শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

পুরুষোত্তম সিংহের আলোচনা: অলোক গোস্বামীর অদ্ভুত আঁধার : বিপন্ন সময়, বিপন্ন মানুষ

ধান ভানতে শিবের গীত :

ইতিমধ্যেই বাংলা উপন্যাস তার যাত্রাপথের দেড়শো বছর অতিক্রম করে ফেলেছে। তবে আজও সস্তা রোমান্টিকতার কাহিনি নিয়ে গড়ে ওঠা আখ্যানই উপন্যাস বলে বাজার মাত করে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তের তরলায়িত জীবনের ফানুস কাহিনি ফুলিয়ে ফাপিয়ে যে আখ্যান রচনা করছে তা বাঙালি পাঠকের বড় প্রিয়। ভিন্ন জীবনচেতনা বা জীবনবোধের শিল্পী যে আসেনি তা নয়।
কিন্তু একজন লেখক যখনই বিষয় নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় যাচ্ছেন বা ভিন্ন জীবনবোধের সংগ্রামের গল্প শোনাচ্ছেন তখনই পাঠক হারিয়ে ফেলছেন। আসলে লিটল ম্যাগাজিনের শুরুই হয়েছিল সেজন্য। প্রচলিত থেকে বা বাণিজ্যিক পত্রিকার পাঠক তা পছন্দ করবে না বলে সম্পাদক তা ছাপবে না, কিন্তু লেখক একটু অন্য কথা বলতে চান বলে নিজেই একটি পত্রিকা প্রকাশ করে ফলেছেন। কিন্তু একজন লেখককে আর কতদিন এই সংগ্রাম করতে হবে ? যেহেতু বাণিজ্যিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি তাই বড় প্রকাশক ছাপবে না অথচ তিনি একশ শতাংশ প্রকৃত লেখা লিখিছেন। লেখকের এই আত্মহনন ও পাঠকের এই আত্মঅবমানার দায়িত্ব নেবে কে ?

রাষ্ট্রের দলদাস বা শাসক দলের তাবেদারি করা লেখকের কাজ নয়। লেখক সবসময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরবেন। কিন্তু আজ সিংহভাগ লেখক রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থেকে, সম্পাদকের তবেদারি করে সাহিত্য ছাপছেন । কিন্তু প্রকৃত লেখক দাঁড়াবে কোথায় ! প্রকৃত লেখকের প্ল্যাটফর্ম দেবে কে ? এ দায়িত্ব নিতে হবে পাঠককেই। বাণিজ্যিক পত্রিকা বা সুমহান সাহিত্যিক পত্রিকা বা সাহিত্য গোষ্ঠী ‘সাহিত্য’ বলে যা চালিয়ে দিচ্ছেন তা থেকে আজ বুঝি পাঠকের বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। তবে সব পাঠকই তো ভিন্ন ধরণের সাহিত্য পড়বে না কিছু মানুষ পড়বেন। এই ‘কিছু’ কেই আজ বড় প্রয়োজন। আসলে ‘মধ্যবিত্ত পাঠক সত্তা’ থেকে বাঙালির কবে মুক্তি হবে তা আমাদের জানা নেই। আর প্রকৃত লেখকও কোন হলফনামা লিখে দিয়ে বসেনি যে পাঠকের রুচিকে সামনে রেখে কলম ধরবেন। সাহিত্যগোষ্ঠী, লেখক ও পাঠকের গোলকধাঁধায় প্রকৃত সাহিত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে। আজ বুঝি সময় এসেছে এসবকে অতিক্রম করে যাবার।

সময়ের বিপন্নতাই তো একজন লেখকের হাতে কলম তুলে দেবে বা শিল্পীর হাতে তুলি তুলে দেবে, গায়ক নতুন সুর তুলবেন। সময়ের জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের আত্মকথাই বুঝি আজকের উপন্যাসের প্রধান বিষয় হওয়া প্রয়োজন ! তবে এই সময়কে শিল্পে পরিণত হতে হবে। আর বড় শিল্পী সময়কে কীভাবে শিল্পে পরিণত করতে হয় তা জানেন। সময়ের বিবরণ দিয়েই বা ফটোকপি করেই যিনি আখ্যান লিখে যাবেন তা কখনও উপন্যাস হতে পারেনা। সময় ও শিল্পের দ্বন্দ্ব সমাসে যে নতুনতর আখ্যানবিশ্ব লেখক পুননির্মাণ করবেন তাই হবে আজকের যথার্থ উপন্যাস। কেননা এক ভয়ংকর সময় সত্যের মধ্য দিয়ে আজকের প্রজন্ম এগিয়ে যাচ্ছে। এই চক্রব্যুহ থেকে মুক্তির পথ আজ লেখকেই দেখাতে হবে। বহুল প্রচলিত শরৎচন্দ্রের সেই ‘সমাজ সংশোধন লেখকের কাজ নয়’ আজ আর মনে রাখার সময় নেই। উপরের এই উপস্থাপিত বক্তব্য এতক্ষণ যারা শুনলেন বা দেখলেন তাদের কাছে এমন একটি উপন্যাসের নাম বলার জন্য এই প্রাককথন তা হল অলোক গোস্বামীর ‘অদ্ভুত আঁধার’( ২০১৬)

অলোক গোস্বামীর ব্যক্তিজীবনের পরিচয় বা সাহিত্যজীবনের পরিচয় আপনারা নিজেই জেনে নেবেন। সে পরিচয় দেবার কোন দায়বদ্ধতা আমি রাষ্ট্রের কাছে স্বীকার করে বসিনি। পাঠক বলতে পারেন ‘আপনি কোন ছেঁড়া বাল’ যে লেখকের পরিচয় পেতে যদি অন্য লেখাই পড়তে হয় তবে আপনার এ রচনা বা সংক্ষিপ্তসার পড়ব কেন ? পাঠক আপনি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবেন কেন ? নিজেই না হয় একবার ‘ঘেঁটে ঘ’ করে দেখবেন। শুধুমাত্র মফস্‌সল পাঠকের গোচরার্থে জানানো যেতে পারে যে লেখকের গল্পগ্রন্থগুলি হল – ‘সময়গ্রন্থি’ (২০০০), ‘জলছবি’ (২০০৩), ‘আগুনের স্বাদ’ (২০০৫), ‘কথা অথবা কাহিনি’ ও উপন্যাস ‘বাতিল নিঃশ্বাসের স্বর’ ( ২০০৫) , ‘অদ্ভুত আঁধার’ (২০১৬ )। পাঠকের আর বেশিদূর যাবার দরকার নেই এই ‘বিজ্ঞাপন পর্ব’ থেকেই বুঝে নেওয়া যেতে পারে লেখক অলোক গোস্বামী গল্প উপন্যাসে কী লিখতে চান। হ্যাঁ অলোক গোস্বামী সেই লেখক যিনি সময়ের রন্ধে রন্ধে ঘটে যাওয়া বড় ভূগোলের মধ্যে যে ছোট ভূগোল, সময় যন্ত্রণা ও সময় ব্যাধির নিপূণ শল্যচিকিৎসক। এ উপন্যাস লেখক উৎসর্গ করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ গল্পের কুরি বাড়ির ছোটবউ চন্দরাকে। যিনি শেষবাক্যে ‘মরণ’ নামক শব্দে পুরুষশাসিত সমাজ ও সময়ের বুকে চাবুক হেনে গিয়েছিলেন। সেই রহস্য সময় বা ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরি’ থেকে নারী সমাজ আজও রক্ষা পায়নি। ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থায় পাওয়া বোধহয় সম্ভবও নয়। এ উপন্যাসেও নারীর বিপন্নতা আছে, তবে লেখক বিজুর পরিণতিকে মিলিয়ে দিয়েছেন সময়ের সঙ্গে।

কথা ও কাহিনি কিংবা কাহিনির কথা : 

অলোক গোস্বামী সাহিত্যে কী লিখতে চান ? যেনে নেওয়া যেতে ‘হলফনামা’ শীর্ষক বয়ন থেকে –“সাহিত্য নিছকই বিনোদনের মাধ্যম নয়। নয় ভাতঘুমের সহায়ক বটিকা। পাঠক রুচি নামক ইয়োটোপিয়াকে সামনে রেখে শিল্প সংস্কৃতির যে বেসাতি চালু আছে তার মূল উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা নয়, জনচেতনাকে দাবিয়ে রাখাও। সাহিত্য এবং জীবনকে একই মুঠোয় ধরতে হয়।“ সেই জনচেতনা ও সময়কে সামনে রেখেই গড়ে উঠেছে এ উপন্যাসের আখ্যান। উপন্যাসের বীজ রোপন করেন শীতকালকে সামনে রেখে। হেমন্ত বিদায় নিয়েছে, হেমন্তের ঝরা পাতারা মাটিতে নুইয়ে পড়েছে আর লেখকও যেন বলতে বসেছেন –‘ঝড়া পাতা গো আমি তোমারাই দলে’। এই ঝরাপাতা হল উদ্বাস্তু শিবিরের মানুষ।প্রমোদনগর কলোনিকে সামনে রেখেই কাহিনি এগিয়ে যায়। অলোক স‍্যাটোয়ারের মাস্টারপিস লেখক। এই মুহূর্তে বাংলা গদ্যে স্যাটোয়ারে তাঁর দোসর যে কেউ নেই একথা অতিবড় আহম্মকও মেনে নিতে বাধ্য হবেন ! যাঁদের জীবনে উল্লাসের কোন উৎসব নেই সেই উদ্বাস্তু কলোনির নাম প্রমোদনগর কলোনি। আসলে নগরের সঙ্গে যুক্ত থাকে উল্লাস, আনন্দ, রোমান্টিকতা। কিন্তু শহরতলির খবর কে রাখে ? সে খবর রাখতে হয়ে সাহিত্যিককে। শহরের প্রান্তে গজিয়ে ওঠা শিবির থেকে মানুষ শহরের বিনোদন দেখতে পায় কিন্তু সে বিনোদনে অংশগ্রহণের সুযোগ ও অর্থ কোনটাই শিবিরের থাকে না। আজ কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার নাম ও রঙ পরিবর্তনের উৎসবে মেতেছে। ব্যক্তি ইতিহাস ও সামাজিক ইতিহাসকে মুছে দিতে রাষ্ট্র যখন অতীব তৎপর তখন কী এ উপন্যাসের নাম মনে পড়ে না ! আসলে কলোনি মাত্রই সর্বহারা। কিন্তু সরকার সে দৈন্য বুঝতে দেবে না অথচ নিজেও সাহায্য করবে না। তবে তো কল্পনায় ভেসে যেতে বাধা নেই। ফলে লেখক বস্তি জীবনকে ভাসিয়ে দিতে চান শহরের সঙ্গে। কিন্তু তা মেলা সম্ভব নয়। লেখকও বাস্তবতা ছেড়ে অন্য পথে যাননি।

উপন্যাস তো এক হিসাবে ইতিহাস। তবে সে বুনন ইতিহাসের থেকে আলাদা। লেখক সামাজিক ইতিহাসই লিখতে চান উপন্যাসে। আর লেখক যখন অলোক গোস্বামী তাঁর বিশ্লেষণ ও দেখা যে আলাদা হবে তা বলাই বিধেয়। প্রমোদনগর কলোনির নাম ছিল ‘সর্বহারা কলোনি’। যেহেতু এ নাম রাষ্ট্রের কাছে , সরকারের কাছে সম্মানহানির ব্যাপার তাই নাম পরিবর্তন বিধেয়। প্রচলিত বিশ্বাস নিয়ে মানুষ যখন বাঁচতে চাইছে, বলা ভালো পাঠকের সত্তা গড়ে উঠেছে তা অলোক গোস্বামীতে এসে ভেঙে যায়। তিনি দেখান মানুষ শেকড় বিহীন নয়, বরং শেকড়বাজ। দেশভাগে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষগুলিকে আবার ওপারে পাঠিয়ে দেওয়ার সম্ভবনা ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ভোটের জন্য তাদের শহরের বুকে রেখে মানুষ নয় ‘মানুষের মত’ করে রাখা হল। কেননা রাষ্ট্র বিশ্বের কাছে নিজের প্রকৃত রূপ দেখাতে চায় না। স্নিগ্ধতার বাতাবরনে রেখে মানুষকে শোষণ করাই রাষ্ট্রের কাজ। আর তা ধরা পরে যায় লেখকের চোখে –

“না, শেষ অবধি তাদের ফেরাল না এই শহর। কেনই –বা ফেরাবে। যারা সীমানা ডিঙোয় তারা যতই অনুপ্রবেশকারী হোক, ভোটার তো বটে। তাছাড়া, শহরটাকে ঠিকঠাক গড়ে তুলতে গেলে শ্রমিকের যোগানটাও তো অপ্রতুল থাকা প্রয়োজন। সুতরাৎ সেইসব হাড়-হাভাতেদের নিয়ে পত্তন হলো জবরদখল বসতি। সেটা শহরের প্রান্তে নয়, একেবারে শহরের প্রাণকেন্দ্রে। এবং সে-সবকে আদৌ পাড়া বলা যায় না। চলতি ভাষায় যাকে বলা হয় বস্তি। সভ্য ভাষায় বলা যেতে পারে কলোনি। অর্থাৎ শহরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য মোতাবেক এখানেও গজিয়ে উঠলো সর্বহারা অঞ্চল। উচ্ছেদ করা হলো না বটে তবে অলিখিত শর্ত রইল, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের নামে কোনো আন্দোলন বরদাস্ত করবে না প্রশাসন। কারণ, এখানকার অধিবাসীরা যদিও ভোটার তবু বিধিসম্মত নাগরিক নয়, নিছক উদ্বাস্তু। সরকারি বয়ানে ‘পার্মানেন্ট লায়াবিলিটি’।‘’ ( অদ্ভুত আঁধার, প্রথম উর্বী সংস্করণ ২০১৬, পৃ. ২৭ )

একদিকে প্রমোদনগর অন্যদিকে মাতঙ্গিনী কলোনিকে সামনে রেখে লেখক আখ্যান পরিক্রমা শেষ করেছেন। এই কলোনি থেকেই বড় হয়ে উঠেছে বিজু ও রতুরা। পাশাপাশি রয়েছে গোপাল চক্রবর্তী, মিনতিবালা, বকাই সেন সহ বহু চরিত্র। আসলে লেখক বস্তির সম্পূর্ণ জীবনচিত্র অঙ্কন করতে চেয়েছেন। ফলে একটি সমাজের , একটি গোষ্ঠীর সমস্ত স্তরের চরিত্ররা এসেছে। এইসমস্ত চরিত্র থেকে তিনি বিজুকে বৃহৎ জীবনচেতনায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিণতিতে তিনি বাস্তববাদী। মার্কসীয় জীবনদর্শন থেকে দূরে থাকেন। ফলে চরিত্রের অবধারিত যে পরিণতি তাই দেখিয়ে দেন।

সময় সময় কাহিনিতে তোমার মন নাই কুসুম :


​গল্প উপন্যাস কখনোই কাহিনির উদযাপন হতে পারে না। কাহিনিকে ফেনিয়ে বলার দিন আজ প্রায় শেষ। বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে সাহিত্য আর মানুষ কতদিন পড়বে ? এসসব তত্ত্বকথা বরং থাক, আমরা প্রবেশ করি আলোচ্য উপন্যাসে। উপন্যাসের নামকরণ থেকেই পাঠক একটা আভাস পেয়ে যাবেন লেখক কোন সময়ের কথা বলতে চান। প্রাককথন হিসাবে পাঠককে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে দেশভাগ পরবর্তী উদ্বাস্তু মানুষের এপারে আসা ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী হিন্দু মানুষের যে স্রোত এপারে এসেছিল সেই সময় এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। শিলিগুড়ির উপকন্ঠে এসেছে কিছু উদ্বাস্তু মানুষ। বড় ভূগোলের অভ্যন্তরে যেমন ছোট ভূগোল থাকে তেমনি বড় সময়ের অভ্যন্তরে থাকে ছোট সময়। সমুদ্রের স্রোতের একটা প্রাবল্য অবশ্যই থাকে কিন্তু সমুদ্রের ঢেউও তো কিছু কথা বলে। সেই পরিবর্তিত সময়, সময়ের পরিবর্তনে মূল্যবোধের পরিবর্তন, সময়ের স্রোতে নতুন প্রজন্ম কীভাবে বেরিয়ে আসছে তা তিনি দেখান। উপন্যাসের শুরুই হয়েছে তরুণ প্রজন্মের নষ্ট সময়কে সামনে রেখে। আসলে উদ্বাস্তু কলোনির নতুন প্রজন্ম কোন ভবিষ্যতের দিকে যাবে ? এক উদ্দেশ্যহীন ভবিষ্যৎ, যেনতেন প্রকারে নিজেকে স্থায়ী করা যুবকের ইতিবৃত্ত আমরা শুনতে পাই। এক মূল্যবোধহীন সময়ে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সবাই সবার অধিকার বুঝে নিতে চায়। ফলে বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যেও কোন সামঞ্জস্য নেই। ‘জোর যার মুলুক তার। গুলি মারো কেতাবি বচনে। সুতরাৎ গ্রীষ্ম, বর্ষা যথারীতি দাদাগিরি চালাতো।‘ ( তদেব, পৃ. ১১ ) কিন্তু এই পরিবর্তিত সময়ের কাছে মানুষ কখনোই বশ্যতা স্বীকার করে না। স্বীকার করেনি নায়ক বিজন চক্রবর্তী ওরফে বিজুও। সময়কে সে প্রথম থেকেই ঘৃণা করত, আর এই ঘৃণাবোধ প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল পিতা গোপাল চক্রবর্তী। ছেলে মেয়েরা ঘুম থেকে দেরিতে উঠলে গোপাল রাগ করত ঠিকই, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেনি। অথচ লেখক সেই ভাবনাকে আর ব্যঙ্গ করে তোলেন সময়কে শ্যামা সংগীতের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে –“সোমায় বহিয়া যায়, মা / যে জন বুজে না হায় ..” তবে স্ত্রী মিনতিবালা কোন ভদ্রতার ধার ধারেনি। ডিউটি থেকে ফিরে এসে যদি দেখত ছেলেমেয়ে এখনও ঘুমাচ্ছে তবে সরাসরি ‘ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ’ করে গায়ে জল ছিটিয়ে দিত। তখন থেকেই বিজু বুঝছে বন্দি সময়ের কথা। এই ইতিবৃত্ত থেকে সে বের হতে চাইলেও উপায় নেই। আসলে তখনও সে সেই বয়সে পৌঁছায়নি। বিজু নিজের স্বাধীন জীবন খুঁজে পেতে চাইলেও তা পাওয়া যায়নি। কেননা সে তখনও মানুষের স্বাধীন হবার জন্য যে বয়স প্রয়োজন অর্থাৎ বাল্য কৈশোর থেকে যৌবনে পৌঁছায়নি। সে জানতে চেয়েছিল কাকে বলে নিজস্ব সময়, কাকে বলে ব্যক্তি স্বাধীনতা। 


​​​​​​​সময়ের পরিবর্তনে ইতিহাস কীভাবে মুছে যায় লেখকের দৃষ্টি সেদিকেও আছে। তাই অবিভক্ত বাংলার রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুম ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, লেখকের বয়ান অনুসারে –“ স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মহান কর্তব্যই তো ইউরোপিয় ঠাঁটবাট চুরমার করে দেয়া।“ ( পৃ. ৭১ ) তেমনি কলোনিতে ক্লাব গড়ে ওঠা থেকে ইরফান খুনের মামলায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, রাজনীতির সুবিধার জন্য আজ বড় কৌশল সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প , তা থেকে মধ্যবিত্তের আত্মখণ্ডন ও আত্মসুখ, বর্তমান রাজনীতি, শাসন ব্যবস্থার গলদ, কলোনিকে সমনে রেখে রাজনৈতিক মুনাফা লুঠ সব লেখক দেখেন ও আমাদের দেখান। তেমনি ছিল প্রমোদনগরে গড়ে ওঠা ক্লাবের নাম কী রাখা হবে, শেষে নানা নামের মধ্য দিয়ে ঠিক হয় ‘ভাই ভাই সঙ্ঘ’। লেখক এসবই অতীব সুন্দর করে এঁকেছেন –“যেহেতু নামকরণ সংক্রান্ত সমস্যা এই কলোনির জন্মলগ্ন থেকেই চালু আছে, তখন ক্লাবের ক্ষেত্রেই বা তার ব্যত্যয় হবে কেন ! যথারীতি মিটিং ডাকতে হলো কামাক্ষাকে। এবার সামনের সারিতে দুটো চেয়ার। পাশের চেয়ারে গোপাল চক্রবর্তীকে বসিয়ে কামাক্ষা প্রস্তাব করল ক্লাবের নাম প্রমোদ সঙ্গ রাখা হোক। কেননা এই নামের জাদু কতটা কার্যকরী সেটা কলোনির সবাই নিশ্চয়ই এতদিনে বুঝেছে !” ( পৃ. ১০৮ )

এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউরের পৌষমাস : 


ভাষা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট সব লেখককেই করতে হয়। জীবন ও শ্রেণিচেতনা বুঝে ভাষার প্রয়োগ করতে হয়। তেমনি চরিত্রের সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা যেন সেই অঞ্চলকেই নির্দিষ্ট করে দেয়। তেমনি লেখক যে সময়ের কথা , জীবনের কথা বা ভূগোলের কথা শোনাতে চাইছেন ভাষাকেও সেই জীবন অনুসারী হতে হবে। অবশ্য এও সত্য বহু লেখক ভাষাকে গুলিয়ে ফেলেন, সংলাপে একই বাক্যে সাধু চলিতের গুরুচণ্ডালী দোষে মিশ্রণ করে বসেন। অলোক গোস্বামী এ উপন্যাসে এক কলোনির ইতিবৃত্ত লিখেছেন। ফলে ভাষাকেও সেই জীবনের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হয়েছে। ওপার বাংলার বাঙালি উপভাষার মানুষদের ওপর এপারের আদর্শ চলিত ভাষা চেপে গিয়ে সৃষ্টি হল এক জগা –খিচুড়ি ভাষা। আসলে সমাজপতিরা ভেবেছিল ভাষা দিয়েই যেহেতু স্বপ্ন রচিত হয় তাই সেই ভাষাটাকেই গুড়িয়ে দেওয়া আগে প্রয়োজন। তবে সব ক্ষেত্রে সমাজপতিরা জয়ী হয়নি –“ভাষা সন্ত্রাসকে সম্পূর্ণ প্রতিহত করা যায়নি। অর্ধেক পরাজয় মেনে নিতেই হয়েছে। অর্ধেক, কারণ পরবর্তী প্রজন্ম দ্বিগুন উৎসাহে নতুন ভাষাসংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে নিয়েছে। নিজের সন্তানের মুখে নতুন ভাষা, নতুন আচরণ, নতুন ভঙ্গী দেখে মানুষগুলো যত আতঙ্কিত হয়েছে ততই নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কারগুলোকে আরও বেশি বেশি করে আঁকড়ে ধরেছে।“ ( তদেব,পৃ. ৩০ ) এ উপন্যাস যেহেতু বস্তি জীবনের ইতিবৃত্ত তাই শব্দ প্রয়োগেও লেখককে সেই জীবনের কাছে যেতে হয়েছে। শব্দগুলি আপাত অর্থে দৃষ্টিকটু হলেও লেখক এমন এক বৃত্তান্ত রচনা করেন যেখানে অশ্লীলতা উড়ে গিয়ে জীবনের গভীর তলদেশে পাঠককে নিয়ে যান। আমরা সামান্য দৃষ্টান্তে তা দেখব, সম্পূর্ণ জানার জন্য মূল উপন্যাস পাঠ ব্যতিত অন্য উপায় নেই। বিজুর স্কুলের ঘটনা। বাদল ও কালু মার্বেল খেলছিল। প্রথমে বাদল জিতলেও পরে হারতে শুরু হওয়া মাত্র অনিয়ম বা ‘চোট্টামো’ শুরু করে। যেহেতু কালুর শক্তি কম তাই প্রহারে সব মার্বেল দিয়ে দেয়। কালু জানতো মারপিট বৃথা, পরিবর্তে সে অমোঘ বাণ প্রয়োগ করে –“নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুত কয়েক-পা পিছিয়ে এলো। তারপর প্যান্টটা ঝপ করে নামিয়ে নুঙ্কুটা বের করে কোমর দুলিয়ে বলল, ‘তোর মায়েরে চুদি।‘’ (তদেব,পৃ. ১১২ ) শহরের আপাত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে এ শব্দ অশ্লীল মনে হতে পারে কিন্তু বস্তিজীবনে এ শব্দ স্বাভাবিক। এ দৃশ্যের পর লেখক যে ঘটনা বলয় তৈরি করলেন তাই মূল লক্ষ। এ শব্দ উচ্চরণে কালুর স্কুলে আসা বন্ধ হওয়ার ফলে রুটি পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বস্তির মানুষের কাছে শিক্ষা অপেক্ষা রুটিই যে প্রধান তা লেখক দেখান। বাড়িতে রুটি না পৌঁছানোয় কালুর বাবা ঘটনাটি জানতে পেরেছে, নচেৎ নয়। তেমনি এ ঘটনাকে সামনে রেখে লেখক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, শিক্ষক-শিক্ষিকার অবৈধ সম্পর্ক ও মেরুদণ্ডহীন বাঙালির যে চিত্র অঙ্কন করলেন তা এক কথায় অনবদ্য।


​​​​​​​বিজুর মাতা মিনতিবালা। তিনি যেহেতু রীতিমত রোজগার করে সংসার চালান তাই পুত্র কন্যা সহ স্বামীকে কোন মধুর বাক্যে সম্বোধন করেন না। কন্যা রতুকে উদ্দেশ্য করে ইরফানরা গালি দিয়েছিল। সেও বস্তির বাস্তব চিত্র। এ ঘটনা শোনার পর মিনতিবালা কন্যাকে উদ্দেশ্য করে যা বলে তাও বাস্তব –“চুল ধরে টানতে টানতে রতুকে এনে ফেলে উঠোনে। লাথি, কিল, থাপ্পড় মারতে মারতে গর্জে চলে, ‘খারাপের এ্যাহনই দেখছস কী ? মায়ে মুখে রক্ত তুইল্যা রাইতভর অইন্যের গু-মুত ঘাটে, আর মেইয়ে গরম খাইয়া বেরায়। কুনহানে তুর অ্যাতো গরম থাহে আইজ দেখমু।“ (তদেব, পৃ. ৮৭ ) এক নিদারুণ ব্যঙ্গের চাবুকে লেখককে এসব অঙ্কন করতে হয়েছে। তবে সে ব্যঙ্গে এক মধু মিশে থাকে। পাঠকের চোখ যেন নতুন করে খুলে যায়। তিনি আঘাত করেন, কখনও ছুড়ি চলান কিন্তু তাঁতে রক্তের দাগ লেগে থাকে না। না বিষয়ে তাঁকে মোপস্যার সাথে তুলনায় বসছি না, অতবড় আহম্মক নই। কিংবা সমাজকে কোন শিক্ষা দেবার জন্যও তিনি কলম তুলে নেননি। আসলে জীবন ও সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন। আর তা পেরেছেন সার্থকভাবে , তা বলাই বিধেয়।

স্বপ্ন... স্বপ্ন... স্বপ্ন...স্বপ্ন দেখে মন... :

মধ্যবিত্ত- নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন স্বপ্নের মূল্য কতটুকু ? অথচ স্বপ্ন নিয়েই তো জীবন গড়ে তোলা। সেই স্বপ্ন ও স্বপ্নহীনতার আখ্যান এ উপন্যাস। তবে এও বলে রাখা ভালো সেই জীবনস্বপ্ন গড়ে তুলতে গিয়ে তিনি কোন দর্শনে পা দেননি। চরিত্রের যা স্বাভাবিক পরিণতি তাই দেখিয়েছেন।বিজু দেখেছিল পিতার সমস্ত স্বপ্ন কীভাবে ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু তা বিচার বিশ্লেষণের বয়স তখন তাঁর হয়নি। সেই স্বপ্নহীন পিতার সন্তান হিসাবে সে কোন স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু জীবনে বা নির্মাণে তো ভাঙার আগে থাকে গড়ার ইতিবৃত্ত। স্বপ্ন ভাঙার আগে থাকে স্বপ্ন গড়ার কথা, লেখক সেদিকে নজর দেন –

“বাবার স্বপ্নভঙ্গের ঘটনাগুলো বিজুর চোখের সামনে ঘটেছিল ঠিকই কিন্তু বিজু দেখেনি সেসব। অর্থাৎ, তখন যা বয়স ছিক সে বয়সে বোধ-বুদ্ধি জন্মায় না। সুতরাৎ স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নভঙ্গ, দুটো বিষয়ই তখন ছিল বিজুর নাগালের বাইরে। নাহলে ঘটনাগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে বিজু বুঝতে পারত স্বপ্ন চুরমার হওয়ার অর্থতার স্বপ্নও চুরমার হয়ে যাওয়া। মানুষ তো স্বপ্ন দেখে তার সন্তানের জন্যই।

অবশ্যই তখন টের পায়নি মানেই তো এ নয় যে জীবন স্বপ্নভঙ্গের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু ভাঙার গল্প তো আসে পরে, প্রথমে থাকে গড়ার গল্প। সুতরাৎ বিজুর জীবনের প্রথম স্বপ্নটার কথাই হোক আগে।“ (পৃ. ৬৬)

বিজু প্রথমে পাড়ার মস্তান বকাই সেনকেই আদর্শ মানুষ হিসাবে মনে করেছিল। কিন্তু বকাইয়ের মৃত্যুতে সে পড়াশোনায় মন দেয়। ভেবেছিল বৃহৎ জীবনে পৌঁছে যাবে। এমনকি মিষ্টির দোকান থেকে পুরাতন বই নিয়েও সে পড়াশোনা চালায়। বৃহৎ জীবন চেতনায় সে গিয়েওছিল, ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের ইন্দ্রজিতের মত ভেবেছিল ‘আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি’। বস্তির স্কুল থেকে শহরের স্কুলে যেতে চেয়েছিল তবে শেষপর্যন্ত সে হয়েছে চৌকিদার। বিজু ভেসে গিয়েছিল কল্পনায় মাধুরীর প্রেমে। বিজু ও মাধুরীকে কেন্দ্র করে লেখক কল্পনা থেকে জাদুবাস্তবে গিয়েছেন। আসলে প্রত্যেক পুরুষের কল্পনাতেই কোন না কোন নারী থাকে, যার সঙ্গে কল্পনায় কথা বলা যায়, মাধুরীও যেন তেমন। বিজু প্রথমে চাকরি পেয়ে আনন্দিত হলেও পরে তা বিষাদে পরিণত হয় কেননা একজনের পেটে লাথি মেরে এই চাকরি জুটেছিল। লেখক বিজুকে নিয়ে গেছেন অবচেতন জগতে , সেখানে মাধুরী ছাড়াও সে মিশেছে অনুর সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত বিজু ফাঁসিতে এগিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের কাছে বিজুর মত সাধারণ মানুষের মূল্য কতটুকু। আর লেখকও আমাদের শোনান –

“যদি ছেড়ে দেয় জেল থেকে, কী করব ? ফের স্বপ্ন দেখব আর দেখে যাব সে সব স্বপ্নের লাগাতর ভেঙে পড়া ? না গো বাকাইদা, আর পারব না সহ্য করতে। তাই সব স্বপ্নটা জমাট বাঁধার আগেই চুরমার করে দিতে ওভাবে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করেছি। স্বপ্ন আমাকে ফের একবার হারিয়ে দেওয়ার আগে আমিই জীবনে প্রথমবার স্বপ্নকে হারিয়ে দিতে চাই। একজন জন্মজব্দ মানুষের কি মৃত্যজব্দ হতেও ভালো লাগতে পারে বকাইদা ?” ( পৃ. ২৪২ )

রতু বা রত্না চক্রবর্তীর স্বপ্নও ভঙ্গ হয়েছে। রত্না একে ইরফান, বকাই সেন ও সুরেশের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে কিন্তু কোনটিতেই সফলতা আসেনি। বন্ধুর কাছে প্রতিজ্ঞা রাখতেই সে ইরফানের সঙ্গে জড়িয়েছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের ইতিবৃত্তের জন্যই মৃত্যু ঘটেছিল ইরফানের। আর লেখক এ ঘটনাকে জড়িয়ে দিয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিমের সাম্প্রদায়িকার সঙ্গে। এরপর রতু জড়িয়ে যায় বকাই সেনের সঙ্গে। সে ইতিবৃত্ত বিজু জানতো কিন্তু অর্থ লোভের কাছে পরাজিত হয়। আসলে নিম্নবিত্ত তো এভাবেই হেরে যায়, সামান্য অর্থের জন্য, সুখের জন্য বৃহত্তর ফাঁদে পা দেয়। এই রত্নাই হারিয়ে গেছে, বিজু শত চেষ্টা করেও খুঁজে পায়নি। সে দিদির খোঁজে পতিতালয় পর্যন্ত গিয়েছিল কিন্তু সেখানের খোঁজ মেলেনি, কিছু নিম্নবিত্তের স্বপ্ন বুঝি এভাবেই হারিয়ে যায়। মিনতিবালা চেয়েছিল হসপিটাল সুপার থাকতে থাকতে ছেলের একটা চাকরির ব্যবস্থা করে নেবে কিন্তু সুপার পরিবর্তন হতেই মিনতিবালার স্বপ্ন অন্ধকারেই থেকে যায়।

এবার বিদায়বেলার সুর ধরো ধরো ও চাঁপা, ও করবী :

সময়, সমাজ, উদ্বাস্তু সমস্যা, রাজনৈতিক সংকট, ভণ্ডামী, মানুষকে শোষণের কলাকৌশল, বিশ্বাস- সংস্কারের দ্বন্দ্ব, সংস্কার থেকে নতুন প্রজন্মের বেরিয়ে আসা, স্বপ্নের হাতছানি ও ব্যর্থতা, পুরাতন ধ্যান ধারণাকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা, কল্পনা, চেতন-অবচেতন, মূল্যবোধের পরিবর্তন, নিয়তিবাদ, মধ্যবিত্তের বেঁচে থাকার মিথ্যা অভিনয় সমস্ত মিলিয়ে এক অনবদ্য আখ্যান নির্মাণ করেছেন অলোক গোস্বামী এ উপন্যাসে। আর সে নির্মাণ এগিয়ে গেছে যথার্থ ভাষা প্রয়োগে। আসলে ভাষা ও শব্দ ব্যবহারের অব্যর্থ কৌশলেই তো উপন্যাসের নান্দনিক সৌন্দর্য গড়ে ওঠে। শুধু এ গ্রন্থ নয় অলোক গোস্বামী সব গল্প উপন্যাসেই শব্দ ও ভাষা প্রয়োগে সচেতন, এজন্যেই বোধহয় তাঁর লেখার পরিমাণ কম ! পাঠককে সামান্য গদ্যের স্বাদ দেওয়া যেতে পারে, যদিও তা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো –

“সত্যকে তুলে ধরতে, ধর্মকে পুনর্স্থাপন করতে যুগে যুগে কেউ না কেউ হাজির হয়ই। তাকে দাবানো যায় না। সে হয়ে ওঠে যুগপুরুষ। সেই যুগপুরুষের দায়িত্ব শেষ হলে আসে নতুন যুগপুরুষ। যেমন ছিল মোহিত ঘোষ। যেমন কি না গোপাল চক্রবর্তী। যথারীতি এই ঘটনাও চোখের পলক ফেলার মতো নিমেষে ঘটে না। যেভাবে কলোনি প্রতিষ্ঠার পর চার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল মোহিত ঘোষের আবির্ভাবের জন্য, সেভাবেই তার অন্তর্ধানের পর আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয় গোপাল চক্রবর্তীর আবির্ভাবের জন্য।“ ( পৃ. ৩৯ )

এ কলোনির মানুষদের ওপারে যাবার সম্ভবনা থাকলেও ভোটের মুনাফা লুঠের জন্য রাজনৈতিক দল গুলি পাঠায়নি। সে সময় চালু হয়েছিল অনুপ্রবেশ আইন। কিন্তু আজ ‘NRC’ এর কারণে ওপার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষেরা এক ভয়ংকর সংকটের মুখে। সে সংকটকে সামনে রেখে অলোক গোস্বামী নতুন কোনো উপন্যাস লিখবেন কি না তা আমাদের জানা নেই ! আর সে জানার জন্য অপেক্ষা ছাড়াও উপায় নেই !





লেখক পরিচিতি
পুরুষোত্তম সিংহ
প্রবন্ধকার।
পশ্চিমবঙ্গ

২টি মন্তব্য: