বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

রুমা মোদকের লেখা : ছেড়ে দাও আমার হাত আমি দেশহীন

"সেই নাগরিক জীবন 
পিছনে ফেলে 
সব থেকে দ্রুত ট্রেনে করে আজ 
এখানে আসা 
এই আসানসোল"( সুভাষ মুখোপাধ্যায়) 

আমি হবিগঞ্জের জালালি কইতর একদিন ওড়েছিলাম নিদারুণ এক নগরের মোহে, একটু আশ্রয়ের জন্য। অতপর কতো ত্রস্ত দৌড়, কতো বন্ধ দরজার সামনে ভিখেরির শেষ আশার আঁখিপল্লব! আমাকে নেয়নি সেই নির্দয় ইটকাঠ, রহস্যময়ী নিয়ন আর নির্ঘুম সংগ্রাম। নেয়নি। অবশষে যুদ্ধক্লান্ত বিধ্বস্ত ডানা ভেঙে পড়েছিলাম আবার এই হবিগঞ্জেরই ওপর। 

জীবন আমার কাছে আসলে এক অসহ্য তপ্ত দুপুরে শ্রান্ত তৃষার্ত ঠোঁটের কাছে তুলে ধরা একগ্লাস বরফ ঠাণ্ডা জল,কী তুমুল প্রতীক্ষার....কী প্রবল আকাঙ্ক্ষার।ভেতরের তীব্র তাড়া তৃপ্তির কাছে আত্মসমর্পণের, হঠাৎ সেখানে ওড়ে এসে আত্মবিসর্জন দেয় এক বোহেমিয়ান মাছি।আহা, ভেতরের প্রবল তৃষ্ণার মৃত্যুসম অসহায়ত্ব মেনে নিয়ে সেই জল ছুঁড়ে ফেলি মাটিলেপা উঠানে,তারপর আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই সেই ছুঁড়ে ফেলা জলের নিজস্ব পথ তৈরি করে করে এগিয়ে যাবার চলার গতি।নিয়ন্ত্রণে নেই আমাদের কারোরই। 

প্রকৃতি এক নিষ্ঠুর নির্দয় অন্ধ হিসেবী বুড়ো। মহাকালের ঘরে এঁকে যাচ্ছে হিসাবের ছক,অলক্ষ্যে,জানার অতীতে।আর আমরা যেনো তার সুতোর রাস টেনে ধরে রাখা দমের পুতুল।অদৃশ্য সেই সুতোর টানে আমরা কেবল ঢুকে পড়ি তারই সাজানো ছকে। যতো চেষ্টা জীবনের,যতো আয়োজন সব বৃথা তার হিসাবের কাছে। আমি সাজিয়েছি স্বপ্ন ভবিষ্যতের কাঙ্ক্ষার বাঁক ছুঁয়ে ছুঁয়ে, হয়তো চেষ্টার ক্লান্ত ছায়া মেখে,প্রেমিকের হাতে হাত রেখে।কোথাও রাখি নি কোন খুঁত বেহুলার বাসরের মতো চুল পরিমাণ। তবু জানি না, কেউ জানতে পারে না, হঠাৎ কোন ফাঁক গলে এক ক্ষীন জলের স্রোত প্রবেশ করে ভাসিয়ে নিয়ে চলে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের রূপান্তরে। প্রানপণ বাঁধার বাঁধ নিমিষে ভেঙেচুরে অতপর কালের স্রোতে ভেসে চলা নিতান্ত লতাপাতা এই জীবন! কোথায় গেলো কোন অজানায়, নালায় না মহাসমুদ্রে বড়োই অপ্রয়োজন তার হিসাব কালের কাছে। 

"আমার পথ এখন মাটি থেকে আকাশের দিকে মোড় নিয়েছে 
ঐতো মেঘ, বৃষ্টি ও বিদ্যুৎ 
চমকের মহড়া দেখেছি 
দেখেছি ধূসর চন্দ্রমণ্ডল" (আল মাহমুদ) 

দ্বিতীয়বার নগরমুখী হবার কোনো কারণ ছিলো না আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি ছিলো,সামনে সুপ্রতিষ্ঠিত সুযোগ্য পাত্রের সয়ম্বরা হবার সুযোগ ছিলো। তবু সে অন্ধকারে দেখে কোন ভূত? এই নগরে ফেলে গেছি আমি এক প্রেমিকের মতো অতীত, নববর্ষার জলে সতেজ হয়ে থাকা ঘাসের মতো কিছু স্মৃতি। স্মৃতিতে ফিরতে হয়না কখনো, কিংবা স্মৃতিরা ফেরে না কখনো নিজের আনন্দের মণিকোঠায়। তবু মানুষ বারবার স্মৃতির কাছেই যায় আনন্দের মধুর সন্ধানে। আমার স্মৃতিতে ছিলো বিষ। করবীর বীজের মতো। ফোটে থাকা মোহের অন্তরালে সমাজ সংসারের অসম্ভব দূরত্বের বিষ। নীলকন্ঠ অভিজ্ঞতায় আবার কেনো ফেরা চাই আমার? প্রশ্নবোধকটা বিবেচনা আগলে দাঁড়িয়ে থাকে। 

আজ যখন পিছন ফিরে তাকাই, তখন ঠিকঠাক খুঁজে পাইনা এই নগরমুখী যাত্রার যৌক্তিক ব্যাখ্যা। আচ্ছা ব্যাখ্যার ব্যাকরণে কী জীবন চলে? নাকি চলেছে কোনোদিন? স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেখি এক একটা অস্থির সাপ....দংশনে দংশনে বিষাক্ত নীলে ছেয়ে যাচ্ছে আমার আত্মসম্মান, ব্যক্তিসত্তা। আর পাঁচটা সাধারণ নারীর মতো সরল নয়তো আমার প্রাপ্তির হিসাব। এই বৈষয়িক প্রতিপত্তি, নিশ্চিত সোনার খাঁচার জীবন নয়তো কাঙ্ক্ষা আমার। পালাতে হবে এর থেকে। পালাতে হবে। পালিয়ে বাঁচতে হবে। 

অকৃত্রিম সাথী ছিলো কিছু স্বপ্ন। লেখক হবার স্বপ্ন। স্বপ্নের মতো এই সাথী আমার দিয়েছে সাহস। আর দুঃসাহসী আমি সেই সাহসে ভর করে চেপে বসি নগরমুখী এক ট্রেনে,জানি বটে নগরেই নেবে সে। কিন্তু ছাদহীন এই শহর আমাকে নেবে কি না আমি জানি না। আমি জানি না এসে থাকবো কোথায়, রাখবো কোথায় স্বপ্নের ঝুড়ি! জানি না কোথায় ঠিকানা মিলবে আমার! 

মফস্বলের চৌকাঠ যখন ডিঙাই, তখন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যহীন এই ঘর ছাড়া বড়ো স্পর্ধার কাজ বৈকি! পিছন ডাকছিলো মায়ের মধ্যবিত্ত মানসিকতার টানাপোড়েন,কুয়াশা মোড়া অষ্পষ্ট পথের মতো বাবার অসহায় দৃষ্টি। এমন সৃষ্টিছাড়া মেয়ে দেখে অনভ্যস্ত কৌতুহলী পাড়া পড়শির কানাকানি ছিলো,হুল ফোটানো ইংগিত ছিলো। আর সব তুচ্ছ করে নগরমুখী অভিযান যেনো এক বিপ্লবের নেশার মতো অদম্য আকর্ষণ হয়ে টানছিলো আমাকে। 

এর আগে এই নগরে এসেছিলাম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রী হয়ে। বড়ো অহংকারের ছিলো সে যাত্রা। আমি জানতাম পরম কাঙ্ক্ষিত এক স্বপ্নের ভুবন অপেক্ষায় আছে আমার। আছে হল জীবনের মতো প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ গায়ে মাখার মতো শিহরণ। অপরাজেয় বাংলার পিছনে বিভাগ আর সামনে উঁচু বেদী সব তখন আমার। আমি এক সনাক্ত চিহ্নহীন সম্রাজ্ঞী সুউচ্চ গর্বে রাখছি পা এই নগরীর বুকে। সেই টি এস সি, সেই মধুর কেন্টিন স্বপ্নের ভুবনগুলো সত্য অবয়বে মিশে যাচ্ছে আমার দৈনন্দিনতায়। এ এক অন্য জীবন। জীবনের মাঝে মিশে থাকা অন্য এক শ্রেষ্ঠ জীবন। 

কিন্তু এই দ্বিতীয়বার আসা যে দৃশ্যমান কারণহীন। কে কবে কোথায় শুনেছে লক্ষ্য উদ্দেশ্যহীন কোনো স্বপ্নের টানে এক মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের নারী ছেড়ে আসে তার নিশ্চিত ভবিষ্যতের সুনির্দিষ্ট গন্তব্যরেখা! অথচ আমি এলাম। অদম্য এক টানে ঝাঁপ দিলাম বিভ্রান্ত ভবিষ্যতে। 

অদম্য সেই টানে যখন স্টেশনে পা রাখলাম সামনে তখন অনির্দিষ্ট অন্ধকার। আমি কেনো এসেছি, আমি কোথায় যাবো, কই থাকবো? এই নগরে চলার বিশাল ব্যয়ভার কোত্থেকে আসবে? কিছুই জানিনা আমি। আমি পা বাড়ালাম এক মহাশূন্যতায়। অতল,গভীর শূন্যতা! আমার হাতে কয়েকখানা সার্টিফিকেট ছাড়া কিচ্ছু নেই সম্বল যে পথ খুঁজবো অবলম্বন করে। কোন অভিজ্ঞতা নয়, কোন প্রশিক্ষণ নয়, কোন স্পেশালিটি নয়। কিচ্ছু না। আর যে কয়খানা সার্টিফিকেট তা হাতে নিয়ে এই নগরে হাঁটছে কতো সহস্র বেকার যুবক-যুবতী! 

কিন্তু! কিন্তু কী আশ্চর্য যেনো অলৌকিকভাবে তখনই একটা চাকরি জুটে গেলো আমার। হয়তো যোগ্যতায়, হয়তো ভরসা না রাখা ভাগ্যেই।দৈনিক পত্রিকা অফিস। আমি গেলাম,সম্পাদক কথা বললেন। ধরিয়ে দিলেন নিয়োগপত্র। আমিতো হতবাক! তবে কী এই নগরী নিয়েছে আমাকে? তবে কী মহাকাল এই নগরে রেখেছে আমার স্থান নির্দিষ্ট করে? কী আনন্দ আমার! কী উচ্ছ্বাস। আমি পেয়েছি.....পেয়েছি ঠিকানার সন্ধান,পথের দিশা। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে আমি পথ দেখে নিলাম পলকে। এবার আমার দেখানোর পালা টিকে থাকার যোগ্যতা। মফস্বল থেকে ওঠে আসা অভিজ্ঞতাহীন নারী আমি। ইন্টার্ভিউর দিন সম্পাদক জানালেন আমার তিনটি অযোগ্যতার কথা। দেশের প্রেক্ষাপটে আমি হিন্দু। বর্ণবাদের প্রেক্ষাপটে আমি বাদামী, আর কালের প্রেক্ষাপটে আমি নারী। আমাকে নির্বাচিত করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন তিনি, দেখো কতোটা পারো নিজেকে প্রমাণ করতে! 

নিজেকে প্রমাণের কী ক্লান্তিহীন শ্রম অতপর ,দিন-রাত এক করা শ্রম। সকল ভালোবাসা আর যোগ্যতার সংমিশ্রণজাত চেষ্টা! পারতে হবে আমাকে। পারতে হবে।হারলে চলবে না। পরাজিতদের কেউ মনে রাখেনা। কেউ জানতে চায়না পরাজয়ের ইতিহাস। পরাজিত আমাকে ফিরে যেতে হবে বাঁধা ঠেলে ফেলে আসা মফস্বলের সীমায়িত জীবনে। সেখানে আমার কোনো সাথী নেই। আমার বৌদ্ধিক উচ্চতার সাথে পাল্লা দিয়ে ভাগাভাগি করার কোনো সুহৃদ নেই। অপরাজেয় বাংলার নীচ থেকে শ্লোগান ধরা মেয়ে আমি, শহীদ রাজুর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে হাঁটা মেয়ে আমি। আমি কী করে আবার ঢুকে পড়ি ব্যঙ হয়ে পরিত্যক্ত কূয়ায়?আমাকে হারলে চলবে না। আমার নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। 

না হারিনি। প্রমাণ করতে পেরেছি অল্পদিনেই, অভিজ্ঞতাহীন পেশায় আমি নিজেকে প্রমাণ করেছি নিজের যোগ্যতায়। অর্জন করেছি পেশাগত যোগ্যতার চেয়ার।নিজের জায়গা তৈরি করেছি নিজে। সব অযোগ্যতা অস্বীকার করে। সময়টা ছিলো বটে,কয়েকটা মাস মাত্র,তবু শময়টা ছিলো নিজেকে প্রমানের। সময়টা ছিলো আত্মবিশ্বাসটুকু নিজের ভেতরে প্রক্রিয়াজাত হবার। 

কাজ করছি আর ভেবেছি খালি একটু শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াক পায়ের তলার মাটি। তারপর খুঁজবো স্বপ্নের চাবি।সে স্বপ্নের তাড়া এ অবধি নিয়ে এসেছে আমাকে। প্ররোচিত করেছে সাহসী হতে। ঝুঁকি নিতে জীবনের। 

কিন্তু টের পেলাম, যতোটা সহজ ভাবা, ততোটা মসৃণ নয় জীবনের স্বপ্নরথের চলার পথ। পেশাগত সফলতা আর ব্যক্তি জীবনের ক্রমাগত ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া,দুই বৈপরীত্য ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে আমাকে। আঁকড়ে থাকা, জড়িয়ে থাকা প্রেমিক আমার আত্মার মতো....তার আহবানে উত্তাল আমি থমকে দাঁড়াই মায়ের অশ্রুময় দৃষ্টির স্মরণে। জীয়নকাঠি প্রেমিক আমার উন্মত্ত কাঙ্ক্ষা তার বুঝে না আমার অসহায়ত্ব! হায় একী যাপন আমার একী অগ্নিপরীক্ষা জীবনের! স্বপ্নেরা অবকাশ পায়না সেই অস্থির সময় গলে স্পর্শ করবে পূরণের কাঙ্ক্ষা। কেবল মাথা ঠুকরে মরে অপারগতার পাথর শক্ত দেয়ালে। 

আমাকে একা এই নির্দয় নগরীতে ফেলে রাখার আশঙ্কা তাড়িত বাবা একদিন নিজেই চলে আসেন আমার কাছে। আমি সারাদিন অফিস করি, বাবা বসে পাহাড়া দেয় আরামবাগের একরুমের ছোট্ট ঠিকানা। দিনমান কাজ করি আর আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় অপরাধবোধ। আমার ষাটোর্ধ বাবাকে আমি দিয়েছি এই বন্দী জীবন? একী উচিত কাজ আমার? কী করবো আমি? আমার বাবা এই নগরীতে আভিভাবকহীন ফেলে যাবে না আমাকে। তবে কী আমি ফিরে যাবো? ফিরে যাবো মফস্বলের সেই একঘেয়ে সংগীহীন আপসের সাধারণ জীবনে? মানসিক শান্তিহীন এ যে হবে মৃত্যময় জীবন আমার! 

কিন্তু এখানেই কী আছি অপার মানসিক শান্তি নিয়ে? পেশাগত জীবন যদিও বা স্থিত তখন, ব্যক্তিজীবনে অসম এক মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত দিন যাপন।হায় সে দিন! অসহায়, সমাধানহীন জীবন আমার স্বপ্নের পথেও দেয় না এগুতে। সবকিছুর উর্দ্ধে এই লেখক হবার স্বপ্নই না আমার সাহসের একমাত্র নিয়ামক। কিন্তু আমি নিজেকে আবিষ্কার করি এক বগিচ্যুত ইঞ্জিন চলছে বেমালুম সমান্তরাল লাইন ধরে ড্রাইভারের নিয়ন্ত্রণহীন, খুব দূরে নয় এর থমকে যাওয়া, উল্টে পড়া! 

কে জানে এ হয়তো অবধারিত প্রকৃতির ছক। হঠাৎ পুরো আকাশটা আমার মাথায় ভেঙে দিয়ে দৈনিকটি বন্ধ হয়ে যায় একদিন। আমি প্রমাদ গুনি ! এখন কী হবে আমার!! আমার জন্য এতো কেবল চাকরি হারানো আর চাকরি খোঁজার সহজ সমীকরণ নয়। এই যে সব অগ্রাহ্য করে চলে আসা , বুঝি ভেঙে গুড়িয়ে যায় সব আত্মবিশ্বাসের দেয়াল! ভেস্তে যায় অন্তরের লালিত স্বপ্ন! শুরু হয় লখিন্দরের লাশসম আমার এই নগরিতে টিকে থাকার ইচ্ছে নিয়ে বেহুলা হয়ে ঘাটে ঘাটে নোঙর। হায়রে জীবন, হায়রে অভিজ্ঞতা.....। কেউ, একটা কেউ একটা দেশলাইকাঠি জ্বালিয়ে এর মৃদু আলোতেও বলে না, ঐ যে সামনে একটা পথের অস্পষ্ট রেখা........। আমি আমার স্বপ্ন লখিন্দরকে নিয়ে দেখি কোনো হোক অচেনা তবু নিরাপদ ঘাট! সব ঘাটেই ওৎ পেতে থাকা মুখোশ পরা সব উপকারেচ্ছুক সব প্রতারকেরা। আমি ঘুরি,ঘুরে মরি অন্ধকার অন্ধকূপে। এই নির্দয় শহরকে খুব চেনা হয় আমার, খুব জানা হয় অমানবিক এই নগরীর ইট কাঠ পাথর- দয়া-মায়াহীন ফিরিয়ে দেয়ার নির্বিকার নির্লিপ্ত নগরীকে। আর তখন জানা হয় আত্মার সাথে মিশে থাকা প্রেমেরা যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা সত্য নয় সবসময়। পাওনা-দেনার হিসাবহীন কোনো প্রেম নেই পৃথিবীতে। হয়না। 

আমি ফিরি,ফিরি পরাজিত আমি, ফিরি বিপর্যস্ত আমি,ফিরি আত্মবিশ্বাসহীন আমি। বাবা-মা অবশ্য স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।পড়শিরা কী মুখ টিপে হাসে? বিদ্রুপের হাসি? চেনা মানুষগুলোর চোখে কী উপহাসের দৃষ্টি? বিভ্রান্ত পর্যদুস্ত আমি বারবার পথ খুঁজে মরি চোরাবালিতে। একী জীবন আমার! এ কেমন জীবন!! 

হয়তো মহাকাল তার সিন্দুক খুলে আরেকবার দেখে আমার জন্য কেটে রাখা ছকখানা। আমি এক দম দেয়া পথ হারানো পুতুল, দেখি ঠিক ঠিক আমার সম্মুখে দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে বন্ধুর এক একটি চলার পথ। হোক বন্ধুর। পথতো বটে! প্রবল আত্মবিশ্বাসের জোরে ওঠে পড়ি সেই বন্ধুর পথে। শুরু করি পুণরায় আমার কচ্ছপ যাত্রা। পা ছিলে যায়, ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ি। আবার ওঠে দাঁড়াই। না আমাকে চলতে হবে। আমার কোনো গন্তব্য নেই,পৌছানোর তাড়া নেই। শুধু জানি আমাকে চলতে হবে.....চলতে হবে.....। থেমে যাওয়ার নামই কেবল পরাজয় হতে পারে।পরাজিতদের মনে রাখেনা নির্মম মহাকাল। পরাজিতরা বাঁচে পতঙ্গের জীবন।আমাকে বাঁচতে হবে মানুষের জীবনে। 

আমিতো একাত্তরে শরনার্থী শিবিরে ডায়রিয়ায় মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া মৃত্যঞ্জয়ী শিশু, বালিকাবেলায় সাঁতার শিখতে গিয়ে ডুবে মরা থেকে বেঁচে যাওয়া বেহায়া বালিকা। আমাকে কি হারলে চলে এই বড়োবেলার ঝড়ে? 

মফস্বলের সব প্রতিবন্ধকতার কাঁটা আমি ফুল করে তোলে নেই ঝুড়িতে। প্রচলিত পুঁতিগন্ধময় চলার পথকেই অপ্রচলিত চন্দনের সুবাসে ভরিয়ে তুলতে ছেড়ে দেই জীবনের অনেক বিত্ত বৈভবের নেশা। এও মহাকালের অলক্ষ্য হিসাব হয়তোবা! আমার হতাশার শূন্য পাত্র ভরে ওঠতে থাকে অমূল্য প্রাপ্তিতে। হয়তো বৃহৎ কিছু নয়,তবু সেই বছর বছর আগে দেখা স্বপ্নের মতো মধুময়। আমার প্রত্যাশার মতো আনন্দময়। আমি টের পাই আমি চলতে এসেছি। চলছি। আর এই অবিরাম চলার নাম জীবনের জয়। 

আজ যখন এই নগরী আমাকে সেই সুদূর মফস্বল থেকে ডেকে পাঠায় বৃহৎ মঞ্চে, স্বীকৃতির নির্মাল্য তোলে দেয় গলায়,আজ যখন দেখি আমি এই গ্রহের বুকে দাঁড়িয়ে আছি নশ্বর জীবন নিয়ে কেবলই আমার তাড়িত স্বপ্নের পরিচয়ে তখন করুনা করি সেই মুখ ঘুরিয়ে রাখা প্রতারক সময়কে। বুকে তোলে নেয়নি বলে হারিয়ে তো যাই নি। কে বলে নিজেকে নিজের নামে কিংবা সাফল্যের প্রতিনামে প্রতিস্থাপিত করতে হলে নিজেকে জাগানো ছাড়া আর কোন সোনার কাঠি রূপার কাঠি প্রয়োজন। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে তাই শুধু নিজেকেই জাগানোর প্রস্তুতি। 

যে স্বপ্ন দেখে সৃষ্টিশীল প্রান, তার কোনো দেশ নেই, নগর নেই, শহর নেই। রাজধানী ঢাকা কিংবা হবিগঞ্জ। আজ বড়ো আত্মবিশ্বাসে এই উন্মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলতে পারি 

"ছেড়ে দাও আমার হাত আমি দেশহীন 
শেষ দশার কবির মতো আকাশের দিকে 
আজান থেকে 
বাতাসে বিলীন হয়ে যাই।"(আল মাহমুদ) 

আমার কী কথা ছিলো, এই আটপৌরে জীবনের লক্ষ্মণগণ্ডির বাইরে কোন বেয়াড়া স্রোত খোঁজার? অর্থ বিত্তের নিরাপদ নির্ভাবনার এক খুঁতহীন ক্ষতহীন 'শূন্যে গঠিত হই,শূন্যে মিলাই' জীবনই তো কেবল জন্মের দায়। আজন্ম অন্তিমের দিকে যাত্রা। তবু কেউ কেউ অন্ধকারে ভূত দেখেতো! যে ভূত আমাকে চমকে দেয় বোধের ভেতরে। অতপর ক্ষরণমুখী ক্ষুব্ধতায় খুঁড়ে দেখতে চাই চারপাশের অজস্র ক্ষরণের গ্রান্ড ন্যারেটিভ,সামর্থ্য সীমিত, বহু খুঁজতে গিয়ে টের পাই অল্পই কিছু তুলে আনতে পারি কেবল। কলমে আর ক্ষরণের বেদনায় লেখা প্রতিটি অক্ষর শেষে জানি, 

" এই স্বরসাধনায় পৌঁছিল না বহুতর ডাক 
রয়ে গেছে ফাঁক।" (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) 

জীবনে জীবন যোগ করে আমি যে ঘুচাতে চাই অপূর্ণতা। পারি কিংবা না পারি সেই পূর্ণতা অভিমূখে ছুটে চলায় যেনো পিছিয়ে না পড়ি কভু। ছুটে চলাই আমি অনিবার্য সত্য জেনেছি কেবল। রিলেরেস জিতে গলায় নিতে চাইনি চ্যাম্পিয়নের মেডেল। পা ভেঙে অচল হবার আশঙ্কা ছিলো জীবনের সব বাস্তবতা ঘিরে। তাই আমি হেঁটেছি কেবল। এখনো হাঁটি। শুধু একটাই আফসোস, অকপট সব সত্যি বলার মতো, সব অন্যায় রুখে দাঁড়ানোর মতো বিপ্লবী হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। আমার মায়ের কথার মতো, না ঘরকা না ঘাটকা আর কবির ভাষায় "না বিপ্লবী না কবি " হয়ে থাকতে বাধ্য হলাম। 

তবু এই পঞ্চাশে দাঁড়িয়ে জানি সৃজনশীল সত্তার কাছে কতো মিথ্যে এই সাময়িক অপমান, অবহেলা, তাচ্ছিল্য, অবহেলা, প্রশংসা, সম্মান, এই শহর,নগর,দেশকালের ভাগ। 



1 টি মন্তব্য:

  1. আত্ম বিশ্লেষণ মানুষকে সঠিক দিশা দেখায় আর স্বপ্নহীন মানুষতো জড়ের সামিল।ভালো লাগলো তবে কিছু বানান ভুল আর সঠিক শব্দ না থাকায় খারাপ লাগছে ।

    উত্তর দিনমুছুন