বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

অহনা বিশ্বাসের গল্প: ভাগের মা

আমাকে আমার শ্বশুরমশাই পছন্দ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরকম অনেকেরই জীবনে ঘটে থাকে, তবু আমি ভাবতাম আমার মতাে ভাগ্যবতী কেউ নেই।
স্বামীর থেকেও শ্বশুরগর্ব বেশি ছিল। কেননা তার নামডাক বিস্তর। ডাকসাইটে ট্রেড-ইউনিয়ন নেতা তিনি। কোম্পানির বড় বড় ম্যানেজাররাও যে মানুষটিকে ভয় করে চলতেন, তিনি যে আমাকে সংসারে কী গুরুত্ব কী আদর দিয়ে চলতেন, সে কেবল আমিই জানি।


সত্যি বলতে কী, খুব সাধারণভাবে বেড়ে ওঠা সাধারণ পরিবারের মেয়ে হলেও আমার মনটা যেন আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা ছিল। যে বয়সে সব মেয়েদের এদিক ওদিক বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, সেসময় আমি বিয়ে করতে ভয় পেতাম। ছােটবেলা থেকে ছবি আঁকার নেশা ছিল। মা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় সহায় ছিলেন। তিনি পরিবারের আর সকলের সঙ্গে লড়ে আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করেছিলেন। আর সেই কারণেই তাে আমার এই পরিবারে আসা।

ফাইনাল সাবমিশনের একজিবিশন হচ্ছে তখন সরকারি আর্ট গ্যালারিতে। সেখানেই তিনি আমাকে প্রথম দেখেন। তাঁর চোখে আমার মতাে শ্রীময়ী আর একজনও ছিল না। সর্বোচ্চ দাম দিয়ে তিনি আমার একখানা ছবি কিনেও ফেলেন তাঁর অফিসের জন্য। আর বাড়িতে ফিরে তিনি তার নিজের ছেলেকে অনুপ্রাণিত করতে থাকেন আমাকে ঘরে আনার জন্য। শান্ত, নম্র, গুণবতী আরও কত বিশেষণ যে তিনি তাঁর পুত্রের কাছে দিয়েছিলে আমার সম্বন্ধে, তা শুনলে আমি লজ্জায় কানে আঙুল দিতাম। আমি যে আয়নায় নিজেকে দেখেছি। বন্ধুদের মধ্যে আমিই যে অতি সাধারণ। অতি সাধারণ বলে আমার সাজতেও কোনােদিন ইচ্ছা যায়নি। অন্যভাবে নিজের দাম বাড়াতে চেয়েছিলাম। হ্যাঁ, সে কাজ, মানে ছবি আঁকার কাজ, খুব ধীরে ধীরে করেও চলছিলাম। আমার স্বামী মাটির মানুষ। কিন্তু আশ্বস্ত হয়েছিলাম, আমার শ্বশুরের কোনাে আপত্তি নেই দেখে। আমি বাড়ির চিলেকোঠায় আমার একটা স্টুডিয়ো বানিয়ে নিয়েছিলাম। আগেই বলেছি, আমার শ্বশুর প্রতিপত্তিশালী ছিলেন, কিছু দিন পরপর কোনাে না কোনাে গ্যালারিতে আমার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা তিনিই করে দিতেন। আমার স্বামীকে ব্যবসার কাজে খুব ব্যস্ত থাকতে হত, আর শ্বশুরমশাই নেতা লোক বলে, অফিস থেকে একটু আধটু ছাড় পেতেন বলে কোনাে প্রদর্শনীতেই আমাকে একা যেতে হত না। আমার এ নিয়ে এতটুকু অভিযােগও ছিল না। আমার সহপাঠীরা আমার এই সৌভাগ্যে ঈর্ষাই করত। তারা এখানে ওখানে ঘুরত, মজা করত, সিনেমা দেখত, কিন্তু তারা এত প্রদর্শনীর আয়ােজন করতে পারত না ।

আমার শাশুড়ি ছিলেন না। যে খুড়শাশুড়ির কাছে আমার স্বামী মানুষ হয়েছেন, তিনিও তাঁর মেয়ের বাচ্চা মানুষ করতে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। তারপর আর ফেরেননি। আমি একা থাকতে ভালােবাসতাম। কিন্তু এত একা বােধহয় নয়। আমার মা তাঁর শাশুড়ি-ননদের কাছে খুব শাস্তি পেয়েছিলেন। সে কারণে শাশুড়িহীন বাড়িতে বিয়ে দিতে তিনি এত খুশি মনে সায় দিয়েছিলেন। কে জানে চিরকাল মায়ের কাছ-ঘেঁষা মেয়ে ছিলাম বলেই কিনা এত শাশুড়ির অভাব বােধ করতাম। আত্মীয়স্বজন অবশ্য বলত— থাকলে মজা বুঝতে। নেই, তাই কান্নাকাটি করছ।

আমার স্বামীর চার বছর বয়সে তাঁর মা চলে যান। এ বাড়িতে তাঁর একটিও ফটো নেই। স্বামীকে যখন জিজ্ঞাসা করতাম তােমার মাকে মনে পড়ে? তিনি নিঃশব্দে ঘাড় নাড়তেন। বলতেন কাকিমা- ঠাকুমার কাছে আমি বড় হয়েছি। মায়ের অভাব কখনাে ছেলেবেলায় বুঝিনি । মায়ের মুখ তাঁর মনে পড়ত না। আমি তাঁর মুখে, তাঁর শরীরে আমার না দেখা শাশুড়িকে খুঁজতাম। ছেলের মুখের সঙ্গে তাঁর বাবার মিল খুব সামান্যই। আমার পাশে বড়ই সুশ্রী আমার স্বামী। টিকালাে নাক, উজ্জ্বল রং, কালাে গভীর চোখ। আমি বলতাম, তুমি তােমার মায়ের মতাে দেখতে।

তিনি বলতেন, তােমার একটু শাশুড়ি বাতিক আছে। শাশুড়ি থাকলে তুমি এমন কী পেতে যা এখন পাচ্ছ না। আমি ওনাকে বােঝাতে পারি না, একজন মহিলার কাছে আরেকজন মহিলার কী মূল্য। এই শ্বশুরবাড়ির উত্তরাধিকার তাে আমি তাঁর কাছ থেকেই নিতাম। আমার খুড়শাশুড়িকেও আমি পাইনি। একজন মা তাঁর ছেলের বউকে কীরকম গভীর যত্নে সংসারে প্রতিষ্ঠা করতেন তা আমি জানি না, সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমি চিরজীবনের জন্য বঞ্চিত হয়েছিলাম।

তবু মায়ের স্মৃতি ছিল না বলেই আমার স্বামীর কাছে নির্দ্বিধায় যেসব কথা বলা যেত, সেসব কোনাে কিছুই আমার শ্বশুরমশাইয়ের কাছে ওঠানাে যেত না। আমি বুঝতাম, ওই জায়গায় তাঁর গভীর ক্ষত। তাঁর বিয়ের পঞ্চম বৎসরে শুধু তাে তাঁর স্ত্রীর রােগে ভুগে মৃত্যু হয়নি। এ মৃত্যু একটা বীভৎস হত্যাকাণ্ড। তিনি দাঙ্গার সময় খুন হয়েছিলেন। নােয়াখালির সেই ভয়ংকর দিনগুলােতে আমার শ্বশুরের ঘরে আগুন লেগেছিল। কোনােমতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আমার শ্বশুর পালিয়ে এসেছিলেন। পালাতে পারেননি তিনি। আগুনে ঝলসে তিনি পুড়ে মরেছেন। তাঁকে নাকি, বের হতেও দেওয়া হয়নি। শ্বশুরমশাই আর ফিরতেও পারেননি সেখানে। আমার শাশুড়ির কোনাে সৎকার হয়নি। এ স্মৃতি খোঁচানো আমার পক্ষে ভয়ানক নির্মমতা ছিল। আমি শান্ত হয়ে শুধু তাঁর দুঃখের স্পর্শ নিতাম । তিনি যখন সামান্য অবসর পেলে অন্ধকারে ছাতে একলা বসে থাকতেন, আমি জানতাম, তিনি এখন কার কথা ভাবছেন।

না, তিনি আর বিয়ে করেননি। প্রথম যৌবনে স্ত্রী হারানাের পর, সর্বস্বান্ত হবার পর কলকাতায় ভাইদের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া একজন মানুষ যখন নতুন করে সংগ্রাম করলেন, জীবন শুরু করলেন, তখনও কি ভাবেননি দ্বিতীয় কারুর কথা? আমার নিজের ভাই-বােন নেই। আমি ভাবতাম আমার শ্বশুরের দ্বিতীয় বিয়ে হলে আমি অন্তত দেওর পেতাম, যারা আমার থেকে বয়সে বেশ ছােট হত। আমি আমার নিজের প্রভাবে নিজে মতাে করে তাদের গড়েপিটে নিতে পারতাম।

আমার স্বামী তাঁর বাবার ওপর খুবই কৃতজ্ঞ ছিলেন, তিনি তাঁর জন্য সৎমা নামের কোনাে বিভীষিকা আনেননি বলে। তবু তাঁর কাছেই আমি শুনেছিলাম— এক অবিবাহিতা, বয়স্ক মহিলার সঙ্গে আমার শ্বশুরের যােগাযােগের কথা। তিনিও হতভাগিনী। পাকিস্তান থেকে আসার পথে তাঁর বাবা-মা দুজনেই হারিয়ে যান। অন্যদের ভরসায় থাকতে থাকতে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খিদমত খাটতে খাটতে তাঁর জীবনের যখন কোনাে মানে ছিল না, তখন আমার শ্বশুরের সান্নিধ্যে তিনি পুনর্জীবন পেয়েছিলেন। তবু ছেলের মুখ চেয়েই তাঁকে তিনি বাড়িতে প্রতিষ্ঠা দেননি, কিন্তু আজীবন দায়িত্ব নিয়েছেন। এসব শুনে শ্বশুরের প্রতি শ্রদ্ধা আমার বেড়ে যাচ্ছিল। আমার তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে প্রবল ছিল। ইচ্ছে হত, আমার শ্বশুরই আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যান। তাঁর পুত্রবধুর সঙ্গে তিনি নিজেই আলাপ করিয়ে দিন। আমি তাঁকে প্রণাম করে তাঁর দু-হাত ভরা আশীর্বাদ নিয়ে ঘরে আসি।

আমার স্বামী এসব ব্যাপার ঠিক বুঝতেন না। মানে আমি ওনাকে ঠিক বােঝাতে পারতাম না। তিনি বলতেন, তােমার মাথার পােকাটা কি মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে?

নিজেকে নিয়ে খুব ভাবতাম বলেই জানি মাথার পােকা আমার ভালােই নড়ে। আমার সন্তান জন্মানাের পর আমি সেই মহিলার সঙ্গে দেখা করার জন্য ব্যস্ত হই। আমার কন্যাটিকে কোলে নিয়ে আমার বিছানায় তিনি একবার এসে বসুন, আমি একটা ফটো তুলে রাখি, এ আমার সাধ ছিল। মরিয়া হয়ে শ্বশুরকে সে কথা বলতে তিনি খানিক অদ্ভুত চোখে আমার দিকে চেয়েছিলেন। তারপর ঘরের ভেতরে ঢুকে আমার স্বামীকে এমন কিছু বলেছিলেন যে তারপর থেকে আমার স্বামী তাদের বাড়ির অভ্যন্তরীন বিষয়ে আমাকে আর বিশেষ কোনাে তথ্যই দিতেন না। আর আমার পিতার চেয়েও স্নেহশীল শ্বশুর সেই প্রথম সরাসরি আমার ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন বলে আমি খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। আমার সদ্যোজাত মেয়ের গায়ে সেই জল টপ টপ করে পড়েছিল।

মেয়ে জন্মানাের পর আমার জীবনটা কেমন বদলে গেল। সত্যি বলতে কী, চারদিকে খবরের কাগজে মেয়েদের ওপর যত লাঞ্ছনা-গঞ্জনার খবর পড়তাম, তত ভয় করত। মনে হত আমার মেয়ের জীবনে যদি এইরকম ঘটনা ঘটে। আমি সময় পেলে যে ছবি আঁকতাম, সে ছবিগুলােতে আমার অজান্তেই যেন মেয়েদের সমস্যাগুলাে স্থান পাচ্ছিল। হয়তাে মেয়ের জন্যই আমি আমার সাধের ঘেরাটোপ থেকে বের হতে চাইছিলাম। মানে স্বামী বা শ্বশুরের সঙ্গ ছাড়াও আমি একলাই বাইরে বের হতে চাইতাম। স্বামীর গাড়িও নিতে চাইতাম না। ড্রাইভার আমার বডিগার্ড হয়ে যাক এ আমি আর সহ্য করতাম না। মানে প্রথম দিকে যেগুলােতে আমি বেশ সুখ ও সুবিধা অনুভব করতাম, সেগুলাে যেন আমাকে দমিয়ে ফেলছিল। বস্তুত মেয়ের জন্যই আমি নতুন করে পৃথিবীটাকে চিনে নিচ্ছিলাম। যে পৃথিবীতে আমার মেয়ে হাঁটবে চলবে তাকে চিনে জেনে নেওয়ার ভার, তাকে সুরক্ষিত করার ভার আমার ওপর এসে পড়েছিল। আমি যে আর নম্র ভদ্র শ্রীময়ী বউ থাকতে পারছিলাম না।

আমি অনেকদিন থেকে আমার শ্বশুরের সেই সঙ্গিনীর ঠিকানা জোগাড় করার চেষ্টায় ছিলাম। ড্রাইভারের কাছ থেকে কথা প্রসঙ্গে সেটা বেরও করেছিলাম। তারপর এক দুপুরে শ্বশুরমশাইকে ঘুমন্ত রেখে আমি পা টিপে টিপে তাঁর কাছে হাজির হয়েছিলাম। আমার পরিচয় পেয়ে তিনি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ঠিক, কিন্তু আমিও কম হইনি।

এই তিনি? এতই কুৎসিত দর্শন। ভাবার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জিত হয়েছিলাম সন্দেহ নেই। আমিই বা কী রূপবতী? প্রথমদিকে আমার স্বামীর পাশাপাশি যেতে যে আমার লজ্জা করত। আমার মেয়েটাও হয়েছে আমার মতন। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে তাঁর পায়ে হাত ছোঁয়াই।

তিনি ভয় পান। জিজ্ঞাসা করেন, কেন এসেছি আমি? আমার শ্বশুর বা স্বামী জানেন কিনা। সত্যি কথা বললে তিনি বিশ্বাস করতে চান না। কীরকম যেন কুঁকড়ে বসে থাকেন। আমি আলফাল বকে তাকে সহজ করতে চাই। তারপর একসময় আমি জিজ্ঞাসা করি, আমাদের বাড়ি কখনাে যান না কেন?

তিনি বলেন, তাই কি যেতে পারি আমি? সবাই কী বলবে?

বললাম, সবাই আবার কী বলবে? বাবাকে আপনি এত দিন সান্ত্বনা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখলেন। মা মারা গেছেন কতকাল। আপনি না থাকলে বাবা এত কাজ করতেই পারতেন না।

তাঁর চোখ চিকচিক করে উঠল। বেদনা-চিহ্নিত মুখখানি পেল হয়ে এল। তিনি মুহূর্তের জন্য যেন অন্যমনস্ক হলেন। তারপর আমার থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে আদুরে গলায় বললেন, তুমি এসেছ আমার মন ভরে গেছে। এক-দু’বার ছেলেকে দেখেছি দূর থেকে। কাছে যেতে সাহস হয়নি।

আমি বলতে পারলাম না, তাতে কী হয়েছে, কাছে যাবেন। আপনারই তাে ছেলে। বদলে শুধু মাথা নিচু করে তাঁর স্পর্শ নিলাম।

কিন্তু তারপরই তিনি বিদায় দেবার জন্য ব্যস্ত হলেন। তােমার আর এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক নয় মা। বাড়ি যাও।

আমি বললাম, আর একটুখানি বসি। সত্যিই তাঁর কাছে যে আমার অনেক গল্প শােনার দরকার ছিল। তাঁর নিজের জীবনের গল্প, আমার শ্বশুরের গল্প। বাড়িতে যে আজকাল নৈঃশব্দের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠি। এই তাে ধীরে ধীরে তিনি আমাকে আপনার করে নিচ্ছেন, এরইমধ্যে বিদায় নিতে হবে কেন?

উনি ব্যস্ত হলেন। যাও বাবা। তােমার শ্বশুরের টাকায় থাকি। তিনি হয়তাে রাগ করবেন তুমি এসেছ বলে। আমিও কথা-টথা বলেছি বলে। উনি রাগী মানুষ। ভয় করে।

তিনি রাগ করুন আর যাই করুন, ওনার অস্বস্তি হচ্ছে বলেই উঠলাম। যাবার সময় বললাম, আমাদের বাড়ি এবার অবশ্যই যাবেন।

তিনি বলে উঠলেন, তুমি সরল মেয়ে বলেই একথা বলছ, মা। শুনে ভালাে লাগছে। তুমি বােধহয় জানাে না তােমার শ্বশুর আমাকে বিয়ে করেননি। রক্ষিতার কি সে অধিকার আছে। সকলে আমায় মেনে নেবেন কেন?

সাততাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসে মেয়েকে বুকে তুলে নিলাম। তখনও আমার শ্বশুর ঘুমােচ্ছেন। আর একটু পরেই উঠবেন। টিপটপ হয়ে চা খেয়ে পার্টি অফিস যাবেন। তারপর হয়তাে সেই রক্ষিতার কাছে। তাঁর জীবনে স্বাধীনতা সম্মান কোনাে কিছুরই তাে অন্ত নেই।

কচি মেয়েকে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে মনে হল, আহা রে, এ যদি কোনােদিন বিবাহিত কোনাে মানুষের প্রেমে পড়ে, কিংবা কোনাে অমানুষের? ভালােবাসা তাে কোনাে হিসেব করে হয় না। সেও যদি কোনােদিন নিজেকে রক্ষিতা বলে পরিচয় দেয়!

শেষপর্যন্ত থাকতে না পেরে স্বামীকে বললাম, তার কাছে যাওয়ার গল্প। তিনি খুব রেগে গেলেন। এমনকী এও বললেন, শ্বশুরমশাইকে রাগালে আমাদের না খেয়েও থাকতে হতে পারে। কেননা আমার স্বামী যেসবের ব্যবসা করেন, তার সব যােগাযােগ আমার শ্বশুরের মাধ্যমেই হয়।

আমি হেসে বললাম, তিনি নিজের ছেলের বউয়ের বিরুদ্ধে এরকম কাজ কখনাে করতে পারেন না। স্বামী গম্ভীর গলায় বললেন, বাবা অনেক মানুষকে চরিয়ে খান। এ বাড়িতে অনেক ভেবেচিন্তে তােমার মতো সাধারণ সরল সিধা মেয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে স্বামী শ্বশুরের ওপরে মাথা তুলতে না পার। নইলে অনেক শিক্ষিত অনেক সুন্দরী অনেক বড়লােকের মেয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। বেশি খ্যাপামি করলে এ বাড়িতে যেসব সুবিধা সুযােগ পাচ্ছ তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাতে তােমার সঙ্গে আমার সমস্যাও কিছু কম হবে না।

আমি রাগ করলাম, আমি দুঃখ পেলাম, কান্নাকাটি করলাম। আমার জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেছে বলে মনে হল। মেয়েটা না থাকলে হয়তাে পালিয়েই যেতাম। মেয়েটা না থাকলে এই অপমানের জীবন শেষ করে দেবার ইচ্ছে হত। কিন্তু মেয়েটার জন্য, মেয়েটাকে মানুষ করার জন্য আমি বাঁচতে লাগলাম। আমার মা যেভাবে আমার জন্য তিল তিল করে স্বাধীনতা সংগ্রহ করতেন, মেয়ের জন্য ঘরে থেকেই আমি তেমন করেই ধীরে ধীরে বাঁধন কাটতে লাগলাম।

ভয় কাটতে লাগল। এবার যেন ওরাই আমাকে সমঝে চলতে লাগল। আমার আর নাগাল পাচ্ছেন না জেনে ওরাই যেন সমীহ করতে লাগলেন। আসলে ইতিমধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল আমাদের সংসারে। শ্বশুরমশাই পার্টির মধ্যে ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছিলেন। শেষমেশ তার প্রথম স্ট্রোক হয়ে গেল। বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী রইলেন তিনি। এবং আমার স্বামীর ব্যবসাতেও মন্দা লাগল।

কে জানে কেন, এসব ঘটনায় যতখানি আমার ভেঙে পড়ার কথা ছিল, ততখানি কিছুই হল না। বরং আমি আরও ছাড় পেলাম। অনেকদিনই আমার ছবি আঁকা চললেও আর প্রদর্শনী হত না। শ্বশুরমশাই হয়তাে এতে আর তেমন আগ্রহ পেতেন না। আমাকে কারুর সঙ্গে আলাদা করে মিশতে দিতেন না বলে আমিও তেমন যােগাযােগ করে উঠতে পারিনি। হাতে টাকাপয়সাও ছিল না। আগের সব প্রদর্শনীতে যা বিক্রিবাট্টা হত সবই শ্বশুরমশাইয়ের হাতে এসে জমা হত। তার কাছে আলাদা করে চাইতেও পারতাম না, কেননা মনে হত আমাদের সব খরচ, প্রয়ােজনের অতিরিক্ত সব যিনি দিচ্ছেন, তার কাছে চাওয়ার কী আছে। হ্যাঁ, আর একটা সাংঘাতিক কাজ করেছিলাম, শশুরমশাইয়ের অসুস্থতার সময় জোর করে সেই সঙ্গিনীকে একবার নিয়ে এসেছিলাম।

আমার প্রবল প্রতাপান্বিত শ্বশুর তখন একান্ত অসহায়, শয্যাশায়ী তাঁদের রেখে আমি বাইরে কাজ করছিলাম। আশ্চর্য, বেশিক্ষণ তিনি থাকেননি, আর কখনাে আসেননি। কিন্তু আমার স্বামী আমার সঙ্গে বেশ কয়েকদিন এ কারণে কথা বলেননি। তাঁর অভিযােগ ছিল এই উত্তেজনার আঘাতে তার বাবার মৃত্যু হতে পারত। অর্থাৎ আমি তাকে খুন করতে পারতাম।

না, আমার স্বামী বেশিদিন শক্ত থাকতে পারেননি। ব্যবসা পড়ে গেলে তাঁর আত্মবিশ্বাসে আঘাত লেগেছিল। তার কোমর ভেঙে গিয়েছিল বলা যায়। একসময় নিরুপায় হয়েই তিনি বলেন, তােমার একটা প্রদর্শনী করা যায় না। বাড়িতে তাে অনেক ছটি পড়েই আছে। ছবি বিক্রি হলে কিছু টাকা আসত।

আমি বললাম, আমার নাম আজ সবাই ভুলে গেছে। লােকে শুধু শুধু আমার ছবি কিনবে কেন?

উনি বললেন, তােমার ছবি খুব সুন্দর। আমি নিজে সুন্দর এ কথা আমি এ বাড়িতে অনেক বার শুনেছি, কিন্তু আমার ছবি সুন্দর! আমি হেসে ফেললাম। আমার স্বামী বললেন, হেসাে না। তােমার ছবিই হল লক্ষ্মী। অনেক আগে থেকেই ওদিকে আমাদের মন দেওয়া উচিত ছিল। ঠিকঠাক মার্কেটিং করতে পারলে যেমন আমাদের হাতে টাকা আসবে, তেমন তােমার শিল্পী হিসেবে নামও ছড়াবে।

সত্যি, আমি খানিক হেসে খানিক কেঁদে আমার পুরােনাে ছবিগুলাে থেকে ধুলাে ঝাড়তে শুরু করলাম। ছবিগুলাে দেখতে দেখতে আমার মধ্যে আবার আঁকার তীব্র প্যাশন হল। আমি পাগলের মতাে রাত জেগে ছবি প্রস্তুত করতে লাগলাম। আমার স্বামী তারিফ করতে লাগলেন, ফ্রেম তৈরি করতে লাগলেন, গ্যালারিগুলাের সঙ্গে যােগাযােগ করতে লাগলেন, খবরের কাগজের সাংবাদিক ও নানা শিল্পীদের সঙ্গে ভাব করতে লাগলেন। আমার আবার প্রদর্শনী হল। আমি সেজেগুজে সেই প্রদর্শনীতে ঘুরতে লাগলাম। আমার শ্বশুর আসতে পারলেন না। আমার স্বামী পিছন থেকে সব কলকাঠি নাড়লেও সামনে এলেন না।

সত্যিই, অনেকদিন ব্যবসা করার পর আমার স্বামীর মার্কেটিং করার ক্ষমতা ভালোই ছিল। আমার নামডাক হল। কাগজে ভালাে রিভিউ বের হল। আমার ফটো ছাপা হল। চার-পাঁচটা ছবি মােটা দামে বিক্রি হল। আর অনেক লােকের সঙ্গে আলাপ হল। সত্যি বলতে কী এই প্রদর্শনী আমার পুনর্জন্ম ঘটাল। আমার মার কথা সবচেয়ে বেশি তখন মনে হচ্ছিল। এমনকী আমার শাশুড়ির কথাও ভাবছিলাম। যে শাশুড়িকে আমি দেখিনি, যাঁর একটা শাড়ি, একটা চুড়ি, একটা মাথার কাঁটা, কোনাে স্মৃতিচিহ্নই আমাদের বাড়িতে নেই, তাকে আমি বার বার ছবিতে ধরবার চেষ্টা করে যেতাম। এ একেবারে আমাকে নেশার মতাে পেয়ে বসেছিল। এই ছবিটার খুব সুনামও হয়েছিল। ছবিটার নাম আমি দেশভাগ রাখব নাকি ভাগের মা রাখব স্থির করতে না পেরে নাম দিয়েছিলাম ‘নিরুদ্দিষ্টের প্রতি পত্র’। অনেক টাকা দাম উঠেছিল এর। এক শিল্পপতি নেবেন বলে বুক করে রেখে গিয়েছিলেন। আমার শশুর ছবিটা দেখেননি। কিন্তু স্বামী বলেছিলেন, তােমার শাশুড়ি বাতিক যে পুরস্কৃত হল দেখছি। ভালাে দাম পাওয়া গেল। তুমি এরকম ছবি আরও আঁকো।

হ্যাঁ, আঁকছিলাম। বস্তুত ‘নিরুদ্দিষ্টের প্রতি পত্র’ নামে বঙ্গভূমি বিচ্ছেদের ফলস্বরূপ নারীকূলের প্রতি অত্যাচারের প্রায় ধারাবিবরণী ছবিতে মুদ্রিত করে যাচ্ছিলাম। আমার অসুস্থ শ্বশুর এসব একেবারে দেখতেন না এমন নয়। কেবল মাঝে মাঝে এসব বিষয় ছাড়া কি অন্য বিষয় নেই— ইত্যাদি স্বগতােক্তি করতেন। একদিন তিনি আমাকে ডেকে খুব বােঝালেনও। বললে, দ্যাখাে কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালােবাসে? আমাদের জীবনে খুব বড় ট্রাজেডি হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে দ্যাখাে, মানুষ ভুলেও গেছে। ভুলে না গেলে কি বাঁচা সম্ভব? বরং এসব নিয়ে আলােচনা-টনা হলে, ছবি-টবি আঁকলে দাঙ্গা বেঁধে যাবারও সম্ভাবনা আছে।

আমি বললাম, তা কেন? মানুষ তাে বর্তমানকে সংশােধন করার জন্যই ইতিহাস পর্যালােচনা করে। তাছাড়া এ তাে সব সম্প্রদায়েরই অসুখ। পাঞ্জাবে, উত্তরপ্রদেশে, বিহারে হিন্দুরাও এমনটি করেছে।

উনি উদাস হয়ে বললে, পণ্ডিতদের কথায় ভুলাে না। জীবন অন্য রকম। যাদের পাঁচজনকে নিয়ে বাঁচতে হয় তাদের তত্ত্ব করলে চলে না। বাস্তবকে জানতে হয়। আমি এতদিন ইউনিয়ন করে এসেছি, তুমি জান তাতে সফলও হয়েছি। তত্ত্ব মানলে হতাম না। আমি বললাম, আমিও কোনাে তত্ত্বের কথা বলছি না। সত্যি বলছি আপনাকে, শুনলে হয়তাে আপনি কষ্ট পাবেন— আপনার স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলছি বলে। তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, এটা যে আমি ভুলতে পারি না। আমি রান্না করি। আমার হাতে একটু ছ্যাকা লেগে গেলে কত কষ্ট হয়, আর উনি! আপনাকে আমি সত্যি বলছি, এটা একান্তই হৃদয়ের ব্যাপার। আমি কোনাে তত্ত্ব-টত্ত্ব করছি না।

তুমি তাে দেখেছ আমার ইউনিয়নের মুসলমান কর্মচারীরা আমাকে শ্রদ্ধা করত। আমি যদি আমার জীবনের ওই ঘটনা নিয়ে ভালোমতাে রটনা করতাম, কী সহানুভূতি পাবার চেষ্টা করতাম তাহলে হয়তাে ওরা ভয় পেয়ে যেত।

আপনি ওরকম বলেই তাে আমি ভরসা পেলাম, বাবা।

উনি আর কিছু বললেন না। জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। আমিও আমার মেয়েকে ওনার কোলে ফেলে নিজের কাজে গেলাম। যদি ওনার মন একটু অন্য দিকে ফেরে।

সত্যি আমার মনে হত আমাদের সংসারে সব কিছু থাকা সত্ত্বেও যে প্রাণ নেই তা কেবল আমার শাশুড়ির অভাবে। মায়ের কাছে মানুষ হয়নি বলে আমার স্বামীটিও যেন কেমন ভীতু ভীতু। মায়ের কোলের নিরাপত্তাটুকুও যে বেচারার জোটেনি। তেমনই নিষ্প্রাণ আমার শ্বশুরমশাই। সে কারণে বােধহয় চেষ্টা সত্ত্বেও বিষয়টা থেকে বের হতে পারছিলাম না। আর এই বিষয়টার জন্য আমার খ্যাতি হচ্ছিল, ছবি বিক্রি হচ্ছিল— ফলে এটা ত্যাগ করার কোনাে জোরও ছিল না। আর এই সুত্রে আমার ভাব হয়েছিল বাংলাদেশের মুহাম্মদ শামিমের সঙ্গে।

খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে। একেবারে ছােট ভাইয়ের মতাে ওর আচরণ। ওদের বন্ধুদের গ্রুপটা খুবই সংবেদনশীল, আর সাম্প্রদায়িকতার ওপর কাজ করত। ওরা খুব চাইছিল বাংলাদেশে আমার প্রদর্শনী হােক। আমার স্বামীর সঙ্গেও ও জমে গেল। আমাদের দুজনকে খুব লােভ দেখাল বাংলাদেশ নিয়ে যাবার জন্য। বলল, নােয়াখালিতে আপনাদের গ্রামে নিয়ে যাব। দেশের বাড়ি দেখতে আপনার ইচ্ছে করে না?

আমার স্বামী মজেছিলেন সেও আগেই বলেছি। তিনি সাততাড়াতাড়ি আমার প্রদর্শনীর সময় বাংলাদেশ যাবার একটা ব্যবস্থা করে ফেললেন। আমিও বলাবাহুল্য খুব খুশি। কেবল বাদ সাধলেন আমার শ্বশুর। তিনি খুবই অনড় হলেন। তাঁর কেবলই ভয় তাঁর পুত্র-পুত্রবধূকে ওদেশ থেকে আস্ত ফিরতে দেওয়া হবে না।

এই প্রথম দেখলাম, আমার স্বামী এইসব অবাস্তব চিন্তাভাবনার প্রতিবাদ করলেন এবং আমাকে ওনার সামনেই প্যাক করার নির্দেশ দিলেন। সেই রাতে শ্বশুরমশাই অন্নগ্রহণ করলেন না। বলাবাহুল্য, আমারও খাওয়া হল না। ওনার বিছানা করতে গিয়ে অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে থমকে গেলাম। ওনার চোখ দিয়ে জল ঝরছে। চোখ মুছে আমাকে বললেন, তােমরা যখন চাইছ তখন বাংলাদেশ ঘুরে এসাে। আমি বুড়াে হয়েছি, আমার কথার আর দাম থাকবে না জানি। কিন্তু তােমার প্রদর্শনী তাে ঢাকা আর চট্টগ্রামে। তুমি আমাদের গ্রামে যেও না। তুমি এইটুকু কথা আমার রাখাে। ভবিষ্যতে আর কখনাে তােমাদের কোনাে কথা বলব না। কখনাে নিজের মতে চালানাের চেষ্টা করব না। কথাটা শেষ করে তিনি বাচ্চা ছেলের মতাে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন।

আমার মনে যাবার সব আনন্দ নিভে গেল। ওনার ছেলেকে সে কথা বলতে তিনিও ফুঁসে উঠলেন। বাবার কথায় তুমি কান দিচ্ছ? ওনার বুড়াে বয়সে ভীমরতি হয়েছে। সারাজীবন মাথা উঁচিয়ে বেঁচে শেষজীবনে কান্নাকাটি হচ্ছে। সাইকিয়াট্রিস্ট দ্যাখাতে হবে ওনাকে। আমি বলতে গেলাম, সেরকম নয়, সেই ঘটনার ট্রমাটা ওনার মনে পড়ে গেছে। বিশেষত দেশভাগ সাম্প্রদায়িকতায়, নারীর অবস্থান— এটা আমার বিষয় হবার জন্য আরও ভয় পাচ্ছেন। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমার স্বামী আরও রেগে উঠলেন। বললেন— ওনার ওই চোখের জলে তুমি এমনই ভুললে যে আর বাংলাদেশ যেতেই চাইছ না। মনে রেখাে, এটা তােমার বিষয় মাত্র। এই বিষয়টা এই অঞ্চলের মানুষই বেশি খাবে। এই অঞ্চলেই বিক্রি হবে। এটা নিয়ে যত বিতর্ক হবে, তত তােমার ছবি দেখতে লােকে ভিড় করবে। তত তােমার নাম হবে। আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন নয় যে তােমাকে কেউ মেরে দেবে। তাছাড়া গায়ে যদি একবার হাত ওঠায় তাহলেই তাে তােমার আন্তর্জাতিক খ্যাতি হয়ে যাবে। বিষয়টা বাছার জন্য তাে তােমার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারি না। আমার স্বামী বাংলাদেশ যাবার ব্যাপারে এত উৎফুল্ল ছিলেন যে আমার জন্য একটা কালাে বেনারসী কিনে এনেছিলেন। আমি যেন এটা পরে উদ্বােধনের দিন প্রদর্শনীতে যাই— এটা তিনি চাইছিলেন। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন অনেক ফটোগ্রাফার আসবে, আর তাদের চোখে আমাকে প্রকৃত সুন্দরী দেখাতেই হবে।

বাংলাদেশে যারা আমার বন্ধু হয়ে ছিলেন তাঁদেরকে আমার সুন্দরী শাশুড়ির জীবনের পিরণাম বলেছিলাম। তাঁদের মনে যে গভীর ব্যথা পৌঁছেছে তা আমি অনুভব করেছিলাম। শ্বশুরের ওইরকম কান্নাকাটির পর গ্রামের বাড়িতে যাবার বাসনা আমার ছিল না। কিন্তু শামিমকে সবই বলেছিলাম, গ্রামের নাম-ধাম বিবরণ। সে আমাদের আশ্বস্ত করেছিল, দেখে আসবে আমাদের ঘরদুয়ারের কী অবস্থা। ওর বর্ণনা থেকেও আমাদের অর্ধেক দর্শন হয়ে যাবে।

নােয়াখালির আমাদের পৈত্রিক গ্রাম থেকে ফিরে সে আমাদের উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করেছিল। ফোন আমিই ধরেছিলাম। আমি স্তম্ভিত হয়ে শুনছিলাম, আমার শাশুড়ি বেঁচে আছেন। তিনি এখন রহমত মােল্লা নামে একজন ধনী ব্যক্তির বিধবা। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি বললাম, এ হতেই পারে না। শামিম বলল, ওখানে অনেকেই আপনার শ্বশুরমশাইকে চেনেন। ও আমার শ্বশুরমশাই ও তার পরিবার সম্পর্কে এমন সব তথ্য দিতে লাগল যেগুলাে আমি ওকে কোনােদিন দিইনি। আমার পরে আমার স্বামী ফোন ধরলেন। তিনিও এসব কথা শুনলেন। তারপর ফোন রেখে গুম হয়ে বসে থাকলেন।

আমি বললাম, মনে হয় কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। উনি বললেন, তাই হয়তাে হবে। সেইসময় তাে বাড়িতে বাবা ছাড়া কেউ ছিলেন না। ঠাকুমা কাকাদের নিয়ে আগেই এদিকে এসেছিলেন। বাবা চাকরি করতেন বলে আসার উপায়ও ছিল না। আমি ভাবছি মৃতদেহ সৎকার হয়নি, হয়তাে অর্ধদগ্ধ ছিল। হয়তাে তারপর কোনােক্রমে বেঁচে উঠেছেন। কিন্তু তাই বলে কারুর ঘরণী হওয়া কি সম্ভব! আমার ঠাকুমার কাছে শুনেছি ভয়ানক রূপসী ছিলেন বলে নিজের মুখ আড়াল দিতে এতটাই ঘােমটা টানতেন যে শাড়িতে হোঁচট খেয়ে বার বার পড়ে যেতেন।

আমি বললাম, বিয়ে তাে তাঁকে করতেই হত। নইলে বাঁচতেন কেমন করে? তার পক্ষে তাে একা একা একটা অন্য দেশে পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না। সে আমলে তাে মেয়েরা লেখাপড়াও শিখত না। আর শিখলেই বা কী? বাজারে শিক্ষিত অশিক্ষিত সব নারীমাংসেরই দামই যে এক। একবার আমার স্বামী চাইছিলেন বাড়িতে ফোন করে সব কথা জানিয়ে বাবার সঙ্গে আলােচনা করতে। কিন্তু আমিই তাকে এ কাজ থেকে বিরত করি। একা ঘরে এ সংবাদ শুনে তার যে কী মনে হবে, কী যে করবেন কে জানে! তবে যাইহােক, এসব উলটোপালটা খবর শুনে আমার স্বামী ঠিক করলেন একবার তার নিজের জন্মস্থানেই যাবেনই। কেন এরকম একটা রটনা হল নিজের কানে শুনে সরেজমিনে তদন্ত করে আসবেন।

শামিম আমাদের কথা বলে রেখেছিল বলেই কী না জানি না গ্রামে আমরা খুব আপ্যায়িত হলাম। অনেকেই আমাদের দাওয়াত দিতে চাইছিলেন। গ্রামটাও খুব সাজানােগোছানাে। নারকেল বাগান, সুপুরিবাগান চারদিকে। আমরা একজনের বাড়ির বৈঠকখানায় বসেছিলাম। অবিলম্বে আমাদের নিতে এলেন এক বয়স্ক ভদ্রলােক। তিনি আমার স্বামীর গায়ে মাথায় হাত দিয়ে এমন আদর করতে লাগলেন— যেন মনে হল সে বাচ্চা ছেলে। তিনি ওঁদের ভাষায় বললেন, আপনি কি আর আমাকে চিনতে পারবেন? আপনাদের বাসায় আমি কামলা ছিলাম। আপনারা চলে যাবার পর কতদিন পােড়া ঘরটা ফাঁকা হা হা করত। আমাদের তো তখন যা অবস্থা ছিল। তারপর আপনাদের ঘরে এসে সারিয়ে-টারিয়ে থাকলাম। এখন ছেলেপুলেরা লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করছে। কাজেই যখন এসেছেন তখন নিজের বাড়িতেই থাকবেন। পরের বাড়িতে থাকতে দেব না।

মানুষটার এতই আন্তরিকতা ছিল যে আমাদের যেতেই হল। আমার মেয়েটাকে তিনি কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, আমার স্বামীকেও তিনি এভাবে নিয়ে যেতেন।

হ্যাঁ, আমাকে অন্দরমহলে ঢুকতেই হল। বাড়ির বর্ষীয়ান মহিলাটি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, এতদিনে শাশুড়িকে দেখতে আসার সময় হল।

আমি প্রায় লাফিয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে তার মুখের দিকে চাইলাম। ইনিই কি তবে?

তিনি হেসে বললেন, তুমি কি আমাকে তােমার স্বামীর মা ভাবছ? তা নয় গাে। তুমি খাওদাও, বিশ্রাম করাে, তারপর তার কাছে নিয়ে যাব। তিনিও খবর পেয়েছেন।

মেয়েদের মহলে আছি। অনেক মেয়েই আমাকে দেখতে আসছে। কিন্তু এই ব্যাপারটা মনের মধ্যে এমন চেপে আছে যে ভালাে করে কথা বলতেও পারছি না। তাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছি। মহিলা বােধহয় কিছু বুঝলেন। সকলের কাছ থেকে সরিয়ে নিলেন আমাকে। বললেন, তুমি কী ভাবছ মা আমি আন্দাজ করতে পারছি। তাঁর কী দোষ বলো? তাঁকে যে তােমাদের সমাজ নিল না।

আমি বললাম, মরতে মরতেও কি বেঁচে উঠেছিলেন?

হ্যাঁ মা, মেয়েদের তাে মরতে মরতে বেঁচে থাকতে হয়। সেসময় যেসব কাণ্ড হয়েছিল, পুরুষগুলাে রাক্ষস হয়ে গিয়েছিল। আমরা সেই পাপীতাপীগুলাের সঙ্গেই যে বাস করি। তাদের ছেলেপুলেই যে পেটে ধরি।

আমি একেবারে আমার সাবজেক্টের মধ্যে এসে পড়েছিলাম। কিন্তু ওসব ভাবার কথা আমার মাথায় আসেনি। আমি একটা রহস্যের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। আর এই রহস্য যতক্ষণ না উন্মােচন হয় আমার অন্য কোনাে কথায় মন ছিল না।

আমরা জানতাম তিনি পুড়ে মারা গেছেন।

তােমাদের ঘরে যখন আগুন লাগল তখন তাে তিনি সে বাড়িতে ছিলেন না। তােমার শ্বশুর তােমার স্বামীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন হকবাড়িতে। তারাই যা তখন পাঁচজনকে বাঁচিয়েছিল। বাঁচানাের মতাে ক্ষমতাও তাদের ছিল কিনা। পরে তারাই সীমান্ত পার করে দিয়ে এসেছিল।

তাহলে আমার শাশুড়ি তখন কোথায় ছিলেন?

সে শয়তানদের যুগ ছিল মা। তােমার শাশুড়ি তাে দেখতে শুনতে ভালাে ছিলেন। গাঁয়ে সকলে জানত তােমাদের বাড়িতে একটি রত্ন আছে। তাই ভাবি, খারাপ দেখতে মেয়েরা বােধহয় কিছুটা রক্ষাও পায়। ভাগ্য তাদের সবটাই খারাপ নয়।

তারপর কী হল বলুন।

দাঙ্গা শুরু হল। আমার তখনও বিয়ে হয়নি। কিন্তু এই ঘটনাটা নিয়ে বাড়িতে আলােচনা হত খুব। গাঁয়ের একদিকে দেখছ তাে তােমাদের বাড়ি। এখনকার মতাে এত জমজমাটও ছিল। বেশ কয়েক দিন প্রতি রাতে তােমার শাশুড়িকে কারা তুলে নিয়ে যেত। ফের দিয়ে যেত সকালে। বলেছি না, মানুষ রাক্ষস হয়ে গিয়েছিল।

হিন্দুবাড়ির বউ। বাড়িতে সেসময় অন্য আত্মীয় ছিল না। কিন্তু স্বামী তাে ছিল। সে তাে নিজের ইচ্ছায় যায়নি। কিন্তু স্বামীও নাকি মেনে নিতে পারেনি। অথচ বাধা দিতেও পারত। বাধা দিলে খুন হয়ে যেত। একদিন বাধা দিতে গিয়েছিলেন , তাে তারা নাকি তােমার স্বামীকে মানে ছােট বাচ্চাটাকে তুলেছিল আছাড় দেবার জন্য। তাই দেখে তােমার শাশুড়ি তাদের পায়ে ধরে বলেছিল আমি যাব। যেখানে তােমরা নিয়ে যাবে যাব। যা করতে বলবে তাই করব, ওকে ছেড়ে দাও। সেটাই ভয়ানক দোষের হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন তিনি ফিরেছিলেন, কিন্তু তাঁর স্বামী তাঁকে নাকি ঢুকতে দেননি। দুঃখে শােকে তিনি ওই পুকুরটায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন। রহমত মােল্লার তখন জোয়ান শরীর। ওই পাশে দাঁড়িয়ে খেত দেখছিল। তার চোখে পড়তে সেই সাঁতরে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনল। তােমাদের ধর্ম তাে বুঝি না বাপু। তােমার শ্বশুর তখনও অনড়। রহমত মােল্লা আর কী করবে, নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে তুলল। তা সেই রাতেই এই ঘরে আগুন লাগাল কারা সব।

বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মধ্যে তখন আমি দুলছি। শ্বশুরকে এতদিনের চেনা, খারাপ ভালােয় মেশানাে মানুষটাকে অবিশ্বাস করতে পারছি না। ইচ্ছে হচ্ছে এক্ষুনি স্বামীকে গিয়ে সব জানাই। কিন্তু তিনি তখন খানাপিনা আর গল্পে মত্ত।

আমি বললাম, চাচি, তিনি শুনেছি ঘরের বাইরে বের হতেন না। খুব সতীসাবিত্রী ছিলেন। ফের বিয়ে করলেন কী করে?

বিয়ে না করে উপায় ছিল কি মা? ওঁকে তাে কেউ সীমান্ত পার করে দিয়ে আসেনি। তােমাদের আত্মীয়স্বজন কোথায় কে ছিল তাও জানি না। তারাও কোনােদিন খোঁজ নিতে আসেনি। আজ এতদিন পর তােমরা এলে। রহমত মােল্লার বাড়িতেই ছিল সে। সে বাড়িতেও লােকজনের আনাগােনা বাড়ছিল। তারপর লােকজন এসে মেয়েদের ফেরতও চাইছিল। তারা সব কোথায় যাচ্ছিল কে জানে। সেসব নিয়েও তাে নানা গল্প শােনা যাচ্ছিল। রহমত মােল্লার বউ ছিল, তিন তিনটে বাচ্চা ছিল। ফের নিকে করল একে। না, মা, তােমার শাশুড়ি আর মরতে-টরতে যায়নি। রহমতের দুখানা বেটা, একখানা বেটি হয়েছে তার পেটে। তবে রহমতের বড় বউ বড় জ্বালিয়েছিল তাকে। তার মুখে তাে কোনাে কথা ছিল না। শুনেছি তার এই স্বামী তাকে যত্নআত্তিই করত।

চাচি আমার সামনে কতরকমের খাবার সাজিয়েছিলেন। আমার কিন্তু ভালাে লাগছিল না। তাকে বললাম, ওনার সঙ্গে দেখা না করে আমি মুখে কুটোটি তুলতে পারব না।

চাচি নিয়ে গেলেন আমাকে। স্বামীকে আমি ডেকে নিলাম। আমি যাঁকে দেখতে চলেছি তিনি সত্যিই আমার শাশুড়ি কিনা কে জানে। তাকে এই ভূমিকায় আমার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। মন বলছিল, সব কিছু যেন মিথ্যা হয়।

একটা প্রাচীরঘেরা বড় বাড়ির ভেতরে চাচি ঢুকে যান। এটাই রহমত মােল্লার বাড়ি। কেউ কেউ আমাদের ভেতরে ডাকে। আমরা এগুই। একটা দরজার সামনে গিয়ে থেমে যাই। চাচি বলেন, তোমরা বসো। তিনি আসছেন।

আমরা আসন গ্রহণ করি। আমার বুক ধুকপুক করতে থাকে। আমার স্বামীর মুখ করুণ হয়ে যায়। আমি কোনোক্রমে তাঁর হাত স্পর্শ করে দেখি তিনি ঠান্ডা হয়ে বসে আছেন।

তিনি ঢুকলেন। আমরা দুজনেই উঠে দাঁড়ালাম। তিনিও দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু পরনে কালো বোরখা। তাঁকে দেখব কেমন করে। তিনি ধীরে ধীরে এগুলেন, আমার কন্যাটিকে স্পর্শ করলেন। কন্যাটি তাঁর কাপড় ধরে টানতে লাগল। তাঁর শীর্ণ ফর্সা হাত যেন কাঁপতে লাগল। তিনি দরজার দিকে ঘুরলেন। চাচি তাঁকে ধরে ঘরের ভেতরের দিকে নিয়ে গেলেন।

আমি পিছু পিছু গেলাম। স্বামী আমার পিছনে অসহায়। আমরা যে ওনাকে দেখতে পেলাম না।

না, এখানে তেমন বােরখার চল নেই। চাচি বােরখা পরেননি। একটি অল্পবয়সি পুরুষকে দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনিও আমার স্বামীর দিকে হা করে তাকিয়ে। দুটি ভাই। কী মিল।

চাচি বললেন, ওর শরীর ভালাে নেই মা। এতটা উত্তেজনা নিতে পারছেন না। যা কাঁপুনি হচ্ছিল ওনার। চলাে। উনি নিজের ছেলেকে দেখেছেন, এবার কবরে গেলেও শান্তি পাবেন। ওই ছেলেকে বাঁচানাের জন্যই না এত।

পারলাম না থাকতে। সন্ধেবেলায় একা লুকিয়ে ঢুকে পড়লাম ওই বাড়িতে। একেবারে ওই ঘরটিতে। তিনি একা নেই। সঙ্গে একটি অল্পবয়সি মেয়ে। পর্দা নেই। একখানি কাপড় মাটিতে বিছিয়ে নামাজ পড়ছেন। আমাকে দেখেও থামলেন না।

শেষ হলে যখন উঠে দাঁড়ালেন, আমি মাটিতে মাথা রেখে তাকে প্রণাম করলাম। তিনি কথা বললেন না। ধীরে কাজ করতে লাগলেন। কী যেন খুঁজতে লাগলেন। অপমানে আমার চোখে জল এল। কারণ আমি যে তাকে চিনেছি। আমি যে ওই শরীর চিনি, ওই চোখ, ওই নাক, ওই গায়ের রং সব আমার চেনা।

তিনি ওই মেয়েটিকে প্রশ্ন করলেন- ও এসেছে কেন? কী দেখতে এসেছে ও?

মেয়েটি একবার আমার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। তারপর আমাকে বলল, চলুন আপনি ওঘরে বসবেন। আম্মির মাথাটা ঠিক নেই।

মাথা ঠিক নেই? বললেই হবে মাথা ঠিক নেই? তিনি প্রায় চিৎকার করছেন। মাথা গােলমাল হলেই তাে ভালাে হত। যখন পাঁচ-ছটা জানােয়ার তুলে নিয়ে যেত তখন তাে আমার মাথা খারাপই ছিল, তাই না?

মেয়েটি আমাকে জোর করে ঠেলে অন্য ঘরে নিয়ে যেতে চায়। মাকে সে বকে। তােমার শরীর খারাপ আম্মি। একটু চুপ করাে না।

কেন চুপ করব? ওর জানা দরকার ও কোন জানােয়ারের বাড়ির বউ।

মেয়েটি লজ্জিত হয়ে তার মায়ের মুখে হাত চাপা দেয়। কী যা তা বলছ। উনি আমাদের মেহমান। তারপর আমার দিকে ফিরে বলে, কিছু মনে করবেন না।

উনি নিজের মুখ থেকে মেয়েটির হাত জোর করে সরিয়ে দেন। খাটে বসে কাঁপতে থাকেন উনি। আমি তাে মেয়েদের বার বার বলি কাউকে বিশ্বাস করবে না। পুরুষমানুষগুলােকে কোনাে বিশ্বাস নয়। ঘরের বউ, ভালাে ভালাে কথা। মিথ্যে, কী মিথ্যের মধ্যে যে ভরসা করে আমি ছিলাম। কী বােকা ছিলাম। হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। মেয়েটি তার মাকে জড়িয়ে ধরল। শরীর খারাপ করছে আম্মি ? আমি অসহায়ের মতাে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি।

মেয়েটি ওঁকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে। ভাবি তাে তােমাকে কিছু বলেননি আম্মি।

ভাবি? ভাবি বলিস কেন তুই ওকে? ওরা আমার কে? ওরা আমার বুক থেকে ছেলে কেড়ে নিয়েছিল। আমাকে ফেলে রেখে গেছে জানােয়ারদের মুখে। আরে তখন বুঝিনি, পরে তাে বুঝেছি সে লােকটাও ওদের মতাে একটা জন্তু ছাড়া কিছু ছিল না।

মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আম্মি বড়ভাইয়ের কথা ভুলতে পারেন না।

আমি তাঁর কাছে এসে তাকে ছুঁতে চাইলাম। তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে বললেন, না, না আমি সব ভুলে গেছি। ভুলব না তাে কী? ওরা আমার কেউ নয়।

তিনি কী একটা খুঁজতে লাগলেন। খাটের তলা থেকে বাক্স প্যাটরা বের করতে লাগলেন। তারপর বের করলেন কয়েকটা গয়না। আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। নিয়ে যাক এসব। এসব ওদের জিনিস। জিজ্ঞেস কর তাে, আর কী কী দিতে হবে। ইজ্জত তাে আমার আগেই লুটে গেছে। গায়ের চামড়াটা যদি খুলে নিয়ে যেতে চায় তাে তাই নিক। তিনি নিজের শাড়িটাও খুলতে চাইলেন। মেয়েটি সর্বশক্তি দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরল।

কে জানে কেন আমি কাঁদছিলাম। আমার শাশুড়ির চরম দুঃখে লাঞ্ছনায় নাকি আমার অপমানে আমি তাদের বাড়ির দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে কাঁদছিলাম। আমাকে দেখতে বাড়ির ও পাড়ার অন্য মেয়ে-বউরাও ততক্ষণে জড়াে হয়েছে।

ছোট মেয়েটি কাতর কণ্ঠে আমাকে অনুরােধ করল, আপনি ও ঘরে গিয়ে যদি না বসেন মাকে সামলাতে পারব না।

আমি ধীরে ধীরে পাশের ঘরে এলাম। আশেপাশের মেয়ে-বউরা আমাকে জানাচ্ছিল, চিরকালই ওনার মাথার গােলমাল। মাঝে মাঝে ঠিক থাকেন মাত্র। ওর ছেলেমেয়েরা খুব ভালাে বলে সামলেসুমলে রেখেছে। নইলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন।

মাকে ঘরে রেখে দরজায় শিকল তুলে মেয়েটি নত মুখে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। যেন মায়ের ব্যবহারে ও কতই অনুতপ্ত। আমি ওর বড় ভাবি। ও আমার সবচেয়ে ছােট ননদিনী। এতজনের সামনে আমরা নিজেদের মধ্যে সম্পর্কটুকুও ঝালিয়ে নিতে পারছি না।

বুদ্ধিমতী মেয়েটি জনতার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাবি একটু বিশ্রাম নেবেন। পরে নাহয় আসবেন আপনারা। জানেনই তাে বেশি লােকজন দেখলে আম্মি খেপে ওঠেন।

অসন্তুষ্ট মানুষজন চলে গেলে আমি বললাম, শিকল খুলে দাও। সে বলল, মাকে শান্ত করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। এখন ঘুমােবেন।

আমি বললাম, তা হােক, খুলে দাও বােন। এখন তো কেউ নেই। আমি আর কতক্ষণ থাকব। তাঁকে দেখে যাই দু-চোখ ভরে।

দরজা খােলা হল। শান্ত তিনি শুয়ে আছেন। আমরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। গলা নামিয়ে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছি। তাঁর কথা জিজ্ঞেস করছি, তাঁকে নিয়ে একবার আমাদের বাড়ি যাবার কথা।

মেয়েটি স্বীকার করল, বড়ছেলের কথা মা প্রায়ই বলেন। তার আব্বা যখন বেঁচে ছিলেন তখন তিনিও চেয়েছিলেন একবার দেখিয়ে আনতে। আম্মিই রাজি হয়নি। এখন দেখতে পেয়ে কী কাণ্ডই না করছেন!

কিন্তু আমাদের কথা কি সামান্য জোর হয়ে গিয়েছিল? তাকে দেখলাম উঠে বসতে। তিনি কি আমাদের কথা শুনতে পেয়েছিলেন? নইলে রুগ্ন শীর্ণ আমাদের মা বলে উঠলেন কেন–

যেতাম। কিন্তু যে ছেলেটিকে কেড়ে নিয়েছিল, এ তাে সে নয়। এ যে অন্য লোক। ভয় করে মা, পুরুষমানুষকে বড় ভয় করে।


৭টি মন্তব্য:

  1. চমৎকার -অস্থির এক সময়ের ভয়ংকর চিত্র ।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক সরিয়েছেন।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. অসামান্য দলিল। চোখের জলের জীবন্ত দলিল

    উত্তর দিনমুছুন
  4. অসাধারণ এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল এই গল্প।

    উত্তর দিনমুছুন