘুরে বেড়ায় দ্বীপের এ-মাথা থেকে ও-মাথায়। ঘন ঘন বিঁড়ি ফোঁকে। কোনো চিন্তা নেই, কোনো ভয় নেই। যেন কিছুই ঘটবে না, যেন অক্ষত থেকে যাবে ক্ষতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা চরজনম দ্বীপ।

মধ্যরাতে, যমের ভয়ে জেগে থাকতে থাকতে ক্লান্ত মানুষেরা যখন ঘুমিয়ে পড়ল, অমনি হানা দিল সমুদ্র। শুরু হলো মহাপ্রলয়। তিন দিকেই সমান তালে শুরু হলো তুমুল ভাঙন। ভোর হওয়ার আগেই তলিয়ে গেল হাট, ঘাট দোকানপাট, মাদ্রাসা, মক্তব, বিএসটিএম-এর অফিস, মসজিদ, মন্দির। ভেসে গেল সমস্ত মানুষ। থাকল কেবল একজন, তুফান আলী। ভোরে নিজেকে সে আবিষ্কার করল হাটের পুবের সেই ঢিবিটায়। চারদিকে অথৈ জল। তখনো বেজে চলেছে কাঁধে ঝোলানো রেডিওটি। গান বাজছে, ‘কোন মিস্ত্রি নাও বানাইল কেমন দেখা যায়/ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ুরপঙ্খী নাও...।’ বাঁচার আশা ছেড়ে দেয় তুফান আলী। গোটা দ্বীপ চলে গেছে, এটুকু জায়গা কি আর থাকবে?

সূর্য ওঠে। সরে যায় আকাশের মেঘ। বৃষ্টিও থামে। শান্ত ¯িœগ্ধ মনোরম ভোর। গাঙচিলেরা উড়ছে। তুফান আলী কপালে হাতের তেলো ঠেকিয়ে দূর পশ্চিমে তাকিয়ে দেখতে পায় একটি ট্রলার। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। কার ট্রলার? আরো কাছে এগিয়ে এলে পতপত করে উড়তে থাকা পতাকা দেখে ট্রলারটি সে চিনতে পারে। মহাজনের ট্রলার।



২১.০৮.২০১৯

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন