বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

বই নিয়ে আলোচনা: এলেচি আমাদির কনকিউবাইন-র পুনঃপাঠ

এলহাম হোসেনের

আফ্রিকার ঐতিহ্য ও ধ্রুপদী সভ্যতা পৃথিবীর যেকোনো ভৌগলিক স্থানের মতই প্রাচীন। এর সাহিত্যের শিকড়ও অনেক প্রাচীন। এর সঙ্গে জুড়িয়ে আছে সহস্র বছরের প্রাচীন গল্পকথনরীতি ও ঐতিহ্যবাহী নানা আচার-আচরণ। এর ভাষার ঐতিহ্য মিশরীয় ফারাওদের রাজত্বকাল অতিক্রম করে রোমানদের কার্থেজ, সুদানী সাম্রাজ্য, ইথিওপিয়ার খ্রিস্টান ঐতিহ্য, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যসমূহ এবং পশ্চিম ও পূর্ব আফ্রিকার ইসলামিক ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে বর্তমান অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তবুও মাত্র গত শতাব্দীর শেষার্ধে এসে আফ্রিকী সাহিত্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। কাজেই আফ্রিকী সাহিত্য একই সঙ্গে প্রাচীন এবং নতুন।

এর প্রকরণ, কাঠামো ও আঙ্গিক যেমন ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে অভিনবত্ব লাভ করেছে, তেমনি বিষয়বস্তু, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা এর প্রাচীনত্বকে পাঠকের সামনে হাজির করে। এর মৌখিক সাহিত্যই এর ঔপনিবেশিকতার নাগপাশ ছিড়ে বেরিয়ে আসার রসদের যোগান দিয়েছে। আবার বর্তমানে আফ্রিকী সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বড় টেক্স্ট বা প্রপঞ্চগুলো অনেক বড় বড় ঘটনা যেমন-- দাসপ্রথা ও ঔপনিবিশেকতার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। যেমন, চিনুয়া আচেবেও দাবি করেন, তাঁর Things Fall Apart পশ্চিমের সঙ্গে আফ্রিকার সংঘাতের জায়গা থেকে উদ্ভব হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতেই সর্বপ্রথম আফ্রিকী সাহিত্যের লেখকদের সন্ধান পাওয়া যায়। এঁরা ছিলেন দাস বা প্রাক্তন দাস। আত্মপরিচয় অনুসন্ধান ও তার প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ থেকেই এঁরা লিখতে শুরু করেন ইউরোপীয়দেরই ভাষায়। এদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু ছিল মানবিকতা, দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধাপড়ার দুর্বিসহ স্মৃতি এবং তা থেকে বেরিয়ে এসে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার তাগিদ। তবে আধুনিক আফ্রিকী সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি, তার উৎপত্তি হয়েছে ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে। ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন মিশনারী স্কুল, গীর্জা, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি আধুনিক আফ্রিকী সাহিত্যের আতুর ঘর। বিশ শতকের শেষার্ধের আফ্রিকী লেখকরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোরই তৈরি। শ্লেষাত্মক ব্যাপার হলো যে, এঁরাই আবার এসব ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। বিশেষ করে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কপট ভূমিকার সমালোচনায় তারা মুখর হয়েছেন। এছাড়া ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে আফ্রিকার প্রায় সব দেশ স্বাধীন হয়। ফলে, এ সময়ের সাহিত্যে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ নিয়ে এক ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে। আবার উত্তর-ঔপনিবেশিক কালের স্থানীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনার ঝাঁঝও পাওয়া যায় এ সময়ের আফ্রিকী সাহিত্যে।

আফ্রিকী সাহিত্য এর সমাজ, ঐতিহ্য, অতীত ও বর্তমানের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এর নিবিড় পাঠ পাঠককে ঋদ্ধ করে আফ্রিকার জনগোষ্ঠীর মানসকাঠামো ও ভৌত উপষঙ্গ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞানের আলিঙ্গনে। কাজেই আফ্রিকার সাহিত্যের শুধু সাহিত্য-পাঠই যথেষ্ট নয়, এর রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং পরিবেশ তাত্ত্বিক পাঠাধ্যায়নের জন্যও পাঠককে তৎপর থাকতে হয়। তিনটি ঐতিহ্যগত উপসঙ্গ আধুনিক আফ্রিকী উপন্যাসের পরিচয় নির্ধারণ করেছে। এক ধরনের উপন্যাস আছে যার বিষয়বস্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা-দুর্ঘটনা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। একে আমরা বাস্তবধর্মী উপন্যাস বলি। তবে এই বাস্তবতা নাটকীয়তা তৈরির মধ্য দিয়ে এক অবাস্তব আবহও তৈরি করে। এই আবহ তৈরির কাজ লেখক সচেতনভাবেই করে থাকেন পাঠককে জমিয়ে রাখার জন্য। আবার আর এক ধরনের উপন্যাস আছে, যাতে জীবনের কদার্যতার চিত্র অংকন করার পাশাপাশি একটি আদর্শ দাঁড় করানো হয়। সর্বশেষ, আর এক ধরনের উপন্যাস আছে যাতে কাব্যসত্য বা পোয়েটিক ট্রুথ-এর উপস্থাপনা করে এক ধরনের খেয়ালি বা রোমান্টিক আবহ তৈরি করা হয়। একে বিংশ শতাব্দীর আঁভাগার্দ সাহিত্যের ধারায় সৃষ্ট রোমান্টিক বা মেটাফিজিক্যাল উপন্যাসও বলা যায়। আফ্রিকী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে সর্বজনপরিচিত আচেবে, নগুগি, স্যমবেন ওসমান প্রমূখ বাস্তববাদী ঔপন্যাসিক হিসেবেই সুখ্যাত। এঁরা নিজেদের উপন্যাসে ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে হারিয়ে যাওয়া আফ্রিকার মানবিকতা ও মর্যাদা পুনরূদ্ধার করার পাশাপাশি আফ্রিকার একটা স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব নির্মাণের প্রকল্প বিধৃত হয়েছে।বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ক্ষোভ, ভীতি ও উদ্বিগ্নতার বিশ্বস্ত ছবি এঁদের উপন্যাসে অংকিত হয়েছে।

তবে আফ্রিকী সাহিত্যকে শুধু নান্দনিক সাহিত্যপাঠের পর্যায় থেকে যাঁরা একে বহুবল্লভ জ্ঞানের আঁকড় হিসেবে গভীর পাঠের বিষয়ে উন্নীত করেছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন এলেচি আমাদি। তিনি পেশায় একাধারে ইঞ্জিনিয়ার, সেনা কর্মকর্তা, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার। জন্ম নাইজেরিয়ায় ১৯৩৪ সালে। মৃত্যু ২০১৬ সালে। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য কনকিউবাইন এর জন্য তিনি বিশ্বনন্দিত। তাঁর সাহিত্যকর্মের আখ্যান জুড়ে থাকে নাইজেরিয়ার প্রত্যাঞ্চল, যেখানে মানুষ ও তাদের অকৃত্রিম আবেগ চালিত, লালিত ও পালিত হয় তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রথার দ্বারা। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করে। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব-পরিস্থিতিতে মানুষ চায় পরিবর্তন। খাপ খাওয়াতে চায় বিশ্ব-পরিস্থিতির সঙ্গে। এই আকাঙ্ক্ষা তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় সহস্র বছরের পুরাতন ঐতিহ্যের মুখোমুখি। সংঘাত বাঁধে অপরিহার্যভাবেই। আবার কখনো কখনো একটি স্বার্থবাদী শ্রেণি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে শাসন, শোষণ ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে। এ ব্যাপারে সচেতনতাও কখনো কখনো মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয় তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে। বাঁধে দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বই এলেচি আমাদির সাহিত্যকর্মের মূল বিষয়বস্তু। তাঁর দ্য কনকিউবাইন উপন্যাসটিও এমনই এক দ্বন্দ্বের ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছে।

বিষয়বস্তু নির্বাচন বা বাছাই করার ক্ষেত্রে আমাদি বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর আফ্রিকার চিত্রায়ণ পশ্চিমী প্রপঞ্চ থেকে আফ্রিকাকে বের করে আনার এক শক্তিশালী প্রয়াস এবং এটি আফ্রিকী সাহিত্যের ক্যানভাসকে আরও বিস্তৃত করেছে। জোসেফ কনরাড বা জেম্স জয়েস ক্যারির রচনায় আফ্রিকীদের শরীর আছে কিন্তু মন নেই; অনুভুতি আছে কিন্তু অভিব্যক্তি নেই; জীবন আছে কিন্তু যাপন নেই। আরিফ দার্লিকের মতে, ’পোস্টকলোনিয়াল’ শব্দবন্ধটি সত্যিকার অর্থে ঔপনিবেশিতদের কথা বলতে শুরু করেছে ১৯৮০ এর মধ্যভাগ থেকে। এডওয়ার্ড সাঈদ তো তাঁর ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে দেখিয়েছেন পাশ্চাত্য কীভাবে প্রাচ্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করে তার ন্যারেটিভ-এ। সাঈদ-এর পূর্বে ফানো তাঁর ব্ল্যাক স্কীন হোয়াইট মাস্ক গ্রন্থে সাহসিকতার সাথে দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিকরা নিগ্রোদের টুকরো টুকরো কল্পচিত্র অংকন করে তাদের অসভ্য হিসেবে হাজির করেছে।

কিন্তু আমাদি দায়িত্বশীলতার সাথে পাঠককে নিয়ে গেছেন আফ্রিকার অভ্যন্তরে, এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সুতিকাগারে। ভূতত্ত্ববিদের মতো ঐতিহ্যের মাটি খুঁড়ে বের করে এনেছেন এর প্রাচুর্যের ইতিবৃত্ত। এটি করতে গিয়ে আমাদি অবতারণা করেছেন নাটকীয়তার। চরিত্রকে হাজির করেছেন প্রচলিত প্রথার বাইরের নিয়মের সূত্রে গেঁথে। সহস্র বছর প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মুখোমুখি যদি চরিত্রকে দাঁড় করাতে হয়, তবে চরিত্রকে রোমান্টিক প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে দিলে তা সহজ হয়, কারণ রোমান্টিক প্রেম গতানুগতিক কোনো নিয়মে চলে না। নিয়ম ভেঙে প্রেম করার নামই তো রোমান্টিক প্রেম। বিবাহসিদ্ধ প্রেম গতানুগতিক সংস্কার ও ঐতিহ্য মেনেই চলে। কিন্তু রোমান্টিক প্রেম প্রচলিত প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করেই এগোয়।

একটি জাতি বা সম্প্রদায়ের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দ্বারা। কিন্তু কখনো কখনো এই অ্যাপারেটাসগুলোকে কেউ কেউ নিপীড়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তখন এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হয় সমাজ-সচেতন লেখককে। কিন্তু প্রত্যক্ষ-প্রতিবাদ অতটা সহজ নয়। তাই বলে লেখক যে সত্য কথা বলবেন না, তা নয়। আর এ সত্য কথা বলতে গিয়েই কখনো কখনো সে কায়েমী স্বার্থবাদী ও শাসকশ্রেণির রোষের মুখে পড়ে। জেলেও যায়। আবার মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করতে হয় কখনো কখনো। এ প্রসঙ্গে আরবি সাহিত্যের কবি এডোনিসের একটি উক্তি উল্লেখ না করলেই নয়। এক সাক্ষাৎকারে এডোনিস বলেছিলেন, যদি দেখ কোনো দেশের জেলখানা কবি, সাহিত্যিকে ভরে উঠছে না, তবে বুঝবে সে দেশের কবি-সাহিত্যিকরা সত্য কথা বলছেন না। যাইহোক, লেখক অবশ্যই সত্য কথা বলবেন। তবে তা তিনি বলবেন গল্পের আশ্রয় নিয়ে। শেক্সপীয়র তাঁর কমেডিগুলোতে রোমান্টিক প্রেমের কাহিনীর অবতারণা করেছেন। তাঁর কমেডির নায়িকারা কথার জৌলুস ছড়িয়ে দর্শক-হৃদয় জয় করেছে। প্রথাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে কখনো কখনো। অ্যাজ ইউ লাইক ইট-এর রোজালিন্ড যখন অরল্যান্ডোর প্রেমাবেগের প্রত্যুত্তরে বলে, Men are April when thay woo, but December when they wed, তখন কিন্তু সে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারীকে মিষ্টি কথায় ঘায়েল করার প্রচলিত চর্চা বা প্রাকটিসকেই চ্যালেঞ্জ করে। কাজেই রোমান্টিক প্রেমকে সাহিত্যের বিষয়বস্তু বানানোর পেছনে লেখকের একটা বড় উদ্দেশ্য থাকে। এলেচি আমাদিরও এই উদ্দেশ্য আছে। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, ..., ...romantic love is most often an affiliative relationship that breaks various intra and inter-social boundaries through the explosiveness and unpredictability of desire (F. Fiona Moola 8).

যদিও বিংশ শতাব্দীতে বেড়ে ওঠা আফ্রিকী সাহিত্যের বিষয়বস্তু মূলত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্থানীয়দের ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার ওপর মনোসংযোগ করেই তৈরি হয়েছে, তবুও একবিংশ শতাব্দীতে এসে এখানে একটা প্যারাডাইম শিফট ঘটেছে। এটি শুধু আফ্রিকার সাহিত্যেই ঘটেনি, বরং পৃথিবীর নানা প্রান্তে বসবাসরত আফ্রিকী অভিবাসী বা ডায়াসপোরার মধ্যেও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিলক্ষিত হয়। আফ্রিকী সাহিত্যের গতানুগতিক বিষয়বস্তু থেকে একবিংশ শতকের অনেক লেখক-সাহিত্যিকই বের হয়ে আসছেন। নাইজেরীয় ঔপন্যাসিক চিমামান্ডা নজোগি আডিচি এঁদের অন্যতম। এদিক থেকে দেখতে এলেচি আমাদি বেশ অগ্রগামী। ১৯৬৬ সালে নাইজেরিয়ার স্বাধীনতার পরে যখন স্থানীয় নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক ব্যর্থতার জন্য দেশে প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে, তখন চিনুয়া আচেবে, ওলে সোয়িংকা, ক্রিস্টোফার ওকিবোর মতো প্রতিনিধিত্বকারী লেখক-কবি তাঁদের সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তু করে নিয়েছেন সমকালীন ও স্বাধীনতার পূর্বে ঔপনিবেশিকতার অভিযাত ও মানুষের প্রতিক্রিয়া। ঐ একই সময়ে আমাদি লিখছেন রোমান্টিক প্রেম নিয়ে। কাহিনীর সেটিং হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম, যেখানকার মানুষ তথাকথিত পশ্চিমা সভ্যতার গোলকধাঁধাঁয় পড়েনি। এখানকার মানুষগুলোর জীবনযাপন নিয়ন্ত্রিত হয় প্রচলিত মিথ, ধর্মবিশ্বাস, সংস্কার, দু:স্বপ্ন, এমনকি কুসংস্কারের দ্বারাও। যেকোনো সংস্কার বা মিথ যা একটা সম্প্রদায়ের জীবনযাপন পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা যদি কখনো প্রশ্নের মুখে না পড়ে, তবে তা কখনো কখনো স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারে। আর এলেচি আমাদি এই স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠা সংস্কার ও বিশ্বাস ব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করেছেন তাঁর দ্য কনকিউবাইন উপন্যাসে।

উপন্যাসটির কাহিনী গতানুগতিক রোমান্টিক উপন্যাসের কাহিনীর মত নয়। কাহিনীর প্রায় শুরুর দিকে আমরা নায়িকা ইহুওমাকে দেখি স্বামী হারিয়ে বৈধব্যের যাতনা সহ্য করতে। তার স্বামী এমেনিকে মাদুমের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয়। জমির মালিকানা নিয়ে এই মারামারি। মারাত্মক আহত হয়ে পরে মারা যায়। মাদুমে এখন ইহুওমাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু মাদুমের ইহুওমাকে বিয়ে করার চেষ্টাও সফল হয় না। ভয়ানক বিষাক্ত গোখরা সাপের মুখ থেকে ছিটানো বিষে তার চোখ অন্ধ হয়ে যায়। যন্ত্রণা এড়াতে সে আত্মহত্যা করে। এরপর বিবাহিত পুরুষ একুমে প্রণয় নিবেদন করে ইহুওমাকে। বিয়ে করতে চায়। কিন্তু সে-বিয়েও হয়ে ওঠে না। সে মারা যায় ইহুওমার ছেলের ধনুক থেকে ছুটে আসা বিষাক্ত তীরের আঘাতে। ওই তীর ছুড়েছিল রঙিন গিরগিটিকে হত্যা করতে। কিন্তু লক্ষভ্রস্ট তীর বিদ্ধ করে একুমেকে। ভবলীলা সাঙ্গ করে সে। উপন্যাসের শেষে আমরা নায়িকাকে নিঃসঙ্গই দেখি। রোমান্টিক উপন্যাসগুলোর শেষে সাধারণত বিয়ের বাদ্য বাজে। এ উপন্যাসে তা হয় না। এই যে নায়িকার নিঃসঙ্গতা, প্রেমে ব্যর্থতা, ঘর বাঁধার স্বপ্ন ধুলিসাৎ হওয়া-- এসবের পেছনের কারণ কী? কারণ কি সামাজিক, নাকি রাজনৈতিক, নাকি ধর্মীয়, নাকি মনস্তাত্ত্বিক? এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করতে করতেই পাঠক এলেচি আমাদির লেখক মানস ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

কাহিনীর নিবিড় পাঠে জানা যায় ইহুওমার স্বামী মারা যায় মারামারিতে লিপ্ত হয়ে মাদুমের আঘাতে। এর সঙ্গে অবশ্য যুক্ত হয় বৃষ্টিতে কাজ করার ধকল। তার মৃত্যুর বাহ্যিক কারণ হিসেবে যাই বলা হোক না কেন, আসলে এর পেছনে হাত রয়েছে সমুদ্রের রাজার বা সমুদ্র দেবতার। পূর্বজন্মে ইহুওমা ছিল সমুদ্র দেবতার স্ত্রী। কিন্তু সে ছিল তার অবাধ্য। সে চলে আসে পৃথিবীতে মানবীরূপে। সঙ্গে করে আনে সমুদ্র রাজার শাপ ও ক্রোধ। তারই ফলে সে আর কোনো মর্ত্য-মানবের সঙ্গে ঘর বাঁধতে পারবে না। ইকুয়েমের সঙ্গেও তার ঘরবাঁধা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ইহুওমার পুত্র নওয়ানার তীরের আঘাতে সে মারা যায়। আসলে তার মৃত্যুর পেছনেও সেই সমুদ্র রাজারই হাত। ইহুওমার এই অতীত বা পূর্ব জন্মের ইতিহাস আবিষ্কার করে গ্রাম্য বৈদ্য দিবিয়া। সে বলে, ইহুওমা কখনোই কোনো মর্ত্য-মানবকে বিয়ে করে ঘর বাঁধতে পারবে না। তার ভাগ্যে টিকা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে উপপত্নী বা কনকিউবাইনের।

এই যে সমুদ্র রাজার শাপ, তাকে যদি আমরা নিয়তি হিসেবে বিবেচনা করি, তবে বিষয়টা কী দাঁড়ায়? ইহুওমা কি নিয়তিকে অমোঘ ও দূর্লঙ্ঘনীয় জেনেও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে? হ্যাঁ, করেছে। সে নিয়তিকে জয় করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। একবার ব্যর্থ হয়েছে, আর একবার চেষ্টা করেছে। তাতেও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সে ব্যর্থতা তাকে শেষ করে দেয়নি। বরং তার ভেতরের শক্তিকে বের করে এনেছে। তাকে মানবিক গুণে গুণাণি¦ত করেছে। তাকে পৃথিবীর বুকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে টিকে থাকার সংগ্রামরত সব মানুষের প্রতিনিধি বানিয়েছে। সে মরণশীল মানুষ কিন্তু অমর দেবতার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। এখানেই তার টিকে থাকার গুঢ় অর্থ নিহীত আছে। এখানেই জীবজগতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের সে প্রতিনিধিত্ব করেছে। সীমার মাঝে থেকে সে অসীমকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

নারীবাদী দর্শনের প্রেক্ষিতে দেখলে ইহুওমাকে পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী নারী হিসেবে আমরা দেখি এই উপন্যাসে। এছাড়া আফ্রিকী সমাজে প্রচলিত বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তার অবস্থানও নির্ণয় করা সম্ভব উপন্যাসের ঘটনা ও পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে। মাদুমে ইহুওমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইহুওমা চায়নি তাকে বিয়ে করতে। সে পছন্দ করেছিল তার স্বামী এমেনিকেকে। আবার ব্রাইড প্রাইসের বিষয়টিও আফ্রিকী সমাজে নারীর সম্মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সমুদ্র রাজার ইচ্ছাই বাস্তবায়ন হয়েছে, যা পিতৃতান্ত্রিকতার দূর্লঙ্ঘ কর্তৃত্বের চিত্রই অঙ্কন করে। কিন্তু ইহুওয়ামার সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, সে পিতৃতান্ত্রিকতার বা পুরুষের কর্তৃত্বের নিপীড়নকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়নি। সে ধ্বংসকেই আলিঙ্গন করতে চেয়েছে, পরাজয়কে নয়। আসলে উপন্যাসের নায়িকার চরিত্রের মধ্য দিয়ে এলেচি আমাদি নাইজেরিয়ার ঔপনিবেশিকপূর্ব যুগের স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবন-ব্যবস্থা, সামাজিক পরিস্থিতি ও বিশ্বাস-ব্যবস্থার চিত্র অঙ্কন করেছেন অতিপ্রাকৃতকে প্রাকৃত-র পাশাপাশি রেখে। ফলে তাঁর বর্ণনায় এক যাদু বাস্তবতার আবহ তৈরি হয়েছে। অতিপ্রাকৃত বিষয়-আশয় যখন দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়, তখনই যাদু বাস্তবতার আবহ তৈরি হয়। এই আবহ জীবন-দর্শনের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। যাদু বাস্তবতার শিকড় আফ্রিকার ওরাল সাহিত্য বা মৌখিক সাহিত্যেও মধ্যে শক্তভাবে প্রোথিত আছে। এতে যেমন বাস্তব জীবনের নানান জটিল বিষয়-আশয়ের অবতারণা ঘটেছে, তেমনি এর সাথে মাখামাখি করে গায়ে গা লাগিয়ে অবস্থান করছে মিথোলজি, ফ্যান্টাসি বা অলীক কল্পনা, অদৃশ্য ও অতিপ্রাকৃত উপাদান ইত্যাদি। এই লোকিক ও অলৌকিক সমান গুরুত্ব নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণরূপে জীবনের বিশ্লেষণ করে এই যাদুবাস্তবতা কৌশল বা দৃষ্টিভঙ্গি। এর ব্যবহার বেন ওকরির ফেমিস্ড রোড, টনি মরিসনের বিলাভেড, অ্যামোস তুতুওলার পাম ওয়াইন ড্রিংকার্ড-এ এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। 

তবে এলেচি আমাদির লেখায় যাদু বাস্তবতা কৌশলের ব্যবহার পাঠককে জমিয়ে রাখে প্রধানত এর সাথে গ্রামীন পরিবেশের ভারসাম্যপূর্ণ সমণ¦য়ের কারণে। শহুরে জীবনের কোলাহল, রাজনীতির কুটিলতা ও ইট-পাথরের সংস্পর্শে থাকা যান্ত্রিক মানুষের উপস্থিতি নেই আমাদির উপন্যাসের ক্যানভাসে। অপরপক্ষে, চিনুয়া আচেবে এলেচি আমাদির চেয়ে অনেক বেশি জীবন ও সময়ঘনিষ্ঠ লেখক। আমাদির চরিত্রগুলো সমাজে থাকলেও যেন সময়টাকে তারা পুরোপুরি স্পর্শ করে না। আমাদির উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। এ বছর আচেবের থিংস ফল এপার্ট-ও প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার প্রাক্কালে নাইজেরিয়ার সমাজ ও মনস্তত্ত্বে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, তা চিনুয়া আচেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাঁর উপন্যাসে ধরতে পারলেও আমাদি তা ধারণ করেননি। আমাদিও চরিত্রগুলো সময়কে পুরোপুরি ধরতে পারেনি। কিন্তু আচেবের চরিত্রগুলো সময়টাকে ধরে ফেলে; এরা সময়ের প্রতি সংবেদনশীল। এটি সম্ভবত উপন্যাসের সেটিংয়ের জন্য হতে পারে। আমাদির মনোযোগের বিষয়ই হলো-- ‘The cultural and intellectual sophistication of this society... a celebration of indigenous beliefs and culture...’ (Usongo 52). অপরপক্ষে, আচেবের উপন্যাসগুলো ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে নাইজেরিয়া তথা পুরো আফ্রিকা জুড়ে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তার পূর্ণাঙ্গ ও বিশ্বাসযোগ্য চিত্র অংকন করে। আধুনিক আফ্রিকী সাহিত্য বলতে যা বুঝায়, তার জন্ম এই প্রতিক্রিয়া থেকেই, এবং তা ঘটে চিনুয়া আচেবের হাত ধরেই।

তবে পাঠক যদি মনে করেন, আমাদি তার সময় ও সমাজকে পাশ কেটে গেছেন, তাহলে তা ভুল হবে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষেও আন্দোলন-বিক্ষুদ্ধ সময়ে বাস করেও তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তু বেছে নিয়েছেন একেবারে নিবিড় ও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের মধ্য থেকে, যাদের দৈনন্দিন জীবনের আবেগ-অনুভুতির গায়ে এখনও তথাকথিত সভ্যতার যন্ত্রদানবের কালির আঁচড় লাগেনি, তেমনি আমাদিও তার সাহিত্যকর্মেও বিষয়বস্তুর উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন রাজনীতি, কূটনীতি ও পশ্চিমা সভ্যতার আগ্রাসনমুক্ত গ্রামীন জীবন। এই জীবন ঘড়ির কাঁটার সাথে চলে না। এই জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় অতিলৌকিক শক্তির দ্বারা যার ব্যাখা-বিশ্লেষণ ইট-পাথরে ঘেরা মানুষের যান্ত্রিক বুদ্ধিতে কুলোবে না। কারণ, আমাদির উপন্যাসে বাস্তব ঘটনা-দুর্ঘটনার মাল-মশলা ঢুকে গেছে অতিপ্রাকৃত ফ্রেমের মধ্যে। এখানেই আছে যাদু বাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়েলিজমের ব্যাপার। আমাদির উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র ইহুওমা সুন্দরী, সৎ, ভদ্র ও অমায়িক। গ্রামের পুরুষরা তাকে ভালোবাসে। একাধিক পুরুষ। তার প্রথম স্বামী এমেনিকে মারা যাওয়ার পর মাদুমে, একুমে-- যেই তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে, তারই রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু যে তাদের হয়েছে, এটি বাস্তব। কিন্তু মৃত্যুর কারণগুলো বাস্তব-ব্যাখ্যায় পাঠককে তুষ্ট করে না। ইহুওমার প্রেমিক বা স্বামী-- কেউ বাঁচে না। এই যে মৃত্যু নামক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে অতিপ্রাকৃত বিষয়কে এর সঙ্গে মেলানো হচ্ছে-- এই বাস্তবের সঙ্গে অতিপ্রাকৃতের অখণ্ড অবস্থানই হলো ম্যাজিক রিয়েলিজমের উৎসস্থল। আসলে ম্যাজিক রিয়ালিজম একটি দৃষ্টিভঙ্গির নাম। এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় বাস্তবের সঙ্গে অবাস্তবের সমন্বয়ের ফলে। এটি অতি প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি মানব সমাজের জন্মলগ্ন থেকেই আছে সবার মধ্যে, সব দেশের মানুষের মধ্যে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে।

এই একই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহৃত হয়েছে ইহুওমার স্বামী ও দুজন পাণিপ্রার্থীর মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। মাদুমের সাথে মারামারিতে এমেনিকে আহত হয়। পরে বৃষ্টিতে ভিজে বুকের সমস্যা হয়। এটিও তার মৃত্যুর কারণ। অথচ গ্রামের বৈদ্য আনিইকা বলেছে, এর পেছনে সমুদ্র রাজার হাত আছে। মাদুমে চেয়েছিল ইহুওমার সঙ্গে প্রেম করতে, বিয়ে করতেও, কিন্তু বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইহুওমার বাড়ি যাবার পথে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে ফেলেছে। এটি স্বাভাবিক নয়। গ্রামের বৈদ্য আনিইকা কড়ি চালাচালি করে বলেছে, এটি মাদুমের প্রতি অতি প্রাকৃত শক্তির সাবধানবাণী। আনিইকা তাকে বলেছে, সে যে জ্যান্ত ফিরে এসেছে-এটি তার সৌভগ্য। কতিপয় অশরীরী আত্মা পণ করেছিল তাকে হত্যা করতে। এই অশরীরী আত্মাদের মধ্যে এমেনিকের বাবার প্রেতাত্মাও রয়েছে। ওরা চায় না মাদুমে ইহুওমার সাথে কোন রকম সম্পর্কে জড়াক। ইহুওমার ওপর সমূদ্র দেবতার শাপ আছে। কাজেই ইহুওমাকে বিয়ে করা তো দূরের কথা, এখন তার প্রাণ বাঁচানোই প্রধান চিন্তার বিষয়। আর এজন্য তাকে নানান আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে গিয়ে তাবিজ-কবজ ধারণ করতে হবে। কিন্তু মাদুমের শেষ রক্ষা হয়নি। ইহুওমার কাঁচকলার ক্ষেতে সে ঢুকে পড়েছিল। জমির মালিকানা দাবি করে তার সাথে কথা কাটাকাটিতে লিপ্ত হয়। ইহুওমা অপমানিত বোধ করে বাড়ি ফিরে কাঁদতে থাকে। তার স্বামীর ভাইসহ পাড়া-প্রতিবেশী প্রতিবাদ জানাতে যায়। তাদেরকেও মাদুমে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রথমে ধস্তাধস্তি, পরে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে গোখরা সাপের মুখ থেকে ছিটানো বিষে সে অন্ধ হয়ে যায়। কয়েক মাস পর অন্ধত্বের যন্ত্রণা ও অপমান সহ্য করতে না পেরে মাদুমে আত্মহত্যা করে।

এরপর ইকুমে চেয়েছে ইহুওমার পাণিপ্রার্থী হতে। বৈদ্য আনিইকা তাকেও সাবধান করেছে, যেমনটা পূর্বে মাদুমেকেও করেছিল। ইকুমে শোনেনি। আনিইকা বলেছে, ইহুওমা পূর্ব জনমে সমুদ্র রাজার স্ত্রী ছিল। কাজেই তার সঙ্গে প্রেম করা বা তাকে বিয়ে করার চেষ্টা করা বিপজ্জনক। এটি সমুদ্র রাজার ক্রোধের উদ্রেক ঘটাবে। কিন্তু ইকুমে বিশ্বাস করেনি। হঠাৎ মনে হয়েছে, সে যেন প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে। হঠাৎ একটা তীর এসে তাকে আঘাত করে। নোয়ানার ধনুক থেকে এই তীর ছুটে এসেছে। নোয়ানা ইহুওমার ছেলে। আগুতুরুম্বের নির্দেশে বিসর্জনের গিরগিটিকে হত্যা করার উদ্দেশে সে এই তীর ছুঁড়েছিল। লক্ষভ্রষ্ট হয়ে আঘাত করেছে ইকুমেকে। প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে তার।

ইহুওমার স্বামী ও দ’ুজন পাণিপ্রার্থীর মৃত্যুর কারণ আর যাই হোক, দুর্ঘটনা তো নয়। একটা ঘটনা একবার ঘটলে এবং তার বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়া না গেলে তাকে দুর্ঘটনা বলা সঙ্গত। কিন্তু একই রকম ঘটনা যদি একাধিকবার একাধিক জনের সঙ্গে ঘটে, যার উদ্দেশ্য ও কর্ম একই, তখন সবাই বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখতে চায়। যদি বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্ক হাজির করা যায়, তবে তো হয়েই গেল। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে যদি রহস্য, সন্দেহ ও অনতিক্রম্যতা যুক্ত হয়, তবে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আর সহজভাবে হয় না। তেমনটাই হয়েছে ইহুওমার স্বামী ও দুজন পাণিপ্রার্থীর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে। এখানে স্বাভাবিকতা ও অস্বাভাবিকতা এসে এক বিন্দুতে মিশেছে। ফলে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। এই ধূম্রজালই যাদু বাস্তবতা। আমাদি এই বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়েছেন। এই মাঝখানে দাঁড়ানোর জায়গটাই হলো ডবল কনশাসনেস।

আনিইকা ও আগুতুরুম্বে সমুদ্র রাজার অস্তিত্বে বিশ্বাস করলেও নৌকার মাঝি, যাকে ইকুমে অনুরোধ করেছিল তাকে ও আগুতুরুম্বেকে সমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে যেতে, সে কিন্তু সমুদ্র রাজার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেনি। এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে মানব জাতির সংস্কৃতি প্রবাহিত হয়, প্রবাহিত হয়ে চলেছে। এখানেই আছে যাদু বাস্তবতার শিকড়। এটি সব সংস্কৃতির মধ্যেই আছে। আমাদের সহজাত প্রবৃত্তিরও এটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কালচার বা সংস্কৃতির মত মানুষের মনস্তত্ত্বও মনোলিথিক নয়। এখানে বাস্তব-অবাস্তব, জ্ঞান-কল্পনা, মায়া-মোহ ইত্যাদির বাইনারী অপজিশন সতত বিরাজমান। বিপরীতের সহাবস্থানেই তৈরি হয় একটা জনগোষ্ঠীর বয়ান বা ন্যারেটিভ। এই বয়ানেরই চিত্রায়ণ দেখি আমরা আমাদির কনকিউবাইন-এ।

বিশ্বাসের সঙ্গে অবিশ্বাসের অবস্থান, বাস্তবের সঙ্গে অবাস্তবের মাখামাখি, দৃশ্যমানতার সঙ্গে অদৃশ্যের বসবাস ম্যাজিক রিয়ালিজমের আবহ তৈরি করে। আফ্রিকী সমাজে তাবিজ-কবজের ব্যবহার বা এর উপর নির্ভরশীলতা একটি অতি প্রাচীন রীতি। এটি স্থানীয় আফ্রিকীদের জীবনযাপন পদ্ধতি, বিশ্বাস ব্যবস্থা ও আচরণকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। আফ্রিকী পুরুষদের, বিশেষ করে তরুণদের পৌরুষ প্রমাণ করার জন্য নিয়মিত কুস্তিতে অংশ নিতে হয়। আমাদিও এই নিয়মের চিত্রায়ণ দেখিয়েছেন তার কনকিউবাইন-এ। কুস্তিতে অংশ নেয়ার পূর্বে এরা যে ওঝার কাছে যেত তাবিজ-কবজ সংগ্রহের জন্য, তাও তিনি দেখিয়েছেন। ইকুমে আনিইকা নামক ওঝার কাছে তাবিজ নিতে যায় কুস্তিতে নামার আগে। এজন্য ওকাচি অর্থাৎ ইহুওমার মা তার সমালোচনা করেছেন। ইকুমে প্রথমে স্বীকার করতে চায়নি। শরীরের শক্তিকেই কুস্তিতে সাফল্যের মূলমন্ত্র বলতে চেয়েছে। কিন্তু তাবিজ-কবজের অদৃশ্য শক্তিকেও সে অস্বীকার করতে পারেনি।

একই রকম বিষয় উপন্যাসটির ষষ্ঠ অধ্যায়েও অংকিত হয়েছে। ইহুওমা স্বামীর মৃত্যু শোকে কাতর। স্বামীর কবরটার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বাড়ির আঙ্গিনার লাল মাটির ঢিবিটা আশপাশের সবকিছুকে যেন ঠেলে উঁচু হয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। ইহুওমা ভাবে, আহা! এমেনিকে যদি আশপাশের কোনো স্থান থেকে বেরিয়ে এসে তার মৃত্যু নিয়ে যতসব শোক আর আনুষ্ঠানিকতাকে ভুল প্রমাণ করতো, তবে কতইনা ভালো হতো। প্রচণ্ড শোকে চোখে জল আসে ইহুওমার। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। তন্দ্রাচ্ছন্নতা নেমে আসে। সে দেখে, এমেনিকে ধীরে ধীরে বাড়ির বৈঠকখানায় এসে ঢোকে। রুগ্ন, শীর্ণ, বুকটা ওষুধি লতা-পাতা ঘষার ফলে ধুসর রং ধারণ করেছে। ভয়ে ভয়ে এসে বৈঠকখানায় বসল। ইহুওয়া জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় ছিলে?

ননাদির কাছে-- এমেনিকে উত্তর দেয়--
আমি তোমাকে এতদিন ধরে কোথায় কোথায় না খুঁজেছি। তুমি কি এখন ভালো আছ?

মনে হয় অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। খাবার আছে কি?

হ্যাঁ, চল ভেতরে যাই। একসঙ্গে খাই।

না আমি বরং এখানেই খাব।

ঠিক আছে, এক্ষুণি আনছি।’

ইহুওয়া তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে যায়। দেখে, খাবার তৈরি নেই। পড়িমরি করে সে খাবার বানায়। স্বল্পতম সময়ে স্যুপ বানায়, খাবার নিয়ে ফিরে এসে দেখে এমেনিকে নেই। চলে গেছে। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে দেখে চোখ দুটো জলে ভেসে যাচ্ছে।

আমাদির এই বর্ণনার মধ্যে এক্সপ্রেশনিজম বা অভিব্যক্তিবাদের ব্যবহার যেমন স্পষ্ট, তেমনি বাস্তব-অবাস্তবের চমৎকার সংমিশ্রণে এখানে তৈরি হয়েছে যাদু বাস্তবতার আবহ। প্রসঙ্গত: একটা ব্যাপার উল্লেখ করা জরুরি। আমাদের এ অংশের পাঠকরা সাধারণত যাদু বাস্তবতার সন্ধান করেন লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের মধ্যে, বিশেষ করে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখার মধ্যে। আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক রচনায় এর অনেক উপাদান আছে, কিন্তু তার অনুসন্ধান হয় না বললেই চলে। আফ্রিকার সাহিত্য তো দূরের কথা। এই মনোভাবের জন্য নয়া-ঔপনিবেশিকতার যে ঠুসি আমরা এখনো চোখে পড়ে আছি, সেটাই প্রধানত দায়ী। নয়া-ঔপনিবেশিকতাবাদ এখনো অনেকের কাছে সড়ফঁং ড়ঢ়বৎধহফর. এই ঠুসি আরো মজবুত ও অভেদ্য আকার ধারণ করেছে প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের চাপিয়ে দেয়া তত্ত্বের অনাতিক্রম্য বোঝার কারণে। আসলে যেকোনো জাতি বা সম্প্রদায় তার নিজের পরিচয় নির্মাণ করতে পারে নিজের অবস্থান ইন্টারপ্রিট বা বিশ্লেষণ করে করে। আফ্রিকার আত্মপরিচয় নির্মাণের জন্য আফ্রিকাকেই তার অবস্থান বিশ্লেষণ করতে হবে। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত আফ্রিকার পরিচয় ও কল্পচিত্র তৈরি করেছে ইউরোপীয়রা। আফ্রিকায় শক্তিশালী ও পর্যাপ্ত সংখ্যক সাহিত্য-সমালোচকের খামতির সুযোগও নেয় ঔপনিবেশিকরা। এই খামতির কারণেই আমাদিও মতো অনেক লেখক-কবি, এমনকি আফ্রিকার মৌখিক সাহিত্যও সারাবিশ্ব তো বটেই আফ্রিকারও সব দেশের, সবভাষার সব পাঠকের সামনে আসেনি। ঔপনিবেশিকরাও আনেনি। দরকার মনে করেনি। উপরন্ত আফ্রিকার একটা বিকৃত চিত্র অংকন করে বিশ্বের সামনে হাজির করেছে। তা তাদের দরকার ছিল। তারপর সেই তকমা চাপিয়ে দেয়া হয় আফ্রিকার ওপর। এই তকমার মালমশলা শুধুই তত্ত্ব বা থিওরি। এই তত্ত্বসম্ভার আফ্রিকার ভৌগোলিক অবয়ব স্বীকার করে, রাজনৈতিক অস্তিত্ব নয়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছার পর থেকে ইউরোপের মানস-কাঠামোর মধ্যে আফ্রিকার খ- খ- কল্পচিত্র বা ইমেজ তৈরি হয়। তখন থেকে আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপের ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে তা অবশ্যই সমতার ভিত্তিতে নয়। এই ব্যবসায়িক কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে ইউরোপের মনের মধ্যে নির্মিত আফ্রিকার কল্পচিত্রগুলো শক্তিশালী হতে থাকে। পার্টনারশীপ থেকে ঔপনিবেশিকতা, আর ঔপনিবেশিকতা থেকে সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার ক্রমে ক্রমে চলতে থাকে। ব্যবসায়ের পার্টনারশীপ থেকেই এটার শুরু। কারণ, এই পার্টনারশীপ কখনোই সমতার ভিত্তিতে তৈরি হয়নি। হয়েছে কর্তৃত্ববাদের ভিত্তিতে। এই কর্তৃত্ব সব সময়ই ছিল ইউরোপের হাতে।

১৮৮৫ সালের বার্লিন কনফারেন্সের মধ্য দিয়ে আফ্রিকাকে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয় ইউরোপ। তখন আফ্রিকার ইমেজ পুরোপুরিভাবে তৈরি হয় ইউরোপের তৈরি তত্ত্বের ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ ১৭৪৮ সালে ডেভিড হিউম তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ--‘Of the Populousness of Ancient Nations’ Ges ‘Of National Characters’তে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই নিগ্রোরা সাদাদের চেয়ে নিকৃষ্টতর (চিলোজোনা ইজি ১৫)। এর ২৬ বছর পর ইমানুয়েল কান্ট ১৭৭৫ সালে লেখেন On the Different Races of Man’. ১৮২২ থেকে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত হেগেল দর্শন ও বিশ্বের ইতিহাস নিয়ে বক্তৃতা দেন। তিনি যেন প্রমাণ করতে পণ করেন যে, আফ্রিকীরা মানুষ নয়, মানব প্রজাতির নিচের স্তরে তাদের অবস্থান। তাঁর মতে একজন আফ্রিকী ‘Is an example of animal man in all his savagery and lawlessness’ (ইজি ১৫)। ১৭৮৭ সালে টমাস জেফারসন তাঁর ‘Notes on the State of Virginia-- তে লেখেন, শারীরিক সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তা বিবেচনায় তিনি মনে করেন যে, নিগ্রোরা স্বহজাতভাবে নিকৃষ্ট প্রাণী। আমেরিকার নৌবাহিনীর অফিসার এ এইচ ফুট (১৮০৬-৬৩) তো আর এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, যদি পৃথিবীর বুক থেকে সব নিগ্রোকে মুছে ফেলা হয়, তবুও পৃথিবীর কোনো ক্ষতিই হবে না।

উপরোক্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও দুরভিসন্ধিমূলক তত্ত্বগুলো ইউরোপীয়রা ব্যবহার করেছে অ্যাপারেটাস বা যন্ত্র হিসেবে। এই অ্যাপারেটাস দিয়ে আফ্রিকাকে কলঙ্কচিহ্নিত করেছে। শোষণ করেছে, নিপীড়ন করেছে। তবে পরবর্তীতে এই তত্ত্বগুলোর প্রতি আফ্রিকা প্রতিক্রিয়া দেখায়। প্রত্যুত্তর করে। এখান থেকেই আফ্রিকার আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পৃথিবীর নানান স্থানে বসবাসরত আফ্রিকী ডায়াসপোরা বা অভিবাসী, আফ্রিকার ভেতরেই শিকড় থেকে উচ্ছেদ হওয়া আফ্রিকী ও আফ্রিকায় জন্ম নেয়া ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে আহত বুদ্ধিজীবীরা এই আত্মপরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে ও রাখছে।

কিন্তু ঔপনিবেশিকতার মাদকে আচ্ছন্ন পৃথিবীর নানান স্থানে বুদ্ধিবাদীদের একটা বিরাট অংশই এখনো আফ্রিকার সমৃদ্ধির তেমন একটা সন্ধান করেননি। তাঁরা আধুনিকতাবাদ বলুন, আর উত্তরাধুনিকতাবাদ বলুন; কিউবিজম বলুন, আর যাদু বাস্তবতা বলুন-- সব কিছুর জন্যই ধেয়ে যান পশ্চিমের দিকে। নিজের বিদ্যাচর্চার প্রক্রিয়ার সঙ্গে পশ্চিমের নাম জড়ালে কিছু মনোযোগও কাড়বার সম্ভাবনা থাকে, তাই। এই সুবিধাবাদী প্রবণতার কারণে প্রায়ই নিজের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিবিধ অমূল্য রতনের সন্ধান করা হয়ে ওঠে না। ধার করা পালক দিয়ে নিজের তথাকথিত বিজয় মুকুট শোভিত করার মতই তখন যা কিছু খোঁজার, যা কিছু আবিষ্কারের, যা কিছু অনুসন্ধানের, তার পুরোটা জুড়েই থাকে পশ্চিমা সাহিত্য। এটি একটি সাধারণ চিত্র সব তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। সেখানে আত্মকে প্রান্তের দিকে ঠেলে ফেলে আমদানি করা অপরকে কেন্দ্রে স্থাপন করার প্রচেষ্টা বেশ সচেষ্ট।

আবার স্বয়ং আফ্রিকাতেও আমাদির উপন্যাস খুব বেশি সংখ্যক সাহিত্যড়সমালোচকের মনোযোগ যে আকর্ষণ করতে পেরেছে, তাও নয়। কারণটা অবশ্য আফ্রিকী বাস্তবতা যার অভিঘাতে এখানে উপন্যাসের উদ্বভ ঘটে বিংশ শতাব্দীতে। ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে স্থানীয়দের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া হয়, তার মধ্য থেকেই উপন্যাসের উদ্ভব হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আফ্রিকীদেও মনস্তত্ত্বে যে ব্যাপক ওলোট-পালট ঘটেছিল তার শক্তিশালী চিত্রায়ণ ঘটেছে উপন্যাসে। এ সময় সংস্কৃতি, ভাষা ও মননের যে সংকরায়ণ ঘটেছিল, তারও বিশ্বস্ত চিত্রায়ণ দেখা যায় উপন্যাসেই। উপন্যাস তার বিস্তৃত ক্যানভাসে জীবনের যত উপষঙ্গের আয়োজন করতে পারে, কবিতা তা পারে না। তাই আফ্রিকী সাহিত্যে প্রধানতম জানরা হলো উপন্যাস। আবার পাঠক-সমালোচক আফ্রিকার উপন্যাস বলতে এমন এক জানরাকে বুঝেন যাতে সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের চিত্রায়ণ থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আফ্রিকার গ্রামীন রীতি, আচার ও বিশ্বাস-ব্যবস্থা নিয়ে রচিত উপন্যাসকে পাশ কেটে যাওয়ার কারণও নিহীত। এজন্য আমাদি বোদ্ধা পাঠক-সমালোচকের পর্যাপ্ত মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেননি। তবে আমাদির উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারলে আমাদের তাঁর কাছে যেতেই হবে। সমাজের কোন কোন সংস্কার দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা একসময় কুসংস্কারে পরিণত হতে পারে। তখন এটি নিপীড়নযন্ত্রে পরিণত হতে পারে। মানুষের আশা-আকাঙ্খাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। মানুষের ব্যর্থতাকে ভাগ্য বলে চালিয়ে দেয়। ইচ্ছার গন্তব্য তো দূওে থাক, অনেক সময় যাত্রাটাকেও বিঘ্নিত করে কুসংস্কার হয়ে ওঠা এই সংস্কারগুলো। আমাদির কনকিউবাইন এই জায়গাতেই আলোক সম্পাত করেছে।

আমাদির বাস্তবকে অবাস্তবের পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে মানুষের ভাবনা ও কল্পনার মধ্যে নিবিড় সেতুবন্ধন তৈরি করার এক দুর্দান্ত ক্ষমতাধর উপন্যাস হলো আমাদির কনকিউবাইন। আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদি গ্রামীণ আফ্রিকী সমাজের মূল্যবোধ, মনস্তত্ত্ব ও মননের ভেতরকার ফাঁক-ফোঁকড়গুলো নির্দেশ করেছেন। আবার প্রাক-ঔপনিবেশিক কালের আফ্রিকার একান্ত ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বিশ্বস্ত দলিল হিসেবেও আমাদির এই উপন্যাস পড়াও যায়। এছাড়া গতানুগতিক আফ্রিকী সাহিত্যের ধারা যার মনোযোগ ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে আফ্রিকী সমাজের পরিবর্তনগুলোর উপর কেন্দ্রিভ’ত, তা থেকে আমাদি পাঠকের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিয়েছেন আফ্রিকার অভ্যন্তর অভিমুখে। আমাদি কনকিউবাইন উপন্যাসে আফ্রিকার মিথ, ইতিহাস ও আচার অনুসন্ধান করে পশ্চিমা প্রপঞ্চের চ্যালেন্জ মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী বয়ান নির্মাণ করেছেন। এ-বাস্তবতা বিবেচনায় কনকিউবাইন উপন্যাসটির পুনঃপাঠ প্রয়োজন।



গ্রন্থসূত্র
Adeoti, Gbemisola A. (Ed). African Literature and the Future. Dakar: CODESRIA, 2015.Print.
EZe, Clielozona. Postcolonial Imagination and Moral Representations in African Literature and Culture. United Kingdom: Lexington Books, 2011. Print.

F. Fiona Moolla. ‘Plotting Marriage and love in Elechi Amadi’s The councubine: Extended Realism in the African Novel.’ The University of the Western Cape, 2019.


1 টি মন্তব্য:

  1. This article of Dear Elham Hossain connotes the relationship between literature and independence of African nations. It is universally true that literature paves the way to not only geographical freedom but also human freedom from racial,gender and other constraints. Dr. Elham deeply explores the fundamental facts of nation and literature. Thanks.

    উত্তর দিনমুছুন