মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

সমীরণ দাস'এর গল্প : সর্পপুরাণ

বাড়ির পাশে একটা বিশাল বটগাছ। সেই গাছের ডালের ভিতর দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ লাফিয়ে নামল সুবিমলের বাড়ির ছাদে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে , চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে চারদিক। দূরে কুকুর ডেকে ওঠে , রাস্তার উপর দিয়ে একটা ক্লান্ত ট্রাক ধোঁয়া বমি করতে করতে শেষ ট্রিপ সারে।

সুবিমলের দোতলা বাড়ি। অফিস থেকে ধার নিয়ে বাড়িটা করেছে সে। যখন থেকে কিস্তির টাকা কাটা শুরু হয় , বেতনের ষাট শতাংশই বেরিয়ে যেতো। বাকি চল্লিশ শতাংশেই চালাতে হত সাংসার। অনেক কষ্ট করেই মণিকা সংসারটা টেনে নিয়ে গেছে – নিজের সুখ-বিলাসের চাহিদা পূরণের জন্য স্বামীকে অনুযোগ না করে। কোনও রকম আঘাত না দিয়ে। 

বাড়ির কথা , স্ত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে সুবিমলের অনেক কিছু মনে পড়ে। যে সমস্ত আরব্ধ কাজ করা হয়নি , নিজেকে সম্পূর্ণ নিংড়ে সেই সব কাজ করতে পারেনি বলে ওর মনে চূড়ান্ত আপসোস, হয়ত জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সেই আপসোস থেকে যাবে। যে রকম থাকে একজন ব্যর্থ মানুষের ; নিজের সর্বনাশ যে সে নিজেই করেছে। 

ছাদের ওপর চারদিকে ছয় ফুট উঁচু প্যারাপেট গাঁথা। ঢালাইয়ের পর ছাদের মাঝামাঝি নিচের দিকে যে চাপ পড়ে , সেটা নিস্ক্রিয় করার জন্যই এটার প্রয়োজনীয়তা। তাছাড়া নিরাপত্তার ব্যাপারটা তো আছেই। সুবিমল ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে এসে জ্যোৎস্না উপভোগ করতে করতে কথাগুলো ভাবছিল। তখনই মনে হল , শরীরের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হয়েছে। কপাল কুঁচকে সুবিমল ভাবল , কী ব্যাপার ? পেট খারাপ হয়েছে কী ? খাওয়া-দাওয়ার তো কোনও অনিয়ম হয়নি ! তাহলে ? 

সুবিমল চাঁদের আলো উপভোগ করতে এসেছিল ছাদে , কিন্তু আর দাঁড়াতে পারল না। দ্রুত ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অনুভব করল , কী যেন একটা উঠে আসছে পেটের ভিতর থেকে। বমি ? না ! তাহলে ? সে বেসিনের সামনে এসে হাঁ করার আগেই মেঝের ওপর বসে পড়তে বাধ্য হল। বিস্মিত হয়ে দেখল , মুখ দিয়ে একটা মাঝারি মাপের ময়াল সাপ বেরিয়ে আসছে। 

সুবিমল অত্যন্ত ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইল , কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বের হল না। সে সাপটার দিকে তাকাল। মনে হল , মৃত্যুর সময় কৃষ্ণ ভ্রাতা বলরামের গলার ভিতর থেকে সহস্রফনা সাপ বেরিয়ে এসে পাতালে চলে গিয়েছিল । এটাও কি সেইরকমই কিছু ? তাহলে আমারও কি মৃত্যু আসন্ন ? সে আরও ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। 

ময়ালটা মসৃণ গতিতে ঢুকে পড়েছে খাটের নিচে। তারপর একটু একটু করে শরীর টেনে ঘুরছে দেওয়ালের কোন ঘেঁষে। সুবিমল ফের চিৎকার করে ডাকল, মণিকা ? মণিকা? কিন্তু এবারো স্বর বের হল না ওর গলা থেকে। অথবা গলা থেকে স্বর বের করে ডাকতেই সাহস পেল না। যদি সাপটা রেগে গিয়ে ওর দিকে তেড়ে আসে ? কিন্তু আমার শরীরের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা সাপ আমারই ক্ষতি করবে ? মনে হয় না। সে বিছানার ওপর উঠে বসে। 

সাপটা চারিদিকে ঘুরে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে। র‍্যাটলস্নেক যখন চলাফেরা করে , শব্দ তৈরি হয়। টিভি-তে দেখেছে। কিন্তু এটা তো ময়াল। এটার গতিবিধির কোনও আওয়াজ নেই। ধীর , গম্ভীর পুরুষালি দাপটের সঙ্গে ওটা ঘুরছে নির্ভীক ভাবে। সুবিমল ওপরের দিকে তাকাল , ডানদিকে তাকাল , বাঁদিকে তাকাল।এই ঘর থেকে বের হওয়ার একটাই দরজা। সেই দরজার সামনেই ওটা অবস্থান করছে। এই অবস্থায় যদি আক্রমণ করে , কী 

করবে ? অনেকে দোতলার বারান্দার গ্রিলে একটা দরজা রাখে , এমারজেনসি দরজা। কোনও কারণে ভিতরে আটকে পড়লে ওই দরজা খুলে যেন বেরিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সুবিমল সেরকম ব্যবস্থা করেনি।গ্রিলের মিস্ত্রি বলেছিল , তবুও গুরুত্ব দেয় নি। আশ-পাশের কোনও বাড়িতেই ওরকম ব্যবস্থা নেই। তাহলে আমার বাড়িতেই বা কেন থাকবে ? কিন্তু এখন বুঝতে পারছে , গ্রিলে একটা দরজা রাখলে ভাল হত। 

ময়ালটা এগিয়ে এসে সুবিমলের খাট ও দরজার মাঝখানে লম্বালম্বি হয়ে পড়ে আছে , মাথাটা ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সুবিমল ভাবল , আমার শরীরের মধ্যে ময়ালটার জন্ম হল কীভাবে ? এই রকম বিস্ময়কর ঘটনা আজকের পৃথিবীতে ঘটে কি ? ময়ালটা মাথা ঘুরিয়ে ওর দিকেও তাকাচ্ছে। ওর চোখে কীসের প্রকাশ ? ভয় ? ক্রোধ ? প্রতিহিংসা ? যদি ভয় হয় ,বুঝতে হবে , বিপদ নেই।কিন্তু যদি ক্রোধ বা প্রতিহিংসা জ্বলজ্বল করে ,বুঝতে হবে ,বিপদ আছে । আর যদি বিপদ আসে – কী করবে সে ? সুবিমল ফের চিৎকার করল , মণিকা ? মণিকা ? এবারো গলার স্বর বের হল না । কিন্তু এরকম স্বরভঙ্গ তো ওর হয়না । অতীতে কখনো হয়নি। মোবাইলটা পকেটে নেই , থাকলে যোগাযোগ করা যেত। সুবিমল ফের তাকাল সাপটার দিকে । দেখল , ভয় নয় , অসহায়তা নয়।বরং সেখানে জ্বলজ্বল করছে ক্রোধ। হিংসা।সুবিমলের বুক কেঁপে গেল । ভাবল , এ-কী অভূতপূর্ব বিপদের মধ্যে পড়লাম ? আমার শরীরের মধ্যথেকে বেরিয়ে এসে প্রাণীটা আমাকেই ভয় দেখাছে ? 

এই কয়েক মিনিটের মধ্যে সাপটা একটু বড় হয়েছে। হয়ত ক্রমশ বাড়ছে ওটা । কারণ কী ? ওটা কী আরও বড় হয়ে আমাকে খাওয়ার চেষ্টা করবে ? এতবড়ো সাপ একবার ধরতে পারলে অবশ্যই চিপে চিপে গিলে নেবে। তাহলে কী করব এখন ? সাপটা মাঝে মাঝে মাথা নিচু করছে , ওটার শরীরের ওপর দিয়ে লাফ মেরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করব ? একবার যদি বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করতে পারি , রেহাই পেয়ে যাব। ওটা নিচে আসতে পারবে না। তারপর পাড়ার লোকজনদের খবর দিয়ে একটা না একটা ব্যবস্থা ঠিকই করে ফেলতে পারব। কিন্তু এখন প্রাথমিক কাজ --- ঘর থেকে বের হওয়া। চিন্তিত মুখে বিছানার অপর উঠে দাঁড়াল সুবিমল। 

সুবিমলের উঠে দাঁড়ান দেখেই ময়ালটা বুঝতে পারল , ও কি করতে চায়। সে মুহূর্তে মাথাটা উঁচু করল কয়েক ফুট। এখন ওর দুচোখ দিয়ে জ্বলন্ত ক্রোধ ঠিকরে বের হচ্ছে। সুবিমল বুঝতে পারল , ওটার 

ওপর দিয়ে এখন লাফ দেওয়া অসম্ভব। লাফ দিতে গেলেই ধরবে। 

সুবিমলের মধ্যে অসহায়তা জাগে। যেন ঘরের মধ্যে আটকা পড়া এক বন্দি ও।মাথার ওপর পাখাটা নিশ্চল। টিউব লাইটটা জ্বলছে। দক্ষিণের হাওয়া প্রবল বেগে ঢুকছে ঘরের মধ্যে , যা একটু আগেও ছিল স্নেহময় প্রশান্ত করস্পরশের মত। কিন্তু এখন যেন অনুভুতিটাই পালটে গেছে। হাওয়ার স্পর্শে কোনো সুখানুভূতি জাগছে না। বরং এখন ওর শরীর থেকে বের হচ্ছে ঘাম। কী করবে এখন ও ? ফের আর্তস্বরে ডেকে উঠল , মণিকা ? 

এবারো গলা থেকে কোনও স্পষ্ট আওয়াজ বেরিয়ে এল না। বরং এক দুর্বল , ঘাসঘেসে অস্পষ্ট শব্দ বেরিয়ে এসে ঘরের মধ্যেই পাক খেতে থাকে। সাপটার মুখ থেকেও শব্দ বের হয়। সুবিমল তাকাল মাথা উঁচু করা সাপের মুণ্ডটার দিকে। দেখল ,ক্রোধ চলে গিয়ে এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে হাসির রেখা। বলল , চিৎকার করতে চাইছ ? বউ তোমাকে বাঁচাবে ? অসম্ভব। 

সুবিমল ভাবল , আমি নিজেকে বাঁচাতে পারছিনা বলেই তো স্ত্রীর সাহায্য চাইছি। ডাকছি। কিন্তু সে ডাক যে পৌঁছচ্ছে না। তাহলে কীভাবে মণিকা আমাকে বাঁচাবে ? সাপটা বলল , তুমি একটা মূর্খ । 

সুবিমল এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে কিছুটা । তবুও বিভ্রান্ত ভাবে বলল , কেন ? 

কেন বুঝছ না ? মানুষ নিজেই নিজেকে বাঁচায়। অন্যেরা সেই চেষ্টায় সহযোগিতা করে মাত্র। তাহলে এখন কী করব আমি ? ভাবল সুবিমল। কীভাবে নিজেকে বাঁচাব ? সাপটা ফের মাথা তুলে ওর দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আসতে থাকে। ময়ালটা বলল , আজ তোমাকে খাব। অনেকদিন মানুষের মাংস খাই না। মানুষের মাংস অতি সুস্বাদু , তোমার শরীরের মধ্যে অবস্থান করে দীর্ঘদিন তোমাকে লক্ষ্য করেছি , পরিকল্পনা করেছি , কীভাবে তোমাকে পাকড়ানো যায়। এবং আজ পাকড়েছি যখন , ছাড়বো না। 

শুনতে শুনতে সুবিমলের বুকের মধ্যে ভয় তীব্রতর হয়। ময়ালটা আমার শরীরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আমাকেই খাবে ? তাহলে আজই কি আমার জীবনের শেষ দিন ? যদি তাই হয় , ছেলেটার কী হবে ? ওকে ঠিক মত মানুষ করার জন্যও তো আমাকে আরও বেশ কয়েক বছর বাঁচতেই হবে। সাপটা একটু ব্যাঙ্গাত্মাক সুরে বলল , ভাবছ ? ভাব। বেশি করে ভাব। দেখ ,যদি বাঁচার কোনও উপায় বের করতে পার। কিন্তু লাভ নেই , আমার হাত থেকে তুমি রেহাই পাবে না। 

সুবিমল আরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তবুও সে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সেটাকে সাক্রিয় রাখার চেষ্টাও করল। এই পরিস্থিতিতে কি বাঁচার কোনও উপায়ই নেই ? কিছুটা সময় কি ব্যয় করা যায় না ওটার সঙ্গে কথা বলে ? একটু পর মণিকা ডাকবে খাওয়ার জন্য। তখন যদি না যেতে পারি , ও ঠিকই ওপরে উঠে আসবে। এবং এসেই বুঝতে পারবে , কী ঘটেছে । সেই সময় পর্যন্ত আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে। ময়ালটা গম্ভীরভাবে বলল , তৈরি হও। আমার খিদে পেয়েছে। 

সুবিমল ওর সমস্ত চিন্তাভাবনা সংহত করে। অত বড় সাপটা যদি একবার হা করে আমার মাথাটা ধরতে পারে , নিশ্চিতভাবে একটু একটু করে পুরো শরীরটা গিলে নেবে। ভাবতে ভাবতে সুবিমল উঠে দাঁড়াল বিছানার ওপর। দুটো উপায় আছে। এক , উপরের নিশ্চল পাখাটা ধরে ওটার ব্লেডের ওপর উঠে পড়া। বহু বছর আগে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিল , নায়িকা পাখার ব্লেডের ওপর বসে দুদিকে পা ছড়িয়ে দিয়ে কথা বলছে। গান করছে। সেইরকম কি উঠে পড়ব ? তাহলে সাপটা নিশ্চয়ই অত ওপরে উঠে আমাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু সিনেমার দেখা পাখার সঙ্গে এই পাখার মিল নেই। এটা ধরে ঝুলে পড়া যায় , কিন্তু ওপরে উঠে বসা যায় না। সিলিং আর ব্লেডের মাঝখানের জায়গাটা খুবই কম। সেই স্বল্প জায়গায় বসা একেবারেই অসম্ভব। তাহলেও পেঁচিয়ে , কুঁকড়ে – যেভাবেই হোক না কেন ওখানেই শরীরটা গুঁজে ঝুলে থাকতে হবে। যদি পারা যায় , তাহলেই হয়ত বাঁচার একটা ক্ষীণ আশা আছ। 

আরও একটা উপায় আছে , দ্রুত লাফ দিয়ে বাথ্রুমের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া। যদি সেটা করা যায় , সাপটা আর কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু ওটার গায়ে যা শক্তি , বাথ্রুমের দরজা ভাঙ্গাও হয়ত ওর পক্ষে অসম্ভব নয়। তবুও এই দুটোর মধ্যে যে কোনও একটা উপায় অবলম্বন করতেই হবে। 

ময়ালটার মুখ থেকে অস্পষ্ট শব্দ বের হল। সুবিমল দেখল , ওটা হাসছে। ব্যঙ্গাত্মক হাসি। সুবিমল বলল , হাসছ কেন ? 

ময়ালটা হাসতে হাসতেই বলল , তুমি দুবার তাকিয়েছ ওপরের পাখার দিকে। দুবার বাথ্রুমের দিকে। তোমার তাকানো দেখেই বুঝে নিয়েছি --- কী করতে চাও। কিন্তু পারবে না। কিছুই করতে পারবেনা তুমি। 

বলতে বলতে ময়ালটা তার দীর্ঘ লেজ ঢুকিয়ে দিল বাথরুমের দরজার ভিতর দিয়ে।এখন লাফ দিয়ে বাথ্রুমের মধ্যে ঢুকতে পারলেও দরজা বন্ধ করা যাবেনা। তাহলে ? আবার ঘামতে শুরু করল সুবিমল। এবং ঘামতে ঘামতেই ফের তাকাল ওপরের নিশ্চল পাখাটার দিকে। ময়ালটা মানুষের মতই বুদ্ধিমান। ওটার শরীর এখন দশ ফুটের মত লম্বা হয়েছে।লেজটা ফুট দুয়েক ঢুকিয়ে দিয়েছে বাথ্রুমের মধ্যে। এবং এটা করার জন্যই সামনের দরজা কিছুটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এই অরক্ষিত দরজার ভিতর দিয়ে কি এক লাফে নিচে নেমে যেতে পারবে সুবিমল ? কিন্তু সেটা সম্ভব হলেও বাস্তবে হয়ত পারবে না তীব্র ভীতির জন্য। 

সুবিমল উঠে দাঁড়াল। একটু একটু করে আকস্মিকতা সামলে নিয়েছে। ধীরে ধীরে কিছুটা বেপরোয়া ভাবও জেগে উঠছে ওর মধ্যে।হার স্বীকার করে নেওয়া মানেই তো সব শেষ হয়ে যাওয়া। হার স্বীকার করব কেন ? ভাবল সুবিমল , হারব না। শেষ পর্যন্ত লড়ব। ভাবতে ভাবতে হাত বাড়িয়ে ওপরের পাখাটা ধরল। 

সুবিমলের ওজন ষাট কিলো। কোনোক্রমে পাখার ওপর উঠে শরীরটা বিছিয়ে দিতে পারলেও পাখাটা কি ঐ ওজন ধরে রাখতে পারবে ? যদি না পারে , সবশুদ্ধ ছিঁড়ে পড়বে বিছানার ওপর। বড় ধরনের চোটও লেগে যেতে পারে। কিন্তু এটা করা ছাড়া আর কোনও উপায়ও যে খোলা নেই সামনে। 

পাখার ওপরের রডটা ধরে হাতের পেশির সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে শরীরটা তোলার চেষ্টা করল সুবিমল। এবং সেটা করতে করতেই বুঝল , কাঁধটা পাখার ব্লেড পর্যন্ত তুলতে পেরেছে। কিন্তু শরীরটা নানা রকম কসরত করেও ওটার ওপর তুলতে পারছে না। যদি পা দুটো কোথায়ও ঠেকানো যেতো , সেই জায়গায় চাপ দিয়ে শরীরটা তুলতে পারত পাখার ব্লেডের ওপর। কিন্তু সেই সুযোগ নেই , হাতের শক্তির সাহায্যেই যা করার করতে হবে। সুবিমল ক্রমাগত চেষ্টা করতে থাকে। এবং ওর সেই বার্থ চেষ্টা দেখেই ময়ালটা ভাবল , সুবিমল হয়ত উঠতে পারবেনা পাখার ওপর। সুতরাং আজ সে মানুষের মাংস খাবেই। সে অবিচলিতভাবে মাথাটা তুলে ধীরে ধীরে সুবিমলের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে , আর কেন ? এবার নেমে এস চান্দু। আমার সঙ্গে সহযোগিতা কর , আমাকে গিলতে দাও তোমার শরীরটা। 

সুবিমল আরও আতঙ্কে সিটিয়ে যেতে যেতে গালাগাল দেয় , শালা , শুওরের বাচ্চা। 

ময়ালটা গম্ভীর গলায় ধমক দেয় , কী হল , নামো বলছি। 

সুবিমল নামে না। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে একই রকমভাবে ঝুলে থাকে। ময়ালটা বোঝে , লোকটা কিছুতেই নামবে না। মৃত্যুভয় যে মানুষের সবথেকে বড় ভয়। ময়াল ধীরে ধীরে খাটের ওপর উঠে ঠিক যেখানে পাখা ঝুলছে , সেই সোজাসুজি মাথাটা রাখে। গনগনে দৃষ্টিতে তাকায় ওপরের দিকে , বলে , তুমি যেখানেই যাওনা কেন , যেভাবেই থাকোনা কেন , তোমাকে ধরবই। ধরে খাব। 

কথাটা বলতে বলতে সেই ময়াল আরও বড় হতে থাকে। ঘর ভর্তি হয়ে যায় তার প্রকাণ্ড শরীরে। এবং সেই দীঘল , বলশালী ,চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া শরীরে ভর দিয়েই মাথাটা তুলল’। এক লহমায় সুবিমলের মুখের কাছে মুখ এনে বলল , এবার ? 

যেটুকু আশা ছিল , সুবিমল বুঝল ,সেটুকুও শেষ। শরীর থেকে সমস্ত শক্তিই কোথায় যেন চলে গেছে। মুহূর্তে হাত শিথিল হয়ে গেল। পড়েই যাচ্ছিল , কিন্তু তার আগেই ময়ালটা ধরে নিল ওকে। 

সাপটা সুবিমলকে বিছানার ওপর নামাল , একটু সময় নিল , যেন সে যুদ্ধ জয় করেছে। বুঝতে পেরেছে , বিজিত শত্রুর আর শক্তি নেই লড়াই করার। সুতরাং তাড়াহুড়োরও আর প্রয়োজন নেই। 

সুবিমল তখন প্রায় অচেতন। নড়তে পারছে না। কথা বলতে পারছে না। ময়ালটা ওর দিকে তাকিয়ে উদগ্র খিদে অনুভব করল। দ্রুত হাঁ করে সুবিমলের মাথাটা ওর মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে গিলতে শুরু করল। অত্যন্ত ধীর , স্থির , নিশ্চিত সেই প্রক্রিয়া। আধ ঘণ্টা পর সুবিমলের শরীরটা পুরোপুরি উদরস্থ করে তৃপ্তির শ্বাস নেয় ময়াল। আহঃ , কী আরাম। তখন একতলা থেকে মণিকার স্বর ভেসে আসে , নিচে এসো। 

ডাকটা শুনে ময়াল একটু থমকায় , তারপর দ্রুত পালটে ফেলতে থাকে নিজের শরীর। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওটা মানব শরীরে রূপান্তরির হয়ে পরিণত হয় সুবিমলের শরীরে। এবং স্পষ্ট সুবিমলের গলার স্বরেই বলে , আসছি। 

দরজা বন্ধ করে সাবলীলভাবে নীচে নামতে থাকে সে। 



৩টি মন্তব্য:

  1. অসামান্য ভাবনার গল্প!
    আপনাকে শ্রদ্ধা জানানোর ভাষা নেই আমার।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. খুব ভালো গল্প। প্রতিটি শব্দের সাথে মুহূর্ত জড়িয়ে আছে যেন। শেষে সুবিমলের নিজেই নিজের শরীরে ফিরে আসার মধ্যে দিয়ে একটি সন্দর্ভের নির্মাণ হল।

    উত্তর দিনমুছুন