বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

দি নিউ ইয়র্ককার পত্রিকার কয়েকটি বেস্ট সেলার বই পরিচিতি

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
ওয়েদ্যরঃ 
জেনি অফইল 
(নফ) - ওয়েদ্যর গল্পটির বক্তা লিজি নামের একটি চরিত্র। প্রখ্যাত এক অধ্যাপকের ই-মেইলগুলো পড়ে তার জবাব দেওয়ার কাজে লিজি নিযুক্ত হয়েছেন। পরিবেশ সংকটের বিপদ-ঘন্টার আসন্নতা নিয়ে অধ্যাপক বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে সচেতন করতে চাইছেন মানুষকে। যাঁদের কাছ থেকে ই-মেইল আসে, তাঁরা কেউ পরিবেশবিদ, কেউ বা ধর্ম-প্রচারক। কিন্তু লিজি দেখে সবার মধ্যেই কেমন হতাশা আর পাগলাটে ভাব। বাম্পন্থীরা উদ্বিগ্ন আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে, আবার দক্ষিণপন্থীরা মগ্ন পাশ্চাত্য-সভ্যতার পতন নিয়ে। এতসব পাঁকে লিজি নিজেই যেন ডুবে যেতে থাকে। এক-একজনের বক্তব্য বা অংশ-বিশেষকে লিজি পৃথকভাবে শ্রেণীবিন্যাস করেন। যারা হলেন বিপর্যয়কালীন-মনোবিদ, ভবিষ্যৎ-বক্তা, পরিবেশ-বিজ্ঞানী, উদ্বর্তন উপদেষ্টা, যুদ্ধ-সাংবাদিক, হিপি। লেখিকা অফইলের তীব্র ব্যঙ্গ-ধর্মী গদ্য দ্রুত এগিয়ে চলে, আর উপন্যাসের মূল প্রশ্ন উচ্চারিত হয়, কীভাবে আমরা যাত্রাপথকে নিরাপত্তা দেব এবং কাকে নিয়ে এগোব নিজেদের সাথে? 
এপেইরোগনঃ 
কলাম ম্যাকক্যান‍ 
(র‍্যান্ডম হাউজ) - একটি বহুমুখী উপন্যাস। এপেইরোগন শীর্ষকের অর্থ, এমন এক আকৃতি যার অগুনতি দিক, যা আমাদের শোনায় প্যালেস্তেয়াইন ও ইজরায়েলের যুদ্ধের অন্তরালে ঘটে যাওয়া এক অসম্ভাব্য বন্ধুত্বের গল্প। প্যালেস্তেনীয় বাসাম আরমেন সাজাপ্রাপ্ত গ্রেনেড ছোঁড়ার দায়ে, আর রামি এলহানান একজন প্রাক্তন ইজরায়েলি-সেনা। সন্ত্রাস দু’জনের থেকেই কেড়ে নিয়েছে সন্তান, আর এই আঘাতই তাদের মধ্যে নৈকট্য এনেছে। নিজেদের সন্তান হারানোর দুঃখের অনুভূতিকে তারা শান্তির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এই গল্প হাজারখানেক ফিকশন ও নন-ফিকশনের সংমিশ্রণ। প্যালেস্তাইন অধিগ্রহণের ইতিহাস, মানুষ ও অস্ত্রের ভূমিকা ম্যাককানের গল্পে স্থান পেয়েছে। আছে রামি আর বাসামের সাথে আলাপচারিতা। গল্পের উচ্চাশী গঠনে রামি আর বাসামের গল্পে যে সূক্ষ্ণ তারতম্য, তা অনুচ্চারিত থেকে যায়, তবু ম্যাকনানের লেখনির উদার ধারাবাহিকতায় দুটি চরিত্রের আবেগপূর্ণ বার্তার অনুরণন ফুটে ওঠে। 
সামথিং দ্যাট মে শক অ্যান্ড ডিসক্রেডিট ইউঃ 
ড্যানিয়েল ম্যালোরি ওর্টবার্গ (আত্রিয়া) – 
কিছু নিবন্ধ আর ছোট্ট ছোট্ট কৌতুকীর মধ্যে দিয়ে লেখক তাঁর লিঙ্গ-পরিবর্তনের কাহিনিকে চিত্রিত করেছেন। সঙ্গে রয়েছে কিছু উপরি সংলাপ। সেসব সংলাপে অংশ নিয়েছেন উইলিয়াম শ্যাটনার, ওভিদ, দ্য গোল্ডেন গার্লস, আর জন বুনিয়ান। লিঙ্গ বদলানোর সন্ধিক্ষণটিকে খুব সরল বাচনে বিধৃত করেননি লেখক, বরং রীতিমত খড়গহস্তে নেমে পড়েছেন নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায়। সমালোচনার সূক্ষ্ম আক্রমণগুলোকে প্রতিরোধ করেছেন নিপুণ হাতে। ব্যক্তিগত গদ্য থেকে বড় বড় লেখকের অনুকরণ, সব কিছুই তাঁর তরফে যুক্তির জোর বাড়াতে ভিড় করেছে। রসিকতা করেছেন নিজেকে নিয়ে, বলেছেন, ‘এক প্রায়-পুরুষের রসকষহীন স্মৃতিকথা যা আমি কোনোদিনই লিখতে চাইনি।‘ ওর্টবার্গ তাঁর বইটিতে খ্রিস্টীয় বিশ্বাস-সংস্কার আর সাংস্কৃতিক উদারতাকেও নিয়েছেন এক হাত। বইটি ঠিক যেন এক সিলেবাস ---বড় এক লেখকের মনের ভেতর ঢুকে পড়ার ধাপগুলোর হদিশ পাওয়া যায় যে বইয়ে। 
ইন দ্য ড্রিম হাউজঃ 
কারমেন মারিয়া মেচাদো 
(গ্রে-উলফ) – শিরোনামের বাড়িটাতে লেখিকা আর তাঁর বান্ধবী বাস করছিলেন এক আশীর্বাদের মতই, যতদিন না বান্ধবীটি ধীরে ধীরে হিসেবি, নিষ্ঠুর, আর হিংস্র মানুষে পরিণত হলেন। তারপর থেকে বাড়িটাকে ‘স্মৃতির কারাগার’ মনে হতে লাগল লেখিকার। সামগ্রিক এক উপমায় এসে দাঁড়ালো যেন বাড়িটা, যা আত্মকথা, ইতিহাস, আর লোককাহিনির অসংখ্য ভাঙা টুকরো দিয়ে সাজানো। তাঁদের দুজনের মত অনেকের খোঁজ পড়েছে এই বইয়ে। পেয়েছেনও কিছু মানুষকে। তাঁরাও গৃহগত অত্যাচারের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত লেখিকার ‘নৈঃশব্দ্যের মহাফেজখানা’-র আলোকে আলোকিত। কোনও স্মৃতিচারী লেখকের কাজ কি, ---লেখিকা বলেন, ‘স্মৃতি, কথন, বাস্তব, আর ধারণার মাটি দিয়ে নিটোল একটা খোপা তৈরি করা, খোপাটাকে নিখুঁত বলের আকার দেওয়া, পরক্ষণেই সেটিকে ভেঙে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া।‘ 
৯ মার্চ’২০২০ তারিখের ‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকার মুদ্রিত-সংস্করণে প্রকাশিত। 

এ গেম অফ বার্ডস অ্যান্ড উলভসঃ 
সাইমন পারকিন 
(লিটল, ব্রাউন) – ১৯৪১ সালে, ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল জার্মানির ইউ-বোট যুদ্ধজাহাজ। বিশেষ এই জাহাজগুলোর ‘উলফ-প্যাক’ নামের সমরনীতি রীতিমত হয়রানি করিয়ে ছেড়েছিল অক্ষশক্তির সেনাপ্রধানদের। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে গল্প বলেছেন লেখক পারকিন, কিভাবে রয়াল নেভি সার্ভিসের নারীবাহিনীর রেনস নামে এক সদস্যা জার্মানদের জল-আক্রমণ প্রতিরোধের আশ্চর্য এক উপায় উদ্ভাবন করে, এবং সেনাদেরকে রীতিমত প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে, যা কিছুদিন পরেই বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পুরো ব্যাপারটাই পরিসংখ্যানতত্ত্ব আর গণিতের চুলচেরা হিসেবের ওপর ভিত্তি করা, যে কারণে তাদের কন্ট্রোল-রুমের মেঝে অচিরেই বিরাট গেম-বোর্ডে পরিণত হয়। মেঝেতে চলতে থাকে একের পর এক সম্ভাব্য সবরকম আক্রমণের ছক, সেইসঙ্গে প্রতিরোধ। প্রশিক্ষণের বিশদ বর্ণনা করেছেন পারকিন তাঁর কাহিনিতে। পোড়-খাওয়া নৌ-সেনারা প্রশিক্ষণ চলাকালে মুখ মটকে হাসছে একে ওপরের দিকে তাকিয়ে, হায় কি দিন এল, বাচ্চা একটা মেয়ের থেকে সমরশাস্ত্র শিখতে হচ্ছে! সেই সঙ্গে রয়েছে নৌযুদ্ধের চমৎকার ছবির মত বিবরণ। 

ডোমিনিয়নঃ 
টম হল্যান্ড 
(বেসিক বুকস) – খ্রিস্টধর্মের বিস্তারিত এবং জীবন্ত ইতিহাস নিয়ে লেখা এই বই পড়লে বোঝা যায়, ধর্ম কিভাবে আজও পাশ্চাত্য মুক্তিবাদী মূল্যবোধগুলোকে ভেতর থেকে সুরক্ষা দিয়ে চলেছে। লেখ হল্যান্ড-এর মতে, মানবজন্মের ‘স্বকীয়তা’র প্রতি আমাদের বিশ্বাস এবং দারিদ্র্য আর দুঃখকষ্টের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধার জন্য খ্রিস্টধর্মকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এমন কি নানান অসাম্প্রদায়িক চিন্তা, যেমন মার্ক্সবাদ থেকে সুনীতিবোধ, সাম্যবাদ কি ভ্রাতৃত্ববোধ, সব কিছুকেই তিনি অত্যন্ত সহমর্মিতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন খ্রিস্টীয় ধর্মের আলোকে। সিয়েনা’র সেন্ট ক্যাথরিন বাবা-মায়ের দেখে দেওয়া পাত্রটিকে বিবাহে অসম্মত ছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, জন্ম থেকেই তিনি খ্রিস্টের পদতলে সমর্পিত। ই নয়, পরবর্তীকালে তিনি ঘোষণা করেন, তাঁদের প্রেমের অভিজ্ঞান-রূপ আংটিটি আসলে খ্রিস্টের শিশুবেলার লিঙ্গাগ্রচ্ছেদের সময় কেটে নেওয়া ত্বক। ব্যাপারটার মধ্যে যে শুধুই প্রেমের শুদ্ধতা রয়েছে, তা নয়, যুক্ত হয়েছে নারী-স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত আবেদন, যা একটি কথাকেই আরও জোরালো করে তোলে, ‘শুধুই অনুমতি, বলপ্রয়োগ নয়’। যাকে বিবাহের সবচাইতে বড় ভিত্তি বলে মনে করছেন লেখক। 
ইন্টেরিওর চায়নাটাউনঃ 
চার্লস ইয়ু 
(প্যান্থেয়ন) – অভিবাসী এশিয়-সমাজের কিছু মানুষ টেলিভিশনের একঘেয়ে একটা শো’তে কিভাবে অভিনয় করার সুযোগ পেল, সেটাই উপন্যাসের বিষয়বস্তু। ‘গোল্ডেন প্যালেস’ নামে এক চাইনিজ রেস্টরেন্টের কর্মীরা ওই বাড়ির দোতলায় থাকত, আর দ্বিগুণ কাজ করে উপরি কামাত। কাহিনির নায়ক উইলস ওয়ু’র অভিনয়-জীবনও ওখান থেকে শুরু। প্রথম-প্রথম নেপথ্যের ‘প্রাচ্যের পুরুষ’, তারপর ‘বিশুদ্ধ এশিয় মানুষ’, তারপর একদিন ‘স্পেশাল গেস্ট স্টার’ ---এভাবেই তার উত্থান। সে আশা করত, একদিন সকলে তাকে ‘কুংফু-বিশেষজ্ঞ’ বলে চিনবে, তার স্বপ্ন সার্থক হবে। দ্বিতীয় পুরুষে লেখা এই উপন্যাস কখনো দীর্ঘ অনুচ্ছেদ আবার কখনো বা চিত্রনাট্যের আদলে লেখা। আমেরিকা-অভিবাসী এশিয়দের জীবনের গভীর উপলব্ধি, অর্থাৎ ‘চিরন্তন বিদেশি’ হয়ে বেঁচে থাকাটুকু বারবার পরীক্ষিত হয়েছে এই উপন্যাসে, এমন একদল সংখ্যালঘুর গল্প যাদেরকে কোনোভাবেই সাদাতে-কালোতে এঁকে ফেলা যায় না। 
স্টেটওয়ে’জ গার্ডেনঃ 
জ্যাসমোন ড্রাইন 
(র‍্যান্ডম হাউজ) – গল্পগুলো প্রেসিডেন্ট রেগানের সময়কার অর্থনীতিকে মনে করায়। সূত্রপাতে রয়েছে ট্রেসি, সপ্রতিভ এক বাচ্চা আর তার মা, যে নাকি ‘বিজ্ঞান-বইয়ের পাতার মতই আবেগপ্রবণ এক মানুষ’। শিকাগোর স্টেটওয়ে’জ গার্ডেন হাউজিং প্রজেক্টে তারা থাকত। চোদ্দতলার জানলা থেকে ছোট্ট ট্রেসি প্রায় গোটা শিকাগো শহরের অর্ধেকটাই দেখতে পেত। তাদের কাছাকাছির মধ্যে, থাকত এক মহিলা, পারিবারিক-বন্ধু, যে ‘জীবনের ঠাটবাঁট নিয়ে নিজেকে অন্ধকারে ছুঁড়ে দিয়েছে’। খুড়িমা, ছেলেমেয়ে, আর বিয়ে না হওয়া বোনকে নিয়ে তার সংসার। হাউজিং-এর বাড়িগুলো ইউটোপিয়ার মত। দীর্ঘসূত্রী ক্ষয় আর ধ্বংসে শেষ। চিবোতে থাকা অনেক ঝুটঝামেলা আর নিত্তনতুন উত্তরণ লেগেই রয়েছে বাড়িগুলোতে। উত্তরণের পথেই জন্ম নেয় উপমা, ‘হুইস্কির ভঙ্গুর স্বাদ’। বালকের চিবুক দেখে মনে হয় ‘অর্কিডের নিখুঁত একটা পাপড়ি’, ‘গভীর রাতের গাড়ির হর্ন শুনে মনে হয়, ...খুব নরম কোনও সুর বাজছে’।






সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
গল্পকার। অনুবাদক। আবৃত্তিকার।
কোলকাতায় থাকেন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন