বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

শেখ লুৎফর-এর গল্প: সুরেন বাইন

অনেক অনেক দিন আগের কথা…

এইভাবে যদি গল্পটা শুরু করতে পারতাম! কারণ এটা পঞ্চাশ বছর আগের একটা ঘটনা। নাকডরা নামের হাওরের গােপাটে সেদিন বিকালে শশাঙ্ক তিনজন বসে ছিল। পুব দিকে নজাই মণ্ডলের ছােটো ছেলে একটা ষাঁড়কে ঘাস খাওয়াচ্ছে। আকার-প্রকারে প্রাণিটা ছােটোখাটো একটা হাতি।
সাদা-কালাে চক্কর চক্কর জীবটাকে দেখে শশাঙ্ক বলে অই দ্যাখ...। বাকি দুইজন সেদিকে তাকায় । তাদের ছ’জোড়া চোখ আটকে যায় ষাঁড়টার থকথকে চর্বিঠাসা শরীরে। অসিত হাে হাে করে হেসে ওঠে। আমাশার রােগীর মতাে পাঙশা চেহারার শশাঙ্ক চোখ নাচিয়ে ঘটনা জানতে চায়। কারণ মনটাই গ্রামের খবরে কান দিতে প্রায় ভুলেই গেছে। দিনের বেশির ভাগ সময় সে থাকে গুরুর কাছে। আর শশাঙ্ক গিয়েছিল উজানে। দিদির বাড়ি। ফিরেছে গতকাল।

অসিত তার কালাে গতরটা দুলিয়ে হাসতে হাসতেই বলে– গত বিষুদবারে যে ষাঁড়টারে টাইগারে হারাইছে, হের নাম কি পড়ছে জানছস? অবাক শশাঙ্ক বােবা মানুষের মতাে নীরবে মাথা নাড়ে। অসিত হাসতেই থাকে। হাসির গমকে তার ময়লা দাঁতগুলােসহ আলজিভের গােড়াতক বিকালের লাল আলােতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শশাঙ্ক ও মনটাই অসিতের কুশ্রী দাঁতগুলাের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে। অসিত হাসির মাঝেই বলে– কোনাবাড়ির মাইন্‌শে হেরে ‘ল্যাচ্ছর' নাম দিছে। 

অসিতের মুখে ল্যাচ্ছর শব্দটার উচ্চারণ ও ভঙ্গি দেখে বাকিরাও এবার সেই বেদম হাসিতে শরিক হয়। 
গেল সপ্তাহে দেখা লড়াইয়ের দৃশ্যটা হাসির মাঝেই তাদের সবার চোখে ফের সমান তেজে ভেসে ওঠে। লড়াইটা শুরু হয়েছিল ঠিক দুপরে। বিশালদেহী দুটো ষাঁড় সামনাসামনি লড়ছে। হাজারে-বিজারে মানষ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। ষাঁড় দুটোর গতিক দেখে সবাই ভেবেছিল, ধুন্ধুমার সেই যুদ্ধের শেষ আর বেশি দূরে নয়। ততক্ষণে দুর্ধর্ষ জীব দুটোর পেছন দিক দর্গন্ধ ভরা পাতলা হাগুতে সয়লাব হয়ে গেছে। আছরের অক্ত ধরে ধরে এমন সময় চূড়ান্ত ফয়সালার আগেই একটা ষাঁড় ভেক করে পিছু হটে ছুটতে শুরু করে। আবংটা ছোটো ছোটো মাঠ, শুকনা হাওর আর দুটো গ্রাম পেরিয়ে সোজা গিয়ে নিজ মালিকের বাড়িতে ওঠে। তাতেই উত্তেজিত জনতার মুখে মুখে তার নাম রটে যায় স্যার ল্যাচ্ছর।

অসিত চোখের কোনাকানায় জমে ওঠা পানি মুছতে-মুছতে বলে– জীবনে এর-চে মজা খুব কম পাইছি। 
চারপাশে কম করে হলেও কুড়ি মাইলের মাঝে কোনও শহর নাই। নাই কোনও রেল কিংবা পাকা সড়ক। শুকনার দিনে হাওরবাসী মানুষগুলাের দুখানা পা-ই বরাদ্দ। কম করে হলেও ওরা সাত মাস জলে বন্দি থাকে। ছুরির ফলার মতো ধেয়ে আসা ভেজা বাতাস আর আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জন ছাড়া জীবনটা কুল্লে খেতা-বালিশ। পােষ-মাঘ আর বােশেখ মিলে বছরের তিনটা মাস বলতে গেলে কাম- গিরস্তিতে ওরা খেতেই কাটিয়ে দেয়। তা–বাদেও বাকি থাকে আরও দুই মাস। সেই কয়টা দিন তারা বিলের খানাখন্দ সেচে মাছ ধরে; শুঁটকি দেয়, শুঁটকির কড়া ঘ্রাণের সঙ্গে ফালতু গপ্প আর তাস পেটানাে ছাড়া সে-জীবনে কোনও রং নাই।

সত্যিকারের রং আসে ফাগুন-চৈতে; ষাঁড়ের লড়াইয়ে। তখন তরুণদের তিড়িং-বিড়িং দৌড়ঝাঁপ দেখে বুড়ােদের মরচে পড়া রত্তেও যেন টান পড়ে। বাকি থাকল ঘরের ঝি-বেটি। চ্যাংড়াদের মুখে-মুখে উড়তে থাকা আলাপের ভাঁপে তাওয়ার রুটির মতাে তারাও গরম হতে শুরু করে।

এখনও ওরা সেই লড়াইয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে জোশে কথা বলছে। ওদের পেছনে হাওর ঘেরা ছােট্ট একটা গ্রাম। করচ, জাম, জারুল গাছ আর বাঁশঝাড়ের গহিনে জগৎ বিচ্ছিন্ন সেই জনপদ যেন ভয়-তটস্থ কাঠবিড়ালি। তাদের ডাইনে একটা মরা নদী। খরার ধকলে নদীর বুক শুকিয়ে ফাটা বাঙ্গি। কিন্তু বর্ষার শুরুতে যখন উজানের পাহাড় থেকে জলের গােলা ছুটে আসে, তখন দিনরাত সে কামারের হাপরের মতাে শোঁ শোঁ গর্জাতে থাকে। সম্ভবত তার থেকেই নদীটার নাম হয়েছে কামারখাল। কামারখালের ডাইন বাজুতে একটা উঁচু টিবির উপর পুরানা দিনের শ্মশান। সামনের কাঠা কয় পতিত জমির পেছনে দিঘির পারে বিশাল বিশাল সব শিমুল, শিলকড়ই, অর্জুনের সরল সরল দেহকাণ্ডের ভিড়। নিচে জাত-বেজাতের লতাগল্মে আচ্ছন্ন; যেন কালান্তরের অন্ধকার ও পােরাণিক গালগল্প নিয়ে ছােটোখাটো ওই জংলাটা আজব এক জগৎ বানিয়ে ভােম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বেলা ডুবতে দেখে কেউ কেউ উঠি-উঠি করছিল। তখন লুঙ্গির ফারে গুঁজে রাখা একটা বাঁশি বের করে মনটাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে শুরু করে। এতেই আলাপের মােড় বেকসুর পালটে যায়। 

অসিত কুতকুতে ছােটো চোখ দুটো চিকন করে মনটাইয়ের হাতের বাঁশিটা নীরবে দেখছিল। জিনিসটা যেমন ছােটো তেমনই অদ্ভুত। এমন বাঁশি তার জন্মে দেখেনি। তাই সে চোখ মটকে, কপাল কুঁচকে বাঁশিটার দিকে ইশারা করে। 

 এইডা কই পাইলে?

অসিতের প্রশ্ন শুনে মনটাইয়ের কালাে মুখটা তার নিজের অজান্তেই লাল হয়ে ওঠে। সে মিহি গলায় জবাব দেয়– গুরু দিছে। অজান্তেই লাল হয়ে ওঠে।

‘গুরু দিছে!’– এই কথা বলে ওরা তিনজনেই অবাক চোখে বাঁশিটার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন ওই আজব বস্তুটার মাঝে তারা মনটাইয়ে গুরু, সুরেন বাইন নামের আজগুবি মানুষটাকে দেখছে!

বাঁশিটা নিয়ে মনটাইয়ের গর্বের শেষ নাই। ফের সে ভয়েও আছে। কেমন পাথরের মতো শীতল আর ওজনদার জিনিসটার দিকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে ওঠে। ছবকের শেষ দিন তার বাজন শুনতে শুনতে গুরু সুরেন বাইন ঝরঝর করে চোখে জল ছাড়ছিল। এক সময় মনটাইয়ের বাঁশি থেমে যায় কিন্তু সুরেন বাইন আগের মতোই নিথর দেহে বসে থাকে। তখনও অন্ধ বাইনের চোখে জলের রেশ। অনেক পরে বৃদ্ধ বাইনের শিথিল অঙ্গসমূহে সাড়া ফিরে। ধীরে ধীরে সে বিছানার শিথানের দিকে যায়। বালিশের পাশে রাখা বিস্তর বাঁশির মাঝ থেকে সবচেয়ে ছােট্ট এই বাঁশিটা নিয়ে মনটাইয়ের হাতে তুলে দেয়। সে তার অবােধ চেতনায় তখন বুঝেছিল, নীরব সে দান, বহু মূল্যবান আমানতের মতোই অর্থবহ।

মনটাইয়ের দিকে তাকিয়ে শশাঙ্ক মট করে ডাল ভাঙার মতাে নীরবতা ভাঙে,– হাচা কইলে কি জানছস, এই অঞ্চলে বাঁশিতে তর লগে টক্কর দেয় তেমন কেউ আর দ্যাহি না। 

গালভাঙা খ্যাংরা চেহারার অসিত শিরাওঠা হাতে হাঁটুতে চাপড় মেরে চেঁচিয়ে ওঠে,– কতাডা এক্কেবারে খাঁটি। 

অসিতের কথায় মনটাইয়ের কালাে মুখটা যেন কয়লা চাপা আগুনের মতাে ফের এট্টু লাল হয় । সেটা কি তৃপ্তির না বিনয়ের তা ভেবে দেখার আগেই অসিত ‘কিন্তু’ বলে ছোট্ট একটা হেঁচকি মেরে বসে। 

বন্ধুর প্রতি মুগ্ধতায় শশাঙ্কের চোখ দুটো তখনও জ্বলজ্বল করছে। নিজের সরল বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতেই যেন সে মােরগার মতাে ঘাড় ঝাঁকিয়ে গলা আরও চড়িয়ে দেয়– এর মাঝে কোনও কিন্তু-টিন্তু নাই।

অসিত মুখটা ছুঁচোর মতাে লম্বা করে রায় দেয় আছে– আছে, অবশ্যি আছে; গুরুর পরীক্ষা শেষ কিন্তু আমগর পরীক্ষাটা তাে বাকি রইছে। তাই আমি কই কী, আইজ রাইতে ওই চাতালটায় বাঁশি বাজায়া মনটাই আমাদের কাছে পরীক্ষা দিতে পারে। 

শশাঙ্কর মনে হয়, এই মুহূর্তে অসিত ইতরের মতাে কথা বলছে চিবিয়ে চিবিয়ে। অসিতের প্রতি রাগে শশাঙ্কের বুক জ্বলতে থাকে। ওর ঈর্ষাকাতর থোতা মুখ ভোঁতা করে দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তার আগেই অন্যমনস্ক মনটাই অসিতের দিকে তাকায়। কটাবর্ণের তরুণ চোখ দুটোতে আত্মবিশ্বাসের ঝিকিমিকি– কোনহানের কতা কইলে? 

– ওই যে।

অসিত হাত তুলে মরা নদীর পাশে শ্মশানের সামনের পতিত চাতালটা দেখায়। 

চিকন-চাকন আর শ্যামলা গতরটা ঘুরিয়ে, শ্মশানের পতিত চাতালটার দিকে তাকিয়ে মনটাইয়ের বুকটা ধক্‌ করে ওঠে। দিনের আলাে এখনও মরেনি, তবু জংলাটা ঘন, গভীর রহস্যে ভােম হয়ে আছে আর সামনের পতিত চাতালটা কেমন ভয়ানক ভাবে শক্‌ শক্‌ করছে। অবশ্য শশাঙ্কদের নিরিখে মনটাই যেই-সে বাদক নয়। সে সুরেন বাইনের শিষ্য। বাঁশি বাজায় কালার মতাে। অসিত মুখে মুখে তর্ক করে শশাঙ্ককে কাবু করতে আর মনটাইকে উসকে দিতে। কিন্তু মনের গােপনে তারও বিশ্বাস, এখন মনটাই বাঁশিতে টান দিলে নাগডরার আনাচ-কানাচ থেকে জাতবেজাতের সব সাপ চেল-চেল করে এই দিকেই ছুটে আসবে।

এ অঞ্চলের সবাই মানে, সুরেন বাইনের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্তই স্থির না। লােকটা আসলেই মানুষ কি না সেই বিষয়েই তাদের গুরুতর মতভেদ আছে। আছে বুক-কাঁপানাে নানান অভিজ্ঞতা। সত্য-মিথ্যা পরের কথা; কিন্তু এলাকার সবচেয়ে বয়স্ক জইফ লােকটিও বলে, তার শিশুকালেও সে সুরেন বাইনকে এমনটিই দেখেছে। আর তার এ তল্লাটে আসার বছরটাও নাকি বিশেষভাবে চিহ্নিত একটা বছর।

অনেক অনেক দিন আগের কথা; তখন কার্তিকের শেষেই এ গ্রামে কলেরা লাগে। ঘরে ঘরে মানুষ রােগে পড়ছে আর মরছে। দিনকে দিন লাশের কাফেলা দীর্ঘ হতে শুরু করে। শেষে এমন দশা হয়, মুর্দা কবরে কিংবা শ্মশানে নেওয়ার মতো লােক পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। ঠিক এমনই সময়ে এক রাতে কামারখালের তীরে আজব সুরে বেজে ওঠে একটা বাঁশি। রাত ভাের হয় হয় তবু বাঁশি থামে না। সে সুর ধীরে বহমান নদীর মতাে করুণ আর গভীর! যারা বেঁচে ছিল তারা ভয়ে সব ফেলে কাঁদতে বসে। কেউ কেউ আবার খিলধরা বুকে ঝিম মেরে বসে থাকে। মনটাইয়ের দাদা ছিল জান-গতর আর সাহসে অসুরের মতাে এক মানুষ। বাঁশির সুরে টিকতে না-পেরে লােকটা হড়াৎ করে কপাট খুলে কামারখালের দিকে ছুটতে থাকে। গ্রামের শেষে গােপাটে গিয়ে দেখে, দানব আকৃতির একটা মহিষের পিঠে চড়ে এক বুড়াে বাঁশি বাজাচ্ছে আর তার সামনে জোড় হাতে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে এক বুড়ি। বুড়ির বুকভরতি লাল লাল চোখ। গাঁয়ের মুরুব্বিরা এখনও কয়, ওই বুড়িটাই ছিল নাকি ওলা বিবি আর সেই বুড়ােটাই হল আজকের সুরেন বাইন। গ্রামের সকলের বিশ্বাস, সেই দিন ওলা বিবি সুরেন বাইনের কাছে নাকে খত দিয়ে গ্রাম থেকে জন্মের মতো বেরিয়ে গেছে । আর সুরেন বাইন রয়ে গেছিল গােপাটের পাশের জংলাটাতে আস্তানা গেড়ে। 

বাইনের আসল নাম কী কেউ জানে না। লােকটা জাত-পাতের ধার ধারে না; মন্দির-মসজিদে যায় না। গা-গতরে শেওলাপড়া শালকাঠের মতো মানুষটা বাঁশি বাজিয়ে লোকের ভােক-তিস্যা ভোলায়। গ্রামের পাঁচজন সেই তিলিসমাতি দেখেই তার নাম দিয়েছিল সুরেন বাইন। 

ভাবমনস্ক মনটাইয়ের নীরবতায় অসিত খোঁচা মারে,– ডরাইয়া গেলে নাকি?

মনটাই ফের গুরুর বাঁশিটির দিকে তাকায়। জিনিসটা দেখলেই তার বুকের তাকদ এক লাফে বেড়ে যায়। অসিতের কথায় তার নরম-ঠান্ডা চোখ দুটোতে দুঃসাহস ঝলকে ওঠে, ডরের কী আছে, মন ঠিক কইরা খাড়াইলে মানুষের সামনে কিছু টিকে?

ডুবুডুবু সূর্যের পরিধি তখনও লাল আর তার জেল্লাতে গােটা হাওরের সবুজ পৃথিবীটাও যেন রুজ-লিপিস্টিক মাখা কিশোরীর মতাে রঙিন হয়ে উঠছে। সেই দিকে তাকিয়ে মনটাই ভাবে : গ্রাম থেকে বেশ ফারাকে, বাসক-আকন্দ-শিয়াকুলের ঝোপ ঘেরা, বড়ো বড়ো বনজ গাছের ছায়ায় সুরেন বাইনের দোচালাটা। প্রায়ান্ধকার ঘরের ভেতরটা কেমন স্তব্ধ, শীতল। ঘরের ভারী বাতাসে জংলি ফুলের মত একটা হালকা ঘ্রাণের সঙ্গে কাদের ফিসফিসানি যেন সারাক্ষণ ভেসে বেড়ায়। বেশিক্ষণ বসে থাকলে মনটাইয়ের হাড়ের ভেতর ভয় ও শীতের ফুটকি জমতে থাকে! 

মনটাই বাঁশিটা পরম ভক্তিতে কপালে ঠেকায়– বাজাইলে কী দিবে? 

অসিত নয়া জোশে লাফায়– একশ ট্যাহার একখান আস্তা নােট পাইবে। 

মনটাই মনে মনে হাসে। বােকাটা ভুল করছে। তার দীক্ষাগুরু সুরেন বাইন বলেন, বাঁশির সুরের বল মন্ত্রের চে সবল। তার অসাধ্য কিছু নাই। সেই শক্তি অর্জনের জন্য চাই সাধনা। যােগসাধনায় সফল হলে পঞ্চভূত বশীভূত হয়। সুরেন বাইন সেই সাধনায় শ্রেষ্ঠী। সে পঞ্চমকার ত্যাগী; শাকান্নভােজি। সুরের সাধনায় তপস্বী যন্ত্রী। মনটাই ওঠে দাঁড়ায়, তাইলে এইডাই কথা রইল। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। আমি যে শ্মশানেই বাঁশি বাজাইলাম তার সাক্ষী কী? সেই সত্য যাচাইয়ের জন্য তরা এইখানে বইয়া থাকবে আর আমি হেই চাতালে বাঁশি বাজায়াম। সারা রাইত বাজায়াম। বইয়া থাকতে হিম্মতে কুলাইব? 

অজানা ভয়ে অসিতের জোশ দপ করে নিভে যায় । আড় চোখে একবার শ্মশানের চাতালটা দেখে। বিজলির চমকের মতাে মনে পড়ে মুরুব্বিদের মুখে শােনা ওই শ্মশানের নানান লােমহর্ষক ঘটনার কথা। তারপরও ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তারুণ্যের অপ্রতিরােধ্য খােমারে, গোঁয়ারের মতাে মাথা নাচিয়ে সম্মতি জানায়,– একশ বার। 

গ্রাম ঘুমিয়ে তখন পৌষের পান্তা ভাত। পঞ্চমীর ক্ষীণাঙ্গী চাঁদটাও মরে মরে। ওরা তিনজন হাওরের লম্বা লম্বা ঘাসে কিম্ভূত ছায়া ফেলে মরা কামারখালের পাড়ে এসে চোরের মতাে দাঁড়ায়। একটু দূরে শ্মশানের ছােট্ট জংলাটা গম্ভীর অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছে। সে অন্ধকার বুঝিবা ইহ-সংসারের নয়, যেমন নিথর তেমনই কুটিল। চৈতের হালকা-ধূমল কুয়াশায় চওড়া হাওরটাও গা-মুড়ি দিয়ে আত্মগােপন করেছে। দূরে কোথাও একটা হট্টিটি পাখি চিকন গলায় আজাজিলের মতাে ক্ষণে ক্ষণে কাঁদছে। কারা যেন খচমচ করে শ্মশানের চাতালটা মুহূর্তে পেরিয়ে যায়; অস্পষ্ট সেই শব্দে অসিতের মাথার রুয়াতক ফড়ফড় করে খাড়া হয়ে গেল! 

শশাঙ্ক মনটাইয়ের একটা হাত খাবলা দিয়ে ধরে,– ল যাইগা।

অসিত উছিলা পেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিসায়,– হ, ল যাইগ্যা। বাঁশি-টাশি বাজায়া কাম নাই। কেমুন জানি অসম্ভব...অসম্ভব… লাগতাছে। 

নিরবয়ব অন্ধকারে মনটাই অস্ফুট হাসে। তার দীক্ষিত হৃদয় পরম ঔদাস্যে বাইনের ঠান্ডা ঘরখানার কথা ভাবে। সে ঘরের জংলি ফুলের সুবাসটাও যেন মালুমে আসে। জটিল দীক্ষা গ্রহণের দিনগুলো কি সে কখনও ভুলবে? গুরুর চারপাশে সারাক্ষণ যেন কারা ঘুর ঘুর করে । দিনের পর দিন এত কাছে থেকেও সে তার গুরুকে ঠিক চিনে উঠতে পারেনি। সময় অসময়ে কতদিন হুট করে গিয়ে তার ঘরে উঠেছে কিন্তু কোনওদিনই বাইনকে অবাক হতে দেখেনি। আলােহনি চোখ দুটো পিটপিট করে একটু মুচকি হাসি দিয়েছে। দীর্ঘ গোঁফ-দাড়ির জটলায় চাপা পড়া সে হাসি যেন কোনও মানুষের নয়। কোনওদিন তাকে রােগ-শােক-বেদনায় কাতর হতে দেখেনি। মেশিনের মতো চিরদিন একরকম। মনটাইয়ের মনে পড়ে : গুরুতর এক বর্ষণের বিকেলে সে গুরুর ঘরে আছকা উঠে পড়েছিল। বাইন তখন বিছানায় চিত হয়ে ঘুমুচ্ছে। প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে যেন তার নাক দিয়ে আগুনের লাল হলকা বেরুচ্ছে। সে কি ভুল কিছু দেখল? মনটাই চোখ কচলে ফের তাকায়। কিন্তু এবার আর আগুন নয়; গুরুর নাক দিয়ে দুটো জ্যান্ত সাপ বেরুচ্ছে। পলক পরেই দেখে সাপ নাই। আজব এক লীলা। মুহূর্তে মুহূর্তে সিফত বদলে যাচ্ছে। কোনওকিছুই সে স্থির করতে পারছে না দেখে ভয়ে হিতাহিত ভুলে দৌড়ে পালিয়ে আসে। পর দিন যেতেই গুরু পিটপিট করে নিঃশব্দে হাসতে থাকেন, কাইল খুব ডর পাইসছ? 

মনটাই ডানে বামে মাথা নেড়ে না বলতেই তিনি গম্ভীর হয়ে ওঠেন। 

মনটাইয়ের নীরবতায় শশাঙ্ক ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে,– ল ফিইরা যাই; আগুনে হাত দ্যায়া কাম নাই। 

সে সুরেন বাইনের মতো নিঃশব্দে হাসে, হেলাফেলায় কথা কয়ম– আইয়া যহন পড়ছি তাইলে আর ফিরতাম না। তগর ইচ্ছা অইলে চইলা যা। আমি আছি।

মনটাই সামনের দিকে পা বাড়ায়। অসিত তার একটা হাত খপ্‌ করে ধরে ফেলে,

– যদি সাপে কাটে? 

– একটুও না। 

কী যেন ভেবে অসিত মনটাইয়ের হাতটা ছেড়ে দেয়।

একটু পরেই শ্মশানের উঁচু চাতাল থেকে বাঁশির মিঠে বােল আসতে শুরু করে। ওরা তিনজন হাওরের ঘাসে খাড়ু ডুবিয়ে ভূতের মতাে দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে মনটাইয়ের বাঁশির সুর চড়ছে। সে সুর যেন হিরের ছরি, কলিজা বিদ্ধ করে; আগুনের চোরা তীরের মতাে পলে পলে মনের দিলকোঠায় জ্বালা ধরায়। অব্যক্ত অনুভবের তীব্র দহনে এক সময় ওরা তিনজনের দেহ নেতিয়ে এলে গােপাটে বসে পড়ে।

পিঙ্গলবরণ চাঁদটা পুরাে ডুবে যেতেই তাদের চারপাশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ধারে ধীরে মনটাইয়ের বাঁশির সুর মেতে উঠছে এক ভয়ংকর খেলায় । শ্মশানের গাছ-বৃক্ষ, লতা-পাতা মায় তাদের পায়ের তলার ঘাস-মাটিও যেন সেই সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গাইছে, দুলছে। 

অবস্থা বেগতিক দেখে এক সময় ওরা জান নিয়ে গ্রামের দিকে দৌড়ে পালায়। 

অসিত, শশাঙ্ক গ্রামের রাস্তায় উঠে থমকে দাঁড়ায়; সুরেন বাইনের দােচালায় বুঝি আরেকটা বাঁশি বেজে উঠল! সে সুর বড়ো গম্ভীর। বোলের তাল-লয় যেন ঝলসে উঠছে তিরস্কার আর আক্ষেপে। কিন্তু এ কী আচান্নক ব্যাপার! বাঁশিটা বুঝি হাওরমুখো উড়তে-উড়তে বাজছে! 

সুরে সুরে বাইন বলছে– বাঁচতে চাইলে থামিস না বাপ। বাজায়া যা। 

ওদিক থেকে বড়ো করুণ সুর ভেসে আসে। মনটাই জানায় তার চারপাশে কারা যেন মনের গাঁজনের নৃত্য শুরু করেছে। আবার জানায়, আরেক দল তার বাজনা থামিয়ে দিতে গলা চেপে ধরতে চাইছে। দু পক্ষের আলাপ চলছিল বাঁশির সুর-তানে। মনটাই শ্মশানে না যেতে তার গুরুকে মিনতি করে। সে নিশ্চিত, তাহলে দুজনেরই মরন হবে। কিন্তু বাইন জানায় এই ক্ষেত্রে সে অপারগ। গুরু থাকতে পুত্রতুল্য শিষ্যের জীবন বিপন্ন হবে এটা কেমন কথা! মৃত্যুতেই তাে আসল মুক্তি আর সেই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গুরু তার শিষ্যের মধ্যে নবজীবন পায়; এই সত্য আজও মনটাই জানে না, তবে সে কেমন শিষ্য?

একটু পরেই অসিতরা শুনে দুটি নয়, এখন কেবল একটি বাঁশির সুর ভেসে আসছে। অকল্পনীয় সে সুর-সুধা পলে পলে জীবনকে তুচ্ছ করে। পতঙ্গের মতাে পুড়ে মরতে সাধ জাগায়। সেই সুরের গভীর মন্ত্রণায় চারপাশের সব জড়-জীব যেন নৃত্য শুরু করেছে। 


পুবদিক ফরসা হয়ে যেতেই গােটা গ্রামটা বাসিন্দাদের কলরবে মুখর হয়ে ওঠে। আগ রাতে শ্মশানে মনটাইয়ের বাঁশি বেযে উঠতেই ঘুমন্তরা ভয়ে ঠকঠক করে জেগে উঠেছিল। সেই থেকে ওরা ভােরের অপেক্ষায়। অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে, পুরুষেরা পতঙ্গের মতো ঝাঁক বেঁধে শ্মশানের দিকে ছুটে। আবাল, অবলারা গ্রামের শেষে, গােপাটের মুখে দল বেঁধে দুরুদুরু বুকে দাঁড়িয়ে থাকে। 


ওরা গিয়ে দেখে সুরেন বাইন উপুত হয়ে পড়ে আছে। নাকে-মুখে থকথকে জমাট রক্ত। পাশেই বাঁশিটা। খোঁজ পড়ে মনটাইয়ের। এত লােকের মাঝে সেই শুধু গরহাজির। আতঙ্ক এবার অন্য মাত্রা পায়। গ্রামখানা তন্ন তন্ন করে তালাশ করা হয়। ভয়-তড়াসে সবাই কথা বলছে জোরে জোরে গলা ফাটিয়ে। এবার পিঁপড়ার লাছির মতাে সার বেঁধে মানুষগুলাে বাইনের ঘরের দিকে ছােটে।


দরজাটা খােলাই ছিল। দুজন সাহসী মরদ উঁকি দিয়ে দেখে– বাঁশি হাতে মগ্ন মনটাই অন্ধের মতাে বাইনের বিছানায় বসে আছে। তার শরীরের হাবভাব, বসার ভঙ্গি-টঙ্গি অবিকল সুরেন বাইনের মতো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন