বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

জন শুপে'র গল্প: সুখে দুখে, করোনায় একসাথে: এক মা ও মেয়ের গল্প। ভাষান্তর: আশফাক স্বপন

গ্লেন্ডা জনসন হাসপাতালে মায়ের বিছানায় বসে মায়ের হাতটি নিজের হাতে নিল। মাকে বলল, ‘মা, বুঝতে পারছি তোমার যাবার সময় এসেছে। ঠিক আছে, মা, শান্তিতে ঘুমোও এবার।'

মা লিন্ডা হপকিন্স-এর বয়স ৮৩। নাকে নল দিয়ে অক্সিজেন যাচ্ছে। করোনার ফলে নিউমোনিয়া হয়েছে। তীব্র কষ্টে মুখ বিকৃত।

তবু লিন্ডা হাল ছাড়তে রাজি না। ‘আমি মরতে চাই না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে অবশ্য।'


মা আর মেয়ের চমৎকার জীবন কাটছিল ডেট্রয়েট-এ। দুজনের সম্পর্ক অন্তরঙ্গ, গভীর। একসাথে থাকা, একসাথে বেড়ানো, একসাথে গীর্জায় উপাসনা, একসাথে হই হই করে পার্টি করা। মার্চের শেষ দিকে দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়ে। একসাথে গাড়ি চালিয়ে চলে আসে নিকটস্থ রয়াল ওক শহরের বোমন্ট হাসপাতালে। পরীক্ষায় COVID-19 ধরা পড়ল। একই ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। একই সাথে দুজনে করোনার বিরুদ্ধে লড়ল। গ্লেন্ডা্ লিন্ডার একমাত্র সন্তান। মায়ের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে সে তার পাশে ছিল।

‘আমার স্বামী নেই, ছেলে মেয়ে নেই, ভাই-বোন নেই। এই পৃথিবীতে মা-ই ছিল সব,’ গ্লেন্ডা বলে। ‘আমার মনটা ভেঙ্গে একেবারে খানখান হয়ে গেছে।'


গ্লেন্ডার বয়স ৫৮। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সে লিন্ডার দেখাশোনা করত। সে বছর বাবা ক্লাইড মারা যায়। বাবা মায়ের ৫৭ বছরের সংসার। গ্লেন্ডা চাকরি ছাড়ল, শহরতলীর ফ্ল্যাট ছাড়ল। সব ছেড়েছুড়ে ডেট্রয়েট শহরের ব্যাগলি পাড়ার যে চার বেডরুমের বাড়িটিতে সে বড় হয়েছে, সেখানে থাকতে চলে এলো।

লিন্ডা ইউনিভার্সিটি অব ডেট্রয়েটে এক অফিসে কাজ করত। ক্লাইড এক সময়ে ডেট্রয়েট নগর প্রশাসনে প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করত। স্বামী-স্ত্রী দুজনায় সাড়া পৃথিবী ভ্রমণ করেছে। বাবার মৃত্যুর পর গ্লেন্ডা তার জায়গা নিল। মা আর মেয়ে হাওয়াই, সাউথ ক্যারোলাইনার হিল্টন হেড, ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো বেড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে যখন করোনাভাইরাস সবেমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে ছড়াচ্ছে, তখন ওরা লাস ভেগাস বেড়াবার একটা পরিকল্পনা বাতিল করে এক রাত ডেট্রয়েট-এর মোটর সিটি ক্যাসিনোতে কাটায়। সেখানে জুয়া খেলে, হোটেল ঘরে খাবার আনিয়ে খায়।

মা-মেয়ের নিবিড় সম্পর্কের বাইরে দুজনেরই নিজস্ব জগত ছিল। ব্যস্ততা ছিল। লিন্ডা রেড হ্যাট সোসাইটির সদস্যা ছিল, সেই সাথে বেশ কয়েকটা তাসের আড্ডার সাথে যুক্ত ছিল। সে নিজের গীর্জা ও পাড়ার লাইব্রেরিতে সক্রিয় ছিল। গ্লেন্ডা নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে সহায়তা করত। মার্চের গোড়ার দিকে তারা সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে দিল। তার আরেকটু পরে গ্লেন্ডা অসুস্থ হলো। এক সপ্তাহ পরে মা লিন্ডাও অসুস্থ হলো। প্রথম প্রথম ভেবেছিল ফ্লু। কিন্তু অসুখ আরো খারাপ হলো। দুজনেই চিন্তায় পড়ল। ২৮ মার্চ লিন্ডার জ্বর খুব বেড়ে গেল। ওরা ঠিক করল এবার হাসপাতালে যাবার সময় এসেছে।

বাড়ি থেকে বেরুতেই খুব কষ্ট। কাপড় পরা, সঙ্গে নেবার জিনিসপত্র গোছগাছ করতে গিয়ে একটু পর পর দুজনকে থেমে জিরিয়ে নিতে হচ্ছিল। হাসপাতালে যখন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন আসতে আসতে যাচ্ছিল। সঙ্গে গাড়ির কাফেলা। এক খালাত বোন, আরেকজন পড়শি – সবাই এগিয়ে দিতে এসেছে। বোমন্ট হাসপাতালে পৌঁছে জরুরি বিভাগে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পরীক্ষায় জানা গেল দুজনেরই করোনার সংক্রমণ ঘটেছে।

‘আমার মা কি আর বাঁচবে না?’ গ্লেন্ডা এক ডাক্তারকে আর্তকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু ডাক্তার কী বলবে? তখনো তো তারা করোনাভাইরাস সম্বন্ধে তেমন কিছুই জানে না।

দুজনেরই নিউমোনিয়া ধরা পড়ল। বোমন্ট হাসপাতালে ভিন্ন ভিন্ন তলায় তাদের থাকার বন্দোবস্ত হলো। প্রতিদিন দুজনের ফোনে কয়েকবার কথা হতো । গ্লেন্ডা ডাক্তার আর নার্সদের কাছে ঘন ঘন মায়ের খোঁজখবর নিত, যাতে মায়ের যত্নে কোন ত্রুটি না হয়। হাসপাতালে থাকার পঞ্চম দিনে তাদের কিছু না বলেই দুজনের এক ঘরে থাকার বন্দোবস্ত করা হয়। এর জন্য গ্লেন্ডা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করল। গল্পগুজব, একসাথে মুভি দেখা, বন্ধুবান্ধবদের ফোন করে ওদের সময় কাটতে লাগল। আস্তে আস্তে গ্লেন্ডা সুস্থ হতে লাগল। কিন্তু মায়ের ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, কিডনির সমস্যা। তার শরীর আরো খারাপ হতে শুরু করল। তার শ্বাস নেওয়া আরো কষ্টসাধ্য হতে লাগল। গ্লেন্ডা মাকে যথাসাধ্য সেবাযত্ন করে কীভাবে আরেকটু আরামে রাখা যায় সেই চেষ্টা করতে লাগল। মাকে খাওয়ায় সাহায্য করত, অক্সিজেনের মাস্ক পড়ে গেলে সেটা ঠিক করে দিত।

এই পর্যায়ে ডাক্তাররা গ্লেন্ডাকে জানাল সে অনেকটা ভালো হয়ে গেছে, এখন বাড়ি ফিরে যেতে পারে। কিন্তু তখনও তার শরীরে দুর্বলতা কাটে নি, অল্পেই শ্বাসকষ্ট হয়। তাছাড়া সে গল্প শুনেছে করোনা আক্রান্ত রোগিদের হাসপাতালে প্রিয়জনদের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয় না। আত্মীয়স্বজনের সাথে ফোন বা ভিডিওতে কথা বলতে হয়। অনেকে একাকী মৃত্যুবরণ করে।

গ্লেন্ডা বাড়ি ফিরতে অস্বীকার করল। সে হাসপাতালের কর্মীদের জানায় তার স্বাস্থ্য এখনো ঝুঁকির সম্মুখীন আর তার খুব ভয় মাকে সে আর দেখতে পারবে না। মায়ের ঘরে কি আর কাউকে থাকতে দেওয়া হবে? হাসপাতালের লোক বলল না, আর কোন রোগি সেখানে থাকবে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে মায়ের সাথে থাকার অনুমতি দিল। মায়ের চিকিৎসা চলতে লাগল। হাসপাতালে থাকার বিশাল খরচের ধাক্কার কথাটা মনে এসেছিল, কিন্তু গ্লেন্ডা সেটা পাত্তাই দিলনা।

১০ এপ্রিল লিন্ডার অবস্থা যেন একটু ভালো হলো। ভালো মত খাওয়া-দাওয়া করল, বন্ধু-বান্ধবদের ফোন করে বলল, শিগগির দেখা হবে। কিন্তু দুইদিন পর রোববারে তার নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে গেল। এর ফলে যে তীব্র কষ্ট হলো, সেটা ছাড়া আর কিছুতেই সে মন বসাতে পারল না।

গ্লেন্ডা মায়ের হাত ধরে তাকে সাহস দেবার চেষ্টা করল, তাকে বরফকুচি খাওয়াল। লিন্ডা গ্লেন্ডাকে আদর করে বলল, ‘তুই এক চার মেয়ের সমান।‘ গ্লেন্ডাও মাকে বলল তার মতো এত ভালো মা আর হয় না।

মায়ের কষ্ট নিজের চোখে দেখার যন্ত্রণা অসহনীয়, কিন্তু তারপরও গ্লেন্ডা মায়ের পাশে থাকতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে।

‘এ একরকম শাপে বর। একই সাথে গভীর বেদনার, আবার সান্ত্বনারও। এই যে আমরা এক সাথে করোনায় অসুস্থ হলাম। হাসপাতালেও আমি বাড়ির মতো করে তার দেখাশোনা করেছি, ঠিক যেমনটা তার অভ্যেস ছিল,‘ গ্লেন্ডা বলে। ‘আমি তাকে যতদূর সম্ভব আরামে রাখার চেষ্টা করেছি, প্রফুল্ল রাখতে চেষ্টা করেছি। মা যে আমার প্রাণের প্রাণ।‘

পরের দিন ১৩ এপ্রিল। গ্লেন্ডার মায়ের প্রতি নজরদারি চলছে। সেইদিন সকালে লিন্ডার পালসের গতি বেড়ে গেল। এবার মনে হচ্ছে শেষ সময় উপস্থিত।

গ্লেন্ডা মাকে বিদায়ের অনুমতি দিয়ে বলল, ‘মা তুমি আমাকে নিয়ে ভেবো না, আমি ঠিক চালিয়ে নেব। তুমি কী বাবাকে দেখতে পাও? তাহলে বাবার সাথে চলে যাও।‘ মা বলল: ‘তোর বাবাকে আমি দেখতে পাইনা, কারণ আমি এখনো মরতে চাই না। আমি বাঁচার জন্য এখনো লড়ে যাচ্ছি।‘

মার অসহ্য কষ্ট। গ্লেন্ড জানতে চাইল উপশমের জন্য কী ডাক্তাররা কোন ওষুধ দিতে পারে? সেই ওষুধ আর যথাসময়ে আসেনি। মেয়ে গ্লেন্ডার হাতটি ধরা অবস্থাতেই লিন্ডার মৃত্যু হয়।

গ্লেন্ডা বাড়ি ফিরে আসে। একা। কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন অসুস্থতা গেছে যে নড়বার জো ছিলনা। তারপর তাড়াহুড়ো করে হাসপাতাল যাওয়া। বাড়িটা বড্ড অগোছালো হয়ে গেছে। তবু চারপাশে ছোট ছোট হাতির মূর্তি দেখে গ্লেন্ডার মনটা খানিকটা শান্ত হলো। এই হাতির মূর্তিগুলো লিন্ডা বিদেশে ভ্রমণের সময় সংগ্রহ করেছে। গ্লেন্ডার মনে হলো হাতির মূর্তিগুলো তার মায়ের মতো – বেশ একটা ভারিক্কি, রাজসিক ভাব, দেখে মনে হয় প্রিয়জনকে আগলে রাখায় নিবেদিতপ্রাণ।

গ্লেন্ডার ইচ্ছা ছিল মায়ের জন্য বেশ ঘটা করে একটা অন্ত্যোষ্টি সভা করবে। তার ৮০তম জন্মদিনে ৩০০জন লোক এসেছিল। কিন্তু এখনকার সামাজিক দূরত্বের জমানায় ১০ জনের বেশি একত্র হওয়া সম্ভব নয়।

বাড়িতে বসে বসে গ্লেন্ডা নানা জায়গা থেকে আসা ফোনের উত্তর দেয়। কত খাবার আর ফুল আসছে, তার তদারকি করে!। গ্লেন্ডা বলেঃ ‘আমি ঈশ্বরের ওপর বেজার হতে চাই না। নিজেকে বারবার বলি, মা একা মারা যাননি। কত লোকতো একা মারা যাচ্ছে!’

টিভি ছাড়ালেই করোনভাইরাসের খবর। ডেট্রয়েটে ১,০০০-এর ওপর মানুষ মারা গেছে। ‘করোনার খবর শুনতে শুনতে এত তিতিবিরক্ত হয়ে গেছি যে কী করব ভেবে পাইনা। প্রতিবার মৃত্যুসংখ্যা দেখি, আর ভাবি এই সংখ্যার মধ্যেও মাও আছে।‘

৩০ এপ্রিল গ্লেন্ডা ও আত্মীয়স্বজনের একটা ছোট দল, লিন্ডার গির্জার পাদ্রীসহ সাউথল্যান্ড শহরে কেম্প ফিউনারেল হোম-এ অন্ত্যোষ্টি সভায় একত্র হলো। সভাকক্ষে লিন্ডার কফিন ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে।

গ্লেন্ডা সভায় একটি কথাও বলল না। তবে মাকে সে একটা চিঠি লিখেছিল, সেটা সভায় আরেকজন পড়ে শোনাল। সেই চিঠিতে গ্লেন্ডা লিখল: ‘মা, তুমি মাঝে মাঝেই আমাকে জিজ্ঞেস করতে, কীরে, আমি মা হিসেবে কি ভালো? প্রতিবার আমি উত্তর দিতাম, মাগো, তোমার মতো মা আমি আর কোত্থাও খুঁজে পাবনা।'






অনুবাদক পরিচিতি:
আশফাক স্বপন 
লেখক। অনুবাদক।

আশফাক স্বপন ‘বইয়ের হাট’-এর সাথে যুক্ত। আটলান্টায় থাকেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রকাশিত ভারতীয় অভিবাসী সাপ্তাহিক পত্রিকা India-West-এ লেখালেখি ও সম্পাদনার কাজ করেছেন। সেখানে প্রকাশিত লেখা ভারতের Times of India থেকে শুরু করে Deccan Herald পর্যন্ত নানা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকার Daily Star পত্রিকায় পাক্ষিক কলাম লেখেন। তার বাংলা ভাষান্তরিত লেখা নিয়মিতভাবে ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।




1 টি মন্তব্য: