বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের 'সেরা দশ গল্প' এর পাঠ প্রতিক্রিয়া

নিবেদিতা আইচ 

এখন ভীষণ এক ক্রান্তিকাল জুড়ে আছে চারিদিকে। বিষাদের চাদর গায়ে জড়িয়ে আমরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হচ্ছি একে অপরের কাছ থেকে। শঙ্কাগুলো অহেতুক নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে। তবু জীবনের নিয়মে সেসব এড়াতে হয়, ভুলে থাকতে হয় নানাভাবে। মাঝেমাঝে অন্তরীণ হতে হয় জাগতিক শোক জরা তাপ থেকেও।

ভুলে থাকবার অল্প একটু প্রয়াসে সদ্য পাঠ করলাম নাসরীন জাহানের 'সেরা দশ গল্প' সংকলনটি। বইটি পড়ে আচ্ছন্ন থেকেছি দীর্ঘ সময়। প্রথম গল্প 'এলেনপোর বিড়াল' এর মেয়েটিও বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছে। মৃত্যুর পর সে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছে ঘুমন্ত মানুষের মতোন। ঘুমটাই যে তার সম্বল। তবু বৈরী রাতগুলোতে তার ঘুম ভেঙে যায় আর ঘুম ভাঙলেই মিথ্যে হয়ে যায় বলে দুঃস্বপ্ন দেখতে মেয়েটি বেশি ভালোবাসে। কোনো কোনো রাতে এ্যালেনপো এসে তার শূন্যস্থানে বসে থাকে। যদি হৃদয়ের এতটুকু উত্তাপ দিয়ে বিড়ালটিকে বাঁচাতে পারে সেই সম্ভাবনায় আঁধার দেয়ালে আঁচড় কাটতে কাটতে গেঁথে রাখা রক্তাক্ত শরীরটাকে খুঁজে বেড়ায় সে। সেইসব বৈরী রাত্রিতেও কালো বিড়ালটি তার মগজে রক্তাক্ত শরীর বিছিয়ে শুয়ে থাকে। আর এক অসংজ্ঞায়িত অসুখে ছটফট করে মেয়েটি। অদ্ভুত বিষণ্ণ এই গল্পটি বহুদিন মনে রাখবার মতোন। 

'আমাকে আসলে কেমন দেখায় ' গল্পটি অভিনব সব স্বগোতোক্তি নিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। ' আমার কিচ্ছু হবে না। স্রেফ মরা কাক হয়ে ঝুলব।' নিজেকে নিয়ে কথকের যে হীনমন্যতা তারই বহিঃপ্রকাশ এটি। ভেতরে ভেতরে আর বাইরের পৃথিবীর সাথে তার যুদ্ধটা এমন যে প্রতিবারই তাকে হারতে হয়। 'কিন্তু এ আমার প্রকৃতি নয়। জন্মাবধি একটা মিনমিনে ভাব আমার মাথা নিচের দিকে নামিয়ে রাখে৷ চিন্তার মধ্যে আমি যত বেশি মারকুটে, প্রকাশ্যে ততটাই শিথিল।' এই যে নিজেকে নিয়ে নিজের সাথেই একটা দ্বন্দ্ব, ধোঁয়াশা তা পুরো গল্প জুড়েই রয়েছে৷ গল্পের নামকরণের মতো পাঠকও শেষ অব্দি না পড়ে বুঝতে পারে না আসলে তাকে কেমন দেখায়, আর কেনই বা অমন দেখায়। 

শারীরিক অক্ষমতা আর প্রিয়জনদের অবহেলা মানুষকে জীবনের প্রতি কতটা অনাসক্ত করে দিতে পারে তা সুস্থ কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়৷ সেরকম এক জীবন উপজীব্য হয়ে উঠেছে 'পুরুষ' গল্পটিতে। 'ও বুলু, কিচ্ছু হইবো না।' এই এক উপেক্ষার সুর বুলুর সমস্ত অন্তঃকরণকে ক্রমশ হতাশ আর বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তারপর বাঁধ ভেঙে গেলে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকা অপ্রতিরোধ্য সত্ত্বাটি জেগে ওঠে একসময় আর তীব্রভাবে জানান দিয়ে যায় সেও একজন মানুষ, একজন পুরুষ। 

এই বইটির 'আমার জন্ম' গল্পটি আমাকে খুব বিষণ্ণ করেছে। সন্তানের প্রতি বীতশ্রদ্ধ বাবার আচরণ খুব অমানবিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এত বিতৃষ্ণ, দায়িত্ব নিতে সদা অপারগ লোকটি আরেকবার নিরুদ্দেশ হবার আগেও স্ত্রীর গর্ভে ভ্রুণ রেখে যায়। আর সেই ভ্রুণ থেকে জন্ম হয় কথকের। কী দুঃখজাগানিয়া এক আখ্যান! গল্পের শেষ লাইনে এসে চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে। 

'পরপুরুষ' গল্পে কুসুম চরিত্রটিকে ভাল লেগেছে তার প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বের জন্য৷ হিল্লা বিয়ে করতে সে রাজি হতে চায়নি এবং তার 'জুডা' হবার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এক পর্যায়ে হিল্লা বিয়েতে রাজি হতে বাধ্য হলেও প্রাক্তন স্বামীর দেখানো কবিরা গুনাহর মিথ্যে ভয় তাকে শেষ অব্দি দমাতে পারেনি। কুসুম নতুন মানুষটিকেই স্বামী বলে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর তারই ভাষায় 'পরপুরুষ' হয়ে গেছে তার প্রাক্তন স্বামী হাফিজ। 

'প্রতিপক্ষ শকুনেরা' গল্পটির বর্ণনা পড়তে পড়তে শিউরে উঠেছি।মৃত গাভীটির চামড়া ছাড়াতে গিয়ে শকুনেরা যখন কুতুবুদ্দির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে তখন পুরো ব্যাপারটা যেন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল। শকুনেরা যখন তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে হামলে পড়ছিল ভীষণ আক্রোশে তখন কুতুবুদ্দির মনে পড়ে নির্জন এক মধ্যরাত্রির কথা। শকুনেরা যখন উপুর্যুপরি ঠোকর দিতে শুরু করে নিজেকে সেদিনের সেই জীবন্ত, উদোম প্রাণীটির মতোই মনে হতে থাকে তার। 

'অন্যরকম' গল্পটি অন্যরকমই। নিজেকে আলাদা ভাববার এক প্রবণতা তার। চিরকাল সুন্দরের অপেক্ষায় দিন কেটেছে। এই অপ্রাপ্তির আক্ষেপটাই ধোঁয়ার মতোন দীর্ঘশ্বাস হয়ে বুক চিরে বেরিয়ে আসে।নিজের অনতিক্রম্য অপূর্ণতাকে আড়াল করতে মেয়েকে অন্যরকম করে বড় করার চেষ্টা তার। সেই চেষ্টাটাও মাঝেমাঝে ব্যর্থ বলে মনে হয়। কিন্তু মেয়ে তার সুস্থ, সমান্তরাল পা দুটো নিয়ে, নিজেকে নিয়ে দিব্যি খুশি। আর তার প্রতি মায়ের ঈর্ষার কথাটিও বন্ধুকে সে জানাতে দ্বিধা বোধ করেনা। অদ্ভুত এক মনস্তত্ত্বের গল্প এটি যা একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো হারিয়ে গেলেও রেশ রেখে যায়। 

'হত্যাকারী' গল্পটি বিভ্রমের ধূম্রজাল বিস্তার করেছে পুরোটা সময়৷ লোকটির স্ত্রী জাদুমন্ত্রবলে বিশাল বাক্সে তার রাক্ষুসে খিদেকে বন্দি করেছিল। আর সেই বাক্সই তার মৃত্যু ডেকে এনেছে। কিন্তু সেসব কবেকার কথা? সকাল, দুপুর, যুগ আর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও লোকটি স্ত্রীর ঘাতককে খুঁজে ফেরে। প্রাচীন বটতলার নিচে বসে সে তার নিজের অস্তিত্ব আর শতবছরের সাক্ষী বৃদ্ধটির অন্তর্ধানের কারণ নিয়ে সংশয়ে নিমগ্ন হতে থাকে। সেই বৃদ্ধ কি তবে এই লোকটিরই প্রতিমূর্তি? তবে কে সেই হত্যাকারী? এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে পাঠককেও গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়াতে হয়। 

এই বইটিতে উপমার কারুকাজ অপূর্ব। উদাহরণস্বরূপ 'একটা দীর্ঘশ্বাসের ডালপালা' গল্পটিতে তিনি লিখেছেন- 'মেঘ তার কোল থেকে ছেড়ে দেয় শিশু চাঁদকে,হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে চাঁদ একসময় মধ্য আকাশে'। আরেকটি গল্পে বলেছেন- 'চৌদিকে গাঢ় ছায়া, দূরের নদীটির মাঝখানে ফুলে ওঠা ধূসর পলি পোয়াতি নারীর মতোন '। আবার কোথাও লিখেছেন- 'আসমানে গা ফুঁড়ে গুটি বসন্তের মতো তারা ফুটে বেরিয়েছে। ' রূপকের এমন ভিন্নরকম প্রয়োগ পড়তে খুব ভালো লেগেছে। সূচনার একটা কি দু'টো লাইন দিয়ে কিভাবে গল্পের পরিধিতে পাঠকের মনোযোগ পুরোপুরি 

আবদ্ধ করে নেয়া যায় বইটি পড়বার সময় তা খুব বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করেছি। মূলত রিয়ালিজম প্রাধান্য পেলেও এই বইটিতে 'এলেনপোর বিড়াল','একটি দীর্ঘশ্বাসের ডালপালা' কিংবা 'হত্যাকারী'র মতো ম্যাজিক রিয়ালিজম, সুররিয়ালিজমের গল্পও রয়েছে। 

প্রতিটি গল্পের অভিনবত্ব দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে আমাকে। একথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের সাহিত্যকর্ম নিবিড়ভাবে পাঠ করলে পাঠকমানস ভীষণ ঋদ্ধ হবে। এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন