বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

অমর মিত্রের গল্পঃ নবজাতক

পঞ্চাশ ছুঁতে আর কদিনই বা বাকি। চাকরির বয়স তিন বছর কমানাে আছে না হয়,তাই বলে শরীর তাে দাঁড়িয়ে থাকবে না এক জায়গায়। গােপেনের চুলে ভালােরকম পাক। পােকা-লাগা দাঁতের উপরনিচ পাটি থেকে ছটি উপড়ে ফেলতে হয়েছে। চশমা ছাড়া কাগজপত্র ঝাপসা। খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম হলেই মাঝরাত্তিরে বুক-জ্বালা। বয়স দিলে কেন হে ঈশ্বর? এই বয়সে গােপেন প্রথম পিতা হয়েছে। কত জায়গায় মানত, কত সাধুর পায়ে ঠেকিয়েছে মাথা।
ট্রেনে করে গিয়ে, ভ্যান রিকশয় চেপে হত্যে দিয়ে এসেছে পীরথানে। তবু হয়নি। বয়স থেমে থাকছিল না। চাকরির মেয়াদ ছোট হয়ে আসছিল। পূর্ণযৌবনে সন্তানের মুখ দর্শনের সুযােগ চলে গেল প্রায়। তখনই এ ডাক্তার ও ডাক্তার করে, ফকিরের কাছে টোটকা নিয়ে গােপেনের বউ পেটে ধরল। সেই সন্তান গত পরশু দুপুরে, ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমের ভিতর জন্ম নিয়েছে হাসপাতালে। গােপেনকে এখন কে দ্যাখে ?

কাল দিনভর একে ওকে খবর দিয়েছে। ওষুধ কিনেছে, সিস্টার-ডাক্তারদের পিছনে পিছনে ঘুরেছে। এখনাে ক’দিন তারা থাকবে হাসপাতালে। এখন গােপেন বাজার সারছে।

কেনাকাটার ফিরিস্তি অনেক, তার ভাইবউ লিস্ট করে দিয়েছে, সেই লিস্টে আরাে কিছু যােগ করেছে নার্স দিদিমণি। গােপেন তার ভাইকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দোকান খােলার অপেক্ষায় ঘুরছে ভাদ্রের সকালে। কখন খুলবে দোকানপাট? নাকি আজ দোকান বন্ধের দিন, হরতাল ? বেলা তাে কম হল না, সাড়ে সাত পেরিয়ে গেছে। খবরের কাগজ বিলি করে শূন্য সাইকেলে ঘন্টি বাজিয়ে ঘরে ফিরছে হকার যুবক। এখনাে খুলল না! পায়চারি করছে গােপেন ফুটপাথে। দোকানগুলাের ঝাপ ফেলা। ফুটপাথ নির্জন। গােপেন পকেট থেকে লিস্ট বের করে চোখ বুলােতে লাগল,তােয়ালে, অয়েল ক্লথ, বালিশ-তােষক (ওয়াড় সমেত), বড় পলিথিন, গামলা, থারমোফ্লাস্ক, বেবি পাউডার, বেবিঅয়েল, সাবান, ফিডিং বােতল, দুধের বাটি, ঝিনুক কিংবা চামচ, ছােটমশারি, জামা, বেবিফুড, দুরকম ওষুধ...।

জন্মালেই এ সব লাগে। গােপেনের ভাই নগেনের দুই ছেলে। তার বউ আধুনিকা। সুর টেনে বলেছে, পারেন তত বেবি কটও দেখবেন দাদা, হাওয়া খাওয়ানাের পেরাম্বুলেটর, সবই তাে লাগে, একটা লাল চেলি আনবেন, ছ দিনের দিন তার মাথার কাছে রেখে দিতে হবে কলম কাগজ রূপাের টাকা। এ সব দিয়ে, বিধাতা তাে ভাগ্য লিখবেন ওই রাতে...।

দোকান খুলছে এবার। গােপেন দেখল বছর তিরিশের মলিনবেশ যুবক রাস্তার ধারে, ফুটপাথের প্রান্তের
দোকানের ঝাঁপ খুলে ধুপ জ্বালাচ্ছে। সে গিয়ে দাঁড়াল, তােয়ালে হবে? তােয়ালে নানারকম লাগবে, প্লাস্টিক সিট দেওয়া তােয়ালেও চেয়েছে নগেনের বউ। তাতে শুইয়ে বাচ্চা নিয়ে ঘুরবে তার মা। তােয়ালের ফিরিস্তি শুনে ধুপ জ্বালানাে সংক্ষিপ্ত করল দোকানদার, বাচ্চার জন্য চাই?

হ্যাঁ। অপরাধীর মতাে হাত কচলায় গােপেন।

ঝপাঝপ গাঁট খুলতে খুলতে দোকানদার জিজ্ঞেস করে, ছেলে না মেয়ে? গােপেন মেয়ে বলাতে দোকানদার যেন থমকায়, সেকেন্ড ইস্যু ?

আঁজ্ঞে না, প্রথম সন্তান।

বাহ। প্রথম সন্তান মেয়ে তাে লক্ষ্মী, কত ওজন হল?

গােপেন ওজন বলতে দোকানদার মন্তব্য করল, বেশ হয়েছে, চমৎকার, এবার মজাটা দেখবেন স্যার, যখন তাকাবে, হাসবে, উপুড় হবে, আহ কী সুন্দর! আচ্ছা মাথায় চুল হয়েছে?
খুউব, ঘন কালাে, আমার বউ তাে ফসা, তার রঙই পেয়েছে। গােপেন যেন গল্প জুড়ল, চোখ দুটো টানাটানা, শুধু হাত-পা নাড়ছে।

হাসল দোকানদার, আমারও ওই রকম। তবে ছেলে, তার কী আদর ! হাসপাতালে ওই সপ্তাহে ওই একটাই ছেলে হয়েছিল স্যার, কটা নেবেন, আচ্ছা আমি সব বেছে দিচ্ছি, নির্ভাবনায় নিয়ে যান, বউদির খুব পছন্দ হবে।।

দাম দিতে গিয়ে গােপেনের মাথা যেন ঘুরে যায়, চারটে ছােট তােয়ালে একশ কুড়ি, এত!
দোকানদার হাসে, দাম করতে নেই স্যার এই সময়ে, ধরুন সবাই এই সময় কিছু পেয়ে থাকে, বাড়ি নিয়ে যান, দেখবেন কত লােক বলবে মিষ্টি দাও, বকশিস দাও, কাপড় দাও, আমি তাে ঠিক দামটাই চাইছি, আচ্ছা, পাঁচ টাকা কমই না হয় দিন, তবে দর করা ঠিক নয়, শিশুর জিনিস তাে।

গােপেন কেমন ডােম্বল হয়ে তাকিয়ে আছে দোকানদারের দিকে। দোকানদার প্যাক করতে করতে বলছে, আপনার হাতে মানে আপনার মেয়ের হাতে বউনি হচ্ছে, দেখি কেমন পয়া, কত সেল হয় আজ। টাকা বের করতে করতে, গােপেন ফস করে বলল, মানে কত লাভ করতে পারেন?

হে হে। হাসতে লাগল দোকানদার, লাভের জন্যই তাে বসেছি স্যার, হ্যাঁ শােনেন, এই সময়ে রােদ খাওয়াবেন ভালাে করে, রােদ খেলে সর্দি-কাশি হবে না, রােদ ছাড়া পিওর জিনিস আর কী আছে বলেন, জল বাতাসে তাে ভেজাল, কাগজে রােজ পড়েন না, দূষণ হচ্ছে কী রকম!

গােপেন প্যাকেটটা ক্যারি ব্যাগে নিয়ে এগােতে এগােতে বুঝল, খুব ঠকে গেছে, গেল মাসেই বড় তােয়ালে কিনেছে বাইশ টাকায়। গালে চড় মেরে নিল। পিছন থেকে দোকানদার হাঁকছে, সর্ষের তেল মাখাবেন স্যার, কথায় বলে।
তেলে-জলে আয়ু...।

ওই তো বড় প্লাস্টিক গামলা ঝুলছে ফুটপাথের ধারে। গােপেন বড় বড় পায়ে এগােয়। এবার সে সাবধান। লাল গামলায় হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল দাম। বুড়াে দোকানি বিড়ি ফেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী হবে, কী কাজে লাগবে স্যার, মানে কী করবেন?

বাচ্চার জন্য। বলতেই হল গােপেনকে।

ফোকলা দাঁতে হাসল বুড়াে, প্রায় হলদেটে চোখে গােপেনকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল, তাই বলুন, তা হলে ভালাে জিনিস, এক নম্বর মাল দিতে হবে, বাচ্চা বলে কথা, কবে হল, ছেলে না মেয়ে?

মেয়ে শুনে মুখটা কুঁচকে যায় বুড়াের, বসে পড়ে, বিড়বিড় করে, লােকে বলে মেয়ে ভালাে, লক্ষ্মী আসে, এটা কি প্রথম ?

গোপেন হাসে, আজ্ঞে হ্যাঁ।

আমার তাে প্রথম মেয়ে, জামাই মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে, তারও দুই মেয়ে, সব নিয়ে আমার ঘাড়ে এসে উঠেছে, কী যে করি? বিড়বিড় করল বুড়াে, নিন, আশি টাকা দিন, ওই মেয়ে হওয়ার পর অবশ্য আমি লটারি পেয়েছিলাম পাঁচশ টাকা, সেই টাকায় ব্যবসা করলাম কাটা কাপড়ের, চোট হয়ে গেল সব, পয়া-অপয়া ধরা যায় না , দিন আশি টাকা।

গােপেনে টের পেল ঠকাচ্ছে তাকে। সে ঠকে যাচ্ছে পরিষ্কার। এর দাম গােটা পঞ্চাশের বেশি হতে পারে না। তাই তাে বলে দিয়েছিল নগেন। সে পঞ্চাশ বলতেই লােকটা গামলা সরিয়ে নিল, হবে না মশায়, বাচ্চার জন্য দর হয় না। 
ঠকে গেলেও দর হয় না।

না হয় না, বাচ্চা ইজ বাচ্চা, যা বলব তাই দেবেন, পকেট উজাড় করে দেবেন, দিন আশি টাকা, সত্তর টাকা দাম, দশ টাকা মিষ্টি।

ঠকে গেল গােপেন। জেনে শুনে ঠকে গেল। তাকে জানিয়ে ঠকাল মানুষটা। যাক! মনে কোনাে দুঃখ রাখতে নেই এই দিনে। লােকটা চিৎকার করে তাকে উপদেশ দিল। গােপেন হাসি মুখে ট্রাম লাইন পার হয়ে শয্যাধামে গিয়ে ঢুকল।

সবে ধূপ লাগানাে হয়েছে। বেশ উগ্র গন্ধ। ফুলের ভিতরে গোঁজা থাকে। সেই ফুল দিয়ে ডেড বডি—ভাবতেই গােপেন মনে মনে রাম নাম করতে থাকে। এখন ওসব মনে আনতে নেই। তােশকের কথা শুনে আধবুড়াে দোকানদার জিজ্ঞেস করল, ক’জন শােবে? পাশ-বালিশ থাকবে না?

পাশ বালিশ থাকবে দু দিকেই, শােবেন একজন, বাহাত্তর ঘণ্টা বয়স।

শুনে হা হা করে হাসল লােকটা, তাই বলুন! পরিষ্কার করে বলবেন তাে, মাথায় সর্ষের বালিশ দেবেন, দুটো পাশ বালিশ, তােশক, রাবার ক্লথ, চাদর, খুব ভালাে জিনিস চাই স্যার, ছিল তাে বাতাসে আকাশে মাটিতে--।

না, না তা হবে কেন? ছিল তাে মায়ের পেটে। গােপেন বলল। তার ভালাে লাগতে আরম্ভ করেছে মানুষটাকে।।

মানুষটা মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে, আজ্ঞে না স্যার, মাটিতে জলে বাতাসে গাছে শস্যেই থাকেন, এঁরা সেখান থেকেই আসেন বাবা মায়ের কাছে। আমাদের পাড়ার জিতেন হালদার, প্রাইমারি টিচার, এই নিয়েই বই লিখেছে, কিনে নেবেন, টালার মহাকালী ভাণ্ডারে পাওয়া যায়। শুনুন স্যার মায়ের পেটে জলের ভিতরে তো ভাসছিল, নরম জায়গায় ওকে শােয়াতে হবে, মায়ের কোলে কিংবা বিছানায়, ও যেন ধরতে না পারে মায়ের পেট থেকে অন্য জায়গায় এসে গেছে।

বাহ তা কেন হবে, সেটা তাে বােঝাতে হবে।

মাথা ঝাঁকাল আধবুড়াে মানুষটা, বুঝে নেবে স্যার, নিজেই বুঝে নেবে, কিন্তু আমাদের কাজ নরম ফাস- ক্লাস বিছানায় শােয়ানাে, আচ্ছা, ও কোথায় এল বলল দেখি?

কেন পৃথিবীতে। গােপেন ভ্যাবলা হয়ে বলল।

পৃথিবীটা ভালাে জায়গা?

চুপ করে থাকে গােপেন। সে যদি কথা বলে এখন, বহু কথা উঠতে পারে। তাতে কথাই বেড়ে যাবে শুধু। কী দরকার!

লােকটা তােশক বালিশ ইত্যাদি প্যাক করে দিতে দিতে বিড়বিড় করে, এত লােক এত অসুখ, পৃথিবীটা যেন গঙ্গাসাগর মেলা হয়ে গেছে স্যার, ভালাে করে চাইল্ড স্পেশালিস্ট দেখাবেন, কী হবে বলুন দেখি, মাস অন্তর কী সব ভ্যাকসিন, ইনজেকশন দিতে হয়, তা দেওয়াবেন, টিকে না নিয়ে পৃথিবীতে থাকাই বিপদ স্যার, এই দ্যাখেন আমার টিকের দাগ। বলতে বলতে লম্বা হাত বাড়িয়ে ধরল মানুষটা, গােল গােল কালচে এই দাগ গােপেনেরও আছে। তখন এতেই হত। এখন অনেক রকম টিকে, ইনজেকশন। ফিসফিস করছে মানুষটা। গঙ্গাসাগর মেলাই বটে, চাদ্দিকে বাতাসে মাটিতে রােগ জীবাণু থিকথিক করছে, হাত বাড়িয়েই আছে তারা, নরম গা পেলেই দাঁত বসিয়ে দেবে।

গােপেন বলল কত দেব? দর তাে জানলাম না।

হাত-পা ছড়িয়ে বসে লােকটা বিড়ি ধরায়। গােপেনের জিজ্ঞাসার জবাবই দেয় না । চোখ বুঁজে বিড়বিড় করতে থাকে, ইনজেকশন না নিয়ে মেলায় ঢুকতেই পারবেন না, কলেরা ডায়েরিয়ার চান্স, সমুদ্রের ধারে অত সুন্দর জায়গা, কিন্তু রােগ-বীজাণুতে ভরা, পরিষ্কার বাতাস, আলাে, সমুদ্রের ঢেউও তা দূর করতে পারে না, কত রকম মানুষ, চোর, বদমাশ রােগী, দুশ্চরিত্র, খুব সাবধানে থাকতে হবে স্যার, কী যে হাল হয়েছে পৃথিবীটার! ওই দেখুন কেমন

কালাে ধোঁয়া ছাড়ছে বাস, পােকা ধরে যাবে কলজেতে।।

গােপেন বলল, আমরা তাে আছি।

চোখ খােলে মানুষটা, আছি তাে বটেই, মানুষ বলেই টিকে আছি।

কত দেব? জিজ্ঞেস করল গােপেন।

যা হয় দেন। উদাস গলায় বলল মানুষটা।

চমকে যায় গােপেন, যা হয় দেব মানে, কত দাম?

যেমন ইচ্ছে দেন স্যার, কোন্ হাসপাতালে আছে, নার্সিংহােমে ?

মাথা নাড়ল গোপেন, না, আর জি কর হাসপাতালে, কদিন বাদে ছাড়া পাবে ।

কেমন হয়েছে, মানে আপনার মত না আপনার ওনার মত, মা না বাবা ?

বােঝা যাচ্ছে না। বলল গােপেন।

লোকটা ঝপ করে উঠে দাঁড়ায়, হাবুল, এই হাবুল, বস দেখি দোকানে, আমি একটু ঘুরে আসি।

অবাক গােপেন, কোথায় যাবেন, দামটা নিন।

নেব, নেব তাে নিশ্চয়, আমি যাই আপনার সঙ্গে, দেখে আসি কে এলেন, মহাপুরুষ কিনা, আমার ও সবের পাট নেই, আমি আর আমার উনি, খােকাখুকু নেই, যাই দেখে আসি।

আপনার নাম? জিজ্ঞেস করল গােপেন।

আজ্ঞে নিরাপদ দাস, আমাকে দেখাতে আপত্তি আছে?

না, না তা হবে কেন? আমি গামলা তােয়ালে কিনতে গিয়ে বিস্তর ঠকে গেছি।

হাসল লােকটা, কী হয়েছে তাতে, ঘরে বাচ্চা এলে ঠকেও আনন্দ, সব কিছু করে আনন্দ, চলেন স্যার।

দামটা? 

যা হয় দেবেন, হাবুল সব বুঝে নেবে, যদি পঞ্চাশ টাকা লস হয় হাবুল তার বদলে পাঁচশ টাকা ঠকিয়ে লােকসান তুলে নেবে, ও সব চিন্তা নেই।।

নিরাপদ দাসের সঙ্গে চলল গােপেন। থারমােফ্লাক্স, বেবি ক্রিম, অয়েল পাউডার সব সে তদারকি করে কিনে দিল। গােপেনের সঙ্গে টানা রিকশায় চাপল নিরাপদ। চলতে চলতে বলতে লাগল, এবার কিন্তু মজা হবে স্যার।

কী মজা?

দেখবেন, আপনি নিজেই বড় হচ্ছেন দিনে দিনে।

আপনি এত জানেন?

জানার কী আছে, চোখ বুজলেই টের পাবেন, আপনি কাঁদছেন, আপনি হাসছেন, আপনার কান হচ্ছে, চোখে দৃষ্টি আসছে, পাখি দেখছেন, আকাশ দেখছেন জানালা দিয়ে, আপনি হামা দিচ্ছেন, আপনি দাঁড়াচ্ছেন, হ্যাঁ, যাদের কাছে ঠকেছেন, তাদের ওপর বিদ্বেষ রাখবেন না, তারা কিন্তু ভালাে মনেই ঠকিয়েছে গােপেনবাবু।

গােপেন আর নিরাপদকে নিয়ে ভাদ্রের মেঘলা আকাশের নিচ দিয়ে রিকশা ঠুনঠুন করতে করতে এগােচ্ছিল। একটু আগেও চড়া রােদুর ছিল। রিকশার উপরে এখন মেঘের ছায়া, ঠাণ্ডা বাতাস। আরাম লাগছিল গােপেনের। তার হঠাৎ কী যেন হল, জিজ্ঞেস করল, বাচ্চা নিয়ে আপনি এত জানেন, বাচ্চা নেই সত্যি ?

না, বাচ্চা নেই, আছে দামড়া, তার ভিতরে আর নিজেকে দেখা যায় শুয়ােরের বাচ্চা হয়ে গেছে সে।

কী বলছেন, নিজের তো সন্তান।

এখন আর তা মনে হয়য় না, কে আমার বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়েছে,তার ভিতরে কোনাে প্রেম নেই গােপেনবাবু, ট্রেসপাসার তো, যা পারে হাতিয়ে নিচ্ছে, চুরি-জোচ্চুরি, মেয়েছেলে নষ্ট, সবেতে ওস্তাদ। সে বেটা পৃথিবীর মানুষই না, আমি বড় হতে-হতে থেমে গেছি, সে একা একা বড় হয়ে... যাক গে—এ আমার ফেমিলির কথা। আমি আপনারটা দেখি, ও ঠিক মহাপুরুষ হবে, হবেই, কাল রাত্তিরে আমি স্বপ্ন দেখেছি গােপেনবাবু।

কী স্বপ্ন? গােপেন অবাক। সন্তান হয়েছে তার, ভিড়-ভিড়াক্কার নােংরা এক হাসপাতালে। এত ক্লান্ত ছিল সে, রাত্তিরে পড়েছে আর ঘুমিয়েছে। স্বপ্ন দেখেছে নিরাপদ দাস, যাকে সে এই ঘণ্টা দেড়েক আগেও চিনত না।

নিরাপদ বলছে আলাে দেখেছে। নরম হলুদ আলােয় রাতের আকাশটা ভরে গেছে। বড় কেউ আসছে নিশ্চয়ই।

অনেকদিন তেমন একজন আসছে না। এ সব সে ভাবছিল যখন, তখনই বাবা গােপেন খবর দিল। প্রথম খদ্দের সেজে গােপেনবাবু খবর দিল। বাবা গােপেন, আপনি মহাপুরুষের পিতা। শুনতে শুনতে গােপেনের গায়ে কাঁটা দেয়।

রিকশা ঝামর ঝামর করে খানাখন্দে টাল খেতে খেতে এগােচ্ছে। রাস্তার দুপাশে ময়লার ডাঁই, দুর্গন্ধে ভরে আছে চারদিক। ময়লার স্তুপে শিশু, নারী, কুকুর একসঙ্গে কী খোঁজাখুঁজি করছে। এরই ভিতরে জন্মেছে গােপেনের সন্তান। তাকে দেখতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ। এখন তার সঙ্গী হয়েছে গােপেনও। সেও তাে খবরটা শুনল নিরাপদর কাছে যে মহাপুরুষ জন্মেছে এই শহরে। আস্তাবলে জন্মানাে শিশুকে দেখতে যাচ্ছে তারা, মেঘের পিছু পিছু। ওই তাে মেঘ হাসপাতালের মাথায়। মেঘই এখন পথপ্রদর্শক। দিনের বেলায় নক্ষত্র তাে থাকে না। সবই মিলে যাচ্ছে। কিন্তু গােপেন বিষণ্ণ গলায় বলল, আমার তাে মেয়ে হয়েছে, মিলছে না নিরাপদবাবু।

রিকশায় পা ছড়িয়ে হা হা করে হাসে নিরাপদ, মিলবেই না তাে। সব কি আগের মতাে মেলে? এটা তাে মানুষের জগৎ, কোনােটাই কোনােরকমের মতাে নয়, আমরাও তাে সাধু নই বাবা গােপেন যে সাধু খ্রিস্টকে দেখতে যাব, ইনি এঁর মতাে হবেন, ইনি সম্পূর্ণ নতুন হবেন, একেবারে নতুন, কারাের সঙ্গে কোনাে মিল পাবেন না।

হাসপাতালে ঢুকল রিকশা। বিচলিত মুখে গােপেনের ভাই নগেন আর তার বউ দাঁড়িয়ে আছে। নগেনের বউয়ের কোলে

নবজাতক। নগেন ছুটে এল হাঁপাতে হাঁপাতে, বলল, কাল রাত্তিরে দুটো বাচ্চা মরে গেছে, বাচ্চা দিয়ে দিল, ওর মাকেও ছেড়ে দেবে আজ, সব জণ্ডিস, জল খারাপ হয়ে গেছে, খুব বিপদ দাদা, আগে তাে বাঁচাতে হবে।

নিরাপদ দাস বলল, আরম্ভ হল বাঁচা, আমি বিছানাগুলাে দিয়ে মুখ দেখি বাবা গােপেন, ঠিক এই রকম আলাে দেখেছিলাম স্বপ্নে, ঠিক এই রকম...।

কী রকম আলাে? গােপেন অন্ধের মতাে আলাে হাতড়ায় যেন। নিরাপদ তার সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে, অভিনন্দন বাবা গােপেন, তুমি এর পিতা! তুমি ইতিহাস হয়ে যাবে।

শিশু ঘুমােচ্ছে। গােপেন ঝাপসা চোখে দেখল আকাশ থেকে ফুল পড়ছে নিরাপদ দাসের মাথায়। হাসপাতালের সব জানালা খুলে গেছে। সবাই মুখ বাড়িয়েছে নিচে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন