বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

আনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জার্নাল : গারাজ-সেল


সারা পৃথিবীতে আজ এক বিলিয়ন মানুষ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক-ভাবে অভিবাসী, অভিপ্রয়াণকর, প্রচরণশীল। গবেষণা বলছে এই সংখ্যা দ্বিগুন হবে আগামী চল্লিশ বছরে। 

গবেষণার কথা, গবেষণার ভাষার বাইরে, আ্যাকাডেমিক কায়দা এড়িয়ে মানুষের সহজ গল্পের, সহজ গল্পের অতীতে জটিলতর বিশ্লেষণের,  দর্শনের সন্ধানে, আখ্যানের- এই নিয়ে শুরু হল- গারাজ সেল।  এই অতিমারী কাটিয়ে বিশ্বাস রাখি মানুষ বাঁচবেন। তার দুমুঠো খাদ্যের সংস্থান হবে।  মানুষের নিরাময় হবে। সুস্থ এক পৃথিবীর সন্ধানে, তবে গল্পপাঠের এই আয়োজন চলবে। পরের সংখ্যার গল্পপাঠে তবে আবার দেখা হবে। সকল মানুষের আরোগ্য হোক।



গারাজ-সেল 
বিচ্ছিন্ন মানুষ মাত্রেই শক্তিহীন। সব যুগে। সব রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। সহজেই তাদের ‘অবৈধ’ ঘোষণা দেওয়া যায়। জনপদ, দেশ, ঘর থেকে উৎপাটিত মানুষ - বিচ্ছিন্ন।  প্রজাতি মানুষ প্রথম গৃহছাড়া হয়ে প্রচরণশীল হয়েছিলো প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে। আফ্রিকার পথ থেকে বহির্বিশ্বে। 

জাতি সঙ্ঘের হিসেব বলছে সারা পৃথিবীতে এ মুহুর্তে প্রায় বিলিয়ন মানুষ প্রচরণশীল, উদ্বাস্তু, অনুপ্রবেশকারী, কেউ বাধ্য হয়েছেন—হয়েছেন কেউ বিতাড়িত। এরা সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার সাড়ে-তিন শতাংশ। 

যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, অনাহার, দেশ-ভাগ, দাসপ্রথা, আর্থ-সামাজিক পীড়ন, ধর্মীয় পীড়ন ও হিংসা, নারীর প্রতি সংগঠিত হিংসা ও গৃহ হিংসা, শিশুর প্রতি হিংসা, প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের প্রতি হিংসা, পাচার, যৌন-পাচার, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন  মানুষকে দেশহীন, পরিচয় বিলীন, উদ্বাস্তু বা অভিবাসী করেছে। আফ্রিকানদের দাস করে উৎপাটন করা থেকে, হলোকস্ট ও হলোকস্ট পরবর্তী ইহুদীদের দেশছাড়া-বাস্তুছাড়া হওয়ার ইতিহাস থেকে সাবেক ভারত দেশের খণ্ড-ভাগ ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বিপর্যয় পর্যন্ত এই গ্রহে মানুষ গৃহচ্যুত হচ্ছেন, দেশ-চ্যুত হচ্ছেন। কখনও লুকিয়ে অন্য রাষ্ট্রের নজর এড়িয়ে, কখনো সাহায্যপ্রার্থী হয়ে । আসলে বাধ্য হচ্ছেন। তাই  সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দেশ ছাড়ছেন। ছাড়ছেন- ঘর। জনপদ। চেনা জলবায়ু,  প্রতিবেশী গাছ। ফিকে ইতিহাস। 

জানতে পারছি - ইংরেজি হিসেবে  শুধু ২০১৯ সালেই  ৫,৩০০ জনেরও বেশী মাইগ্রান্ট মানুষ মারা গেছেন দেশ বদল করতে গিয়ে, যাত্রাপথে। 

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, উদ্বাস্ত, জনপদ-বিচ্ছিন্ন, উৎপাটিত, আভ্যন্তরীণ-উৎপাটিত, পরিচয়পত্রহীন, অভিপ্রয়াণকর, প্রচরণশীল মানুষদের নিয়ে মিডিয়া বেশ কিছু খাদ্যও পরিবেশন করে প্রচলিত প্রথায়। তাদের মধ্যে সরলীকৃত করলে একটি অনায়াস কোলাজ আপনি পেয়ে যাবেন, যাকে চিত্রায়িত করলে  দাঁড়ায় অনেকটা এরকম

মরুপ্রান্তর, কাঁটাগাছ পেরিয়ে শরণার্থী, চোরা-অনুপ্রবেশকারীরা হেঁটে চলেছেন।
অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন। রাতের অন্ধকারে কালো সমুদ্রে দিশাহীন কারা ভাসিয়েছে ডিঙ্গা। অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন। 
ড্রাগ-ভর্তি ট্রেনে চেপে বগলে বন্দুক বাগিয়ে অন্ধকারে চলেছে সদলে। অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন এবং অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন। 

আর অনুন্নত, অ- শ্বেত বর্নের দেশ থেকেই আসছেন।শাদা-সুপ্রীমেসিস্টদের যাবতীয় হেট-রেটরিক তাই এদের দিকেই ধাবিত। রক্ষণশীল রাজনীতিক ও তাদের মিডিয়ারা এরকমই প্রচার করে। এভাবেই হলিউডি অ্যাকশন সিনেমার মত এগুলিকে গিলিয়ে দেওয়া হয়। 

সারা পৃথিবীতে আনডকুমেন্টেড/ পরিচয়হীন/ কাগজহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ মিলিয়ন। এবং আমেরিকায় থাকেন তার ১২ মিলিয়ন। যা কিনা হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক এবং টিউনিশশিয়ার সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর সমান সংখ্যক। এই বারো মিলিয়নের ১.৪ মিলিয়ন এশিয়ান বংশোদ্ভূত। ৬০০, ০০০ জন ইউরোপিয়ান ও কানাডিয়ান দেশ-জাতি সূত্রের মানুষ । ৪০০, ০০০ জনের আফ্রিকা ও মধ্য প্রাচ্যে শিকড় ও বাকী ৫৫০, ০০০ জন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের থেকে এসেছেন । 

আমেরিকার ট্রাম্প বলছেন- মেহিকান-রা চুরি করে দখল করে নিচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রসদ, ভুখণ্ড, খাবার, থাকার জায়গা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এনেছেন হিন্দুত্ববাদী তাড়না সম্পৃক্ত এক নাগরিক-পঞ্জী বিল। ক্ষুব্ধ মানুষ বলছেন-- এ বিল সংখ্যালঘুকে নিজভূমে উদ্বাস্ত করে ছাড়বে। ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশ আগত কাগজ-হীন মানুষকে ভারতের জনপ্রিয় হিন্দু নেতা বলেছেন- এরা দেশের চোখে ছারপোকা সম। 

বিদ্রোহ করে উঠেছেন ভারতের বাসী। গরীব-অগরীব ভেদে। সারা ভারত জুড়ে সে আগুন জ্বলেছে। তাদের বিদ্রোহী লব্জ “ কাগজ আমরা দেখাবনা” স্লোগান হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে-- মানুষের মুখে মুখে, দেশ পেরিয়ে বলা যায় সর্ব-দেশেই। ব্রিটেনে বিশ্বের আইকনিক গায়ক-কে গেয়ে উঠতে শুনি ভারতের বিদ্রোহী ছাত্রনেতার লেখা সেই বিদ্রোহী বার্তা-- “সব কিছু মনে রাখা হবে।” 

মনে রাখব আমরা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে, মহাদেশে, ভুখা, কাগজহীন মানুষের পদচালনায়, লং মার্চে, কাঁটাতারে, ভিসা’র সাম্রাজ্যে, সাধারণ মানুষের গল্পে, গানে। আমরা মনে রেখে দেব আড়ালের আড়ালে থাকা দেশ ভেদে মানুষের বেঁচে থাকার মৌখিক ইতিহাস। সেই ইতিহাসই গারাজ-সেল। 

যেখানে কখনও সরণীতে সাজানো থাকবে, থালা-বাটি-শয়নের পসরা, যা ছিল কাল নিত্য প্রয়োজনের, ভালো বাসার, আদরে পাতা এক সংসারের, আজ তা বাড়তি, সস্তায় বিক্রয় হয়ে চলে যাবে অন্য কোন সংসারে। যেমন হয়-- আমাদের গারাজ সেলে, এই আমেরিকা দেশে। গারাজের দরোজা খুলে বিছিয়ে দেওয়া- সংসার-সীমান্ত, বাসন-পাতিল, বইপত্র, মাথার ফিতে, রোদের জন্য কেনা একটা ঝালর দোলানো ছাতা। একটা চা-পাত্র কেনা হয়েছিল, একটা মাদুর- পার্কে, বাগানে বিছিয়ে বসার। তা তুলে দিয়ে দেওয়া হয়েছে গারাজ সেলে। ছেড়ে যেতে হয় যাদের, কখনও কখনও তাদের সংসার গুটিয়ে ফেলার এই আয়োজন-- এই গারাজ সেল। যেতে হবে অন্য কোনখানে। রাতারাতি ছাড়তে হবে দেশ। কার দেশ, কোন দেশ -- প্রশ্ন তোলে মিনার্ভার পেঁচা। এক ফালি অ-কাব্যময়, গদ্যের দর্শন। ভূখণ্ডহীন, কাগজবিহীন, কর্মহীন, জাতিসত্তাবিলীন মানুষের বাঁচতে চাওয়ার ন্যারেটিভ্। জীবনের পারাপার। লংমার্চ আর তার ফুট-প্রিন্ট। এসবই গারাজ-সেল। হোক সে অভিবাসী বা অনুপ্রবেশকারী, নিজভুমে উদ্বাস্তু কি অ্যাসাইলাম প্রত্যাশী; আদি বাড়ি বরিশাল কি সুদূর সিরিয়া, সোমালিয়া কি সজনেখালি, পেরু অথবা গুয়াতেমালা, দ্রুত ছোট হয়ে আসা পৃথিবীতে এই ইণ্টারনেট ব্যপ্ত গ্লোবাল-গ্রামে, আপনি মানুন না মানুন - তিনি আমার--আপনার একজন এসেনশিয়াল প্রতিবেশী। আপনি গাড়ি-মালিক হোন বা গাড়ির সারাই মিস্ত্রী, সারাংশ এই যে-- কেনা-বেচার, ক্রেতা-বিক্রেতার এই গারাজ মেটাফরে আপনি যন্ত্রের কিছু অধিক। অযান্ত্রিক।


"ভূখণ্ডহীন, কাগজবিহীন, কর্মহীন, জাতিসত্তাবিলীন মানুষের বাঁচতে চাওয়ার ন্যারেটিভ্। জীবনের পারাপার। লংমার্চ আর তার ফুট-প্রিন্ট। এসবই গারাজ-সেল। হোক সে অভিবাসী বা অনুপ্রবেশকারী, নিজভুমে উদ্বাস্তু কি অ্যাসাইলাম প্রত্যাশী; আদি বাড়ি বরিশাল কি সুদূর সিরিয়া, সোমালিয়া কি সজনেখালি, পেরু অথবা গুয়াতেমালা, দ্রুত ছোট হয়ে আসা পৃথিবীতে এই ইণ্টারনেট ব্যপ্ত গ্লোবাল-গ্রামে, আপনি মানুন না মানুন - তিনি আমার--আপনার একজন এসেনশিয়াল প্রতিবেশী। আপনি গাড়ি-মালিক হোন বা গাড়ির সারাই মিস্ত্রী, সারাংশ এই যে-- কেনা-বেচার, ক্রেতা-বিক্রেতার এই গারাজ মেটাফরে আপনি যন্ত্রের কিছু অধিক। অযান্ত্রিক।" 


যন্ত্র এবং আপনার অপর। দ্বন্দ্বের  জড়বাদ, জড়বাদ ফুঁড়ে ওঠা সংসার-মাশরুম। তেমনই আপনার প্রতিবেশীটিও। কখনও সে কাগজহীন  ক্লীব, তাই নম্বরহীন গাড়ীর মতোই চুরি যায় তার শ্রম, তাই সে না যন্ত্র, না অপর। তাঁকে থাকতে হয় কাগজ অন্বেষণে। খাদ্য, শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক অধিকারের রাষ্ট্র-সম্মত ইশারার অনুদানের সন্ধানে। অধুনান্তিক, অনেকান্ত কালে সিগ্নিফায়ার, সিগ্নিফায়েড পরম্পরা মতে তামাদি হতে চললেও, আমাদের মস্তিষ্কে সে ভাবেই মানে'র জন্ম হয়। অতএব আমরা প্রতীক অন্বেষণে। যন্ত্র ও তৈল বিত্তের যতি-চিহ্নের সন্ধানে। ক্রেটা ও বিক্রেতা, পণ্য ও সেলের এপার ও ওপারের বিনির্মাণে।  

গবেষণা বলছে- এই শতক হবে অভিবাসী, অভিপ্রয়াণকর, প্রচরণশীলের শতক। 

গবেষণার কথা, গবেষণার ভাষার বাইরে, আ্যাকাডেমিক কায়দা এড়িয়ে মানুষের সহজ গল্পের, সহজ গল্পের অতীতে জটিলতর  বিশ্লেষণের, দর্শনের, আখ্যানের, এই নিয়ে শুরু হল- গারাজ সেল। 








গারাজ-সেল 

পর্ব-এক 

মিনার্ভার পেঁচা, খণ্ড স্পেক্টাকেল, ক্ষুধার ভাইরাস : শ্রমিক মালিক দ্বন্দ্ব সমাস ও ভুখা শ্রমিকের লংমার্চ  


                                                অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় 


সারা পৃথিবীতে কোথাও মানুষের আর সেভাবে মানুষ মারা হচ্ছে না এখন আর। খুন ও ধর্ষণ অবিশ্বাস্য রকম কম  আছে। মানুষ নামে একটা প্রজাতির অসুখ করেছে । সবাই একযোগে সার্স-কোভ২ মলিকিউল-টাকেই কেবল মারতে চাইছেন। 

সারা পৃথিবী জুড়ে প্রায় ১,২৫৪,৪৪৩ জন মানুষ কোভিড-১৯ শে আক্রান্ত। অণুজীবের সংক্রমণ-সন্ত্রস্ত হোমো-সেপিয়েন্স প্রজাতিরা ঘরবন্দী। জনশূন্য লোকালয়ে রাস্তায়, রাজপথে খেলার পার্কে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছেন হরিণ শিশুরা, দু সপ্তাহ আগের জনাকীর্ণ সৈকতে আজ নিশ্চিন্তে খেলে বেড়াচ্ছেন-- উধাও হয়ে যাওয়া ডলফিনের ঝাঁক। 

আপাত জনশূন্য এ গ্রহে'র নিরাপদ আস্তানায় বসে অধিকাংশ ঘরবন্দী পৃথিবীর মানুষ জানলা দিয়ে এক দৃশ্য দেখে ফেলেছেন -- এ গ্রহের কিছু মানুষ হঠাৎই এক জনশূন্য রাজপথে মিছিল করে পথ হাঁটছেন। লঙ মার্চে। ঘনিয়ে উঠছে স্পেকট্যাকল। যা কালেক্টিভ, যা সংহত- সমবেত দর্শনে। যা ব্যাপ্ত, টেলিভিশন সেটে। ইন্টেরনেটে। 

'মৃত্যু এবং সুযোগ-- মানে মৃত্যু এবং জীবন'। "সময়ের স্তব"--এ পড়ছিলাম উরসুলা লে-গ্যিন কে। বলছিলেন তিনি-- মৃত্যু এবং সুযোগ কী-ভাবে খেলা করে- মহাশূন্য ও গ্যালাক্সির মধ্যে। 

মৃত্যুর চেতনার মধ্যে স্পেকট্যাকল কখনও হয়ে ওঠে জীবন হারানোর একটা রিলে রেস। মন্থর সে দৃশ্য-গতি। 

পৃথিবীর এই কালান্তক সময়ে সমবেত দেখে যাওয়া এই লঙ মার্চের স্পেক্ট্যাকল অতএব আমাদের জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়ে থাকল। 

আমরা দক্ষিণ এশিয়ার কথা বলছি। 

দৃশ্যগুলি ভারত দেশের ও বাংলাদেশের। 

যেখানে সারা রাজপথে, নগরের রাস্তায়, হাইওয়ে জুড়ে কেবলই দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে। খুব দ্রুতই কিছু দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে। 

আমরা সাক্ষী থাকছি। মন্থর দিনাবলী, স্লো ক্যামেরা, এপিক্যাল প্লট, দার্শনিকের কথামালা এবং খণ্ড স্পেক্টাক্যাল-এর । 

খণ্ড স্পেক্টাক্যাল 
দৃশ্য- এক 

গত গ্রীষ্মে ভারতের নরেন্দ্র মোদী সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন, ভারত চাঁদে যাচ্ছে। 

ঠিক যেভাবে, ট্রাম্প বিশ্বাস করিয়েছিলেন-- আমেরিকা আবার গ্রেট হবে। গ্রেট হবে আবার। 

আজ এপ্রিল মাসের মাঝখানে ২০২০ তে আমেরিকা এক গ্রেট মৃত্যুপুরী। মারণান্তক ভাইরাসের মোকাবিলায় ব্যর্থ গ্রেট ধনকুবেরদের দেশ মুখ থুবড়ে পড়েছে। 

আর ভারতে মোদীর নির্দেশে থালা-বাসন বাজিয়ে লকডাউন শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মাথায় নাগরিকগণ নিশ্চিন্তে গৃহবন্দী হয়েছেন। রাস্তা, পথ-ঘাট শুন-শান। । মানুষ জানালায় বসে পাখির গান শুনছেন। পাহাড়ের পাতা ভেজানো দামী চা খাচ্ছেন। এমন সময় ভারত দেশের রাজপথে, হাইওয়েতে হাজার হাজার পিল-পিলে পিঁপড়ের মত, মানুষের মত মাটি ফুঁড়ে কিছু সারি সারি অবয়ব, এরা কারা? 


রাত হয় আমাদের, হয় দিন। 
দৃশ্য -দুই 

ঘরে রুটি নেই, সাথে জল নেই। ঘাসের বয়সী কচি শিশুরা ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। কাব্যিক না । সাই-ফাই না। ঘটমান স্পেক্টাক্যাল। কেউ কেউ মাঝে মাঝে ফুঁকে নিচ্ছেন বিড়ি। এতে নাকি খিদে কম পায়।বলছেন- সাতানব্বই বছরের কাজরী বাঈ। উনিও পথ হাঁটছেন। 



দৃশ্য তিন 


গাড়ী নেই, ঘোড়া নেই, পরিবহনের ব্যবস্থা নেই, সরকারের অনুদান নেই, এখনও নেই রিলিফের ডাল ভাত । 

সারা পৃথিবীর সংবাদপত্রে চক্ষু রাখলেই দেখা যাচ্ছে ভারতে দল বেঁধে পিঁপড়ের মত মানুষ হাঁটছে, মাথায় বোঝা, কোলে বাচ্চা। অপরিচ্ছন্ন পোশাক। 

মারণান্তক জীবাণুর থেকে বাঁচতে ঘরে দোর দিয়েছি আমরা। আর আমাদের ঘর-দরোজা, শহর, বাথরুম, পায়খানা, সেলফি তোলার জানালা বানিয়ে দিয়ে রাস্তায় নেমে গেছেন এরা। রাস্তায় স্রোতের মত বয়ে যাচ্ছেন। কাজ, খাদ্য, ঘর বিহীন ভারতভূমির রাজপথে, দেশ সমাজের উদ্বৃত্ত, বাড়তি এরা কারা? কারা এরা? ছবির মত। সিনেমার মত। টেলিভিশনের পর্দার মত এই চলমান স্পেক্ট্যাকল। 

কাজের থেকে উৎখাত হওয়া এই শ্রেণীরা মূলত ভারত দেশের মজুরদের সারি। এ তাদের-ই মিছিল। 

একদিন কাজের খোঁজে যারা গাঁ-গেরাম থেকে এসেছিলেন এই শহরে, ঝুপড়িতে, কল কারখানায়, বস্তীতে। 

আজ তারা রিভার্স মাইগ্রেশনে। শহরের কাজ হারিয়ে, আশ্রয় হারিয়ে, খাবার-সঞ্চয় ফুরিয়ে ফেলে ফের গ্রামের দিকে শরনার্থী। 

ওপরের এই চিত্রকর্মটি চোখে পড়ল আর মনে পড়ল এক দলিত কবির লেখা এই লাইন- 
'All the wealth has been created by Nature and working people.' 


দৃশ্য চার 


আবার রাত হয়, ফুটে ওঠে আমাদের দিন। আমরা ইণ্টারনেট খুলে বসি। দেখি মজুররা সেই হাঁটছেন। 

আমরা খবর পড়ছি ও জানতে পারছি-- এরা কাজ হারিয়েছেন। এদের মালিক কিম্বা ম্যানেজার এদের পরিত্যাগ করে গিয়াছেন। এই দুনিয়াভর লকডাউনের সময় রাস্তায় শুয়ে থাকার আস্তানাও তাই বাতিল।এদের কারোর কোথাও কোন গাঁও আছে, সেখানে আরও কিছু বুভুক্ষু মুখ আছে। বাচ্চা, বস্তা মাথায় মাইল মাইল হেঁটে পৌঁছতে হবে সেখানে। 

মজুররা তাই পথ হাঁটছেন। তারা জীবাণুর কথা বলছেন না। খিদে, পথ হাঁটা, আর বাড়িতে থাকা খালি পেটগুলোর কথা বলছেন। আর তা বলতে গিয়ে আমরা কৌতুক ভরা চোখে আরও একটি নতুন দৃশ্যের জন্ম হতে দেখছি। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি-- দিন রাত এক করে রাস্তা হাঁটতে থাকা এই অপরিচ্ছন্ন, রুগ্ন, পথশ্রান্ত মানুষগুলো কাফকার গল্পের মত কখন নিজেরাই পরিবর্তিত হয়ে ভাইরাস হয়ে গেছেন। রাজপথে সমবেত উবু করে বসিয়ে উকুনের মত স্প্রে করা হচ্ছে তাদের গায়ে ব্লিচ-মিশ্রিত জীবাণুনাশক। 

দৃশ্য পাঁচ 


কিছু শ্রমিক এক গন্তব্যে পৌঁছছেন। গায়ে জীবাণুর মত, গবাদীপশুর মত ব্লিচিং দিয়ে মজুরদের গা ধুইয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার সপক্ষে কিছু মানুষ গলা মেলাচ্ছেন। শুনলাম-- এতো বাচ্চা দেয় কেন ওরা-- এ প্রশ্নে বেস্ট ক্যাটিগরিতে আদারাইজড্ “ওদের” মরতে দেওয়াও জায়েজ আছে। ঘুমচোখে দেখছি-- আমার ফেইসবুকের কমেন্ট-বক্সে কে যেন বিনীত স্বরে লিখে গেছেন-- কদিন, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন, আসলে সরকার সঠিক কাজটিই করেছেন। 


দৃশ্য - ছয় 


কদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার পর...।মোট সাইতিরিশ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এদের চারজন অবশ্য লরিচাপা পড়েছেন। একজন পথশ্রম ও ক্ষুধায় সন্তান হারিয়েছেন। আপাতত বইছেন শিশুমানবের লাশ। কিন্তু লং মার্চে আছেন। দেশে পৌঁছে লাশটিকে দাহ করবেন। 

আর আমার তিন বন্ধু মারা গেছেন নিউইয়র্ক শহরে। সারসকোভিড-২ এর সংক্রমণে। ভাত-ডাল রান্না করে চামচ কেবলই মুখ অবধি না গিয়ে হাত থেকে টেবিলে পড়ে যাচ্ছে। ঘোর লেগে গেলে এরম হয়। ঘোর লাগা চোখেও এই বিনয়টাকে ভীষণই চেনা চেনা লাগছে। কালেক্টিভ মেমরির থেকে মনে পড়ে যাচ্ছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় পর্যন্ত ইওরোপ জুড়ে এই বিনয় আমাদের দৈনন্দিন দেখতে হয়েছে। 'ওরা' ও 'ওদের'কে মারার এ এক পুরাতন আখ্যান। 


দৃশ্য- সাত 

মজুরদের লং-মার্চ চলছে। 
ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতিকে ইয়োগা’র ভিডিও করিয়া পোস্টাইতে বলেছেন। 


দৃশ্য আট 


বিশ্বের পরিবর্তন হচ্ছে। নানা জীবজন্তু, প্রাণী নির্ভয়ে লোকালয়ে নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছেন। 

অনেকে দার্শনিক ভাবে প্রত্যক্ষ করে ফেলেছেন-- মানুষ ক্রমে উদার ও দরদী হয়ে পড়ছেন। বিশ্ব জুড়ে বাড়িয়ে দিচ্ছেন সহানুভূতির হাত। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সর্বাধিক বৃহৎ এ সংকটে এখনও পর্যন্ত মানুষ মানুষকে বাঁচাতে চাইছেন। 

শুধু অন্ত্যজ, শ্রমিক মালিকের লাভ খতিয়ানের সম্পর্ক ধ্রুবকের মত অক্ষুণ্ন রহিয়া গিয়াছে। 


দৃশ্য নয় 


বাংলাদেশে গারমেন্টস শ্রমিকরা হাঁটতে শুরু করেছেন। তবে এ অভিমুখ কর্মস্থলের রিভার্স নয়। কর্মস্থলের অভিমুখে। লকডাউন মধ্যবর্তী পরিবহনহীন বাংলাদেশে কারখানা খুলে উৎপাদন চালু রাখার প্রকল্পে আপাতত লাখো লাখো শ্রমিক রাস্তায়। 

অতএব সেই পেন্সিল। সেই শ্রমিক মালিক দ্বন্দ্ব সমাস। মালিক পক্ষ এই পংগপাল শ্রমিকদেরকে পালন করেন বলিয়াছেন। কিন্তু পিতার মত, মাতার মত নাকি গবাদীপশুর মত, এ প্রশ্নে মৌনই আশাকরি থেকেছেন। 


            শ্রমিক মালিক দ্বন্দ্ব সমাস: গরীবের আণ্ডা-বাচ্চা: দৃশ্য দশ 

গরিবী যখন, এতো বাচ্চাই বা দ্যায় কেন ওরা এ প্রশ্ন কেউ কেউ করে ফেলেছেন। কথা হল-- হায়ারার্কি প্রাসাদ থেকে ঝাড়া দিয়ে উঠলে কেক-রুটির তফাত গুলিয়ে যায়। আর এই দুনিয়াব্যপী অনুজীব সন্ত্রাসের দিনে পালকের প্রতিশ্রুতি আর খাদ্য-সন্ধান গুলিয়ে যাচ্ছে। এই মারীর দিনে সরকার, স্বাস্থ্য কর্মীরা সচেতন করছেন, বলছেন হাত ধুয়ে জীবাণু মুক্ত থাকতে। এর জন্য কেউ কেউ বিনা পয়সায় গরীবদের সাবানও দেবেন বলেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোমবাতি জ্বালানোর কথা ঘোষণা করেছেন। প্রফেট সুকুমার রায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সাবানের সুপ আর মোমবাতি খাওয়ার কথা বলেছিলেন। এতদ সত্বেও শ্রমিকরা রাস্তায় কেন এই প্রশ্নে অতএব তারা আন্ডা-বাচ্চার কথাটিও তুলে ফেলেছেন। অতএব কালেক্টিভ মেমরি। আবার হলকস্ট। অতএব মনে পড়ে যাবে-- নাৎসিরা ইহুদীদের ইঁদুর বলেছিল, রাওয়ান্ডা জিনোসাইডের সময় হুতুরা টুটুদের বলেছিল আরশোলার জাত। আমেরিকার স্লেভ-ওনার-রা আফ্রিকানদের বরাবর অব-মানুষ ভেবেছেন। ঠিক নাতসিদের মতই- Untermenschen — subhumans- অব-মানুষ। 

ডেভিড লিভিংস্টোন বলছেন-- এই যে অবমূল্যায়ন ও শ্রেণী বা বর্গ-করণ করা, তা আসলে খুব জরুরী। কারণ এর ফলেই দ্রুত হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় একটি লক্ষ্য-গোষ্ঠীর দিকে। 

একই কথা বলবেন, অধ্যাপক চমস্কিও। বলেছেন-- দোষারোপ চলবে। কারণ এতে নিজের শ্রেণী স্বাতন্ত্রতা বজায় রাখতে সুবিধে হয়। তফাত গড়ে তোলা যায়। আর দোষ চাপানোর একটা ক্ষেত্র ভালো মতো তৈরি রাখতে পারা যায়। আর সর্বোপরি নিজেদেরই লাভ হয়। লাভের ভাগ এতে করে নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, অন্য ছোটলোক শ্রেণী এসে খেয়ে যেতে পারেনা। নিজেরা বেশ সভ্য জাতি/ শ্রেণী হিসেবে নিজেদের লাভের ভাগ ধরে রাখতে পারবেন। না হলে তাদের সভ্য জীবনে লাভের ভাগ কম হয়ে যেতে পারে। 

যেমন ভাবেন নিও-লিবেরালরা; বলেন চমস্কি- "Any deviation from this moral obligation would shatter the foundations of “civilized life.” 

আসলে সারা পৃথিবীতে মানুষ যত ভুখা থাকবেন, ততই প্রচরণশীল হবেন। এই-ই মাইগ্রেশনের ধরন। আসলে 'নাগরিক খিদে 'একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, বন্যা হলেও তাই। মানুষ যখন ভাত পান না এবং বদলে মানচিত্রও চিবিয়ে খান না তখন ঠিক কী ঘটে এবং কারা তা ঘটানোর জন্য দায়ী থাকেন ? 

দায়ী থাকে মুনাফা-ভোগী মালিক আর কর্পোরেট পালনকারী সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র। ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, ইচ্ছাকৃত অবহেলা এসবই হাঙ্গার-ইনডেক্স জারী রাখে। 

মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে ভারতে লকডাউন করা হল। মাইগ্র্যান্ট শ্রমিকরা যথেষ্ঠ সময়ই পেলেন না, তার আগেই কাজ খোয়ালেন, আস্তানা খোয়ালেন ও পরিবহনহীন দেশে, ভুখা পেটে মাইল, মাইল হাঁটতে বাধ্য হলেন। একই চিত্র বাংলাদেশেও। আগাম সতর্কতা, পরিকল্পনা ছাড়াই লকডাউনে হঠাৎ চালু হয়ে গেল কারখানা। 

অথচ আগাম সতর্কতা, আপদকালীন খাদ্য ব্যাঙ্ক, রিস্ক ইন্সিওরেন্স, এমপ্লয়মেন্ট স্কীম, টি পি ডি এস (টার্গেটেড  পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম), দিন মজুরদের সরাসরি ভাতা, এসবই জানা সমাধান এবং তা করে ফেলাও কঠিন নয় বলে মনে করেন জাতি সঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা। চাইলেই দুর্ভিক্ষ বা যুদ্ধ, মহামারী বা মানুষের হঠাৎ কর্মহীনতার জন্য যে ক্ষুধার নির্মাণ হচ্ছে তা রুখে দেওয়া যায় বলে ভাবেন অর্থনীতিবিদ ও ক্ষুধা নির্ণয় বিশেষজ্ঞরা। শুধু চাই পরিকল্পিত ভাবে বিভিন্ন স্টোরেজে জমানো খাদ্যশষ্যের আপদকালীন বন্টন। খাদ্যশস্যের বণ্টনের সঙ্গে দিন মজুরদের হাতে তুলে দিতে হবে- নগদ অর্থ। দুর্ভিক্ষের ইতিহাস বলছে-- দেশে দেশে ধরিত্রীর ভাঁড়ারে খাদ্য মজুদ থাকে যথেষ্ঠই, শুধু ক্ষুধার্তের ঘরে তা পৌঁছে যায় না।

"মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে ভারতে লকডাউন করা হল। মাইগ্র্যান্ট শ্রমিকরা যথেষ্ঠ সময়ই পেলেন না, তার আগেই কাজ খোয়ালেন, আস্তানা খোয়ালেন ও পরিবহনহীন দেশে, ভুখা পেটে মাইল-মাইল হাঁটতে বাধ্য হলেন। একই চিত্র বাংলাদেশেও। আগাম সতর্কতা, পরিকল্পনা ছাড়াই লকডাউনে হঠাৎ চালু হয়ে গেল কারখানা। অথচ আগাম সতর্কতা, আপদকালীন খাদ্য ব্যাঙ্ক, রিস্ক ইন্সিওরেন্স, এমপ্লয়মেন্ট স্কীম, টি পি ডি এস (টার্গেটেড  পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম), দিন মজুরদের সরাসরি ভাতা, এসবই জানা সমাধান এবং তা করে ফেলাও কঠিন নয় বলে মনে করেন জাতি সঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা। চাইলেই দুর্ভিক্ষ বা যুদ্ধ, মহামারী বা মানুষের হঠাৎ কর্মহীনতার জন্য যে ক্ষুধার নির্মাণ হচ্ছে তা রুখে দেওয়া যায় বলে ভাবেন অর্থনীতিবিদ ও ক্ষুধা নির্ণয় বিশেষজ্ঞরা। শুধু চাই পরিকল্পিত ভাবে বিভিন্ন স্টোরেজে জমানো খাদ্যশষ্যের আপদকালীন বন্টন। খাদ্যশস্যের বণ্টনের সঙ্গে দিন-মজুরদের হাতে তুলে দিতে হবে- নগদ অর্থ। দুর্ভিক্ষের ইতিহাস বলছে-- দেশে দেশে ধরিত্রীর ভাঁড়ারে খাদ্য মজুদ থাকে যথেষ্ঠই, শুধু ক্ষুধার্তের ঘরে তা পৌঁছে যায় না।" 

ঘরে খাবার না থাকলে মানুষ রাস্তায় নামবে। নামবেই । কখনও তার অভিমুখ চেহারা নেবে রিভার্স মাইগ্রেশনের। কখনও তা হবে মিস-ইনফর্মেশনের, ব্যর্থ পরিকল্পনার ফলশ্রুতি। যেমন ঢাকায়। শত শত মানুষ জীবনের নিরাপত্তা ভেঙ্গে কারখানার কাজ বজায় রাখতে পথে নামলেন। আসলে জীবন এর নিরাপত্তা ভাঙলেন জীবনের নিরাপত্তা বজায় রাখতেই। এ এক মজার পরিহাস। আসলে চাকরি বজায় রাখতে যাত্রা হোক বা গ্রাম থেকে শহর আসতে বা উলটোপথে বা খিদে মেটাতে, বা মাথা গোজা'র আস্তানা পেতে, কথা হল আসলে তিনি শেষ-মেশ ডিসপ্নেসড্ই হবেন। এই পথ হাঁটা তাই এক যুদ্ধ। টিকে থাকার জন্য। রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং মানবতার হুঁশ ফেরানোর জন্য। অর্থনীতিক কৌশিক বসু’র ভাষায়- জীবনের বিরুদ্ধে জীবনের যুদ্ধ। 

অমর্ত্য সেনও বলবেন তাই-- সরকারি ব্যবস্থা, যা মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, তারাই দায়ী থাকবেন। 

“governance systems that are held to account by the people they represent—through a free press, democratic participation, and transparent leadership—are much less likely to allow hunger to develop on their watch, lest they find themselves removed from power by their constituents (Sen 2001).” 

অতএব তর্ক, তত্ত্ব জারী থাকবে। 

অতএব মানুষ হাঁটবেন। তা সে খিদেয় হোক, বা জলবায়ু বা যুদ্ধ বা হিংসার কারনে। আসলে তা শ্রমিক বনাম মালিক রাজনীতিরই বিষয়। আমরা সুবিধাভেগীরা নিজ নিজ বারান্দা ও জানলা থেকে সে পদচারণা দেখব, তা ঠিক না, আসলে দেখতে বাধ্য থাকব কেননা আমরা সবাই সে মুনাফা'র রাজনীতি নির্মাণের অংশীদার। 

কেন বিদ্রোহ করেন নি এরা। কেন ফুঁসে উঠছেন না রাগে? সম্প্রতি জঁ দ্রেজ এককথায় চমৎকার উত্তর দিয়েছেন এর- 

"When people are hungry and feeble, they are not well placed to revolt " 

হাজার বছর ধরে, দেশে দেশে ভুখা মানুষ পথ হাঁটবেন তাই। সময়ের ব্যবধানে তারা কখনও ভারত ভুমির বদলি শ্রমিক, কখনও বাংলাদেশের সস্তা গারমেন্টস শ্রমিক। 


মৃত্যু এবং সুযোগ-- মানে মৃত্যু এবং জীবন। বলেছেন উরসুলা। শুরুতেই স্মরণ করেছি আমরা।

ধনতন্ত্রের এই রূপটি নিয়ে সচেতন না হলে আজ ভারত, কাল বাংলাদেশ-- কেবলই এই দৃশ্যের জন্ম হইবে। হইতেই থাকিবে। আমরা বিনাপয়সায় এক অভূতপূর্ব স্পেকট্যাকল দেখিতে থাকিব। যেমন বলপূর্বক এই মাইগ্রেশন, এই উৎখাত, তেমনই বলপূর্বক এই দৃশ্য দেখিতে বাধ্য থাকা। 

ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তেই তাই ছড়িয়ে পড়েছেন তারাও। অন্দরের থেকে বাহিরে। বৃহৎ থেকে প্রত্যন্তের দিকে। মাইগ্রেশনের পথের উলটো-পিঠে, উলটো পথে । একেই আমরা গবেষণাপত্রে রিভার্স-মাইগ্রেশন বলব। আর, সামগ্রিক ভাবে এই মানুষদের পোষাকী ভালোনাম দেব-- ইণ্টারনালি ডিসপ্লেসড্ পিপল। 

যে ভাইরাস মারক, যে জীবন নিয়ে নেয়, সারা পৃথিবীকে স্তব্ধ, চলচ্ছক্তিহীন করে রেখে দেয়, সেই ভাইরাসকে তুচ্ছ করে দিতে পারে এমন পাল্টা ভাইরাস এর খোঁজ চলছে দেশ-দুনিয়ার ল্যাবরেটরি জুড়ে। 

আর ভারতে, বাংলাদেশে এই সব মজুরেরা সকলে মিলিয়া প্রমাণ করিয়াছেন কোভিড ১৯ নহে, সয়াইন- ফ্লু নহে, কর্কট রোগও নহে-- সকল জীবাণু আর অসুখ অপেক্ষা ক্ষুধাই অতিশয় মারক ভাইরাস। 

রেশন- হীন, পানীয়-হীন, শয়ন-শয্যা-হীন রাজপথে সেই ক্ষুধাই একমাত্র লং মার্চ । মৃত্যু ভয়-ও তার কাছে তুচ্ছ। 

মনে রাখব আমরা-- প্রতি বছর নয় মিলিওন সংখ্যক মানুষ এই ক্ষুধা ভাইরাসেই মারা যান। তারা স্থায়ী বা অস্থায়ী, কারখানার শ্রমিক বা মাটি কাটার মজুর, অঙ্ক একই। 

                                অতএব জেগে থাকে মিনার্ভার পেঁচা 

অতএব রাজপথে রাতভর জেগে থাকে কে? ইঁদুর, আরশোলা আর মজুরেরা। স্থায়ী বা অস্থায়ী। হোক তিনি কারখানার মজুর বা মাটি কোপানোর।এমনি একজন-- কলকাতার সেই মাটি কোপানো মানুষটি-- যিনি ঈদানিং বাঙালির সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের অজান্তেই কাল্ট হয়ে উঠেছেন- অজস্র খিল্লীর লক্ষ্য এক চূড়ামণি হয়ে গেছেন-- সেই সরল প্রশ্নটি করে-- আমরা চা খাবোনা, চা খাবোনা আমরা? 

করোনার লকডাউনের দিনে আরামে গৃহকোণে থাকার সুযোগ ছিলনা তার, ঘরবাড়ি ফেলে মাটি কোঁপাতে আসা সেই অস্থায়ী মজুরটির। ছিলনা-- গৃহকোণ, হেঁসেল, রান্নাঘর, চুলা ও হাঁড়ি পাতিল। চা করে দেওয়ার অন্য কেউ। চা খেতে এসেছিলেন পাড়ার দোকানে। আরো অনেকের জটলার একজন হয়ে। কারণ-- ফেসবুকের ফীডে “স্টে দ্য ফাকিং হোম’ পড়ার ও জানার সুযোগ হয়নি তার। ভাইরাস সচেতনতার তাকে স্পর্শ করেনি দেখে এক সচেতন নাগরিক তাদের সতর্ক করতে খানিক পুলিশি করেন, ভালোই করেন, কিন্তু এ পুলিশির হেতু তাকে স্পর্শ করেছে বলে বোধ হয়না। 

যেমন-- এই মানুষগুলিরও।সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ির লেখায় পড়লাম-- পুলিশ রিক্সা ভেঙে দেওয়ায়-- ঘরহারা বস্তির কাগজহীন শ্রমিকের হাল। রিক্সা না চললে সে খাবে কী, রাস্তায় না শুলে সে শোবে কোথায়? তাই মৃত্যু ভয় তাকে স্পর্শ করেছে বলে বোধ হয়না। 

এই বোধহীনতার অংশীদার আমিও। কেমন করে গরীব না খেয়ে, মৃত্যু কে ভয় না করে, মাইগ্রেট করতে বাধ্য হয়, পরিবারের টানে পথ হাঁটে, কে কাকে দুটি খেতে দেবে, কার নুন ফুরিয়েছে, কার অন্ধ মা বসে আছে, আধা-বস্তা চালে তার মাসাধিক কেটেছে, অপার অন্ধ জননীটি বসে আছেন-- ছেলে তার মাটি কেটে চাল নিয়ে আসছে। সে তো পথ হাঁটবেই। তাকে তো ভুখা-পেট, নাঙ্গা-পা পথ হাঁটতেই হবে। এই রাজপথে রাতে শুয়ে থেকে আবার সকালে পথ চলতে হবে । পথের ক্লন্তিতে মৃত সন্তানের দেহ দাহ করতে তাকে গ্রামের শ্মশানটি পর্যন্ত হাঁটতেই হবে। 

শেষ করার আগে একটা গল্প বলি। যেমন ছিল সেই সংলাপ। বিখ্যাত এক অর্থনীতিবিদ পরীক্ষা চালাচ্ছেন-- বিশ্ব-দারিদ্র নিয়ে। দিল্লীর বস্তি অঞ্চলে। এক দরিদ্র নারী, যিনি একক মা, তাকে সামান্য ঋণ দিয়ে ব্যবসার কাজে লাগাতে বলেছেন গবেষক। কিছু মাস বাদে ফিরে আসবেন, ডেটা সংগ্রহ করতে-- ঋণ এর সাফল্য প্রমাণে। ফিরে এলেন ও। দেখলেন-- কিছুই লগ্নী করেন নি ওই নারী তার ব্যবসায়। টাকা জলে গেছে। হতাশ, বিরক্ত অর্থনীতিবিদ। ফিরে যাচ্ছেন-- এমন সময় ওই নারী বললেন ‘ কিন্তু টাকাটা আমি কাজে লাগিয়েছি।’ ঘুরে দাঁড়ালেন অর্থনীতিক, নারীটি বললেন ঋণের টাকায় তিনি একটি টেলিভিশন খরিদ করেছেন। হতভম্ব ও ক্রুদ্ধ গবেষক কিছু বোঝার আগে তিনি আরও বলে উঠলেন-- টিভিটি কেনায় ব্যবসায় সত্যিই উন্নতি হয়েছে ওর। বাচ্চা গুলো আগে রাস্তায় খেলতো, গাড়ী চাপা পড়ার ভয় থাকত। ব্যবসায় মন দিতে ব্যাঘাত হত। এখন বাচ্চারা টিভি দেখে। ব্যবসায় মন দিতে পারেন তিনি। 

গবেষণায় লিখলেন তিনি-- “গরিবী কী বস্তু, তা আমি সত্যিই বুঝিনি।” 

বলেছেন-- অভিজিত বিনায়ক, সদ্য নোবেল পাওয়া অর্থনীতিবিদ, তার প্রখ্যাত গ্রন্থ-- ‘গরীব অর্থনীতি’তে।

"শেষ করার আগে একটা গল্প বলি। যেমন ছিল সেই সংলাপ। বিখ্যাত এক অর্থনীতিবিদ পরীক্ষা চালাচ্ছেন-- বিশ্ব-দারিদ্র নিয়ে। দিল্লীর বস্তি অঞ্চলে। এক দরিদ্র নারী, যিনি একক মা, তাকে সামান্য ঋণ দিয়ে ব্যবসার কাজে লাগাতে বলেছেন গবেষক। কিছু মাস বাদে ফিরে আসবেন, ডেটা সংগ্রহ করতে-- ঋণ এর সাফল্য প্রমাণে। ফিরে এলেন ও। দেখলেন-- কিছুই লগ্নী করেন নি ওই নারী তার ব্যবসায়। টাকা জলে গেছে। হতাশ, বিরক্ত অর্থনীতিবিদ। ফিরে যাচ্ছেন-- এমন সময় ওই নারী বললেন ‘ কিন্তু টাকাটা আমি কাজে লাগিয়েছি।’ ঘুরে দাঁড়ালেন অর্থনীতিক, নারীটি বললেন ঋণের টাকায় তিনি একটি টেলিভিশন খরিদ করেছেন। হতভম্ব ও ক্রুদ্ধ গবেষক কিছু বোঝার আগে তিনি আরও বলে উঠলেন-- টিভিটি কেনায় ব্যবসায় সত্যিই উন্নতি হয়েছে ওর। বাচ্চা গুলো আগে রাস্তায় খেলতো, গাড়ী চাপা পড়ার ভয় থাকত। ব্যবসায় মন দিতে ব্যাঘাত হত। এখন বাচ্চারা টিভি দেখে। ব্যবসায় মন দিতে পারেন তিনি। 
গবেষণায় লিখলেন তিনি-- “গরিবী কী বস্তু, তা আমি সত্যিই বুঝিনি।” "


মনে পড়ল যে-- হেগেল যখন লিখেছিলেন-- সন্ধ্যার অবকাশে ওড়া মিনার্ভার পেঁচাটির কথা, তিনি আসলে বলেছিলেন-- দর্শন কাজ করে তখন, যখন শব্দেরা বাস্তবের জন্ম দিয়ে ফেলেছে। 

বিগ ব্যাং এর সময়, ম্যাটার- এর চেয়ে আ্যন্টি ম্যাটার এর যদি আরেকটু বেশী মন্থন হত-- যদি হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম এর রেশিও আরকটু খানেক পাল্টে যেত, ভাবুন তবে কী হতে পারত। 

আমিও ভাবছি। 

এইটুকুই। 


—————————- 
অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় 
মার্চ, ২০২০, আমেরিকা 






গারাজ-সেল 


পর্ব-দুই 

প্রবেশ, অনুপ্রবেশের আখ্যানঃ অবৈধতার নির্মাণ, মিথ ও সন্ত্রাসের রন্ধনশালা 

(আমেরিকায় অবৈধ-বসবাসকারী নারীর স্বাস্থ্য-বিপন্নতার ঝলক খতিয়ান) 

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় 

গাড়ি চালাইতেছিলাম শহরের ব্যস্ত রাস্তায়। আমার সঙ্গে ছিলেন আঞ্চলিক রিফিউজি সংস্থার এক সাফাই কর্মী-- মারিয়া। মারিয়ার ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই । তাই তাহাকে মাঝে মাঝেই অনেকেই রাইড দিয়া থাকেন। আমিও দিতেছিলাম। তার কিছু ঔষধ আমাকে কিনিয়া দিতে হইয়াছিল। যদিও কিনিতে বেগ পাইতে হয়নাই। ওভার দ্য কাউন্টারই সব মিলিল । তবুও। এই 'তবুও' লইয়াই এই আখ্যান-- যা লিখিতে বসিয়াছি। যাহা বলার চেষ্টা করিব। যাহা হউক-- এদিকে গোল বাঁধিল যখন পুলিশ-শেরিফের গাড়ি আমার আমার পিছনেই ট্র্যাফিকে আটকাইয়া থাকিল। মারিয়া প্রায় মরিয়া হইয়া উঠিল। আতঙ্কে দমবন্ধ অবস্থা। তাহাকে যতই শান্ত থাকিতে অনুরোধ করি সে ততোই অস্থির হইয়া ওঠে। অবশেষে বাতি সবুজ হইল এবং আমি তাকে লইয়া বড় রাস্তা ছাড়িয়া ছোট রাস্তাপথ নির্বাচন করিয়া নির্জনে তার বাড়ির দিকে আগাইতে থাকিলাম। 

এই হল আখ্যান--আমেরিকার অনুপ্রবেশকারীদের, 'অবৈধ' বসবাসকারীদের চব্বিশ ঘণ্টার আন-অফিসিয়াল ফাইল-চিত্র। প্রতিটি দিন দমবন্ধ করা। প্রতি মুহূর্তে ধরা পড়িবার, তাড়া খাইবার ত্রাসে শরীরে-মস্তিষ্কে আতঙ্কের টক্সিন প্রেরণ করা । প্রায় স্টিরিওটাইপে পরিণত এই আখ্যান, এই চিত্রাবলী। যেভাবে আমিও নাম গোপন করিবার কালে স্টিরিওটাইপ মতে বাছিয়া লইয়াছি এই নাম-- মারিয়া। এই মারিয়ার আসল নাম যা খুশী হইতে পারে। পারিত । মারি, মেরী, মারিনোভা, মেহেরুন্নিসা কিম্বা মীরা। যাহা খুশী। কিন্তু তা হইবেনা। যতদিন আমেরিকায় অনুপ্রবেশের আখ্যান লইয়া মিথ ও মিথ্যার, জাতি-ঘৃণার ও শাদা-সুপ্রিমেসির গরিষ্ঠতা বর্তমান, ততদিন তাহা হইবেনা। অন্তত মেইনস্ট্রিমে হইবে না । 

কেন হইবেনা তাহা আপাত বুঝিয়া লইবার জন্য আমাদের মত সুবিধাভোগীরা বেশীরভাগ সময়ই ঝলক-চিত্রে উৎসাহিত বোধ করি। মানে ট্রেইলার। মানে ব্লার্ব। কারণ উহা অনতিকায়। লিখিতে ও পড়িতে শ্রম কম। আসুন সেটি নির্মাণ করি। তথ্য সরলীকরণ করে সাজিয়ে ফেললে দাঁড়াচ্ছে মোটামুটি এই-- 

অর্থনৈতিক দিক থেকে আনডকুমেন্টেড বসবাসকারীরা অর্থনীতির মইয়ের সর্বনিম্ন স্তরে থাকা মানুষ। এরা শ্রমের বাজারে সবথেকে কম টাকায় কাজ করতে বাধ্য হন। নারীদের ক্ষেত্রে আরও কম। রাষ্ট্রীয় আইনে বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন মজুরীও এদের পাওনা হয়না। কারণ আইনের খাতায় এরা ইনভিসিবল। কিন্তু এদের অদৃশ্য শ্রম অর্থনীতিতে কাজে লাগে। এবং এরা বেশীরভাগই অর্ধাহারে, অল্পাহারে থাকতে বাধ্য হয়ে থাকেন । ফেডেরাল আইন অনুযায়ী ইন্সিওরেন্স কেনার সামর্থ্য ও আইনগত অধিকার দুটোর কোনটিই এদের নেই। নিম্ন রোজগারের মানুষের জন্য সরকার থেকে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, সেই বীমার আওতা থেকে এরা বাদ। বীমা ছাড়া আমেরিকায় চিকিৎসা অত্যাশ্চর্য রকমের ব্যয়বহুল। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ভিন্ন ঝালমুড়ি বা কন্ডোমের মত এখানে ঔষধ ক্রয় করা যায়না-- গা-ব্যথা, হাঁচি বা আরও কিছু ওভার দ্য কাউণ্টার ড্রাগ (যা কাউন্টারে বলিলেই পাওয়া যায়) ছাড়া। 

তো, এই হল মোটামুটি উঁকিগত একটি কাছাকাছি সামারি। 

এবার সংখ্যার হিসেবে খাড়াচ্ছে-- সারা পৃথিবীতে আণ্ডকুমেন্টেড মানুষের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ মিলিয়ন। এবং আমেরিকায় থাকেন তার ১২ মিলিয়ন। যা কিনা হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক এবং টিউনিশশিয়ার সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর সমান সংখ্যক। এই বারো মিলিয়নের ১.৪ মিলিয়ন এশিয়ান বংশোদ্ভূত। ৬০০, ০০০ জন ইউরোপিয়ান ও কানাডিয়ান দেশ-জাতি সূত্রের মানুষ । ৪০০, ০০০ জনের আফ্রিকা ও মধ্য প্রাচ্যে শিকড় ও বাকী ৫৫০, ০০০ জন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের থেকে এসেছেন । 

পরিচয়হীন মানুষ ছাড়াও এ মুহুর্তে এগারো শতাংশ পরিণত বয়স্ক আমেরিকান স্বাস্থ্যবীমার বাইরে। আর, গুরুত্বপূর্ণ হল-- এ মুহুর্তে আমেরিকা হচ্ছে পৃথিবীর ১১ নম্বর ধনীতম দেশ। 

বলা হয়, না বল্লেও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে আনডকুমেন্টেড মানুষেরা পৃথিবীর সবচে পীড়িত জনগোষ্ঠী। রিফিউজি বা অ্যাসাইলাম প্রার্থীদের মত এরা সোচ্চারে সরাসরি সুবিধা চাইতে পারেন না। কারণ পরিস্থিতির শিকার বা অন্যত্র অপরাধের ভিক্টিম হলেও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বসবাসকারী রাষ্ট্রের চোখে তারা অপরাধী। 

অ্যাফোর্ডেবেল কেয়ার অ্যাক্ট বা ACA আইন এদেশে স্বাস্থ্য পরিষেবার নজরদারী ও কলকাঠি চালায়। আণ্ডকুমেন্টেডদের স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়টি আমেরিকায় সর্বার্থেই খেজুরের আমসত্ব। অত্যন্ত নেতিবাচক ও একই সাথে ঘোড়েল বিষয়। 

ACA আইন সুপরিকল্পিতভাবেই 'বৈধ' আওতায় না থাকা বসবাসকারীদের থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য-ইন্সিওরেন্স পরিষেবার সব সুযোগ বন্ধ করে রেখেছে। ফেডেরাল সরকারের ভর্তুকিপ্রাপ্ত সস্তা ইন্সিওরেন্স, যেমন-- মেডিকেয়ার, মেডিচিপ, এবং শিশুদের জন্য চিপ (CHIP) এইসব সুলভে কম রোজগারের মানুষদের সুবিধার্থে চালু করা হয়েছে । কিন্তু এই সবই নাগরিক বা 'বৈধ' বসবাসকারীদের জন্য। 

তার মানে যারা আনঅথরাইজড রইলেন তাদের জন্য শুধু খোলা রইল মূলত এমার্জেন্সি। এছাড়া কিছু কমিউনিটি এবং মাইগ্রান্ট স্বাস্থ্য-কেন্দ্র বা EMTALA ( The Emergency Medical Treatment and Active Labor Act)। এর ফলে আণ্ডকুমেন্টেডরা আপাত ভাবে সামান্য কিছু সুবিধা পান-- যেমন সন্তানের জন্ম দেওয়া বা মারণ অসুখ বা দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি হতে পারা। কিন্তু অনুপ্রবেশ বিরোধী আইনের চোখে এই ন্যূনতম সুবিধা নেওয়ার ব্যাপারটিও মোটেই সহজ কিছু নয়। এ বিষয়ে পরে আসছি। 

আসলে কথা হচ্ছিল। কথা হচ্ছিল আমার ছাত্রী অ্যালেনার সাথে। তার বাবা-মা বসনিয়া থেকে এদেশে এসেছিলেন। অ্যালেনার ছোটবেলা কেটেছে আনডকুমেন্টেড-- রাষ্ট্র-পরিচয়হীন হয়ে । "আনডকুমেন্টেড থাকার অর্থ হল এটা নিজেকে বোঝাতে পারা যে-- স্বাস্থ্য পরিষেবা আমার জন্য একটি লাক্সারি। জরুরী নয়। টিকে থাকার জন্য, আমেরিকায় বাস করতে চাওয়াকে পরিস্থিতির চাপে বা স্ব-ইচ্ছায় বেছে নেয়ার জন্য এইটি আমার ট্যাক্স।" পড়ে আসা শীতে অল্প অল্প তুষার জমে থাকা সাইড-ওয়াকে সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে শীতল স্বরে বলে চলে অ্যালেনা। "স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবে না। মেনে নাও।" 

শিক্ষাক্ষেত্রে আমেরিকায় এই সমস্যাটি তত প্রকট নয়। কারণ, পলিটিক্যালি কারেক্ট হওয়া না, শিশু শ্রম ও অপরাধ বন্ধ করতে আমেরিকা দেশে বসবাসকারী সব শিশুকেই ইশকুলে পাঠানো বাধ্যাতামুলক করেছে বা করতে পেরেছে। যা অন্তত আপাত সুখের। অ্যালেনা এই সুবিধার জেরেই হাইস্কুল শেষ করতে পেরেছে । এখন সে এদেশের স্থায়ী বাসিন্দা। তার বাবা-মাও। 

আমি তার মুখের দিকে তাকাই। চলার ছন্দে তার কালো চুলগুলিতে পশমের টুপীর পমপমটি আনমনা খেলা করে। 

সন্ত্রাসের শেষে সব শিশুর হেসে উঠিবার মত। 
  

মিথ এর রন্ধনশালা


বলছিলাম মিথ ও মিথ্যার নির্মাণ নিয়ে কথা। কেন মারিয়ার গল্প শুরু করেছিলাম, বলছিলাম মারিয়ার গল্প কেন মারিনোভার বা মেহেরুন্নিসার হবেনা। স্টিরিওটাইপ মতে মিডিয়ায় সেটির কেমন আবর্ত চলে তার একটি ফ্ল্যাশ-ধারণা দেবো। একটি ন্যানো কোলাজ। 

অবৈধ ইমিগ্রান্টস নিয়ে মিডিয়া বেশ কিছু খাদ্য পরিবেশন করে তাদের মধ্যে সরলীকৃত করলে কোলাজটি দাঁড়ায় মোটামুটি এরকম- 

মরুপ্রান্তর, কাঁটাগাছ পেরিয়ে শরণার্থী। চোরা-অনুপ্রবেশকারীরা হেঁটে চলেছেন। অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন। 

রাতের অন্ধকারে কালো সমুদ্রে দিশাহীন ভাসিয়েছে ডিঙ্গা। অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন। 

ড্রাগ-ভর্তি ট্রেনে চেপে বগলে বন্দুক বাগিয়ে অন্ধকারে চলেছে সদলে। অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন 

এবং অনুপ্রবেশকারীরা আসছেন। 

এবং তারা কেবলই আমেরিকায় আসছেন। কেবলমাত্র আমেরিকাতেই আসছেন। 

আর 'পেত্নীগুলির সবসময় লম্বাপানা হাত হয়', এই রকম ভাবার মতই এর সবথেকে সহজ স্টিরিওটাইপটি হল-- এরা সবাই মেক্সিকান, নিদেন পক্ষে লাতিন আমেরিকান তো বটেই। 

বাস্তব তথ্য অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকা, এশিয়া, ক্যারিবিয়ান, এবং ওসিয়ানিয়া থেকে মানুষ এলেও তারা ঘরের পাশের ভূখণ্ড থেকে আসা মানুষের চেয়ে সংখ্যায় কম, অতএব শাদা-সুপ্রীমেসিস্টদের যাবতীয় হেট-রেটরিক এদের দিকেই ধাবিত। রক্ষণশীল রাজনীতিক ও তাদের মিডিয়ারা এরকমই প্রচার করে। 

এভাবেই হলিউডী অ্যাকশন সিনেমার মত এগুলিকে গিলিয়ে দেওয়া হয়। 

এই প্রোপাগ্যান্ডা গিলিয়েই শাদা-বাড়িতে গেঁড়ে বসেছেন ট্রাম্প ও সম্প্রদায়। সম্প্রতি তার আইনজীবী, বলা ভাল প্রাক্তন আইনজীবী মাইকেল কোহেনের কবুল আখ্যা আমেরিকা ভ্যাবলা হয়ে সকালবেলা শুনেছে। কোহেন তার ট্রায়ালে বললেন- - ট্রাম্প ভাবতেই পারেননি-- তিনি এই নির্বাচন জিতে যাবেন। জিতে গিয়ে উনি একটু বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। এ শুনে সক্কাল সক্কাল আমাদের অনেকেরই লে-হালুয়া অবস্থা। উনি আরও বললেন -- ট্রাম্প হলেন আদ্যন্ত এক রেসিস্ট মানুষ । উনি মেহিকান ও কালো মানুষদের অন্তর থেকে ঘৃণা করেন। আমরা শুনলাম। কিন্তু কথা হল আবার বললে আমরা আবার শুনবো। তারপর বড়জোর একটু নাক খুঁটে নেব। অফিসে গিয়ে সকালের কফিটায় একটু সময় নিয়ে চিনি গুলবো। কিন্তু ট্রাম্প-ভোটারদের প্রশ্ন করবো না-- আপনি জানতেন ট্রাম্প নিজের ক্ষমতায় জেতেননি? জিতিয়েছে আপনাদের ঘৃণা আর অশিক্ষা। মিসজিনি আর রেসিজম। ট্রাম্প আপনার এই বিষাক্ত কফি ধারণ করার একটি স্বচ্ছ পেয়ালা মাত্র। করবো না। কারণ আমরাও এই মিথের নির্মাণের অংশীদার হব। ভাবব-- আমাদের আমেরিকান ড্রিম হবে। আমরা ড্রীম ভাঙলে ব্যাটারি চালিত বুরুশে দাঁত মেজে নিতে পারব। আসলে প্রস্তুতি নেব। সারাদিন ধরে চলা ধারা বিবরণীর প্রস্তুতি-- ড্রীম নয়, আমেরিকান নাইটমেয়ারের ।



"এই প্রোপাগ্যান্ডা গিলিয়েই শাদা-বাড়িতে গেঁড়ে বসেছেন ট্রাম্প ও সম্প্রদায়। সম্প্রতি তার আইনজীবী, বলা ভাল প্রাক্তন আইনজীবী মাইকেল কোহেনের কবুল আখ্যা আমেরিকা ভ্যাবলা হয়ে সকালবেলা শুনেছে। কোহেন তার ট্রায়ালে বললেন- - ট্রাম্প ভাবতেই পারেননি-- তিনি এই নির্বাচন জিতে যাবেন। জিতে গিয়ে উনি একটু বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। এ শুনে সক্কাল সক্কাল আমাদের অনেকেরই লে-হালুয়া অবস্থা। উনি আরও বললেন -- ট্রাম্প হলেন আদ্যন্ত এক রেসিস্ট মানুষ । উনি মেহিকান ও কালো মানুষদের অন্তর থেকে ঘৃণা করেন। আমরা শুনলাম। কিন্তু কথা হল আবার বললে আমরা আবার শুনবো। তারপর বড়জোর একটু নাক খুঁটে নেব। অফিসে গিয়ে সকালের কফিটায় একটু সময় নিয়ে চিনি গুলবো। কিন্তু ট্রাম্প-ভোটারদের প্রশ্ন করবো না-- আপনি জানতেন ট্রাম্প নিজের ক্ষমতায় জেতেননি? জিতিয়েছে আপনাদের ঘৃণা আর অশিক্ষা। মিসজিনি আর রেসিজম। ট্রাম্প আপনার এই বিষাক্ত কফি ধারণ করার একটি স্বচ্ছ পেয়ালা মাত্র। করবো না। কারণ আমরাও এই মিথের নির্মাণের অংশীদার হব। ভাবব-- আমাদের আমেরিকান ড্রিম হবে। আমরা ড্রীম ভাঙলে ব্যাটারি চালিত বুরুশে দাঁত মেজে নিতে পারব। আসলে প্রস্তুতি নেব। সারাদিন ধরে চলা ধারা বিবরণীর প্রস্তুতি-- ড্রীম নয়, আমেরিকান নাইটমেয়ারের । "

আর তা মিথ্যার ইউটোপিয়াগুলি আরও সযত্নে বুনে দেবে। অনেকেই তাই আবারো লুকিয়ে বর্ডার, কাঁটাতার পেরোবেন। চলে আসেন আমেরিকা নামক এই কল্পিত স্বর্গে। যেখানে ড্রাগ নেই, বন্দুক নেই, মাসে মাসে ইশকুল বিদ্যালয়ে ফুটফুটে ছাত্র-মৃত্যু নেই, কর্মাভাব নেই-- এমন কিছুই নেই তেমনি এক মৌ-ধরোধরো ইউটোপিয়ায়। 

সারা বিশ্ব জুড়ে এই যে ডলারের মহিমা তারই ভালো নাম-- 'আমেরিকান ড্রীম'। এই ড্রীম দেখতেই তারা আসেন, নাকি তাদের না এসে উপায় থাকেনা-- সে অন্য খতিয়ান। তার জন্য বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। এখানে তা আমি সচেতন ভাবে এড়িয়ে যাচ্ছি। 

আপাতত আরেকবার পরিসংখ্যানে ফেরা যাক। কথা হচ্ছে এই যে সারি সারি কাঁটাতার পার হয়ে আসেন যে বিপুল মানুষ, তারা সত্যিই মোট কত শতাংশ? 

ফোর্বস সংস্থার রিপোর্ট বলছে-- চল্লিশ শতাংশ। মানে এদেশে মোট অবৈধভাবে বসবাসকারী জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ। বাকী ষাট শতাংশ তাহলে কারা? 

তারা-- যারা একদিন বিধি-সম্মত ভাবেই এই উত্তর আমেরিকায় এসেছিলেন। কর্মসূত্রে। ছিল বৈধ স্ট্যাটাসও।আসলে বৈধভাবে এদেশে বাস করছেন কিন্তু নাগরিক নন, এমন যেকোনো মানুষই যেকোন দিন অবৈধ বসবাসকারী হয়ে যাওয়ার যোগ্য সম্ভাবনা নিয়েই এদেশে বাঁচেন। । 

আরেকটু খোলসা করতে মূলত তিন ধরনের সম্ভাবনার হদিশ দিচ্ছি। এক -- যারা কর্ম করবেন ও কর্ম-ভিসায় আসেন ও পরে চাকরী খুইয়ে ভিসা হারান এবং থেকে যান, দুই-- আন্তর্জাতিক ছাত্ররা যারা পড়া-লেখা শেষ করে কাজ খুঁজছেন ও মেয়াদের চেয়ে বেশীদিন থেকে ফেলেছেন। তিন-- যারা গ্রীন -কার্ড খুইয়েছেন। গ্রীন কার্ডও সহায়ক নয়। আপনি আইন বিরোধী কাজ করলে সেটি বাজেয়াপ্ত হবে। এখন, আইন বিরোধিতার একটি নমুনা দিই-- তা খুন খারাপি বা চোরাচালান নয়। ইস্যু-ভিত্তিক লড়াই, সামাজিক উন্নয়নের জন্য লড়াই, অ্যাক্টিভিজমের জন্যও খোয়া যেতে পারে আপনার সবুজ-পত্র'টি । 

যেমন হলো-- আলেহান্দ্রো পাবলোসের বেলায়। 


সন্ত্রাসের কার্যক্রম


গত ডিসেম্বর মাসে তার গ্রীন-কার্ড সরকার থেকে বাজেয়াপ্ত করা হল। আলেহান্দ্রো এদেশে আসেন ইমিগ্রান্ট হয়ে। ১৭ বছর তার কোন বৈধ পরিচয়পত্র ছিলনা। পড়াশোনায় মেধাবীনি আলেহান্দ্রো অনেক পরিশ্রম শেষে, যোগ্যতা প্রমাণ করে গ্রীনকার্ড পেতে সমর্থ হন। অ্যাবরশন বিরোধী বিল নিয়ে কাজ করতে করতে অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠেন তিনি। অ্যাবরশন বিরোধী বিক্ষোভ ও অবস্থানের জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। 'রাষ্ট্র-বিরোধী'- এই অভিযোগ দেখিয়ে তার গ্রীন কার্ড কেড়ে নেওয়া হল গত শীতে। 

অ্যাবরশন নিয়ে আন্দোলন এদেশে পুরাতন ঘটনা। কন্সারভেটিভ নারীরা বিশ্বাস করেননা, তাহারা অপমানিত জীবন কাটাইতেছেন, তাহাদের স্বাস্থ্য-শরীর সম্পর্কিত ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা আরোপ করা হইতেছে অথবা তাহাদিগকে ধোঁকা দেওয়া হইতেছে। পক্ষী যেরূপ বাঁধা থাকিলেও বন্ধনকারীর শিখানো বুলি আউড়াইতে চাহে, তাহারাও পুরুষ-তন্ত্রের ভঙ্গ-ধ্বজ'কে (ভঙ্গ-ধ্বজ মানে 'ধ্বজভঙ্গ' পড়িবেন না। আমি শারীরিক অক্ষমতাকে খিস্তিরূপে ব্যবহার করিনা) হাউই-উড়ন্ত ধ্বজা ভাবিয়াই পূজা করিয়া থাকেন। যে নারীরা পুরুষবাদ অভ্যাস করেন তারা তাহা অবৈজ্ঞানিক হইলেও করেন। কারণ অবশ্যই একমেবাদ্বিতীয়ম-- অশিক্ষা। 

আর অশিক্ষাই সেই তাস, যাহা ট্রাম্প কে পপুলার বানায়। ট্রাম্প ক্ষমতায় না আসিলে জানাই প্রায় যাইতনা-- সারা আমেরিকা এই হেট-স্পিচের জন্যে ওইরূপ আকুল হইয়া থাকিয়াছে এতকাল। তাহা যেমনই মিসজিনিস্ট, তদ্রূপই জাতি-ঘৃণাকর। 

দেখা যায় যে ইল্লিগ্যাল ইমিগ্রান্টদের জন্য এই অ্যাবরশন অনেক সময়ই সন্তানের চেয়েও অনেক বেশী জরুরী। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় যৌন হেনস্থা ও ধর্ষণের ঘটনা সমান্তরাল ভাবে ঘটে চলে তাদের জীবনে। এতে আসতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণ। অনেক সময় বৈধ কাগজ পাওয়ার আশায় নকল বিয়েতে রাজী হতে হয়। এ ধরণের বিয়েতে প্রায়শই দেখা যায় পুরুষটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। মিথ্যার বিয়ে ও তার থেকে সন্তান, এই দুইয়ের কোনটিই তার কাম্য নয়। দেশে হয়তো তার মা-বাবা, ক্ষুধার্ত, অসুস্থ ভাইবোন থাকেন। তাদের মুখে সামান্য খাবার তুলে দিতে সামান্য ডলারের বিনিময়ে রেস্টরুমে মানুষের গু-মুত্র পরিষ্কার করে সে। বিয়ে- সন্তান এসব কিছুই তার জীবনের পরিকল্পনায় না থাকার কথা হতেই পারে । তখন অ্যাবরশনই তার বেঁচে থাকার একমাত্র সহায়ক। আর এই অ্যাবরশন করাতে গিয়েই ধরা পড়েন 'ইল্লীগ্যাল' ইমিগ্রান্ট। ফেডেরাল আইনে অ্যাবরশন অপরাধ না হলেও ওকলাহোমার মত কয়েকটি কনজারভেটিভ রাজ্য অ্যাবরশনকে 'অপরাধ' ঘোষণা করে রেখেছে। অতএব গ্রেপ্তার ও দেশে ফেরত পাঠানো। 

ওবামা সরকারের আমলে অবৈধ বসবাসকারী কেবলমাত্র অপরাধে জড়িয়ে পড়লে ডিপোর্ট করার নির্দেশ চালু ছিল। ট্রাম্প সরকারের আমলে ফোকাস হইল-- যে কোনো আনডকুমেন্টেড ইমিগ্রান্টকেই গ্রেপ্তার করে সরাসরি ফেরত পাঠানো। ট্রাম্প সরকারের হোমল্যাণ্ড সিকিউরিটির সচিব জন কেলি ইহাকে বাস্তবায়িত করিতে উঠে পড়ে লাগিয়াছেন । আর তাহারই ফল-- টেক্সাসের নতুন এই ডিটেনশন ক্যাম্প। অসুস্থ, প্রেগন্যান্ট মানবীদেরও কোন ছাড় নেই। 

বিচ্ছিন্ন মানুষ মাত্রেই শক্তিহীন। অতএব শক্তিহরণ পালা খুবই কার্যকরী। সব যুগে। সব রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। ট্রাম্প জমানায় তার চূড়ান্ত ফ্যাসিস্ট চেহারা দেখছি মাত্র । আমেরিকান সেটলাররা ছিলেন বিশেষ করিৎকর্মা । নেটিভদের দেশ থেকে মুছে দিতে এ ধরনের কুমানবিক পদ্ধতি তারা আগেই প্রয়োগ করে ফেলেছেন । ট্রাম্প সেই পথে নতুন ডিজিট্যাল আলো দিয়েছেন মাত্র । তাতেই জেগে উঠেছে নতুন করে কু-ক্লাক্স-ক্লান। বর্ডারে নতুন সাজে ডিটেনশন ক্যাম্প। গত গ্রীষ্মে শত শত শিশুকে মা-বাবার থেকে কেড়ে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো সেই কারায়। সারা দেশব্যাপী গন বিক্ষোভের জেরে ট্রাম্প-প্রশাসন সেই 'জিরো টলারেন্স' অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এখনও ডিটেনশন ক্যাম্পের বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে শিশুর কান্না। প্রেগন্যান্ট মায়েরা বাধ্য হচ্ছেন শারীরিক কষ্ট, ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে দেশ ছাড়তে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও, মারণ রোগ নিয়েও চিকিৎসার বদলে ফের বর্ডার পেরিয়ে অনিশ্চিত ধোঁয়া-পথে এগিয়ে যেতে। 

সেরা হের্নান্দেজের কথা মনে পড়ছে। ২০১৭ সালে টেক্সাসে বসবাসকারী সেরা মাথার টিউমরে আক্রান্ত হয়ে এমার্জেন্সি চিকিৎসার সুবিধা নেওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ল-এনফোর্সমেন্টের কর্মীরা হাসপাতাল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেন। তাকে নিয়ে গিয়ে রাখা হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে। সেরা'র ঘটনা মনে করায় কেন অবৈধ বসবাসকারীরা এই সুবিধা নিতে রীতিমত তটস্থ হয়ে থাকেন ও আছেন। সেরা'র বোন ও তার কমিউনিটির লোকজন ইমিগ্রেশন অ্যাক্টিভিস্টদের সাথে যোগাযোগ করেন ও সেরা'কে একজন আইনজীবী দেওয়া হয়। ক্রিস হ্যামিল্টন নামের আমেরিকান এই আইনজীবী সেরার সাথে ডিটেনশন ক্যাম্পে দেখা করার চেষ্টা করলে তাকেও গ্রেপ্তার করার হুমকি দেওয়া হয়।ক্রিস মিডিয়াকে জানান-- " ইহা গণতন্ত্র-বিরোধী। এবং আপামর আমেরিকাবাসীদের মনোভাব অ্যাতো অমানবিক নয়। কিছু অনুদার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও কুৎসিত-অমানবিকতায় আমরা লজ্জিত।" 

এরকম লজ্জিত কিছু মানুষ রহিয়া যান সর্ব-দেশে, সর্বকালে। তাহারা কেউ কেউ সরকারেও থাকেন। তাহারা কেউ কেউ অমানবিকতার বিনাশ চাহেন। তাহারা কেউ কেউ ঘৃণার প্রতিশব্দ নহেন। তাই দুনিয়াব্যাপী সন্ত্রাস ও ঘৃণার পরেও এই গ্রহটির কিছুটা সভ্য থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েই যাবে। 

কিছু শহর ও রাজ্যে আনডকুমেন্টেড ইমিগ্রান্টসদের প্রাইমারি কেয়ারের একটা মডেল খাড়া করার চেষ্টা হয়েছে। যেমন নিউইয়র্ক শহরে যেহেতু সবথেকে বেশী বেসরকারি ও কমিউনিটি স্বাস্থকেন্দ্র এবং দেশের সবচে বড় জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থাও এই রাজ্যেই, তাই এই শহরের হাসপাতাল ও স্বাস্থকেন্দ্রগুলিতে মেলে কাগজবিহীন বসবাসকারীদের চিকিৎসাও। সহজেই। ক্যালিফোর্নিয়া বহুদিন থেকেই এ ব্যাপারে উদার মনোভাব দেখাতে পেরেছে। এই রাজ্যের 'মেডিক্যাল' (MEDI-Cal) অত্যন্ত সহানুভূতিশীল একটি স্বাস্থ্য পরিষেবা। ডকুমেন্টেড, বা না আন-ডকুমেন্টেড সকলেই এর ভোক্তা হতে পারেন। সকলেই এর চিকিৎসার আওতায় পড়েন। 

জোরদার হচ্ছে ইমিগ্রান্ট রিফর্মেশনের আন্দোলনও। ইমিগ্রান্ট'দের দাবী-দাওয়া নিয়ে যারা আন্দোলন করেন, তারা দাবী করেছেন-- চাই ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল মনোভাবের স্বাস্থ্য-পরিষেবা। চাই এমন প্রশিক্ষিত, উদার মনোভাবের কর্মী-- যারা ল্যাঙ্গোয়েজ-শেমিং করবেননা। অর্থাৎ 'মেল্টিং-পটের' এই দেশে ইংরেজি না বলতে পারাকে 'অপর' যেন না প্রতিপন্ন করা হয় । বলা হচ্ছে-- ইংরেজী 'অ্যাক্সেন্টেড' মানে তিনি অন্য আরও একটি ভাষা জানেন। অতএব তার ভাষা-জ্ঞান সীমিত নয়। তাই তার অ্যাক্সেন্টেড ইংরেজিকে খাটো ও করুণা করবেননা। বরং তার প্রাথমিক ভাষাটিকে মান্য করে রোগীর আস্থা অর্জন করতে হবে । যাহাতে সেই অনুপ্রবেশকারীটি নিশ্চিন্ত মনে তার চিকিৎসক ও ইন্সিওরেন্সকে ভরসা করতে পারেন। 

গেল শীতে দেশে গিয়ে দেখলাম-- মফস্ব্বলের এক বাঙ্গালী সল্টলেকের এক ঝকঝকে বেসরকারি স্বাস্থ্য-কেন্দ্রে আপ্রাণ হিন্দি-ইংরেজী মিশিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার পরিচয়পত্র আমি স্বচক্ষে দেখিনি। মফস্বলের নামটি শুনে ধরে নিচ্ছি তিনি ভারতের ও পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক । স্বাস্থ্য-খানার কর্মীদের কাছে তার আস্থা অর্জন করার কায়দাটি আমার কাছে ছিল রোমহর্ষক । বাহু ও বাহুমূলের রোম চাঁচা না থাকলে নির্ঘাত খাড়াই হইত মালুম করি। 

লোকটি কি মাইনরিটির? কিরূপ মাইনরিটির ? মানসিকভাবে মাইনরিটি ? এইসব ভাবিতে ভাবিতে কলিকাতার রাস্তা ফেলিয়া চলিয়া আসিতেছি-- আর আমার বৈধ-অবৈধ সমস্ত প্রকার বসবাসকারী, দেশ-বিদেশ, অনুপ্রবেশকারী বিষয়ক সব আখ্যান উলটাইয়া-পালটাইয়া যাইতেছে। 

লেখা শেষ করিব ভাবিতেছি। কিন্তু তাও মনে পড়িতেছে কিয়ের্কেগার্দের সেই অমোঘ উপলব্ধি-- 

Truth always rests with the minority, and the minority is always stronger than the majority 


কারণ-- মাইনরিটি এইরূপেই তৈয়ারি হয়। মাইনরিটি প্রস্তুত হয় যখন সত্যই তাহাদের কোন অবস্থান থাকে। সংখ্যা-গরিষ্ঠ গোষ্ঠীর শক্তি আসলে একটি মিথ। ভুলভুলাইয়া। যাহারা বহতা। নিজেদের অবস্থানের থেকেও যাদের বেশী অবস্থানবিহীনতা। যাহারা করে চলেছেন অন্যের প্রভাবে প্রভাবিত এক বহুল শেয়ারিত মতপ্রকাশ-- নিন্দুকের ও ফেসবুকের, জলের ও জঙ্গলের, এই গ্রহের ও বিগ্রহের, মঙ্গলের ও আমেরিকাস্তানের। 

মেজরিটি নামের এই দানব, আসলে সত্যিই এক দৈত্য যাহার ভালোনাম 'পাব্লিক' হ্যায়, আউর যো সব জানতি হ্যাঁয়-- কিন্তু সব জানিলেও তাহারা কোন দৃঢ় অবস্থানে নেই। তাহারা ম্যানুফাকচার্ড। তাই সত্য হল তাহা- যা বাস্তব, যেখানে অভাব, যেখানে পীড়ন চলিতেছে, যাদের প্রয়োজনীয় পাওনা উসুল করিতে হবে এই গ্রহটিতে টিকে থাকার জন্য, যা ন্যুনতম এবং প্রাপ্য, সেই সত্যই তখন মাইনরিটি। 

আমরা কখনও কি এই সংস্কৃতি নির্মাণ করিতে পারিব-- যাহা মাইগ্রেশনকে চ্যালেঞ্জ করিবে? আমরা কখনও কি এই প্রশ্নের উত্তর করিতে সক্ষম হইব-- মানুষেরা কেন পরিচয়হীন, 'অবৈধ' হইয়া যান? এতক্ষণে প্যারাডক্সের সমাধান হইল। পরিচয়হীন মানুষ অদৃশ্য। অতএব অশরীরী। অতএব তাহার চিকিৎসাও নিষ্প্রয়োজন। 


________________________________________ 
আমেরিকা, মার্চ, 

***** লেখক দীর্ঘদিন গুরুচণ্ডালীতেই লেখেন। 




নোট
পর্ব- এক 
[এই কলাম লেখা যখন শুরু করেছি, অতিমারী তখনও আমাদের আচ্ছন্ন করেনি। 

গত এক মাসে সারা পৃথিবীর মানুষের জীবন ও জীবনচর্চা পাল্টে গেছে। সময়ের সাথে সংহতি রাখতে প্রথম পর্বটি সংক্ষিপ্তাকারে যোগ করা হল।]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন