বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

তন্বী হালদারের গল্প : জালাঙ্গীর গান অথবা গোখরো সাপের ভয়

- না-না-না, তুমি টিভি ঘোরাবে না। ‘কুসুম’ আমি দেখবোই। তারপর তুমি যা ইচ্ছা দেখবে। 

- আমি খবরের হেডলাইনগুলো শুনেই ঘুরিয়ে দেবো। 

- আমি এখন কিছুতেই ঘোরাতে দেবো না। 


টিভির পর্দায় ভেসে উঠছে তৈলাক্ত কালচে চেহারার একটা মুখ। সঙ্গে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। হাতে একটা মোটা বই।

- ম্যায় এয়ার হোস্টেজ বনুঙ্গি। 

দীপক লাইটার খুঁজতে নিচু হয়ে শো-কেসে হাত দেয়। 


টিভির দৃশ্যপট পাল্টায়। গোলাপি পোশাক পরা, গোলাপি চেহারার একটা মেয়ে গোলাপের পাপড়ির মতো হাসি ছড়াতে ছড়াতে সবুজ একটা মাঠের উপর দিয়ে যেন উড়তে উড়তে আসছে। মাঠের তীরের যত কাছাকাছি আসছে, দীপক দেখতে পায় - মেয়েটার পোশাকগুলো একটা একটা করে খুলে পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটা সম্পূর্ণ নিরাভরণ হয়ে পড়েছে। ঠিক সেই সময় মোটোর কালীর মন্দিরে সন্ধ্যা আরতির ঘণ্টা বেজে ওঠে - ঢং ঢং ঢং। 

বাইরের স্লেট-রঙা আকাশে বরফের কুচির মতো অসংখ্য তারা ছড়িয়ে আছে। প্রত্যেকটি তারা নিজস্ব দ্যুতিতে জ্বলছে নিভছে, নিভছে জ্বলছে। অন্ধকারের যে রূপ - তাকে আবিষ্কার করতে হয়। অনুভব করতে হয়। নিজেকে একা আলাদা ক’রে নিয়ে নিজের সাথে কথোপকথন করা যায়। এই যেমন এই মুহূর্তে – 

- কী হে দীপক, ওই আধফালি চাঁদের আলোর মতো যে যুবতীর অর্ধেক মুখ দেখা যাচ্ছে, সে তো তোমার বৌ। 

- তো কী হয়েছে! 

- ও তো অপূর্ব সুন্দরী। আজন্ম বালিগঞ্জের ঝাঁ-চক্‌চকে সতেরশো স্কোয়্যার ফুটে মানুষ। সি.বি.এস.ই.-র ছাত্রী, ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া গ্র্যাজুয়েট। দু’-একটা মডেলিং র‍্যাম্পেও হেঁটেছে। মগজে কিছু না-থাকায় ঠিক সুবিধা করতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু তোমার মতো সুন্দরবন এলাকার ধবধবিতে জন্ম বড় হওয়া মাছমারা পরিবারের ছেলে এহেন কস্‌মোপলিটনকে ভালোবাসলে কী ক’রে! শুধুই কি ওর রূপ! 

- হ্যাঁ সৌন্দর্য। সুন্দরকে ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। ওর ওই মাখনের মতো ত্বক, রেশম চুল, ঘন চোখ পল্লব। পাতলা ঠোঁট, আধো আধো কথা ... আমি পাগল হয়ে যাই। 

- মিঠু যদি এখন ম’রে যায়, ওর দেহটা তিনমাস মাটি চাপা দিয়ে রাখো, তারপর শরীরটা মাটি-ধুয়ে-যাওয়া কঙ্কাল। 

— স্টপ। ব্যস্ অনেক হয়ে গেছে। 

নিজের মধ্যে নিজেই হাঁফিয়ে ওঠে দীপক। জানালা দিয়ে সরাসরি তাকায় মিঠুর দিকে। মিঠু ‘কুসুম’-এর কোনো ক্লাইম্যাক্সে রয়েছে। চোখ বড় বড় ক’রে দেখছে। মুখ ভরা উৎকণ্ঠা। বড় রাস্তা দিয়ে হুশ্‌ ক’রে একটা রাত-চরা ট্রাক বেরিয়ে গেল। কোয়ার্টার চত্বরটা বড় বেশি নির্জন। জুনের আঠাশ তারিখ পেরিয়ে গেছে। এখনও বর্ষা নামেনি। অথচ আবহাওয়া দপ্তর অনুযায়ী আট থেকে দশ তারিখের মধ্যে বর্ষা নামে। মাটির বুকে দুধ নেই। আর মা মাটি — দুধ না-দিতে পারলে ফসল হবে কী করে? কী যে হবে কে জানে! চাকরি এবং জন্মসূত্রে মাটির কাছাকাছি থাকার জন্য কি চক্‌চকে মেট্রোপলিটন সিটি হাতছানি দিয়েছিল দীপককে? হয়তো - বা...। মনের ভিতর কেমন একটা চাপ-চাপ ব্যথা অনুভব করে দীপক। আর এই ব্যথার রেমিডি খুঁজতে আগামী কালকের অফিসের কাজের কথা ভাবতে চেষ্টা করে। অন্তর্দ্বয় কার্ডের লিস্টের ব্যাপারে খাদ্য ও সরবরাহ বিভাগের মহকুমা-নিয়ামকের সাথে একটা জরুরি মিটিং আছে। ওই অফিসের ইন্সপেক্টিং ইনচার্জকে নিয়ে এত মুশকিল। লোকটাকে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না। দিনের পর দিন মানুষকে ঘোরায়। স্টাফ শর্টেজ থাকায় একা শুধু একজন এস.আই.-কে নিয়ে পুরো জি.পি. সামলানো সত্যিই খুব কঠিন। তবু ব্যবহারটা ভালো করতে তো পয়সা লাগে না রে বাবা। দীপক ঘাড়টাকে বার-দুয়েক এদিক-ওদিক ক’রে উপরে তাকায়। অন্ধকার আকাশের বুকে ফুটকি দেওয়া তারারা যেন নক্সীকাঁথার হাট বসিয়েছে। 


টিভির ভলিউমটা হঠাৎ করে বেড়ে যায়। 

- ‘ডোলা রে, ডোলা রে, ডোলা ও ডোলা - মন ডোলা...’। 

দীপক সোজাসুজি ঘরের দিকে তাকায়। মিঠু খুব খুশি মনে টিভি দেখছে। ঠোঁট দুটি অল্প-অল্প করে নাড়ছে। মনে হয় তাল দিচ্ছে। দীপকের মনের ভিতর জলচুড়ি বেজে ওঠে — ‘ছেলেমানুষ!’ 

ঘরের দিকে পা বাড়াতেই ছটপাড়ুয়া গ্রামের ভিতর থেকে মাদলের দ্রিম্ দ্রিম্ দ্রিম্ শব্দের ধুন বেজে ওঠে। দীপক অন্ধকারে গ্রামের দিকটা খুঁজতে চেষ্টা করে। এই বোধহয় শুরু হলো জালাঙ্গীর গান। 

খেতে ব’সে মিঠু বলে — দ্যাখো দীপক তুমি এখানকার বি.ডি.ও., তুমি বললে ভালো মেড সারভেন্ট পাওয়া যাবে না এ আমি বিশ্বাস করি না। দুধিয়াকে আমি আর রাখতে পারবো না। 

দীপক ভাতের গ্রাস মুখে তোলে। সেই অবস্থাতেই বলে - ও তো মোটে আজ বিকেলে ছুটি নিয়েছে। 

- তা ব’লে এখন বাসন, এঁটোকাঁটা... আমি পারবো না। নাচতে যাবে আর আমি ব’সে ব’সে সেটা সহ্য করবো? 

- মিঠু তুমি বুঝতে পারছো না। ওদের এই জালাঙ্গীর গানের অনুষ্ঠান কিন্তু এন্‌জয়মেন্টের জন্য নয়। বহুদিন এই অঞ্চলে বৃষ্টি নেই। নিদারুণ দাবদাহ। শুষ্কতা। জলের স্তর কোথায় নেমে গেছে জানো? এটা একটা মিথ। ওদের এই জালাঙ্গীর গানের মাধ্যমে ওরা মেঘের দেবতাকে স্মরণ করে। 

- তা ব’লে উদম ল্যাংটো হয়ে নাচতে হবে! 

- মিঠু, এটা একটা প্রতীক। ঈশ্বরের কাছে সর্বস্ব নিবেদনের ভাষা। 

- রাবিশ! 

টিভির পর্দায় ব’লে ওঠে - 

আজকের বিশেষ বিশেষ খবর। মণিপুর আজও উত্তাল। অসম রাইফেল্‌স-এর বর্বরোচিত অত্যাচারের বিরুদ্ধে মণিপুরের সংগঠনগুলি প্রতিবাদ জানিয়েছে। মনোরমা থাংগামের মৃত্যুর প্রতিবাদে চিত্রাঙ্গদার দেশের বীর রমণীরা নিজেদের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলে পুলিশ-ব্যারাকের সামনে ফেস্টুন হাতে স্লোগান দিচ্ছে - “Indian army rape us.” 

দীপকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে - স্ট্রেঞ্জ্‌! 

মিঠু গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বলে – ছিঃ, ভাল্‌গার। 

দীপক সরাসরি তাকায় মিঠুর দিকে। 

মাছের গলুইয়ে সুতলি বাঁধতে বাঁধতে পিসিমা বলেছিল – বাবলু, বিয়েডা সোমানে সোমানে হওয়নই ভালো। 


মিঠু যেন কী একটা নাইটক্রীম ব্যবহার করে। এত মিষ্টি গন্ধ যে সারাদিনের রাগ অভিমান দুঃখ যা-ই থাকুক সব ভেসে যায়। তবু আজকের দিনের সুর আর তাল কিছুতেই লয়ের সাথে যেন মাত্রা রাখতে পারে না। 

- আমাকে তুমি কোলকাতা দিয়ে এসো। 

- মিঠু, আমার চাকরিটা ট্রান্সফারেব্‌ল। এর থেকেও ইন্টেরিওর জায়গায় থাকতে হ’তে পারে। একটু অ্যাডজাস্ট করতে চেষ্টা করো। 

- চাকরিটা তোমার। তুমি থাকো। আমি থাকবো না। 

- কী ছেলেমানুষের মতো কথা বলছো! তুমি আমার বৌ, তুমি আমার সাথে থাকবে না তো কোথায় থাকবে? 

- সেটাই চরম স্যাড যে তোমার মতো একটা গেঁয়ো অর্থডক্স জেলের ছেলে আমার হাজব্যাণ্ড। বাবা যে কী দেখলো তোমার মধ্যে, আর আমিও রাজি হয়ে গেলাম ... 

ছটপাড়ুয়ার মাঠের ভিতর থেকে দুধিয়াদের নাচগানের এক ধ্বনি ভেসে আসে এবং একই সঙ্গে দীপকের মনের পর্দায় ভেসে ওঠে স্কটিশচার্চ কলেজের অ্যানুয়াল ফাংশানে ভার্গবী দত্ত নাচ করেছিল ‘বঁধু কোন আলো লাগলো চোখে’। 

মিঠু বোধহয় একটু ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। দীপক বাঁ-কাতে শুয়েছিল। ডান-কাতে ফেরবার 

ইচ্ছা হয়নি। দীপকের তন্দ্রালু চোখে তখন ঝুরো ঝুরো বরফ ঝ’রে পড়ছে। দীপকের ট্রেনিং শেষ। পোস্টিং অর্ডার হয়ে গেছে। প্রথম পোস্টিং উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ ব্লক। বাবা-মা-পিসিমা কেউ রাজি নন দীপককে অত দূরে একা একা পাঠাতে। সবার ইচ্ছা বিয়ে ক’রে বৌ নিয়ে দীপক যাবে। দশই সেপ্টেম্বর ২০০৩-এর কোলকাতার মেসে ব’সে দীপক রবিবারের রবিবাসরীয় পড়ছে। হঠাৎ কী মনে হয়, ‘পাত্রী চাই’ কলামে চোখ বোলাতে থাকে। এক জায়গায় এসে আটকে যায় - 

মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরের একমাত্র পরমাসুন্দরী গ্রাজুয়েট (ইংরাজি মাধ্যম) কন্যার জন্য ডাক্তার / ইঞ্জিনীয়ার / অফিসার পাত্র চাই। পাত্র নিজেও যোগাযোগ করতে পারেন। ৯৪৩২১৭৮৯ - ২৪৯১৮৯৮। 

দীপক বার-দুয়েক বিজ্ঞাপনটি পড়ে। একটু চিন্তাও করে। 

তারপর উল্টোদিকের এস.টি.ডি. বুথ থেকে ফোনটা ক’রেই ফেললো। 

- হ্যালো। 

- হ্যালো। 

- আজকের আনন্দবাজারে বিজ্ঞাপনটা দেখে …। 

- আচ্ছা আচ্ছা বলুন। আপনি কে? মানে আপনি পাত্রের কে হন? 

—না, মানে, আমি নিজেই ......। 

- ও বুঝতে পেরেছি। আপনি কোন্‌ প্রফেশনে আছেন? 

—আজ্ঞে আমি W.B.C.S. পরীক্ষা দিয়ে ব্লক-ডেভেলপমেন্ট-অফিসার পোস্টে আছি। 

- আপনি তো কলকাতা থেকেই ফোন করছেন। কলার আই ডি তাই বলছে। আজ সন্ধ্যাতেই চ’লে আসুন না! 

- আজ সন্ধ্যায়? 

— কেন, অন্য কোনো কাজ আছে? 

— না, ঠিক আছে। 

- বালিগঞ্জের কোলাপুরী সেন্টারের ঠিক উল্টোদিকের রাস্তায় একটু গিয়ে বাঁ-হাতে তিনটে বাড়ির পরে, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্টের 2nd floor, রঞ্জিত দাস। 


সেদিন সন্ধ্যাবেলা স্যুটকেস থেকে সমস্ত জামাকাপড় ছড়িয়ে কিছুতেই আর পোশাক পছন্দ হচ্ছিল না। এই শার্টের সাথে ওই প্যান্ট নাকি ওই প্যান্টের সাথে এই শার্ট। 

সমস্যার সমাধান হতোই না, যদি না ভার্গবী এসে পড়তো। ভার্গবী মাঝেমধ্যে দীপকের কাছে আসতো বই নোট্‌স নিতে। কলেজ ইউনিভার্সিটি একই স্ট্রীমে পড়ায় ভার্গবীর সাথে একটু বেশিই বন্ধুত্ব ছিল দীপকের। একসঙ্গে ওরা W.B.C.S. পরীক্ষাতেও বসেছিল। ভার্গবীর হয়নি। ভার্গবী বলেছিল – আমার যদি ‘ডি’ গ্রুপেও লাগতো। আমার বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা যা, একটা চাকরির বড় প্রয়োজন ছিল। 

সেদিন খুব অবাক হয়েছিল ভার্গবী – ওমা দীপক তুই এত জামাকাপড় বার করেছিস, কোথাও যাবি? 

— হ্যাঁ, দ্যাখ্‌ তো, কোন্‌টা পরলে মানায়। 

ভার্গবী বেছে বেছে একটা পোশাক ঠিক ক’রে দেয় - এটা পর। কিন্তু কোথায় যাবি? 

- মেয়ে দেখতে। 

- কার জন্য? 

- আমার জন্য। 

- মানে! 

দীপক খবরের কাগজটা মেলে ধরে ভার্গবীর সামনে। লাল স্কেচ পেন দিয়ে মার্কা করা পরমাসুন্দরী পাত্রী। 

- কিন্তু তুই কীজন্য এসেছিলিস? 

ভার্গবী আর ঠিক মনে করতে পারে না কীজন্য এসেছিল। একটু ভেবে বলে — এমনি এলাম। যাই তাহলে। তুই তো খুব ব্যস্ত। 

ছোট আয়নায় চুলে ব্যাক্‌ব্রাশ করতে করতে দীপক বলেছিল — আচ্ছা। 

ভার্গবী আর কোনোদিন আসেনি দীপকের কাছে। দীপক শুনেছিল ভার্গবী আজ পর্যন্ত সরকারি চাকরিও পায়নি। তবে তারপর বেসিক ট্রেনিং নিয়ে বসিরহাট লাইনে কোনো একটা প্রাইমারি স্কুলে ছোট ছোট বাচ্চাদের স্বরে অ – স্বরে আ শেখাচ্ছে। 

বাঁ-পাশটা ব্যথা ব্যথা করাতে ডান পাশ ফেরে দীপক। মিঠু ঘুমিয়ে পড়েছে। নাইটল্যাম্পের লাল আলো ওর লাল রঙের রাত্রিবাস ও মুখের উপর প’ড়ে কেমন মায়াবী করে তুলেছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে দীপকের মান-অভিমান পাওয়া-না-পাওয়ার ব্যথা-অনুশোচনা বিলীন হয়ে যায়। না-বলা এক কোমল আর্দ্রতায় ঘুমপরীরা তাকে ডেকে নিয়ে যায়। — মিঠু আমার সোনা! 

ধড়মড় ক’রে ঘুম ভাঙে দীপকের। 

ঘড়ির দিকে ফিরতেই ... সাতটা বেজে গেছে! মিঠুকে যতটা পারা যায় ঘরের কাজে একটু সাহায্য করা দরকার। বেচারী ঠিক পেরে ওঠে না। তবু তো আগেই উঠে গেছে বিছানা থেকে। ঠিকে কাজের মাসী আজ সকালে কি আসবে? মোটোর কালিবাড়িতে সকালবেলা দুধিয়াদের উদ্দেশ্যে হাঁস বলি দেওয়া হবে। ওইসব না-দেখে কি আসবে? দীপক একটু মনে করতে চেষ্টা করে, শেষ কবে খেয়েছিল হাঁসের মাংস। বনগাঁয় ভার্গবীদের বাড়ি হঠাৎ ক’রে গিয়েছিল দীপক - ভার্গবী বেশ ক’দিন ইউনিভার্সিটি না-আসায়। ভার্গবীদের একটা রাজহাঁস ছিল, সেটাই রান্না হয়ে গেল সেদিন। ভার্গবীর জ্বরও ভালো হয়ে গেল দীপককে দেখে। রূপছায়া হলে ম্যাটিনি শোয়ে ভার্গবীর ছোট ভাই, ভার্গবী আর দীপক সিনেমা দেখতে গিয়েছিল ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’। 

ছোট্ট একটা শ্বাস ফেললো দীপক। রান্নাঘরে মিঠু নেই। তাহলে বোধহয় বাথরুমে। পুরানো দিনের কোয়ার্টারের জন্য বাথরুমটা কোয়ার্টার সংলগ্ন না-হয়ে ছোট্ট উঠোনটার ওপারে। তবে আধুনিক সুখ-সুবিধা সবই আছে। শাওয়ার, হ্যাণ্ড শাওয়ার, গীজার, কমোড। রান্নাঘরে গিয়ে চা-টা বানিয়ে ফেললো দীপক। বারান্দায় এসে দ্যাখে খবরের কাগজ দিয়ে গেছে। কাগজের প্রথমপৃষ্ঠা জুড়ে মণিপুরের সেইসব প্রতিবাদী মায়েদের নিরাভরণ দাবি – ‘Indian army rape us’ দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। মোটোর কালিমন্দির থেকে উলুধ্বনি ভেসে আসে। 

ঠিক সেই সময় তিন-চারটে লোক লাঠিসোঁটা হাতে দৌড়োতে দৌড়োতে কোয়ার্টারের উঠোনে উপস্থিত হয়। 

- বাবু সাপ ঢুকিছে। 

- গোখরো সাপ। 

- হুই ঘরে। ঘুলঘুলি দে। 

আঁতকে উঠে লাফিয়ে উঠোনে নেমে আসে দীপক। মুখ উঁচু করে বাথরুমের দিকে দ্যাখে, ভেন্টিলেটারের এপাশে বিগদ খানেক সরু ছাইরঙা লেজ দেখা যাচ্ছে। একটু একটু দুলছে। দীপক আর্তস্বরে চিৎকার করে ওঠে — মিঠু বেরিয়ে এসো। বেরিয়ে এসো মিঠু। ভেন্টিলেটার দিয়ে বাথরুমে সাপ ঢুকেছে মিঠু। গোখরো সাপ। 

খোলা শাওয়ারের নিচে সমস্ত পোশাকের মুক্তি দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিজেকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল মিঠু। চিৎকারটা কানে আসতেই চোখ মেলে দ্রুত। মাথার উপরে শাওয়ারটাকে পেঁচিয়ে হিস্‌হিসানি গোখরো সাপের। 

দীপকের গলার স্বর বিকৃত হয়ে যায় – মিঠু ছিট্‌কিনি খুলে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো। 

ক্ষিপ্রহস্তে ছিট্‌কিনি খুলে কোনোরকমে ছুট্টে বেরিয়ে আসে মিঠু। সম্পূর্ণ নিরাভরণ নিরাবৃত। জলসিক্ত উলঙ্গ যুবতী নারী। পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত শুধু একটা ভয়। তিরতির করে কাঁপছে। গোখরো সাপের ভয়। 

মোটোর কালিমন্দিরে খুব জোরে ঢাকে কাঠি পড়ে। দুধিয়াদের উদ্দেশ্যে প্রথম বলিটা বোধহয় হয়ে গেল। দীপক হাতে ধরা খবরের কাগজের প্রথম পাতাটা দিয়েই কোনোরকমে জড়িয়ে দেয় মিঠুকে। অনাবৃত, পীনোন্নত বুকের উপর মনোরমা থাংগামের দেশের মায়েরা। যারা কিনা বলতে পেরেছিল — Indian army rape us.



লেখক পরিচিতি
তন্বী হালদার
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।
কথাসাহিত্যিক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন