নাহার মনিকা
বেঁচে যায় যুদ্ধবিদ্ধস্ত মানুষওতো!
বুকের ভেতরে থাকে গোলাগুলি
রহস্যের অগ্নিগোলক।
বয়ে নিয়ে চলে অযুত গল্পের ভেলা
অথচ সকল গল্প এক নয়
উলের দীর্ঘ কাঁটা বুনে চলে ক্ষতের জাম্পার।
নির্মোহ
ভোররাতে চিড় ধরে গেছে। গা ঘষে যাওয়া বাতাসে নিঃশব্দ মানুষ এ ঘর থেকে ও ঘর,
জিনিষপত্র বাঁধাছাদা করে। বাতাসের পাশাপাশি রিক্সাটা ভারের চোটেও কেঁপে কেঁপে ওঠে।
তাও যা হোক একটা পাওয়া গেছে।
গায়ে গামছা জড়িয়ে রিক্সাওয়ালার সঙ্গে মুরাদ নিজেই
তদারকি করছে বাঁধা ছাদা। কেউ তেমন কিছু নেবেনা নেবেনা করেও ট্রাংক-স্যুটকেস, ঝুড়ি
আর পোটলাপুটলি মিলিয়ে গোটা সাতেক। মানুষও কম না, শিরিন গুনে রেখেছে- বারেক,
সাফিয়া, আবুলের মা, তার নিজের মেয়েদুটো
মিলিয়ে আটজন। আগষ্টের শেষ, রোদ ওঠার আগেই গরম শুরু হবে। হাতের পার্সে রুলি আর চুড়ি
ঢোকাবার পর খুব বেশী আঁটেনি, আঁচলে গিট দিয়ে কিছু বড় কানপাশাদুটো আর মটরদানা
চেইনটা নিয়ে নেয় শিরিন। বড় হার দুটো নিয়েছে পেটিকোটের ফিতে বাঁধার ভাঁজে। কালরাতেই
সেলাইতে মুড়ে রেখেছিল। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মেরুদন্ডসহ মাজা টং করে ওঠে। এ সময়ে তার
ব্যাথাটা হয়। আগের দু’বারের অভিজ্ঞতা আছে।
বাঁশের
মসৃণ বাতা রাঙ্গানো জানালা দিয়ে উঠোনে দেখা যায়, মুরাদ বারেককে নিয়ে রিক্সার সিটে
পাদানিতে মালপত্র তুলে দিচ্ছে। রডের দু’পাশে হাল্কা দু’একটা ঝুলিয়ে দেয়ার পরে
পেছনের দিকে দড়ি দিয়ে প্লাষ্টিকের ঝুড়ি দুলিয়ে দেয়া যায় কিনা ভাবে মুরাদ। কিছু
খাবার, নিদেনপক্ষে একবস্তা চাল নিতে পারলে ভালো হতো। এতগুলো মানুষ অচেনা জায়গায়!
আতাউর অবশ্য বলছে কোন অসুবিধা হবে না। তাদের কয়েক শরীকের বড়সড় বাড়ি। রহিমানপুরে
আপাতত সেই বাড়িই গন্তব্য।
উঠোনের
কোনে ট্রেঞ্চটার কাছাকাছি গিয়ে দেখে আসে মুরাদ, ওর মুখটায় কুয়াশার পলকা আভাস।
দু’সপ্তা আগে খোঁড়া পরিখা। শান্তি কমিটি থেকে নোটিশ জারী হলো- প্রতিটি বসতবাড়িতে
বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেনশ খনন করা জরুরী। বাড়িটা পাড়ার এক কোনায়, আর
তাদের থাকার কথা তেমন জানাজানি হয়নি। না বানালে শান্তি কমিটি ঝামেলা বাড়াতে পারে।
জীবনে কোনদিন মাটি খোঁড়েনি সে। বারেকের বাড়ির বড়ই গাছটার নিচে কোদাল চালাতে চালাতে
মনে হচ্ছিল- নিজের কবর খুঁড়ছে কি?
চীফ
ইঞ্জিনিয়ার সরফরাজ খান ছুটিতেই ছিল, এপ্রিল মাসে ফেরার কথা কিন্তু ফেরেনি। এর
মধ্যে তো যুদ্ধই শুরু হয়ে গেল। মুরাদ নিজের কোয়ার্টারে থাকলো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত,
শালবনের দিকে মুখ করা সারি সারি দশটা
কোয়ার্টার, মুরাদের জন্য বরাদ্ধটা একদম কোনায়। বাকিগুলোর মধ্যে বাঙ্গালী
শহীদুল্লাহ সাহেব বন্ধ ব্রাকেটের মত একদম
অন্য ধারে, মাঝখানে সব খানেদের আবাস। সেই এপ্রিল থেকে শুরু করে জুন মাসের মধ্যে
সবাই কোন না কোনভাবে সরে গেছে। রাতারাতি, কাদের সহযোগিতায়, কিভাবে, মুরাদ জানেও
না। আসলে কাজের বাইরে অত খাতির তার বাঙ্গালী অফিসারদের সঙ্গেও হয়নি।
জনশূণ্য
কলোনীতে আতংক ভালো রকম সঙ্গী হয়ে ছিল। সোমা-সুরভীকে নিয়ে শিরিনের দিনের বেলায়ও ভয়
লাগে। তবু দিনপার করছিল, এ অবস্থায় যাবে কোথায়? কিন্তু দিন দশেক হয়ে গেল
পাকিস্থানী আর্মির কনভয় সুগারমিলের গেষ্ট হাউসে আস্তানা গেঁড়েছে। তারা কোয়ার্টার
তল্লাশী শুরু করার আগেই বারেক জোর করলো। ওর বাড়িতে আসতে মুরাদ না করেনি। এ সময়
শিরিনকে নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকাও নিরাপদ।
বারেক
আর আতাউরকে নিয়ে মুরাদ নিজেই ট্রেনশ খুড়ে কাঠ আর টিন দিয়ে মুখ আটকে দিয়েছিল। ওপরে
মাটি দিয়ে বন্ধ করার পর সাফিয়া এমন করে লেপে দিয়েছে, অন্তত কাছে না গেলে বোঝার কোন
উপায় নেই। একদম উঠোনের সঙ্গে মিশে গেছে। ট্রেনচের মুখের ভেজা মাটিতে ছোট ছোট পায়ের
ছাপ। সুরভীর নাকি সোমার? নিজের পায়ের ছাপ খুঁজতে আরো ঝুঁকে আসে মুরাদ। পদচ্ছাপ
মানেই তো বেঁচে থাকার চেষ্টা, প্রমাণ। উল্টোটাও হতে পারে, এই ঘোর ডামাডোলের মধ্যে
মৃত্যু এখনো সামনে এসে দাঁড়ায়নি, কিন্তু দাঁড়াতে কতক্ষণ। মুরাদের ভেতরটা সহসা
উদ্দিগ্ন হয়।
২
সোমা
আর সুরভীকে ঘুম থেকে ওঠায় শিরিন। কাদা হয়ে আছে দুটোই। কাল সারাদিন ট্রেঞ্চ এ আর
বাইরে দৌড়াদৌড়ি করেছে। প্লেনের শব্দ শুনলেই দৌড়ে ভেতরে ঢোকা, নিঃশ্বাস আটকে বসে
থাকা, দর দর করে ঘাম। কানে তুলো গুজে কতক্ষণ আর এ বয়সের বাচ্চা চুপচাপ বসে থাকতে
পারে। সুরভী দুই বছরেই কট কট করে কথা বলা শিখে গেছে। ঘুম ভাঙ্গা চোখে ফিসফিসিয়ে
ওঠে- ‘আম্মা আমলা টেনচে নাম্বো? মিলিটালি এছে গেসে?’
ঝটপট
ওদের গায়ে জামা চাপায় শিরিন। এই ঘরে তার গত সপ্তা খানেকের দিন যাপন।
স্যুটকেসবন্দী। এখন এখান থেকেও বেছে বেছে কেবলমাত্র অতি দরকারীগুলোই নিতে হচ্ছে।
কিছু ওষুধ-পত্র নিতে পারলে ভালো হতো। কোয়ার্টারে তার ফার্ষ্ট-এইড বক্স ছিল, এখানে
আসার সময় খেয়াল হয়নি। এখন কি আর কোয়ার্টারে যাওয়া সম্ভব! ঢাকায় নিজেদের বাসার কথা
মনে হয় শিরিনের, মুরাদের বদলীর চাকরী বলে কত কি যে সে নিয়ে আসেনি। একটু গুছিয়ে
নিয়ে পরে আনবে ভেবেছে। এখানের অফিসার্স কোয়ার্টারেও এই এক বছরে কত কিছু জমে গেছে।
ফেলে ছড়িয়ে থাকা অভ্যাস শিরিনের। কম জিনিষে দিন সামলাতে কষ্ট হয়। বারেকরা যত্ন
আত্তির কোন কমতি করে না, তবু এই ভারী শরীরে অন্যের বাসায় থাকা পোষায়? কবে যে এই
যুদ্ধ শেষ হবে? শরীর মন দুই-ই এত অবসন্ন লাগে শিরিনের। মুরাদকে বলে কি লাভ?
পরিস্থিতি যে ওর নিয়ন্ত্রণে নাই এটা কি সে বোঝে না? তারপরও সব অভিযোগ, শিশুতোষ জেদ
ওর বিরুদ্ধেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে- মনে হয় যুদ্ধের জন্যও মুরাদই দায়ী।
রাওয়ালপিন্ডির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার
হাশমীকে পয়লা বৈশাখে বাসায় দাওয়াত দিলে কী এমন ব্যাপার হতো। সবাই দেয়। ওই লোক কি খবর পায় নাই যে মুরাদ
নিজের বাসায় এ উপলক্ষে আড্ডা জমিয়েছিল?
কী, না, ওই ব্যাটার সঙ্গে উর্দু বলতে হবে, ও বাংলা গান কবিতা এসব বুঝবে না।
এত কিছু চিন্তা করলে তুমি চাকরী টিকিয়ে রাখবে কি করে? মাথার তালুকে
ধুম্রউদ্গীরণকারী অবস্থা থেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কষ্ট হয় শিরিনের। পান থেকে চুন
খসলেই এখন মুরাদকে ডেকে দোষ ধরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। এই সময় কোথায় একটু বিশ্রাম, মন
ভালো রাখা গান শুনবে- তা না এক আশ্রয় থেকে আরেক আশ্রয়ে ছুটতে হচ্ছে।
উঠানে
শব্দ যথাসম্ভব নিচুস্বরে রেখে রিক্সায় মালপত্র তোলা হচ্ছে। পেয়ারা গাছের ঝুঁকে আসা
ছায়ার আবছা অন্ধকারে মানুষগুলোকে আধিভৌতিক লাগে। অতিরিক্ত ফর্সা, তাই জানলা দিয়ে মুরাদের
আদুল গা চেনা যায়, গামছাটা গলার কাছে উঠে এসেছে, স্যুটকেসের হ্যান্ডেলের সঙ্গে গরম
পানির ফ্লাস্ক দড়ি দিয়ে কষে বেঁধে দিচ্ছে, এক পা রিক্সার পাদানিতে। মনটা নরম হয়ে
আসে শিরিনের। নাহ, আর মেজাজ করবে না। ও বেচারার কি দোষ! সে নিজেও কি চায় এইসব
মিসেস হাশমীদের সঙ্গে আইয়ে খাইয়ে করতে!
হারিকেনের
উসকে দেয়া সলতে কমে আসছে, তেল ফুরিয়ে গেছে। চাবিটা ঘুরিয়ে নিভিয়েই দেয় শিরিন। তার
গোছগাছ শেষ। সাফিয়া চুলা ধরিয়ে চা করেছে, সঙ্গে মজনু বেকারীর টোষ্ট। শিরিন খায়
কিন্তু গা গুলিয়ে আসে। সাত মাসেও তার বমি ভাব থাকে, সুরভির বেলায় তো একদম শেষদিন
পর্যন্ত ছিল, কী যে গন্ধ লাগে সবকিছু, আর আছে বুকজ্বালা করা। এটাই তার গর্ভাবস্থার
ধরণ, তিনবারই এক সমস্যা। আতপচালের রান্না কোনকিছুর ধারে কাছে ঘেষতে পারে না সে
পুরো ন’মাস।
চা
খাওয়ারও সাহস হয় না শিরিনের। এর আগের দু’বার সুগারমিলের ডাঃ জালাল বমিভাব আর বুকজ্বালা
কমার ওষুধ দিয়েছিল। এপ্রিলের শুরুতেই সপরিবারে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। খুব ভালো
সিদ্ধান্ত- শিরিনের মনে হয়। যেসব ঘটনা কানে আসে তাতে সোমত্ত দুই মেয়ে নিয়ে
কোয়ার্টারে থাকা একদম নিরাপদ না। শরীরের সওয়া না সওয়া বুঝে কিছু বাছবিচার শিরিন
এবার নিজেই করছে। সাফিয়া পীড়াপিড়ি করলেও দুটো টোষ্ট বিস্কুট খেয়ে অল্প পানি খেয়ে
নেয় সে। রাস্তায় পানির পিপাসা পাবে নির্ঘাত। রহিমানপুর বারো মাইলের ধাক্কা। অন্য
সময় হলে অত ভাবতো না সে, কলেজ পর্যন্ত দৌড়ে ফার্ষ্ট প্রাইজ আছে তার। কিন্তু এখন,
পেটের মধ্যে দস্যুটা যখন ফুটবল খেলে, কারণে অকারণে ক্লান্তিতে টলে ওঠে সে। তার ওপর
সোমা-সুরভী দু’জনই দুরন্ত।
মুরাদের
তাড়ায় গা তোলে শিরিন। সাফিয়া তার লাল গরুটাকে মতির মায়ের কাছে সঁপে দিচ্ছে উঠোনের
এক ধারে, দড়ি ধরে আছে, তার শ্যামলা পানপাতা মুখে টলটলে চোখ। বাপের বাড়ী থেকে পাওয়া
বকনা বাছুর বছর না ঘুরতেই বাচ্চা বিয়ানো গাই হয়েছে। নধর বাছুরটার নাম দিয়েছে লালি,
সে মমতামাখা চোখে সাফিয়ার বিহবলতা দেখে।
-মতির
মা, দুধ দুহাবার আগেপিছে লালিক দুধ খাইবার দিও। দেখিয়া রাইখো একনা, দোহাই তোমার।
-‘হামরা
আর কুনখানত যামো বাহে, এইঠেই থাকিবা নাগিবে। তবে, যুদিল বাঁচো তুমার লালি আর লালির
মাও বাচিবে। চিন্তা না করিয়েন মা’- মতির মা একহারা সুরে আস্বস্ত করে চলে, তার চোখ
যাত্রাকালীন সবাইকে জরীপ করে।
বারেকের
বাড়ির পেছন দরজা রেললাইনের দিকে গেছে। সেখান দিয়ে বেরুনো নিরাপদ, কিন্তু সমস্যা
রিক্সা নিয়ে। ঠিক হলো মুরাদ রিক্সাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরপথে সুগারমিলের উল্টোপারে
সবার সাথে মিলবে। শিরিনের ভয় করে। এই যাত্রার কাপড় চোপড় আর নিতান্ত দরকারী কিছু
জিনিষ রিক্সায় আছে, সেগুলো না হয় গেলে যাক, কিন্তু যদি রিক্সাওলার কিছু হয়?
মুরাদের কোন অমঙ্গল আশংকা কোনভাবেই সে মাথায় আনতে চায় না।
২
আগষ্ট
মাসের দুপুর দীর্ঘ আর পৌরুষময়। তবু তার দাপটে নদী খালের মত ক্ষীণাঙ্গী হয়ে সিঁটিয়ে
নেই। অল্প ঢেউ আছে, অন্যপাশে পানি কালো দেখাবার মত গভীরতাও।
দুই
মেয়েকে নিয়ে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াতে পারলে আর কিছু চোখে পড়ে না শিরিনের। সঙ্গের
মানুষজন, নিজের স্বামী সবাইকে অদৃশ্য করে চোখের সামনে শুধু ধূ ধূ। চোখ বোঝাই
অন্ধত্ব নিয়ে নিজের ভেতরে আরেকটা প্রাণের আকুপাকু করা হৃদস্পন্দন শুনতে পায় সে,
টের পায় তার পদাঘাত। অস্থির সময়ের তাড়না আট মাসের গর্ভস্থ সন্তানকেও আক্রান্ত করছে
তাহলে। হোক না তৃতীয়বারের মত পোয়াতি, এই হাঁটার পরিশ্রম তার প্রাপ্য ছিল না। ছেলে
না মেয়ে কে জানে- পেটের মধ্যে থেকেও ক্লান্তিকর যাত্রায় শ্রান্ত হচ্ছে। এ রকম
শ্বাসরুদ্ধকর দুপুরে দূরের টেলিগ্রাফের খাম্বাকেও অপরিচিত লাগছে তার। একটু দূরে
উড়ে বেড়ানো কালো ফিঙ্গে পাখি, এর মত্ত, তিরতির, মসৃণ পালকে বলক তোলা দেখে আগে কত
উচ্ছসিত হয়েছে! কি স্বাধীন এইসব পাখি! বছর পাঁচেক আগে সে নিজেও ঢাকায় ইডেন কলেজ
প্রাঙ্গনে এমন করেই ঘুরে ফিরে বেরিয়েছে। শিরিন আলতো হাত বুলিয়ে আদর করে নিজের পেট।
সবারই
পা অল্পবিস্তর ফুলে গেছে। সেই ভোর থেকে হাঁটাই একমাত্র উপায়। শিরিন যদিও দু’বার
রিক্সাতে বসেছে। আবুলের মায়ের পীড়াপীড়ি। কিন্তু সে এক ঝক্কি। গোটা চারেক
ব্যাগ-বাক্স তখন নামাতে হয়, সেগুলো ক্লান্ত মানুষজনের হাতে, কাঁধে নিতে হয়। সেবা
যত্নে অভ্যস্থ শিরিনেরও অস্বস্তি লাগে, আবুলের মায়ের আবারো অনুরোধে আর রাজী হয় না
সে।
ওপার
দেখে একটু ধন্ধ আসে- কেমন নদীর পাড়! বড় কোন গাছের বংশ নাই ধারে কাছে। মুরাদ দুটো
গামছা ভিজিয়ে আনে, তাতে গরম পানির পরশ। রিক্সার ছায়ায় বসে হাঁপানো যায়।
-আর
কতদূর আতাউর?-আবুলের মা সবার হয়ে প্রশ্ন করার হক রাখে। সবচে বয়স্ক মানুষ। বয়স্ক
হলেই অভিজ্ঞ হবে এমন না, কিন্তু ত্বকের সোনালী ভাঁজে জীবন বোঝার ছাপ জ্বলমান।
নদীর
ওপারে রিক্সা আর যাবে না। সেইমতই কথা হয়ে আছে। দুপুরের মধ্যে রহিমানপুর পৌঁছাতে
পারলে বারেকের ইচ্ছা ছিল সে রিক্সাওয়ালাকে এখানেই অপেক্ষা করতে বলবে। একটু বেশী
টাকায় যদি রাজী হয়। আসার আগে ষ্টেশন রোডে তার
দোকান একবার ঘুরে আসতে পারেনি। মুরাদ রাজী হয়নি তাকে ছাড়তে। বলা যায় না,
কোথায় কি বিপদ ওৎ পেতে আছে। ঠাকুরগা শহর থেকে রেলষ্টেশন রোড মাইল তিনেক দূর হলেও এ
জায়গাটার বিশেষত্ব ভিন্ন। চিনিকল আর
এ্যারোড্রামের মত দুটি স্থাপনা আছে, এ দুটোর ওপর হামলা হতে পারে যে কোন সময়।
বারেকের
মনটা খচ খচ করে, সুগারমিলের অফিসারদের কতগুলো অর্ডার ছিল। দু’জন
অবাঙ্গালী অফিসারের স্যুটের অর্ডার, দিয়ে দিতে পারলে মাসকাবারি টাকার চিন্তা দূর
হতো। সরফরাজ খানের বড়সড় ভুড়ির কারণে কোন স্যুটই পরে আরাম পায় না। বারেক টেইলার্সে
বানানো স্যুট দিয়ে তার দিল সাচমুচ খুশ হো যাতা হ্যায়। লাহোরেও নাকি এত ভালো দর্জি
পায়নি সুগারমিলের ব্যাবস্থাপক। তেমন চৌকষ কিছু করতে হয়নি বারেককে, শুধু পেটের
ঘেরের কাপড় একটু ঢিলে রেখেছে, যাতে বোতাম আটকানো যায়। মুরাদের মারফৎ সুগারমিলের
অনেক অর্ডার আসে তার কাছে। দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই, এত বড় ইঞ্জিনিয়ার তাকে যে
চেনে তাতেই বারেকের প্রাণ কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ হয়ে যায়। এইতো গত বছর কালিয়াচাপড়া থেকে
বদলি হয়ে এখানে ঠাকুরগাও চিনিকলে এসেছে। মুরাদ ভাই বড় চাকুরে, পয়সার ক্ষতি পুষিয়ে
যায়, কিন্তু বারেকের তো সতেরো দিকে নজর দিতে হয়। আতাউর কাজ শিখছে, তাই বেতন নেয়
না, কিন্তু অন্য আরো দু’জন কর্মচারী আছে। তাদের সংসার আছে। গত সপ্তাখানেকে বাসার
খাই খরচও বেড়েছে। সাফিয়া দু’একবার ফিস ফিস করে কানে তুলেছে, কিন্তু সেতো মুরাদ
ভাইয়ের কাছে চক্ষু লজ্জায়ও টাকা পয়সা নিতে পারে না, জোর করে হাতে গুজে দিলেও না। দোকানে
একবার গিয়ে দেখে আসার ভাবনাটা মাথায় পোকার মত কুট কুট করে কামড়ায় বারেককে। নিজে না
হলেও আতাউরকে যদি পাঠানো যায়। অন্তত গোটা দুই সিঙ্গার মেশিনের মাথা সে রিক্সায় করে
নিয়ে আসতে পারে। বলা যায় না- দোকান ভেঙ্গে কেউ তাদের রুটিরুজির যোগানদার
মেশিনগুলোই আগে লুট করবে। নাহ, কুচিন্তা মাথার বাইরে থাক, হয়তো কোন কাষ্টমার এসে
অর্ডার ডেলিভারি নেয়ার অপেক্ষায় আছে। আতাউরের বাড়িতে সে আগে কয়েকবার গিয়েছে। কাজেই
অসুবিধা হবে না।
ক্লান্তিতে
হোক, সিদ্ধান্ত দেয়ার দায় এড়াতে হোক- মুরাদ আর কিছু বলে না। বারেকের উপরোধে আতাউর
দ্বিধা আর অনিচ্ছা গোপন করে ফিরে যাওয়ার জন্য রিক্সায় উঠলে মুরাদ এই দীঘল কালো
তরুণের চলে যাওয়ার দিকে তাঁকিয়ে থাকে।
৪
নদী
ছোট হলে পারাপারের বন্দোবস্ত আগে ছিল, ডিঙ্গি, না হলে বাঁশের অথবা কলাগাছের ভেলা-
বারেক আগে যখন এসেছে। আজকে সেসব উধাও। সাঁতার দিয়ে পদ্মা পার হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে
আবুলের মায়ের, সে তুলনায় এটাতো খাল! সাফিয়াও সাঁতরে ওপারে গিয়ে ওঠে। ওপারে নদীর
কাঁধ উজিয়ে ঝুঁকে থাকা একটা ছোট্ট আকন্দপাতার ঝোঁপ! তার বাদে ধারে কাছে কোন
গাছপালা নাই, শুনশান কাশবন রোদের কাছে স্থির, মৌন, উপাসনারত।
আবুলের
মা আর সাফিয়া তারা নোঙ্গর করলে বারেক আর মুরাদ একে একে শিশু আর বাক্স প্যাটরা পার
করতে শুরু করে। প্যান্ট গুটিয়ে, লুঙ্গি কাছা মেরেও ভেজা বালিতে পায়ের ভার কমে না।
শিরিন রিক্সায় ছায়ায় হাঁপিয়ে বসে থাকে।
খুব ইচ্ছে করে হাঁটুতে মাথা গুজে দেয়, কিন্তু পেটটা আগবাড়িয়ে বৈরী হয়ে যায়। তারই সবচে বড় অন্তরায়- সাঁতার শেখেনি।
মুরাদ
তাকে কোলে আধশোয়া করে পানিতে ধরে রাখে। তেজী রোদের বিপরীতে তার ভেজা আঁচলটাও কম
ভারী না, গয়নাগাটি বাঁধা। এখন মনে হয় গায়ে পরে নিলেও হতো। এত গরম লাগে তার গয়না
গায়ে জড়ালে! একবারই পরা এসব। মুরাদ একটু নারাজ হয়েছিল বিয়ের পরদিনই সব গয়না খুলে
নিরাভরণ হওয়াতে। এখন এসবই তাদের বিপদের সম্বল। কে জানে কোন অচেনার সামনা সামনি হবে
তারা, কতদিনের জন্য!
পানির
ভেতরে পেটের ব্যথা সহসা মোচড় দিয়ে বেড়ে গেলে শিরিন মুরাদের গলা জোরে জাপ্টে ধরে।
পানির শব্দ বেগও যেন হঠাৎ বেড়ে যায়। তার উপুড় হতে ইচ্ছে করে। ‘এইতো আরেকটু’ করে
করে মুরাদ তাকে ধীরে ধীরে টানলে শিরিনের মনে হয় সে নিঃসীম কাল ধরে এই নদীর মৃদু
উষ্ণ পানির ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছে। কচুরীপানার বেগুনী ফুলগুলো হলুদ ঠিকরানো আলো
ছিটিয়ে তাকে পাহারায় রাখে। কন কনে ধারালো ব্যথার একটা ছুরি থেকে থেকে তার পেট
এফোঁড় -ওফোঁড় করছে। কয়েকবার সে মুরাদের কাঁধ খাঁমচে নখ বসিয়ে দেয়। আটমাসের দস্যিটা
আকুপাকু করে ক্রমাগত লাথি মেরে যাচ্ছে।
-‘
বাবা, বৌয়ের মনে কয় পানি ভাইঙ্গা গেছে’।
আবুলের
মা তড়িঘড়ি ঘাসের ওপরে একটা কাঁথা বিছিয়ে দিয়েছে। শিরিনের স্খলিত পেটের চামড়া ভেদ
করে শিশুর কনুই কিংবা হাঁটুর ছাপ বেশ স্পষ্ট। শিরিনের বন্ধ চোখের ক্লান্ত চেহারা
দেখে সোমা-সুরভী চুপ চাপ সাফিয়ার কাছে বসে আছে।
মুরাদ
কয়েক মুহূর্ত ভাবলেশহীন, বারেকের দিকে চেয়ে থাকে শুধু। রহিমানপুর আরো অন্তত ঘণ্টা
দেড়েকের ধাক্কা।
৩
‘পেইনলেস
কন্ট্রাকশন, হয় কারো কারো। ভালোইতো, কত কম ব্যথা সয়ে মা হয়ে গেলেন!’- এর আগের
দু’বার প্রসবের সময় হলিফ্যামিলির লেডী ডক্টর শিরিনকে এভাবে ঠাট্টা করেছে। কিন্তু
এবার তার এত তীব্র ব্যথাবোধ হচ্ছে কেন! হাজার হাজার গোখরার ধারালো দাঁত শরীরে ফুটে
যাওয়ার মত ব্যথা ছাপিয়ে এই বিরান মাঠের মধ্যে প্রসব উন্মুক্তির ভাবনা তাকে আরো
কাবু করে তুলছে। শিরিনের বাহু তার মুখাবয়বের মতই, চোখ কাড়ে। সে সুতরাং, হাতকাটা
ব্লাউজ পরে, সুচিত্রা সেনের মত খোঁপা বাঁধা ঘাড় বাঁকিয়ে ফটোও তোলে। ক্লাবের
পার্টিতে অন্যান্য অফিসারদের সামনে আঁচল টেনে কাঁধ ঢাকে কদাচিৎ। কিন্তু তাই বলে
এমন উন্মুক্ত নদীর ধারে তাকে সন্তান প্রসব করতে হবে! এত বড় শাস্তিযোগ্য পাপ কি সে
করেছে!
পেট
থেকে ব্যথাটা লাফিয়ে লাফিয়ে সুউচ্চ গিরিশৃঙ্গের উচ্চতা নিয়ে কিছুক্ষণ দম ধরে থাকে,
তারপর আবার লাফিয়ে নিচে নেমে সমতলবাসী। শিরিন গোঙ্গানোর পাশাপাশি প্রার্থনা করে
চলে- ‘না এখানে না। এই খোলা নদীর পাড়ে না’।
আবুলের
মা গামছা দিয়ে শিরিনের ঘেমে ওঠা মুখ, গলার কাছটা মুছিয়ে দেয়। ভেজা শাড়ী বদলে দিলে
ভালো হতো, জনমনিষ্যি না থাকলেও একটা আড়াল দরকার। পেটিকোটের বাঁধন আলগা করতে গিয়ে
গয়নার গিটে হাত লেগে যায়।
শিরিন
চেষ্টা করেও গোঙ্গানী নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। সাফিয়াকে দিয়ে মেয়েদুটোকে একটু
দূরে পাঠিয়ে দেয় আবুলের মা। সামান্যই দূর, সেখানে কাশফুল ফোটার পায়তারা করছে, তার
আশপাশে ফড়িং ঘোরে-ফেরে, স্বাধীন।
সূর্য
সামান্য হেলে গেছে পশ্চিমে। উল্টোদিকে তাঁকিয়ে চোখ মেলা যায়, নীল রং এর নীচে সাদা
উদাসী মেঘেরা মন্ত্রনা করতে করতে ভাসে। ফ্লাস্কের পানি আবুলের মা কাপে ঢেলে দিলে
শিরিন চুমুক দেয়।
আতাউরের
বাড়ি আরো মাইল তিনেক। বারেক আগেভাগে চলে গিয়ে যদি একটা রিক্সা আনতে পারে,
নিদেনপক্ষে দু’ চারজন মানুষ। মুরাদ কোন সিদ্ধান্তে স্থির হতে পারেনা।
ব্যথায়
শাদা হয়ে ওঠা শিরিনের মুখের খিঁচুনি দেখে আবুলের মা তড়িঘড়ি একটা শাড়ি বের করে ঘের
দিয়ে দিতে বলে মুরাদকে। বারেক ছুটে দৌঁড়ে ডালপালা জোগাড় করে। জড়িপাড় গোলাপী শাড়ির আলতো ছায়া শিরিনের মুখের
ওপর, কাপড়ের পুটলির ওপর তার মাথা। মুরাদ তার জরায়ু ভেদ করে আরো গোলাপী ক্ষুদ্রকায়
পায়ের পাতার আভাস দেখতে পায়। দু’সন্তানের বাবা মুরাদ হয়েছে বটে, তার সবটুকু
দুঃশ্চিন্তা ভাগ করে নেয়ার মানুষ সব সময়ই পাশে ছিল, শিরিনের মা বাবা, তার নিজের
মা। এবার সে একদম একা। দুঃশ্চিন্তা ছাপিয়ে বুকের মধ্যে সদ্য জন্মানো আতংক ঝেড়ে
ফেলে দিতে চায় সে। শিরিনের বন্ধ চোখ, নিশ্চিন্তে নিজেকে কারো ভরসায় ছেড়ে দিয়েছে।
বিস্তীর্ণ
প্রান্তরের দিকে হতবিহবল মুরাদ চেয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। অতিদ্রুত ডাক্তারী চিকিৎসা
দরকার। নিদেনপক্ষে একজন পেশাদার ধাত্রী। কোনদিকে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী?
রহিমানপুরে? নাকি ঠাকুরগাও থানা শহরে? সেখানে অন্তত হাসপাতাল আছে। ডাক্তার কি
পাওয়া যাবে! নাকি তারা ফিরে যাবে চিনিকলের মেডিক্যাল সেন্টারে, অন্তত কিছু
ডাক্তারী যন্ত্রপাতি থাকবে সেখানে! আতাউরের তো এতক্ষণে ফিরে আসার কথা ছিল, ছেলেটা
অক্ষত আছে তো? আতংকের বেগ জেতেজুতে বাক্সে ভরার মত দমিয়ে রাখে মুরাদ। কোনদিকে
যাবে? নদীর ওপারে চিনিকলের গন্তব্যে? নাকি আরো মাইল তিনেক ভেতরে ঘোর গ্রামে?
শাড়ির
ঘেরের গোলাপী ছায়ায় মুহূর্তের জন্য শিরিন মুর্ছা যায়, আবার ব্যথায় জেগে ওঠে। রোদের
তেজ কমতে গিয়েও কমে না, থার্মোমিটারের পারদের মত থির থির কেঁপে পা ছড়িয়ে বসে থাকে
পুরো নদীর পার জুড়ে, যেন সরবে না, রাত্রি নেমে এলেও না।
লেখক পরিচিত পরিচিতি
নাহার মনিকাজন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গে। পড়াশুনা ঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ত্রপিক্যাল মেডিসিন।
বর্তমান নিবাস : কানাডা।
গল্পগ্রন্থ : পৃষ্ঠাগুলি নিজের।
কাব্যগ্রন্থ : চাঁদপুরে আমাদের বরষা ছিল।


1 মন্তব্যসমূহ
onek valo akta Golpo...khub valo laglo..
উত্তরমুছুন