শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

মধ্যপ্রাচ্যের ৩ লেখিকা সামার ইয়েজবেক, ইনাম কাসাশি ও রোজা ইয়েসিন হাসান'র সাক্ষাৎকার

'লেখকরা সব সময়ই নির্বাসিত' 

অলিভিয়া স্নেজ 
অনুবাদ : এমদাদ রহমান 

[বিপন্ন সিরিয়ার নির্বাসিত লেখক সামার ইয়েজবেকের কথা শুনছিলাম, ইউটিউবে; ইয়েজবেক তাঁর দিনলিপি 'অ্যা উইম্যান ইন দ্য ক্রসফায়ার : ডায়রিজ অফ দ্য সিরিয়ান রেভ্যুলুশন' সম্পর্কে বলছিলেন, পাশে বসে আছেন বর্ষীয়ান লেখক-অনুবাদক এবং অধ্যাপক পিটার ক্লার্ক। গুগলে তাঁর সম্পর্কে খুঁজতে গেলে পাওয়া গেল ইয়েজবেকসহ এমন ক'জন লেখককে, যারা নির্বাসিত, দেশহীন; কেউ সিরিয়ার কেউ ইরাকের, ফিলিস্তিনের; কেউ আশ্রয় নিয়েছেন ইংল্যান্ডে, কেউ ফ্রান্সে, জার্মানিতে। যে-দেশে জন্মেছিলেন তারা, বেড়ে উঠছিলেন, সে মাটি সে বাড়ি, সেসব স্মৃতিচিহ্ন মুছে গেছে, ধ্বংস হয়েছে; ছোট্ট পায়ের ছাপ যে-ধুলোয় পড়েছিল একদিন, সেই ধুলো এখন রক্ত, ক্ষুধা, মারী ও মৃত্যুতে কাতর।

'বৈরুত থার্টিনাইন' ব্লগে পেলাম সুসান হামাদের নেওয়া সামার ইয়েজবেকের সাক্ষাৎকার। ১৯৭০ সালে সিরিয়ায় জন্ম নেওয়া সামার ইয়েজবেক লেখার আঙ্গিক সম্পর্কে বলছেন- 

দেখুন, লেখালেখি হচ্ছে কিছু ছবি বা দৃশ্যের মধ্যে তৈরি হওয়া এক ইন্দ্রজাল, ছবিগুলো আসলে বাস্তব থেকেই উঠে আসছে। উপন্যাসে আমি এমন এক স্পেস খুঁজে পাই যেখানে পৌঁছতে হলে আমাকে কল্পনার জাদুশক্তির একেবারে অতলে যেতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি কিন্তু একটি খেলা; পুরোটাই স্ক্রিপ্ট ও একটি সমান্তরাল জগৎ তৈরি করার খেলা। এ এমন এক জগৎ যা একটি স্ক্রিপ্টের ভিতর থেকে জন্ম নেয়, আমাদের চারপাশের জগৎ থেকে যা আরও বেশি বাস্তব।' 

এমন কথা যে লেখক বলতে পারেন, তাঁর প্রতি স্বভাবতই আগ্রহ জাগে, আরও খুঁজি তাকে, তাঁর বিষয়ে জানতেও চাই, পেয়ে যাই ওয়েভ-পত্রিকা 'ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডার্স'-এর ২০১৪ সালের 'নির্বাসিতের লেখালেখি' সংখ্যাটি, যে সংখ্যায় তিনি সহ আরও দু'জন লেখিকার সাক্ষাৎকার আছে, যা পড়ে দুঃখে ও বেদনায় হতাশ হতে হয়, অনুবাদও করে ফেলি। 

'ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডার্স'-এর এই সাক্ষাৎকারে, মধ্যপ্রাচ্যের লেখিকাদের দেশত্যাগের গভীর বেদনা প্রকাশ পেয়েছে। তাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন প্যারিস-ভিত্তিক সাংবাদিক ও সম্পাদক অলিভিয়া স্নেজ, পঁচিশ বছর ধরে যিনি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কাজ করছেন এবং আলোচিত 'কীপ ইওর আইজ অন দ্য ওয়াল : প্যালেস্টাইনিয়ান ল্যান্ডস্কেপ' বইটির সহ-সম্পাদক। ] 



১ 
নোবেলজয়ী নাট্যকার ওলে সোয়িংকা প্রায়ই প্রবন্ধে নিবন্ধে নির্বাসন বিষয়ে তাঁর প্রাজ্ঞ পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, নির্বাসন প্রথমত একটি বিশেষ স্থানকে নির্দেশ করে, এক নির্বান্ধব, নিঃসঙ্গ এবং বিধ্বস্ত স্থানকে বোঝায়, যেখানে এই প্রশ্নটির সামনে একবার না একবার দাঁড়াতেই হয়- 'আপনি কি এমন এক মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছেন যখন আপনি স্বজ্ঞানে এ সম্পর্কে জেনেছেন, তারপর কি সত্যিকার অর্থেই মেনে নিয়েছেন যে আপনি নির্বাসনে যাচ্ছেন? সোয়িংকা লেখকদের মনোভূমি সম্পর্কে বলেছেন- 'লেখকরা এমন এক জাত যারা স্থায়ীভাবে নির্বাসিত।' লেখালেখির আসল জায়গাটি বাস্তবের সমস্ত প্রতিবন্ধকতাগুলোর মূলে আঘাত করে। এক্ষেত্রে সোয়িংকা'র মত হচ্ছে- লেখকদের একমাত্র লক্ষ্য হবে তার পাঠককে কল্পিত সব সীমান্ত অতিক্রম করতে সাহায্য করা, যে সীমান্ত মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, ভাষায় এবং সংস্কৃতির মধ্যে ভেদরেখা তৈরি করেছে। 

২ 

সিরিয়ার লেখক, গণমাধ্যমকর্মী সামার ইয়েজবেক, যিনি পশ্চিমে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তাঁর 'অ্যা উইম্যান ইন দ্য ক্রসফায়ার' প্রকাশের পর পর; সিরিয়া-বিপ্লবের গোড়ার সময় থেকে প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ একটি ডায়রিই মূলত এই বই, যার জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ 'প্যান পিন্টার' পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। সিরিয়া থেকে নির্বাসিত সামার ইয়েজবেক ২০১১ সাল থেকে প্যারিসের রাজনৈতিক রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। তিনিও সোয়িংকার ভাবনার সঙ্গে একমত- 'লেখকরা তো সব সময়ই নির্বাসিত, বেদনাময় এই অভিজ্ঞতাই তাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। লেখকের নির্বাসনকে কখনওই ভৌগলিক সীমা দিয়ে মাপা যায় না।' 

ইয়েজবেক সিরিয়ার 'আলাউইয়া' গোত্রের মেয়ে। প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের শাসনের বিরোধীতাকারী সিরিয়ার রোজা ইয়েসিন হাসান এবং সামার ইয়েজবেক, এ দু'জন লেখিকা তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের (আলাউইয়া) মধ্যেই সংঘাত ও নির্যাতনের শিকার হন, এবং এক সময় নিজ সম্প্রদায় থেকেই নির্বাসিত হতে হয়, যে-সম্প্রদায়টি প্রেসিডেন্ট আসাদকে সমর্থন করছিল; আসাদ এ সম্প্রদায়েরই একজন। 

ইয়েজবেক তার আত্মপরিচয় সম্পর্কেই লেখেন। তিনি বলেন- 'আমাদের ঘরই আমাদের ভাষা, আমাদের দেশ, আমাদের আত্মা, এবং আমাদের পুরোটা জীবন লুকিয়ে আছে এই লেখার ভেতর।' 

সিরিয়া যে-দুঃস্বপ্নের কাল অতিক্রম করছে এখন, সে-কারণেই, ইয়েজবেকের মনে হয়- 'নির্বাসন' শব্দটি দিয়ে যে-কঠোর সত্যকে বোঝানো হয়, তিনি সে সত্যের একেবারে তলদেশে পতিত হয়েছেন। 'বিপ্লব শুরুর আগেই আমি এখানে পালিয়ে আসতে চেয়েছিলাম, কারণ তখন আমার কাছে প্যারিসই ছিল একমাত্র স্থান যেখানে আমি আমার আরাধ্য শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারি... আর, এখন আমি তার সম্পুর্ণ বিপরীত কথাটিই কেবল ভাবি। পৃথিবীতে যাওয়ার একটাই জায়গা আছে আমার- সিরিয়া, আমার নিয়তি; কিন্তু দুর্ভাগ্য, সিরিয়ায় আমি আর কোনও দিনও যেতে পারব না! 

'নির্বাসন বা দেশত্যাগ সম্পর্কে লেখকদের পূর্ববর্তী ভাবনাগুলো এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে,' ইয়েজবেক বলতে থাকেন, 'সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আগের নির্বাসন ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে; দেখুন, আজ, আজকের দিনে, যোগাযোগের তাৎক্ষণিক উপায় আবিষ্কৃত হয়েছে। যে 'নস্টালজিয়া' শব্দটি দিয়ে আগের দিনে আমরা নির্বাসনের বেদনাকে ও তাৎপর্যকে বুঝতাম, সেই সময়টি আর নেই। এখন আপনি এমন এক সময়ে আছেন, এমন জায়গায় আছেন যেখানকার শব্দ কিংবা গন্ধও কোথাও আটকে থাকছে না, মুহূর্তে দিক্বিদিক ছড়িয়ে পড়ছে; আপনি তাৎক্ষণিক দেখতে পারছেন, আর এভাবে, দেশের পরিস্থিতিটি আপনার জন্য আরও গভীর আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে, কারণ আপনি কোনওভাবেই ঘটনাবলীকে এড়িয়ে যেতে পারবেন না, কোনওভাবে বিচ্ছিন্নও হতে পারবেন না। 


৩ 
যার তৃতীয় উপন্যাস, 'বাতাসের অভিভাবক' দীর্ঘদিন ধরে 'ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর অ্যারাবিক ফিকশন'-এর অপেক্ষমান তালিকায় ছিল, সেই রোজা ইয়েসিন হাসান ছেলেকে নিয়ে জার্মানিতে চলে আসেন, দু'বছর আগে। নির্বাসন সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিগুলো নানা জটিলতা ও সংঘাতে পূর্ণ। 'সিরিয়াকে আমি ত্যাগ করেছিলাম কিন্তু সিরিয়া আজও আমাকে ত্যাগ করেনি...মানুষ তার অতীত স্মৃতিকে কখনওই ত্যাগ করতে পারে না, এটা তার পক্ষে সম্ভব নয়, এমনকি আপনি যদি সমস্ত কিছু নিজের ভিতর থেকে মুছেও ফেলতে চান, তারপরও অসম্ভব। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারলাম যে আমরা শিকড়-উপড়ে-ফেলা গাছ, কেউ যেন টান মেরে মাটি থেকে তুলে ফেলেছে! যাদেরকে প্রতিদিন দেখতাম, যাদেরকে চিনতাম, ভালোবাসতাম, তাদের থেকে এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি অনুপুঙ্খ থেকে যেন মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম...এখানে (জার্মানিতে) আমরা নিরাপত্তার মধ্যে থাকলেও, নির্ভাবনায় থাকলেও, এখনও স্নায়ু অবশ করে দেওয়া সেই ভয় আমাদের পিছু ছাড়েনি। আসলে, কোনও দেশে নির্বাসিত কিংবা শরণার্থী হয়ে থাকা ভীষণ রকমের অসহায়ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ব্যাপার! 

রোজা হাসান জানান, নির্বাসিত জীবনের কিছু ইতিবাচক দিক যে নেই তাও নয়, নিশ্চয়ই আছে; নিঃসন্দেহে যা তার লেখালেখিতে প্রভাব ফেলেছে। তার ভাষায়- 'আমার জন্য পরিপ্রেক্ষিতটা বিস্তৃত হয়েছে; লেখার ক্ষেত্রে এই জিনিসটি জরুরি, একটা পরিপ্রেক্ষিত, দূর থেকে আমাকে যা 'ডিটেইলস'-কে দেখতে সাহায্য করেছে যা হয়তো কাছ থেকে ঠিকঠাক দেখা অসম্ভব ছিল। সিরিয়া থেকে পালিয়ে এসে এখানে আমি এক নতুন সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, আমার ভিতরে যা বিশেষ এক মিশ্র বোধের জন্ম দিয়েছে, যে বোধকে হাইব্রিডিটি বলা যায়, আমাকে যা সবসময় ঋদ্ধ করছে। লেখালেখির সম্পর্কে নিজের বিশ্বাসটিও এই নির্বাসনকালে ফিরে এসেছে, আত্মবিশ্বাসও বেশ ভাল মাত্রাতে বেড়েছে। এই বিশ্বাসই আমাকে আরব-সমাজে যে সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় সংগ্রাম রয়েছে, এবং সে সংগ্রামেরও যে ভিন্নতা আছে, তার অনেক গভীরে গিয়ে লিখতে সাহস যুগিয়েছে। 

'দেশত্যাগ আমাকে উপলব্ধি করাতে পেরেছে যে আমরা প্রতিষ্ঠিত কতগুলি ধারাবাহিক বিশ্বাসের শিকলে বন্দি যা কোনও রূপ বোঝাপড়া কিংবা পরীক্ষা ছাড়াই আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি; ফলে, আমাদের ব্যক্তিজীবনের বিবর্তনের ওপর যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তেমনই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী হিসাবে আরব সমাজের উত্থানেরও ওপর', রোজা হাসান বলছিলেন, 'কিন্তু সেইসব দেশত্যাগী কিংবা নির্বাসিত লেখক, যারা দীর্ঘদিন ধরে বাইরে আছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ শুরুরও বেশ আগে থেকে, এবং এখন দূর থেকে দেখছেন তাদের দেশের ধ্বংসস্তূপ, তারা কি আর ফেলে-আসা-দেশটিকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবেন?' 


৪ 

লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী ইনাম কাসাশি গত ত্রিশ বছর ধরে প্যারিসে আছেন। ইরাকে জীবনের যতটা সময় তার কেটেছে, তারচেয়েও বেশি সময় ধরে তিনি নির্বাসনে। ইয়েজবেক এবং রোজা হাসানের চেয়ে একটু ভিন্ন তার নির্বাসন, কারণ কোনও রাজনৈতিক চাপে তিনি ইরাক থেকে পালিয়ে যাননি; ফ্রান্সে পড়তে এসেছিলেন, তার বাচ্চাদের জন্মও হয়েছে ফ্রান্সে। ততোদিনে ইরাক-পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়লে তিনিও আর ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছিলেন না; কাসাশি বলেন- 'আমি তো স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলাম, কিন্তু আমি এখন আর মুক্ত ও স্বাধীন নারী হিসাবে ইরাকে বাস করতে পারব না, সব বদলে গেছে।' 

তবুও, গত কয়েকটি দশক ধরেই অনুভব করেন যে সরাসরি না হলেও চেতনাগত দিক থেকে তিনি এখনও ইরাকেই বাস করছেন। 'মাথায় সব সময়ই আমার ইরাকি আত্মপরিচয়টি জেগে থাকে।' ফরাসিতে আমি সর্বদা উচ্চারণ করি- 'শে মোয়া'; এর মানে-- ইরাক, আর ইরাক মানেই ঘর। একবার এখানকার এক নারী আমাকে বলেছিল, 'সেতিশিচে ভুই',। 'এখন এখানেই তোমার ঘর'! কথাটিকে কেন জানি অদ্ভুত লেগেছিল। 

কিন্তু, কাসাশি'র জন্য, চেতনাগত কিংবা আধ্যাত্মিক, সব দিক থেকেই ইরাকে বসবাসের ধারণাটি বদলে গেছে, বিশেষ করে চরমপন্থার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে। তিনি বলেন- 'প্রকৃত অবস্থাটি এমন দাঁড়িয়েছে, এখন ইরাকে আমি আর বেঁচে থাকতে পারব না, কিন্তু আমার ভিতরে ইরাক বেঁচে থাকবে। ইরাক এখনও আমার মধ্যে আছে; সে ইরাক, এক সত্যিকার এবং সভ্য ইরাক। টিভির পর্দায় আজ আমরা যে ইরাক দেখি, এ তো সে দেশ নয়, যেখানে একদিন আমার জন্ম হয়েছিল, আমি হাঁটতে শিখছিলাম, বেড়ে উঠছিলাম! এ ইরাক তো অনেকটাই নূহা'র নৌকো। যে লক্ষ লক্ষ (মিলিয়ন) মানুষ তাকে ছেড়ে প্রাণভয়ে পালিয়েছে, তারা তো শুধু রাজনৈতিক কারণেই পালায় নি, তারা মরুভূমিতে স্বাধীনতা খুঁজে মরছে; তারা সঙ্গে করে সত্যিকার ইরাকের ছোট্ট টুকরোগুলো নিয়ে গেছে, এবং বুকের ভিতরে আঁকড়ে ধরে সভ্যতাকে রক্ষা করছে।' 

ইনাম কাসাশি সবসময়ই গণমাধ্যমে কাজ করে এসেছেন, আর মাত্র দশ বছর পূর্বে লিখতে করেছিলেন তার গল্পগুলো, ঠিক যখন তার মনে হয়েছিল--'নিজের দেশে যা ঘটছে, সে ঘটনাসমূহের প্রতিক্রিয়ায় আমার ভিতরের চিৎকারগুলো যখন প্রচণ্ড হতে শুরু করেছে, এমন চিৎকার যাকে কোনোভাবেই সংবাদপত্রে প্রকাশ করা যাবে না।' 

যে-ইরাককে তিনি জানতেন, সে ইরাক ভেঙে পড়ছিল, ক্রমাগত, আর হারিয়ে যাচ্ছিল ঠিক যেভাবে প্রান্তরের তপ্ত বালি আপনার আঙুলের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে ঝরে পড়বে! আর, সংবাদকর্মী বলেই ইরাকের জীবনধারার এমন অনেক কিছুই আমি জানি, পরবর্তী প্রজন্মকে সেসব বলার একটা দায়ও আমার আছে। সন্তানরা যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ছবিগুলো দেখে, তারা এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাসই করে না। সেসব ছবিতে তারা ভালোবাসার এমন কিছু গল্প খুঁজে পায়, যা এখন আর ভাবাই যাবে না; আমাকে বিভিন্ন সোশ্যাল ক্লাব আর সাহিত্যের আড্ডাগুলোয় তারা আমাকে দেখে যা চিরতরে পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে!' 

তার প্রথম উপন্যাস 'আত্মার প্রবাহ'-তে, কয়েকজন ইরাকির মধ্যকার সম্পর্কে এবং ফেলে আসা ইরাক নিয়ে টানাপড়েন দেখা যায়, যারা প্যারিসে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে। কাসাশি তাঁর পরবর্তী দু'টি উপন্যাসে, 'দ্য আমেরিকান গ্র্যান্ডডটার' এবং 'তাসারী'-তেও নির্বাসনকে থিম করেছেন; দু'টি উপন্যাসই 'ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর অ্যারাবিক ফিকশন'-এর জন্য মনোনীত হয়েছিল। আর, এখন তিনি নির্বাসন-কে তার সাংবাদিকতার থিম হিসেবেও গ্রহণ করেছেন এবং ইরাকি-বংশোদ্ভূত ৫ জন ইস্রাইলি লেখকের লেখা নিয়ে গবেষণায় মনযোগী হয়েছেন, সেই ৫ লেখক হলেন- শিমন বালাস, সামি মাইকেল, স্বামীর নাকাশ, এৎজাক বার-মোসে, এবং নাইম কাত্তান। এই লেখকরা একদম অল্পবয়সে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, এবং অর্ধশতাব্দীরও পরে বাগদাদকে নিয়ে লিখছিল! তাদেরকে আমি আমার প্রশ্নগুলো পাঠিয়ে দিতাম এবং তাদের বইগুলো পড়তাম গভীর আগ্রহে এবং নিবিড় মনোযোগে। আমি কখনও কল্পনাও করতে পারিনি যে একদিন আমিও তাদের পদচিহ্ন ধরে হেঁটে যাব, তাদের লেখায় নিজেকে খুঁজে পাব! সবসময় আমি ভাবতাম- 'সেখানে একদিন এমন এক দেশ ছিল যেখানে আমি ফিরে যেতে পারব; এখন মনে করি আমি সেটা আমি আর কখনওই পারব না, গেলেও সেই পুরনো দিনের কিছুই আর খুঁজে পাব না! এমনকি সাদ্দামের শাসনকালে যারা রাজনৈতিকভাবে তার বিরোধিতা করেছিল, তারাও এখন দেশছাড়া; ত্রিশ বছর পর তারাও যদি ইরাকে ফিরে আসে, ইরাককে আর কিছুতেই চিনতে পারবে না! 


৫ 

কাসাশি, ইয়েজবেক এবং রোজা হাসানদের কাজের ফোকাস হচ্ছে তাদেরকে একটি দীপ্ত কণ্ঠস্বর প্রদান করা, বিশেষত সেই নারীদেরকে যারা একেবারেই সাধারণ নারী নন, যারা আরববিশ্বে চরমপন্থার উত্থান সম্পর্কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কাসাশি'র সর্বশেষ উপন্যাস, তশারী, প্রকৃতপক্ষে একজন খ্রিস্টান নারী গাইনকোলজিস্টের গল্প, যিনি বিশ বছর ধরে শিয়া প্রধান শহরে থাকেন এবং চিকিৎসা সেবা দেন। তিনি ইরাকি নারীদের সাক্ষাৎকাভিত্তিক একটি বই প্রকাশ করেন, পাশাপাশি ২০০৪ সালে নাজিহা আল দুলেইমিকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেন, যিনি প্রথম ইরাকি নারীবাদী এবং আরব বিশ্বের মন্ত্রীসভার প্রথম নারী মন্ত্রী হয়েছিলেন। 

'দেখুন, আমি ইতিহাসবিদ নই', কাসাশি বলতে থাকেন, 'কিন্তু ইতিহাস সর্বদা শাসকদের হাতেই লিখিত হয়, ফলে, আপনি আর মানুষের কথা জানতে পারেন না, বিশেষ করে নারীদের কথা তো নয়ই।' 

এদিকে, ইয়েজবেক ও হাসান, উভয়ই, সিরিয়ায় নারী-অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এখনও সে সব কাজেই তারা সোচ্চার; তাদের কাজের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চলমান ট্যাবুগুলোকে ভেঙে দেওয়া, আর নারীর যৌনতা এমনকি সমকামীদেরকে নিয়ে লেখালেখি করা। 

রোজা বলেন- 'আমি ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক কর্তৃপক্ষগুলোর মুখোমুখি হতে নারী হিসেবে কখনওই ভয় পাই না বরং সাহসের সঙ্গেই মুখোমুখি হই। স্বপ্ন দেখি, আমার দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে একজন নারী তাঁর সমস্ত অধিকার নিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো বেঁচে থাকবে, কোথাও তাকে মাথা নিচু করতে হবে না। কিন্তু এসব শুধুই স্বপ্নকথা, কেননা পরিস্থিতি দিনে দিনে ভয়ানক হয়ে উঠছে, এবং সবকিছু ঢেকে যাচ্ছে কালমেঘে। আমি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এমন স্বপ্নটি দেখতে চাই না যা এখন পুরো সিরিয়াকে দখল করে আছে, আর, এ জন্য লোকদেরকে স্যাক্রিফাইস করতে হচ্ছে, এসব করতে গিয়ে তারা সন্ত্রাসবাদীতে পরিণত হচ্ছে, সর্বত্র ভয়ের পরিবেশ জন্ম নিয়েছে। যার কোনও শেষ নেই। রাহুর গ্রাস থেকে আমাদের রক্ষা করতে কেউ আসবে না। আমি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার এই স্বপ্নটি দেখতে চাই না যা সিরিয়ায় আছে এবং যা থেকে মুক্তি পেতে লোকেরা নিজেদের উৎসর্গ করছে। বেঁচে থাকবার দুর্নিবার আশা আর সুন্দর আগামীর আকাঙ্ক্ষা ছাড়া আমি চাই না আমাদের কন্যারা সেখানে থাকুক।' 

ইয়েজবেক এবং রোজা হাসান দু'জনই প্রথম ও প্রধানত নিজেদের সন্তানদের দেশত্যাগের কথা ভেবেছিলেন, ইয়েজবেকের মেয়েটি তখনও ছোট, কিশোরী। রোজা বলেন, 'শেষপর্যন্ত, জীবনের জ্বলন্ত মশালটি কিন্তু নারীর হাতেই থাকে, এবং নারীই মশালটিকে জ্বালিয়ে রাখতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে, আমার ছেলের জীবনের নিরাপত্তাই ছিল আমাদের দেশত্যাগের প্রধান কারণ।' 


৬ 

লেখালেখির জন্য যেসব শর্ত ও ধ্যান দরকার, তারপর লেখা প্রকাশ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া দেশের লেখকের জন্য কঠিন বিষয়। কাসাশি'র ক্ষেত্রে, ফরাসি ভাষায় তাঁর কথাসাহিত্যের অনুবাদ প্রকাশ হওয়ায় তাকে গ্রহণকারী দেশটিতে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিতে সহায়তা করেছে। 'যখনই আপনি নিজের ভাষায় কিছু লিখবেন, তখন আর অনুবাদক খুঁজে পাবেন না, একজন প্রকাশকও পাবেন না। তখন আপনার টেক্সট-এ কিছু বাড়তি অর্থাৎ, অন্যদেশে প্রকাশের জন্য লেখার ওপর আরও কিছু বিষয় চাপিয়ে দিতে হয়। এটা সত্যিই কষ্টের। আমার জন্য অনূদিত হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি ছিল, কারণ আমি তো এখানেই (প্যারিসে) থাকি, আমার বাচ্চারাও এখানে; আমার আশপাশে ফরাসির আবাস। তাদেরকেও জানাতে হয় যে আমি লেখালেখি করি। গত ক'বছর ধরে আমার ছেলেটি দেখছে যে আমি প্রথমে হাতে লিখছি, তারপর কম্পিউটারে, এডিট করছি ট্যাবে; অবশেষে, সে যখন আমার বইটিকে ফরাসি ভাষায় দেখে, তখনই সে বুঝতে পারে এতদিন ধরে কী করছিলাম! প্রতিবেশী ফরাসিরা যখন আমার বইটি দেখল, আমার প্রতি তাদের এতদিনের আচরণই বদলে গেল। এসবের অর্থ হচ্ছে আপনি আছেন, আপনার একটা অস্তিত্ব আছে। আপনি শুধু ওয়েলফেয়ারের সুবিধাগ্রহণকারী ইমিগ্রান্ট নন, আপনি কাজ করেন, আর আপনি এমন একজন মানুষ এ-সমাজে যার একটা গুরুত্ব আছে।' 

প্যারিস কাসাশিকে দিয়েছে উদার আর মুক্ত পরিবেশ যেখানে তিনি লেখক হিসাবে নিজেকে গড়ে নিতে পেরেছিলেন, আর এখানে থাকার কারণেই ইরাককে আবারও নিজের ভিতরে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য স্মৃতিগুলোকেও ফিরে পেয়েছিলেন। 

'ফ্রান্স আমাকে একজন নারী ও একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করার বড় সুযোগটি দিয়েছে...প্যারিসে বাস করা একটি বিশেষাধিকার। এমনকি আপনার যদি যদি খাওয়া, পরারও কিছু না থাকে, তাহলেও ফ্রান্সের বেঞ্চিতে বসে থাকতে পারবেন, আর দেখতে পাবেন পুরো বিশ্ব আপনার সামনে দিয়ে হেঁটে চলেছে; প্যারিস বিশ্ব-সংস্কৃতির বড় একটি মিশ্রণপাত্র, আর এটাই আমার লেখায় প্রতিফলিত হতে চেয়েছে। এখানে আমি অবাধে লিখি, মুক্তি আর স্বাধীনতায়; যা বলতে চাই তা এখানে নির্দ্বিধায় বলতে পারি। লেখালেখির ক্ষেত্রে নিজেকে আমি আরবি সাহিত্যের ক্ল্যাসিক্যাল ফর্ম থেকে মুক্ত করেছি, তারপর আমার রক্তে বাহিত স্মৃতিগুলোর ভিতর গভীর গভীর সব গর্ত খনন করে চলেছি--ইরাকের প্রতিটি খুঁটিনাটি, তার গান, গন্ধ, স্বাদ, সমস্ত কিছু। লেখায় আমি সেই পরিবেশটি তৈরি করতে চাই, যেখানে মিলবে হারানো ইরাক। কখনও আমার নিজেকেই এমন একটি মাধ্যম মনে হয় যা অতীত থেকে আত্মাদেরকে ফিরিয়ে আনে। আমার বিশ্বাস, স্মৃতিশক্তি দিয়ে পঞ্চাশ বছর আগে যা ঘটেছিল তাকে আমি ফিরিয়ে আনতে পারবই। 

প্যারিসে, সামার ইয়েজবেকের জীবন বৈচিত্রময় হয়ে উঠেছে সিরিয়া নিয়ে বিভিন্ন দেশের কনফারেন্স, আর গোপনে সিরিয়া সফর ইত্যাদি ব্যস্ততায়। ইয়েজবেক জানান, 'কোথাও এতটুকু সময়ও বসবার সুযোগ নেই, কত কাজ পড়ে আছে...আমার সর্বশেষ বইটি একটি ননফিকশন। এই দেশে এখনও ফিকশনে হাত দিতে পারিনি। জানি, ফিকশন লিখতে হলে আমাকে 'ফোকাস' করতে সক্ষম হতে হবে। এবারই আমি আমার উপন্যাসে হাত দিয়েছি কিন্তু সত্যিই জানি না লেখাটি ধীরে ধীরে কোথায় যাচ্ছে, কোন দিকে যাচ্ছে! গত দু'বছর, সাহিত্য আমার মন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল কারণ আমি তখন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসমূহের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছিলাম, আর সিরিয়ায় (বিদ্রোহী নয়, সাধারণ) নারীদের নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন শুরু করার ব্যাপারে মনোযোগী ছিলাম।' 

ইয়েজবেক নির্বাসিত জীবনে চরম দ্বন্দ্বে ভুগছেন- 'দেখুন, আমি সত্য ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়ছি, কিন্তু নিজেকে সর্বদা দোষী ভাবছি, কারণ আমার মনে হচ্ছে আমি তো ঘটনাস্থলে নেই, অনুপস্থিত থেকে, দূর থেকে দেখছি; সকলকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।' তাই ইয়েজবেক দেশত্যাগকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য শান্তিপুর্ণ বিপ্লবের পক্ষের সোচ্চার কণ্ঠস্বর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা লালন করছেন। 'বাসারের যদি পতন হয়, সঙ্গে সঙ্গে ফিরব।' ইয়েজবেকের কণ্ঠে দৃঢ়তা। 

তিনি এখন মনযোগী হয়েছেন ফরাসি ভাষা শিখবার প্রতি, আর মাসে মাত্র মাত্র একবার যাওয়া। সিরিয়ায়। তিনি বলেন- 'উপন্যাসে আমি কিছু একটা 'ফোকাস' করতে চাই। আমার গল্পটি একটি অদ্ভুত গল্প যা ২০১১ সালের সিরিয়ার পটভূমিতে জন্ম নিয়েছে।' 

'আমি যেকোনও জায়গায় লিখতে পারি'- বলেন রোজা ইয়েসিন হাসান, 'কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েও আমি লিখেছি। শুধু একটা কম্পিউটার আর এক কাপ কফি লাগবে। একমাত্র লেখালেখিই আমার জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ দিক, আমি লেখার জন্যই বেঁচে থাকি।' রোজা সম্প্রতি একটি উপন্যাস লিখে শেষ করেছেন, যার পটভূমিতে ধরা আছে ২০১১ থেকে ২০১২ সালের ঘটনাবহুল সিরিয়া। 

'উপন্যাসটির নাম রেখেছি- 'দৌজ, হু ওয়ার টাচ্‌ড্‌ বাই ম্যাজিক'। সেইসব লোকের কথা বইটিতে এনেছি যাদের কথা কোনওদিনও গণমাধ্যমে আসেনি, যাদেরকে কেউ চিনে না; তারা সব এমন মানুষ যারা মারা গেছে মরবার কারণ না জেনেই, অগোচরে। আমি সেইসব মানুষের কথা বইটিতে লিখেছি, যারা শাসনকারী কর্তৃপক্ষের পক্ষে এবং বিপক্ষে ছিল, লিখেছি বিপ্লব, ভালোবাসা, মৃত্যু এবং সমস্ত রকমের দ্বন্দ্ব ও পরস্পরবিরোধীতা নিয়ে।' রোজা'র আগের উপন্যাসগুলো সিরিয়ায় নিষিদ্ধ হয়েছে, মনে করছেন সর্বশেষ উপন্যাসটিও, যা বৈরুত থেকে প্রকাশ হতে চলেছে, একই পরিণতি ভোগ করবে। 

রোজা'র কাছে, লেখালেখি হচ্ছে 'যা অকথিত, যা কিছু গোপন তার নির্যাস বের করা', যা কিছু দৃশ্যমান নয়, যা কিছু হারিয়ে গেছে, তাকে খুঁজে পাওয়াই হচ্ছে লেখালেখি; মানুষের, এবং সমাজের মনোজগতের গভীরে যা কিছু বহু শতাব্দী ধরে চাপা পড়ে আছে, তাকে উদ্ধার করার নামই হচ্ছে লেখা...আমি মনে করি, লেখালেখি নান্দনিক শিল্প হিসেবে আনন্দদানের পাশাপাশি, পাঠককে প্রশ্ন করার, বিরক্ত করার, জাগিয়ে দেওয়ার এবং ভিন্ন চোখে তাকাতে বাধ্য করার একটি কার্যকর পদ্ধতি। লেখালেখি জীবনের কোনও সংকটের উত্তর যোগায় না ঠিকই কিন্তু প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ কথা কিছুতেই বিশ্বাস করব না যে- সাহিত্য এমন এক কল্পনার জগৎ তৈরি করে যার মধ্যে মানুষ বাস করতে থাকে, বাস করতে করতে ফাঁপা মানুষে পরিণত হয়। এমন কথা কিছুতেই বিশ্বাস করব না। আমার মতে, উপন্যাস হচ্ছে মানবতার সত্যিকার এক গোপন ইতিহাস; গোপন, কেননা- কর্তৃপক্ষের রচিত ইতিহাস হচ্ছে মিথ্যা; সে ইতিহাস লিখিত হয় দখলদার আর অত্যাচারী শাসকদের দ্বারা। 

প্রথমবারের মতো কাসাশি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি সত্যিকার অর্থেই নির্বাসিত, যখন মার্কিনিদের আক্রমণে ইরাক বিধ্বস্ত হচ্ছিল। 'ইরাকে আমি আমার জীবনটাকে কাটাতে চেয়েছিলাম, আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল বহু পুরোনো একটি খেজুর গাছের পাশে নিজেও বয়সের ভারে নুয়ে পড়ব। এখন মনে হচ্ছে আমার এ আশা আর কখনওই পূরণ হবার নয়।





অনুবাদক
এমদাদ রহমান
গল্পকার। অনুবাদক
ফ্রান্সে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন