আমাদের পাড়াতে যাদের বাড়ি দেখতে ভালো, গেট আছে এবং সাথে ছোট্ট কালো কলিং বেল, তাদের সবার বাড়ির নাম এবং নম্বর আছে। আমাদের বাড়িও দেখতে ভালো আর পুরোনো বড় গেটটি এই সেদিনই লাল রঙ করা হয়েছে। সেই বড় গেটের মধ্যে আবার একটা ছোট গেটও আছে। বড় গেটের ছিটকিনি সবসময় আটকানো থাকে। ছোট গেটের ছিটিকিনি শুধুমাত্র আটকানো হয় যখন আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হয়না।
সুযোগ পেলেই আমি পাড়ার মাঠে ছুট দিই কী-না! সবাই জানে গেটের ছিটিকিনি আমি খুলতে পারিনা, অনেক শক্ত যে! নতুন লাল রঙ করা গেটের পাশে বাড়ি নম্বর এবং কালো বোতামের মত কলিং বেলও লাগানো হয়েছে। কিন্তু কোন নাম দেয়া হয়নি। আমি মাকে সেই থেকে জিজ্ঞেস করছি, সব গেট এবং কলিং বেল দেয়া বাড়ির নাম আছে, আমাদের বাড়ির কেন নাম নেই। শুধু নম্বর কী বাড়ির নাম হতে পারে! মা বলে, “তুই একটা দিয়ে দে না!” ধ্যাত, আমার দেয়া নাম কেউ রাখবেই না! তবুও আমি ভাবছি, কী নাম দেয়া যায়! সেই যে-বার ছোট কাকুর বড় মেয়ে ঝিলমিলের বিয়ে হলো, তখন প্রথম গিয়েছিলাম ঢাকায়। ঝিলমিলের বিয়েটা কেমন যেন হুট করেই হয়ে গেল। ছোট কাকিমা বলছিল ওতো টগবগে সুন্দরী মেয়ে বেশিদিন ঘরে রাখলে বিপদ। কী বিপদ কে জানে! বড়দের কথার মাথামুন্ডু আমি কিছুই বুঝিনা। ঝিলমিলের শ্বশুরবাড়ির পাশেই যে একতলা বাড়িটি ছিল, তার নাম “মীরার নিজের বাড়ি”। কী অদ্ভুত নাম! আমাদের পাড়ার “খান ভিলা” কিংবা “ভূঁইয়া লজ” এর সাথে একদমই কোন মিল নেই। ঐ একতলা বাড়ির মীরার কথা আমি প্রায়ই ভাবি। মীরা কি ছোড়দির মতো এলোচুলে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ায় আর খিল খিল করে হাসে?
আমাদের বাড়ির নাম এরকম হলে কেমন হয়, আমার “নিজের বাড়ি”! নাহ, কেউ রাজি হবে না! আর আমার নামতো সবাই জানেই না! যেমন আমার বড় জ্যাঠু এবং আমার জ্যাঠতুতো দাদারা। ওরা যতক্ষণ বাড়ি থাকে ততক্ষণ আমি লুকিয়ে থাকি। ওদের কারও সামনে পড়লেই শাস্তি পেতে হয়! সেদিন, কলের পাড়ে স্নান করতে গিয়ে অভ্যাসমতো জল নিয়ে খেলছিলাম। হঠাৎ কেউ একজন পিছন দিকে এসে বালতি ভর্তি ঠাণ্ডা জল শাস্তি স্বরূপ আমার মাথায় দুম করে ঢেলে দিল। ব্যথা পাইনি তবে ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। মাকে কখনো কারো সাথে রাগ করে কথা বলতে শুনিনি, কাঁদতেও খুব একটা দেখিনি। এমনকি বাবাকে নিয়ে সবাই যখন আজে বাজে কথা বলে, তখনও মা একদম রাগ করেনা। কিন্তু সেদিন মা খুব রাগ করেছিল এবং আমার ভেজা গা মুছিয়ে দিতে দিতে কাঁদছিল।
বাবাকে আমার মোটেও বাজে লোক মনে হয় না। দুপুর বেলা আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়। বাবা যখন দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি আসে, তখন আমাকেই প্রথমে খোঁজে! মাঝে মাঝে আমি কাপড় ঝোলানোর আলনাটির পিছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকি কিংবা কাপড় রাখার ঝুড়িতে সব কাপড়ের নীচে গিয়ে বসে থাকি। বাবাটা না একদম বোকা! কখনোই আমাকে খুঁজে পায়না। বাবা মায়ের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে, কেন মা আমাকে দেখে রাখতে পারে না, আর ঠিক তখনই আমি আমার লুকানো জায়গা থেকে বের হয়ে এক দৌঁড়ে বাবার কোলে গিয়ে চড়ি। বাবার গায়ের সিগারেটের বিদ্ঘুটে গন্ধ আমার ভালো লাগেনা কিন্তু কোল থেকে নামতেও ইচ্ছে করেনা যে! কোলে চড়তে গিয়ে বাবার হাতে ধরানো জ্বলন্ত সিগারেটে দু’দিন আমার হাতে ফোসকা পড়েছে।
সবাই বলে বাবা খারাপ। বাবার কোলে যেন না চড়ি। কিন্তু সত্যি ওতে বাবার কোন দোষ ছিল না। বাবা কী আর ইচ্ছে করে আমাকে আগুনের ছ্যাঁকা দিয়েছে! ওরা বলে, বাবাকে যেন বকে দেই কেন বাবা সংসারের কোন খেয়াল রাখেনা। ওরা আমাকে প্রায়ই বাবার বান্ধবীর গল্প শোনায়। বাবা আর বাবার বান্ধবীর গল্প শুনতে আমার একদম ভালো লাগে না। কিন্তু ওদের এই গল্প বলতে খুব ভালো লাগে। ওরা সবাই তখন খুব মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। আমি ঠিক বুঝতে পারিনা কারও বন্ধু বা বান্ধবী থাকলে এতে হাসির কী আছে! কই, মেঝদির মানে আমার বড় জ্যাঠুর মেয়ের ওই যে সুন্দর মতো বন্ধু আসে, তখন তো কেউ হাসে না। অবশ্য তখন আমার ওপর কড়া নির্দেশ থাকে যেন আমি সবসময় দিদির এবং সুন্দর বন্ধুটির সাথে সারাক্ষণ থাকি। আমি একদিন ঘরে ঢুকে দিদিকে ওর বন্ধুর গলায় ঝুলতে দেখেছিলাম। আমাকে দেখে ওরা ছিটকে দূরে সরে গিয়েছিল। ঠিক কী ঘটে গেল, কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে ওখানে এক মুহূর্ত দাঁড়াতে ইচ্ছে করেনি। আমি ছুটে গিয়ে মাকে বলেছিলাম। মা কিছুই বলেননি । মাকে আমি বড় জামাইবাবুর কথাও বলেছিলাম। বড়দির জামাই লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুমন্ত মেঝদিকে দেখত। আমি দেখে ফেলেছিলাম। সেদিনও মা কিছুই বলেনি। আমার মা, জ্যাঠীমা বা বাড়ির অন্যদের, আমি কাউকেই ঠিকমত বুঝতে পারিনা। এদের সবাইকে আমার মাঝে মাঝে ভীষণ অদ্ভূত আর অচেনা মনে হয়।
আমার জেঠীমা প্রতিদিন নিয়ম করে ঘণ্টা তিনেক সবাইকে শাপ শাপান্ত করেন। যদি তিনি সকাল সকাল শুরু করেন, তাহলে তার ঘরের দোরগোড়ায় লম্বা বারান্দাটিতে পা ছড়িয়ে বসেন। তারপর সুপারি কাটতে কাটতে কিংবা তরকারি কুটতে কুটতে সবার গোষ্ঠী উদ্ধার করেন। যদি দুপুরে শুরু করেন, তাহলে শুধু মুখ নয় হাতের ব্যাবহারও করে থাকেন। উঠোনে জমা হয় রান্নার সরঞ্জামসহ সমস্ত তৈজসপত্র। দুপুরের রেশ কোন কোন দিন রাত অব্দি গড়ায়। যদি সে রাতে বাবা বাড়ি ফেরেন, তাহলে জেঠীমার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে বাবার উপর। সারা বাড়ি নিঝুম হয়ে যায়। শুধু জেঠীমার আত্নসংলাপের প্রতিধ্বনি হতে থাকে সারা বাড়িতে।
জেঠীমাকে শুধু একটা সময় আমি কখনো চিল চীৎকার জুড়ে দিতে দেখিনি, সেটা হলো, যখন সখিনা, বিলকিস এদের উনি বাড়ি থেকে বিদেয় করে দেন। সখিনা যাওয়ার কিছুদিন পরেই বিলকিস এসেছিল। একদিন দেখলাম ছোড়দা লুঙ্গিতে গিট্টু দিতে দিতে কলঘর থেকে বের হয়ে আসছে। একটু পর জেঠীমা আর মায়ের পিছু পিছু বিলকিস বেরিয়ে এলো। সেদিনের পর থেকে বিলকিসকে আমাদের বাড়িতে আর দেখা যায়নি। আমি শুধু বুঝেছিলাম এ বিষয়ে কোন কথা বলতে নেই। জলখাবারের মত এ বাড়ির এ সব কিছু টপ করে গিলে ফেলতে হয়। মনে হয় একমাত্র বোকা ছোড়দি তা করতে জানতো না।
ছোড়দি যেন এই বাড়ির হয়েও, আসলে এ বাড়ির কেউ ছিল না। বাবার মতো আমার বড় জেঠুর এই তৃতীয় কন্যাটিকেও কেউ খুব একটা সহ্য করতে পারতো না। দিদির সব কাজই সবার কাছে ছিল ভীষণ অসহ্য। অন্যসবের মত এই বিষয়টিও আমি একদম বুঝিনি কেন দিদি সবার এত অপ্রিয় পাত্র ছিল। দিদি দুদ্দাড় করে এ ঘর থেকে ও ঘর, এ পাড়া থেকে ও পাড়া করে বেড়াত। কণ্ঠ উজাড় করে দিয়ে হাসতো। এমনকি সবাই মিলে যখন দিদিকে গালি দিত, তখনও দিদি হাসতো। এ বাড়িতে দিদিই ছিল একটিমাত্র আশ্চর্য। সেবার মামা বাড়ি থেকে ফিরে এসে দিদিকে আর দেখিনি। শুনেছি, কী যেন ওষুধ খেয়ে দিদি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। জেঠীমা রাত বেশি বলে কাউকে দিদির অসুস্থতার খবর জানায়নি। যখন শেষপর্যন্ত দিদিকে হাসপাতালে নেয়া হয়, ডাক্তার নাকি বলেছিল, দিদি মারা গিয়েছে আরও চার ঘণ্টা আগে। আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “মা, দিদি অসুস্থ হলে কেন জেঠীমা সবাইকে জানায়নি?” মা বলল, “তোর জেঠীমা বুঝতে পারেনি।”আমি মায়ের আঁচলের খুট ধরে নাড়াচাড়া করি কিছুক্ষণ, তারপর আবার জিজ্ঞেস করি, “মা, কেন জেঠীমা বুঝতে পারেনি?” আমি অনেকক্ষণ মায়ের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করি, কিন্তু মা আর কিছু বলে না। কেন যেন মনে হয়, মা এর বেশি কিছু আর বলবে না।
আমাদের বাড়ির পুরনো গেটটিকে লাল রঙ করার পাশাপাশি, পুরো বাড়িটিই আবার নতুন করে হলুদ রঙ করা হচ্ছে। বাড়ির ভিতরে এবং বাহিরে পলেস্তরা খসে খসে পড়ছিল। তাছাড়া ভালো উপলক্ষ্যও পাওয়া গিয়েছে। শেষপর্যন্ত মেঝদির বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছে। সেই সুন্দর বন্ধুটি অনেকদিন হলো আমাদের বাড়ি আসেনি। মেঝদির গাত্র বর্ণ উজ্জ্বল, দীঘল কালো চুল এবং রন্ধনে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু লোকে বলে, মেঝদির শরীরে মেদ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণ বেশি। আমাদের বাড়ির সবাই খুশি। যাক, শেষপর্যন্ত শহরের কাঠাখানিক জায়গায় সব দফা রফা হয়েছে।
আমাদের হলুদ রঙের বাড়ির সামনে লাল রঙের একটি গেট। গেটের এক পাশে একটি বড় গাছ। গাছের পাতাগুলো খুব অদ্ভূত। বড়, লম্বা পাতাগুলো বছরের একসময় থাকে সবুঝ এবং আরেক সময় লাল। যখন পুরো গাছটি লাল, বড় এবং লম্বা পাতায় ভরে যায়, তখন দেখতে বেশ ভালো লাগে। মা এই গাছের নাম জানে, কিন্তু কেন জানি মাকে এখন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। আপাতত গাছের নামটি অজানাই থাকুক। বরং আমাদের বাড়িটির একটি নাম দেয়া যাক, হলদে বাড়ি কেমন হয়?
সুযোগ পেলেই আমি পাড়ার মাঠে ছুট দিই কী-না! সবাই জানে গেটের ছিটিকিনি আমি খুলতে পারিনা, অনেক শক্ত যে! নতুন লাল রঙ করা গেটের পাশে বাড়ি নম্বর এবং কালো বোতামের মত কলিং বেলও লাগানো হয়েছে। কিন্তু কোন নাম দেয়া হয়নি। আমি মাকে সেই থেকে জিজ্ঞেস করছি, সব গেট এবং কলিং বেল দেয়া বাড়ির নাম আছে, আমাদের বাড়ির কেন নাম নেই। শুধু নম্বর কী বাড়ির নাম হতে পারে! মা বলে, “তুই একটা দিয়ে দে না!” ধ্যাত, আমার দেয়া নাম কেউ রাখবেই না! তবুও আমি ভাবছি, কী নাম দেয়া যায়! সেই যে-বার ছোট কাকুর বড় মেয়ে ঝিলমিলের বিয়ে হলো, তখন প্রথম গিয়েছিলাম ঢাকায়। ঝিলমিলের বিয়েটা কেমন যেন হুট করেই হয়ে গেল। ছোট কাকিমা বলছিল ওতো টগবগে সুন্দরী মেয়ে বেশিদিন ঘরে রাখলে বিপদ। কী বিপদ কে জানে! বড়দের কথার মাথামুন্ডু আমি কিছুই বুঝিনা। ঝিলমিলের শ্বশুরবাড়ির পাশেই যে একতলা বাড়িটি ছিল, তার নাম “মীরার নিজের বাড়ি”। কী অদ্ভুত নাম! আমাদের পাড়ার “খান ভিলা” কিংবা “ভূঁইয়া লজ” এর সাথে একদমই কোন মিল নেই। ঐ একতলা বাড়ির মীরার কথা আমি প্রায়ই ভাবি। মীরা কি ছোড়দির মতো এলোচুলে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ায় আর খিল খিল করে হাসে?
আমাদের বাড়ির নাম এরকম হলে কেমন হয়, আমার “নিজের বাড়ি”! নাহ, কেউ রাজি হবে না! আর আমার নামতো সবাই জানেই না! যেমন আমার বড় জ্যাঠু এবং আমার জ্যাঠতুতো দাদারা। ওরা যতক্ষণ বাড়ি থাকে ততক্ষণ আমি লুকিয়ে থাকি। ওদের কারও সামনে পড়লেই শাস্তি পেতে হয়! সেদিন, কলের পাড়ে স্নান করতে গিয়ে অভ্যাসমতো জল নিয়ে খেলছিলাম। হঠাৎ কেউ একজন পিছন দিকে এসে বালতি ভর্তি ঠাণ্ডা জল শাস্তি স্বরূপ আমার মাথায় দুম করে ঢেলে দিল। ব্যথা পাইনি তবে ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। মাকে কখনো কারো সাথে রাগ করে কথা বলতে শুনিনি, কাঁদতেও খুব একটা দেখিনি। এমনকি বাবাকে নিয়ে সবাই যখন আজে বাজে কথা বলে, তখনও মা একদম রাগ করেনা। কিন্তু সেদিন মা খুব রাগ করেছিল এবং আমার ভেজা গা মুছিয়ে দিতে দিতে কাঁদছিল।
বাবাকে আমার মোটেও বাজে লোক মনে হয় না। দুপুর বেলা আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়। বাবা যখন দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি আসে, তখন আমাকেই প্রথমে খোঁজে! মাঝে মাঝে আমি কাপড় ঝোলানোর আলনাটির পিছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকি কিংবা কাপড় রাখার ঝুড়িতে সব কাপড়ের নীচে গিয়ে বসে থাকি। বাবাটা না একদম বোকা! কখনোই আমাকে খুঁজে পায়না। বাবা মায়ের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে, কেন মা আমাকে দেখে রাখতে পারে না, আর ঠিক তখনই আমি আমার লুকানো জায়গা থেকে বের হয়ে এক দৌঁড়ে বাবার কোলে গিয়ে চড়ি। বাবার গায়ের সিগারেটের বিদ্ঘুটে গন্ধ আমার ভালো লাগেনা কিন্তু কোল থেকে নামতেও ইচ্ছে করেনা যে! কোলে চড়তে গিয়ে বাবার হাতে ধরানো জ্বলন্ত সিগারেটে দু’দিন আমার হাতে ফোসকা পড়েছে।
সবাই বলে বাবা খারাপ। বাবার কোলে যেন না চড়ি। কিন্তু সত্যি ওতে বাবার কোন দোষ ছিল না। বাবা কী আর ইচ্ছে করে আমাকে আগুনের ছ্যাঁকা দিয়েছে! ওরা বলে, বাবাকে যেন বকে দেই কেন বাবা সংসারের কোন খেয়াল রাখেনা। ওরা আমাকে প্রায়ই বাবার বান্ধবীর গল্প শোনায়। বাবা আর বাবার বান্ধবীর গল্প শুনতে আমার একদম ভালো লাগে না। কিন্তু ওদের এই গল্প বলতে খুব ভালো লাগে। ওরা সবাই তখন খুব মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। আমি ঠিক বুঝতে পারিনা কারও বন্ধু বা বান্ধবী থাকলে এতে হাসির কী আছে! কই, মেঝদির মানে আমার বড় জ্যাঠুর মেয়ের ওই যে সুন্দর মতো বন্ধু আসে, তখন তো কেউ হাসে না। অবশ্য তখন আমার ওপর কড়া নির্দেশ থাকে যেন আমি সবসময় দিদির এবং সুন্দর বন্ধুটির সাথে সারাক্ষণ থাকি। আমি একদিন ঘরে ঢুকে দিদিকে ওর বন্ধুর গলায় ঝুলতে দেখেছিলাম। আমাকে দেখে ওরা ছিটকে দূরে সরে গিয়েছিল। ঠিক কী ঘটে গেল, কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে ওখানে এক মুহূর্ত দাঁড়াতে ইচ্ছে করেনি। আমি ছুটে গিয়ে মাকে বলেছিলাম। মা কিছুই বলেননি । মাকে আমি বড় জামাইবাবুর কথাও বলেছিলাম। বড়দির জামাই লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুমন্ত মেঝদিকে দেখত। আমি দেখে ফেলেছিলাম। সেদিনও মা কিছুই বলেনি। আমার মা, জ্যাঠীমা বা বাড়ির অন্যদের, আমি কাউকেই ঠিকমত বুঝতে পারিনা। এদের সবাইকে আমার মাঝে মাঝে ভীষণ অদ্ভূত আর অচেনা মনে হয়।
আমার জেঠীমা প্রতিদিন নিয়ম করে ঘণ্টা তিনেক সবাইকে শাপ শাপান্ত করেন। যদি তিনি সকাল সকাল শুরু করেন, তাহলে তার ঘরের দোরগোড়ায় লম্বা বারান্দাটিতে পা ছড়িয়ে বসেন। তারপর সুপারি কাটতে কাটতে কিংবা তরকারি কুটতে কুটতে সবার গোষ্ঠী উদ্ধার করেন। যদি দুপুরে শুরু করেন, তাহলে শুধু মুখ নয় হাতের ব্যাবহারও করে থাকেন। উঠোনে জমা হয় রান্নার সরঞ্জামসহ সমস্ত তৈজসপত্র। দুপুরের রেশ কোন কোন দিন রাত অব্দি গড়ায়। যদি সে রাতে বাবা বাড়ি ফেরেন, তাহলে জেঠীমার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে বাবার উপর। সারা বাড়ি নিঝুম হয়ে যায়। শুধু জেঠীমার আত্নসংলাপের প্রতিধ্বনি হতে থাকে সারা বাড়িতে।
জেঠীমাকে শুধু একটা সময় আমি কখনো চিল চীৎকার জুড়ে দিতে দেখিনি, সেটা হলো, যখন সখিনা, বিলকিস এদের উনি বাড়ি থেকে বিদেয় করে দেন। সখিনা যাওয়ার কিছুদিন পরেই বিলকিস এসেছিল। একদিন দেখলাম ছোড়দা লুঙ্গিতে গিট্টু দিতে দিতে কলঘর থেকে বের হয়ে আসছে। একটু পর জেঠীমা আর মায়ের পিছু পিছু বিলকিস বেরিয়ে এলো। সেদিনের পর থেকে বিলকিসকে আমাদের বাড়িতে আর দেখা যায়নি। আমি শুধু বুঝেছিলাম এ বিষয়ে কোন কথা বলতে নেই। জলখাবারের মত এ বাড়ির এ সব কিছু টপ করে গিলে ফেলতে হয়। মনে হয় একমাত্র বোকা ছোড়দি তা করতে জানতো না।
ছোড়দি যেন এই বাড়ির হয়েও, আসলে এ বাড়ির কেউ ছিল না। বাবার মতো আমার বড় জেঠুর এই তৃতীয় কন্যাটিকেও কেউ খুব একটা সহ্য করতে পারতো না। দিদির সব কাজই সবার কাছে ছিল ভীষণ অসহ্য। অন্যসবের মত এই বিষয়টিও আমি একদম বুঝিনি কেন দিদি সবার এত অপ্রিয় পাত্র ছিল। দিদি দুদ্দাড় করে এ ঘর থেকে ও ঘর, এ পাড়া থেকে ও পাড়া করে বেড়াত। কণ্ঠ উজাড় করে দিয়ে হাসতো। এমনকি সবাই মিলে যখন দিদিকে গালি দিত, তখনও দিদি হাসতো। এ বাড়িতে দিদিই ছিল একটিমাত্র আশ্চর্য। সেবার মামা বাড়ি থেকে ফিরে এসে দিদিকে আর দেখিনি। শুনেছি, কী যেন ওষুধ খেয়ে দিদি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। জেঠীমা রাত বেশি বলে কাউকে দিদির অসুস্থতার খবর জানায়নি। যখন শেষপর্যন্ত দিদিকে হাসপাতালে নেয়া হয়, ডাক্তার নাকি বলেছিল, দিদি মারা গিয়েছে আরও চার ঘণ্টা আগে। আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “মা, দিদি অসুস্থ হলে কেন জেঠীমা সবাইকে জানায়নি?” মা বলল, “তোর জেঠীমা বুঝতে পারেনি।”আমি মায়ের আঁচলের খুট ধরে নাড়াচাড়া করি কিছুক্ষণ, তারপর আবার জিজ্ঞেস করি, “মা, কেন জেঠীমা বুঝতে পারেনি?” আমি অনেকক্ষণ মায়ের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করি, কিন্তু মা আর কিছু বলে না। কেন যেন মনে হয়, মা এর বেশি কিছু আর বলবে না।
আমাদের বাড়ির পুরনো গেটটিকে লাল রঙ করার পাশাপাশি, পুরো বাড়িটিই আবার নতুন করে হলুদ রঙ করা হচ্ছে। বাড়ির ভিতরে এবং বাহিরে পলেস্তরা খসে খসে পড়ছিল। তাছাড়া ভালো উপলক্ষ্যও পাওয়া গিয়েছে। শেষপর্যন্ত মেঝদির বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছে। সেই সুন্দর বন্ধুটি অনেকদিন হলো আমাদের বাড়ি আসেনি। মেঝদির গাত্র বর্ণ উজ্জ্বল, দীঘল কালো চুল এবং রন্ধনে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু লোকে বলে, মেঝদির শরীরে মেদ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণ বেশি। আমাদের বাড়ির সবাই খুশি। যাক, শেষপর্যন্ত শহরের কাঠাখানিক জায়গায় সব দফা রফা হয়েছে।
আমাদের হলুদ রঙের বাড়ির সামনে লাল রঙের একটি গেট। গেটের এক পাশে একটি বড় গাছ। গাছের পাতাগুলো খুব অদ্ভূত। বড়, লম্বা পাতাগুলো বছরের একসময় থাকে সবুঝ এবং আরেক সময় লাল। যখন পুরো গাছটি লাল, বড় এবং লম্বা পাতায় ভরে যায়, তখন দেখতে বেশ ভালো লাগে। মা এই গাছের নাম জানে, কিন্তু কেন জানি মাকে এখন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। আপাতত গাছের নামটি অজানাই থাকুক। বরং আমাদের বাড়িটির একটি নাম দেয়া যাক, হলদে বাড়ি কেমন হয়?
0 মন্তব্যসমূহ