সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প




চল্লিশ বছর ধরে লিখেছেন হুমায়ুন আহমেদ এবং তাঁর প্রতিটি বই উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ভ্ৰমণকাহিনী পড়ার জন্য পাঠক উন্মুখ হয়ে থাকত। শরীরে কঠিন ব্যাধি নিয়েও তিনি লিখেছেন এবং শেষ স্বদেশ ভ্ৰমণে এরকম একটা আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে, সুস্থ হয়ে তিনি দেশে ফিরবেন, নিয়মিত লেখালেখি শুরু করবেন। হুমায়ুনকে 'জনপ্রিয়’ লেখক হিসেবে বর্ণনা করতেই অনেকে পছন্দ করতেন, কেউ এ 'জনপ্ৰিয়' কথাটিকে একটু তীর্যকভাবে উপস্থাপিত করতেন, এ কথা প্ৰমাণ করতে যে, জনপ্রিয়তা আর মেধা এক জিনিস নয়; যে হুমায়ূন জনপ্রিয় বটে তবে উঁচুদরের লেখক নন। তবে এটি যে সঠিক মূল্যায়ন নয় তাঁর সম্বন্ধে, এতো তাঁর কয়েকটি বাছাই উপন্যাস পড়লেই পরিষ্কার হয়।
এবং শুধু বাছাই কয়েকটি উপন্যাসই বা কেন বলি, অন্যান্য উপন্যাসেও যখন তিনি পাঠককে সম্মোহিত করে জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত মানব মনে, নানা জটিলতা, সমকালীন নানা অনাচার বিচ্যুতি এবং জটিলতা অথবা মানুষের প্ৰেম-বিদ্রোহ-সফলতা-অসাফল্যের গল্প শোনান, তখন তাঁকে তাকে কোন বিচারেই তো 'নিচুদরের’ বলা যায় না। যে উপন্যাস একবার পড়তে বসলে শেষ না করা পর্যন্ত রাখা যায় না, তাকে উঁচু-নিচুর বিভাজনে ফেলে বিচার করার কোনো অর্থ হয় না। তাঁর পাঠকেরা তাঁকে চেনেন কথার জাদুকর হিসেবে। তাদের বিচারে বহু আগেই তিনি উতরে গেছেন এবং এ পাঠক শুধু বাংলাদেশেরই নয় পশ্চিমবঙ্গেও আছে। কলকাতার ছোট কাগজ রিভিউ প্রিভিউ-তে (৫ম বর্ষ, ১৯ সংখ্যা বর্ষ ১৪১৯) অরুণাভ দাস তাঁর ‘উতলধারা শ্রাবণরাতে চলে গেলেন হিম' স্মরণপ্রবন্ধে লিখেছেন, “বছরের পর বছর একটা করে হিমুর বই বেরোয় আর আমরা পাগলের মতো কিনতে ছুটে যাই। হিমু-পাগলের এ দলটা ক্রমশ ভারী হতে হতে জনসমুদ্রের মতো পাঠকসমুদ্রে পরিণত হয়'। তবে উঁচু-নিচু বিভাজনের একটি চমৎকার উত্তর দিয়েছেন আরেক লেখক চন্দন আনোয়ার তাঁর “হুমায়ূন আহমেদ : জনপ্রিয় সাহিত্যিকের মৃত্যু ও দু'একটি ভাবনা” নিবন্ধে। নিবন্ধের কথাটি হলো “অনেক সিরিয়াস ধারার সাহিত্যের কালোন্তীর্ণ হবার দৃষ্টান্তের অভাব নেই'। তিনি হুমায়ুনকে এ দ্বিতীয় ধারার সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করে যে মন্তব্য করেছেন, সেগুলো হুমায়ুনের প্রতিভাকে একটি সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করে। এখানে একটি উদ্ধৃতি, কিছুটা দীর্ঘ হলেও গুরুত্বপূর্ণ :

এতটা শক্তি ও সামর্থ রাখেন যে লেখক, তাঁর দেশ ও জাতির প্রাণের মানুষে পরিণত হয়েছেন যে লেখক, তিনি এবং তাঁর লেখাকে কী করে সিরিয়াস সাহিত্য নয় বলে দূরে ঠেলি। নিজের কাছে সৎ থাকতে হলে স্বীকার করতেই হবে, সিরিয়াস বা ক্লাসিক সাহিত্য হচ্ছে না বলে মোটের উপরে হুমায়ুন আহমেদকে প্রত্যাখ্যান, তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য ও অবহেলাই করে আসছে সিরিয়াস সাহিত্যের মুষ্টিমেয় লেখক, পাঠক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের অধ্যাপকরা। সারা বছরে যে লেখকের বই ১০০ জন পাঠকের কাছে যায় না বা পাঠক গ্ৰহণ করে না, আর যে লেখকের একটি বই-ই ২৫ লাখ পাঠকের কাছে পৌঁছায়; এ দুই লেখকের তুলনা করা উচিত কি অনুচিত এ প্রশ্ন কার কাছে করা যায়? ...সাহিত্য যদি মানুষের জন্য হয়, তবে মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষিত বোদ্ধার কাছে নয়, তৃণমূল মানুষের কাছে, সব বয়সের সব মত-পথের মানুষের কাছে লেখকের লেখাটি পৌঁছাতে হবে, মানুষকে পড়তে বাধ্য করতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় তফাৎ হলো, পড়ার সংস্কৃতিটাকে আমরা যখন বিসর্জন দিচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গ সেখানে সেটিকে শুধু টিকিয়েই রাখেনি উজ্জীবিতও করছে। শুধু একটি মাত্র ছোটকাগজে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যে দুটি উঁচুমানের প্রবন্ধ প্রকাশিত হলো- আমি নিশ্চিত, আরও অনেক লেখা সেখানকার পত্রপত্রিকায় বেরিয়েছে—তাতে এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায়, সিরিয়াস পাঠক শুধু নয়, সিরিয়াস লেখকও সেখানে আছেন, যারা সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, সেগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন এবং পাঠকদের জানা ও বোঝার পরিধিটি ক্রমাগত বাড়ান। হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য পাঠক আছেন বাংলাদেশে, কিন্তু তার লেখালেখি নিয়ে গবেষণা হয়নি, প্ৰবন্ধ-নিবন্ধও লেখা হয়নি। যদি শরৎচন্দ্রকে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে বিবেচনা করেও তার ওপর সিরিয়াস (অর্থাৎ গবেষণামূলক) প্ৰবন্ধ করা যায়, এমফিল পিএইচডি গবেষণা করা যায়, তাহলে হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখি নিয়ে নিধেন পক্ষে দু'তিনখানা সিরিয়াস প্রবন্ধ তো ছাপা হতে পারত। বহুদেশে এখন সাহিত্য বিভাগগুলোতে কালচারাল স্টাডিজ অথবা সংস্কৃতি পঠন এটি বিষয় হিসেবে চালু হয়েছে। সখ্যত গঠনে জনপ্রিয় সাহিত্যকে নতুনভাবে দেখা হচ্ছে আর উত্তরাধুনিক সাহিত্য বিচারে জনপ্রিয় সাহিত্যকে তা মোটামুটি মূলধারার সাহিত্যের পাশে রেখেই পড়া হচ্ছে। সংস্কৃতি পঠনে সাহিত্যের পিছনে সামাজিক শক্তি, সমাজ সংগঠন এবং অর্থনীতির রাজনীতির প্রভাবকে খতিয়ে দেখা হয়, সাহিত্যের দৃশ্যময়তা, পৃথিবীতে এর অবস্থান চিহ্নিত করা হয় । একদিন হয়তো এরকম উদ্যোগ বাংলাদেশেও নেওয়া হবে এবং সাহিত্যপাঠে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে। তখন হুমায়ুনকে নিয়ে নতুন করে যে আগ্রহ সৃষ্টি হবে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তবে সে পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্মের নিশ্চয় নানা মূল্যায়ন হবে, সেরকম একটি মূল্যায়ন হতে পারে তার লেখালেখির একটি উপেক্ষিত অঞ্চল নিয়ে । এবং এ অঞ্চলটি হচ্ছে ছোটগল্প । বহুদিন থেকেই আমি তার ছোটগল্পের একজন উৎসাহী পাঠক। নানা পত্রপত্রিকা ও সংকলনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটগল্প এবং দুই নির্বাচিত সংকলনে সংযুক্ত তাঁর আশিটির মতো ছোটগল্প পড়ে আমার মনে হয়েছে, বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ছোটগল্প লেখকদের একজন হুমায়ূন আহমেদ। এবং যেসব সমালোচক তাকে তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাসগুলোর জন্য উচ্চমূল্য দিতে রাজি নন, তারাও তাঁর ছোটগল্পগুলোর জন্য তাকে সেই মূল্য, অথবা সিরিয়াস লেখকের উত্তরীয় পরিয়ে দিতে কুষ্ঠিত হবেন না। ১৯৯২ সালে কাকলী প্ৰকাশনী থেকে প্ৰকাশিত তার ‘গল্পসমগ্র’ এবং ২০১২ সালে সালেহ চৌধুরীর সম্পাদনায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত "বাছাই গল্প” প্রধানত আমার বিবেচনা । তবে অন্যান্য সংকলন ও পত্রপত্রিকায় ছাপা হওয়া গল্পগুলোও একই সঙ্গে আমরা মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত। আমি এরকম একটি দাবিও করতে পারি যে, হুমায়ুন যদি শুধু ছোটগল্প লিখতেন, একটিও উপন্যাস না লিখতেন, তাহলেও তাকে বাংলা সাহিত্যে একটা মৰ্যাদার জায়গা পাঠকরা দিত।

হুমায়ুন আহমেদের ছোটগল্প এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নির্মাণ। বিশ্বসাহিত্যে যেসব ছোটগল্প একটা স্থায়ী আসন পেয়েছে, যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প, সেগুলোর ভিতর অভিন্ন যে কিছু সূত্রের দেখা পাওয়া যায় এবং তাদের রেখাবিন্যাস, চরিত্র নির্মাণ এবং ঘটনার পরম্পরা ও আভিঘাত সৃষ্টিতে যেসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, হুমায়ুনের অনেক ছোটগল্পেও তা দেখা যায় । এসব ছোটগল্পের সঙ্গে মোঘল অথবা দক্ষিণ ভারতীয় অনুচিত্রের তুলনা করা যায়। অনুচিত্র ছোট হলেও এর দেখা ও দেখানোর জগৎটি মোটেও ক্ষুদ্র নয়; এর চিন্তাভাবনা অথবা বোধের জগতের গভীরতাও সামান্য নয়। একটি অনুচিত্রের বিন্দুতে জীবনি ও কল্পনার সিন্ধুদৰ্শন সম্ভব। ছোটগল্পেও তাই। পরিসরে অবশ্যই ছোট, কিন্তু ছোটোগল্পের পৃথিবীতে বৈচিত্ৰ্য, জীবনবোধ, বাস্তব-অবাস্তব অথবা বাস্তবের অভ্যন্তরের দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনেক বড় মাত্রায় বিন্যস্ত হতে পারে। হুমায়ুন আহমেদের ‘শিকার’, ‘খাদক’, ‘উনিশশ একাত্তর’ অথবা ‘অপেক্ষা' মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার গল্প, কিন্তু এসব গল্পের ভিতরের বিস্তারটি অনেক পরিব্যাপ্ত । এটি সম্ভব হয়েছে গল্পকারের সংবেদী মন, তার দৃষ্টির গভীরতা ও স্বচ্ছতা এবং বর্ণনার কুহুক সৃষ্টির ক্ষমতার জন্য।

রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের ‘ওপেন-এন্ডেড' অথবা উন্মুক্ত সমাপ্তির চরিত্রের আবশ্যকতার কথা বলেছেন । ছোটগল্প যেন শেষ হয়েও শেষ হয়নি, এরকম একটি অনুভূতি পাঠকের মনে রেখে যায়, যাতে গল্পের শেষে সে বইটি বন্ধ করে চলে না যায়, বরং গল্পটি নিয়ে ভাবতে বসে। এর যে পরিণতিটি লেখক দিয়েছেন, তার বাইরে গিয়ে বিকল্প অনেক পরিণতির কথা সে ভেবে নিতে পারে । সেরকম সম্ভাবনার কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। আমার মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ এ উন্মুক্ত-সমাপ্তির এক কুশলী নির্মাতা। তার প্রতিটি ছোটগল্প এর সমাপ্তিতে একটি চমক রেখে যায়, একটা আক্ষেপ, একটি দীর্ঘশ্বাস অথবা একটা উদ্বেগ রেখে যায় । কোনো কোনো গল্পে তৃপ্তিও থাকে, আনন্দ থাকে। কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই এ সমাপ্তি কোনো দৃঢ় সমাপ্তিরেখা টেনে দিয়ে যায় না, বরং পাঠককে গল্পের জীবনে ডুবিয়ে চমৎকৃত করে, স্তম্ভিত করে, অবশ করে অথবা পুলকিত করে। হুমায়ূনের গল্পে কাহিনী রেখা এগোয় নিজস্ব এক গতিধারায়, এর পথটি আগে থেকে কেউ বলে দিতে পারে না। মোপাসাঁ'র গল্পের শেষে দুৰ্দান্ত কিছু চমক অপেক্ষা করে পাঠকের জন্য। আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন মোপাসাঁ'র একটি গল্প আমাদের পাঠ্য ছিল। সেটা পড়াতেন যে স্যার, তিনি বলতেন এ চমকের জন্য মোপাসাঁ'র একটি গল্প দু’বার পড়তে আগ্রহী হয় পাঠক। তিনি নিজে কোনো কোনো গল্প চার-পাঁচবার পড়েছেন বলে স্যার জানিয়েছিলে। হুমায়ূন আহমেদের অনেক গল্প আমি একাধিকবার পড়েছি। প্রতিবারই শেষের চমক অথবা ঘটনার হঠাৎ কোনো মোড় ফেরা অথবা কোনো তীব্র পর্যবেক্ষণ নতুন করে ধরা পড়েছে। 'খাদক' গল্পটির কথাই ধরা যাক। দরিদ্র একজন মানুষ, খেয়েই যে জীবিকা নির্বাহ করে। তাকে খেতে হয় এবং প্রচুর খেতে হয়, যেহেতু তাকে নিয়ে বাজি ধরা হয়। অথচ খাদকের সন্তানেরা থাকে প্রায় অভুক্তই। লেখক যেদিন খাদকের খাদ্যগ্ৰহণ চ্যালেঞ্জটি পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি দেখছেন, এ খাদ্যগ্রহণ ব্যাপারটি কত নির্মম । বাজিতে জিততে হলে তাকে সব খাবার শেষ করতে হবে। সে কি পারবে তার অভুক্ত সন্তানের মুখে এক টুকরা মাংস তুলে দিতে? লেখক নিজেই বলছেন, না, বাস্তবে তা হবে না। একটি সাধারণ ঘটনার গল্প, অথচ কী অসাধারণ এর পর্যবেক্ষণ শক্তি। একটা হাহাকার তুলে গল্পটি শেষ হয়। কিন্তু শেষ হওয়ার আগে খাদকের জীবনের ভয়ানক মানবিক দিকটার ওপর যে তীর্যক আলোটি পড়ে, তা গল্পটিকে অসাধারণ একটি স্তরে উন্নীত করে।

ছোটগল্পগুলোতে হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত মর্মস্পশী, যেহেতু তার মন পড়ে থাকে সাধারণ মানুষের জীবনে। এসব সাধারণ মানুষ নিতান্তই সাধারণ একজন গৃহকর্মী, একজন স্কুল শিক্ষক, একজন জনপ্রিয় গুণীন, একজন দরিদ্র বাবা । তাদের জীবনের গল্পগুলোও সাধারণ। সেগুলোর পিছনে কোনো ঘটনার ডামাডোল নেই, বিশাল বিশাল সব প্ৰস্তুতির ব্যাপার নেই, জীবনের চাইতে বড় বড় সব মানুষের আনাগোনা নেই। অথচ এ সামান্য গল্পগুলোই শুধু বলার কুশলতার জন্য একটা মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি পায়। 'জলিল সাহেবের পিটিশন' গল্পটির কথা বলা যায়।

একজন সামান্য মানুষ তার কাঁধে ভার নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের বিচার অনুষ্ঠানের দায়িত্ব।

সমাজ নির্বোধ, ভালোবাসাহীন, ক্ষমতাসীনরা আপসে ব্যস্ত, কিন্তু সব বাধা তুচ্ছ করে মানুষটি এগিয়ে যায়। তার সংগ্রাম একটি গোটা জাতির সংগ্রামের প্রতীকী মর্যাদা পায়। আমরা জানি, জলিল সাহেব তার জীবনকালে বিচার দেখে যেতে পারবেন না । কিন্তু গল্প শেষের চমকটি আমাদের নিজের, তাকে নিয়ে নয়। একে তো অনেক বছর পরিশ্রম করে মাত্র কয়েক হাজার স্বাক্ষর জলিল সাহেব পেলেন, ফলে জাতি হিসেবে আমরা কাঠগড়ায় উঠলাম, তার ওপর লেখককে যখন জলিল সাহেবের মেয়ে জানাল, তার বাবা বলে গেছেন তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য। লেখক একদিন এগিয়ে আসলেন, লেখক তখন নিজেকেই কাঠগড়ায় তুললেন। এ চমকটি গ্লানির এবং লজ্জার। এটি একদিকে আমাদের বিবশ করে দেয়, অন্যদিকে বিবেকের ঘরে মৌমাছি পাঠায়।

একজন ছোটগল্পকারের বড় যে গুণটি থাকা উচিত, তা হচ্ছে এক অসম্ভব পরিমিতিবোধ । কতটা বলতে হবে, কতটা উহ্য রাখতে হবে, কতটা সামনে আনতে হবে অথবা কতটা পিছনে, এই জ্ঞানটি তার অবচেতনেই উৎপন্ন হতে হবে। বলা হয়ে থাকে যে, একটি অপ্রয়োজনীয় চরিত্র একটি ছোটগল্পের অকালপ্রয়াণ ঘটাতে পারে। হুমায়ূন আহমেদ রসায়নের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছোটগল্পের এসব রসায়ন জানতেন একটা সহজাত প্ৰজ্ঞা থেকে । তার ছোটগল্পগুলো অসম্ভব সুনির্মিত—যেখানে গাঁথুনি সেখানে গাঁথুনি, যেখানে দেওয়াল সেখানে দেওয়াল, আর যেখানে চাল সেখানে চাল। গল্প লিখছেন না যেন গল্পের বাসা বানাচ্ছেন। তার গল্পগুলোতে প্রতিটি চরিত্র জীবন্ত এবং জীবন্ত তাদের আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-হতাশা-প্রত্যাশা নিয়ে। হুমায়ূন তার অভিজ্ঞতার অঞ্চলেই গল্পগুলো সাজান—সেসব গ্রামেই অথবা শহরেই স্থাপিত হোকক অথবা পানিতে। চরিত্রদের হয়ে ওঠা সেজন্য তার এবং একটু বিস্তারে আমাদের— অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই। হুমায়ুনের পর্যবেক্ষণের এক দারুণ ক্ষমতা ছিল। একটি মেঘলা দিন, একটি চাঁদময় রাত অথবা খোলামাঠের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস- এসবের বর্ণনায় তার যে শক্তি, তার তুলনা পাওয়া কঠিন। সেরকম প্রতিদিনের ভাষায় (যার ভিতর ছিল আঞ্চলিক ভাষাও), ছোট ছোট টানে, মানুষে মানুষে সংসারের অন্য মানুষদের এসব সম্পর্ক উন্মোচন করাটা কঠিন হলেও হুমায়ুন অবলীলায় তা করতেন। চরিত্রদের তিনি গোড়া থেকেই খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে তৈরি করতেন— হিমুর মতো চরিত্রেরও একটা বিশ্বাসযোগ্যতা আছে, যেহেতু আমাদের প্রত্যেকের ভিতরে একজন হিমু বাস করে, হয়তো একজন মিসির আলীও । ছোটগল্পে হিমু অথবা মিছির আলীর অল্পস্বল্প উপস্থিতি বেশ কয়েকটি চরিত্রে এবং অনেক চরিত্রের খামখেয়ালিপনা অথবা আপাত যুক্তিমনস্কতা হিমু। অথবা মিছির আলীকে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার মানুষের চরিত্রের জটিলতা, আপাত বিরোধ এবং নানা মাত্রায় তাদের প্রকাশ সেই 'নন্দিত নরক’ থেকেই আমরা দেখে আসছি। তবে উপন্যাসে যতটা সময় নিয়ে, কিছুটা রয়ে সয়ে তিনি তাঁর চরিত্রকে প্রকাশ করতে পারতেন, ছোটগল্পে সেরকম বিলাস তাঁর সম্ভব ছিল না। কিন্তু কয়েকটি বর্ণনা অথবা বিবরণে তিনি যেভাবে এক একটি স্বয়ম্ভূ চরিত্র তৈরি করতেন, যাদের ভোলা পাঠকদের পক্ষে সম্ভব নয় । তাতে বোঝা যায় ছোটগল্পে তিনি কতটা স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন এবং এ সাহিত্যশ্রেণিতে তার কতটা অধিকার ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে হুমায়ূন আহমেদের বাবা শহিদ হয়েছিলেন। জীবনের শুরুতেই তিনি বাবাকে হারিয়েছিলেন। হয়তো সেজন্য মুক্তিযুদ্ধ তার অনেক গল্পে প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে এবং হয়তো সেজন্য বাবা ও ছেলের মধ্যে এক অদ্ভুত, মায়াময় সম্পর্ক তিনি গল্পে তৈরি করেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি দেশে ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধে ছিলেন না, তার বাবার অনুপস্থিতি ছিল তাঁর জীবনজুড়ে । এজন্য উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি—এই দুই প্রেক্ষাপটেই মুক্তিযুদ্ধের গল্পকে তিনি সাজান, বাবা-ছেলের সম্পর্ককে সাজান। মুক্তিযুদ্ধ কিছু গল্পের পুরো জমিনজুড়ে দীপ্যমান, কিন্তু গল্পে আছে উল্লেখ হিসেবে, গল্পের পটভূমিতে অথবা এর গভীরে বয়ে চলা একটি অন্তর্লীন স্রোতের মতো এবং যখনই মুক্তিযুদ্ধ প্রধান ঘটনা হিসেবে দেখা দেয় তার কোনো গল্পে, হুমায়ূন চলে যান সাধারণ মানুষের জীবনে, কারণ সেখানেই নিহিত আছে মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি। তার গল্পে সকলের চেনা যোদ্ধা বা নায়কেরা নেই, আছেন সাধারণ মানুষজন, যাদের জীবনের ওপর দিয়ে একটা ঝড়ের মত বয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ অথবা যাদের জীবনকে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করেছে এ যুদ্ধ। ফলে হুমায়ূনের বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধ এক অপূর্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হয়।

ছোটগল্পের দুটি ধারা আমাদের সাহিত্যে বিদ্যমান। এর একটি হলো ‘লেখার' ঐতিহ্যে সমৰ্পিত, অন্যটি 'বলার' ঐতিহ্যে। আমাদের দেশে গল্প লেখার ঐতিহ্যটি সাম্প্রতিক, কিন্তু বলার ঐতিহ্যটি দীর্ঘকালীন। এখনও এদেশের অর্ধেকের মতো মানুষ নিরক্ষর, ফলে লেখার ঐতিহ্যটি তাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে। কিন্তু বলার ঐতিহ্যে তারা স্বতন্ত্র অংশ নিতে পারে। হুমায়ূন আহমেদ গল্প বলার ঐতিহ্যে নিজেকে স্থাপন করেছেন; গল্প কথকদের মেজাজ, ভঙ্গি এবং শৈলী, শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের অনিবার্যতা এবং শ্রোতাকে গল্পের প্রয়োজনীয় একটি অংশ ভাবার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এবং হালকা চাল, হাস্যরস, শব্দ নিয়ে খেলা করা ইত্যাদি বিষয়ে মনোযোগী হয়েছেন। এজন্য পাঠককে খুব সহজেই তাঁর গল্পের অন্তঃপুরে ঢুকে পড়তে হয় এবং সে তাকে একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে পায়। গল্পকথকের শক্তিগুলো হুমায়ুন নিজের ভিতরে সঞ্চয় করতে পেরেছিলেন। প্রতিটি গল্পে তাই এত চুম্বকি আকর্ষণের এতটা টানের সঞ্চার করতে পেরেছিলেন। 

হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্পের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে, তাঁর উপন্যাসের ভিড়ে যেন ছোটগল্পগুলো হারিয়ে না যায়। এসব গল্প বাংলা সাহিত্যের সম্পদ—এগুলোর তুল্য তেমন বেশি গল্প লেখা হয়নি আমাদের সময়ে। তার ছোটগল্পের ওপর গবেষকদেরও অনুসন্ধানী দৃষ্টি পড়া উচিত, যাতে তার উৎকর্ষের রসায়নটি চিহ্নিত করা যায়, তার গল্পপ্রতিভাকে উদযাপন করা যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ