বাংলা বারো মাসের নাম এক নিশ্বাসে বলে ফেলতে পারলেও জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়,আমি নিশ্চিত, পহেলা বৈশাখ ছাড়া আর কোনটাই আপনি সঠিকভাবে বলতে পারবেন না । বুকে হাত দিয়ে বলুন,পারবেন? তাও পারতেন না যদি চৌদ্দ আর পনের এপ্রিলের ঝামেলাটা অনেক ঝুট-ঝামেলার পর ওইভাবে মিটিয়ে ফেলা হতো। মিটিয়ে ফেলাতে ভালোই হয়েছে। বাঙ্গালিত্ব প্রমাণের ন্যূনতম ট্রিকটা আপনার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে না বলে জিবের আগায় সদা প্রস্তুত আছে বলা যায়। অনায়াসে।
তবে আমি আপনার থেকে এক ধাপ এগিয়ে আছি। না, বলছি না যে আমি বলতে পারবো ইংরেজি প্রতি মাসের মাঝামাঝি ঠিক কোন তারিখে (চৌদ্দ, পনের নাকি ষোল) বাংলা মাসগুলোর একেকটার প্রথমদিন শুরু হয়। অনেকবার খাতা-কলম ব্যবহার করে মুখে-মগজে মুখস্থ করতে চেয়েছি। সফলতা ধরা দেয়নি বুড়ো মস্তিষ্কের ‘গ্রে সেলগুলো’ তাদের কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেনি বলে। তা বলে হাল ছেড়ে দিইনিএকেবারে। বাঙ্গাল হয়ে জন্মেছি, অথচ বারটা বাংলা মাসের দিনক্ষণ বলতে পারবোনা—এটা কোন কাজের কথা না, মশায়। নিজেকেই বলি। আর তার সামান্য চেষ্টা হিসেবে আমি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের জন্য নির্ধারিত জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখটাভালো করে জেনে নিয়েছি। তাই আমার আশপাশের সবাই যখন জ্যৈষ্ঠের গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে বলতে থাকে, কবে যে বৃষ্টি নামবে,আর কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘায়িত করে এই ভেবে,কবে যে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটা কেউ গুনগুনিয়ে উঠবে, আমি তখন খানিকটা ভাব দেখিয়ে বলি, ক্ষান্ত দিন,জনাবে আলা,জুনের পনের তারিখটা তো আগে আসতে দিন। তারপর না হয় ওইসব গান-বাজনার আসর-টাসর বসানো যাবে...
আজ আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন এখানে এই ব্রাসেলসে। সকালে অফিসে আসবার সময় দেখেছি,আবহাওয়া ভীষণ মনমরা। ডিজমাল ওয়েদার অ্যাট ইটস পিনাকল। এ অবশ্য এ শহরের জন্য নতুন কিছু না। পারলে সারাক্ষণই মুখ বেজার করে রাখে। ধনীর দুলালীর আদুরেপনা আর কি ! একটা সময় এমন ঝিরঝির ধারায় বৃষ্টি ঝরতে লাগলো যে সেই একহারা বৃষ্টি-ঝরা দেখতে অফিস-রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। আর নির্নিমেষে এই বারি-পতন দেখতে দেখতে এক সাথে কত যে কথা এই বেচারির মনে পড়ে গেলো ! মনের জানালার আবছা ক্রুশ-কাটা পর্দায় ভেসে উঠলো কিছু মনে থাকা-বেশিরভাগ ভুলে যাওয়া মানুষের মুখ-নাম-পরিচয়, আর কত কত জায়গার ছবি যেখানে আমি কোন এক হারিয়ে ফেলা সময়ে রেখে এসেছি আমার পায়ের নরম-কঠিন চিহ্নসকল। সেই জায়গাগুলো আরও অনেক কিছুর সাথে মিশে গেছে রূপসা নদীর ঢেউ হয়ে, সান্তাহার স্টেশনের ট্রেন লাইনের সমান্তরালে, কোন এক সবুজ ধান খেতের আইল ধরে, আরেক নাম-না-জানা গোরস্থানের (গোরস্থানের কি বিশেষ কোন নাম থাকে?) ভেতর গজিয়ে ওঠা রহস্যময়ী সূর্যমুখী গাছটার সবুজ পাতায়-পাতায়, বিটিভির নাটক দেখার আনন্দ-আয়োজনে আর এরকম অসংখ্য সাদাকালো ছবি-ভর্তি অ্যালবামের মাঝে থেকে যখনতখন ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়ার ঘোর অন্ধকারে!
যাক, থাক ওসব মন-উচাটন আকুলি-বিকুলিপনা। বরং ফিরে আসি আজ আষাঢ়স্য তৃতীয় দিবসে। ব্রাসেলসের বর্ষা-স্নাত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সঙ্গীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো-আরে,এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন ! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে। বলতেই হচ্ছে, স্থান-কাল ভেদে বৃষ্টি তার নিজস্ব চরিত্র ধারণ করে। আমি এমনটাই দেখেছি। আপনিও দেখেছেন। মনে করার চেষ্টা করে দেখুন। আচ্ছা, মনে করুন,লন্ডন-এর ছিপছিপা বৃষ্টির কথা। সেখানকার বৃষ্টির এমন বিশ্রী চেহারা যে কাব্য করা আর সাহিত্য সাধনা দূরে থাক,বিরক্তিতে রীতিমত আপনার হাত কামড়াতে ইচ্ছা করবে আমার মতন। আমি জানি, কারণ আমার এমনটা হয়েছে। দু’একবার হাত নয় অবশ্য, আঙ্গুল কামড়েছি,অসহ্য বিরক্তিতে ত্যক্ত হয়ে---কিছু করার নাই,কোথাও যাওয়ার নাই---শুধু জানালার পাশে বসে নীরবে বৃষ্টির পতন দেখে যাওয়া---এমন তার শ্রী তাকে না যায় ধরা না যায় ছোঁয়া।
অথচ আমার একজন প্রিয় কলাম লেখক-সাংবাদিক ভাই বেশ আয়েশ করে বলেন, আমার এই ব্লিক এন্ড বিষণ্ণ ওয়েদারই ভালো লাগেভীষণ। কেমন একটা মনমরা মগ্নতায় অবশ হয়ে থাকেচারপাশের সবকিছু। এরকমই আমার ভালো লাগে। আরও ভালো লাগে এমন অদ্ভুত মিসটেরিয়াস মেলানকলি মোমেন্টসে এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি হাতে নিয়ে জানালার পাশে রকিং চেয়ারটায় বসে বাইরে অন্ধকারে অপলক তাকিয়ে থাকতে। ব্যাপারটা একবার তোমার কল্পনার ক্যানভাসে তুলে নাও,দেখবে কেমন এক ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে তোমার সারাটা মনোজগৎ !
আপনি এত সুন্দর ইংরেজি লেখেন, আর এখন দেখছি , না মানে শুনছি, বাংলাতেও কম যান না...আমার কথা শুনে তার বিদগ্ধ কপাল সামান্য কুঁচকে গেলো। যদিও মুখের স্মিত হাসিটি অমলিন।
হুম, তুমি একবার ওই দৃশ্যপটটা ক্যানভাসে তুলে নাও, তোমার মনের ক্যানভাসে, ইজেলটা বাম হাতে শক্ত করে ধরে এবার আঁকতে থাকো যা যা তোমার ভাবতে ইচ্ছা করে। প্রায় সময় এমন বৃষ্টি-ধোয়া মেঘলা দিনে আমার ভেতরে একরকম তোলপাড় হয়---নীরব শব্দহীন সে তোলপাড়-অথচ আমার ভেতরটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে যায় ! আচ্ছা, বলতো, এটা কি আমার কোন রোম্যান্টিক ভাবালুতা ? তোমার ভাবির এমন অভিযোগ প্রায় শুনতে হয় আমাকে। কিন্তু কি জানো, বৃষ্টি-ছোঁয়া একেকটা অন্ধকার দিন আমাকে যে কি ভীষণ ভালো লাগায় মোহমুগ্ধ করে রাখে ! ইন ফ্যাক্ট, যে এটার অনুভবের ভেতর দিয়ে না গেছে, তাকে ঠিক কথার মারপ্যাঁচে তা কখনোই বোঝানো সম্ভব না...আর সেরকম একটা কবি-মনও থাকতে হয়, কি বল ?
প্রশ্নের মতো কিছু একটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সাংবাদিক ভাই কেমন এক ঘোরলাগা ভাবনায় চুপ মেরে গেলেন, সম্ভবত আরও কিছু বলবার আশায়। আর আমি এটাও জানি, তিনি আমার কাছ থেকে কোন উত্তর শুনতে চাননি। যেহেতু আমার মত ধৈর্যশীল শ্রোতা সবসময় তার কাছে আসেনা, তিনি তাই তার মনের আগলটাই আজ খুলে দিয়েছেন আমার সামনে । কেননা, কোন এক কথার ফাঁকে তিনি একবার বলে উঠেছিলেন, সবাই তো কেবল নিজের কথা বলতে চায়। শোনার লোকের সংখ্যা হাতে গোনা। কেমন একটা প্যারাডক্স, দেখো! আমাদের দুটা কান আর একটা মুখ,অথচ এগুলোর ব্যবহার ঠিক বিপরীত সূত্র মেনে।
কিন্তু আমার ধৈর্যও একসময় বিদ্রোহ করতে চায়। মনে মনে বলি-আপনিও তো কম যাচ্ছেন না। যে বিষয়ের সমালোচনা করছেন, সেই একি দোষে আপনি নিজেও দুষ্ট। আমাদের সমস্যাটা তো এখানেই। আমার এই সত্যি কথাগুলো তাকে বলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমার বরাবরের যে চেপে যাওয়া স্বভাব, আমি চুপ করে থাকি। ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করেন।
তুমি আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছ না তো? স্যরি,এই বৃষ্টি-ভাবালুতায় এমনভাবে পেয়ে বসলো আর তোমার মতো এমন একজন মনোযোগী নীরব শ্রোতা পেয়ে গেলাম যে চারপাশের সবকিছুই যেন ভুলে গেলাম। আচ্ছা, বাদ দাও। এবার তোমার কথা বল। তোমার টেক্সট করা ওই কবিতাটা কিন্তু আমার এখনও বেশ মনে আছে।মনে পড়ছে না? যেখানে তুমি এক ঘন বর্ষণের রাতে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে গেলে আর ওই সময় তোমার অস্তিত্বটাকে তুলনা করতে চাইলে গর্তে আটকা পড়ে যাওয়া একটা ইঁদুরের সাথে যে বের হবার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছেনা। ফ্যান্টাস্টিক! অসাধারণ! তুমি কবিতাটা চালিয়ে যাও, ঠিক আছে?
তার কথা কিছুতেই শেষ হতে চায়না। আমাকে কিছু বলবার জন্য বারবার বললেও আমি কিছুতেই তার কাছ থেকে সেই মওকা আদায় করতে পারিনা। নিজেকে আমার সত্যি সত্যি তখন ওই ইঁদুরটার মতো অসহায় লাগে। আমি একটু পিটপিট করে তার দিকে তাকাই-আমাকে একটু বলবার সুযোগ দিন আর না হলে বিদায় বলে যাই? অথচ আমারও বলবার ছিল,আমি নিজেও বৃষ্টি–কাতর একজন মানুষ। আর বৃষ্টি বা বর্ষাকে রোমান্টিকতার চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে গিয়েছেন যে কবিগুরু তার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমি হঠাৎ করে অসহিষ্ণু হয়ে উঠি। যেন আমি ভীষণই বিরক্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত এই বর্ষা-বয়নে। চটজলদি হুমায়ূন আহমেদের কথাও আমার মনে পড়ে যায়। আরও অনেক কিছুই মনে পড়ে যায়। তেইশ বছর আগে কোন এক বিভাগীয় শহরে ঝুম বৃষ্টি নামা জুন মাসের এক দুপুরের কথা। কলেজ-পোস্ট অফিসের এক চিলতে বারান্দায় গাদাগাদি করে দাঁড়ানো অনেক ছেলে-মেয়ের ভিড়ে শুধু একজনকেই ভালো লেগে যাওয়া আর বৃষ্টি শেষ হওয়া মাত্র ভেজা বাতাসেরসুরভির সাথে তার উধাও হয়ে যাওয়া। পেছনে ফেলে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাসের মেঘ-মল্লার।
যা হোক, বর্ষা-বন্দনায় সংক্রামিত আমার নিজেকে আমি সামলেনিলাম আর বরষণ-স্নাত বিষণ্ণ আবহাওয়ার মাঝেসকল আনন্দ খুঁজে পাওয়া সাংবাদিক ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো। কারণ তিনি পরম মমতায় আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফির সুচতুর প্রলোভন। অবিকল তার বর্ণনার মতন। নিজ হাতে কফি মেশিন থেকে বানানো সেই কফির মন এলোমেলো করা সুবাস আমার নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। আর আমি কিছুতেই এই ট্যানটালাইজিংটেম্পটেশন থেকে আমাকে রক্ষা করার সহজলভ্য কোন উপায় খুঁজে পাইনা। নিজেকে এ সময় মমের লাঞ্চন গল্পের সেই অমানানসই চরিত্রটির মতো মনে হয়, যাকে এক অজ্ঞাত কারণে কখনই আমার নায়িকা বলতে ইচ্ছা হয়না।
একবারে আমার কেবল এক মাগ কফিই ভালো লাগে...ভাই। এর সাথে আর অন্য কিছু না। না বিস্কিট, না বাদাম। আমার একটু ঢং করে বলতে সাধ হয় যখন দেখি সাংবাদিক ভাই উপুর হয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে তার ফুড স্টকে আমাকে অফার করার মতো কিছু আছে কিনা তা খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি মুখে যদিও কিছুই বলিনা, কিন্তু তিনি আমার মনোভাব পড়ে ফেলেন এবং আবার সোজা হয়ে বসে তার লম্বা মাগটা হাত বাড়িয়ে টেনে নেন।
দেখো, ওই মেঘ-মেদুরকাল-নীলাভ শান্ত আকাশটার দিকে তাকাও আর তোমার সম্পূর্ণ দৃষ্টিটা মেলে দিয়ে ভাবতে চেষ্টা কর ছোপ ছোপ কালি ছিটানো নীল রঙে ডোবানো মেঘগুলো একেকটা কিসব কবিতা বলে যায়...কিসব কবিতা...
আহ,মরি,মরি...সাংবাদিক ভাইয়ের অফিসে এসেছিলাম কুশল বিনিময়ের ছুতায় দুমাস আগে জমা দেওয়া আমার লেখাটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে। এখন বৃষ্টি-শিকলে আটকা পড়ে কি করি-কোথায় পালাই অবস্থা। তিনি আমার মনের হাল বোঝার ধারেকাছেও যেতে চাইলেন না।।তার মতো করে বলে যাচ্ছিলেন যা যা তার মনের রাস্তায় মিছিল করে আসছিল প্রজাপতি-রঙ্গিন অথবা দাবার বোর্ডেরসাদাকালো ছক আঁকা জ্যামিতিক রেখার ছাতা মাথায়...
আমি শুনছিলাম, আর শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম দেবো নাকি একবার মনের পাখনাটা মেলে ? ওই যে ব্রাসেলসের কর্মস্থলে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে যেমন যেমন বৃষ্টি ভাবনা এসে মনের জানালায় ভিড় করে সেসব আনন্দের বর্ণমালা...কিছুটা শেয়ার করি তার সাথে, যদি সুযোগ পাই। হয়তো ভালোই লাগবে তার। হয়তো না। তারপরও বলি। এই মনোটোনাস মনোলগের মিজারি থেকে অ্যাট লিস্ট মুক্তি পাওয়া দরকার...
আমি এপাশ ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ করে তাকাই আর আমার আচরণ যেন হঠাৎ কেমন এক অদ্ভুত চেহারা ধারণ করে! জানিনা কেন, ব্রাসেলসের বিরহী আকাশের সময়ে-অসময়ে মুখ কালো করে কান্না-ঝরান বৃষ্টির উপর একপ্রস্থ রাগ এসে জমা হয় আর আমি বলতে থাকি, হয়তো মনে মনে, অথচ দেখুন, আমাদের দেশের বৃষ্টি দেখুন----কেমন মনকাড়া ভঙ্গিমায় সমস্ত চরাচর জুড়ে মোহনীয় মায়া ছড়িয়ে ঝলমলে রিমঝিম করতে করতে ছলাত ছলাত করতে করতে কলকল টলমল করতে করতে তার রাজসিক আগমন। দুকুল ছাপিয়ে নিজে তো নীপবনে নৃত্য করবেই,সাথে আপনাকেও নাচিয়ে ছাড়বে---সোনার চাঁদবদনী তুমি নাচো তো দেখি ! সেই বৃষ্টি- সঙ্গীতের মাঝে মাঝে যদি আবার গুরুগম্ভীর মেঘ-রাজ ডেকে ওঠেন,বাজিয়ে দেন বজ্রস্বরে তার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ-নিনাদ,তাহলে আপনার বর্ষা-উদযাপন সম্পূর্ণ হলো ষোল কলায়।
আর ইউরোপের বৃষ্টির এমন হাস্যকর একই সাথে বিরক্তি-উৎপাদক চেহারা যে আপনি তা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাতে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। যাবেন না, বলছেন? যখন বৃষ্টির বদলে আপনার মাথায় পাতা ছাতার উপর একরাশ ঘ্যানঘ্যানান অসহ্যপনা ঝরে পরবে আর শরীরে এক ধরনের ব্যাখ্যাতীত চিটচিটে অনুভূতির অস্তিত্ব টের পাবেন, তখনই বুঝতে পারবেন ইউরোপের বৃষ্টি-বেদন কতটা ...যাহ্ আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আর এমন যে এমন, কোন শব্দ নেই, কোন আওয়াজ নেই---শুধু ঝরছে আর ঝরছে আর ঝরছে। আপনি তাকে দিব্য চোখে দেখছেন,আপনার পরনের কাপরও অল্পস্বল্প ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সে যে এসেছিল তার চিহ্নস্বরূপ, অথচ কুহেলি মরীচিকার মত থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কোন বৃষ্টি হল যদি তারে আপনার মতো করে কাছে না পেলাম?
আজ অবশ্য ব্রাসেলস-এর বৃষ্টি সামান্য ভেল্কি দেখাল।না,ঠিক, দেখাল না, শোনাল। মুহূর্তের জন্য কিছু একটা শুনিয়ে দিল---ওই ধরুন গিয়ে ইউরোপিয়ান মেঘের ডাক। খুবই ভদ্র কায়দায়,পাছে কেউ যাতে শুনে না ফেলে এমন ভাবে! আমিও শুনতে পেতাম না যদি আমার কান অমন খাড়া না থাকত। আমি তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এই ইউরোপিয়ান বৃষ্টির ভেলকিবাজি দেখছিলাম একটু সতর্ক চোখ-কান মেলে-খুলে। দেখতে চেয়েছিলাম নতুন করে,আমাদের বর্ষার যাদুময় সৌন্দর্যের কাছে তা ঘেঁষতে পারে কিনা । পারবে না,কখনোই না। প্রশ্নই আসেনা। তবে এর আগে আর এক দিন ওই ডাক শুনেছিলাম বেশ ভয়ঙ্করভাবেই। এখানে আসার পর সেবারই প্রথম এমনটা হল। বেশ চমকে উঠেছিলাম দফায় দফায় ওরকম গর্জন শুনে।আসলে এখানে এই ব্রাসেলসেবৃষ্টির একটানা নিরানন্দ নিঃশব্দ ধারাবাহিক পতন দেখে দেখে চোখ যতটা সয়ে গেছে,অমন হুঙ্কার শুনে তো এই বেচারা কান-জোড়া অভ্যস্ত নয়। সে কারণেই ওরকম হতভম্ব দশা। শুধু আমার না, যাদের সাথেই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছি, যারা অর্থাৎ আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকা দেশি ভাই-ব্রাদার, প্রত্যেকেই একই কথা বলেছে। বুঝতে পারছেন তো,এই বৈদেশেও আমরা বৃষ্টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করার অবকাশ পাই।
আর বৃষ্টি-বিলাসী আমার প্রিয় সাংবাদিক ভাই কোথায় গেলেন,জানেন? কফি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম কদিন আগে এক নিশ্বাসে পড়ে শেষ করা মমের অসাধারণ রেইন গল্পটার কথা। কিছু তর্কবিতর্কের সুযোগ ছিল। সাবডিউড প্যাশন আর উচ্চকিত নৈতিকতা নিয়ে একটা দারুণ আড্ডার সূচনা হতে পারতো। তারপর তা বেড়ে প্রসারিত হতো ইমেইল আর টেক্সট মেসেজে... ইশ, এমন একটা জমজমাট সাহিত্যিক আসর শুরু করেও শেষ করতে পারলামনা। মনে হল, মনে হল এর জন্য ওই বৃষ্টিটাই দায়ি। কারণ তা আমাকে এমনভাবে ভিজিয়ে দিয়েছিল যে সাংবাদিক ভাইয়ের সামনে ভদ্র-সভ্যভাবে বসে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিল। আমার ভীষণ আড়ষ্ট লাগছিল যে ! আর তাছাড়া মিস থম্পসনের মতো এত দুর্বিনীত দুঃসাহসের বর্ষণও আমার উপর কখনও ঝরে পরেনি। আমি যে আমার মধ্যে গুটিয়ে থাকা এক চিরকালের শুঁয়োপোকা যে কেবল একছিটে বৃষ্টির আলতো পরশেই মিইয়ে যায়, চুপসে যায়...তা না হলে হয়তো...
*******
লেখক পরিচিতি
মালেকা পারভীন
বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তা। বর্তমানে ব্রাসেলস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত।
মূলত ছোট গল্প লিখে থাকেন। কবিতাও তার আরেক ভালোবাসা। বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকী ও পত্রিকা এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখে থাকেন।
প্রথম গল্পগ্রন্থঃ সিদ্ধান্ত(২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিবইমেলায় জাগৃতি প্রকাশনী থেকেপ্র কাশিত)
তবে আমি আপনার থেকে এক ধাপ এগিয়ে আছি। না, বলছি না যে আমি বলতে পারবো ইংরেজি প্রতি মাসের মাঝামাঝি ঠিক কোন তারিখে (চৌদ্দ, পনের নাকি ষোল) বাংলা মাসগুলোর একেকটার প্রথমদিন শুরু হয়। অনেকবার খাতা-কলম ব্যবহার করে মুখে-মগজে মুখস্থ করতে চেয়েছি। সফলতা ধরা দেয়নি বুড়ো মস্তিষ্কের ‘গ্রে সেলগুলো’ তাদের কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেনি বলে। তা বলে হাল ছেড়ে দিইনিএকেবারে। বাঙ্গাল হয়ে জন্মেছি, অথচ বারটা বাংলা মাসের দিনক্ষণ বলতে পারবোনা—এটা কোন কাজের কথা না, মশায়। নিজেকেই বলি। আর তার সামান্য চেষ্টা হিসেবে আমি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের জন্য নির্ধারিত জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখটাভালো করে জেনে নিয়েছি। তাই আমার আশপাশের সবাই যখন জ্যৈষ্ঠের গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে বলতে থাকে, কবে যে বৃষ্টি নামবে,আর কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘায়িত করে এই ভেবে,কবে যে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটা কেউ গুনগুনিয়ে উঠবে, আমি তখন খানিকটা ভাব দেখিয়ে বলি, ক্ষান্ত দিন,জনাবে আলা,জুনের পনের তারিখটা তো আগে আসতে দিন। তারপর না হয় ওইসব গান-বাজনার আসর-টাসর বসানো যাবে...
আজ আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন এখানে এই ব্রাসেলসে। সকালে অফিসে আসবার সময় দেখেছি,আবহাওয়া ভীষণ মনমরা। ডিজমাল ওয়েদার অ্যাট ইটস পিনাকল। এ অবশ্য এ শহরের জন্য নতুন কিছু না। পারলে সারাক্ষণই মুখ বেজার করে রাখে। ধনীর দুলালীর আদুরেপনা আর কি ! একটা সময় এমন ঝিরঝির ধারায় বৃষ্টি ঝরতে লাগলো যে সেই একহারা বৃষ্টি-ঝরা দেখতে অফিস-রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। আর নির্নিমেষে এই বারি-পতন দেখতে দেখতে এক সাথে কত যে কথা এই বেচারির মনে পড়ে গেলো ! মনের জানালার আবছা ক্রুশ-কাটা পর্দায় ভেসে উঠলো কিছু মনে থাকা-বেশিরভাগ ভুলে যাওয়া মানুষের মুখ-নাম-পরিচয়, আর কত কত জায়গার ছবি যেখানে আমি কোন এক হারিয়ে ফেলা সময়ে রেখে এসেছি আমার পায়ের নরম-কঠিন চিহ্নসকল। সেই জায়গাগুলো আরও অনেক কিছুর সাথে মিশে গেছে রূপসা নদীর ঢেউ হয়ে, সান্তাহার স্টেশনের ট্রেন লাইনের সমান্তরালে, কোন এক সবুজ ধান খেতের আইল ধরে, আরেক নাম-না-জানা গোরস্থানের (গোরস্থানের কি বিশেষ কোন নাম থাকে?) ভেতর গজিয়ে ওঠা রহস্যময়ী সূর্যমুখী গাছটার সবুজ পাতায়-পাতায়, বিটিভির নাটক দেখার আনন্দ-আয়োজনে আর এরকম অসংখ্য সাদাকালো ছবি-ভর্তি অ্যালবামের মাঝে থেকে যখনতখন ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়ার ঘোর অন্ধকারে!
যাক, থাক ওসব মন-উচাটন আকুলি-বিকুলিপনা। বরং ফিরে আসি আজ আষাঢ়স্য তৃতীয় দিবসে। ব্রাসেলসের বর্ষা-স্নাত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সঙ্গীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো-আরে,এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন ! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে। বলতেই হচ্ছে, স্থান-কাল ভেদে বৃষ্টি তার নিজস্ব চরিত্র ধারণ করে। আমি এমনটাই দেখেছি। আপনিও দেখেছেন। মনে করার চেষ্টা করে দেখুন। আচ্ছা, মনে করুন,লন্ডন-এর ছিপছিপা বৃষ্টির কথা। সেখানকার বৃষ্টির এমন বিশ্রী চেহারা যে কাব্য করা আর সাহিত্য সাধনা দূরে থাক,বিরক্তিতে রীতিমত আপনার হাত কামড়াতে ইচ্ছা করবে আমার মতন। আমি জানি, কারণ আমার এমনটা হয়েছে। দু’একবার হাত নয় অবশ্য, আঙ্গুল কামড়েছি,অসহ্য বিরক্তিতে ত্যক্ত হয়ে---কিছু করার নাই,কোথাও যাওয়ার নাই---শুধু জানালার পাশে বসে নীরবে বৃষ্টির পতন দেখে যাওয়া---এমন তার শ্রী তাকে না যায় ধরা না যায় ছোঁয়া।
অথচ আমার একজন প্রিয় কলাম লেখক-সাংবাদিক ভাই বেশ আয়েশ করে বলেন, আমার এই ব্লিক এন্ড বিষণ্ণ ওয়েদারই ভালো লাগেভীষণ। কেমন একটা মনমরা মগ্নতায় অবশ হয়ে থাকেচারপাশের সবকিছু। এরকমই আমার ভালো লাগে। আরও ভালো লাগে এমন অদ্ভুত মিসটেরিয়াস মেলানকলি মোমেন্টসে এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি হাতে নিয়ে জানালার পাশে রকিং চেয়ারটায় বসে বাইরে অন্ধকারে অপলক তাকিয়ে থাকতে। ব্যাপারটা একবার তোমার কল্পনার ক্যানভাসে তুলে নাও,দেখবে কেমন এক ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে তোমার সারাটা মনোজগৎ !
আপনি এত সুন্দর ইংরেজি লেখেন, আর এখন দেখছি , না মানে শুনছি, বাংলাতেও কম যান না...আমার কথা শুনে তার বিদগ্ধ কপাল সামান্য কুঁচকে গেলো। যদিও মুখের স্মিত হাসিটি অমলিন।
হুম, তুমি একবার ওই দৃশ্যপটটা ক্যানভাসে তুলে নাও, তোমার মনের ক্যানভাসে, ইজেলটা বাম হাতে শক্ত করে ধরে এবার আঁকতে থাকো যা যা তোমার ভাবতে ইচ্ছা করে। প্রায় সময় এমন বৃষ্টি-ধোয়া মেঘলা দিনে আমার ভেতরে একরকম তোলপাড় হয়---নীরব শব্দহীন সে তোলপাড়-অথচ আমার ভেতরটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে যায় ! আচ্ছা, বলতো, এটা কি আমার কোন রোম্যান্টিক ভাবালুতা ? তোমার ভাবির এমন অভিযোগ প্রায় শুনতে হয় আমাকে। কিন্তু কি জানো, বৃষ্টি-ছোঁয়া একেকটা অন্ধকার দিন আমাকে যে কি ভীষণ ভালো লাগায় মোহমুগ্ধ করে রাখে ! ইন ফ্যাক্ট, যে এটার অনুভবের ভেতর দিয়ে না গেছে, তাকে ঠিক কথার মারপ্যাঁচে তা কখনোই বোঝানো সম্ভব না...আর সেরকম একটা কবি-মনও থাকতে হয়, কি বল ?
প্রশ্নের মতো কিছু একটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সাংবাদিক ভাই কেমন এক ঘোরলাগা ভাবনায় চুপ মেরে গেলেন, সম্ভবত আরও কিছু বলবার আশায়। আর আমি এটাও জানি, তিনি আমার কাছ থেকে কোন উত্তর শুনতে চাননি। যেহেতু আমার মত ধৈর্যশীল শ্রোতা সবসময় তার কাছে আসেনা, তিনি তাই তার মনের আগলটাই আজ খুলে দিয়েছেন আমার সামনে । কেননা, কোন এক কথার ফাঁকে তিনি একবার বলে উঠেছিলেন, সবাই তো কেবল নিজের কথা বলতে চায়। শোনার লোকের সংখ্যা হাতে গোনা। কেমন একটা প্যারাডক্স, দেখো! আমাদের দুটা কান আর একটা মুখ,অথচ এগুলোর ব্যবহার ঠিক বিপরীত সূত্র মেনে।
কিন্তু আমার ধৈর্যও একসময় বিদ্রোহ করতে চায়। মনে মনে বলি-আপনিও তো কম যাচ্ছেন না। যে বিষয়ের সমালোচনা করছেন, সেই একি দোষে আপনি নিজেও দুষ্ট। আমাদের সমস্যাটা তো এখানেই। আমার এই সত্যি কথাগুলো তাকে বলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমার বরাবরের যে চেপে যাওয়া স্বভাব, আমি চুপ করে থাকি। ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করেন।
তুমি আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছ না তো? স্যরি,এই বৃষ্টি-ভাবালুতায় এমনভাবে পেয়ে বসলো আর তোমার মতো এমন একজন মনোযোগী নীরব শ্রোতা পেয়ে গেলাম যে চারপাশের সবকিছুই যেন ভুলে গেলাম। আচ্ছা, বাদ দাও। এবার তোমার কথা বল। তোমার টেক্সট করা ওই কবিতাটা কিন্তু আমার এখনও বেশ মনে আছে।মনে পড়ছে না? যেখানে তুমি এক ঘন বর্ষণের রাতে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে গেলে আর ওই সময় তোমার অস্তিত্বটাকে তুলনা করতে চাইলে গর্তে আটকা পড়ে যাওয়া একটা ইঁদুরের সাথে যে বের হবার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছেনা। ফ্যান্টাস্টিক! অসাধারণ! তুমি কবিতাটা চালিয়ে যাও, ঠিক আছে?
তার কথা কিছুতেই শেষ হতে চায়না। আমাকে কিছু বলবার জন্য বারবার বললেও আমি কিছুতেই তার কাছ থেকে সেই মওকা আদায় করতে পারিনা। নিজেকে আমার সত্যি সত্যি তখন ওই ইঁদুরটার মতো অসহায় লাগে। আমি একটু পিটপিট করে তার দিকে তাকাই-আমাকে একটু বলবার সুযোগ দিন আর না হলে বিদায় বলে যাই? অথচ আমারও বলবার ছিল,আমি নিজেও বৃষ্টি–কাতর একজন মানুষ। আর বৃষ্টি বা বর্ষাকে রোমান্টিকতার চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে গিয়েছেন যে কবিগুরু তার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমি হঠাৎ করে অসহিষ্ণু হয়ে উঠি। যেন আমি ভীষণই বিরক্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত এই বর্ষা-বয়নে। চটজলদি হুমায়ূন আহমেদের কথাও আমার মনে পড়ে যায়। আরও অনেক কিছুই মনে পড়ে যায়। তেইশ বছর আগে কোন এক বিভাগীয় শহরে ঝুম বৃষ্টি নামা জুন মাসের এক দুপুরের কথা। কলেজ-পোস্ট অফিসের এক চিলতে বারান্দায় গাদাগাদি করে দাঁড়ানো অনেক ছেলে-মেয়ের ভিড়ে শুধু একজনকেই ভালো লেগে যাওয়া আর বৃষ্টি শেষ হওয়া মাত্র ভেজা বাতাসেরসুরভির সাথে তার উধাও হয়ে যাওয়া। পেছনে ফেলে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাসের মেঘ-মল্লার।
যা হোক, বর্ষা-বন্দনায় সংক্রামিত আমার নিজেকে আমি সামলেনিলাম আর বরষণ-স্নাত বিষণ্ণ আবহাওয়ার মাঝেসকল আনন্দ খুঁজে পাওয়া সাংবাদিক ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো। কারণ তিনি পরম মমতায় আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফির সুচতুর প্রলোভন। অবিকল তার বর্ণনার মতন। নিজ হাতে কফি মেশিন থেকে বানানো সেই কফির মন এলোমেলো করা সুবাস আমার নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। আর আমি কিছুতেই এই ট্যানটালাইজিংটেম্পটেশন থেকে আমাকে রক্ষা করার সহজলভ্য কোন উপায় খুঁজে পাইনা। নিজেকে এ সময় মমের লাঞ্চন গল্পের সেই অমানানসই চরিত্রটির মতো মনে হয়, যাকে এক অজ্ঞাত কারণে কখনই আমার নায়িকা বলতে ইচ্ছা হয়না।
একবারে আমার কেবল এক মাগ কফিই ভালো লাগে...ভাই। এর সাথে আর অন্য কিছু না। না বিস্কিট, না বাদাম। আমার একটু ঢং করে বলতে সাধ হয় যখন দেখি সাংবাদিক ভাই উপুর হয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে তার ফুড স্টকে আমাকে অফার করার মতো কিছু আছে কিনা তা খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি মুখে যদিও কিছুই বলিনা, কিন্তু তিনি আমার মনোভাব পড়ে ফেলেন এবং আবার সোজা হয়ে বসে তার লম্বা মাগটা হাত বাড়িয়ে টেনে নেন।
দেখো, ওই মেঘ-মেদুরকাল-নীলাভ শান্ত আকাশটার দিকে তাকাও আর তোমার সম্পূর্ণ দৃষ্টিটা মেলে দিয়ে ভাবতে চেষ্টা কর ছোপ ছোপ কালি ছিটানো নীল রঙে ডোবানো মেঘগুলো একেকটা কিসব কবিতা বলে যায়...কিসব কবিতা...
আহ,মরি,মরি...সাংবাদিক ভাইয়ের অফিসে এসেছিলাম কুশল বিনিময়ের ছুতায় দুমাস আগে জমা দেওয়া আমার লেখাটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে। এখন বৃষ্টি-শিকলে আটকা পড়ে কি করি-কোথায় পালাই অবস্থা। তিনি আমার মনের হাল বোঝার ধারেকাছেও যেতে চাইলেন না।।তার মতো করে বলে যাচ্ছিলেন যা যা তার মনের রাস্তায় মিছিল করে আসছিল প্রজাপতি-রঙ্গিন অথবা দাবার বোর্ডেরসাদাকালো ছক আঁকা জ্যামিতিক রেখার ছাতা মাথায়...
আমি শুনছিলাম, আর শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম দেবো নাকি একবার মনের পাখনাটা মেলে ? ওই যে ব্রাসেলসের কর্মস্থলে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে যেমন যেমন বৃষ্টি ভাবনা এসে মনের জানালায় ভিড় করে সেসব আনন্দের বর্ণমালা...কিছুটা শেয়ার করি তার সাথে, যদি সুযোগ পাই। হয়তো ভালোই লাগবে তার। হয়তো না। তারপরও বলি। এই মনোটোনাস মনোলগের মিজারি থেকে অ্যাট লিস্ট মুক্তি পাওয়া দরকার...
আমি এপাশ ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ করে তাকাই আর আমার আচরণ যেন হঠাৎ কেমন এক অদ্ভুত চেহারা ধারণ করে! জানিনা কেন, ব্রাসেলসের বিরহী আকাশের সময়ে-অসময়ে মুখ কালো করে কান্না-ঝরান বৃষ্টির উপর একপ্রস্থ রাগ এসে জমা হয় আর আমি বলতে থাকি, হয়তো মনে মনে, অথচ দেখুন, আমাদের দেশের বৃষ্টি দেখুন----কেমন মনকাড়া ভঙ্গিমায় সমস্ত চরাচর জুড়ে মোহনীয় মায়া ছড়িয়ে ঝলমলে রিমঝিম করতে করতে ছলাত ছলাত করতে করতে কলকল টলমল করতে করতে তার রাজসিক আগমন। দুকুল ছাপিয়ে নিজে তো নীপবনে নৃত্য করবেই,সাথে আপনাকেও নাচিয়ে ছাড়বে---সোনার চাঁদবদনী তুমি নাচো তো দেখি ! সেই বৃষ্টি- সঙ্গীতের মাঝে মাঝে যদি আবার গুরুগম্ভীর মেঘ-রাজ ডেকে ওঠেন,বাজিয়ে দেন বজ্রস্বরে তার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ-নিনাদ,তাহলে আপনার বর্ষা-উদযাপন সম্পূর্ণ হলো ষোল কলায়।
আর ইউরোপের বৃষ্টির এমন হাস্যকর একই সাথে বিরক্তি-উৎপাদক চেহারা যে আপনি তা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাতে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। যাবেন না, বলছেন? যখন বৃষ্টির বদলে আপনার মাথায় পাতা ছাতার উপর একরাশ ঘ্যানঘ্যানান অসহ্যপনা ঝরে পরবে আর শরীরে এক ধরনের ব্যাখ্যাতীত চিটচিটে অনুভূতির অস্তিত্ব টের পাবেন, তখনই বুঝতে পারবেন ইউরোপের বৃষ্টি-বেদন কতটা ...যাহ্ আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আর এমন যে এমন, কোন শব্দ নেই, কোন আওয়াজ নেই---শুধু ঝরছে আর ঝরছে আর ঝরছে। আপনি তাকে দিব্য চোখে দেখছেন,আপনার পরনের কাপরও অল্পস্বল্প ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সে যে এসেছিল তার চিহ্নস্বরূপ, অথচ কুহেলি মরীচিকার মত থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কোন বৃষ্টি হল যদি তারে আপনার মতো করে কাছে না পেলাম?
আজ অবশ্য ব্রাসেলস-এর বৃষ্টি সামান্য ভেল্কি দেখাল।না,ঠিক, দেখাল না, শোনাল। মুহূর্তের জন্য কিছু একটা শুনিয়ে দিল---ওই ধরুন গিয়ে ইউরোপিয়ান মেঘের ডাক। খুবই ভদ্র কায়দায়,পাছে কেউ যাতে শুনে না ফেলে এমন ভাবে! আমিও শুনতে পেতাম না যদি আমার কান অমন খাড়া না থাকত। আমি তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এই ইউরোপিয়ান বৃষ্টির ভেলকিবাজি দেখছিলাম একটু সতর্ক চোখ-কান মেলে-খুলে। দেখতে চেয়েছিলাম নতুন করে,আমাদের বর্ষার যাদুময় সৌন্দর্যের কাছে তা ঘেঁষতে পারে কিনা । পারবে না,কখনোই না। প্রশ্নই আসেনা। তবে এর আগে আর এক দিন ওই ডাক শুনেছিলাম বেশ ভয়ঙ্করভাবেই। এখানে আসার পর সেবারই প্রথম এমনটা হল। বেশ চমকে উঠেছিলাম দফায় দফায় ওরকম গর্জন শুনে।আসলে এখানে এই ব্রাসেলসেবৃষ্টির একটানা নিরানন্দ নিঃশব্দ ধারাবাহিক পতন দেখে দেখে চোখ যতটা সয়ে গেছে,অমন হুঙ্কার শুনে তো এই বেচারা কান-জোড়া অভ্যস্ত নয়। সে কারণেই ওরকম হতভম্ব দশা। শুধু আমার না, যাদের সাথেই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছি, যারা অর্থাৎ আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকা দেশি ভাই-ব্রাদার, প্রত্যেকেই একই কথা বলেছে। বুঝতে পারছেন তো,এই বৈদেশেও আমরা বৃষ্টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করার অবকাশ পাই।
আর বৃষ্টি-বিলাসী আমার প্রিয় সাংবাদিক ভাই কোথায় গেলেন,জানেন? কফি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম কদিন আগে এক নিশ্বাসে পড়ে শেষ করা মমের অসাধারণ রেইন গল্পটার কথা। কিছু তর্কবিতর্কের সুযোগ ছিল। সাবডিউড প্যাশন আর উচ্চকিত নৈতিকতা নিয়ে একটা দারুণ আড্ডার সূচনা হতে পারতো। তারপর তা বেড়ে প্রসারিত হতো ইমেইল আর টেক্সট মেসেজে... ইশ, এমন একটা জমজমাট সাহিত্যিক আসর শুরু করেও শেষ করতে পারলামনা। মনে হল, মনে হল এর জন্য ওই বৃষ্টিটাই দায়ি। কারণ তা আমাকে এমনভাবে ভিজিয়ে দিয়েছিল যে সাংবাদিক ভাইয়ের সামনে ভদ্র-সভ্যভাবে বসে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিল। আমার ভীষণ আড়ষ্ট লাগছিল যে ! আর তাছাড়া মিস থম্পসনের মতো এত দুর্বিনীত দুঃসাহসের বর্ষণও আমার উপর কখনও ঝরে পরেনি। আমি যে আমার মধ্যে গুটিয়ে থাকা এক চিরকালের শুঁয়োপোকা যে কেবল একছিটে বৃষ্টির আলতো পরশেই মিইয়ে যায়, চুপসে যায়...তা না হলে হয়তো...
*******
লেখক পরিচিতি
মালেকা পারভীন
বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তা। বর্তমানে ব্রাসেলস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত।
মূলত ছোট গল্প লিখে থাকেন। কবিতাও তার আরেক ভালোবাসা। বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকী ও পত্রিকা এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখে থাকেন।
প্রথম গল্পগ্রন্থঃ সিদ্ধান্ত(২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিবইমেলায় জাগৃতি প্রকাশনী থেকেপ্র কাশিত)

0 মন্তব্যসমূহ