বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

শাহনাজ মুন্নীর গল্প : গুলটুশ


‘বানরের গল্প শুনবেন?’ 

একদম কানের কাছে হঠাৎ এই প্রশ্নটা করে আমাদের প্রায় চমকে দিয়ে সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে লোকটা। লম্বায় আমাদের কোমরের কাছাকাছি, বামন নাকি? আমরা মনে মনে ভাবি। ঘাড়টা নিচু করে পাশে তাকাই, চাদরে ঢাকা লোকটার মুখ পরিস্কার দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার কথা শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। আজকে বিকেলেই চর মুগুরিয়া বন্দরে প্রায় শ’তিনেক বানরকে একসাথে ঘুরতে দেখে এসে বানর সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল যথেষ্টই বেড়ে গেছে, তাই শকুনী লেকের পাশে শহীদ মিনারের বাঁধানো বেদীতে জুত্ করে বসে আমরা বলি--
‘শোনান তো দেখি’। 

লোকটাও বসে,একটু দূরে, ঘাসের ওপর, তারপর বলতে শুরু করে। 

সে অনেক দিন আগের কথা। পদ্মা নদীর সঙ্গে যেখানে কুমার নদ এসে মিলে গেছে সেখানটাকেই এ অঞ্চলের লোকে তখন ডাকতো কুলপদ্দী বলে, পদ্মার কোল ঘেষে শুয়ে থাকা আদুরে মেয়ের মতোই ছোট্ট সবুজ আর খুব আহ্লাদি এক এলাকা ছিল এই কুলপদ্দী। কলকাতার বেথুনে পড়া মেয়ে শাশ্বতী যখন কুলপদ্দীর অভিজাত রায় পরিবারের বউ হয়ে শেয়ালদা থেকে রেলে গোয়লন্দ তারপর স্টীমারে ভেসে পূর্ব বঙ্গের এই নিঝুম এলাকায় পা রেখেছিল তখনই কেন যেন কুলপদ্দীকে ভারী ভাল লেগে গিয়েছিল তার। শহর থেকে এতো দূরে বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে যাওয়ার পর বড়’দা নাক কুঁচকে বলেছিলো, ‘যাচ্ছিস তো বাঙ্গালদের দেশে, সাবধানে থাকিস, দালানের বাইরে পা দিস না যেন।’ 
তা দালান বলতে কুলপদ্দীতে তখন এক ছিল রায় বাড়ির এই কারুকাজ করা লাল রঙা দোতলা দালান--যে বাড়ির একমাত্র ছেলে যোগেশ রঞ্জন রায়ের বউ হয়ে এসেছিল শাশ্বতী আর ছিল পদ্মার পাড়ে সবে তৈরি হওয়া জজ সাহেবের একটা ঝকঝকে এক তলা বাংলো, এ ছাড়া তো বাকি সবই দরিদ্র চাষা-ভূষা মানুষের কুঁড়েঘর, দিগন্ত ছোঁয়া ধান ক্ষেত, পাট ক্ষেত আর কচুরী পানা ভরা জলাভূমি। বাড়ির সামনে পেছনে নারকেল গাছে ঘেরা বিশাল দুটো দিঘী আর রকমারী গাছের হুলুস্হুলু সমারোহে ছায়া ঢাকা রায় বাড়িটাকেই আস্ত এক মিউজিয়াম বলে মনে হচ্ছিল কলকাতার মেয়ে শাশ্বতি’র। না, না, মিউজিয়াম না, চিড়িয়াখানা। 

চিড়িয়াখানা নয়তো কি? বাগানের গাছে গাছে এতো জানা অজানা রঙবেরঙের পাখি, এতো বানর আর এতো কাঠবেড়ালি। কলকাতার পাকা রাস্তা, এঁদো গলি আর ওয়েলেসলী স্ট্রীটে নিজেদের কবুতরের খুপড়ি’র মতো ইটের বাড়ির তুলনায় কুলপদ্দীকে দারুণ আকর্ষণীয় মনে হলো ওর। এই মনে হওয়ার অবশ্য কারণও আছে, আপনারা জানেন না, আমাদের শ্রীমতি শাশ্বতী রায়ের একটা গোপন লাজুক কবি মন রয়েছে, কলকাতায় থাকতে খাতা ভরে পল্লীগ্রামের সৌন্দর্য বিষয়ে অজস্র কবিতা লিখেছে সে। সেসব কবিতায় গ্রামের গরীব কৃষক বঁধুর নিকানো দাওয়া, তুলসী মঞ্চ, জলের মধ্যে বাচ্চা হাঁসের খেলা, শ্রাবণের মেঘে ঢাকা আকাশ--ইত্যাদি চিত্র কল্পনা করে শব্দের পর শব্দ জোড়া দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছে সে। 

শাশ্বতীর স্বামী যোগেশ রঞ্জন রায় বিয়ের দুদিন পরেই নতুন বউ রেখে ব্যারিষ্টারি পড়তে চলে গেছে বিলাতে। যোগেশের এক বিধবা দিদি সৌদামিনি, মা হেমাঙ্গিনী, অকৃতদার জেঠা মশাই আর একগাদা চাকর বাকর ছাড়া পুরো বাড়িটাতে আর কেউ ছিল না। এই নিঝুম নীরবতায় শাশ্বতী’র দিন কাটতো দিঘীর পাড়ে আর নামে বাগান কিন্তু আদতে ঝোপঝাড় আর সাপ-খোপ, বেজি-বাদরে ভরা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে। সৌদামিনি অবশ্য ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখতো না, 

‘ও লো বউ, তুই কেমন মাইয়া লো? এমন বন বাদাড়ে ঘুইরা বেড়াস? তোর কি ভয় ডর করে না?’ 

‘ভয় তো করে না দিদি, ভালই লাগে।’ 

‘মরণ! পূজো আর্চ্চার দিকে একটু মন দিলেও তো পারোছ। ’ 

‘আমি যে প্রকৃতি দেবীর পূজো করি গো দিদি। ’ 

শাশ্বতী হাসতে হাসতে বলে, সৌদামিনির এসব কথা বুঝতে পারার কথা নয়, সে মুখ ঝামটা মেরে বলে, 

‘তোরা কলকাতার মাইয়া, কত রং ঢং জানোস, তোগোরে বোঝা ভার, তার ওপর পেটে আবার কিছু বিদ্যাও আছে শুনছি।’ 

নন্দাইয়ের কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ে শাশ্বতী। নিজের ঘরে দরজা লাগিয়ে সে যোগেশের পত্রের উত্তর লিখতে বসে। যোগেশ চিঠি লিখে ইংরেজীতে, ইংরেজের আদব কায়দা, ইংরেজী চাল-চলন সবই তার বিশেষ পছন্দ, চিঠি জুড়ে তাই টেনিস কোর্ট, ব্রেকফাস্ট, টি পার্টি, ডিনার, পিয়ানো আর ইংল্যান্ডের উইন্টারের বর্ণনা। শাশ্বতী চিঠি লেখে বাংলাতে, তার মনে হয় ইংল্যান্ডের পাতা ঝরার সৌন্দর্য যোগেশের চোখে পড়লেও কুলপদ্দীর বকুল আর শেফালির দিকে সে বোধহয় কখনো ফিরেও তাকায়নি। শাশ্বতী তাই লেখে-- 

‘ওগো, কাল ভোরে উঠিয়া দেখি, গাছ হইতে শিউলি ঝরিয়া ভূমিতে এক অপূর্ব চিত্র তৈরি হইয়াছে, আমার চিত্ত তাহা দেখিয়া এতো আনন্দে পরিপূর্ণ হইলো, যাহা বর্ণনা করা কঠিন। জানো, বাড়ির বৃক্ষরাজির মধ্যকার প্রাণী সকলের সহিত আমি বন্ধুত্ব গড়িয়া তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছি, তবে উহারা খুবই দুষ্ট আর চঞ্চল প্রকৃতির, অবশ্য সম্প্রতি উহাদের কেউ কেউ যে আমাকে পছন্দ করিতে শুরু করিয়াছে তাহা টের পাইতেছি। ভাবিয়াছিলাম কুলপদ্দী আমার ভাল লাগিবে না, কিন্তু সেই ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হইয়াছে।’ 

তবে শাশ্বতী’র এই প্রাণী প্রীতি হেমাঙ্গিনীর কিন্তু মোটেও পছন্দ হচ্ছিলো না, 

‘এ রাম, ছি ছি, ঘেন্নায় মইরা যাই, তুই এইসব জন্তু জানোয়াররে ঘরে আইতে দিলি যে বউ, এইগুলারে লাই দিলে মাথায় ওঠে, জানোস না?’ 

শাশুড়ির কথায় শাশ্বতীর মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না, সে আগের মতোই যেমন দিচ্ছিলো তেমনি করে এক কাঁদি কলা থেকে একটা একটা করে কলা ছিঁড়ে হাতে নিচ্ছিলো আর জানালা দিয়ে একের পর এক বানর দল ঢুকে শাশ্বতীর হাত থেকে কলাটা নিয়েই দিচ্ছিলো ছুট্, যেন খুব মজার একটা খেলা খেলছে তারা, শাশ্বতীর চোখে মুখেও কেমন একটা স্নিগ্ধ প্রফুল্ল আনন্দের ভাব ফুটে উঠেছিলো, ওর শাড়ির আঁচল গড়াচ্ছিল মেঝেতে, কয়েকটা বানর সেই আঁচল মাড়িয়ে এসে’ও কলা নিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ করে ঘরে ঢুকে চোখের সামনে পুত্রবধূর এসব আলাভোলা কাণ্ড দেখে হেমাঙ্গিনী’র তো ভিমড়ি খাওয়ার জোগাড়। 

‘এ্যাঁ ... এইটা কি হইলো? যোগেশ দেখি কলিকাতা থেইকা একটা পাগলি বিয়া কইরা আনছে’রে ... রামো, রামো, রামো।’ 

হেমাঙ্গিনি’র কথা যেন শুনতেই পায়নি এমন ভাবে বানরদের কলা বিতরণ শেষ করে নিজের লুটিয়ে পড়া আঁচলটা তুলে নিয়ে শাশ্বতী বলে, 

‘মা দেখো, ওই যে বড় কামরাঙা গাছটায় গম্ভীর হয়ে একজন বসে আছে না! দেখো ওই যে, পাতার আড়ালে ..।’ 

‘এ ভগবান, এইটা তো দেখি এক ভোৎকা বান্দর! এইটা কোই থাইকা আইলোরে?’ 

‘জানো মা, ওর ভাব ভঙ্গী না অনেকটা মানুষের মতো।’ 

‘কি যে আজগুবি সব কথা তুই কস না বউ।’ 

হেমাঙ্গিনী গজ্ গজ্ করেন, ‘শোন, বনের প্রাণীরে অগো মতন বনে থাকতে দে, ঘরে আইনা তুলিস না, ঘেন্না পিত্তি বইলা তোর ভেতরে ভগবান কিছু দেয় নাই, নাকি?’ 

বানরকে এতো ঘেন্না করার কি আছে, ভেবে পায় না শাশ্বতী। বড়’দা তো বলতোই, ‘মানুষের পূর্বপুরুষ আসলে বানর, হোমোসেপিয়ান গ্রুপের সদস্য এই বানরই হচ্ছে মানুষের সবচে কাছের আত্মীয়, বুঝলি?’ 

তাই যদি সত্যি হবে তাহলে ওদের কেন দূর দূর করবো? শাশ্বতী আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, চেয়ারের মতো বেঁকে থাকা কামরাঙা গাছটার ডালে কেমন বাবুদের মতো গম্ভীর হয়ে বসে আছে বড় বানরটা, 

‘কি রে কলা নিতে এলি না যে?’ 

শাশ্বতী জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে বলে, বানরটা চোখ ঘুরিয়ে শাশ্বতীর দিকে তাকায়, গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়েই থাকে তারপর যেন তার খুব রাগ হয়েছে এমন ভাব দেখিয়ে কামরাঙার ডাল থেকে নেমে ঘন গাছ-পালার আড়ালে হারিয়ে যায়। শাশ্বতীর হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে যায়। আজ সকালের ডাকে যোগেশের চিঠি এসেছে। সেই কঠিন কঠিন শব্দে ইংরেজি ভাষায় লেখা ভাব-গম্ভীর চিঠি। যোগেশ লিখেছে,-- 

‘তুমি দ্রুত কলকাতায় চলিয়া যাও, কুলপদ্দীর জঙ্গলে থাকিয়া তোমার কোন উন্নতি তো হইতেছেই না বরং তুমি দিন দিন জংলী হইয়া উঠিতেছো, শুনিতে পাই, পশুদের সহিত তোমার খুব ভাব। তোমার অবগতির জন্য জানাই পশুরা সামান্য খাবার, আশ্রয় আর সঙ্গ পাইলেই খুশি। তাহাদের মধ্যে কোন মানবিক আবেগ, ব্যক্তিত্ব বা তুমি যাহাকে মন বলিতেছো, তাহার বালাই নাই।’ 

কচু জানো তুমি! মনে মনে যোগেশকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায় শাশ্বতী। এই যে বড় বানরটার কথাই ধরো না, ও সবার সঙ্গে কলা নিতে এলো না কেন? আর কেউ বুঝুক আর না বুঝুক, শাশ্বতী ঠিকই বুঝেছে, অভিমান করে ও আসেনি, সবার সাথে গণহারে সে কিছুতেই খাবার খাবে না ও। সে আসলে চায় শাশ্বতী’র স্পেশাল আর অখণ্ড মনযোগ। যোগেশ তো প্রাণীদের বিবেচনা করছে বই পড়ে, বাইরে থেকে, আর শাশ্বতি ওদের দেখেছে হৃদয় দিয়ে, ভেতর থেকে, এই যে বানরগুলো ওদের মধ্যে ঈর্ষা, ভয়, দুঃখ, ভালোবাসা কি নেই ? হ্যাঁ, মানুষের মতো জটিলতা হয়তো ওদের মধ্যে নেই, কিন্তু যে বুনো সারল্য আছে তা-ই বা কম কিসে? 

শাশ্বতী তাক থেকে খাতা কলম পেড়ে নিয়ে যোগেশ’কে চিঠি লিখতে বসে। 

‘তুমি লিখিয়াছো ইংরেজি ভাষায় পত্র লিখিতে, হ্যাঁ, তাহাতে ইংরেজির চর্চা হয় ঠিক, কিন্তু বাংলা ভাষায় পত্র না লিখিলে আমার যে মন ভরে না, ওগো জানো, ওই যে বড় বানরটার কথা তোমাকে লিখিয়াছিলাম, উহার একটা নাম দিয়াছি, নামটা হইলো, ‘গুলটুশ’। আমি বাগানে গিয়া ‘গুলটুশ’ বলিয়া উচ্চস্বরে ডাক দিলেই সে আসিয়া উপস্থিত হয়। ও আমাকে ভারী ভালোবাসে। গুলটুশ-কে আমার কখনো কখনো একটি ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ বলিয়া ভ্রম হয়। সে দেখিতে যেমন অনেকটা মানুষের কাছাকাছি, তেমনি তার আচরণও অনেকটা মানুষের মতোই। সম্ভবত সে নরবানর, তুমি তো ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়িয়াছো...।’ 

‘বউ ও বউ, কই গেলি. দেখ্ তোর বাপের বাড়ি থাইক্যা লোক আইছে,’ 

সৌদামিনির ডাকে নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে শাশ্বতী দেখে, তার পিসতুতো ভাই ধীরেন এসেছে। 

‘পূজোয় তোকে কলকাতা নিয়ে যাবার জন্য মামা পাঠিয়ে দিলেন দিদি, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে, কাল ভোরেই স্টীমারে উঠব।’ 

তা শাশ্বতী যাবে বৈকি, পূজোর মতো এমন একটা উৎসব বাড়ির লোকদের সঙ্গে কাটাতে কার না ভাল লাগে? কিন্তু তার এখানের ছায়ামায়া ঘেরা লতাপাতা মোড়া সংসার? তার গগনশিরীষ, আমড়া, আমলকি! পাখির কিচিরমিচির, বানরকূল, কাঠবেড়ালি? 

দিঘী থেকে জাল পেতে তোলা পাকা রুইয়ের মুড়ো দিয়ে বানানো মুড়িঘন্ট খেতে খেতে ধীরেন তার দিদির দিকে তাকায়, ‘এত কষ্ট করে তোকে নিতে এলাম, আর তুই কি-না একটু’ও খুশি হলি না দিদি?’ 

‘না না, খুশি হই’নি কে বললো? আসলে এই জায়গাটা আমার কেন জানি খুব ভাল লেগে গিয়েছে রে। দুদিনের জন্য যাবো, তাতেই ছেড়ে যেতে কেমন মায়া লাগছে,’ 

ধীরেনের তাড়ায় স্টীমার ধরতে ভোর সকালে বেরিয়ে পড়তে হলো শাশ্বতী’র। গুলটুশ বা অন্য কারো কাছ থেকে আর বিদায় নেয়া হলো না তার। 

পূজোকে কেন্দ্র করে শাশ্বতীদের কলকাতার বাড়ি একেবারে সরগরম। দাদা, বউদি, দুই দিদি, জামাইবাবু, তাদের ছেলেমেয়ে, সবার সঙ্গে হৈ হুল্লোড় করে, পূজো মণ্ডপগুলো ঘুরে বেশ কাটলো পূজোর কয়েকটা দিন। যদিও এতসব হুল্লোড়ের মধ্যেও মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলো শাশ্বতী, জামাইবাবুরা রসিকতা করে বলছিলো, ‘কিরে শ্বাতী, যোগেশের জন্য মন কেমন করছে বুঝি?’ 

বৌদি ঠেস মেরে বলেছিলো, ‘নায়িকার এখন বিরহ পর্ব চলছে, ক্ষণে ক্ষণে মন তো উতলা হবেই।’ 

মৃদু হেসে চুপ করে থেকেছে শ্বাশতী, সে কেমন করে এদের বোঝাবে যোগেশ নয়, যোগেশের বাড়ির গাছ পালা আর জন্তু জানোয়ারের জন্য তার খুব মন খারাপ লাগছে। আচ্ছা, ওদেরও কি আমার কথা এরকম করে মনে পড়ছে? এই দুপুর রোদে কি করছে গুলটুশ? কেমন আাছে পুরনো বকুল গাছটা? কুলপদ্দীর বাতাসে কি এখনো মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে ছাতিম ফুলের রেণু ? কতখানি বড় হলো কদবেল গাছের বেলগুলো? 

শাশ্বতীর মা নেই, পূজো শেষে বাবা আদর করে বললেন, ‘শীত কাল পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থেকে যা না মা।’ 

বাবার অনুরোধ ফেলা গেলনা, কিন্তু উফ, কলকাতা যে এত বেশি দম আটকানো বদ্ধ একটা জায়গা তা আগে কেন এমন করে মনে হয়নি শাশ্বতীর! জানালা খুললে ছোট্ট একটা ধোয়াটে মলিন আকাশ, সবুজের বিরল রুগ্ন উপস্থিতি, চারপাশে প্রজাপতি নেই, ঘাসফুল নেই, বাতাসটাও কেমন যেন চাপা আর গুমোট। সব শুনে বড়’দা বললো, 

‘তুই তো দেখি দুদিনের বৈরাগি হয়ে ভাতকে অন্ন বলতে শুরু করেছিস শ্বাতী, সারাজীবন বাস করলি কলকাতায়, এখন মাথা খুঁড়ে মরছিস কোথাকার কোন অজ পাড়াগাঁ কুলপদ্দীর জন্য, ওখানে তোর মন টেকে কি করে, ভেবে পাই না,’ 

শাশ্বতী নিজেই কি জানে, কি করে ওর মন টেকে, আর কেনইবা ওখানকার সব কিছু এতো ভাল লেগে গেছে ওর। যেন নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না শাশ্বতী। এ তার কেমন টান! কেমন আবেগ! অঘ্রাণের শুরুতে আর পারলো না, ধীরেনকে নিয়ে প্রায় জোর করে কুলপদ্দীতে ফিরে এলো সে। 

‘ও বউ আইছস! নে, এইবার আমাগো উদ্ধার কর, তোর বান্দরগুলা তোরে দেখতে না পাইয়া আমাগোরে পারলে যেন ছিঁড়া খায়, তুই যে কি যাদু করছস বনের পশুরে তা তুই’ই জানোস বাপু!’ 

শাশ্বতী আসাতে সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী দুজনেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ওফ্, শাশ্বতী বড় করে শ্বাস নেয়, জঙ্গলের ঝিম ধরা ভেজা গন্ধ তার নাকে ঝাঁপিয়ে পরে, ফুসফুস্ ভরে ওঠে বিশুদ্ধ বাতাসে, দালানের বাইরে বেরিয়ে এসে কিশোরীর মতো দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে ঘুরতে থাকে শাশ্বতী, 

‘কইরে আমার গুলটুশ, কইরে আমার বানরকুল, কইরে আমার কাঠ বেড়ালী, আমার আদরের গাছ পাতা, পশু পাখি।’ 

কুলপদ্দীর সবাই যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল রায় বাড়ির যোগেশের বউ শাশ্বতীর মুখের এই নরম আদুরে ডাকগুলি শোনার জন্য, যেন তারা তৃষ্ণার্ত আর ক্ষুধার্ত হয়েছিল শাশ্বতীর একটু খানি স্নেহ, একটু খানি মমতা আর একটু খানি মনযোগ পাবার জন্য। 

‘ওরে আমার সোনারে, তোরা এতদিন কেমন ছিলিরে, কেমন করে কেটেছে তোদের দিন? আহা, গুডুশ তুই বুঝি একটু শুকিয়ে গেছিস, ওরে শিরীষ, তোর ডালটা এমন ভাঙলো কিভাবে রে? মা গো, এত ফুল কিভাবে ফুটালি তোরা চম্পা-পারুল? আরে, আরে বাবলার ডালে দেখি নতুন অতিথি, ওমা, ওটা কোন পাখির বাসারে? এ্যাঁ, লেজ দুলিয়ে গান করছিস, কেরে তুই, বেনে বউ নাকি কুটুম পাখি?’ 

প্রকৃতির খোঁজ খবর নেয়া যেন শেষই হয় না শাশ্বতীর। আর গুলটুশ? গুলটুশ কিন্তু অন্যদের মতো এক ডাকেই ছুটে এলো না, একটা অর্জুন গাছের শিকড়ে বসে রাজ্যের অভিমান নিয়ে তাকিয়ে রইলো শাশ্বতীর দিকে। নীরবেই যেন কত কথা বলছে সে, যেন বলছে, ‘এই তোমার ভালোবাসা? কাউকে কিচ্ছু না বলে হুট করে চলে গেলে, এখন এসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছো। তোমরা মানুষরা বুঝি এমনই নিষ্ঠুর, বেদরদি.. ’ 

তো শেষ পর্যন্ত গুলটুশের অভিমান ভাঙাতে কত কথা, কত কাতর অনুনয় বিনয় যে করতে হলো শাশ্বতীকে। 

‘পাগলী! একটা পাগল বউ জুটছে আমাগো যোগেশের কপালে।’ 

সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী ওর কাজ কারবার দেখে খানিকটা বুঝি প্রশ্রয়ের সুরেই বলে। 

হেমন্তের শুরুতে যোগেশ চিঠি লিখলো যে, সে দিশে ফিরছে। সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী বসে গেল যোগেশের প্রিয় খাবার, প্রিয় পিঠা, প্রিয় মিষ্টি তৈরির যোগাড় যন্ত্র করতে, শাশ্বতী কি করবে? যোগেশকে যতখানি চিনেছে, বুঝেছে, তাতে করে চুপচাপ অপেক্ষা করা ছাড়া, ওর এখন কিছুই করার নেই। 

‘জানিস গুলটুশ, তোদের জামাই বাবু আসছে, হ্যাঁরে, বাবু শ্রী যোগেশ রঞ্জন রায়, ব্যারিস্টার এট ল’। মন মেজাজ কেমন? তা একটু চড়া বটে, তবে অন্তরটা তেমন মন্দ নয়, উহু, পশু পাখি জন্তু জানোয়ার বোধহয় তার একবারেই পছন্দ নয়। না না ভয় পাসনি, তোদের পাশে আমি আছি না।’ 

যোগেশ কুলপদ্দীতে এলো সত্যিকারের সাহেব সেজে, পরনে কোট টাই হ্যাট, ঠোঁটে ধোঁয়া উগড়ানো পাইপ আর মুখে ইংরেজী বোল চাল। সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী তো বটেই, যোগেশকে দেখে শাশ্বতীও খানিকটা ঘাবড়ে গেল। মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয় কি-না, খাওয়ার জলের মধ্যে কলেরার জীবাণু আছে কি-না তা নিয়ে যোগেশ যেন খামাকাই একটু বেশি ব্যস্ত। ইংল্যান্ডে নারী-পুরুষের মধ্যে মেলা মেশা কত সহজ আর স্বাভাবিক তা নিয়ে রাতে শাশ্বতীর সাথে এক তরফা গল্প করে গেলো যোগেশ। শাশ্বতী কথা বলবে কি? ওর জগত যাদের নিয়ে তাদের ব্যাপারে তো বিন্দু মাত্র আগ্রহ নেই ওর স্বামীর। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকা বা কলকাতা গিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যোগেশ। যতদিন মা আর দিদি আছে ততদিন না হয় কুলপদ্দীর বাড়িটা রইলো, তারপর সব বেচেবুচে ঢাকা বা কলকাতায় স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা যোগেশের। শাশ্বতী চুপচাপ শুনে যায়, কুলপদ্দির এই বাড়ি গাছপালা পশুপাখি থাকবে না, ভাবতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ব্যথা করে ওঠে ওর। 

‘ন্যাস্টি! তুমি ওই বানরগুলোর এতো কাছে যাচ্ছো কেন? ওদের শরীরে নানা রকম জার্ম থাকতে পারে! ওরা তোমাকে কামড়ে দিতে পারে, ওহ্ রাবিশ!’ 

শাশ্বতী প্রতিদিনের মতোই সকাল বেলা কলা খাওয়াচ্ছিলো বাঁদরদের, ব্যাপারটা একদম পছন্দ হলো না যোগেশের। শাশ্বতী যোগেশকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলো, 

‘না, না, ওরা কিচ্ছু করবে না, বড্ড লক্ষ্মী ওরা, দেখো কি সুন্দর লাইন ধরে এসে খাবার নিয়ে যাচ্ছে, এই তুমিও এসো না গো, এসো, তোমাকে গুলটুশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।’ 

‘নাহ্, এই কুলপদ্দীতে থেকে থেকে তুমি একবারে গেঁয়ো ভূত হয়ে গেছো।’ 

যোগেশ স্ত্রীর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নাক সিঁটকে মন্তব্য করে। 

‘বাড়ি তো নয়, যেন জঙ্গল বানিয়ে রেখেছে, উফ্, কোনো সিভিলাইজড্ মানুষ এখানে থাকতে পারে!’ 

যোগেশ নাক কুঁচকে তার বিরক্তি প্রকাশ করে আবার ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। শাশ্বতী বুঝতে পারে যোগেশের হাব ভাব বানরকুলের মোটেও পছন্দ হয়’নি। সে চোখ পাকিয়ে ওদের ধমকে দেয়, 

‘এই খবরদার, উনি কিন্তু আমার স্বামী, পতি দেবতা, হু, তাকে মান্যিগণ্যি করতে হবে।’ 

গুলটুশের ভাব ভঙ্গী তো রীতিমতো হিংস্র, যেন সে যোগেশকে সহ্যই করতে পারছে না। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে গুলটুশকে কোনভাবে শান্ত করে শাশ্বতী। 

‘এই, স্নান না করে ঘুরে ঢুকো না কিন্তু,’ দোতলার জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে শাশ্বতীকে বলে যোগেশ, ‘ওই নোংরা জীব জন্তু গুলোর সঙ্গে তুমি কিভাবে যে মিশো আমি ভেবেই পাই না।’ 

দিঘীতে স্নান সেরে উদোম গায়ে শুধু শুকনো কাপড়টা এক প্যাঁচ করে পড়ে শোবার ঘরে ঢুকলো শাশ্বতী, পালংকে কাত হয়ে শুয়ে একটা ইংরেজি নভেল পড়ছিলো যোগেশ। 

সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী দুজনেই সেদিন পূজো দিতে গিয়েছিল মন্দিরে। ফলে দোতলার পুরোটাই ছিল খালি। দিনের আলোয় স্বল্পবসনা শাশ্বতীকে দেখে যোগেশের চোখে কেমন বিভ্রম জাগে, মনে হঠাৎ করে কিছু একটা ওলট পালট ঘটে যায়, সে চুপি চুপি উঠে এসে পেছন থেকে দুই হাতে স্ত্রীর সরু কোমর জড়িয়ে ধরে, 

‘আঃ, এই, কি করছো, ছাড়ো, ছাড়ো।’ 

কিন্তু শাশ্বতী যতই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করুক যোগেশের সবল হাতের বাঁধন খুললো না। সে প্রায় পাঁজাকোলা করে শাশ্বতীকে তুলে নিয়ে এলো বিছানায়। 

‘এই এসব কি হচ্ছে, দরজা জানালা খোলা তো।’ 

কিন্তু শাশ্বতীর কোন কথাই যেন কানে ঢুকলো না যোগেশের। যেন সে মাতাল কিংবা যেন সে চেতনে নাই, যেন প্রবল এক ঘোরের মধ্যে সে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর সেই ঘোরের ঘুর্ণীতে সে টেনে নিতে চাইছে শাশ্বতীকেও, অতঃপর সেই অপ্রতিরোধ্য টানে সেই প্রবল ঘুর্ণিপাকে শাশ্বতী এবং যোগেশ দুজনেই জ্ঞান হারিয়ে যেন অন্য কোন নিভৃত মাদকতাময় জগতে চলে যেতে থাকে ….। 

তাদের ঘরের জানালা তখন খোলা থাকে, আর একটু দূরের কামরাঙা গাছের ডালে বসে সেই দৃশ্য গভীর বিস্ময় ও ঈর্ষার সঙ্গে অবলোকন করে একটি প্রাণী। তার কণ্ঠে ভাষা নাই, তার শরীর রোমশ, তার চেপ্টা কান দুটি চেপে বসেছে মাথার সঙ্গে, তার উঁচু কপালের নিচে ছোট ছোট দুটি বাদামী চোখ, সেই চোখের ভাষা অন্যরা না বুঝলেও শাশ্বতী বুঝতে পারে। কিন্তু শাশ্বতী তো এখন শাড়ি-টারি গুছিয়ে দেয়ালে বসানো আয়নায় মুখ দেখে কপালে সিঁদূর পরতে ব্যস্ত। গুলটুশ গোঙানীর মতো একটা শব্দ করে কামরাঙা গাছের ডাল থেকে লাফ দিয়ে পাশের আম গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ে। এতে ধপ্ করে একটা ভারি শব্দ হলে শাশ্বতি চমকে তাকায়, তার কপালের সিঁদুর কিছুটা থেবড়ে যায়, বিছানায় আধ শোয়া হয়ে নভেল পড়তে পড়তে যোগেশ’ও চমকায়। তারপর হেসে বলে ‘নিশ্চয়ই তোমার বানর সেনাদের কেউ।’ 

‘গুলটুশ নয়তো?’ শাশ্বতী মনে মনে ভাবে। কিন্তু গাছের ডালের সবুজ পাতার দুলুনি ছাড়া জানালা দিয়ে আর কিছুই চোখে পড়ে না ওদের। 

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, যোগেশ এখন একাই কলকাতা যাবে, ওখানে যদি ঠিক মতো পসার জমে ওঠে তাহলে পরে এসে শাশ্বতীকেও নিয়ে যাবে। যাক্ আরো কিছুদিন কুলপদ্দীতে কাটানো যাবে ভেবে মনে মনে স্বস্তি পায় শাশ্বতী, কিন্তু হঠাৎ করে গুলটুশের কি হলো? দূরে দূরে হাঁটছে, খাবার দিলে খাচ্ছে না, কাছে ডাকলেও আসছে না। বাবুর রাগ কতো! শাশ্বতী মনে মনে হাসে। 

আজকাল সকাল সকাল পশু পাখিদের খাইয়ে একেবারে স্নান সেরে ঘরে ঢোকে শাশ্বতী। বিকেলে বাগানে ঘুরে বেড়ালেও ছোয়াছুয়িটা এড়িয়ে চলে, যোগেশ যখন পছন্দ করে না, তখন কি আর করা? এজন্যই কি গুলটুশ অভিমান করেছে? কে জানে? এমন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়েই ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো শাড়িটা গায়ে জড়াচ্ছিলো শাশ্বতী, হঠাৎ পেছন থেকে দুটো শক্ত লোমশ হাত ওকে জড়িয়ে ধরলো, অকস্মাৎ এই ঘটনায় ভয় পেয়ে গলা দিয়ে অস্ফুট একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো শাশ্বতীর। 

যোগেশ তখন মায়ের ঘরে বসে ওর কলকাতা যাওয়ার দিন তারিখ পাকা করে নিচ্ছিলো, শাশ্বতীর চিৎকারটা ওর কানে পৌঁছুতে ‘শ্বাতীর আবার কি হলো?’ বলে যখন সে তার শোবার ঘরের দিকে ছুটে এলো ততক্ষণে শাশ্বতীকে মাটিতে ফেলে ওকে আদরে আদরে অস্থির করে তুলেছে গুলটুশ। দৃশ্যটা যোগেশের কাছে এমনই বীভৎস মনে হলো যে কিছুক্ষণের জন্য যেন সে সম্বিৎ হারিয়ে ফেললো। তারপরই ‘বাস্টার্ড’ বলে এক হুংকার দিয়ে পাশের ঘর থেকে দৌড়ে তার গাদা বন্দুকটা নিয়ে এসে গুড়–ম গুড়–ম শব্দে ঘর কাঁপিয়ে বানরটার মাথা লক্ষ্য করে দুইবার গুলি করলো সে। শাশ্বতী তখন থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়েছে। সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী মিলে অজ্ঞান শাশ্বতীর পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বন্দুকের গুলির শব্দে নীচতলা থেকে সিঁড়ির গোড়ায় ছুটে আসা উৎকন্ঠিত চাকর বাকরদের ডেকে যোগেশ স্থির নিষ্কম্প কণ্ঠে বলে, ‘উপরে এসে রক্তটা ধুয়ে দে, আর মরাটাকে নিয়ে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আয়।’ 

গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো, কিন্তু অচেনা লোকটা থামলো না। সে বললো, 

‘এর পরদিন কুলপদ্দীর লোকজন দেখলো এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, তারা দেখলো শত শত বানর এসে ভীড় করেছে জজ সাহেবের বাংলোর সামনে, এদের মধ্যে দুজন কাঁধে করে বয়ে এনেছে গুলটুশের শব দেহ, আর অন্যরা হাত জোড় করে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরো বাংলোটাকে ঘিরে, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, যেন বানরো বিচারকের কাছে করজোড়ে তাদের সঙ্গী হত্যার বিচার চাইছে। পুরো একদিন এক রাত তারা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো।’ 

তারপর? 

তার পরদিন থেকে জানেন, কুলপদ্দীর কোথাও আর একটা বানরও দেখা গেল না। যেন রাতারাতি তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে কুলপদ্দী থেকে।

২টি মন্তব্য: