শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তীর গল্প: একটি রাতের গল্পকথা

সূর্য পশ্চিম দিগন্তে যাত্রা করেছে। আকাশে লেগেছে দিনশেষের রংয়ের ছোঁয়া। সেই নরম ম্লান আলো বড়ো অপরূপ করে তুলেছে চারিদিক। নদীর বুকে জলের উপরেও পড়েছে সেই রাঙা আলোর রাশি। নদীটির নাম নৈরঞ্জনা। আসন্ন সন্ধ্যার মুখে নদীর তীরে বালির চরে পা ছড়িয়ে বসেছিল দুই ভিক্ষুণী। তাদের একজনের নাম ইসিদাসী ও অন্যজনের নাম বোধি। বোধির বয়স এখনও কুড়ি বছর হয়নি, তার মুখটিতে কৈশোরের লাবণ্যমাখা। এখনও প্রব্রজ্যা পায়নি সে, উপসম্পদা নিয়ে কোশলরাজ্যের পূর্বারাম ভিক্ষুণী সংঘে থাকে।

ইসিদাসীর বয়স প্রায় তিরিশ পেরিয়েছে। সে সংঘে যোগ দিয়েছে সংসার থেকে প্রত্যখ্যাত হয়ে। তার জীবনে অনেক বেদনাবহ ইতিহাস আছে, সে একটু গম্ভীর প্রকৃতির। কথা খুবই কম বলে, বলা চলে কথাই বলে না প্রায়, এবং যখনই দু একটা সামান্য কথা বলে, সেই সময় তার শরীর সজাগ ও কঠিন হয়েওঠে ।

বোধি ইসিদাসীর সঙ্গে মগধ রাজ্যের রাজগৃহ নগরে চলেছে। সুদূর কৌশম্বী নগর থেকে নানা পথ ঘুরে অবশেষে তারাএসেছে রাজগৃহে। আজকের রাতটা বেণুবনের ভিক্ষুণী বিহারে থাকার ইচ্ছে তাদের। তবে এখন বৌদ্ধ সংঘগুলিতে ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায়, আগত সকলকে অনেক সময় বিহারে জায়গা দেয়া সম্ভব হয় না। তখন আগত ভিক্ষু বা ভিক্ষুণীদের রাতে কোনো পর্বত কন্দরে অথবা কোনো উদ্যানে বা বনের গাছের তলায় আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। গৃহস্থদের আবাসে ভিক্ষু বা ভিক্ষুণীদের থাকার নিয়ম সংঘে প্রতিষ্ঠিত নয়।

দীর্ঘপথ কেবলমাত্র পায়ে হেঁটে এসেছে তারা। রাজগৃহে প্রবেশ করার আগেই সূর্যের অসহ্য তাপে ভিক্ষুণী বোধি অসুস্থ হয়ে একটি গাছতলায় শুয়ে পড়েছিল, আর তার মাথাটিকেকোলের উপর নিয়ে তাকে জল খাইয়ে দিচ্ছিল, ইসিদাসী। সেই সময় সেখানে তরুণ শ্রেষ্ঠী সৌমাল্য তাদের দুজনকে দেখতে পেয়ে রথ থেকে নেমে আসেন। তারপর তিনি অনুরোধ করেন, তাঁর রথে অনুগ্রহ করে উঠে আসার জন্য। বোধির তখন ক্লান্তিতে প্রবলভাবে মাথা ঘুরছিল। সে ভেবেছিল, ইসিদাসী হয়তো শ্রেষ্ঠীর এই প্রস্তাবে রাজি হবে। কিন্তু ইসিদাসী শ্রেষ্ঠীকে নমস্কার জানিয়ে রথে উঠতে অস্বীকার করেছিল।

বোধির বিস্মিত মুখটি দেখে সে তাকে বলেছিল,

'স্মরণ রেখো বুদ্ধের অনুশাসণ অনুযায়ী, কখনও শক্তি থাকতে ভিক্ষুণীদের কোনোরূপ যানে অবতরণ নিষিদ্ধ, এবং তা অমান্য করলে দুক্কট অপরাধ হবে। দুক্কট অর্থাৎ বুদ্ধের শাসন অনুসারে যা দুষ্কৃত, বুঝেছো?''

সচকিত হয়ে উঠেছিল বোধি। সে এখনও বিনয় ও পাতিমোক্ষ সম্পূর্ণ অধিগত করতে পারেনি। এছাড়াও আরও কত যে বিধি নিষেধ আছে সংঘে! সব এখনও সে জানেও না।

তারপর তারা অসহ্য দহনবেলা উপেক্ষা করে বহুদূর পথ অতিক্রম করেছে। পথে ভিক্ষায় সামান্য যা খাদ্য পেয়েছে, তাই গ্রহন করেছে। রাজগৃহের মহাপথের দুপাশে ভগবান বুদ্ধের পরামর্শে বহু ছায়াপ্রদায়ী ও ফলদায়ী বৃক্ষ রোপন করেছেন মহারাজ বিম্বিসার। একটি ফলন্ত বেল গাছের তলা থেকে দুটি পাকা বেল পেয়ে বোধি ভোরবেলায় তা কুড়িয়ে এনেছিল। তারপর মনে মনে বুদ্ধকে স্মরণ করে সে দুটি দিয়েই দুজনে দুপুরের জলপান করেছিল। অবশেষে দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি দূর করতে নৈরঞ্জনার তীরে এসে বসেছে দুজন। গন্তব্য রাজগৃহ নগর এখনও খানিকটা দূরে। তবে সন্ধ্যার আগে হয়তো সেখানে তারা পৌঁছে যাবে। 

গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেল। বড় সুন্দর এই সময়। এক ঝাঁক সাদা বক সারিবদ্ধভাবে নিকটবর্তী নলবনের দিকে উড়ে গেল। নদীর ভেজা হাওয়ার ঝাঁপটায় শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে বোধির। দূরের কোনো প্রমোদবন থেকে সুগন্ধী পুষ্পের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। বোধি তার চোখদুটি বুজে রেখেই বলল,

'আরও একটু সময় কি এখানে থাকা যাবে না ভিক্ষুণী ইসিদাসী? যদি সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হবার পরে বিহারে যাই, খুব কি অসুবিধা হবে?'

'বুঝেছি! তুমি নদীর এই শীতল বাতাসে স্নিগ্ধ হতে চাইছো,তাই তো? তবে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সেখানে আমাদের যেতেহবে। মহারাজ বিম্বিসারের শাসনে রাজগৃহের পথঘাট যদিও সুরক্ষিত, তবুও আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হয় বোধি! তাছাড়া আরও একটি চিন্তার বিষয় হল, আজ বিহারে গিয়ে আমাদের আশ্রয়লাভ যদি না ঘটে? তখন কোথাও তো রাতটুকু কাটাতে আশ্রয় নিতেই হবে! রাজগৃহে অবশ্য গুহার অভাব নেই। সপ্তপর্ণী-গুহা কিংবা ইষিগলী পর্বতের গুহায়,কোথাও একটা আশ্রয় সম্ভবত পাওয়া যাবে। সেখানেও সূর্যের আলো থাকতে না যেতে পারলে, পাহাড়ে ওঠার সমস্যা হবে। হয়তো তির্থীক পরিব্রাজকেরা গুহাগুলো আগে থেকেই দখল করে রেখেছেন। কিছুই তো জানা নেই!'

'আমি এখানে এতক্ষণ চোখ বুজে শুধু বুদ্ধের ক্ষমাসুন্দর মুখটিই চিন্তা করছিলাম! আমার সর্বাঙ্গ যেন শুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে এই বাতাসে। এই পুণ্যানদীর শীতল জলেই একদা বোধিজ্ঞান লাভ করার আগে ও পরে ভগবান স্নান করেছিলেন!'

'বুদ্ধের মুখ? সর্বনাশ ! তুমি জানো, এতে শাক্যমুনি অসন্তুষ্ট হন! তিনি ব্যক্তিপূজার বিরোধী। আমাদের তিনি দেহাতীত চিন্তনে অভ্যস্ত হতে বলেছেন। তিনি বড় কঠোর। নিজে এত সুন্দর তিনি, তবুও তিনি সুন্দরকেই যেন ঘৃণা করেন। তিনি সুন্দর দেহের থেকে বেশি ভালবাসেন, মানুষের সুন্দর অন্তর। কারণ তিনি বলেন, সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, আজ আছে, কাল আর তা থাকবে না। এই প্রকৃতির প্রতিটি পদার্থই অনিত্য। অনিত্য বস্তুর সুন্দর অসুন্দর বিচার করতে নেই, কারণ তা একসময় লয় পেয়ে যায়। কিছুই স্থায়ী নয়! আমাদের তাঁর মতো করে আত্মচিন্তা ভুলে নিজের আমিত্বকে বর্জন করতে হবে।'

'আচ্ছা, আমি থেরী শোভার একটি ঘটনা শুনেছি, তা কি সত্যি?'

'নিশ্চয় সত্যি। শ্রাবস্তী নগরেই তো ঘটেছিল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা। একটি উদ্যানের ভেতর থেরী শোভার দুটি চোখের প্রশংসা করেছিল একজন কামুক ব্যক্তি। শোভা তা শুনে বিরক্ত হন, লোকটিকে অনেকবার বারণ করেন তিনি। তাতেও শোনেনি সেই দুর্বৃত্ত! তখন শোভা নিজের দু চোখে এমন আঘাত করেন যে, তার দুচোখ বেয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। তা দেখে কামুক সেই মানুষটি ভয় পেয়ে সেখান থেকে তক্ষুণি পালিয়ে যায়। শুনেছি বুদ্ধের কৃপায় শোভা তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন আবার।'

'আপনি কি তাঁকে দেখেছেন? শোভা থেরীকে?

'হ্যাঁ থেরী শোভা আমার পরিচিতা। তুমি সপ্তভগ্নীদের নাম জানো তো বোধি? গৌতম বুদ্ধের এই সুখ্যাত ধর্মে তাঁরা হলেন সকলের প্রাতঃস্মরণীয়া।'

'তাঁদের কথা শুনেছি। তাঁরা সাতজন হলেন চিরস্মরণীয়া। আমি বলছি তাঁদের নাম। প্রথম হলেন ক্ষেমা। তিনি বিম্বিসারের পাটরানি। তাঁর অধীনে প্রায় পাঁচশো ভিক্ষুণী প্রব্রজ্যা পেয়েছেন। এরপর আছেন উৎপলবর্ণা। তাঁর গায়ের রং উৎপল অর্থাৎ নীল পদ্মের মত স্নিগ্ধ ও অপরূপ সুন্দর, তাই নাকি এমন নাম। ইনি বিশেষ সাধন বিভূতিযুক্তা নারী। আছেন কুণ্ডলকেশা। তাঁর চুল কেটে দিলেও দু একদিনেই কুণ্ডলাকারে মাথা ভরে ওঠে, তাই তাঁর নাম কুণ্ডলকেশা। ইনি হলেন বিশেষ জ্ঞানী। এরপর কিসা গৌতমী। ইনি ভয়ানক কৃশ, এমন শীর্ণ দেহ বলে তাঁর নাম কিসা গৌতমী। ইনি প্রব্রজ্যালাভের কয়েকদিনের মধ্যে অর্হত্ব লাভ করেছেন। আছেন ধর্মদিন্না, ইনি ধর্ম বিষয়ে সুপণ্ডিত। সবশেষে উপাসিকা বিশাখা। ইনি যদিও গৃহী, তবুও স্মরণীয়া। সংঘের জন্য তাঁর বহু অবদান। পূর্বারাম ভিক্ষুণী সংঘের প্রতিষ্ঠাতাওতিনি। এছাড়া ভিক্ষুণীদের স্নানাগার, অসুস্থ ভিক্ষুদের জন্য চিকিৎসালয় ভিক্ষুদের অন্নদান আরও কত যে পুণ্যকর্ম তিনি করেছেন তার হিসেব নেই। তিনি হলেন ভিক্ষুণীসংঘের জননী স্বরূপ।'

'ঠিক বলেছো বোধি! একটা খবর শুনেছি, এই বিহারে সেই স্মরণীয়া থেরীদের অনেকেই নাকি উপস্থিত আছেন!'

'তবে এখনই এগিয়ে যাই চলুন! যদি তাঁদের দুর্লভ সঙ্গ একবার পেতে পারি! তাঁরা অনেকেই অর্হত্বলাভ করেছেন! তাঁদের দেখতে পাওয়াও পরম সৌভাগ্যের।

'ঠিক কথা! তাঁদের কাছাকাছি থাকাও মহা পুণ্যের বোধি। চলো তাড়াতাড়ি বেণুবন ভিক্ষুণী সংঘে যাই! আজকের রাতটা হয়তো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে আমাদের জীবনে।'






অন্ধকার পথ কিছুটা বিপজ্জনক। নারীরা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেও তাদের মুক্তি মেলেনি দুর্বৃত্তদের লোভ থেকে। নারীদের সুরক্ষার কথা ভেবে বুদ্ধ তাই অসংখ্য অনুশাসন তৈরি করেছেন সংঘে। সন্ধ্যা হয়েছে। পথ এখনই প্রায় জনশূন্য। সশব্দে হ্রেষাধ্বনি করতে করতে কয়েকটি অশ্ববাহিত রথ চলে যাচ্ছে রাজপথ দিয়ে। রাজপথের দুধারে দীপাধারে সন্ধ্যা হতেই প্রজ্জ্বলিত দীপগুলি শোভা পাচ্ছে। মাঝে মাঝে কয়েকটি শোভিত উদ্যানের ভেতর থেকে বারবণিতাদের উচ্ছ্বল কলকন্ঠে গান ও হাসির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। উদ্যানগুলিতে বিলাসী নারী ও পুরুষদের ভিড়, সেখানকার প্রাচীর বরাবর অনেক মালাকারেরা তাদের বিপণী সাজিয়ে বসে আছে,সাজানো আছে সুগন্ধী নানাধরণের ফুলের মালা, পান, ও অনেক সুগন্ধি দ্রব্য--- অগরু, চন্দন, কস্তুরী, লতা কস্তুরী ও কুমকুম। তারা উদ্যানের বাইরে বসে রসিক ক্রেতাদের অপেক্ষা করছে। লতা কস্তুরী একধরণের ভেষজ বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদের ফুল। এর গন্ধ অনেকটা মৃগ কস্তুরীর মত, এবং এর দাম অনেকটাই কম। মৃগ কস্তুরীর অভাবে এই লতার ফুল দিয়ে কাজ চালানো হয়।

এই সেই রাজগৃহ নগর, যার একদিকে ভোগ বিলাস ও বিকৃত বাসনার রাশি, অপরদিকে বিহার ও সংঘগুলিতে সর্বত্যাগী ভিক্ষুরা নিজেদের অস্তিত্বটুকুও ভুলতে উদ্যোগী হয়েছেন। 

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হবার পরে রাস্তায় পথচারী বলতে ক্ষৌমবস্ত্র পরা কয়েকজন নারী ও পুরুষ। এদের সকলের গায়ে পোড়া মাটির গয়না। মেয়েদের মাথা কাপড়ে ঢাকা। তাদের শরীর ঢাকা, কেবল চোখ দুটি দেখা যাচ্ছে। ক্ষিপ্র পদে যাতায়াত করছে তারা নগরের দোকানগুলিতে। উপাসকদের সান্ধ্য পূজার ফুল সংগ্রহ করতে কোনো গৃহস্থের দাসী হয়ত এসেছে, কারুর দাসী হয়তো এসেছে প্রভু পরিবারের সাজশয্যার উপকরণ হিসাবে ফুলের মালা বা সুগন্ধী পান কিনতে। 

গৃহস্থের দাসের দল রাস্তার দীপাধারগুলির নীচে বসে পাশা বা জুয়ো খেলছে। দাসীরা যাবার পথে তাদের কারুর দিকে ভ্রুভঙ্গী করে যাচ্ছে, কাউকে বা কটাক্ষ করছে, চোখে চোখে সংকেত আদান প্রদান চলছে। 

ধনী পরিবারের মেয়েরা সূর্যাস্তের পরে পথে থাকে না। তাদেরপোশাক সম্পূর্ণ আলাদা। তারা দু কুল পরিধান করে, তা একধরণের সূক্ষ্মবস্ত্র। তাদের উর্ধাঙ্গে বস্ত্রের উপর আরও একটি উর্ধবাস থাকে শোভনীয়তা বজায় রাখার জন্য। ধনীরা সকলেই সবসময় সোনা, মুক্তা ও নানা রত্নের অলঙ্কার ব্যবহার করেন। পূজা অর্চনায় ব্যবহার হয়, পট্টবস্ত্রের চেলী। 

সন্ধ্যার পর অন্ধকার পথে দস্যুর উপদ্রব হয়। মাঝে মাঝে প্রহরা স্বরূপ ঘোড়ায় চেপে দণ্ডধারী রাজার কর্মীকেরা যাতায়াত করেন পথে। তা সত্ত্বেও নারীদের নিরাপত্তার অভাব এখনও আছে মগধে। বিবাহিতা নারীদেরও কদর্য কামুকের লালসা থেকে মুক্তি নেই। তাদের সুযোগ পেলেই জোর করে অপহরণ করে প্রমোদ উদ্যানে প্রেরণ করা হয়।

মহারাজ বিম্বিসার বৌদ্ধধর্মের উপাসক। তাঁর প্রভাবে এই রাজ্যে গড়ে উঠেছে একাধিক ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী সংঘ। বুদ্ধ ভোগের অসারতা বোঝাতে জীবনপাত করছেন। তাঁর পদতলে একত্রিত হয়েছে অসংখ্য শিষ্য ও উপাসকেরা, তবুও জম্বুদ্বীপের বৃহত অংশের এখনও ধারণা, ভিক্ষুরা কর্মবিমুখ, তাই তারা ভিক্ষাণ্ণে জীবনধারণ করে সুখে কাল কাটায়। তাদের ত্যাগ এবং প্রব্রজ্যা সম্পর্কে এখনও অনেক মানুষের মনেই সম্যক কোনও ধারণাই গড়ে ওঠেনি। বিম্বিসারের রাজত্বকালের মগধ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রতীক হয়ে বিরাজ করছে, যেখানে চরম ভোগ ও ত্যাগের নিদর্শন একত্রে দেখতে পাওয়া যায়।



ধীরে ধীরে নগরের বুকে রাত্রি নেমে এল। অমাবস্যা তিথির মেঘমুক্ত আকাশের বুকে ফুটে উঠল অসংখ্য নক্ষত্রমালা। এক নারীর নিকষ কালো আঁচলে যেন হীরক কণার দ্যুতি জ্বলে উঠেছে। অবশেষে সংঘের সুবিশাল চাতালে এসে পৌঁছালোদুই ভিক্ষুণী বোধি আর ইসিদাসী। চাতালটি ঘিরে আছে ছোট ছোট পাথরের ঘর। কিছু মাটির ঘরও আছে। ঘরগুলি বেশিরভাগই এক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট। ভেতরে একটি বড় দালান আছে। বেশি জনসমাগম হলে বাইরের চাতালেও শয়ন আসন বিছিয়ে রাত্রিবাস করা হয়। চাতালে একটি পাথরের গোলাকৃতি সুন্দর চৈত্য আছে। চৈত্যটি ঘিরেই ঘরগুলি নির্মিত হয়েছে। চৈত্যটিতে রাখা আছে বুদ্ধের কেশধাতু।

ইসিদাসী ও বোধি বুদ্ধের সেই চৈত্যে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। ঘরগুলিতে এখন সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলছে। একজন বয়স্কা ভিক্ষুণী এসে তাদের বিশ্রামগৃহে নিয়ে গেলেন। তাঁর হাতে গোলাকৃতি একটি বিরাট মাটির প্রদীপ জ্বলছে। একটু সংকোচের সঙ্গে ইসিদাসী বলল,

'আজ রাতে আমরা এই সংঘে আশ্রয় চাইছি।'

'সংঘে ভিক্ষুণীদের সংখ্যা অতিক্রম করে গেছে, কিন্তু তোমরা দুজন আজ এখানে অবশ্যই থাকতে পারো। তবে রাত্রে হয়তো কোনো প্রকোষ্ঠে তোমাদের জায়গা হবে না, এই চাতালে বিশ্রাম করতে হবে, প্রকোষ্ঠগুলি এখন আর ফাঁকা নেই।'

'আমাদের তাতে কোনো অসুবিধা নেই। আচ্ছা স্থবিরাপটাচারা কি এই সংঘে আছেন? আমরা কি তাঁর কাছে আজ ধর্ম উপদেশ পেতে পারি?'

'ঠিক সময়ে এসেছো তোমরা। এই সময় থেরী পটাচরা বেশিরভাগ দিনই তাঁর সান্ধ্য ধ্যানাদি সেরে বাইরে আসেন এবং অনেক সময় আগত ভিক্ষুণীদের ধর্মোপদেশ দেন। তোমরা চীবর পরিবর্তন করে হাত মুখ ধুয়ে এই চাতালে এসো। চাতালের বাইরে জলাধারে জল রাখা আছে। হাত ধোবার এবং পানীয় জলের পাত্র পৃথক। এসো! আমি তোমাদের তা দেখিয়ে দিচ্ছি। দুপুরের আহার করা হয়েছে তো? রাত্রে এই ভিক্ষুণীসংঘে বুদ্ধের অনুশাসন মেনে কঠিন খাদ্য নিষিদ্ধ। অসুস্থরা অবশ্য পথ্য হিসেবে দুধ খেতে পারবে।'

'তাহলে বোধিকে এক পাত্র দুধ দেবেন। সে আজ সকাল থেকেই পথশ্রমে বিশেষ অসুস্থ।'

'তোমরা দুজনেই দুধ খেতে পারো। বহুদূর পথ অতিক্রম করে এসেছো। গরম দুধ খেলে সুস্থ বোধ করবে, দুজনেই। আমি মধু মিশ্রিত দুধ নিয়ে চাতালে আসছি। তোমরাও তৈরি হয়ে এসো।'

চাতাল থেকে একটা বাঁক নিয়ে কোণাকুণি যে ঘরটি দেখা যায়, সেটি থেরী পটাচারার বাসস্থান। তিনি আজ চাতালে আসেননি দেখে, বোধি আর ইসিদাসী তাঁর ঘরে দেখা করতে গেল। বোধি শিহরিত হয়ে দেখল আরও তিনজন থেরী সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত আছেন। বোধি দেখেই চিনতে পারল, থেরী কুণ্ডলকেশাকে। সংঘে একমাত্র তাঁর মাথায়সামান্য কুঞ্চিত কেশ সবসময় দেখা যায়। বাকি দুজন একজন বৃদ্ধা ও কৃশ কিসাগৌতমী এবং অন্যজন অপরূপ সুন্দরী থেরী উৎপলবর্ণা। তাঁর গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম। তাতে যেন নীল পদ্মের মতো জ্যোতি। তারা সকলে পরস্পর পরিচিত হল।

পটাচারা বললেন,

'আজ এক আশ্চর্য মনোরম সন্ধ্যা। এই কক্ষে আজ আমরা ছজন নারী উপস্থিত। পূর্ব জীবনে আমরা মায়া ও মোহের ছলনায় এবং ছয় রিপুর তাড়নায় অনেকবার দিকভ্রান্ত হয়ে অবশেষে এসে পৌঁছেছি বুদ্ধের চরণতলে। আজ আমি কোনো ধর্মকথা বলবো না, বরং আমরা আমাদের পূর্বজীবন-কথা আজ প্রত্যেকে সকলকে বলি এসো! আমরা কোনো কথা কেউ গোপন না করে, প্রত্যেকে নিজেদের কথা আলোচনা করলে,সকলেই মোক্ষমার্গে আরও উন্নীত হবো।'

সকলেই পটাচারার কথায় সমর্থন জানিয়ে বলল, ''সাধু! সাধু!'' পটাচারা বলল,

'আমি থেরী কিসা গৌতমীকে প্রথমে তাঁর জীবন কথা বলতে অনুরোধ করবো, কারণ তিনি আমাদের মধ্যে সকলেরবয়সজ্যেষ্ঠ।'

ঘরের মাঝখানে একটি দীপদানীতে একটিমাত্র দীপ জ্বলছে। বিহারে রাত ঘনিয়ে এসেছে। আজকের রাতটি তারা সকলে ধর্মালোচনা ও আত্মসমীক্ষায় কাটাবে স্থির করেছে। দীপের পাশে কয়েকটি পাহাড়ি পতঙ্গ উড়ছে। ঘরের দেওয়ালে পতঙ্গের ওড়ার ফলে ছায়াগুলি ইতস্ততঃ ঘোরাফেরা করছে। যেন অনেক কালের অনেক প্রাচীন কথারা ঘোরাফেরা করছে ঘরের প্রকোষ্ঠটিতে। কোথাও এতটুকু শব্দ নেই। নিস্তব্ধ নিশীথ রাত্রিতে ছজন নারী মুখোমুখি বসেছে ধর্ম আলোচনায়। বাইরে সারাদিনের গুমোট গরমের পরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, চরাচরে নেমেছে নিঃসীম শান্তি। কেবল হাওয়া আর বৃষ্টি পড়ারশব্দ ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই।






কিসা গৌতমীর কথা

ফিসফিস করে যেন আপন মনে কথা বলতে শুরু করল বৃদ্ধা গৌতমী। কথা বলার সময় তার স্বর কাঁপে। বয়সের তুলনায় শরীরও অনেক বেশি ক্ষয়াটে হয়েছে তার। নিজের উপর সারাজীবন কম অত্যাচার হয়নি। এবার সে বলতে লাগল,তার নিজের কথা। 

আমার নাম গৌতমী। শরীর আমার অতি কৃশ, তাই লোকে আমাকে বলতো কিসা গৌতমী। 

আমার জীবন সুখের ছিল না। আমি বড় দুঃখিনী নারী। আমি বোধিসত্ত্বকে আগে থেকে চিনতাম না, সম্পর্কে সে আমার দূরসম্পর্কের মাতুল পুত্র হয়। তবে সে ছিল রাজার ছেলে আর আমি হলাম সাধারণ প্রজা। তাই মুখোমুখি কখনও আমাদের সাক্ষাত হয়নি। বিয়ের কিছুদিন পর সন্তানহীনা এবং কুৎসিত ও কৃশ আমাকে আমার স্বামী দূর করে দিলেন। পিতা মাতাকে আগেই হারিয়েছিলাম। স্বামীর সুবিশাল প্রাসাদেও আমার আর স্থান হল না। আমাদের বাড়ির দাস দাসীদের জন্য যে নীচু কুঁড়েঘরগুলি ছিল, তার একটাতে আশ্রয় পেয়ে, অনাথাদের মতো সেখানেই থাকতে লাগলাম। 

সিদ্ধার্থের পুত্র রাহুল কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদে জন্মগ্রহন করলে, সিদ্ধার্থকে খবর দেওয়া হল। সে তখন কিছুটা দূরে প্রমোদ উদ্যানে বাস করছিল। রাজার আদেশে দিবারাত্রি সেখানে নাচ, গান আর নাট্যশালার আসর বসানো হয়েছিল, যাতে রাজপুত্রের মুখ ভোগ্যবস্তুর প্রতি ধাবিত হয়। কিন্তু তাই কখনও আবার হয় নাকি? সিদ্ধার্থের মন ছিল উঁচু তারে বাঁধা। তাঁকে যতই বাঁধনে বাঁধার চেষ্টা করা হোক না কেন, তা কেবলই তুচ্ছ হয়ে যায়। পুত্র সন্তান জন্মানোর সংবাদ পেয়ে সিদ্ধার্থ সোনার কারুকার্য করা এক অপূর্ব রথে চড়ে তাঁর প্রাসাদের দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন। সেইসময় আমি আমার কুঁড়েঘরেরসামনে রাস্তার উপর পড়ে থাকা রাশিকৃত শুকনো পাতা ঝাঁট দিচ্ছিলাম। দূর থেকে অপরূপ সুন্দর সিদ্ধার্থের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। আমি তাঁকে দেখে পলক ফেলতেও ভুলে গেলাম। তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ দীর্ঘদেহী এক অসামান্য যুবক! রাজপুত্র সিদ্ধার্থকে দেখতে দেখতে আমার মুখ থেকে বেখেয়ালে কয়েকটি কথা বেরিয়ে এল। মুখে মুখেই রচনা করে ফেললাম একটি গাঁথা।

'নিব্বুতা নূন সা মাতা, নিব্বুতো নূন সো পিতা।

নিব্বতা নূন সা নারী, যস্সায়ং ঈদিসো পতী তি।।'

অর্থাৎ যে মাতা পিতার এমন পুত্র, যে নারীর এমন স্বামী, তাঁরা নিশ্চয়ই পরম সুখী!

দূর থেকে তখন সিদ্ধার্থ আমার অনেকটা কাছে চলে এসেছেন। তিনি আমার গাঁথাটি শুনতেও পেলেন। কিন্তু তিনি নিব্বতে বা সুখীর পরিবর্তে, শুনলেন নিব্বাণ বা মুক্তি, কারণ তখন তিনি দিবারাত্রি সংসার ও দুঃখ জ্বালা থেকে মুক্তির কথাই ভাবছিলেন। শুনেই রথ থেকে নেমে এলেন সিদ্ধার্থ। তারপর আমাকে বললেন,

'কী আশ্চর্য গাঁথাটি বলেছো তুমি! আমার পিতা, মাতা ও স্ত্রী সকলেই নির্বাণ লাভ করবে! আশ্চর্য! অসাধারণ তোমার কথা। ধন্য তুমি। তোমার এই গাঁথাটিকে যেন আমার একটিউপদেশবাণীর মত মনে হচ্ছে!'

আমি তখন খানিকটা আনন্দে খানিকটা ভয়ে তাকিয়ে আছি সেই অনির্বচনীয় রূপবান মানুষটির দিকে। ভাবছিলাম, যেমন এঁর রূপ তেমনই সদাশয় এই মানুষটি! গরীবের প্রতি কত সদয় এঁর মন! এমন সময় সিদ্ধার্থ আনন্দিত মনে রথে উঠে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় তাঁর রথের সারথী হঠাৎ ছুটে এসে,আমাকে সিদ্ধার্থের গলার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা মূল্যের অপরূপ মুক্তার মালাটি উপহার দিয়ে, বলে গেল, এটি সিদ্ধার্থ আমাকে উপহার দিয়েছেন। আমার মন তা শুনে দারুণ আনন্দে ভরে গেল। ভাবলাম সিদ্ধার্থ আমার প্রতি আসক্ত হয়েছেন! কী ভীষণ ভুলই না ছিল তা। আমি আমার মোহান্ধ মন দিয়ে ঈশ্বর পুরুষের পবিত্র মনকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

শত দারিদ্রেও আমি কিন্তু আমার সেই মালাটি কখনও বিক্রি করিনি। এরপর আরও কতগুলি বছর কেটে গেল। আমার স্বামীর একটা খুব শক্ত অসুখ করল। তাঁর সারা শরীর বিকট ঘায়ে ভরে গেল। নিকট আত্মীয়রা তাঁকে ত্যাগ করে চলে গেল। কেউ তখন আর তাঁর পাশে নেই, তা দেখে আমি তখন তাঁর খুব সেবা করলাম। স্বামীর মনে অনুশোচনা দেখা দিল।তিনি বললেন,

'তোমার উপর আমি অযথা অন্যায় করেছি। তবুও তুমি আমাকে কখনও অনুযোগ করনি। আজ সেই পাপেই আমি বোধহয় এই ভয়ানক রোগে ভুগছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করোগৌতমী।'

আমি বহুবছর পর আবার আমার স্বামীর মন জয় করলাম। এরপর আমার একটি পুত্র সন্তান হল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম আমি। জীবনে বেশি কিছু আমি চাইনি। ছোট ছোট আশা ছিল আমার। সংসার খুব ভালবাসতাম। তা যে শোকের কারাগার তা এরপর আমি বুঝতে পারলাম, তখনও মিথ্যে সুখের আশায় আমার মন অধীর ছিল। সেই শোক না পেলে, আজ আমি এখানে, এই সংঘে কিছুতেই আসতাম না। জীবনে যা কিছু হয়, সব কিছুর পেছনেই তাই মঙ্গলময়ের হাত থাকে। তারপর এল সেই ভীষণ দিন।

হঠাৎ কয়েকদিনের অসুখে প্রথমে আমার স্বামী মারা গেলেন, তারপরই মারা গেল আমার ছেলে। কী এক বিষাক্ত কীটের কামড়ে আমার ছেলে আমার চোখের সামনেই ছটফট করে মারা গেল। ছেলের মৃত্যু আমি সইতে পারলাম না। সকলে আমাকে ছেলের সৎকার করতে বললেও আমি তা করলাম না। ছেলে বুকে নিয়ে কেবল কাঁদতে লাগলাম। আমি শুনেছিলাম, সিদ্ধার্থ এখন বোধিজ্ঞান লাভ করে বুদ্ধ নামে পরিচিত হয়েছেন। তাঁর অনেক খ্যাতি এবং অসাধারণ অলৌকিক ঋদ্ধি শক্তি। তিনি চাইলে আমার সন্তান আবার জীবিত হতে পারে। বুদ্ধের দৈব ওষুধ খেলে, ছেলে আমার আবার কথা বলবে এই ভেবে, আমি পাগলের মত তাঁর কাছে ছুটে গেলাম। 

বুদ্ধকে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই কি সেই রাজপুত্র সিদ্ধার্থ? যাঁকে সোনার বিচিত্র রথে চড়ে যেতে দেখেছিলাম? সেই তরুণ রাজপুত্র এখন যেন স্বয়ং ত্যাগ ও ক্ষমার প্রতিমূর্তি। আমি তাঁর পদতলে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলাম। বুদ্ধ বুঝেছিলেন, ব্যথিত মাতৃহৃদয় কোনো সান্ত্বনাবাক্যে শান্ত হবে না। তিনি আমাকে বললেন,

'গৌতমী! শ্রাবস্তী নগরে যাও! এবং একটিমাত্র শ্বেত সর্ষের দানা নিয়ে এসো। তবে যে বাড়ি থেকে সেই সর্ষের দানা আনবে, সেখানে যেন এর আগে কারুর মৃত্যু না ঘটে থাক।' অর্থাৎ মৃত্যুহীন কোনো পরিবার থেকে সর্ষের দানা আনতে হবে।

আমি ভাবলাম, এ আর এমনকী কঠিন কাজ! বেরিয়ে পড়লাম সর্ষের সন্ধানে। কোলে ধরা ছিল আমার মৃত সন্তান। আমি তখনও আশা করছিলাম, একবার সর্ষে নিয়ে ফিরতে পারলেই বুদ্ধ কোনো দৈব ওষুধ তৈরি করে দেবেন, আর তা খেয়ে আমার ছেলে আবার আমাকে মা বলে ডেকে উঠবে!

কিন্ত হায়! সারাটা দিন শ্রাবস্তী নগরে ঘুরে বেরিয়ে এমন একটা গৃহ আমার চোখে পড়ল না যেখানে কখনও মৃত্যুশোক প্রবেশ করেনি। এভাবে সন্ধ্যা হয়ে গেল, সর্ষে সংগ্রহ করতে পারলাম না আমি। আমার মন ধীরে ধীরে অনাসক্ত হয়ে গেল।সন্তানের শবদেহটি নিয়ে দিনের শেষে আমি মশানে প্রবেশ করলাম। শ্মশানে ধনী মানুষের সৎকার হয়, আমার মত হতভাগ্যদের সৎকার হয় মশানে। সেখানে মৃতদেহ রেখে দিলে, তা বন্য জন্তুরা এসে খায়। আমি তারপর আমার পুত্রের দেহটা মশানের একপাশে রেখে দিলাম। এক মুহূর্তের মধ্যে আমার পুত্রের দেহটা শিয়ালেরা এসে ছিঁড়ে খেতে লাগল। আমি তখন নিঃস্ব, রিক্ত! একাকী। ক্লান্ত দেহ মনে ফিরে এলাম বুদ্ধের কাছে। আমাকে দেখে সর্বজ্ঞ বুদ্ধ, সব জানা সত্ত্বেওবললেন,

'সর্ষের বীজ এনেছো গৌতমী?'

আমি তাঁকে উত্তর দিলাম,

'সর্ষের বীজের আর প্রয়োজন নেই আমার। আপনি আমাকে দয়া করে প্রব্রজ্যা দান করুন! আমি জেনেছি, পৃথিবীর সকল জীবের একটিই ধর্ম--- তারা সকলেই অনিত্য।'

কিসা গৌতমীর গল্প শেষ হল। গৌতমী আসব ক্ষয় করে শোক জয় করেছে, তবুও পুত্রের স্মৃতি তার দু চোখকে বাষ্পচ্ছন্ন করেছে আজ। সকলে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল, চিত্রার্পিতের মতো।সবার মুখের ভাষা যেন হারিয়ে গেছে। 






পটাচরার কথা

শুরু হল নতুন গল্প। এবার বলবে পটাচরা। জ্ঞানী এবং বাগ্মী পটাচরাকে দেখে কে বলবে, সে একদিন উন্মাদ ছিল! যার কোমরে কাপড় পর্যন্ত থাকত না! পটাচারা সম্পর্কে সংঘে বহু গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। বেশিরভাগই পরস্পর বিরোধী। আজ মহামান্যার মুখ থেকে শুনে সকল বিতর্কের অবসান ঘটাতে চায় সকলে। সকলে নিবিষ্ট হয়ে শুনতে লাগল পটাচরার জীবন কাহিনী। 

আমার দুর্ভাগ্যই আমাকে টেনে এনেছে বুদ্ধের কাছে। আমার জন্ম শ্রাবস্তী নগরে। আমার পিতা ছিলেন শ্রাবস্তী নগরের রাজার কোষাধ্যক্ষ। আমাদের তিন মহলা বাড়ি ছিল। ধন রত্ন প্রতিপত্তি কোনো কিছুরই অভাব ছিল না আমাদের। পিতা মাতার একমাত্র কন্যা সন্তান ছিলাম আমি, আর আমার এক ভাই ছিল। বাড়িতে অনেক যত্নে ও আদরে আমি পালিত হয়েছিলাম। পিতা আমাকে নানা শিক্ষায় পারদর্শী করেছিলেন। বাড়িতেই পণ্ডিত বেদবিদগণ আমাকে বেদ, সাংখ্য, দর্শন, ন্যায় ইত্যাদিতে শিক্ষা দিতেন। তাঁরা সকলেই আমার স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানের প্রশংসা করতেন।

এক ধনী শ্রেষ্ঠী পরিবারে এরপর আমার বিবাহ ঠিক করা হল। তাঁরা থাকতেন সাকেত নগরে। শ্রাবস্তী থেকে সাকেত বেশি দূরের পথ নয়। আমার আশীর্বাদও হয়ে গেল। আমার শ্বশুরকুলের লোকজন সোনার সুপুরী ও অন্যান্য মাঙ্গলিক উপাচার নিয়ে এসে বহু কার্ষাপণ দিয়ে আমার পিতার কাছ থেকে আমাকে প্রথামত দাবী করলেন। পিতা সানন্দে সেই উপাচার গ্রহন করলেন। আমার বিবাহ স্থির হয়ে গেল। এটিএকটি প্রথা, যা এখনও অনেক পরিবারে প্রচলিত আছে।

বিবাহ হতে তখন থেকে মাত্র একমাস বাকি। পিতা ও মাতা আমাকে তিন মহলা বাড়ির সব থেকে উঁচু মহলটিতে বন্ধ করে রাখলেন। এমনটাই সামাজিক নিয়ম। আশীর্বাদ হয়ে গেলে কন্যাদের এমনভাবেই পৃথক করে সাবধানে রাখা হয়। এই প্রথা খুব অপমানজনক। আমি শিক্ষিতা এবং মনের দিক থেকে উদার এবং বিচারশীল ছিলাম। আমি পিতার কাছে এই প্রথার প্রতিবাদ করলাম। আমার পক্ষে পরিবারে কেউ কোনো কথা বলল না। পিতার সঙ্গে আমার অনেক বাদানুবাদ হল। আমি অভিমানে সেদিন কিছু খেলাম না, একা শুয়ে রইলাম।

হঠাৎ দুপুরবেলা আমার ঘরের দরজা খুলে গেল। দেখলাম আমার ঘরের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাড়ির চাকর সত্থিয়। সে আমাদের বাড়ির রথের ঘোড়াদের দেখাশুনো করত আর ঘোড়াদের জন্য খাবার জন্য ঘাস কাটার কাজ করত। সেদিন তার দুটি চোখে আমি দেখলাম মুগ্ধতা। সত্থিয় মাঝে মাঝেই আমার দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকে- একথা আমি জানতাম, তবে কখনও আমল দিইনি। আকাশের সুন্দর চাঁদের দিকে মানুষ যেমন মুগ্ধতা নিয়ে তাকায়, সত্থিয়র দৃষ্টি ছিল তেমন। আজ আমি সত্থিয়র দিকে চেয়ে দেখলাম, সে দেখতে বেশ সুন্দর। তার বলিষ্ঠ শরীর আর দুটি সরল চোখ আমার ভাল লাগল। সে আমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। 

এমনভাবে সবার চোখ এড়িয়ে সত্থিয় এরপর মাঝে মাঝেই আমার বন্ধ ঘরে আসতে লাগল। আমাদের মধ্যে ভালবাসা আর নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে উঠল। দিন কেটে যেতে লাগল। আমার বিবাহের তখন মাত্র কয়েকদিনই বাকি ছিল। গভীর রাতে একদিন সত্থিয় আমার ঘরে এল। সে বলল,

'তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।'

আমারও মনোভাব তাই। আমরা দুজনেই খুব কাঁদতে লাগলাম। আমি সত্থিয়র বুকে মাথা রেখে কাঁদছিলাম। প্রতি মুহূর্তে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে দুজনেই কাঁপছি, তবুও এক অদ্ভুত ভাললাগার আবেশ ছড়িয়ে পড়ছিল দেহ মনে। সেইরাতে আমরা মিলিত হলাম। উন্মত্ত আবেগে ভেসে গেল সমাজ সংসার, বাধা বিপত্তি সবকিছু। তারপর সেই রাতেই আমরা দুজন ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেলাম। বিয়ে করে অপরিচিত একজনকে প্রতারণা করতে পারব না, তাই ঘর ছেড়েছিলাম। আমি জানতাম আমাদের এই সম্পর্ক আমাদের পরিবারের কেউ কখনও মেনে নেবে না। 

অচীরাবতী নদীর অপর পারে একটি গভীর বন আছে। তার নাম জালিবন। আমরা সেখানে একটি ছোট কুঁড়ে ঘর বানিয়ে থাকতে লাগলাম। চারিদিকে ঘনবন। রাত্রে হিংস্র জন্তুর ডাক শোনা যায়। মাঝে মাঝে হাতির ভয়ানক বৃংহণও কানে আসে। তবুও আমাদের সুখের সংসার গড়ে উঠল। আমার স্বামী আমাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসত। আমি তার জন্যই গভীর বনে কষ্ট সহ্য করে আছি, বলে তার মনে দুঃখের সীমা ছিল না। 

আমাকে সুখে রাখার জন্য, সত্থিয় আয়ের ব্যবস্থা করতে জীবনপাত করে পরিশ্রম করতে লাগল। নদীর ধার থেকে সে কচি ঘাস কেটে নিয়ে যেত নগরে, তা উচ্চ মূল্যে নগরের শ্রেষ্ঠীরা কিনে নিত, কারণ শ্রেষ্ঠীদের রথের ঘোড়াদের জন্য রোজ ঘাসের দরকার হত। এভাবেই আমাদের দিন কাটতে লাগল। বনের ফল মূল, পাখির মাংস, নদীর মাছ আমাদের খাদ্যেরও কোনো অভাব ছিল না। এর মধ্যে আমার একটি সুন্দর পুত্র সন্তান জন্মালো। 

আমার পুত্রটি বড় শান্ত স্বভাবের হয়েছিল। এর কিছুদিনের মধ্যে আমি আবার সন্তানসম্ভবা হলাম। প্রথমবার সন্তান হবার সময় আমি বড় কষ্ট পেয়েছিলাম। একাকী সারাদিন বনেথাকতে আমি খুব ভয়ও পেতাম। এবার ঠিক করলাম আমি যেমন করেই হোক, পিতা মাতার কাছে গিয়ে থাকব। সত্থিয়আমাকে সেখানে যেতে বিশেষ করে বারণ করল। হয়তো সে ভেবেছিল, ওখানে গেলে আমার পিতা মাতা আর আমাকে ওর কাছে ফিরে আসতে দেবেন না। স্বামীর আপত্তিতে আমি সেখানেই থেকে গেলাম।

প্রসব বেদনা শুরু হল যেদিন, সেদিনটা আমি কখনও ভুলতে পারব না। গহীন বনের ভেতর অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। আমি প্রসব বেদনায় কষ্ট পাচ্ছি। আমার পাতার ঘরের চাল ফুটো হয়ে গেছিল, সেখান থেকে আমার গায়ে জল পড়ছিল। ঘরও ঝড়ে দুলছিল। এইজন্য আমি সত্থিয়কে অনেক গঞ্জনা দিলাম। আমার সেই কটু কথা শুনে, ঝড় জলের মধ্যেই সে বনের ভেতর থেকে মজবুত বাঁশ কেটে আনতে চলে গেল। যা দিয়ে ঘরের খুঁটি তৈরি হবে।

এদিকে ঝড় ও বৃষ্টি ক্রমে বাড়তে লাগল। সে যে কী ভয়ানক বৃষ্টি! তা বলে বোঝাতে পারব না। বাজ পড়তে লাগল কড়কড় শব্দে। বড় বড় গাছগুলো যেন আমাদের বনের ভেতর পিষে মেরে ফেলবে। আমি যন্ত্রণার মধ্যেও স্বামীর চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। শেষরাতে আমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হল, কিন্তু স্বামী তখনও ফিরে এল না। প্রবল চিন্তায় তখন প্রায় আমার শ্বাসরোধ হয়ে যাচ্ছে। আমি কোনোক্রমে বিছানা থেকে উঠে দুটি সন্তানকে কোলে করে বনের ভেতর প্রবেশ করলাম। বহুক্ষণ ধরে তাকে খোঁজার পর, একটি বাঁশঝাঁড়ের কাছে আমার স্বামীর মৃতদেহ দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম সে সর্প দংশনে মারা গেছে। সম্ভবত ঝড়ের রাতেই সে মারা গেছিল। এ কী ভয়ানক বিপর্যয়!

শোকে দুঃখে বিহ্বল আমি নিজেকে শত ধিক্কার দিতে লাগলাম। ভাবলাম, এ কী করলাম আমি? কেন তাকে অনুযোগ করতে গেলাম! সে যেতে চাইলে, কেন তাকে গভীর বনে রাতে একাকী যেতে দিলাম? যদি অনুযোগ না করতাম, সে আজ বেঁচে থাকত। এতবড় আঘাতে আমার শরীর মন একেবারে ভেঙে পড়ল। তবুও এতকিছুর পরেও আমার সন্তানদের চিন্তা মন থেকে গেল না।

অবশেষে ঠিক করলাম, যেমন করেই হোক আমার সন্তানদের বড় করে তুলব, এবং সেইজন্য পিতার গৃহে আবার ফিরে যাব। নিশ্চয় একবার সেখানে গেলে তাঁরা আমার সন্তানদের মুখ চেয়ে আমার সব অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। ফিরে যেতে হলে নদী পার হতে হবে। বনের কাছের ছোট নদীটি গতরাতের বর্ষায় ফুলে ফেঁপে উঠে তখন প্রবল বেগে বইছে। দুটি সন্তান নিয়ে জলে নামতে পারলাম না। বড় ছেলেটিকে পাড়ে বসিয়ে রেখে, আমি ছোট ছেলেকে একটি ঝুড়িতে শুইয়ে মাথায় নিয়ে নদী পার হতে লাগলাম। কোথা থেকে একটি বিশাল বাজপাখি উড়ে এসে আমার সদ্যোজাত সন্তানটিকে ঝুড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল। আমি সজোরে হাততালি দিয়ে বাজপাখিটির কাছ থেকে আমার সন্তানকে ছাড়াতে চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার বড় ছেলে ভাবল চিৎকার করে আমি তাকে আমার কাছে ডাকছি। সে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল, এবং তক্ষুণি ডুবে মারা গেল। দুই ছেলের কাউকেই আমি বাঁচাতে পারলাম না। আমার দোষে আমি সেদিন স্বামী ও দুই সন্তানকে হারালাম।

নদীর পাড়ে হতচৈতন্য হয়ে বসেছিলাম। তখনও আমার দুর্ভাগ্যের আরও খানিকটা অবশিষ্ট ছিল। একজন পথিক আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। তিনি বললেন গতরাতের দুর্যোগে আমাদের বাড়িটি ভেঙে পড়েছে, এবং আমার মা বাবা ও ভাই দেওয়াল চাপা পড়ে মারা গেছেন। আমি সেই পথিকের কথা বিশ্বাস করলাম না। নদী পার হয়ে সন্নিহিত শ্মশানে এসে দেখলাম, চিতার উপর আমার মা বাবা ও ভাইয়ের মৃতদেহ শায়িত আছে। তারপর তাদের চিতাতে অগ্নিসংযোগ করা হল এবং চিতা জ্বলে উঠল। আমি কাঁদতেও ভুলে গেলাম। স্থির বিশ্বাস হল এই সমস্ত ঘটনা সাজানো, কোনোটাই সত্যি নয়। হঠাৎ হাসতে লাগলাম পাগলের মত। আমার গায়ের কাপড় সরে গেল, তবুও হাসতে লাগলাম। বলতে লাগলাম,

'সব ভুল! সব মিথ্যে! সবই আমাকে ঠকানোর ষড়যন্ত্র!'

লোকজন বলতে লাগল, এত শোক আমার মস্তিষ্ক গ্রহন করতে পারেনি। আমি পাগল হয়ে গেছি!

আমার উর্ধাঙ্গের বসন খসে পড়লেও আমার বোধ এতটুকু জাগ্রত হল না। এক সময় আমার কোমরেও কাপড় থাকল না। উন্মাদ ও উলঙ্গ হয়ে আমি নগরের পথে পথে ঘুরতে লাগলাম। কটি বস্ত্রও চ্যুত হওয়ায় আমার নাম হল, পট্টাচরা (পট্ট অথবা বস্ত্র + অচরা অথবা ধারণ না করা) বা সংক্ষেপে পটাচরা।

একদিন আমি ঘুরতে ঘুরতে জেতবন বিহারে এসে উপস্থিত হলাম। সেই উদ্যানে বুদ্ধ তখন বহু ভক্ত সমাগমে ধর্মোপদেশ দিচ্ছিলেন। আপন খেয়ালে আমি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। শ্রোতাগণ বিরক্ত হয়ে বললেন,

'এই পাগলিনীকে এখনই বিহার থেকে বের করে দেওয়া হোক!'

বুদ্ধ তা শুনতে পেয়ে বললেন,

'ওকে বাধা দিও না। এখানে আসতে দাও!'

আমি ভগবানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ভগবানকে দেখে আমার স্মৃতি তখনও ফিরে আসেনি, তবে আমার বহুদিনের পুরনো সমস্ত শোক যেন একসঙ্গে ফিরে এল। বহুদিন পরে এক ভীষণ দুঃখের অনুভূতি হল আমার। এত শোকেও এতদিন আমি কেবল হেসেছি। এতদিন পর এক ভীষণ প্লাবনের মত শোক জাগ্রত হল আমার মধ্যে। ভীষণ কষ্টে আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। তবে কেন কাঁদছি? সেই বোধ তখনও ফিরে আসেনি আমার স্মৃতিতে। আমি এতদিন কাঁদতে ভুলে গেছিলাম। সেই আমি অঝোরে কেঁদে যেতেলাগলাম। বুদ্ধ আমাকে বললেন,

'ভগিনী! তুমি তোমার স্মৃতি পুনঃপ্রাপ্ত হও।'

বুদ্ধের অলৌকিক ঋদ্ধিশক্তির প্রভাবে আমার সব কথা মনে পড়ে গেল। বোধ জাগ্রত হতে দেখলাম আমি বিবসনা। আমি সঙ্কুচিত হয়ে বসে পড়লাম। একজন আমাকে তার উত্তরীয় দান করল। আমি সেটিকে গায়ে জড়িয়ে বুদ্ধের চরণ বন্দনা করলাম। বুদ্ধ বললেন,

'পটাচরা হৃতধনের উদ্ধার অসম্ভব। এখন যে সন্তানদের জন্য অশ্রুপাত করছো, সহস্র জন্মে এমন অসংখ্যবার করেছো। শোকমগ্ন হয়ে এই দুর্লভ মানব জন্ম কেন নষ্ট করছো? তোমার মৃত আত্মীয়রা মুক্তির পথে তোমার কোনো সাহায্য করতে পারবে না। এই পরম সত্য উপলব্ধি করে সত্বর নির্বাণের পথে অগ্রসর হও।'

তারপর জীবনের কালো ও দীর্ঘ অধ্যায়গুলি শেষ করে আমি প্রবেশ করলাম আলোর পথে। প্রব্রজ্যা লাভ করে ভগবানের চরণে আশ্রয় পেলাম। আমি এক নবজন্ম পেলাম। অতীতের দীর্ঘ অধ্যায়গুলো এখন ছায়ার মত কোথায় হারিয়ে গেছে!






উৎপলবর্ণার কথা

পটাচরার কথার মধ্যে এমন এক মাধুর্য্য ছিল যে সকলে একমনে কেবল শুনেছে। পটাচরার নির্দেশে এবার নিজের গল্প শোনাবে উৎপলবর্ণা। তার গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম, দুটি চোখ যেন পদ্মের মত সুবিশাল ও গভীর, এবং তা অদ্ভুত উজ্জ্বল ও শান্ত। উৎপলবর্ণার চোখের দিকে সাধারণ মানুষ বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারবে না। সাধনালব্ধ এক অপূর্ব আলোয় তার দুটি চোখ আলোকিত, সেখানে ক্ষুদ্র কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। সে বলতে শুরু করল তার কথা। সকলেই সহজ সরল ভাষায় তাদের অকপট জীবনকাহিনী বলে চলেছে সকলের সামনে। উৎপলবর্ণার উদাত্ত কন্ঠস্বর গভীর রাত্রির নৈশব্দকে যেন ভেঙে খান খান করে দিতে লাগল।

বাইরে তখন আবার সজোরে বর্ষা নেমেছে।

আমার পিতা ছিলেন শ্রাবস্তীর বিখ্যাত শ্রেষ্ঠী, কিন্তু মাতা ছিলেন বারবণিতা। মাতা অপরূপ সুন্দরী ছিলেন। তাঁর রূপের অংশ পেয়েছিলাম আমিও, আর তাতেই ঘটে গেল সর্বনাশ। কামুক ব্যক্তিরা বালিকা অবস্থায়ই আমাকে এবং সেইসঙ্গে আমার মাকে, দুজনকেই কামনা করতেন। সেই পতিতালয়ে আমার দম যেন বন্ধ হয়ে আসত। আমার পিতা পরম দয়ালু, তিনি আমাকে সেই পঙ্কিল জীবন থেকে মুক্তি দিলেন। আমাকে একদিন তিনি তাঁর সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন, আমার শিক্ষার ব্যবস্থাও তিনি করলেন। সমাজের সকলের কাছে আমার পরিচয় করালেন--- উৎৎপলবর্ণা শ্রেষ্ঠীকন্যা, সে সামান্যা নর্তকী নয়।

আমি যেন মুক্তি পেলাম। আমি নিজের অতীতকে ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করলাম। শিক্ষায় মনোনিবেশ করলাম।এরপর যৌবনে প্রবেশ করলে, পিতা আমার বিবাহ ঠিক করলেন। এরপরেই শুরু হল বিরোধিতা। বিবাহ ঠিক করা মাত্র সমাজের উচ্চপদস্থ মানুষেরা প্রতিবাদ করলেন, আমি বারবণিতার কন্যা, সুতরাং আমার বিবাহ দেওয়া যাবে না। আমাকে হয় বারবণিতা, নাহলে জনপদবধূ হয়ে সকল পুরুষেরভোগ্যা হতে হবে। পিতা তবুও জোর করে আমার বিবাহ স্থির করলেন। পাত্র পিতার অধীনে কাজ করতেন, তাই তিনি আমাকে বিবাহ করতে আপত্তি করেননি। এই সময় আমাদের বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। যাতে কিছুতেই আমার বিবাহ না হতে পারে। পিতা বুঝলেন এই মুহূর্তে কিছু একটা করতে হবে। তিনি আমাকে ডাকলেন।

'মা আমি চাই না, তুমি সর্বজনভোগ্যা হয়ে সারাজীবন ধরেকেবল দুঃখযন্ত্রণা সহ্য করো। তুমি কি বৌদ্ধ সংঘে গিয়ে প্রব্রজ্যা নিতে আগ্রহী? তবে সেখানে যাও! পালিয়ে যাও এই পঙ্কিলতা থেকে। আমি নিজে তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেব।'

আমি তখন গায়ে কালিঝুলি মেখে মলিন বস্ত্র পরে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলাম ভিক্ষুণী বিহারে। সেখানে আমার প্রব্রজ্যা হয়ে গেল। এক পঙ্কিল জীবন থেকে অতিকষ্টে মুক্তি পেলাম আমি। প্রব্রজ্যা নেওয়ার পর আমার নিজের শরীরকে ঘৃণিত মনে হত, কারণ এই শরীর মানুষের মনে লালসার উদ্রেক ঘটায়।

আমি ঘন বনের ভেতর নির্জনে ধ্যান করতাম। আনাপান স্মৃতি ধ্যান অভ্যাসের ফলে নিজের শরীরের উপর একধরণের মায়াহীনতা এসেছিল। দিবারাত্রি ধ্যানে নিবিষ্ট হয়ে থাকতাম। সাধনমার্গে যখন বেশ অগ্রসর হয়েছি, তখন হঠাৎ একদিনএকটি বিপদ ঘটল আমার। আমার মামাতো ভাই নন্দিয়বরাবর আমার প্রতি আসক্ত ছিল। তাকে কখনও আমি গুরুত্ব দিতাম না। আমি প্রব্রজ্যা নিলেও সে তারপরেও আমাকে কামনা করত। একদিন আমি যখন নির্জনে ধ্যান সাধনা করছি, সে এসে আমার শয়ন আসনের তলায় লুকিয়ে রইল। আমি রাতে ধ্যানে বসতেই, সে আমাকে আক্রমণ করল। 

'আমি বাধা দিলাম, গায়ের জোরে না পেরে, অনেক মিনতি করলাম, তবুও সে আমাকে ছাড়ল না। তার লালসার কাছে আমি পরাজিত হলাম এবং সে আমার সতীত্ব নষ্ট করল। আমি নষ্ট হলাম। তার কাছ থেকে কিছুতেই নিজেকে বাঁচাতে পারলাম না। সকাল হতেই সেই দুর্বৃত্ত পালিয়ে গেল। আমি ছেড়া চীবর শরীরে জড়িয়ে কোনোমতে গিয়ে ভিক্ষুণীদের সবজানালাম। তাঁরা তক্ষুণি বুদ্ধকে গিয়ে বিষয়টি জানালেন।ভেবেছিলাম এবার আমাকে সংঘ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। ভীষণ হতাশায় আমার ভেতর জীবন নাশের ইচ্ছা জেগে উঠল। কিন্তু বুদ্ধের স্নেহভরা বাক্য আমাকে আবার জীবনের পথে ফিরিয়ে আনল। তিনি সত্যদ্রষ্টা, তাই তিনি বুঝলেন আমাকে। বললেন,

'তোমার ভেতর যে মহান শক্তি আছে, তা এই দেহের থেকে অনেক বড়। দেহে যেমন কীট পতঙ্গ হাঁটে এই ঘটনাকেও তেমনই মনে করো। হতাশ হয়ো না, তুমি চির পবিত্র। কেউ কখনও তোমার পবিত্রতার হানি ঘটাতে পারবে না। তবে গভীর বনে সাধনা আজ থেকে ভিক্ষুণীদের জন্য বন্ধ করা হল। এটা তাদের নিরাপত্তার কারণেই করা হল।'

এরপর বুদ্ধের কৃপায় আমি সাধনায় অনেক উন্নতি করলাম। খেচরী সিদ্ধি লাভ করার পর, আমি শ্রাবস্তীতে বিরুদ্ধবাদীদের পরাস্ত করতে পুরুষের বেশে নিজের সাধন বিভূতি প্রদর্শন করেছিলাম। সে ছিল এক অদ্ভুত দিন ছিল। বিরুদ্ধবাদীরা তখন সংঘের বিরুদ্ধে নানা চক্রান্ত শুরু করেছিল। সুন্দরী নামের একজন নর্তকীকে হত্যা করা হয়, শ্রাবস্তীতে। তারপর তার দেহ জেতবন বিহারের মাটির তলায় পুঁতে ফেলা হয়। এরপর বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে সেই হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। বুদ্ধ সকলকে সাধনলব্ধ বিভূতির প্রদর্শন করতে বারণ করেন, তবে সেইদিন বুদ্ধও বাধ্য হয়ে পরিস্থিতির চাপে তাঁর অলৌকিক শক্তি দেখিয়েছিলেন গণ্ডম্ব আমগাছের তলায়। গণ্ডম্ব নামক রাজার মালির বাড়ির একটি আম খেয়ে সেই মুহূর্তে তার বীজ থেকে একটি সুবিশাল চারা সৃষ্টি করেন বুদ্ধ তারপর সেই সুবিশাল ফলন্ত আমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে তাঁর যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন করেছিলেন। সেই বিশেষ অবিশ্বাস্য দৃশ্য অনেকেই দেখেছেন এবং সেই গল্প সংঘের সকলেই জানেন। নিজের জীবনকথা বলতে গিয়ে তা আর বলছি না। আমি সেই দুর্লভ দৃশ্য দেখতে শ্রাবস্তীতে এসেছিলাম। তারপর আমিও সেখানে আমার ঋদ্ধিশক্তি প্রদর্শন করি। সেদিনের পর থেকে বিরুদ্ধবাদীরা একেবারে স্তব্ধ হয়ে যান। অনেকেই বুদ্ধের কাছে তাঁদের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বুদ্ধের কৃপায় আজ আমি আসব মুক্ত, ষড় অভিজ্ঞায় পারদর্শিনী।








পরের বক্তা কুণ্ডলকেশা। সে দীর্ঘাঙ্গী, তার গায়ের রং চাপাফুলের মতো উজ্জ্বল, এক কথায় সে অপরূপ সুন্দরী, কিন্তু তার মুখে একধরণের দৃঢ়তা ও কাঠিন্য আছে। যা দেখে বোঝা যায়, সে সামান্যা নয়।

ভদ্রা কুণ্ডলকেশার কথা

আমার নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আমি নিজেই করেছি। আমি রাজগৃহের রাজ কোষাধ্যক্ষের মেয়ে ভদ্রা। একদিন জানলায় চোখ রেখে দেখলাম, রাজপুরোহিতের পুত্র সত্থুককে বেঁধে নিয়ে চলেছে রাজকর্মচারীরা। আমি তখন জানতে চাইলাম,

'সত্থুকের অপরাধ কী?' উত্তর পেলাম-

চুরির অপরাধে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বধ্যভূমিতে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।

শুনে আমি তাকালাম বন্দীটির দিকে। তার দুটি চোখ দেখে আমার বুকের ভেতর কী যেন হয়ে গেল। আমি মায়ায় আবদ্ধ হলাম। মনে হল যে করেই হোক, ওকে বাঁচাতে হবে।

আমি বরাবরই স্বাধীনচেতা। যা মনে হয়, তাই করতে আমি ভালবাসি। ছুটে গেলাম পিতার কাছে। বললাম এই বন্দী নির্দোষ। যেমন করে হোক একে বাঁচাতেই হবে। পিতা বহু স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে সত্থুককে মুক্ত করে দিলেন। সে প্রাণভিক্ষা পেল। আমি পিতা মাতাকে বললাম,

'আমি এই সত্থুককে স্বামী হিসেবে গ্রহন করতে চাই।'

কৃতজ্ঞ সত্থুকও আমার প্রস্তাবে রাজি হল।

আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। পিতা মাতা প্রথমে মেনে নিতে চাননি। একেই সে ছিল অভিযুক্ত, তার উপর বিদেশী। তবুও আমার জেদের কাছে ওঁরা হার মানলেন। সত্থুক আমাকে নিয়ে দূরদেশে যাত্রা করবে বলে রথে উঠল। আমি বহুমূল্য অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে এসেছিলাম। হঠাৎ রথ থামিয়ে দিল সত্থুক। বলল,

'ভদ্রা! নগর রক্ষীরা যখন আমাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই পর্বতরাজির দিকে চেয়ে অঙ্গীকার করেছিলাম, যদি কখনও প্রাণরক্ষা হয়, অর্ঘ্য দিয়ে এই পর্বতশ্রেনীর পুজো করবো। তুমি অর্ঘ্য প্রস্তুত করো।'

স্বামীর কথা অনুযায়ী আমি অর্ঘ্য প্রস্তুত করলাম। সেই পাহাড়ের নীচে কাঠ জ্বেলে রান্না করলাম। তারপর তা থালায় ঢেলে দেবতার উদ্দেশ্যে সাজিয়ে দিলাম। আমরা রথে চড়ে কিছুটা পথ গেলাম। তারপর সত্থুক আমাকে নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠতে লাগল। পথ ছিল খুবই নির্জন। সত্থুক আমাকে অলঙ্কারগুলি খুলে তার হাতে দিতে বলল। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো দস্যু তস্করের ভয়ে সে এমন বলছে। পরক্ষণেই মনে হল, অলঙ্কারগুলি নিয়ে সত্থুক আমাকে এই নির্জন পথে মেরে ফেলবে না তো? সত্যিই কি সে তস্কর ছিল? আমি কি ভুল মানুষের জীবন দান করেছি?

আমি প্রশ্ন করলাম,

'কেন? তুমি এখন অলঙ্কার দিয়ে কী করবে?'

সত্থুক বিরক্ত হয়ে বলল,

'তুমি বড়ো প্রশ্ন করো। তাড়াতাড়ি অলঙ্কারগুলো দিয়ে আমাকে মুক্তি দাও।'

'সেকী! তুমি কি কেবল আমাকে অলঙ্কারের লোভে বিবাহ করেছো?'

'তা আমি জানি না। তবে অলঙ্কার ছাড়া আমার কাছে তোমার কোনো মূল্য নেই। তোমাকে এই পাহাড় থেকে ছুঁড়ে ফেলেই দিতাম, তবুও প্রাণ রক্ষা করলাম--- কারণ তুমি আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিলে। এখন ফিরে যাও আর আমাকে মুক্তি দাও!'



আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বুঝলাম ভুল লোককে নিজের স্বামী হিসেবে নির্বাচন করেছি। মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করলাম কী করতে হবে। আমি মিথ্যে অভিনয় করে চোখে জল এনে বললাম,

'ঠিক আছে। কেবল একবার তোমাকে আলিঙ্গন করতে চাই।তারপর আমার অলঙ্কার সব তোমাকে দিয়ে আমি চলে যাব।'

আমার স্বামী রাজি হল। আমি তাকে বুকে চেপে ধরে, একমুহূর্তে ধাক্কা দিয়ে পাহাড় থেকে ফেলে দিলাম।

মানুষের কদর্য চরিত্র, আমাকে সংসারের প্রতি মোহশূন্য করে তুলেছিল। সেই পাহাড়ে তখন জৈন ধর্মাবলম্বী কিছু মানুষ বসেছিলেন। আমি ঘরে না ফিরে, তাদের সংঘভুক্ত হলাম। তাঁরা তাল পাতার কাঁটা দিয়ে আমার সমস্ত কেশ উৎপাটিত করে দিলেন। তবুও কুণ্ডলাকারে আবার কেশের আবির্ভাব হল। সেই থেকে আমি ভদ্রা নয়, কুণ্ডলকেশা নামে পরিচিতা হলাম। সেখানে আমি বহু পুথিপত্র পড়লাম, তবু মনে এতটুকু শান্তি পেলাম না। তখন আমি সেই সংঘ পরিত্যাগ করে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। বিভিন্ন মানুষকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান করে পরাজিত করাই আমার এক ধরণের নেশা হয়ে গেল।

আমি পথের পাশে জামের ডাল পুঁতে মানুষকে তর্কযুদ্ধেআহ্বান করতাম। জম্বুদ্বীপে সেরা তার্কিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছিলাম আমি। অবশেষে একদিন শ্রাবস্তী নগরে এসে পৌঁছলাম আমি। এসেই পথের একপাশে জামগাছের একটি শাখা প্রোথিত করে বললাম,

'যে এই পথে যাবে, তাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, তারপরযেতে হবে।' 

সেই পথে যাচ্ছিলেন তখন স্থবির সারিপুত্র। তিনি ধ্যানসুখে তন্ময় হয়ে পথে বিচরণ করেন। মাটিতে কোথায় তাঁর পা পড়েছে তা তিনি খেয়ালই করেননি। তাঁর পা আমার জামগাছের ডাল স্পর্শ করতে তিনি বাধ্য হলেন আমার সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করতে। আমি প্রথমে সারিপুত্রকে অনেক প্রশ্ন করলাম। প্রতিটা প্রশ্নেরই সঠিক জবাব দিলেন তিনি। শেষে তিনি আমাকে একটিই প্রশ্ন করলেন। বললেন,

'বলো তো, 'একটি জিনিস' কী?' 

এর উত্তর আমার জানা ছিল না। আমি মাথা নত করলাম। তখন সারিপুত্র উত্তরে বললেন,

'একটি জিনিস হল আহার। সকল প্রাণী হল আহারের উপর নির্ভরশীল।'

আমি তাঁকে প্রণাম করে বললাম,

'আমি আপনার শরণ নিতে চাই।' সারিপুত্র বললেন,

'তুমি ভগবান বুদ্ধের শরণ নাও। তিনি দেব ও মনুষ্যলোকের সর্বপ্রধান।'

আমি ছুটে গেলাম বুদ্ধের কাছে। বহু পথ ঘুরে অবশেষে তাঁর সাক্ষাত পেলাম। সেই অমিতাভ বুদ্ধের চরণে নিজেকে তারপর সঁপে দিলাম। তিনি আমাকে প্রব্রজ্যা দিলেন। আমাকে আশীর্বাদ করে বললেন,

'ভদ্রে! তুমি শ্রদ্ধাভরে প্রব্রজ্যা নিয়েছো। যা পরম আনন্দ, সর্বান্তকরণে তাতে নিয়োজিত হও। মঙ্গলের অনুশীলনপূর্বক শান্তির পথে অগ্রসর হও।'






পটাচরা বললেন,

'এতক্ষণ তোমরা আমাদের চারজনের কথা শুনেছো। এবার আমরা তোমাদের দুজনের কথা শুনবো। তোমাদের জীবনের কথাও আমাদের ধর্মপথে উদ্দীপনা দেবে। বলো ইসিদাসী তোমার পূর্বজীবনের কথা, আগে তুমি বলো, এবং নিঃসঙ্কোচে বলো। আমরা সকলেই একই পথে যাত্রা করেছি। যা ত্যাগের পথ, সত্য ও মঙ্গলের পথ। আমাদের অতীত অন্ধকার বলেই তো আমরা আলোর খোঁজে এসেছি!'

ইসিদাসীর কথা 

আমি বিহার পরিক্রমায় বেরিয়েছিলাম। এবার জেতবনে ফিরে যাব। শুনেছি বুদ্ধ এখন ওখানেই আছেন। তাঁর দর্শন বেশি পাইনি। তবে আজ আপনাদের জীবন কথা শোনার সৌভাগ্য হল। আজকের রাতের কথা আমি সারাজীবনে ভুলবো না। আমি বেশ কিছু বছর হয়েছে বৌদ্ধ সংঘে প্রবেশ করেছি। থেরী জীনদত্তার কাছ থেকে আমি অভিষেক গ্রহন করে ভিক্ষুণী হয়েছি। সাধন পথে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারিনি। তবে রোজ ধ্যানাভ্যাস করে থাকি।

আমি এক অতি সামান্যা হতভাগিনী নারী। আমার বাড়ি ছিল উজ্জয়িনী নগরে। আমার পিতা ছিলেন ধর্মপরায়ণ, দানশীল এক ব্যক্তি। সাকেত নগরের এক বিখ্যাত শ্রেষ্ঠী পরিবারে আমার বিবাহ হয়। বিয়ের পর সংসারের যাবতীয় কাজ আমি হাসিমুখে করতাম।

শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, পরিজনবর্গ কাউকে কখনও অমর্যাদা করিনি। অনলসভাবে পতিসেবা করেছি। আসলে আমার মতো পরিচারিকা এ জগতে দুর্লভ। প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে আমি ঘরের সব কাজ করতাম। তবু কোন এক অজানা কারণে আমার স্বামী আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। তিনি জানালেন, তিনি আমাকে ত্যাগ করতে চান। একদিন সজল নয়নে আমার শ্বশুর, শাশুড়ি আমাকে পিতৃগৃহে পাঠিয়ে দিলেন।

পিতা আমি ফিরে আসতেই আমার আবার বিয়ে দিলেন। সেখান থেকেও আমি এক মাসের মধ্যে বিতাড়িত হলাম। অথচ সেখানেও সবার খুব সেবা করেছিলাম। ফিরে আসার পর আমাকে নিয়ে আমার পিতা খুব দুশ্চিন্তায় পড়লেন। শেষে একদিন একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে অনেক ধনসম্পদের লোভ দেখিয়ে আমাকে বিয়ে করতে রাজি করানো হল।

সেই বিয়েও আমার জীবনে স্থায়ী হল না। ভিক্ষুটি চীবর ত্যাগ করে সংসারে প্রবেশ করলেও সংসারকে সে মনে প্রাণে ঘৃণা করত। মাত্র পনেরোদিন কাটতেই তার কাছে এই সংসার জীবন অসহনীয় হল। সে পুনরায় সংঘে ফিরে যাওয়ার জন্য আমাকে ঘৃণা সহকারে ত্যাগ করল।

এবার আমার মন সত্যিই ভেঙে গেল। এত প্রত্যাখ্যান সহ্য করে নিজেকে খুব ঘৃণ্য মনে হল। ভাবলাম এই সংসারে আর থাকবো না। সেই সময় আমাদের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালেন ভিক্ষুণী জীনদত্তা। তাঁর শান্ত ও সৌম্য মূর্তি দেখে আমার মন শান্ত হল। আমি জীনদত্তার কাছে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করলাম। আমি এতদিন কেবল সংসার করতেই চেয়েছিলাম, তবু সংসার আমাকে প্রাণপনে দূরে ঠেলেছে, কারণ আমার অজান্তেই আমার জন্য ত্যাগের এক অপূর্ব জীবন অপেক্ষা করছিল। এখন বুঝলাম সংসার কেবল দুঃখের কারাগার, আর বুদ্ধ স্বয়ং কৃপা করে এই দুঃখিনীকে সেই কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন। আমার ভিক্ষুণী জীবনে একবারই তাঁর দর্শনলাভ করেছি। একবার তাঁকে দর্শনের বড়ো সাধ হয়েছে, আমার।

পটাচরা বললেন, 

'আমরাও কাল সকলে জেতবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছি। তোমরা চাইলে আমাদের সঙ্গী হতে পারো।'

সকলে এবার বোধির দিকে তাকালেন।

'বলো নবীন ভিক্ষুণী! তোমার কথা এবার শোনা যাক।'



বোধির কথা

আমার তেমন কোনো কথা নেই। এত খ্যাতনামা থেরীদের সামনে বলার মতো কিছুই নেই আমার। আমি কেবল শ্রোতা হয়েই থাকতে চাই। মহাবোধিজ্ঞান লাভ করতে সংঘে প্রবেশ করেছি। আমার মাতা ছিলেন, একটি ধনী পরিবারের ক্রীতদাসী। সেখান থেকে মা একদিন মুক্তিলাভ করলেন। মুক্তি পেয়েই মা এসে সংঘে যোগ দিয়েছিলেন। আমিও শিশু অবস্থা থেকে তাই সংঘে থাকতে লাগলাম। বুদ্ধের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মা আমার নাম রেখেছেন বোধি। মা মারা যাবার পর আমি সংঘে আশ্রয় নিয়েছিলাম দারিদ্র ও অসম্মান থেকে বাঁচতে। তবে প্রব্রজ্যা তার থেকে আরও অনেক মহান, ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডিতে তাকে বাঁধা যায় না। আজ বুঝতে পারছি, ভাগ্যিস দুর্ভাগ্যের কবলে ছিলাম! তাই তো বুদ্ধ করুণা করে আমাকে তাঁর কোলে টেনে নিয়েছেন। তাঁরই অপার কৃপায় আজ আপনাদের সবার কথা শুনতে পেলাম।

এখন বুঝতে পারছি, সকলের জীবনে দুঃখের পরিধি সুবিশাল। ব্যথার পূজার অন্তেই আলোকিত নির্বাণ অপেক্ষা করে থাকে। দুঃখের আগুনে পুড়েই মানবমন সোনার মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।'



ভোর হয়ে আসছে। ভোরের আলো গায়ে মেখে দ্রুত পথ চলেছেন ছয় পুণ্যা নারী। তাঁরা বুদ্ধের দর্শনলাভের মানসে এগিয়ে চলেছেন, আর তাঁদের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে আলোকিত একটি মেঘমুক্ত ভোর।

1 টি মন্তব্য: