বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

রুমা মোদক'এর গল্প : ভোরের আভার আভাস

--ঘুমিয়েছিস রাত্রি? 

বালিশের পাশে ফোনটা ট্রিং করে উঠতেই আমার সিক্সথ সেন্স বলছিলো এ শুভ্রর মেসেজ। ভেতরে তখন প্রচণ্ড অনাগ্রহের তিক্ততা । মেসেজ দেখতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু নাবিলের সাথে ওকে নিয়ে সন্ধ্যায় ঝগড়া করার পর থেকে এতোক্ষণ ধরে সঞ্চিত শুভ্রকে উপেক্ষা করার অচল ইচ্ছা, তীব্র বিরক্তি সব হেরে যায় ছোট্ট একটা ইচ্ছের ঢেউয়ের কাছে। ফুলে উঠা যে ঢেঊ তীরে আসতে আসতে মিইয়ে যায়। অথচ ঠিক বালিয়াড়ি না ছুঁয়ে ফিরে যেতে পারে না, তেমন। হ্যা ঠিক। শুভ্ররই মেসেজ। বিশেষ কিছু বলার জন্য কি নক করছে ও? অনাগ্রহ আর বিরক্তি নিয়েও উত্তর লিখি আমি।

-রাত তিনটায় জেগে থাকে কোন গাধা ? 

উত্তর না দেয়ার দৃঢ় অবস্থান টলে গেলেও ওর প্রশ্নের ধরনে অনাগ্রহ আর বিরক্তি ছাপিয়ে উঠে রাগ। রাত তিনটায় ঘুমিয়েছি কিনা জানার জন্য মেসেজ? প্রচণ্ড রাগেই উত্তরটা লিখি আমি। ভাবি মোবাইলটা বন্ধ করে ঘুমাই। ও আবার উত্তর দেবে, আবার আমি। এটা প্রানপণে এড়াতে চাইছি এই মূহুর্তে। 

ঘটনাটা ঘটার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন ঝগড়া হচ্ছে নাবিলের সাথে। আমার থিয়েটার করা নিয়ে, আমার রিহার্সাল শেষে শুভ্রকে নিয়ে রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়ে। যে উদারতা নাবিলের প্রতি আমার মোহ আর মগ্নতার অন্যতম কারণ ছিলো, ওর সাথে পারস্পরিক নির্ভরতায় ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নরা ডালপালা মেলেছিলো, এক রাতের একটা ঘটনায় সেই পলকা উদারতার মুখোশটা চট করে খুলে পড়েছে। মেজাজ খিঁচিয়ে আছে সন্ধ্যা থেকেই। এই গভীর রাতে কারো সাথেই একদম একটুও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। এমনকি শুভ্রর সাথেও না। তখনই আবার ট্রিং.......। 

-গাধারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মেসেজ লেখে। আর গাধীরা? 

-খুব আড্ডার মেজাজে আছিস? 

লেখার কোন শরীরী ভাষা নেই। রাগ, বিরক্তি, অনুরাগ বিরাগ সবসময় ঠিকঠাক প্রকাশ করতে পারে না। ভুল বোঝার সুযোগ তৈরি করে। অন্যপক্ষ ঠিক সুযোগও নিয়ে নেয়। অবশ্য শুভ্রর সাথে আমার ভুল বুঝাবুঝি হলেই কী! আর না হলেই কী? যা ভেবেছিলাম তাই। শুভ্র আমার বিরক্তি টের পায়না। রিপ্লাই পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে পাল্টা মেসেজ দেয় 

-ফোন দেবো? 

আমার পিত্তি জ্বলে যায়। শুভ্র মোটেই কৈফিয়ত চাইবে না জেনেই মোবাইলটা বন্ধ করে দিতে চাই। ওর সাথে আমার কৈফিয়ত চাওয়ার সম্পর্ক নয়। আচ্ছা কৈফিয়ত চাওয়ার মতো সম্পর্ক হলে কি দিতাম? 

নিজেই নিজের কাছে কৈফিয়ত দেই। হ্যা দিতাম৷ আলবাত দিতাম। আমি বুঝাতাম, আমি উপেক্ষা করতে জানি। শুধু শুভ্র কেনো, কে কী ভাবলো না ভাবলো তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। 

সত্যি যায় আসে না। এই নিরেট বাস্তবতাটাকে দুঃসাহসে স্বীকার করতে পারছি না বলেই একটা অনভিপ্রেত ঘটনা গত একমাস ধরে দুর্ভেদ্য এক পাহাড় হয়ে আমার জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে এর চেয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়াই ভালো ছিলো। তখন নিজাম তার গং নিয়ে আমাকে রেপ করে মেরে ফেললেই অনেক অনুসন্ধিৎসার, অনেক বিব্রতকর মূহুর্তের সমাপ্তি ঘটতো শুধু আমার এই ব্যক্তিগত নাই হয়ে যাওয়ার মতো একটি ঘটনার বিনিময়ে। 

এমনিতেও কী প্রতিদিন নাই হয়ে যাচ্ছি না? পায়ে পায়ে টের পাই সহস্র প্রশ্ন, তারও অধিক কৌতুহল, তারও অধিক উৎসুক দৃষ্টি আমাকে পিষে পিষে যায় প্রতি মুহূর্তে। আমার সম্মানজনক উপস্থিতি নাই করে দেয়। 

যদিও ঘরে ফিরে নিজেই নিজের পিঠটা চাপড়ে দেই। মেয়ে তুই বলে! শুধু তুই বলে। অন্য মেয়ে হলে এতোক্ষণে! এতোক্ষণে কী করতো? অপমানের হল হজম করতে না পেরে গলায় দড়ি দিতো? অপবাদের হুলে রক্তাক্ত হয়ে সব ছেড়েছুড়ে গা ঢাকা দিতো? শুধু আমি বলে চারপাশের তীব্র বৈরিতার মুখোমুখি ঘরে ফিরে বিষহীন সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছি? এর বেশি আর কী করতে পারছি? 

কী জানি! বোকামী করছি কিনা জানিনা। তবে তীব্র একটা তেজে লড়ছি। কিসের তেজ আমি জানিনা। তেজ দেখিয়ে লাভ কি আমি জানি না। এর শেষ কি আমি জানিনা। আমাকে আরো মাশুল দিতে হবে কিনা আমি জানি না। শুধু এটুকু জানি একটা তীব্র তেজ,তীব্র জেদ! 

আর জানি, কিছু অমূল্য শিক্ষা যুক্ত হচ্ছে আমার অভিজ্ঞতায়। মেয়েরা যা জানে না। তবে জানতে হয়। জানতে হয় উপেক্ষা করা। অবহেলা নয়। বিচ্ছেদও নয়। উপেক্ষা করতে জানা এই সমাজে মেয়েদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। লড়াই চালিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন। 

সব আগ্রহ, কৌতুহল, অপবাদ, প্রতিবন্ধকতা একমাত্র চারপাশে গড়ে তোলা উপেক্ষার দেয়ালে প্রচণ্ড আহত হয়ে ফিরে যেতে পারে। অথচ আমাদের মেয়েরা তাই পারে না। আমিও পারছি না। 

নইলে এই মূহুর্তে আমার উপেক্ষা করার শক্তিটাই ছিলো সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমাকে পারতেই হবে। ঘরে ঘুমপাড়ানি মৃদু আলো, অনেকটা পূর্ণ চাঁদের আলোর মতো। যেনোবা কাল পরশু শুক্লা দ্বাদশীর জোছনা ভাসিয়ে নেবে আমার বিছানা বালিশ। 

সোনা বন্ধুরে আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি......দূরে কোথাও তীব্র গানের অস্পষ্ট সুর শেষ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে শাসনের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে পড়া স্বাধীন মেয়ের মতো। সেই জোছনা আর সুরে ভাসতে ভাসতে আমি সিদ্ধান্ত নেই আমাকে পারতে হবে, উপেক্ষা করতে পারতে হবে। 

আমি পারি কিংবা না পারি, আপাতত উপেক্ষা যোগ্য বিষয়গুলো প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করতে শুরু করি। 

১.নাবিলকে উপেক্ষা করা। 
২.চারপাশের হাজারো প্রশ্ন উপেক্ষা করা , 
৩.কৌতুহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করা , 
৪.থানা-পুলিশের বিদ্রুপাত্মক হাসি উপেক্ষা করা , 
৫.নেতাদের ঔদ্ধত্য উপেক্ষা করা , 
৬.আসামীপক্ষের হুমকি উপেক্ষা করা , 

আর শুভ্রর......।শুভ্রর গায়ে পড়া কথা বলা কি উপেক্ষা করা উচিত আমার? একমাত্র ওর ব্যাপারে দৃঢ় হতে না পারার কারণটাতেই যুক্তি আছে। আপাতত ওকে সাথেই রাখি আমি। 

উপেক্ষার সব ক্ষেত্রে আমি আবিষ্কার করি আমার স্পষ্ট চারিত্রিক দুর্বলতাগুলো। যেমন, প্রতিদিন রিহার্সাল থেকে ফেরার সময় শুভ্রই কেনো সাথে থাকে আমার, শুভ্রকেই থাকতে হয়? গ্রুপে ছেলের অভাব? আমাকে বললে আমিতো গিয়ে নিয়ে আসতে পারি - নাবিলের প্রেমের ভাণে আবৃত সন্দেহ সন্দেহাতীত বুঝেও মুখের উপর ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়ে আমি চলে আসতে পারি না। ওর ভণ্ডামিকে তীব্র উপেক্ষা করে বুঝিয়ে দিতে পারি না, ওর প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ আর নেই আমার। ওর সাথে না থাকলে একটা হার্টবিটও দ্রুত পড়বে না ছন্দ ভুল করে।এই একটি ঘটনা আমাকে বদলে দিয়েছে মেকওভারের মতো। পুরো ভেতরের হিসাব নিকাশ উল্টে গেছে। বিত্তবানের অলস গৃহিণীর সযত্ন বাগান থেকে আমি বৃন্তচ্যুত ঝরে পরেছি রাস্তায়। আর পথচারীদের পদতলে টের পাচ্ছি আসলে ঝরে পড়ার পর ফুল বুঝতে পারে, যতোক্ষন মালিনীর যত্নে সে, ততোক্ষণই মূল্য তার। 

রিহার্সাল কিংবা কলেজে কিংবা বাসায় যারা শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে অনাকাঙ্ক্ষিত সব প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়, আমার উচিত তাদের কাঙ্ক্ষিত উত্তর দিয়ে বিব্রত করা। হ্যা তারা যা শুনতে চায়, ঠিক তাই যদি মুখের উপর বলে দিতে পারি নিজে বিব্রতহীন সাহসী হয়ে, আমি জানি তবেই একমাত্র প্রশ্নকারীরা বিব্রত হয়ে মুখ লুকিয়ে চলে যাবে। কিন্তু আমি পারি না। আমি বলতে পারি না, হ্যা লোকটা আমার জামার ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। দেয়ালে ঠেসে ধরে ঠোঁট কামড়ে ধরেছিলো। এই যে দেখেন, আমার ঠোঁটের কাটা দাগ এখনো শুকায়নি। লোকটার মুখ থেকে ভসভস করে বের হচ্ছিলো গাঁজার গন্ধ। হ্যা গাঁজার গন্ধ আমি চিনিতো। একবার পহেলা বৈশাখে টি এস সি তে খেয়েছিলাম। খেয়ে বাসায় ফিরতে পারিনি। শামসুন্নাহার হলে বান্ধবীর রুমে থেকে গিয়েছিলাম। হ্যা শুভ্রর সাথে আমার অন্যরকম সম্পর্ক আছে। এজন্যইতো ও আমাকে এগিয়ে দিতে গিয়ে সেদিন নিজামের গ্যাংয়ের হাতে মার খেয়েছিলো। 

যুৎসই হতো উত্তরগুলো। কিন্তু কিচ্ছু বলা হয় না। বলতে পারিনা। তাদের মোটেই বিব্রত করতে পারি না। বরং নিজেই বিব্রত হয়ে প্রসঙ্গান্তর করি। ঠিক পালিয়ে না গেলেও তাদের অপমান করার মতো দুঃসাহসী আমি হতে পারিনা। আমতা আমতা করে প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘুরানোর চাতুর্য দেখাতে চাই। 

চারপাশ থেকে আমার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া হাজারো দৃষ্টি উপেক্ষা করে আমার উচিত প্রতিটি সন্ধ্যায় বেপরোয়া তরুণীর মতো বাসায় ফেরা। যারা আমাকে দৃষ্টিতে গিলে খায়, আঙুল তুলে অন্যকে দেখায়, আমার উচিত ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে তাদের চোখে চোখে তাকিয়ে থাকা। যেনো তাদের দৃষ্টি অপরাধী হয়ে নত হয়ে যায় কেবল আমার কাছে নয়, পৃথিবীর তাবৎ নারীদের কাছে। তাদের নিজের ভেতরের রেপিস্ট ইচ্ছাটার কাছে। তাদের প্রশ্নের আড়ালে গোপন করা বিকৃত আনন্দ বুঝেও নিজের চারিত্রিক দুর্বলতার কারণে আমি না বুঝার ভাণ করে কোনদিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে গলির রাস্তাটুকু অতিক্রম করে বাসায় ঢুকে পড়ি। 

যে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট প্রমাণ হিসাবে পুলিশের যোগাড় করার কথা হাসপাতাল থেকে, আমি নিজে তা যোগাড় করে দেই। শুরু থেকেই ওসি থেকে সেপাই পর্যন্ত সবার মুখে ছিলো চাপা হাসি। সেই হাসিতে কিছুটা বিদ্রুপ কিছুটা তাচ্ছিল্য। এমন কতো দেখেছি, কিংবা এসব নিয়ে কোন মেয়ে থানা পুলিশ করে, এ জাতীয় অবহেলা তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে। ওরা বাঁকা চোখে বারবার শুভ্রর দিকে তাকায়। ওদের দৃষ্টিতে শুভ্রকে অপদস্ত করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। তলে তলে নষ্টামি করার এই ফল কিংবা মাইয়া নিয়া রাইত/বিরাতে মজা করো, এরকম তো হবেই! পুলিশের উপরের চেয়ার থেকে নিচের কনস্টেবল একথাটাই বলতে চায়, গলির মোড়ে দাঁড়ানো রিক্সাওয়ালাদের মতো, নিজামের সঙ্গী রংবাজদের মতো। 

ওরা যখন আমার অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে, আমাকে সাক্ষরের কাগজটা এগিয়ে দেয়ার সময় ফিরেও তাকায় না তারা আমার দিকে। তাদের জরুরি রাজকার্যে আমি যে এক উটকো ঝামেলা, নানাভাবে তারা আমাকে বুঝিয়ে দিতে ছাড়ে না। ভ্রু কুঁচকে সাক্ষরের জন্য কলম ছুঁড়ে দিয়ে, সাক্ষরের পর কাগজটা ছোঁ মেরে নিয়ে....। যতোটা করলে আমি ঠিক অসাদাচরণের অভিযোগ না করতে পারি, ততোটাই দুর্ব্যবহার করে তারা আমার সাথে। ভাগ্যিস শুভ্র আর গ্রুপের অদম্য কয়েকটা ছেলে পাশে ছিলো আমার শক্তি হয়ে,সাহস হয়ে। 

আমি কেইস ফাইল করেছি। ছেলেগুলো সারারাত থানা চত্বর না ছাড়ায় চাপটা পুলিশের রেপুটেশনে প্রভাব পড়বে ভেবে পুলিশ আসামীও গ্রেফতার করেছে রাতেই। তারপর যতোবার ইনভেস্টিগেশন করেছে ততোবার ঠিক তিনটা প্রশ্ন করতে ভোলেনি। 

১. আপনি এতো রাতে বাইরে গিয়েছিলেন কেনো? 
প্রতিবার আমি তার সত্য আর যথার্থ উত্তরটাই দেই। আমি মঞ্চে নাটক করি। রিহার্সালে ছিলাম। কিন্তু প্রথম দুয়েকবার প্রশ্নের পিঠে উত্তর দেয়ার পরই আমার মনে হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে আমার বলা উচিত, আমি আসলে খেপের মেয়ে মানুষ। রাতে খেপ মারতে যাই। সেদিনও তাই গিয়েছিলাম।এরকম উত্তর দিলেই এদের প্রশ্ন করার অশালীন ইঙ্গিতে ঠাস করে চড় মারা হয়। 

কিন্তু পারিনা। পারিবারিক শিক্ষার নিয়ন্ত্রিত রুচি আমার আচরণ বেপরোয়া হতে দেয় না, যা আমার চরিত্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে রাখে আর আমার চারিত্রিক দুর্বলতা আমাকে উত্তরগুলো দিতে বাধা দেয়। 

২. নিজাম ঠিক আপনার কোথায় হাত দিয়েছিলো? 
এর উত্তরেও আমি যথাসম্ভব স্বর নরম করে বলি, মেয়েদের যেসব জায়গায় অনাকাঙ্ক্ষিত হাত দিলে গা ঘিনঘিন করে। এদের অন্যকিছু শোনার অশ্লীল ইচ্ছে আন্দাজ আমাকে লজ্জিত করে, আহত করে,বিব্রত করে। তাদের ইচ্ছের মতো নোংরা করে কথা বলে উল্টো বিব্রত করে দিতে পারলেই তীব্র উপেক্ষা দেখানো হয়। কিন্তু আমি পারি না। 

৩. এই শুভ্র নামের ছেলেটার সাথে প্রতিদিন রাত করে ফিরেন শুনেছ, ওর সাথে আপনার সম্পর্ক কী? 
আমি দাঁতে দাঁত চেপে সত্যিটা পুনরাবৃত্তি করি। শুভ্র আমার ভাইয়ের মতো। ওর বাসা আমার বাসা পাশাপাশি গলিতে বলে রিক্সাভাড়া সেইফ করার জন্য আমরা প্রতিদিন একসাথে আসি। ওরা মুখ টিপে হাসে ও ভাইয়ের মতো, ভাই নয়- ওদের বিদ্রুপে তীব্র উপেক্ষা ছুঁড়ে দিয়ে আমার বলা উচিত, জানেন প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে রিক্সার হুট তোলে চুমু খেতে খেতে আমি আর শুভ্র বাসায় ফিরি। ঠিক এ উত্তরটাই হতো ওদের নোংরা ইঙ্গিতে উপেক্ষার চপেটাঘাত। কিন্তু ব্যক্তি চরিত্রের নমনীয়তা অতিক্রম করে এ উত্তর দেয়ার মতো ডিয়ারিং আমি হতে পারি না। 

বাসায় ওয়ার্ড কমিশনার আসে মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়ে। এসেই বলে, অ চাচামিয়া পাড়ায় থাকতে হইবো না? শাস্তি তো তার যথেষ্ট হইছে। এ্যাইবার কন আফনেরা কী বিচার পাইলে খুশি? আমার বাবা প্রথমেই গদগদ হয়ে যান। ভোটের সময় ছাড়া এই ক্ষমতা ঘেঁষা নেতাদের বাসায় আসা দূরে থাক, ছায়া দেখাও সাত জন্মের ভাগ্য। সেই কমিশনার অসীম দয়ায় নিজ থেকে আমাদের বাসায় আসে, বসতে বলার আগেই বসে পড়ে । খালাম্মা চা খাওয়ান-বলে নিজের সীমাহীন উদারতা দেখায়। তার মধ্যস্ততায় বিষয়টা মিটমাট করার জন্য একটা বিরাট ধাপ এগিয়ে যায়। 

মোক্ষম অস্ত্রটি সে প্রথম ঢুকেই ছুঁড়েছিলো , পাড়ায় থাকতে হবে তো! আমার প্রতিদিন রিহার্সাল যাওয়া নিয়ে, রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়ে ফ্ল্যাটের চাচা ফুফুদের আপত্তির অন্ত ছিলো না। নাবিল সমর্থন দিয়ে পাশে ছিলো তাই কেউ তেমন সুবিধা করতে পারেনি। বাবা দমবন্ধ খিঁচিয়ে সহ্য করে ছিলেন। এবার সবাই পেয়ে বসলো। আসলেই তো পাড়ায় থাকতে হবে না! আমার জন্য তারা পাড়া ছাড়া হবে নাকি! 

আমার মতামতের তোয়াক্কা না করে মধ্যস্ততায় রাজি হয়ে যায় সবাই। আমি ভেতর থেকে বের হয়ে বলি, আমি মানিনা। কোন বিচার চাইনা। থানায় মামলা হয়েছে, যা বিচার হবার সেখানেই হবে। আমার এই ব্যবহার নেতাদের কাছে ঔদ্ধত্য ঠেকলেও আমি বুঝি ওদের আক্রমণ আমি উপেক্ষা করতে পারিনি। পারলে আমার বলা উচিত ছিলো আমার শরীর কোন পতিত জমি নয়। যে কেউ ইচ্ছার পথে হেঁটে যাবে। নিজের শরীরের উপর যে ঘিনঘিনে ঘেন্না আর মনের উপর অসহনীয় চাপ, তোমরা কি তা ফিরিয়ে দিতে পারবে? ফিরিয়ে যদি দাও, সেটাই হতো আমার বিচার পাওয়া। 

আর সেই নষ্ট কীটটার সঙ্গীগুলো, রাস্তায় দেখলেই যারা বলে, নিজাইম্যা আর বাইর অইতো না? টের পাবি। আমি শোনেও না শোনার ভাণ করে অন্যদিকে তাকিয়ে চলে আসি। এটা মোটেই উপেক্ষা নয়। এটা হলো দুর্বলতা। চারিত্রিক দুর্বলতা। সবল হলে ঠিক দাঁড়িয়ে এদের মুখোমুখি হতাম,প্রয়োজনে গালে থাপ্পড় দিয়ে জিজ্ঞেস করতাম কি করবে তোদের নিজাইম্যা বের হয়ে? কী করবে আমাকে? চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতাম। 

রিহার্সালের জন্য রাত করে বাড়ি ফেরা আমার অপরাধ নয়। যদি আমি পরিবারের ইনকাম সোর্স হতাম, টিউশন সেরে রাত করে ফিরতে হতো তবে কি সেটা অপরাধ হতো? রাত করে বাড়ি ফেরার অপরাধে আমার গায়ে হাত দেয়া বৈধ হয়ে যায়? 

ফোনটা বেজে ওঠে। বন্ধ করা হয়নি। ঘরটা ভাসছে অপার্থিব শুক্লা দ্বাদশীর চন্দ্রালোকে। আমার ঘরে জিরো পাওয়ারের বালবটা দ্বাদশীর পূর্ণ চাঁদের মতো। ভেসে আসা গানের সুরটা কি থেমে গেছে? ফজরের আজানের মোহময় সুর অলৌকিক রঙে মিশে যাচ্ছে ভোরের প্রথম আভার সাথে। আমি শুভ্রর ফোনটা ধরি।কোন ভূমিকা ছাড়াই কথা বলে শুভ্র 

-কী করবি রাত্রি? 

-কী করবো মানে? 

-মিটিয়ে ফেলবি? 

-তুই বলছিস একথা? তোর মাথার সেলাই তো এখনো কাটেনি। 

-সিরিয়াসলি ভাব, কতোদিন এভাবে লড়তে পারবি! 

-যতোদিন পারি লড়বো। 

মনে মনে ভেবে পাই না এতো জোর আমার মতো দুর্বল মানুষটা পেলাম কোথা থেকে? বাঁধা পেলেই কী আমার ভেতর থেকে অন্য আরেকটা আমি জেগে ওঠে,যাকে নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা লাগে। 

-রাত্রি, আমি জানি ঘটনাটা নিয়ে নাবিলের সাথে তোর প্রতিদিন ঝামেলা হচ্ছে। 

-তোর হচ্ছেনা রীতুর সাথে? 

-হ্যা হচ্ছে তো। তাইতো বলছি মিটিয়ে ফেল। 

-ভোরটা খুব সুন্দর শুভ্র। বাইরে তাকিয়ে দেখ।এই ভোরগুলি হেরে যাবার জন্য নয়। তোর অসুবিধা হলে তুই সরে যা। আমি লড়বো। 

শুভ্র কী বুঝে কে জানে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফোনটা কেটে দেয়। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন