রঞ্জনা ব্যানার্জীর গল্প : দুধওয়ালা


সুধাংশু বাবুর সঙ্গে বাস টার্মিন্যালে আবার দেখা হয়েছিল ইব্রাহিমের। ঠাকুরদিঘির সেই ছোকরার কথামতো ওখানেই পেয়েছিল তাঁকে। সেদিন ইব্রাহিম যে সুধাংশু বাবুর খোঁজে যাচ্ছে তা গোপন রেখেছিল। আমেনাকে বলেছিল সামনের মার্কেট থেকে রনির জন্যে খেলনা কিনবে। ছোটজনের জন্মের পরে রনির দুরন্তপনা বেড়েছে। দুপুরে কিছু একটা বায়না ধরেছিল বাবার কাছে। সারওয়ার অফিসের জরুরি ফাইল দেখছিল। খেয়াল করেনি। চোখের নিমেষেই সারওয়ারের মোবাইলটা মেঝেতে আছড়ে ফেলল রনি। মোবাইলের পর্দায় এপার-ওপার চিড় খেয়েছিল। সারওয়ার তেড়ে ধরেছিল রনিকে! ইব্রাহিম মিয়া সারওয়ারকে এমন রাগতে দেখেনি আগে। সারওয়ারের বউ মেহেরুনও সামলাতে পারছিল না। ভাগ্যিস আমেনা বিবি গোসলখানা থেকে ভেজা কাপড়েই বেরিয়ে এসেছিল নইলে বাচ্চাটার বড় কিছু ক্ষতি হয়ে যেতে পারত। ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছিল রনি। আমেনা বিবি সারওয়ারকে গাল দিচ্ছিল, ‘বাফর ডইল্লা ছোডোলোইক্কা মেজাজ ফাইয়েদে(বাবার মত ছোটলোকী মেজাজ হয়েছে)’। ইব্রাহিম উঠে চলে গিয়েছিল ঘরে। চৌদ্দ বছর আগের সেই দুপুরটার কথা মনে পড়েছিল এবং সুধাংশু বাবুর সঙ্গে আরেকটিবার দেখা করার তীব্র ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়েছিল।

ইব্রাহিম মার্কেটে যাচ্ছে শুনে সারওয়ার বিরক্ত হয়েছিল। বলেছিল, এটা ঠিক হচ্ছে না এখন খেলনা পেলে রনি ন্যায়-অন্যায়ের ফারাক বুঝবে না। ইব্রাহিম উত্তর দেয়নি। চুপচাপ জুতো পরছিল। বাবাকে থামানো যাবে না বুঝতে পেরে মা’র ওপরেই ঝাল ঝেড়েছিল সারওয়ার অতঃপর বড় সাহেবের গলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছিল-আব্বা যেন রফিককে ছাড়া কোথাও না যায়। আমেনা বিবিও বড় সাহেবের মায়ের গলায় সাঁয় দিয়েছিল, ‘গেলে গাড়িত গড়ি য’ (গেলে গাড়িতে যাও)।

আমেনা বিবির এই গাড়ি সংক্রান্ত আদিখ্যেতা সহ্য হয় না ইব্রাহিমের। রাজ্যের হীনমন্যতা ঝেঁপে ধরে ওকে। এই সেদিনও রিকশা ছিল ওদের বিলাসিতা। অতি কষ্টে রাগ সংবরণ করেছিল ইব্রাহিম এবং মা ছেলের সিদ্ধান্ত মেনে মুখ আঁধার করে গাড়িতেই উঠে বসেছিল।

ঝোঁকের মাথাতেই ঠিক করেছিল টার্মিন্যালে যাবার কথা কিন্তু গাড়িতে উঠেই দুশ্চিন্তায় পড়েছিল ইব্রাহিম, কীভাবে বলবে রফিককে? ভেবেছিল মার্কেট থেকে টেক্সি নিয়ে যাবে। সব ভেস্তে গেল! বাগেরহাট গেছে শুনতে পেলে সারওয়ার ফের বাড়ি মাথায় তুলবে। আবার রফিককে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করাও রীতিমত অসম্মানের। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই মার্কেটের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছিল গাড়ি। অতঃপর সব আড় ভেঙে ইব্রাহিম যথাসম্ভব সহজ গলায় বলেছিল, ‘রফিক মিয়া, সেদিন যে পাগলাবাবাকে দেখলাম ঠাকুরদিঘিতে মনে আছে? তার সাথে দেখা করা লাগবে আমার। ফেরার পথে মার্কেটে থামবো।’ রফিক পার্কিংয়ের জন্যে বাম দিকে গাড়ির নাক ঘোরাবার তোড়জোড় করছিল, ইব্রাহিমের কথা শুনে একটু অবাক হলো হয়তো-বা। উত্তর না দিয়েই ব্রিজের রাস্তা ধরেছিল। বাস টার্মিন্যালে পৌঁছানোর পরে ইব্রাহিম গাড়ি থেকে নামতে গেলে রফিকই থামিয়েছিল ওকে, ‘আপনি বসেন স্যার, আমি জেনে আসি আছেন কি না।’

খানিক পরে ফিরে রফিক জানিয়েছিল বাবা আছেন। ডানদিকের শেষ বাসটার পেছনে পাওয়া যাবে তাঁকে। রফিকের কথামতো ঠিক জায়গাতেই বাবুকে পেয়েছিল ইব্রাহিম। চোখ বুজে বসে আছেন একা। পরনের শততালির লুঙ্গির মতোই আরেকখানা লুঙ্গি গায়ে জড়ানো। আহা, কত বড় অফিসার ছিলেন সুধাংশু বাবু!

ইব্রাহিম ওঁর সামনে বসতেই চোখ খুলেছিলেন কিন্তু চোখ মেলাননি। ঠিক কীভাবে শুরু করবে বুঝতে পারছিল না ইব্রাহিম। অতঃপর গলা খাঁকারি দিয়ে ঠাকুরদিঘিতে সাক্ষাতের সেই ঘটনার কথাটাই তুলেছিল। কয়েকহাত দূরে অল্পবয়েসী একটা ছেলে বাসের গা ধুচ্ছিলো, চেঁচিয়ে জানাল, ‘বাবা কথা বলেন না।’ ছেলেটার হাঁকে লোকজন মাথা ঘুরিয়ে দেখেছিল ওদের। একজন অতি কৌতূহলী ইব্রাহিমের প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। ইব্রাহিম প্রমাদ গুনেছিল। একটু পরেই লোকজন জমতে পারে। সারওয়ারের কানে যেতে কতক্ষণ? আচ্ছা, এই লোক সত্যিই সুধাংশু বাবু তো! নাকি আমেনার কথাই ঠিক? কিন্তু মাছ মরার ঘটনা অন্য কেউ জানবে কীভাবে? আর চাটগাঁর ভাষা? এই বাবা কথা না বললে ও শুনল কীভাবে? ইব্রাহিম এবার সরাসরিই ঢিল ছুড়লো, ‘ ব’, রানিমা’র খতা মনত আছে না?(বাবু রানিমা’র কথা মনে আছে?) সুধাংশু বাবু ঝট করে তাকালেন। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ইব্রাহিমকে পেরিয়ে অন্য কোনোখানে! ইব্রাহিম ভালো করে চেহারাটা জরিপ করেছিল আবার। সেই জরুল। সেই ধূসর চোখ। কেবল মুখটা ঢেকে আছে দাড়িগোঁফের জঙ্গলে। নাহ্‌, এই লোক সুধাংশু বাবুই। আরও ক’মিনিট চুপচাপ বসে থেকে ইব্রাহিম ফিরে এসেছিল।

গাড়ি চালু করেই রফিক জানিয়েছিল সারওয়ার বেশ কবার ফোন দিয়েছে, ও ধরেনি। ইব্রাহিম মনে মনে শোকর করেছিল, ভাগ্যিস নিজের ফোনটা বাড়িতে রেখে এসেছে!

ফেরার পথে কত কী মনে পড়ছিল ইব্রাহিমের! এই তো সেদিন—সারওয়ারের কোচিং এর জন্যে আমেনার চুড়ি জমা দিয়ে তিনহাজার টাকা ধার চাইলে বড়কর্তা চুড়ি ছোঁননি। টাকাটা দিয়ে ধমকেছিলেন ; ‘বৌর গয়না বন্দক দিয়ন ফড়িব না বেক্কল?’(বৌয়ের গয়না বন্ধক রাখতে হবে বেয়াক্কেল!) বড়কর্তা, সুধাংশু বাবুর দাদাশ্বশুর। স্মৃতির টানে ভাসছিল ইব্রাহিম সারা রাস্তা, কখন যে মার্কেটে পৌঁছে গেছে টেরই পায়নি।

মার্কেট থেকে বেশ দাম দিয়ে লাল টুকটুকে দুটো খেলনা গাড়ি কিনেছিল ইব্রাহিম। একটা রফিকের হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘তোমার ছেলেকে দিও।’ রফিক লাজুক স্বরে জানিয়েছিল, ওর নতুন বৌ পোয়াতি। অপ্রস্তুত ইব্রাহিম সামলে নিয়ে বলেছিল, ‘বাচ্চার জন্যে আগাম তোফা। সারওয়ারকে বলার দরকার নাই।’ ঠিক কোন বিষয়টি বলার ‘দরকার নাই’ উপহার নাকি বাগেরহাট বাস টার্মিন্যাল, নাকি দুই-ই; ইব্রাহিম খোলাসা করেনি।

বাড়ির রাস্তায় গাড়ি ঢুকতেই দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল গেইটের সামনে সারওয়ারের অস্থির পায়চারি। গাড়ি থামতেই রফিককে ধমকাতে শুরু করল সারওয়ার, ‘ফোন ধর নাই কেন? প্রায় চাইর ঘন্টা খবর নাই! কী হইসিল?’ ইব্রাহিম তড়িঘড়ি বলেছিল, ‘রফিক মিয়ার হোঁয়ারে এক্কানা শ’রত ফাক খাইলাম দে আরি।’ (রফিক মিয়াকে নিয়ে শহর টা ঘুরলাম খানিকক্ষণ)। রফিক মাথা চুলকে জানাল ওর ফোনে চার্জ ছিল না।

সেই রাতে দু’চোখের পাতা এক হয়নি ইব্রাহিমের । অদ্ভুত একটা অস্বস্তি খোঁচাচ্ছিল ওকে। সুধাংশু বাবুকে দেখার পেছনে অন্য কোন ইশারা আছে নিশ্চিত। পরদিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই সিদ্ধান্ত নিল, বাড়ি ফিরবে। আমেনা বিবি অবাক। আরও এক মাস পরে কোরবানি ঈদের ছুটিতে নাতি, বৌমাসহ একসঙ্গে ফেরার কথা!
সকালে নাস্তার টেবিলে আমেনা বিবি সারওয়ারকে জানিয়েছিল ইব্রাহিমের সিদ্ধান্ত। সারওয়ার কাঁধ ঝাঁকিয়েছিল। আব্বাকে অনুরোধ করে কোনো লাভ আছে? মেহেরুনই দায়িত্ব নিল। অনুযোগ করল আর কিছুদিন থাকলেই বাচ্চাটা সড়গড় হতো।

সারওয়ারের বৌ মেহেরুন বলতে গেলে ইব্রাহিমের বাড়িতেই বড় হয়েছে। আমেনা বিবির বড় ভাইয়ের মেয়ে। ছেলেবেলায় মা হারিয়েছিল। বড় মায়াশীল কন্যা। ইব্রাহিম, আমেনা দুজনেরই চোখের মণি। মেহেরুনের অনুরোধে অতঃপর আরও বারোদিন থেকে আমেনা বিবিকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল ইব্রাহিম। ছোট ছেলে সোহরাব থেকে গিয়েছিল। ভাই-ভাবির সঙ্গেই কোরবানির ঈদে ফিরবে।

সুধাংশু বাবুর নিখোঁজের সংবাদটা তেরো বছর আগে সারওয়ারই দিয়েছিল। ও তখন বুয়েটে পড়ে। ট্যুইশানিও করে। ওর এক ছাত্রের বাড়িতে ইত্তেফাকের ভেতরের পাতায় ছবিসহ নিখোঁজ সংবাদটা নজরে পড়েছিল। আম্মাকে ফোনে জানিয়েছিল! ইব্রাহিম বিশ্বাস করেনি। সোহরাবকে দিয়ে সামনের ফার্মেসি থেকে ইত্তেফাক আনিয়েছিল। ঠিক, ইনি বড়বাবুর মেয়েজামাই-ই, পিএম শিপিং কোম্পানীর জি.এম. সুধাংশু সেন’।

বড়কর্তার মৃত্যুসংবাদও কাগজেই পড়েছিল ইব্রাহিম। চুল কাটতে গিয়েছিল মনা নাপিতের দোকানে। আজাদী পত্রিকার দ্বিতীয় পাতায় ডান কোণে বড়কর্তার ছবি- ‘বিশিষ্ট আইনজীবি সি পি সরকারের প্রয়াণ’। থম ধরে বসে ছিল ইব্রাহিম। বাচ্চাদের করা একটা ‘মশকরা’ কীভাবে জীবনের ছকই পালটে দিল!

বড়কর্তাকে পিতার মত শ্রদ্ধা করতো ইব্রাহিম। আব্বাজানের মৃত্যুর পরে প্রথমদিন ইব্রাহিমকে দুধের ভাঁড় নিয়ে ঢুকতে দেখে বড়কর্তা বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। ‘স’দ খন্ডে?’ (স’দ কোথায়?) ইব্রাহিমের আব্বাজানের নাম ছিল সৈয়দ মুহাম্মদ। লোকে বলতো, স’দ মুহাম্মদ। বিহ্বল কিশোর নিজেও বিশাল ঘোরে তখন। আব্বাজান কবরের অন্ধকারে কীভাবে সব ছেড়েছুড়ে একা শুয়ে আছেন? ঠিক তিনদিন আগে রাতে এশার নামাজ পড়ে আসবার সময় বাড়ির কাছেই বৃষ্টির জমা পানিতে পা হড়কে পড়ে গিয়েছিল স’দ মুহাম্মদ। পিঠে লেগেছিল। পরদিন সকালে ফজরের ওয়াক্তে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে আবার পড়ে গেলেন । আর উঠলেন না।

সেই ঘটনার ঘোর কাটার আগেই তিন দিনের দিন সকালে আম্মা ইব্রাহিমকে ঘুম থেকে উঠিয়েই পুকুরে ডুব দিতে পাঠালেন। দাদিজান জায়নামাজে সকাল থেকেই কেঁদে চলেছেন। ছোট ভাই মুমিনুল তখনও ঘুমে। গোসল সেরে এলে ইব্রাহিমকে আম্মা রান্নাঘরে ধোঁয়া-ওঠা ফেনভাত, আলুসেদ্ধ আর আস্ত একটা কাঁচামরিচ দিয়েছিলেন, ঠিক আব্বাজানকে যেভাবে দিতেন। তারপরে বলেছিলেন শহরে বাবুদের বাড়িতে দুধ দিয়ে আসতে হবে। দাদীজান এ কথা শুনে চোখ মুছে, জায়নামাজ গুটিয়ে আম্মাকে গাল পাড়ছিলেন। কেমন পাষাণী! বাপ মরল তিনদিন শেষ হয় নাই, এরই মধ্যে বেটাকে কাজে পাঠাচ্ছে! আম্মাজান উত্তর দেননি। ইব্রাহিমের কপালে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দুধের ভাঁড়সহ ঘাঁটার সামনেই রিকশায় তুলে দিয়েছিলেন ।

সেইদিন বড়কর্তাদের কাজের মহিলা দুধের পাত্র দাওয়ায় রেখে বলেছিল,আটপোয়া। ইব্রাহিম দুধ ঢালতে গিয়ে বুঝেছিল—এ সহজ কাজ নয়। বড় কর্তা নেমে এসে মগ মেপে দুধ ঢালার কায়দা শিখিয়েছিলেন। এরপরে বাটি ভরে মুড়ি আর খেজুড়ের গুড় দিয়েছিলেন বড়মা। পাশে দাঁড়িয়ে জানতে চেয়েছিলেন দুধের ‘ভাণ্ড’ নিয়ে বাস স্ট্যান্ড থেকে এতটা পথ কীভাবে এলো ও? বড় মা’র সজল চোখের দিকে তাকিয়ে ইব্রাহিম জানিয়েছিল , বাড়ি থেকে রিক্‌শা করে বাসস্ট্যান্ডে। শহরে নেমেই আবার রিকশায় এ বাড়ি। বড়কর্তা শুনে সেদিনই পাকা বন্দোবস্ত করেছিলেন বাস স্ট্যান্ড থেকে এ বাড়ি পর্যন্ত রিকশায় চেপেই আসবে ইব্রাহিম। দুধের হিসেবের সঙ্গে মাসের রিকশাভাড়াও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। একবছরের মধ্যেই ইব্রাহিম দুধ না-ছলকে ভারকাঠি কাঁধে, দুই প্রান্তে দুধের ভাঁড় ঝুলিয়ে হাঁটতে শিখে গিয়েছিল।

এরপর বহুবছর পেরিয়ে গেছে! কিশোর ইব্রাহিম ক্রমশ যুবক হয়েছে। বিয়ে করেছে। সন্তানের বাবা হয়েছে। ও-বাড়ির সেজ বাবুর ছেলে অমল হবার কিছুদিন পরেই সারওয়ারের জন্ম। সারওয়ারের পরপরই ফাতিমা। সোহরাব অবশ্য আরও অনেক পরে--- ইব্রাহিম তখন ‘দুধওয়ালা ইব্রাহিম’ নয় আর।
সব চলছিল ঠিকঠাক হঠাৎ করেই নিয়তি নতুন দান ফেলল। ঠিক যেভাবে এক ভোরে আম্মাজান ওর অশক্ত কাঁধে সংসারের ভার দিয়ে অবাক করেছিলেন দাদীজানকে ঠিক তেমনই অন্য আরেক দুপুরে ও নিজেই নিজের অভ্যস্ত সবল কাঁধ থেকে সেই ভারকাঠি ফেলে অবাক করেছিল আম্মাজান এবং আমেনাকে। আপাত তুচ্ছ সেই ঘটনাই ইব্রাহিমের জীবনের মোড় পাল্টে দিয়েছিল।

সারওয়ার বরাবরই ভালো ছাত্র। গ্রাম ছেড়ে শহরের সেরা সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছিল। সেজ বাবুর ছেলে অমল সেই কলেজে চান্স না পেয়ে প্রাইভেট কলেজে ঢুকেছে। বড়কর্তা খুব খুশি হয়েছিলেন সারওয়ারের সাফল্যে। নিজের নাতিদের সুযোগের অপব্যবহারে দুঃখ করতেন। ইব্রাহিমের সামনেই সারওয়ারের কথা টেনে প্রায়শ অমলকে লজ্জা দিতেন। পড়াশোনার সুবিধার জন্যে সারওয়ার তখন শহরের মেসে থাকে। ট্যুইশানি করে হাতখরচ চালায়।

ঘটনা আরও পরের। সারওয়ার তখন দ্বিতীয় বর্ষে। কোচিংয়ে দেবার মত সামর্থ্য ছিল না ইব্রাহিমের। নিজের চেষ্টাতেই প্রথম বর্ষে ভালো ফল করেছে সারওয়ার। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে সব বিষয় আয়ত্ত্বে আনতে পারলেও পদার্থবিজ্ঞানে ঝামেলা হচ্ছিল। মাকে এসে জানিয়েছিল পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের কোচিং নিতেই হবে। ক’দিন আগেই ফাতিমার বিয়ে দিয়েছে ইব্রাহিম। একটু টানাটানি যাচ্ছিল। আমেনা বিবি হাতের চুড়িগাছা খুলে দিয়েছিল ইব্রাহিমকে। যেভাবেই হোক সারওয়ারের প্রাইভেটের ব্যবস্থা করতেই হবে। বড়কর্তা তখন কোর্ট- কাছারিতে খুব একটা যান না। জুনিয়রদের দিয়েই কেইস করান। ইব্রাহিমের সংকোচ হচ্ছিলো ধার চাইতে। টাকাটা দিয়েছিলেন বড়কর্তা এবং আমেনার চুড়ি আনার জন্যে বকেছিলেন ইব্রাহিমকে।

প্রথমদিনই কোচিং থেকে ফিরে সারোয়ার ওর আম্মাকে জানিয়েছিল অমলও পড়ে একই ব্যাচেই। এর মাস খানেক পরে হঠাৎই ইব্রাহিমের ডায়রিয়ার মতো হলো। আগেরদিন কড়া রোদে হেঁটে দুধ বিলি করেছে। বাড়ি ফিরেই সন্ধ্যা বসার আগেই পেট খারাপ, সঙ্গে বমি। পরদিন দুপুর পর্যন্ত এমন চলেছে। দুই দিন শহরে যেতে পারেনি ইব্রাহিম। আব্বাজানের মৃত্যুর পরেই সেই যে দুধ বিলানো শুরু করেছিল, কেবল ফাতিমার বিয়ের দিন একদিনের বিরতি পড়েছিল। তাছাড়া ঝড়, বৃষ্টিবাদল, হরতাল যাই থাকুক ইব্রাহিম দুধওয়ালার দুধের রোজে ছেদ পড়েনি কখনও। বড়কর্তার দুধের নেশা। দুই বেলা দুধ লাগেই। বড়মা বলতেন, ‘পোলাপানে দুধ খাইলো কি খাইলো না, বিষয় না। তুমার কর্তা দুধ দিতে দেরি হইলেই বাড়ি মাথায় তুলব। রোজ যেন বাদ দিও না ইব্রাহিম।’ বড়মা’র কথায় কুমিল্লার মিষ্টি টান। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেবার পরপর দুই দিন কর্তার ‘রোজ’ বাদ গিয়েছিল।

সারওয়ার ইব্রাহিমের শরীর খারাপের কথা জানত না। জানার কথাও নয়। সপ্তাহান্তে বাড়ি এলেই জানে বাড়ির কথা। ইব্রাহিমও খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সারওয়ারের মেসে যেত না। সেদিন বিকেলে কোচিং শেষে সারওয়ার ট্যুইশানিতে যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল মোড়ে। অমল ওদের কোচিংয়েরই কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ওকে পেরিয়ে গেল। কী মনে হতেই ফিরে এসেছিল ফের। এরপরে বেশ গলা চড়িয়ে বলেছিল, ‘ইব্রাহিম দুধওয়ালা দুই দিন দুধ দেয়নি। দুধওয়ালাকে বলো দাদু খোঁজ করেছে।’ সারওয়ারের কান গরম হয়ে গিয়েছিল। আমলের বন্ধুদের একজন জানতে চাইল, ‘ইব্রাহিম দুধওয়ালাটা কে?’ অমল হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘সারওয়ার সাহেবের বাপ।’ ছেলেগুলো ওর দিকে অদ্ভুত আমোদচোখে তাকিয়েছিল। সারওয়ার সেদিন আর ছাত্র পড়াতে যায়নি, বাস ধরে সটান বাড়িতে। আব্বার অসুখ শুনে নয় অপমানের ভার নিতে না পেরে। ইব্রাহিম নিজেও কষ্ট পেয়েছিল খুব। ভেবেছিল বড়কর্তাকে পরদিনই অমলের নামে নালিশ দেবে। কিন্তু সারওয়ারের গোঁ ধরে বসলো ও আর কলেজে যাবে না। সব ছেলেরা জেনে গেছে ও দুধওয়ালার ছেলে। বুকে লেগেছিল ইব্রাহিমের। আমেনা বিবি, ইব্রাহিমের আম্মাজান দুজনই সারওয়ারকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল বিভিন্নভাবে। ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যেই ওকে ধারদেনা করে পড়াচ্ছে ওরা। সারওয়ার ঘাড় গোঁজ করে বসেছিল। সে রাতে কিছুতেই খাওয়ানো গেল না সারওয়ারকে।

পরদিন বেশ আগেভাগেই দুধের ভাঁড় কাঁধে বেরিয়ে গিয়েছিল ইবাহিম। কর্তাদের কাজের মহিলা নয় সেজ বৌদি এসেছিল দুধ নিতে। ‘কী ব্যাপার ইব্রাহিম কী হয়েছিল তোমার? আসনি কেন?’ বাড়ি থেকে বেরোবার সময় ইব্রাহিম ভেবে রেখেছিল বড়কর্তার কাছেই বিচার দেবে কিন্তু বৌদির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সব গড়বড় হয়ে গেল। নালিশটা সেজ বৌদিকেই করে বসল। বৌদি ফিক করে হেসে দিলেন। বললেন, ‘তুমি তো দুধওয়ালাই। আমিই অমলকে বলেছিলাম খবর নিতে। বাবাকে তো জানো। দুধ না হলে বাড়িতে অশান্তি। অমল ছোট মানুষ অত ভেবে কী আর বলেছে?’ ইব্রাহিম থমকে তাকিয়েছিল। হিসাব মিলছিল না। দাওয়া থেকে নেমে গেটের দিকে ছুটেছিল হাওয়ার বেগে। ইব্রাহিমের কানের ভেতরে হাজার বোলতা হুল ফোটাচ্ছিল, ‘তুমি তো দুধওয়ালাই!’

সেই যে প্রথম দুধওয়ালা হবার দিনে মগে দুধ ঢালা শিখিয়েছিলেন বড়কর্তা, রিকশাভাড়া দিয়েছিলেন সদ্য পিতৃহারা ইব্রাহিমকে, ইব্রাহিম তো মনে মনে সেইদিনই তাঁকে বাপ মেনেছে।

অন্য বাড়িগুলোতে সেদিন আর দুধ বিলি করেনি ইব্রাহিম। বাস স্ট্যান্ডের কাছের নালাতে পথচারীদের অবাক দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে হড়হড় করে ভাঁড় খালি করেছিল ইব্রাহিম।

বাড়ি ফিরেই কাউকে কিছু না বলে শুয়ে পড়েছিল। আমেনা বিবি খেতে ডাকতে এসে জানাল সারওয়ার মেসে ফেরেনি। খাওয়া-দাওয়াও করেনি দুপুরে। ইব্রাহিম নিজেরও খিধে উবে গেছে। ক্লান্তিতে ক্ষোভে সবমিলিয়ে অবসাদ ঘিরেছিল ওকে। চোখ বুজে এসেছিল। হঠাৎ বেড়ার ফাঁক গলে পাশের রুমে আমেনা বিবির কথা কানে ঢুকল। সবমিলিয়ে আমেনারও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল হয়তো-বা। ‘মরার ফুত ঠিক আসে খলেজত ন যাইস। বাফর ডঁইল্লা দুধওয়ালা হইস।(মরগে যা কলেজে যাওয়ার দরকার নাই বাবার মত দুধওয়ালাই হ) ইব্রাহিমের মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। ঘর থেকে হিড়হিড় করে টেনে এনেছিল সারওয়ারকে। আলকাতরা মাখানো আমকাঠের সেই শক্ত ভারকাঠি না ভাঙা পর্যন্ত নির্দয়ভাবে পিটিয়েছিল। সারওয়ার একফোঁটা কাঁদেনি, কেঁদেছে আমেনা।

সেইরাত দুই চোখের পাতা এক করেনি ইব্রাহিম। ছেলেটার দাঁতে দাঁত চেপে মার খাওয়ার দৃশ্য জেগে ছিল চোখের সামনে। ভোরের দিকে চোখ ভারী হয়েছিল। যখন ঘুম ভাঙল তখন রোদ মেলেছে উঠোনে। তার আগেই সারওয়ার চলে গেছে মেসে। বাইরে বেরিয়ে দেখে আমেনা বিবি দুধ ভরা ভাঁড়ের ওপরে কলাপাতা ঢেকে তৈরি করে রেখেছে। ওদিকে তাকিয়ে ইব্রাহিমের মনে হ’ল ভারকাঠি ছাড়া ভাঁড়গুলোও ভাবছে তাদের ভবিষৎ। আমেনাবিবি কলতলায় দুলে দুলে বাসন মাজছে যেন কিছুই ঘটেনি কোথাও। ইব্রাহিম বিষণ্ন চোখে চারপাশ দেখলো তারপরে ঘাটে যেতে যেতে জানিয়েছিল, আর কখনই দুধ বেচতে যাবে না ও। আমেনা বিবির হাত থেমে গিয়েছিল সঙ্গে সঙ্গেই।

এরপরে ইব্রাহিম দুধের ভাঁড় আর কাঁধে তোলেনি কখনও। গরু বেচে মুরগির ফার্ম করেছিল। তারপরে কত চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে এসেছে সে আজকের জায়গায়। কিন্তু এতদিন পরে কার ইশারায় আবার স্মৃতির পর্দা উঠল ? কেনই-বা সুধাংশু বাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল!

বিয়ের এক মাসের মাথাতেই সুধাংশু বাবুর অসুখের বিষয়টা ধরা পড়েছিল। অদ্ভুত সেই অসুখ।

চাটগাঁর হিন্দু-মুসলমান দুইপক্ষের বিয়ে অনেকটা ছোটগল্পের মতো ‘শেষ হইয়াও হয় নাই শেষ’ গোছের; দাওয়াত, ফিরানি-দাওয়াত চলতেই থাকে। সেবার রানিমা র শ্বশুরপক্ষ কনেপক্ষের বেয়াইদের খাওয়াবে রানিমা বড় বাবুর তো বটেই, এ বাড়িরও একমাত্র মেয়ে। গ্রামের বাড়িতেই আয়োজন। বিশাল বাড়ি। শ্বেতপাথরের ঘাট লাগানো দুই-দুইটা পুকুর। একটায় মাছ খলবলায়, অন্যটা স্নানের। বেয়াই-ভাত উপলক্ষ্যে রান্নার জন্যে বড় বড় চুলা পাতা হয়েছে। আত্মিয়স্বজন এবং কেজো লোকের ভিড়ে গমগম করছে বাড়ি। দাওয়াতের দুইদিন আগে ভোরে হঠাৎ আকাশ কাঁপানো চিৎকার। পুকুরভর্তি মরা মাছ উল্টে ভাসছে জলে এবং তার পাশে জামাই বাবাজি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ঘাটে। কোন ফাঁকে এবং কেন নতুন বৌ ছেড়ে অত ভোরে পুকুর ঘাটে এলেন সেই কথা কেউ জানে না! মন্দিরের বারান্দায় ঘুমানো রান্নার লোকেদের কেউ শুনতে পেয়ে উঠে এসেছিল দেখতে। তারপরেই শোরগোল। শহরের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল ত্বরিত। একদিন ছিলেন। রানিমার শ্বশুরবাড়ির সবাই শহরে থাকেন। ওদের এক জ্ঞাতি, পরিবার নিয়ে থাকেন এ বাড়ির পেছনের অংশে। তিনিই বাড়ির দেখভাল করেন। জানামতে কারো সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই। পুলিশ এসেছিল। অনেকের বয়ান নিয়েছে কিন্তু কোনো সূত্র মেলেনি।

এই ঘটনার ক’মাস পরেই ঘটেছিল দ্বিতীয় ঘটনা। শ্বশুরবাড়িতে সেটা রানিমার প্রথম কালিপূজা। বলির পাঁঠা রান্না হয়েছে। সবাই মেঝেতে পাত পেড়ে খেতে বসেছে। এমন সময় খবর এলো, বাবুদের বর্গা চাষিদের কারো বৌ স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে ইঁদুরের বিষ খেয়ে মরেছে। সুধাংশু বাবু খাচ্ছিলেন। খবরটা শোনার পরপরই আসনে ঢলে পড়লেন। জ্ঞান ফিরলে অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করেছিলেন। এরপর থেকেই তাঁর অস্বাভাবিক ব্যবহার। সবকিছুতেই বিষ সন্দেহে উনি খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিলেন। দুই ঘটনার কোন যোগসূত্র আছে কি না জানা যায়নি। জামাইবাবাজীকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। ভালোও হয়ে গিয়েছিলেন। অন্তত ইব্রাহিম তেমনই জানত। নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরের বছর দুর্গা পূজার সপ্তমী দিন অন্তঃসত্ত্বা রানিমাকে ‘একটু আসি’ বলে সুধাংশু বাবু সেই যে গেলেন আর ফিরলেন না। তেরো বছর পরে কিনা ইব্রাহিমকেই দেখা দিলেন!

ও বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে সুশীল ছিল রানিমা। ইব্রাহিম ভেবে পায়না আল্লাহতালার এ কেমন বিচার! এই মেয়ের জীবনেই কেন এই অঘটন!

সুধাংশু বাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনাটাও অদ্ভুত। সেদিন সকালে ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখে ওরা খান জাহান আলীর মাজারে গিয়েছিল। ওরা মানে ইব্রাহিম, আমেনা, সারওয়ার আর রনি। মেহেরুন, ছোটজনকে নিয়ে ডাক্তার ছাড়া আর কোথাও যায়না আর সোহরাব ঘুম থেকে উঠতে পারেনি বলে ওকে ফেলেই ওরা বেরিয়ে গিয়েছিল। ঈদের ছুটির শেষদিন। বেশ ভিড়। ঠাকুরদিঘির সেই জোড়া-কুমির দর্শনের বড়ই সাধ আমেনা বিবির। সারওয়ার এসবে নেই। ওর যুক্তি এরা কালাপাহাড় ধলাপাহাড়ের কেউ নয়। কিন্তু আমেনা বিবির এক কথা— কুমির যেখানেরই হোক, দিঘির পানিতে পীরের কুদরত আছে তাই কালাপাহাড় ধলাপাহাড় না হলেও এই কুমিরজোড়ার তেমনই গুণ। বিরক্ত সারওয়ার রনিকে নিয়ে গাড়িতে বসে রইলো আর ইব্রাহিম আমেনা বিবিকে নিয়ে কুমিরদর্শনে গেল।

দিঘিতে যাওয়ার ঢালু পথে নামার সময় ফিরতি একজন জানাল, পুকুরের দক্ষিণ কোণে পাড় ঘেঁষে একটা কুমির কিছুক্ষণ আগেও রোদ পোহাচ্ছিল এখন কচুরিপানার দঙ্গলের পেছনে নেমে গেছে। পানির তলায় তার আবছা অবয়ব কেবল খাদেম সাহেবই দেখছেন, অন্যেরা নয়। একথা জেনে ইব্রাহিম দোনোমনা করছিল কিন্তু আমেনা বিবির নিয়ত, দিঘির পাড়েই যাবেন এবং অপেক্ষা করবেন। আকাশ ফকফকা। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আওয়াজ তুলে বাজ পড়ল কোথাও। সাথেসাথেই বড়বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। বড় ফোঁটার বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকেনা। কিন্তু হিসাব গুলিয়ে দিয়ে বৃষ্টির তেজ বেড়ে গেল। ইব্রাহিমরা দীঘির ধারে পৌঁছাতেই কাকভেজা হয়ে গেল। আর তখনই খাদেম সাহেবকে দেখা গেল উঠে আসছেন ওপরে। ওদের জানালেন, কুমির পানির নিচে চলে গেছে। এখন গিয়ে আর লাভ নাই। বৃষ্টি কমলে আবার চেষ্টা করতে পারেন যারা চান।

একটু গেলেই ছাউনিমতো জায়গা আছে একটা। ইব্রাহিম গজগজ করে- না নেমে ওখানে ফেরত গেলেই হতো। বৃষ্টি ধরলে নামা যেত। এখন ফের ফিরে ওইটুকু পথ যেতে যা ভিজবে গাড়িতে ফিরে গেলেও তাই-ই। আমেনা বিবির বোরকা একটু আড়াল দিলেও ইব্রাহিম গা বেয়ে কলের মত পানি ঝরছে। আমেনা বিবি ভারী শরীর টেনে ছাউনির নিচেই ঢুকলেন। আশ্চর্য কী, ছাউনিতে ঢুকতেই বৃষ্টিও থেমে গেল। আমেনা বিবি ভেজা কাপড়ে গাড়িতে ফিরতে নারাজ। কুমির দর্শন না করে ফিরছেন না। ইব্রাহিমের কফের ধাঁত। বেশিক্ষণ ভেজা কাপড়ে থাকলে বুকে হাঁপর চলবে। এ নিয়ে মৃদু তর্ক চলছিল দুজনের মাঝে, ঠিক তখনই ডানদিকে চোখ গেল। হাতখানেক দূরে গাছের গুঁড়িতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে আছেন তিনি। খালি গা। গলায় রাজ্যের মালা। শততালির লুঙ্গি পরা। ইব্রাহিমের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বলছে। ইব্রাহিম তর্ক থামিয়ে কী এক অমোঘ টানে এগিয়ে গিয়েছিল কাছে। পেছনে আমেনা বিবির কথা ওর কানে যাচ্ছিল না। ওকে অবাক করে দিয়ে লোকটা পরিষ্কার চাটগাঁইয়াতে বলল, ‘ফইরর মইধ্যে ইতারা বিষ মিশাই দিল দে আঁরি।’ ( পুকুরে ওরাই বিষ মিশিয়েছিল)। ইব্রাহিম থ। ‘খন্ডের কতা খন দে?(কোথাকার কথা বলছেন?) লোকটা ঘোলা চোখে কিছু খোঁজে ওর মুখে, ‘নন্দিফাড়ার জাউরগা হিজইল্লা মাছ বেইজ্ঞুন মারি ফেলাইল দে’ (নন্দীপাড়ার জারজ হিজল মাছ সব মেরে ফেলেছিল।) আর তখনই ইব্রাহিমের নজরে আসে চোখের কোণের কিশমিশের মত সেই জরুল এবং বিড়ালের মত ধূসর চোখজোড়া। ধক করে ওঠে বুক। আরে কর্তাদের নিখোঁজ জামাই সুধাংশু বাবু!

ইব্রাহিম প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে— ‘ও আল্লা অনে এণ্ডে খোত্থুন?’ ( ও আল্লাহ আপনি এখানে কীভাবে?) আমেনা বিবিও ততক্ষণে ইব্রাহিমের পাশে। ইব্রাহিম তড়িঘড়ি সারওয়ারকে ফোনে ডাকে। তখনই সুধাংশু বাবু অসীম দ্রুততায় উঠে দাঁড়িয়েই প্রায় ছুটতে থাকেন সামনে। ইব্রাহিমও বাবুর পেছনে ছোটে। সারওয়ার ব্যাপার বোঝার জন্য গাড়ি থেকে নেমেছিল ঠিকই কিন্তু লোকটার পেছনে বাবাকে দৌড়াতে দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়ে মায়ের খোঁজে উলটো দিকে পা চালায়। শেষপর্যন্ত ইব্রাহিম নাগাল পায়নি বাবুর। অসহায় চোখে দেখেছিল মিলিয়ে যাচ্ছেন তিনি দৃষ্টিসীমার বাইরে। সারওয়ারের নিষেধ উপেক্ষা করে ছাউনির কাছে ফের ফিরে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে ছোকরা মত একজন জানিয়েছিল, ইনি পাগলবাবা। রাতে বাস-টার্মিনালে থাকেন। দিনে মাঝে-মধ্যে এই গাছতলায় বসেন। কথা বলেন না।
বাড়ি ফেরার পথে আমেনা বিবি কুমির না দেখার ঝাল ঝাড়তেই ইব্রাহিমের বোকামির ফিরিস্তি শোনাচ্ছিল সারওয়ারকে। লোকে বলল কথা বলে না আর ইব্রাহিম কিনা মরা মাছের কাহিনী শুনলো বাবার মুখে। মানে হয়? ‘তোর আব্বারে জ্বীনে ধইরয্যে ফাঁল্লার!’, (তোর আব্বাকে মনে হয় জ্বীনে ধরেছে)।

চট্টগ্রামে নিজ বাড়িতে ফিরে ইব্রাহিম ঠান্ডা মাথায় আদ্যোপান্ত ভেবেছিল । সিদ্ধান্তে এসেছিল - বাবুদের সুধাংশু বাবুর খোঁজ জানানো দরকার। তাছাড়া সেই তিনহাজারের দেনা না মিটালে হজ্জ্ব কবুল হবে না। খোদা চাহে তো আগামীবছরই হজ্জ্বের নিয়ত আছে ইব্রাহিমের। কে জানে মাবুদই হয়তো ঋণমুক্তির নির্দেশ দিলেন! দুই দিন পরেই ইব্রাহিম বাবুদের বাড়ি যাবার কথা তুলল । আমেনা বিবি ইব্রাহিমের চায়ে সুক্রোলের গুল্লি মেলাতে মেলাতে বলল, ‘তের বচ্ছর বাদে এইডইল্লা হাঙ্গামার ছিন্তা কিওরলাই করনদে অনে? খোদা নারাজ ওইবো খই দিলাম’ (তেরো বছর পরে এমন হাঙ্গামার চিন্তা কেন? খোদা নারাজ হবেন, বলে রাখলাম)

ইব্রাহিম সেইদিনই নটার দিকে কোর্তা লুঙ্গি পরে শহরের বাসে উঠেছিল। সাধুর দোকান থেকে এক কেজি রসগোল্লা কিনে যখন বাবুদের বাড়ি পৌঁছাল তখন বেলা এগারোটা পেরিয়ে গেছে। গেটে হাত দিতেই মাঝবয়েসী একজন জানতে চাইল, ‘কাকে চাই’। ইব্রাহিম ওর নাম বলে অনুরোধ করল বাড়ির মালিকদের জানাতে। লোকটা ওকে দাঁড় করিয়ে ভেতরে গেল। ইব্রাহিমের চোখে সবই নতুন লাগছিল। চেনা গাছগুলো নেই। মাটি উধাও। ঢালাই চারপাশে। বাড়িটা বাড়ানো হয়েছে, পাশে এবং দৈর্ঘ্যে। কেমন যেন মেঘলা দিনের মত আবছা চারপাশ! আগেও গলিটা সরু ছিল তবে আলো ছিল আঙিনাজুড়ে। এখন বাড়িগুলো সব রাস্তায় নেমে গায়ে গা ঠেকিয়ে আটকে দিয়েছে আলো!

লোকটা ফেরার আগেই বড় বৌদি রেলিং থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে বলেন, ‘ওমা ইব্রাহিম! চেনাই তো যায় না! ভেতরে এসো!’ বড় বাবু শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাবুকে দেখে ইব্রাহিমের বুক ধক করে উঠেছিল, বড়কর্তার ছাপ ছুঁয়ে আছে মুখে!

এই প্রথম ইব্রাহিম বাবুদের বাড়ির ভেতরে এলো। ছেলেবেলায় ছুটির দিনে আব্বাজান মাঝে মাঝে এ বাড়িতে আনতো ওকে। তখন অসীম কৌতূহলে বাবুদের নিচের বারান্দার গ্রিলের ভেতর দিয়ে দেখবার চেষ্টা করত সে। সঞ্জয় বাবু তবলা শিখত। গ্রিলের বাইরে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম মগ্ন হয়ে শুনত মাস্টার শেখাচ্ছে, ‘তাক তুন্না তেরেকেটে তুন্না’... ইব্রাহিম বাড়ি ফেরার সময় তালে তালে পা ফেলে হাঁটত... ‘তাক তুন্না তেরেকেটে তুন্না’।

সেজবৌদি আর সেজবাবুও নেমে এলেন ইব্রাহিমকে দেখতে। সেজবৌদিকে দেখে ইব্রাহিমের সেই রাগ আবার মাথাচাড়া দিয়েছিল। ইব্রাহিম জানল মেজবাবু সস্ত্রীক তীর্থে গেছেন ভারতে। বড়বৌদি খুঁটিয়ে ইব্রাহিমের বাড়ির খবর নেয়। ইব্রাহিমও সারওয়ারের সাফল্যের কথা বিশদে বলে। মেজবাবুর দুই ছেলের একজন দেশে ঢাকায় আর আরেকজন কুয়েতে। অমলের কথা তোলে না কেউ, ইব্রাহিমও জানতে চায় না। বরং মেজ বাবুর ছেলের কুয়েত বাসের কথায় ইব্রাহিমের ভাই মুমিনুলের প্রসঙ্গ আসে। মুমিনুলও কুয়েত ছিল। জায়গাজমি সংক্রান্ত ঝামেলায় ইব্রাহিমের সঙ্গে সম্পর্ক নাই আর। বড়বৌদি বলেন, ‘সারওয়ারের বিসিএসের খবর আমরা পেয়েছিলাম। বাবা খুব আশা করেছিল তুমি ওকে নিয়ে আসবে সালাম করাতে।’ ইব্রাহিমের অস্বস্তি হয় সে চোখ সরিয়ে, বাড়ির সজ্জা দেখে। দেয়ালের বড় ছবিটায় চোখ আটকায়। বড়কর্তা-বড়মাকে ঘিরে তিন ছেলে আর তাদের বৌয়েরা। সঞ্জয় বাবু আর রানিমা নিচে বসা । রানিমার কোল ঘেঁষে কাত হয়ে বসেছে বারো-তেরো বছরের চশমা পরা ফুটফুটে কিশোরী। বড় কর্তার নাতিদের কেউ নেই এই ছবিতে। বড় বৌদি ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে চেনায়। ‘বাবার আশি বছরের জন্মদিনে তোলা। চিনেছ? রানিমা । এটা ওর মেয়ে মৌটুসী।’ রঙিন ছবিতে রানিমার বিরান কপালে চোখ থমকায় ইব্রাহিমের। রানিমার চোখ ছুঁয়ে আছে আনন্দ। ঠোঁটে টেপা হাসি। কপালদোষে ইব্রাহিমের কিশোর কাঁধেই উঠেছিল সংসারের জোয়াল। দুধের ভাঁড় নিয়ে আসাযাওয়ার পথেই পেয়েছে জীবনের পাঠ। মানুষের মুখ পড়তে ওর ভুল হয় না সচরাচর। ছবি বলে, রানিমা সুধাংশু বাবুর অনুপস্থিতি মেনে নিয়েছে।

বড়বৌদি বললেন, ‘তুমি খেয়ে যাবে ইব্রাহিম। রানিমা চলে আসবে তিনটার দিকে।ওর মেয়েও ওর স্কুলেই পড়ে। খুব খুশি হবে তোমাকে দেখলে।’ বড়মা’র সাড়াশব্দ নেই! বড়বাবু জানান স্ট্রোকে জিভ ধরে গেছে। হাঁটাচলায়ও কষ্ট । বড় বৌদি ইব্রাহিমকে নিয়ে যান বড় মার ঘরে। চোখ বুজে শুয়ে আছেন বড় মা। ছোট হয়ে গেছে শরীর! বড়বৌদির ডাকে চোখ খুলে দেখেন ইব্রাহিমকে। বড় অদ্ভুত সেই দৃষ্টি। ইব্রাহিমকে নয় ওকে পেরিয়ে অন্য কোথাও দেখছেন যেন। ঠিক সুধাংশু বাবুর মতো। বড় বৌদি কাছে গিয়ে বললেন, ‘মা ইব্রাহিমকে মনে আছে?’ বড় মার দৃষ্টি লাটাই ছেড়া ঘুড়ির মতো গোত্তা খায় ওর মুখে। ইব্রাহিম বলল, ‘বড় মা আঁই ইব্রাহিম।ছিনিত পাঁইজ্জুন না? স’দ দুধওয়ালার ফোয়া?’ (বড়মা আমি ইব্রাহিম। চিনতে পারেন? স’দ দুধওয়ালার ছেলে।) ইব্রাহিমের ‘দুধওয়ালা’ পরিচয়টা উহ্য রেখে কেবল নাম ধরে চেনাতে চেয়েছিলেন বড় বৌদি। অবাক কাণ্ড ইব্রাহিম নিজেও বাবার লেবাসেই নিজেকে মুড়ে নিল! বড় মা চেনেননি।

দুপুরে খুব খাওয়া-দাওয়া হলো । বৌদির রান্নার হাত ভালো। অনেক রেঁধেছেন। নারকেলের বড়া, বেগুন দিয়ে পুঁই শাক, মসুর ডাল, বড়ি দিয়ে পাবদা মাছ, আবার মোরগের লাল সুরুয়াও ছিল। সেটা ইব্রাহিম ছোঁয়নি। হেঁদু বাড়ির মোরগ হালাল জবাই নাও হতে পারে। সঞ্জয়বাবু এলেন খাওয়ার আগে। সারওয়ারের খুব সুখ্যাতি করলো সঞ্জয়বাবু। সেজবাবুর সাথে কিছু কথা হলেও সেজ বৌদি একটি কথাও বলেননি। ‘সুধাংশু বাবু’ও বাবুদের আলাপে উহ্য রইলেন। সঞ্জয় বাবুর পাতে মাছ দিতে দিতে বড় বৌদি জানালেন, ‘জানো মা ইব্রাহিমকে চিনতে পারেননি।’ সঞ্জয় বাবু অবাক হলেন। খাওয়ার পরে সঞ্জয় বাবু জোর করেই আবার নিয়ে গেলেন বড় মার ঘরে। বড় মা তখন বিছানায় বসা। ইব্রাহিম এবার দেখল জানালার পাশে কুলুঙ্গিতে রাজ্যের জিনিস। প্রথমবার খেয়াল করেনি তো! সঞ্জয় বাবু প্রায় কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেন , ‘মা ইব্রাহিমরে চিন্‌সো’? সেই যে দুধ দিত?’ বড়মা আবার তাকায় ওর দিকে। ইব্রাহিমের মনে হলো ঠাকুরদিঘির কুমিরের মতো পানির ভেতর থেকে আবছা ভাসছে সেই দৃষ্টি। ইব্রাহিমের পিঠ বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল যেন! হঠাৎ মাথা ফিরিয়ে কুলুঙ্গির ওপর থেকে হামানদিস্তা টেনে নিলেন বড় মা। তারপরেই শূন্য হামানদিস্তায় হাতল ঠুকতে লাগলেন, ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ। অপ্রস্তুত সঞ্জয় বাবু বলল, ‘মা-র আসলেই মনে নাই।’

বসার ঘরের দিকে ফিরে যাওয়ার সময় ইব্রাহিমের মনে হলো বড় মা-র হামানদিস্তাও শব্দ তুলে সমান পায়ে হাঁটছে ওদের সঙ্গে। মাঝে মাঝে ওঁর হাত পিছলে হাতল লাগছে হামানদিস্তার গায়ে। আর সেই ধাতব শব্দ ঠং করে ইব্রাহিমের মাথায় বাড়ি দিচ্ছে যেন। বসার ঘরে ঢুকতেই বড়কর্তার ছবির দিকে ফের নজর যায় ইব্রাহিমের, অমনি বাঁ-দিকের বুকপকেটে রাখা তিন হাজার টাকার চাপ বুকে লাগে। টাকাটার কথা ভুলেই গিয়েছিল ইব্রাহিম! টাকাটা বড়বাবুর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, ‘ আঁর নাম গড়ি নাতিনর লাই কিছু কিনি দিওন ব ’ (আমার হয়ে নাতনিকে কিছু কিনে দেবেন বাবু) অপ্রস্তুত বড়বাবু বলেন, ‘টাকা নয় ইব্রাহিম, আশির্বাদ করো বাচ্চাটাকে। মায়ের মত দুর্ভাগ্য যেন না হয়।’ রানিমা’র দুর্ভাগ্যের উল্লেখে ইব্রাহিমের মনে ফের দ্বিধা জাগে, সুধাংশু বাবুর কথা কি বলা উচিত? বড়মার হামানদিস্তার বাড়ির তালে ওর পাপপুণ্যের দ্বন্দ্ব জোর দুলুনি খেতে শুরু করে। সেইসাথে মাথার ভেতরে আমেনা বিবির গলাও যেন আঙুল নাড়ে, ‘খোদা নারাজ হইবো’। টাকাটা জোর করে বড় বাবুর হাতে গুঁজে দেয় ইব্রাহিম। আর তখনই বড়বাবু বলেন, ‘আমার বাবা আর কোনদিন দুধ খান নাই ইব্রাহিম। তোমার ঘন দুধের সরের স্বাদ ভুলতে পারেন নাই! বাবা তোমারে অনেক ভালোবাসতেন’। ইব্রাহিম ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে, ‘বড়কর্তা দুধ খান নাই আর?’ পাশের ঘরে বড়-মার হাতলের বাড়ি লাগে ঠং করে !’ ইব্রাহিমের দুই চোখের জলের ধারা বাধ মানে না। ইব্রাহিম জানে এই ধুপধুপের মানে। কী এক ঘোরে ও উঠে দাঁড়ায়। পর্দা ঠেলে প্রায় ছুটে পাশের ঘরে যায় ও। পেছন পেছন অন্যেরাও।

ইব্রাহিম বড়মার পায়ের কাছে বসে অভিমানী শিশুর মত চৌদ্দ বছর আগের অপমানের বিচার দেয়। সবই বলে কেবল বলে না এইসব কথা শেষদিন সেজ বৌদিকেও বলেছিল সে। বড়-মার হাত থামে। ইব্রাহিম দেখে - ঘোলা চোখ ডুবে গেছে পানির তলায়। বড় মা কাঁদছেন। ইব্রাহিমের কানে বাজে অনেকদিন আগে কুমিল্লার আঞ্চলিক টানে বলা সেই অনুরোধ, ‘পোলাপানে দুধ খাইলো কি না খাইলো ইডা বিষয় না, তুমার কর্তায় দুধ দিতে দেরি হইলেই বাড়ি মাথায় তুলেন। ‘রোজ’ যেন বাদ দিও না ইব্রাহিম!’

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. একটা অভিমান কে ব্যাথার ভাজে গুছিয়ে নিয়ে প্রকাশ করার ভেতরে যে দক্ষতার প্রয়োজন সেটা বোধহয় রঞ্জনা ব্যানার্জীর পক্ষেই আয়োজন করা সম্ভব - এই গল্পটা পড়ার পরে বারবার তাই মানে হয়। হঠাৎ করে শরৎচন্দ্রের মহেশ গল্পটি মনে এসে গেল এটা পড়তে পড়তে। রঞ্জনা ব্যানার্জী ও শরৎচন্দ্রের মত এক কথাসাহিত্যিক।

    উত্তরমুছুন