বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

রাধানাথ মণ্ডল'এর গল্প: শীতের মানচিত্র

সারা শীতকাল মহিমের ঘুমিয়ে পড়াটা এরকম। কাঁথার ভিতরে তার বাবার সঙ্গে পাশাপাশি শুয়ে, অন্ধকার ঘর, ঘরের উপরের সাঙা কাঠ দেখা যায় না, একসময় বাবা বিড়ি ধরায়, মহিম এক ঝলকে দেখতে পায় গোটা ঘরটা। দেয়ালে গৌর নিতাইয়ের ছবি, বাঁশের আলনায় থাক থাক সার দিয়ে রাখা কাঁথা-বালিশ। দেশলাইয়ের কাঠি নিবে গেলে ফের অন্ধকার, চুপচাপ ঘর। শুধু বাবা যখন বিড়িতে টান দেয় আগুনের একটা ফোঁটা জ্বলজ্বল করে ওঠে, ঘরটা একটু স্পষ্ট হয়, তারপর আবার অন্ধকার। এইভাবে একবারের জন্যে আলো, একটু পরেই অন্ধকার দেখতে দেখতে মহিম কখন ঘুমিয়ে পড়ে।

মহিমের জেগে ওঠাটাও একই ধরনের। আধো ঘুমের মধ্যে দেখতে পায় চাদর গায়ে দিয়ে বসে তার বাবা, গুনগুন করে গাইছে; রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক সারি ডাকে--। মহিম আস্তে আস্তে চোখ মেলে, ঘরটা ঠিক বুঝতে পারে না, শুধু দ্যাখে, দরজার ফুটো দিয়ে সরু সরু আলোর তির ছুটে আসছে তার চোখ-বরাবর, সে তাড়াতাড়ি কাঁথা ঢাকা দিয়ে দেয় চোখে, কানের মধ্যে তবু বাবার গুনগুন গানের শব্দ ঢুকে পড়ে। মহিম ওঠে না, আড়মোড়া ভেঙে আবার ভালো করে শোয়। সে জানে এখন বাবা উঠবে, খামার পেরিয়ে গিয়ে স্বয়ংবর গাছের ডাল ভেঙে দাঁত মাজতে মাজতে মাঠের দিকে চলে যাবে। একটু পরে ফিরে গোয়াল থেকে গোরুগুলো বের করবে একে একে, তখনও বাবার গলায় লেগে থাকবে ওই গুনগুন গান, গোরুগুলোকে চালায় বেঁধে, ছানি দিয়ে ফিরে আসবে বাড়িতে, সবাইকে ডাকবে একে একে, সবচেয়ে আগে তাকে। মহিম উঠবে, ভালো করে চাদরে সারা শরীর ঢেকে, তারপর উনুনশালে বসে খুব কষ্টে একটা হাত চাদরের বাইরে বের করে উনুনের ভিতর থেকে কাঠকয়লা অথবা ঘুঁটের ছাই খুঁজবে দাঁত মাজবার জন্যে।

সারা শীতকাল মহিম খামারে বসে রোদ পোহাবে চাটাই পেতে, পাশের বেড়ায় বরবটির শুঁড় ঠোঁট বাড়াবে তার দিকে, জামবাটি-ভর্তি মুড়ি আর কড়াইশুঁটি, কলি-পেঁয়াজ দিয়ে মুখে মুড়ি তুলতে তুলতে এক হাত দিয়ে ওলটাবে পৃথিবীর মানচিত্রের পাতা। একটু পরে পরে রোদ সরে সরে যাবে আর মহিম চাটাইটাও টেনে নিয়ে যাবে একটু একটু। তারপর একসময় যখন পাশের দেওয়ালে দাগ দেওয়া অংশটায় রোদ উঠে যাবে, অমনি বইপত্র গুটিয়ে ব্যাগে ভরে উঠে পড়বে। বাড়িতে গিয়ে খুব কষ্ট করে জামা খুলবে, সরষের তেল মাখবে, তারপর বুকে বল বেঁধে ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়বে ডোবার কনকনে জলে। তারপর কোনোক্রমে ডুব দিয়ে উঠে কাঁপতে কাঁপতে জামা-প্যান্ট পরে খেতে বসবে। রোজ রোজ বড়ি পোস্ত? একটু রাগ দেখাবে মার উপর। মা বোঝাবে আর দিন পনেরো গেলে বড়ো কাঁদিতে আলু ভাঙা হবে, আর হপ্তাখানেক গেলে সাদা হাঁসটা ডিম দেবে, তখন--। মহিম এরপর কয়েক গ্রাস খেয়ে উঠে পড়বে, হাতমুখ ধোবে, তারপর ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বলরামপুরের মাঠ ধরবে।

সারা শীতকাল মহিম পাকা ধানের গন্ধ পেতে পেতে, ধান কাটা, ধানের আঁটি বাঁধা, ঝরা ধানের শিষ দেখতে দেখতে তিন ক্রোশ দূরের বলরামপুর হাইস্কুলে যাবে আর সূর্যাস্ত মাথায় করে নিজের দীর্ঘতর ছায়া দেখতে দেখতে ফিরে আসবে।

এই শীতকালেই আসবে মহিমের সবচেয়ে দুঃখের দিন। একদিন স্কুলে গিয়ে দেখবে স্কুলের অন্য এক চেহারা। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছেলেমেয়েরা, এখানে-ওখানে খাতা হাতে মাস্টারমশাইরা, সকলের চোখে-মুখে উদ্বেগ। একটু পরে ঘণ্টা বাজবে ঢং ঢং করে, সবাই যে যার ক্লাসে গিয়ে বসবে, মহিম যাবে চুপিচুপি সকলের শেষে, পেছনের বেঞ্চিতে। একটু পরে তাদের ক্লাসটিচার আসবেন, হাতে একগাদা প্রোগ্রেস রিপোর্ট, কিছু ভালো ছেলে ছাড়া কেউই সরাসরি তাকাবে না মাস্টারমশাইয়ের মুখের দিকে। মহিম দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করবে সেই দারুণ সময়ের, যখন হেডমাস্টার আসবেন সঙ্গে আরও দু-একজন শিক্ষককে নিয়ে, একে একে সকলের নাম ডাকবেন যারা প্রোমোশন পেয়েছে, সেখানে মহিমের নাম থাকবে না। সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলে সে আস্তে আস্তে হেডমাস্টারের ঘরের দিকে যাওয়ার সাহস সঞ্চয় করবে, তারপর এগিয়ে যাবে পায়ে পায়ে। অন্যান্যবারের মতো হেডমাস্টারমশাই তাকে দেখেই দাঁত খিঁচিয়ে উঠবেন, প্রোগ্রেস রিপোর্ট দেখে বলবেন, এবারও তিনটে বিষয়ে ফেল করেছ, তোমার বাবাকে দেখা করতে বোলো।

বিকেলবেলা একা একা বাড়ি ফিরে আসবে মহিম। এসেই কালামাটিতে চলে যাবে, যেখানে আলুজমিতে জল দেওয়া হচ্ছে। সে বাবার হাত থেকে কোদাল কেড়ে নিয়ে জল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলু পাওয়াবে। সার সার নালায় জল ভরে উঠতে দেখবে আর ভাববে, কীভাবে বাবাকে কথাটা বলা যায়। সন্ধেবেলা লণ্ঠনের আলোয় ঢেরা নিয়ে যখন শনের দড়ি পাকাতে বসবে বাবা, সেও কাছে গিয়ে বসবে, জিজ্ঞেস করবে, বাবা আমি কি দড়ি ধরব? কাজ করার প্রতি ছেলের এই আগ্রহে একটু অবাক হবে বাবা, তবু ঢেরাটা ছেলের হাতে দিয়ে পাশে বসে জিজ্ঞেস করবে, আজ পড়াশুনা নাই? 

মহিম ঘাড় নাড়বে শুধু, না নেই। রাত্রে শুধু মুলো শাকের তরকারি আর বিউলির ডাল দিয়ে একমনে ভাত খেয়ে নেবে মহিম, মা জিজ্ঞেস করবে, কি রে, আজ যে এত চুপচাপ? মহিম কোনও জবাব দেবে না। তারপর বিছানায় শুয়ে বাবার আসার অপেক্ষা করবে। বাবা এসে লণ্ঠনের দম কমিয়ে বারান্দায় বের করে রেখে দরজায় খিল এঁটে দেবে। তারপর বিছানায় চুপচাপ বসে থাকবে কিছুক্ষণ। মনে মনে রোজকার মতো মন্ত্র জপ করবে। তারপর একসময় ফস করে দেশলাই জ্বেলে বিড়ি ধরাবে। মহিম একদৃষ্টে সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারপর বাবা তার পাশে শুলে মহিম ডাকবে, বাবা। উঁ? জবাব দেবে বাবা। মহিম কোনও কথা বলবে না। কি রে কিছু বলবি? মহিম তবু চুপচাপ থাকবে। কী বলবি, বল। হেডমাস্টার তোমাকে একবার দেখা করতে বলেছে। একনিঃশ্বাসে একসময় মহিম বলে ফেলবে কথাগুলো।

--কেন রে, এবারও ফেল করেছিস বুঝি?

মহিম কোনও কথা বলবে না। একসময় বাবার শিরা ওঠা খসখসে হাতের ছোঁয়া তার মাথায় এসে লাগবে, আর ঠিক তখনই তার দু-চোখের জমা জল গায়ের কাঁথার উপরে টপটপ করে পড়তে থাকবে। সারা শীতকালে এই একবার মাত্র মহিম কাঁদবে।

একটু পরে বাবার নরম গলা শুনতে থাকবে মহিম। শুধু মানচিত্র দেখলে চলবে, একটু পড়াশুনো করতে হবে না? কোনও জবাব দেবে না মহিম। অনেক রাত পর্যন্ত কাঁদতে থাকবে।

এই এক অদ্ভুত ব্যাপার মহিমের। তাকে সবাই বারবার বলে। প্রত্যেকটি মাস্টারমশাই। সে অঙ্ক বুঝতে পারে না, জ্যামিতির উপপাদ্য তার মাথায় ঢোকে না, সহজ বানান সে বারবার ভুলে যায়, দিনরাত তার কাছে শুধু মানচিত্র আর মানচিত্র। আফ্রিকা কিংবা আমেরিকা, চিন কিংবা মঙ্গোলিয়া, হাঙ্গেরি কিংবা চেকোস্লোভাকিয়া। সে চটপট বলে দেয় ইংলিশ চ্যানেল বা আর্জেন্টিনা কোথায়, মিশরের রাজধানীর নাম কী। সে অবলীলায় দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্র এঁকে দেখিয়ে দিতে পারে দক্ষিণ আটলান্টিক এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর কীভাবে তাকে ছুঁয়ে আছে, ইউরোপের মানচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে সে মুহূর্তের মধ্যে দেখিয়ে দিতে পারে জুরিখ কিংবা ফ্রাঙ্কফুর্ট কোথায় অবস্থিত। ক্লাসের সবাই যখন বীজগণিতের এ স্কোয়ার প্লাস বি স্কোয়ারের ফরমুলা মনোযোগ দিয়ে শুনছে তখন হয়তো মহিমের চোখের সামনে ভাসছে আল্পস পর্বতমালার অবস্থান কিংবা মূল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাসমানিয়ার দূরত্ব। মহিম তাই প্রতিবার বাংলায় কোনোক্রমে পাস করে, ইংরেজিতে পাস নম্বরের চেয়ে দু-চার নম্বর কম পায়, অঙ্কে ফেল করে, আর ভূগোলে সকলের চেয়ে বেশি নম্বর পায়। প্রতিবার, প্রতিটি পরীক্ষায় এরকম।

স্কুলে মহিমের সবচেয়ে প্রিয় ভূগোলের মাস্টারমশাই অরিন্দমবাবু। ফুলহাতা সাদা শার্টের উপরে নীল সোয়েটার, চমৎকার মুখ-চোখ, মোটা গোঁফ অরিন্দম স্যার মহিমের চোখে একজন আশ্চর্য মানুষ। যখন ক্লাসে অরিন্দমবাবু পড়ান তখন মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে মহিম আর ভাবে, কত কী জানেন মাস্টারমশাই, কত প্রখর ওঁর জ্ঞান, সারা পৃথিবী যেন ওঁর হাতের মুঠোয়। যখন গ্লোব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একটা কাঠি নিয়ে নানা দেশ-নদী-পর্বত-সমুদ্র দেখান, মনে হয় যেন উনি ওইসব জায়গায় ঘুরে এসেছেন বহুবার। অরিন্দমবাবুও মহিমকে একটু বিশেষ স্নেহের চোখে দেখেন। প্রায়ই গায়ে হাত দিয়ে এটা ওটা বলেন, বোঝান। একবার বলেছিলেন, তোমার নিজের কি গ্লোব আছে মহিম, এবার বাবাকে একটা গ্লোব কিনে দিতে বলো। তার অনেক দিনের ইচ্ছেটা মাস্টারমশাইয়ের মুখে শুনে বুকের মধ্যে একটু শিরশির করে ওঠে। কত দাম হবে স্যার একটা গ্লোবের? কত আর— চল্লিশ-পঞ্চাশ! দামটা শুনে একটু দমে যায় মহিম। বাড়ির অবস্থাটা এক মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাবা মা আর তিন ভাই তারা। বাবার বয়স হয়েছে, এখন আর খাটার শক্তি নেই, তবু সব কাজ বাবাকে করতে হয়। বর্ষালী ছাড়া সবসময়ের মুনিশ তারা রাখতে পারে না। অনেক সময়ই বাবাকে লাঙল ধরতে হয়, ধান কোপানো, ধান-কাটা ধান-ঝাড়া, আলু-বসানো, তিল-বোনা— সব কাজ। মহিমের সবচেয়ে কষ্ট হয় যখন বাবা মুনিশ না থাকলে নিজেই ধান ভানানোর জন্যে বড়ো বড়ো বস্তা পিঠে করে নিয়ে গিয়ে গোরুর গাড়িতে তোলে আবার গোরুর গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে। মহিম যত বড়ো হচ্ছে বুঝতে পারছে তাদের বাড়ির অবস্থাটা, তার জন্যে প্রতি ক্লাসের বই, স্কুলের মাইনে, ছোটো ভাইদের পড়ার খরচ জোগাতে যেখানে তার বাবা একেবারে হিমশিম, সেখানে আরও চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা খরচ করানোর কথা সে বলবে কী করে? তবু মনে মনে সামান্য আশা ছিল তার, যদি ভালোভাবে পাস করতে পারে তাহলে এবার শীতকালে যখন বাবা তাকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাপারে যাবে, সে আবদার করবে একটা গ্লোব কিনে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না, অন্যান্যবারের মতো এবারও সে দেখে তার সরল চাষিবাসী মানুষ বাবা হেডমাস্টারের ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে আছে আর বলছে, ওকে মাস্টারমশায় দয়া করে ক্লাস নাইনে তুলে দেন, আমার যত কষ্ট হোক আমি এবারে ওকে টিউশনি দেব। মরমে মরে যায় মহিম, তার চোখ ফেটে জল আসে, নিজের উপর অসম্ভব রাগ হয় তার, সে প্রতিজ্ঞা করে কাল থেকে প্রতিদিন দু-ঘণ্টা করে অঙ্ক কষবে, ট্রানশ্লেসন করবে দু-প্যাসেজ করে, রচনা মুখস্থ করবে রোজ একটা। কিন্তু পরের দিন সকাল হলেই সে অদ্ভুতভাবে বইয়ের ব্যাগ, চাটাই আর জামবাটি-ভর্তি মুড়ি নিয়ে খামারে রোদ পোহাতে যায়, এবং অঙ্ক নয়, ইংরেজি নয়, বিজ্ঞান কিংবা ব্যাকরণ-রচনা নয়, সে খুলে বসে ভূগোল বই আর পৃথিবীর মানচিত্র।

তবু এই শীতকালেই সবচেয়ে সুখের দিন আসবে।

সকাল থেকেই খুব উত্তেজিত হয়ে আছে মহিম। ধান কাটা-ঝাড়া শেষ, আজ প্রথম ব্যাপারে যাওয়া হবে। তাদের বর্ষালী মুনিশ রামফলদার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে মহিম। ডোবার পাড়ে নামিয়ে রাখা ছই এনে গোরুর গাড়ির উপরে চড়ানো হচ্ছে, রামফলদা ছই বাঁধছে, দড়ি এগিয়ে দিচ্ছে মহিম। গাড়ির পাটাতনে খড়ের আঁটি বিছনো হল, চাকায় তেল দেওয়া হল, জোয়াল বাঁধা হল শক্ত করে। তারপর ধান ওজন করা হচ্ছে। বাবা পাল্লা ধরে আছে, মহিম ধান এগিয়ে এগিয়ে দিচ্ছে, বস্তার মুখ ধরে আছে রামফলদা, এক-একটা বস্তা ভর্তি হলে মুখ বেঁধে ফেলছে আঁট করে। তাদের বাড়ির মতোই আরও অনেক বাড়িতে ব্যস্ততা, দশ-বারোখানা গাড়ি একসঙ্গে ব্যাপারে যাবে। রাত্রে খাওয়াদাওয়া করে রওনা হবে সবাই, সারা রাত গাড়ি চলবে, সকালে পৌঁছোবে মহকুমা শহরে, সেখানে ধান বিক্রি করে জিনিসপত্র কেনাকাটা করবে সবাই, তারপর একসঙ্গে রান্না খাওয়া করে সন্ধের পর রওনা দেবে বাড়ির উদ্দেশে। সারা বছর ধরে মহিম এই একটি দিনের জন্যে ব্যাকুলভাবে অপেক্ষা করে থাকে।

সারা বছরের মধ্যে গোটা গ্রামের লোক এই সময়েই বেচাকেনা সারতে শহরে যায়। ধান উঠে গেছে, আলু তুলতে আর কিছুদিন বাকি, এই সময় সকলের ব্যাপারে যাওয়ার সময়। যাদের অবস্থা ভালো তারা দুবার তিনবার যায়, মহিমরা একবার। জামাকাপড়, দোকানের জিনিসপত্র, চায়ের সরঞ্জাম, বইপত্র, যার যা দরকার সবাই মিলে কিনে আনে। মহিম যখন ছোটো ছিল তখন তাকে বাবা সঙ্গে নিয়ে যেত না, সে কান্নাকাটি করত, এখন তার ভাইয়েরা যাওয়ার জন্য কাঁদে, মহিম অনেক বড়ো মানুষের মতো তাদের বোঝায়, ছোটোদের ব্যাপারে যেতে নেই।

সন্ধেবেলা বস্তাগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়া হল একে একে। পাশাপাশি দুটো করে মোট ছটা বস্তা রাখা হল, তার উপরে কাঁথা পেতে বিছানা, গায়ে দেওয়ার কম্বল। দুটো বালিশ, বাবার আর তার। মওড়ায় চাদর মুড়ে বসবে রামফলদা, হাতে হালবাড়ি। একটা চটের থলিতে নেওয়া হল মুড়ি, চাল, ডাল, একটা গেলাস। চোঙায় নেওয়া হল তেল, বোঝা বেঁধে নেওয়া হল কিছু কাঠ। কৌটোর মধ্যে বাবার জন্যে বিড়ি, রামফলদার চটা খাওয়ার দোক্তা-শালপাতা।

তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে মহিম গাড়িতে গিয়ে উঠে বসে। রামফলদা লন্ঠন জ্বালিয়ে নিয়ে গিয়ে গাড়ির তলায় বেঁধে দেয়। বাবা অন্য এক বাড়ি থেকে টিকিট ভাড়া করে নিয়ে আসে। কিছু লোকের টিকিট থাকে গোরুর গাড়ির, তারা ভাড়ায় দেয়, যাদের থাকে না তারা সেগুলো নিয়ে আসে। এই টিকিটই হল লাইসেন্স। রঙিন টিনের তৈরি নম্বর দেওয়া টিকিট মহিম ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছে। ব্যাপারে গেলে এই টিকিট সঙ্গে থাকা দরকার।

একটু পরে গাড়ি ছেড়ে দেয় একে একে। কই গো হল, কত দেরি, ও বলাই, এখনও যে গাড়িই জুড়োনি গো— হাঁকডাক শোনা যায় গ্রামের এদিক থেকে ওদিক, তারপর একসময় সার দিয়ে গাড়িগুলো বেরিয়ে পড়ে। কার গাড়ি আগে যাবে, এই নিয়ে একটু কথাবার্তা হয়, সবচেয়ে ভালো গোরু যার, সে থাকে সকলের পিছনে। গাড়িতে উঠেই বাবা কম্বল ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়ে, মহিম জেগে বসে থাকে বহুক্ষণ। গ্রাম ছাড়িয়ে গাড়িগুলো মাঠের মধ্যে পড়ে, ধান কাটার পর বেশিদিন যায়নি, তাই ভালো করে লিক পড়েনি গাড়ির, গাড়িগুলো টলমল করে, মাঝে মাঝে রামফলদাকে নেমে গিয়ে ন্যাঙড়া ধরতে বা চাকা মারতে হয়, তখন মহিম মওড়ায় বসে গাড়ি চালাতে থাকে। রাত বাড়ে, গাড়িগুলো মাঠ ছেড়ে কুলিরাস্তা ধরে, মহিমের ঘুম পায়, সে বাবার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। গাড়ির ক্যাঁচরকোঁচর শব্দ হয়, টুকটাক কথাবার্তা ভেসে আসে গাড়োয়ানদের, দ’-এ পড়ে মাঝে মাঝে টাল খায় গাড়ির চাকা, ঘুম ছেয়ে আসে মহিমের দু-চোখে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে হিসেব করে আর দু মাইল দূরে শ্রীনগর, সামনে পিচরাস্তা, সেখান থেকে আট মাইল গেলে ক্ষীরপাই বি.ডি. ও. অফিস, আমরা গিয়ে উঠব চন্দ্রকোনা-ঘাটাল মেন রাস্তায়, সেখান থেকে বারো মাইল দূরে ঘাটাল। মোট আটত্রিশটা গ্রাম, সাতটা গঞ্জ শহর, নটা অঞ্চল পঞ্চায়েতের এলাকা পেরিয়ে আমাদের যেতে হবে।

বাবার ডাকে ঘুম ভাঙে মহিমের। জেগে দ্যাখে সকাল হয়ে গেছে। ঘাটালে ঢোকার আগে চাতালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে গাড়িগুলো। এখানে ক্যানালের জলে সবাই মুখ ধোবে, পায়খানা-টায়খানা সেরে নেবে। মহিমও গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। গোরুগুলোকে জোয়াল থেকে খুলে খড় খেতে দিয়েছে সবাই, কেউ কেউ জাব মেখে দিয়েছে চ্যাঙারিতে, মহিম কাছের গাছ থেকে একটা নিমডাল ভেঙে নিয়ে দাঁত মাজতে থাকে। এদিক-ওদিক আরও বেশ কিছু গাড়ি, বাবাকে চিন্তিত দেখায়, আজ আমদানি প্রচুর, ভালো দর পাওয়া যাবে না। দু-চার জন দরদাম নিয়ে কথা বলে। পাঁচ কাল ছিল, আজ বোধহয় তিন-চারে নেমে যাবে, লোকেরা বলাবলি করে। মহিম বুঝতে পারে একশো তিন-চার টাকা এক কুইন্টাল ধানের দাম। দরটা ভালো না খারাপ সে ঠিক বুঝতে পারে না, তবে আরও বেশি দাম হলে যে সকলে খুশি হত, এটুকু সে বুঝতে পারে, গাড়ি ছাড়া হয় আরও কিছুক্ষণ পরে, বাবা একটা কাগজে মোড়া নমুনা ধান নিয়ে আগে চলে যায়, রামফলদাকে বলে গাড়ি নিয়ে যেন সোজা কুঠিবাজারের ভিতরে চলে আসে।

খানিক পরে বাবাকে দেখতে পায় মহিম। চোখে-মুখে উত্তেজনা, অন্য গাড়িগুলোকে গোপন করে ফিসফিস করে বাবা বলে, ভালো দর পাওয়া গেছে। বারো। রামফলদা যেন সোজা রায়বাবুর গদিতে চলে আসে। মহিমও উত্তেজিত হয়ে পড়ে ভিতরে ভিতরে। সারা বছর ধরে কত পরিশ্রম, কত মেহনত, জল, সার দিয়ে একটু একটু বড়ো করে তোলা হয়েছে ধান গাছ, সেই গাছে ধান হয়েছে, সেই ধান পেকেছে, তাকে কেটে ঝেড়ে বস্তায় ভরে এত দূর আসা, এরপর যদি ভালো দাম না পাওয়া যায় তাহলে তার চেয়ে মনখারাপের আর কী থাকতে পারে? রায়বাবুর গদিতে তাদের গাড়ি থামে, অন্য গাড়িগুলো এ গদি-ও গদি চলে যায়, মহিম নেমে এসে গদির এক কোণে বসে কাঁটা-পাল্লাতে ধানের বস্তার ওজন দেখতে থাকে।

সারাটা দিন অদ্ভুত হইচইয়ের মধ্যে কেটে যায়, এখান থেকে ওখান থেকে মহিমের ডাক পড়ে, তাদের গ্রামের অনেকেই লেখাপড়া জানে না, হিসেব মিলিয়ে দেখার জন্যে, টাকা গুনে নেওয়ার জন্যে মহিমকে দরকার হয়। মনে মনে খুব অহংকার বোধ করে সে, গ্রামের সব লোকজনদের মধ্যে তারও গুরুত্ব যে কম নয়, সে বুঝতে পারে এই এখন, এইখানে।

বরদাবাবুর গদি থেকে প্রতিবার কেনা হয় দোকানের জিনিসপত্র। বাবা ফর্দ হাতে দিয়ে বসিয়ে দেয় মহিমকে। মহিম একে একে হাঁক পাড়ে, পোস্ত এক কেজি, গুড় পাঁচ কেজি, সরষের তেল পাঁচ, চা আড়াইশো গ্রাম— এক একটা জিনিসের নাম হাঁকে আর মহিমের মনে পড়ে যায়, ক্রান্তীয় অঞ্চলে সাতাশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উত্তাপ, একশো সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত এবং দোআঁশ মাটিতে আখ চাষ হয়। ভারতে এরকম প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকায় এই দেশ আখ উৎপাদনে পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তৈলবীজের মোট উৎপাদনেও ভারতবর্ষ পৃথিবীতে প্রথম, চায়ের জন্যে দরকার সাতাশ ডিগ্রি উত্তাপ, দেড়শ সেমি বৃষ্টিপাত, চা উৎপাদনে ভারত প্রথম শুধু নয়, রপ্তানিতেও। উৎকৃষ্ট গন্ধ এবং স্বাদের জন্য দার্জিলিং-এর চা জগদ্বিখ্যাত।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিমের খিদে পায়। কুঠিবাজারের ভিতরে অনেক খাবারের দোকান, যা দ্যাখে মহিমের তা-ই খেতে ইচ্ছা করে, একসময় শালপাতার ঠোঙায় মুড়ি আর রঙিন বোঁদে তার দিকে এগিয়ে দেয় বাবা, যেন অমৃতের স্বাদ নিচ্ছে এমন পরম যত্নে মহিম একটি একটি করে মুড়ি-বোঁদে খেতে থাকে।

অবেলায় রান্নার আয়োজন করতে থাকে সবাই। মহিম তাকিয়ে দ্যাখে সেই পোড়ো বাড়ির উঠোন, যেখানে প্রতি বছরই তারা রান্না-খাওয়া করে আসছে। এখনও উনুন আছে, কাঠ কয়লার দাগ। মাকড়সার জাল সরিয়ে পরিষ্কার করে ফেলা হল জায়গাটা, বড়ো হাঁড়িতে ভাত চড়ানো হল উনুন ধরিয়ে। ভাত, আলু ভাতে, মুসুর ডাল আর চিংড়ি মাছ। বড়ো বড়ো চিংড়ি মাছ কেনা হয়েছে অনেক। এখানে সবাই একটু উদার, গ্রামে যাদের কৃপণ বলে দুর্নাম আছে, এখানে তারাও চাঁদা দিয়েছে ভালোই। গাড়ি-পিছু একজন করে রান্নার কাজে লেগেছে, বাবা মহিমকে ডাকে, তার নতুন বই কিনে দেবে বলে। এই মুহূর্তটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিল মহিম। সে ইতিমধ্যে দেখে এসেছে, কোন্ বইয়ের দোকানের তাকে গ্লোব সাজানো আছে। ধানের ভালো দাম পাওয়া গেছে, যদি বাবা তাকে দয়া করে— যদি? বলা তো যায় না।

বুকলিস্ট দেখে দেখে বইয়ের দোকানের লোকটি বই এনে দেয়, মহিম একদৃষ্টে তাকের উপর রাখা গ্লোবগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। একসময় সাহস করে সে জিজ্ঞেস করে, কত দাম ওই গ্লোবগুলোর? লোকটা প্রথমে শুনতে পায় না, কিন্তু বাবা কথাটা শুনতে পায়। মহিম আর-একবার জিজ্ঞেস করে, কত দাম, ওই গ্লোবগুলোর? লোকটা গম্ভীর হয়ে মহিমের মুখের দিকে তাকায়। তুমিই একটু আগে এসেছিলে না দাম জিজ্ঞেস করতে? বললাম তো, প্লাস্টিকেরটা কম দাম, তিরিশ। মহিম লক্ষ করে, বাবা কোনও কথা বলছে না। লিস্ট অনুযায়ী বই মিলিয়ে নেয়। মহিম দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করে, এবার কি বলবে সে বাবাকে? খুব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হয়ে আসছে, বইয়ের প্যাকেট বাঁধা হল, বাবা কোমরের গেঁজেতে হাত দিয়েছে টাকা বের করার জন্যে, এইবার, এইবার সময়। কিন্তু মহিম বলতে পারে না, তার প্রোগ্রেস রিপোর্টখানা সামনে এসে সব কিছু আড়াল করে দেয়, তার চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে।

হঠাৎ মহিম শুনতে পায় বাবার গলা। বইয়ের দাম মিটিয়ে তিরিশ টাকা এগিয়ে দিচ্ছে বাবা, বলছে, ওকে একটা গ্লোব দিন তো।

পা থেকে মাথা পর্যন্ত অদ্ভুত একটা আনন্দের শিহরন খেলে যায় মহিমের। নিজের কানকে তার বিশ্বাস হয় না। অরিন্দমবাবুকে স্পষ্ট দেখতে পায় মহিম। যেন তিনি নিজে একটা গ্লোব বাড়িয়ে দিচ্ছেন মহিমের দিকে। আর ‘স্যার দিন’ বলে আলতো করে তুলে নিয়ে একটা নরম স্বপ্নময় গ্লোব বুকে জড়িয়ে ধরছে মহিম।

খুব ঝাল দিয়ে মাখা হয়েছে আলুভাতে। চিংড়ি মাছেও ঝাল। মহিম এত ঝাল কখনও খায়নি। তবু একটুও কষ্ট হয় না তার। গাড়ির তলায় শালপাতা পেতে প্রচুর ভাত সুপসাপ করে খেয়ে নেয়। বাবা নিজের ভাগ থেকে চিংড়ি মাছ তুলে মহিমকে দিতে যায়। মহিম নেয় না। বরং তার ইচ্ছে হয়, সে তার নিজের মাছগুলো সব বাবাকে দিয়ে দেয়। প্রত্যেকটা গাড়ির মওড়া তোলা, যে যার গাড়ির তলায় খেতে বসেছে। রান্নার প্রশংসা করছে দু-একজন। কিন্তু মনে হয় সেসব কথা কানে যাচ্ছে না কারও। প্রত্যেকের খুব খিদে পেয়েছে, তাই গোগ্রাসে খেয়ে যাচ্ছে সবাই। দু-একজন ভিখিরি কান্না কান্না গলায় খেতে চাইছিল, মহিম তার পাতা থেকে কিছু ভাত দেয় একজনকে।

খাওয়াদাওয়ার পর যখন সবাই একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, গাড়ি ছাড়তে দেরি আছে একটু, মহিম একা একা বেরিয়ে পড়ে। কুঠিবাজার পেরিয়ে সরু গলি, গলি ছাড়িয়ে নদীর ধার ধরে গিয়ে ওঠে বড়ো ব্রিজের উপরে। ঘাটাল এবং পাঁশকুড়ার রাস্তাকে যোগ করেছে এই সেতু। মহিম রাস্তার দিকে তাকায়। এই রাস্তা চলে গেছে পাঁশকুড়ার দিকে। সেখানে রেলস্টেশন, সেই রেললাইনের একদিকে হাওড়া-কলকাতা, অন্যদিকে খড়গপুর। খড়গপুর থেকে ভারতবর্ষের নানাদিকে চলে গেছে রেললাইন, কলকাতা বিমানবন্দর থেকে রোজ প্লেন ছেড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর নানা দেশে। সেসব দেশের নাম লেখা আছে ভূগোলের পাতায়, সেসব দেশের অবস্থান দেখেছে সে মানচিত্রে। ওইসব দেশ দূরে থাক, মহিম জানে না, ঘাটাল থেকে পাঁশকুড়া— এই দূরত্বটুকুই কখনও অতিক্রম করতে পারবে কি না। তবু প্রতিবার শীতকালে এই একবার অন্তত এই ব্রিজের উপর দাঁড়াতে পারবে, একবার অন্তত তাকিয়ে থাকতে পারবে এই রাস্তার দিকে, যে-রাস্তা চলে গেছে তার প্রিয় মানচিত্রের পৃথিবীর দিকে।

এরপর নিজেদের গাড়ির কাছে ফিরে আসবে মহিম। একসময় গাড়ি ছেড়ে দেবে। আর গোরুর গাড়ির ছইয়ের নিচে আলো-আঁধারের মধ্যে প্রাণপণে গ্লোবটা ঘোরাতে থাকবে সে। দেখবে এখানে তার গ্রাম, বলরামপুর হাইস্কুল, তিন ক্রোশ দীর্ঘ মাঠ, কোনোটাই নেই।

তবু মহিমকে সেখানেই ফিরে যেতে হবে।

৪টি মন্তব্য:

  1. রাধানাথ মন্ডলের গল্প কোনও প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে জানা যাবে?

    উত্তর দিনমুছুন
  2. রাধানাথ মণ্ডলের গল্প কোন প্রকাশনী ঠেকে প্রকাশিত হয়েছে জানা যাবে?

    উত্তর দিনমুছুন
  3. রাধানাথের গল্পের মতোই বাংলা গল্প মানচিত্রে আমরা রাধানাথকে খুঁজে বেড়াই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর জুড়ে। কখনো কখনো এভাবেই আমরা তাকে পেয়ে যাই।আমাদের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় আনন্দের অশ্রু,এক অন্য শিহরণ। 'শীতের মানচিত্র'এরকমই এক শিহরণের গল্প।
    - প্রবুদ্ধ মিত্র

    উত্তর দিনমুছুন
  4. রাধানাথ মণ্ডলের গল্পগুলি বহু বছর আগে সংবাদ নামের একটি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন আর কোথাও পাওয়া যাবে কিনা জানা নেই।

    উত্তর দিনমুছুন