শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের 'একটি অসমাপ্ত গল্প'

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ক্রোড়পত্রএ গল্পটি বলতে গিয়ে আমার যে কী কষ্ট হয়! প্রেসার বেড়ে যায়| কতবার গল্পটি বলতে চেষ্টা করেছি, প্রধানত নিজের কাছেই। কী করব, আজকাল কারো ধৈর্য নেই গল্প শোনার। অমন সন্তের মতো মানুষ হাসনাত ভাই, সাহিত্য সম্পাদক, তিনিও বললেন আমাকে মাঝপথে থামিয়ে, 'ও। গল্পটা মন্দ নয়।’ আমিতো অবাক। মাঝখান অব্দি গল্পটাতে কী আছে? আমি বেশ আহত হলাম। বুঝতে পেরে তিনি বললেন, 'এ রকম গল্প প্রায়ই শোনা যায়।'
কোথায় শোনা যায়, কোথায়? জানাবেন কি হাসনাত ভাই ? আর হেলালকে বলতে গিয়ে তা আরো ফ্যাসাদ। সে বলল, ‘আমি এ রকম বিষয় নিয়ে একটা কবিতা লিখেছি।’ কী করে লেখে সে কবিতা, আমার তিন চতুর্থাংশ গল্পে যা আছে, তা নিয়ে? নাকি সে অভিযোগ আনবে কুম্ভীলকবৃত্তির, আমার বিরুদ্ধে? 

কোন গল্পটা? শোনার আগ্রহ আছে তাহলে? সুখের কথা। কারণ, মানুষ আজকাল নিজের গল্প ছাড়া অন্য কারো গল্প শুনতে চায় না। খালি হাই তোলে; আর ইতর প্রকৃতির হলে নাক সিঁটকায়। অথবা গল্পটা খুব করুণ হলে, ছোখ ছলছল করার ভান করে। এটি বাঙালি খুব শিখেছে; অল্পতেই কেঁদে ফেলার অভিনয়। এই করে বাঙালি একদিন চাঁদে পৌছে যাবে, জেনে রাখুন। 

হৈ চৈ করছেন কেন? গল্পটাতো হাওয়া হয়ে যাচ্ছে না, আর আপনার সময়ের কীই বা বাহারি মূল্য? বাঙালি তো; হয় ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে বাহাদুরি, নইলে বাইরে গিয়ে আকাম কুকাম । এর বাইরে কী করেন, ভাই? একটা গল্প আস্ত শোনার ধৈর্য নেই। এক মিনিটের আয়ু উল্লাস আর উত্তেজনার। আপনার জন্য গল্পটা এক মিনিটেই বলব, কথা দিচ্ছি। আমি জানি, এটি আলিমুজ্জামানের গল্প না হলে ওই এক মিনিট ও দাঁড়াতেন না। 

আলিমুজ্জামান একটা দোনলা বন্দুক রাখে বাড়িতে। ভয় যে পাবেন, ঠিকই জানতাম, আলিমুজ্জামানের ভয়ে আপনি ভীত। কারণ তার হিট লিস্টে আপনিও আছেন। তার স্ত্রীর দিকে একদিন হলেও অপাঙ্গে তাকিয়েছিলেন, কারবালা মসজিদের পাশ দিয়ে যখন দশ নাম্বারের বাসে উঠতে যেত। মিসেস আলি্মুজ্জামান কাজ করতেন আবহাওয়া অফিসে। আপনি না হয় আপনার ছেলে - আপনার মতোই তো, আপনার ছেলে--- আলিমুজ্জামানের বড় মেয়েটার পেছনে পেছনে কলেজ তক কোনো একদিন হেঁটে গিয়েছে। মিরপুরের জোয়ান ছেলেদের জন্য এ ছিল এক মহা চিত্তসুখের চর্চা। অথচ মেয়েটা বোবা! বোবা মেয়ে কলেজে পড়ে কিভাবে? প্রশ্নটা অবান্তর। এই যে আপনার তরতাজা মেয়েটা যার মুখে খই ফোটে সারাদিন, মাছি বসতে পারে না এক পলক, সে যখন রংচঙা জামা ওড়না ডিভাইডার পরে, ঠোঁটে লিপিস্টিক মেখে কলেজে যায়, ক্লাসে গিয়ে বসে, তখন সেও তো পাথরের মত হয়ে যায়। পেটে বোমা মারলেও ইতিহাস কি সমাজতন্ত্র কি চাঁদের অমাবস্যা বিষয়ে একটা শব্দও বলতে পারে না। নাকি? 

রাগ করলেন ভাই, এমন কথা বলায়? 

কী বললেন, আপনার কোনো মেয়ে নাই? ঠিক আছে। বলছি আলিমুজ্জামানের গল্প : বোবা মেয়েটা রাস্তা দিয়ে যায়, আর মিরপুরের দুষ্টপ্রকৃতির ছেলে ছোকরারা আজেবাজে মন্তব্য করে, তাকে উত্যক্ত করে। অর্থাৎ ঈভ টিজিং- বাংলাদেশ দন্ডবিধি মতে মতে দণ্ডনীয় অপরাধ। আলিমুজ্জামান পুলিশের দারোগা । একদিন সেপাইসান্ত্রী নিয়ে হামলে পড়ল ছোকড়াদের ওপর। এত ছেলেকে গ্রেফতার করল যে, একটা ট্রাক আনতে হল এদের থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

ছোকড়াগুলো যখন ছাড়া পেল লক আপ থেকে, এতটা হাড্ডিও জায়গামত ছিল না তাদের শরীরে। 

সেই প্রহৃতদের মধ্যে এক ছাত্র নেতাও ছিল: সে খুব সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ন,য় তার প্রেস্টিজদ খুব লেগেছিল, বুঝলেন? সে নানা জায়গায় গিয়ে বলল, এর প্রতিকার চাই। কিন্তু প্রতিকার তেমন হল না। ছাত্রনেতা বটে, কিন্তু ছোটোখাটো গোছের - পল্লবী কলেজের কমনরুম সম্পাদক, কে পাত্তা দেয় বলুন? এতে পাড়ায় তার প্রেস্টিজ খুব গেল। সে বলল, 'এর একটা বিহিত করব।' 

বোবা মেয়েটার নাম ছিল আফরিন। তাকে ওই গ্রেপ্তারী ঘটনার পর থেকে কলেজে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিল তুষার - তার বছর দুয়েকের বড় ভাই, জগন্নাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পড়ে, প্রথম বর্ষে। উঁচু, লম্বা, অনেকটা বাবার মত, কিন্তু চেহারা দারুণ, মা থেকে পাওয়া-- আপনি মনে হচ্ছে কিছুটা আপসেট হচ্ছেন ছেলের প্রসঙ্গ এসে পড়ায়? কারণ কি, ভাই ? যাকগে। 

ছাত্রনেতার নাম ছিল আক্কাস। তার ব্যবসা ছিল কন্ট্রাক্টরি । দশ নাম্বারের পাশে ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় যে আনুষঙ্গিক কিছু কাজটাজ হয়, সে তাতে ঠিকাদারী পেয়েছে। হাতে টাকা আছে, নির্মাণ শ্রমিক আছে বেশ কিছু, আর বখাটে মস্তানরা তো আছেই। 

এই অংশটা আমিও ঠিকমত গুছিয়ে বলতে পারব না, ভাই। আমার এমন ক্ষমতা সত্বেও। এ আক্কাস আলী, যাকে কোনো কোনো মিরপুরবাসী বুলেট আক্কাস নামে ডাকত, একদিন থানায় ডায়রি করতে গেল এই অভিযোগ তুলে, যে ‘হিলিং পয়েন্ট’ ক্লিনিকের পাশে তার শেড থেকে কে বা কারা নির্মাণসামগ্রী চুরি করে নিয়ে যায়- ইটকাঠ, লোহালক্কর। 

পুলিশ মামলা নিল না । আক্কাসকে বলল, তার নিজের লোকজনই চুরি করছে। চোখকান খোলা রাখ, দারোয়ান লাগাও, তারা বলল, 'বৃথা আমাদের সময় নষ্ট করো না।’ 

পুলিশের সময়, আমরা জানি, খুবই মূল্যবান। আক্কাস সেটা জানত না। 

তিনদিন চারদিন, এ ঘটনা ঘটল। এক কথিত চোরকে মারধরও করা হল। তাকে থানায় নিয়ে গেল বুলেট আক্কাস, কিন্তু পুলিশ তাকে আরো কয়েক ঘা লাগানো ছাড়া কিছুই করল না, লোকটাকে ছেড়ে দিল। মামলা নিল না। 

বাংলাদেশ পুলিশ, ভাই এই কথাগুলো বলছি, এজন্য আমার বিরুদ্ধেই একটা মামলা লাগিয়ে দিতে পারে। 

একরাতে আরেক চোর ধরা পড়ল, কি এবার পিটুনিটা হল দারুণ । মনে হল একে মেরেই ফেলবে। ঘটনাটা থানার দেয়ালের বাইরে ঘটল-- না, চুরির ঘটনা নয়, প্রহারের ঘটনা। থানার ভেতর থেকে আলিমুজ্জামান মারের দৃশ্য দেখে বলল পুলিশকে, বাইরে গিয়ে হাঙ্গামা মিটিয়ে আস। লাঠি নিয়ে যাও, কয়েক ঘা লাগাও সব শ্যালককে। আলিমুজ্জামানের পুলিশ গেটের বাইরে গিয়ে লাঠিচার্জ করল, কিন্তু আক্কাসের গায়ে বাড়ি পড়ল না । সে চতুর ছেলে- দূরে দাঁড়িয়ে দেখল। 

চোরকে মুমুর্ষূ অবস্থায় থানায় নিয়ে আসা হল। আলিমুজ্জামান ঘর থেকে দেখল। তার প্রচণ্ড বিরক্তি চাপল। এই ছিঁচকে চোরদের জন্য এক মিনিটের শান্তি নেই। 

পুলিশকে বলল, 'শ্যালকটাকে আরো তিন ঘা লাগাও।' পুলিশেরা জনগণকে এভাবেই সম্বোধন করে। একটু অপ্রিয় হলেই মানুষকে তার স্ত্রীর ভ্রাতা হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। এতে বোঝা যায়, আসলে পুলিশ জনগণের বন্ধুই কারণ তারা তাদের স্ত্রীদের খুবই পছন্দ করে এবং স্ত্রীদের ভ্রাতাদেরও নিশ্চয় পছন্দ না করে পারে না। 

বড় সাহেবের অর্ডার । পুলিশ লাগাল কয়েক ঘা মুমূর্ষ চোরটার ওপর। 

মুমুর্ষূ চোরটা আসলে তুষার। তাকে সন্ধ্যার পর অন্ধকার বাতিহীন রাস্তা থেকে তুলে এনে ‘হিলিং পয়েন্ট’ ক্লিনিকের পাশে অমানুষিক প্রহার করেছে আক্কাস ও তার দল। পরে মরমর অবস্থায় থানার সামনে নিয়ে গিয়ে সাজিয়েছে ওই নাটক, যে নাটকের ফাঁদে পা দিয়েছে আলিমুজ্জামান। 

মুমূর্ষ তুষার নিভতে থাকা বাতির মত অনুজ্জ্বল চোখে তাকায় একটি পুলিশের দিকে এবং অতিশয় ক্ষীণ কণ্ঠে, যা শুধু তার চারিদিকে উড়তে থাকা মশারা শুনতে পায়, এক গ্লাস পানির জন্য অনুরোধ করে। পুলিশটি দেখে, চোরটা আসলে দারোগা সাহেবের ছেলে। 

তুষারের কী হল? আলিমুজ্জামানের কী হল? দুটি পরিণতির কথা বলি, যার যেটা ইচ্ছা বেছে নিন মর্জিমত, কি বলেন? 

ক। আলিমুজ্জামান বিদ্যুৎপৃষ্টের মত উঠে দাঁড়ায় চেয়ার থেকে। এক লাফে দরোজা পেরিয়ে বারান্দায় এসে হাঁটু গেড়ে বসে তুষারের পাশে। তুষারের একটি হাত অলসভাবে পড়ে আছে মেঝেতে - সেটি অন্তত চার জায়গায় ভাঙ্গা, থেঁতলে যাওয়া। তার একটি চোখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে; নাকের পাশ দিয়ে, কষ বেয়ে ঝরছে রক্ত। তার বুকের মাংস কে যেন খুবলে তুলে নিয়েছে। 

আলিমুজ্জামানের আকাশ ফাটানো কান্না আর বিলাপের শব্দ তার কানে পৌছায় না। 


খ, আলিমুজ্জামান একটানে বুকে তুলে নেয় তুষারকে । প্রাণটা এখনও আছে। শক্ত মানুষ মানুষ আলিমুজ্জামান। ছেলেকে পাঁজাকোলা করে দৌঁড়ায়, 'হিলিং পয়েন্ট’ ক্লিনিকের দিকে। 

গভীর রাতে, যখন আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে আলিমুজ্জামান এবং ক্রন্দনরত তার স্ত্রী ও কন্যারা, ডাক্তার এসে জানায়, ক্লিনিকের বারান্দায় - ডাক্তারের মুখটা হাসিখুশি -- এবার বাড়ি যান, দারোগা সাহেব। এ যাত্রা আর ভয় নেই। 

আলহামদুলিল্লাহ। | কিন্তু আপনি খুব সন্তুষ্ট হলেন না, এ প্রস্তাবনায়? আমি কি করব, বলুন? লোকজন বিয়োগান্তক গল্প চায় না। সবাই চায় নায়ক বেঁচে থাক। একবার এরকম একটা বিয়োগান্তক গল্প বলে প্রায় মার খেতে বসেছিলাম, মানুষের হাতে। 

আপনার নিজস্ব একটা পরিণতি প্রস্তাব আছে? বলেন কি, ভাই, শিগগির দিন! এ পর্যন্ত আমার গল্প, তাতেও লোকজন শুনতে চায় না। এখন যদি আপনার পরিণতি তাদের মনে লাগে। 

দাঁড়ান; আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি? তুষারের পিছে আপনাকে ঘুরতে দেখেছি। বুলেট আক্কাসের সঙ্গে তো আপনার খুব ঘনিষ্টতা । তাকে টাকা পয়সা দিয়েছেন, দেখতে পেয়েছি। কি বললেন, ওর মটর সাইকেলটা আপনিই দিয়েছেন, সর্বনাশ। তাছাড়া--দাঁড়ান মশাই, তুষার যখন আমার বা্রান্দায় পড়ে ছিল, বাঁচবে না মরবে সে ভার আমার হাতে সঁপে দিয়ে, তখন আপনিও তো ছিলেন গেটের পাশে দাঁড়িয়ে। চাঁদের আলোয় আপনার দেঁতো হাসির কথাটা আমি কি করে ভুলি? 

তুষারের একটাই পরিণতি? অর্থাৎ ঐ প্রথমটা, পরিণতি কি ‘ক’? কেন এত হৃদয়হীন আপনি, ভাই? ছেলেটা কি দোষ করেছে? 

ছেলে নয়, ছেলের বাবা? এই আলিমুজ্জামান? কি তার দোষ? কি বললেন? 

একাত্তুরে আলিমুজ্জামানমান রাজাকার ছিল? আপনার দু'টি ছেলেকে ধরে নিয়ে গুলি করে মারে সে? আপনার স্ত্রী নিজের প্রাণ দিয়েছিলেন সেই কষ্টে? 

ও! এ রকম গল্প কতই শোনা যায়। 

1 টি মন্তব্য:

  1. গল্পের শেষাংশে মোড় ঘোরানোর চেষ্টা রয়েছে। কিছুটা অন্যরকম।

    উত্তর দিনমুছুন